বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৩২
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
একদম পরিপূর্ণ এক দম্পতি যেভাবে নিজেদের বাচ্চা নিয়ে কোথাও যায়? ঠিক হিমেল এবং মিথিরও এই মুহুর্তে একই রিক্সায় বাচ্চা কোলে নিয়ে বসা দৃশ্যটা যেন এক সুখী দম্পতির দৃশ্য। হিমেল মনে মনে হাসল বিষয়টা ভেবে। পরমুহুর্তেই আবার মুখ গম্ভীর করে নিল। যা নিয়ে ভাবার অধিকার তার নেই, সেসব ভাবনায় কেন মাথায় চড়ে বসে? মস্তিষ্ক কি জানে না যেসব ভাগ্যে নেই সেসব নিয়ে ভাবনা ভাবা নিষেধ? হিমেল পিচ্চিটার দিকে চাইল। একটু আগে অব্দি চোখমুখ বুঝে রেখে ঘুমালে ও এখন জেগে আছে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে হিমেলের মুখশ্রীর দিকে। অথচ বাচ্চা হিসেবে তার স্বভাব চরিত্র দেখাল একেবারেই শান্ত, সভ্য। এই যে কোলে আছে?তার একটুও কান্না নেই, জ্বালাচ্ছে না। হিমেল অনেকটা সময়ই তাকিয়ে থাকল। ঠিক শেষ মুহুর্তে এসেই রিক্সা নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে হিমেল ছোটশ্বাস টেনে নামল। এরপর পর মিথি নামল। হিমেল এবার শান্ত গলাতে প্রথমে শুধাল,
“ ওকে একটু নে, ভাড়া দিয়ে নিই। ”
মিথি সঙ্গে সঙ্গে হাত বাড়াল। নিজের মেয়েকে কোলে নিল। মিথি এতক্ষন যাবৎ যে হিমেল কোলে নিল এটাও চায়নি।ছোট করে বলল,
“ ধন্যবাদ হিমেল ভাই। আপনি এবার চলে যান। বাকিটা আমি সামলাতে পারব। ”
হিমেল ভ্রু বাঁকিয়ে চাইল। কপাল কুঁচকে এল ওর কথাটা শুনেই। অন্যদিকে মিথি মেয়েকে কোলে নিয়ে অন্যপাশ ফিরতেই মেয়ে তার চিকন কন্ঠটার প্রকাশ করেই কেঁদে উঠল। আকস্মিক কান্নার কারণ মিথি বুঝল না। তবুও মেয়েকে কোলে নিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করল। কান্না থামানোর চেষ্টা করল। হিমেল তখনভাড়াটা দিয়ে ফের মিথির পাশে এসে দাঁড়াল। শুধাল,
“হ্যাঁ, তুই তো সব পারিস মিথি। আমি শিওর এটাও পারবি। পারবি না তো বলিনি তাই না? ”
মিথি বুঝল না এটা কি খোঁচা দিল তাকে? রাগ রাগ বুঝাল স্বরটা? মিথি আসলেই বুঝল না। ও মেয়েকে শান্ত করতে চাইল কেবল। হিমেল এবারে আবারও বলল,
“ ওকে আমায় দে মিথি। ”
মিথি স্পষ্টই দিতে চাইল না যেন। মুখচোখের অস্বস্তি দেখে তাই বোধগম্য হলো। ও চাইল না, হিমেল ভাই থাকুক এখানে। অথচ হিমেল থাকল। এবং হাত বাড়িয়ে মিথির মেয়েকে কোলেও নিল পুণরায়। অতঃপর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কান্না থামাল। আদুরের পুতুলের মতো কোলে নিয়ে ফের মিথিকে বলল,
“ এমন একটা ভাব করছিস যেন ওকে কোলে নিয়ে আমি কোথাও চলে যাব। বাচ্চাচোর মনে হয় তোর আমাকে? নাকি শিশু-পাচারকারী? ”
মিথির মুখটা চুপসে গেল। ছোটশ্বাস টেনে বলল,
“ তেমন নয় হিমেল ভাই। আমি শুধু চাইছিলাম আপনি এখানে না থাকুন তাই। ”
হিমেল গম্ভীর গলায় জানাল,
“ আমি আছি, তোদের একেবারে বাসায় পৌঁছে দিয়েই যাব।এখন সামনে এগো।”
মিথি সামনের দিকে হাঁটা ধরল। পিছু পিছু হিমেল নিজেও পা বাড়াল।আর ছোট্ট মিথিফুলকে ফের নিজের কোলে আবারও ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকতে দেখে ও হেসে ফেলল। মিথির অগোচরেই হুট করেই নিজের খোঁচা খোঁচা দাঁড়িওয়ালা মুখটা এগিয়ে চুম্বন আঁকল ছোট্ট মিথির ফুলের কপালে৷ খুব সযত্নেই চুমু দিল যাতে দাঁড়ির খোঁচা না লাগে নরম ত্বকে, কান্না না করে। অতঃপর আবারও পা চালাতে চালাতে বলল,
“ছোট্ট মিথিফুল? তোমার উপর যদি আমার অধিকার থাকত তাহলে তোমায় মাথায় তুলে নাচতাম বুঝলে? তোমায় ঠিক এভাবেই, এভাবেই কোলে তুলর নিয়ে ঘুরতাম বহুপথ। তোমাকে সবসময়, সবকিছু থেকে রক্ষা করতাম বাচ্চা মিথিফুল। কিন্তু আপসোস ঐ যে, তোমার উপর আমার বিন্দুমাত্রও অধিকার নেই। একটুও না। অথচ তুমি আমার হয়ে, আমার কাছে থাকলে আজ সবচাইতে বেশি খুশি আমিই থাকতাম জানো?”
কথাগুলো হিমেল বিড়বিড় করেই বলল। মিথি অব্দি গেল না। মিথিও শুনল না, নিজের মতোই পা চালাল। অন্যদিকে হিমেলের কল এল। একহাতে সযত্নে কোলে রেখে অন্যহাতে কল রিসিভড করল ও। ওপাশের ব্যাক্তিটি কিছু বলতেই বলে উঠল,
“ আমি আরো এক দেড় ঘন্টা পর যাব ভাইয়া। একটু কাজে আটকে গেছি। চলে আসব, তুমি একটু সামলে নাও। ”
মিথি এইবারে ফোন আলাপটা স্পষ্টই শুনল। পা থামিয়ে একবার হিমেলের দিকে চাইল। নিজের কাজ ফেলে রেখে মিথিকে সাহায্য করার কি এত মানে? কি এত প্রয়োজন? এটা কি পরিচিত হিসেবে সহানুভূতি দেখানো?
টীকা দেওয়াতে যাওয়ার পর অব্দিও হিমেল পিচ্চি প্রাণটাকে কোলে কোলে রাখল। মিথি টীকার কার্ডে নাম ঠিকানা এসব বলছিল। তারপর হুট করেই ওখানকার এক মহিলা হিমেলকে ইঙ্গিত করে জিজ্ঞেস করল,
“ উনিই কি বাচ্চার বাবা? আপনার হাজব্যান্ড? ”
আকস্মিক এই প্রশ্নটায় মিথি অস্বস্তিতে পড়ল। প্রশ্নটা স্পষ্ট আওয়াজে হিমেলও শুনল। মিথির মুখচোখ ছোট হয়ে এল মুহুর্তেই।একবার হিমেলের দিকেও চাইল সতর্ক হয়ে যে শুনল কিনা। পরমুহুর্তে দ্বিগুন অস্বস্তি, লজ্জায় পড়ল। দ্রুত জবাব দিল,
“ না,না উনি প্রতিবেশী। ”
মহিলাটা তবুও তাকাল হিমেলের দিকে। দুয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে ফের আবার শুধালেন,
“ বাচ্চাকে আদরযত্ন করে কোলে রেখেছেন তাই ভাবলাম বাচ্চার বাবা হবেন। যায়হোক, আপনি তো বাচ্চার আব্বুর নাম বলেননি?বাচ্চার আব্বুর নাম কি? ”
ফের দ্বিতীয় দফায় প্রশ্নে মিথি তাকাল মহিলার দিকে। একটু আগে যে অস্বস্তি লজ্জায় মুখ ছোট হয়ে এল তা আর দেখা গেল না। বরং স্পষ্ট গলায় উল্লেখ করল,
“ ওর আব্বু আম্মু দুইজনেই আমি। এইজন্য বলিনি। বাবার নামের জায়গাটা খালি থাকলেও কিছু হবে না। খালিই রাখুন।”
মহিলা হাসলেন। ভাবলেন বাচ্চজ কোলে নেওয়া ছেলেটি আর এই মেয়েটি সত্যিই স্বামী স্ত্রী। হয়তো নতুন দম্পতি। কোন কারণে ঝগড়া হওয়াতেই বোধহয় মেয়েটা রেগে গিয়ে এসব শোনাচ্ছে। ভদ্রমহিলা হাসলেন। হিমেলের দিকে ফের চেয়ে বললেন,
“ উনার সাথে ঝগড়া করে এলেন নাকি? যতোই বাচ্চার বাবা-মা আপনিই হোন বলুন না কেন, কিন্তু আসলে তো বাচ্চার বাবা আছেন তাই না? নাম উল্লেখ করতে সমস্যা কি?বলুর বাচ্চার বাবার নাম। ”
মিথি ছোটশ্বাস ফেলল। এখন এই মহিলাকে ও কিভাবে বুঝাবে ও বাচ্চার বাবার নাম উল্লেখ করতে চায় না। বলল,
“ থাকুক না ও শুধু আম্মুর নাম দিয়েই,আম্মুর হয়েই। সবসময় আব্বুর নাম ও দিতে হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা তো নেই বলুন?”
“ বাধ্যবাধকতা নাহলেও আমরা প্রচলিত ভাবে কার্ডের সব তথ্যই পূরণ করি। বলুন। কার্ডটা কম্প্লিট করে নিই।”
মিথি এবারেও বলল,
“ খালি রাখুন বাবার নামটা। ওর বাবার অস্তিত্ব নেই তাই বলতে চাইছি না। ”
ভদ্রমহিলাকে এবার বিরক্ত হতে দেখা গেল। শুধাল,
“ বাবা ছাড়া পৃথিবীতে সন্তান আছে? মৃত হলেও বাবা তো থাকেই।বাবার নাম তো থাকেই। ”
মিথি ছোটশ্বাস ফেলল। এখন কি করে বলবে কিছু বাবা মৃত না হলেও বাবা হিসেবে তারা অস্তিত্বহীন থাকে। ভদ্রমহিলাকে বুঝানোর স্বার্থে এবার শুধাল,
“ ওর বায়োলজ্যিকাল বাবা যে, তার সাথে আমার বিচ্ছেদ হয়ে গেছে কয়েকদিন আগেই। তাই আমি উল্লেখ করতে চাইছি না। আশা করি বুঝবেন। তাছাড়া বর্তমানে তো বাবার নাম ছাড়াও এসব টীকাকার্ড, জম্মনিবন্ধন হয়ে যায় আপু।সমস্যা হয় না।বাবার নাম দেওয়া তো বাধ্যগত বিষয় নয়।”
ভদ্রমহিলা এবারে বোধহয় দমলেন। মুখচোখ কুঁচকে বললেন,
“ ঠিক আছে, আপনার যা ইচ্ছে। ”
মিথি ছোটশ্বাস ফেলে। মনে মনে বিড়বিড় করে,
” আদ্র? আপনার নাম আমি কোথাও রাখব না। দেখবেন, কোথাও না। আমার মেয়ের সাথে আপনি কোনদিন কোনভাবেই জড়িত থাকবেন না। ”
অন্যদিকে হিমেল মিথির দিকে চেয়ে আছে। ভ্রু জোড়া কিছুটা কুঁচকে এসেছে। যে হিমেল মিথি তার স্বামীর কাছে ফেরত যাবে এমনটা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে নিজেকে মানিয়ে নিচ্ছিল সে হিমেল আজ শুনল ওদের বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। এই মেয়েটার হাত সত্যিই ছেড়ে দিতে মন চাইল তার স্বামীর?
হিমেল একটা প্রশ্নও করল না। একটা কথাও টানল না এই নিয়ে। গম্ভীর রূপ ধারণ করে বসে থাকল। অতঃপর যখন টীকা দেওয়ার সময় এল মিথিই আগ বাড়িয়ে মেয়েকে কোলে নিল। কান্না করবে এসব বলে। হিমেল পাশেই দাঁড়ানো ছিল। অথচ যখন সুঁই ফুটানোর সময় হলো তখন মেয়ের আগে মাই চোখ খিচে নিল সর্বপ্রথম। মেয়েকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে চোখ খিচে রেখেই বসে থাকল ভয়ে। যেন মিথিকেই সুঁই ফুটানো হবে। হিমেল দেখল দৃশ্যটা। অতঃপর নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল। ঝুঁকে বলল,
“ এত ভয় পেলে সাহস দেখাতে যাস কেন মিথি? সরে বস। ওকে আমি কোলে নিচ্ছি। ”
মিথি চোখ খুলে চাইল। দিতে চাইল না মেয়েকে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বলল,
“ না, না। আমি পারব হিমেল ভাই। ”
হিমেল ও খোঁচা দিয়ে শুধাল,
“ হ্যাঁ, তুই সবই পারবি। আমি কি বলেছি তুই পারবি না? ”
এইটুকু বলেই মিথির কোল থেকে ওকে নিয়ে নিল। বাবা বাবা অনুভূতি নিয়ে কোলে তুলে বসল। অতঃপর ইঞ্জেকশন হাতে নিয়ে দাঁড়ানো মহিলাটাকে বলল,
“ এবার দিন। ”
অতঃপর সুঁই ফুটাতে দেরি হলো না মিথির বাচ্চা মেয়েটার কাঁদতে দেরি হলো না। পুরো রুম জুড়ে কান্নার স্বর প্রতিধ্বনিত হলো।কার্যক্রম শেষ হতেই হিমেল ওকে সযত্নে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। হেঁটে হেঁটে ঘুরিয়ে, দুলিয়ে কান্না থামানোর চেষ্টা চালাল। অথচ ও কান্না থামাবেই না। ওকে কেন সুঁই ফুটানো হলো এই অভিমানে ও রিক্সায় উঠার আগ অব্দিই কেঁদে গিয়েছে। কাঁদতে কাঁদতে অবশেষে হিমেলের কোলেই ঘুমিয়ে গেল।
হিমেল আর মিথি যখন একই রিক্সায় ফিরল ঠিক তখনই রাস্তায় সাবিহা দাঁড়ানো ছিল। দুইজনকে একইসাথে একই রিক্সায় দেখে ওর দৃষ্টিটা কিছুটা নিভে এল যেন। হিমেল কি এখনো মিথিকে ভালোবাসে? এখনো চায় মিথিকে? সাবিহা ছোটশ্বাস ফেলে। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
অন্যদিকে মিথি নামার পরই হিমেল খুব আস্তে ধীরে নিজের কোল থেকে মিথির কোলে দিল ছোট্ট প্রাণকে। মুহুর্তেই ঘুম ভেঙ্গে আবারও কেঁদে উঠল ও। হিমেল চুপসানো মুখ নিয়ে চাইল। ওর যদি অধিকার থাকত তবে সারাদিনও ও কোলে নিয়ে বসে থাকতে পারত। একদম সযত্নে আগলে রাখত। অথচ সেই হিমেলের নেই। এই যে এতোটা সময় একটা অযুহাতে কোলে নিয়েছে? এর বাইরে তো জোর করে কোলে নিয়ে বসে থাকার অধিকার তার নেই। যদি বসে ও থাকে মিথি হয়তো অনেককিছু ভেবে নিবে তখন।
মিথি বাসায় ফিরে বহুকষ্টে মেয়েকে ঘুম পাড়াতে পারল। অতঃপর ঘুম পাড়িয়ে ফিজার সাথে আস্তে আস্তে কথা বলছিল। ফিজাও হাসছিল একটা বাচ্চা মেয়ের ঘুম ভেঙ্গে যাওয়াকে ওরা কত ভয় পায় তাই ভেবে। এই যে পা টিপেটিপে হাঁটে, কথা আস্তে বলে, ফোন সাইলেন্ট রাখে আরো কত কি! ফিজা যেন একটু হলেও মা মা অনুভূতিটা টের পায়।ফিজা বসে বসে টীকার কার্ডটা দেখছিল। অতঃপর দেখে ভ্রু কুঁচকে শুধাল,
“ টীকা কার্ডে শুধু মায়ের নাম উল্ল্যেখ করেছিস মিথি? বাবার নাম উল্লেখ করলি না? ”
মিথি একই প্রশ্নে আবারও চাইল। উত্তর করল,
“ শুধু মায়ের নাম দিয়েও হয় আপু। আর ও যেহেতু শুধু আমার মেয়েই, থাক না আমার পরিচয়ে। ক্ষতি কি? ”
ফিজা বুঝল। তবুও বলার চেষ্টা করল,
বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৩১
“ কিন্তু বাবা ছাড়া…”
এটুকু বলে আর বলল না। মিথি বোধহয় বুঝল কি বুঝাতে চাচ্ছিল। হেসে বলল,
“ বাবা যেখানে ওকে স্বীকারই করেনি সেখানে ওর বাবার জায়গায় কি করে বসাই ঐ মানুষটাকে? সম্ভব নয় তো আপু। যে বাবা সন্তানের অস্তিত্বের জানান পেয়ে তাকে শেষ করতে উঠে পড়ে লেগেছিল সে বাবার নাম ওর জীবনে উল্লেখ করাটা খুব জরুরী আপু? আমার তো মনে হয় না। ”
