Home বিষাদ ও বসন্ত বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৩৮

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৩৮

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৩৮
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

আদ্র সারাটা রাত ছটফট করতে করতে কাটিয়ে সকাল হতেই মায়ের কাছে এল। একটা ছোট্ট প্রাণ, একটা ছোট্ট আদর আদর আবয়ব কল্পনা করেই ওর রাতটা কাটল। কেবল মনে হচ্ছিল তার বাচ্চাটা থাকবে৷ অবশ্যই থাকবে। মিথি এতোটাও খারাপ মা হতে পারে না। আদ্র শুধু নিজের ঐটুকু কল্পনা থেকেই সকাল সকাল মায়ের কাছে ছুটে গিয়ে প্রশ্ন ছুড়ল,
“ আম্মু? তুমি কি তাকে কখনো দেখেছো আম্মু? সে আছে তাই না? ”
আদ্রর মা ভ্রু কুঁচকাল। ছেলের কথা প্রথমেই বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল,
“ কে সে আদ্র? ”
“ আ্ আমার.. মানে মিথির সন্তান। ”
আদ্রর গলা কাঁপল। সেই এইটুকু ভ্রূণটার উপর সে নিজের অধিকার প্রকাশ করে উঠতে পারল না৷ যদি সন্তানটা থাকেও, অথবা নাও থাকে তবুও আদ্রর সেই সময়কার ঘটনাগুলো স্পষ্টই মনে পড়ে। আল্ট্রাসোনোগ্রাফির সেই পাতাটাও চোখে ভাসে। ভ্রূণটা তারই অংশ ছিল, অথচ আদ্রর সাহস হচ্ছে নিজের বলে দাবি করার৷ তীব্র অপরাধবোধে মুখ কালো হয়ে এসেছে ওর। আদ্রর মা তাকিয়েই বলল,

“ এখনও নিজের সন্তান বলতে ভয় হয় আদ্র? এখনও অস্বীকার করো সে তোমার সন্তান নয়? ”
“ না আম্মু। ”
“ তো? ”
“ আমার আসলে তার বাবা হিসেবে নিজেকে দাবি করতে লজ্জা হচ্ছে। ”
আদ্রর মা শুধু তাকালেনই। উত্তর দিলেন না। এই যে এই লজ্জাটা এটা যদি কয়েকমাস আগেও আদ্রর চোখে দেখতে পেত? কয়েক মাস আগেও যদি আদ্র বুঝত? ছোট নিঃশ্বাস বের হয়ে আসে। আদ্র আবারও বলল,
“ আম্মু? সে আছে তাই না? বলো..”
“ কি চেয়েছিলে আদ্র? না থাকুক? তোমার ইচ্ছে পূরণ হোক? শোনো আদ্র, মায়েরা শত বিপদের মধ্যে থাকলেও সন্তানদের রক্ষা করতে জানে, সন্তানদের আগলে নিতে জানে।সন্তান ভালো হোক বা খারাপ, মায়েদের কাছে তাদের সন্তানরাই সব আদ্র৷ দূর্ভাগ্যবশত তোমার ইচ্ছেটা পূরণ হয়নি। ”
আদ্রর বোধহয় দুঃখী হওয়ার কথা ইচ্ছে পূরণ হয়নি শুনে। অথচ আদ্রর চোখজোড়া চকচকে করে উঠল। পুনরায় আহ্লাদ নিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“ আছে সে? বলো আম্মু..”
তার মা উত্তর করে না। আদ্র আবারও ডাকল,
“ আম্মু? বলো না..
ফের আবার কিছু একটা ভেবে বলল,
“ মিথি কি আমাকে দেখতে দিবে ওকে একবার? শুধু একবার। দেখতে দিবে আম্মু? ”
আদ্রর মা কিছুই বলল না। শুধু ছোটশ্বাস ফেলল। আদ্র ততক্ষনে বেরিয়ে গেছে। বোধহয় মিথির কাছে। একনজর সন্তানকে দেখার আকুতি করবে। বোকা আদ্র! অপরাধবোধ, অনুশোচনা, নিজের পাপ সবই বুঝল, তবে ভুল সময়ে। আমরা মানুষরা বড্ডই বোকা। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। এইটুকুই ভেবেই আদ্রর মা বিড়বিড় করে বলল,

“ প্রিয় আমজাদ,লোকমুখে শুনেছি পঞ্চাশের আগে যে প্রেমে আমরা ডুবে থাকি তা নাকি যৌবনের প্রেমের রেশ। অথচ আসল প্রেম, আসল ভালোবাসা বুঝা যায় নাকি পঞ্চাশের পর এসে। রূপ, সৈান্দর্য, দৈহিক চাহিদা সব ভুলে নিজেদের মনের সম্পর্কটুকু সজীব থাকে।অথচ আমি সেদিক থেকে বিশ্রীভাবে হেরে গেলাম বলো? আমি হেরে গেলাম, আর পঞ্চাশের পরের আসল ভালোবাসার পরীক্ষায় শূণ্য পেলে তুমি আমজাদ। তোমার শূণ্য পাওয়ার মানে বুঝো আমজাদ? এর মানে আমার সারাটা জীবনে পাওয়া ভালোবাসার পরিমাণ ও কেবলই শূণ্য। আমি আজীবন তোমার থেকে যা পেয়েছি তা কেবলই নিখুঁত অভিনয় ছিল আমজাদ। ভালোবাসা নয়। ”

আদ্র এতগুলো দিন মিথির সামনে আসতে পারেনি এক অদৃশ্য লজ্জা,সংকোচ আর অপরাধবোধ থেকেই।নিজের অন্যায়গুলো বুঝার পরও মিথির কাছে ক্ষমা চাওয়ার মতো সাহসটুকুও তার হয়ে উঠেনি। সে মুখটাই নেই তার। তবে আজ মিথির ঠিকানায় ছুটে এসেছে শুধু তার ছোট্ট বাচ্চাটার জন্য। আদ্র সে সকাল থেকেই এসেই দাঁড়িয়ে ছিল বিল্ডিংটার সামনে। মিথিকে কখন দেখতে পাবে শুধু সেই জন্য স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। অতঃপর অনেকটা সময় পর যখন মিথির দেখা মিলল আদ্রর চোখ স্থির হলো। মাথায় ওড়না চাপানো মেয়েটার ব্যস্ততা দেখে ও শান্ত দৃষ্টি ফেলে চেয়ে থাকল। অথচ সামনে যাওয়ার সাহসটুকু করতে পারছে না। ভেতরে তীব্র অস্থিরতা আর অপরাধবোধ! আদ্র বহুপরেই ধীর পায়ের মিথির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বহুকষ্টে গলা দিয়ে শব্দ বের করল,
“মিথি?”

মিথি হুট করেই চমকাল কন্ঠ শুনে। তাকিয়ে যখন দেখল এটা আদ্র ঠিক তখনই ওর চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে এল। কেমন যেন ঘৃণার ন্যায় দৃষ্টি। আদ্র আবার তাকে দোষারোপ করতে এসেছে? আবারও? শেষবার যেবার এল, তখন ও আদ্র তাকে দোষারোপ করেছিল। মিথি স্পষ্ট গলাতেই জিজ্ঞেস করল সর্বপ্রথম,
“আপনি? আবার? আবার কেন এসেছেন আদ্র? আপনার সাথে তো আমার আর কোন সম্পর্ক নেই আদ্র। তবুও কেন? আবার কেন এসেছেন এখানে?”
আদ্রর নজর আরো নাজুক হলো। মিথি আবারও বলল,
“ আবার কি দোষ দিতে এসেছেন আদ্র? চরিত্র নিয়ে আঙ্গুল তুলবেন হুহ?”
আদ্র অসহায়ের মতো তাকাল। এবারে বলল,
“ মিথি..
এইটুকু বলার পরই আর শব্দ পেল না। কি বলবে? কথা পাচ্ছে না কে ও? আদ্র কিছুটা সময় চুপ থেকে শুকনো ঢোক গিলল। ফের শুধাল,

“ মিথি, স্ সে কেমন আছে?”
মিথি ভ্রু কুঁচকে উত্তর দিল,
“ কে? ”
“ আমার সন্তান। ”
“ আপনার সন্তান? ”
আদ্রর উঁশখুশ লাগল। বলতে অস্বস্তি হচ্ছিল নিজের অন্যায়গুলো ভেবে। তবুও বলল,
“ হ্যাঁ, যে তোর গর্ভে বেড়ে উঠেছিল। কেমন আছে সে? কতটুকু হয়েছে? ”
মিথি তাচ্ছিল্য নিয়ে হাসল। উত্তর করল,
“ হাসাচ্ছেন আদ্র। আপনার সন্তান? এমন সন্তান যাকে কিনা আপনি এবরশন করিয়ে মেরে ফেলতে চেয়েছিলেন। নিজের সন্তান নয় বলে স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন।লজ্জা হচ্ছে না এখন আমার সন্তান বলতে? ”
আদ্র এবার অনুরোধ করেই শুধাল,
“ মিথি? বল না সে কোথায়? আছে এই বাসায়? আমি শুধু একবার দেখব। একবার কোলে তুলব। শুধু একটাবার মিথি।বল না, আছে সে এখানে? ”
মিথি মুখচোখ শক্ত করেই তাকাল।মুখ টানটান করে মুহুর্তেই উত্তর করল,
“ না, সে এখানে নেই। থাকলেও আমি কখনো তাকে আপনার কোলে দিব না৷ কখনোই না। ”
মিথির মুখে স্পষ্টই জেদ। স্পষ্টই রাগ। আদ্র সরু চাহনিতে চেয়ে শুধাল,
“ একবার, একবার কি বাবা হিসেবে আমি তাকে দেখতেও পারি না মিথি? নিজের সন্তানকে কোলে নেওয়ার অনুভূতু কেমন তা অনুভব করতে পারি না?”
মিথি তাচ্ছিল্য করে হাসে। আদ্রর আকুলতা আর এইমাত্র বলা সম্বোধনটা শুনে শুধাল,

“ বাবা? তাও এবরশন করিয়ে যে ছোট্ট প্রাণটাকে দুনিয়ায় আসার আগেই শেষ করে দিতে চেয়েছিলেন তার বাবা? আপনার মন নিজেকে বাবা হিসেবে ভাবতে পারছে আদ্র? ”
আদ্র উত্তর করে না। নিজের অস্থিরতা, আকুলতা ছাপিয়ে মিথির দিকে তাকিয়ে রইল। মিথি আবারও বলল,
“ আপনি কয়েক মাস আগেও ফুফিকে কি বলেছিলেন আদ্র? আমি, আমি নাকি আমারই সন্তানকে মেরে দিয়েছি! আর যায় হোক আপনার মতো নিকৃষ্ট তো আমি ছিলামই না আদ্র। আমার সন্তানকে আমি ভালোবাসি। তার অস্তিত্বের উপস্থিতির শুরু থেকেই ভালোবাসি। আপনার মতো এতোটা জঘন্য মন আমার নেই যে নিজের সন্তানকেই এবরশন করানোর মতো নোংরা চিন্তাভাবনা করতে পারব। ”
এইটুকু বলেই মিথি আর দাঁড়াল না। এক সেকেন্ডও না। পা বাড়াল।

হিমেলের সেই উত্তরটা ওর পরিবারে পৌঁছাতে দেরি করল না। মিথিকে বিয়ে করেছে এমন একটা বাক্যই পরিবারের সুখ শান্তি বোধহয় এক মুহুর্তেই নড়চড় করল। হিমেল তার বড়ভাইকে খুবই সমীহ করে চলে। বলা চলে ভাবীকেও। অথচ আজ তার মাত্রটা পার হলো। হিমেল বাসায় আসার সাথে সাথেই শুরু হলো নাটকীয় সব সংলাপ। এমনিতেই বহুদিন যাবৎ এই বাসাটায় ওর মানসিক শান্তি নেই বললেই চলে। বহুদিন হলো ওর এই বাসায় থাকতেও ইচ্ছে হয় না। হিমেল আজ সে না থাকতে চাওয়ার ইচ্ছেটাই পূর্ণ করল। ভাই-ভাবীর সাথে একটা শীতল রাগ দেখিয়ে সে হুট করেই বাসা ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছে। আর এতেই ওর পরিবারের রাগটা মিথির উপর আরো চওড়া হলো। অনেকক্ষন যাবৎ ও যখন হিমেলের সাথে সরাসরি বা ফোনকলে কোন যোগাযোগ করা গেল না তখন তার ভাবী আর মুহিবের আম্মু সরাসরিই মিথির কাছে গেল। কথাবার্তার শুরুতেই হিমেলের ভাবী বলে উঠল,
“ মিথি, হিমেল কোথায়? ”
মিথি তখন তার ছোট্ট মেয়েটাকে কোলে নিয়ে বসা। এই বাসা আরো দুইজন মেয়েও উঠেছে। সে মেয়েগুলোর সামনেই এভাবে হিমেল ভাই এর প্রসঙ্গ আসতে ও ভ্রু কুঁচকাল। কোথাও মানে? সে কিভাবে জানবে? মিথি শুধাল,

“ মানে?”
“ মানে তুমি জানো নিশ্চয় মিথি? হিমেল তোমার জন্য রাগ করে বাসা ছেড়ে চলর গেছে। কোথায় আছে বলো? যোগাযোগ করছে না কেন আমাদের সাথে? ”
মিথি ছোটশ্বাস ফেলল। এই যে একের পর এক অশান্তি তার জীবনে জুড়ে আছে? এর থেকে কি মুক্তি মিলবে না তার? অথচ মিথি মনেপ্রাণে শুধু তার বাচ্চাটাকে নিয়ে সুখে থাকতে চেয়েছে একটু। সব ছেড়ে একটু শান্তি চেয়েছে। হিমেলের ভাবী আবারও বলল,
“ তুমি ভুলে যাচ্ছো সমাজে তোমার কি পরিচয় মিথি? তুমি ডিভোর্সী, স্রেফ সোজা ভাষায় তুমি ডিভোর্সী নারী। অবিবাহিত এক ছেলের দিকে হাত বাড়াও কিভাবে? ”
এর পরের মুহুর্তেই মুহিবের আম্মু বলে উঠল,

“ আমরা ওর পরিবার মিথি। আমরা অবশ্যই চাইব ওর যাতে ভালো হয়। চাইব না বল? কোন পরিবার চাইবে ওদের অবিবাহিত ছেলেটার সাথে একটা বিবাহিত মেয়ের বিয়ে দিতে? তুই বুঝতে পারছিস তো মিথি, তাই না? ”
মিথি একবার রুমে দাঁড়িয়ে থাকা বাকি দুইজন মেয়ের দিকে তাকাল। ওরা কথাগুলো শুনে ঠিক কি ধারণা পোষণ করছে তার সম্পর্কে? এতোটা নোংরা ভাবে তাকে উপস্থাপন না করলে হতো না? মিথি ছোটশ্বাস ফেলে। অতঃপর বলল,
“ ভাবী এবং চাচী। আপনাদের জেনে রাখা উচিত যে আমি হিমেল ভাই এর দিকে হাত বাড়াইনি। কখনোই না। আমি এই কথাটা কতবার বললে আপনারা বিশ্বাস করবেন না জানি না।”
মুহিবের আম্মু আবারও বলল,
“ না বাড়ালে প্রশ্রয় দিচ্ছিস কেন ওকে?”
“ প্রশ্রয়? ”

“ ও যখন বলল তোরা বিয়ে করেছিস গোপণে তখন তো হা না কিছু বলিসনি। নিশ্চয় এটা প্রশ্রয় দেওয়াই বলে তাই না? দেখ মিথি, তোকে আমরা পছন্দ করি। সত্যিই পছন্দ করি। একজন মানুষ হিসেবে, একজন মেয়ে হিসেবে। কিন্তু হিমেলের বউ হিসেবে মেনে নিতে পারছি না। অনেকবার ভেবেও পারছি না। হিমেল সাবিহাকে বিয়ে না করে অন্য যেকোন মেয়েকে বিয়ে করলেও আমরা মেনে নিব । কিন্তু তোর মতো বাচ্চাসহ ডিভোর্সী মেয়েকে মানতে পারছি না। কোনভাবেই না। তোর ভালো চাই বলেই আমরা তোর জন্য সম্বন্ধ দেখেছিলাম। চেয়েছিলাম তোর সুন্দর একটা সংসার হোক। কিন্তু হিমেলের জীবন থেকে চলে যা। দেখবি তোর এর চাইতেও ভালো ঘরে সংসার হবে মিথি। ”
মিথি শুনল। এতগুলা কথা শুনার পর তার নিজের উপর শুধুই ঘিনঘিন করা একটা অনুভূতি জাগল। সে কি এতোটাই ঠুনকো? হিমেল ভাই কেন তাকে এভাবে বাজে ভাবে আঙ্গুল তোলার সাহস করে দিল? কেন? মিথি বলেছে ও নতুন করে সংসার করতে চায়? একবারও বলেছে? তবুও এই মানুষগুলো কি বুঝাতে চাইছে? সে স্বস্তা? সংসার করার জন্য পাগল হয়ে বসে আছে? মিথি শুধাল,

“ চাচী, আমি উনার জীবনে কখনো ডুকিইনি যে বোর হবো। ছোটবেলা থেকে দেখেছেন আমায়। নিশ্চয় জানেন আমাকে? উনার প্রতি আমার এইটুকুও আগ্রহ নেই । আমি যেভাবে আছি এভাবেই থাকার প্ল্যান আমার। আমার মেয়ে নিয়ে আমি সুখে আছি,সেই আমার সব। ”
মিথি ফিজার মাধ্যমে আয়মানের সাথে যোগাযোগ করল। হিমেলের ফোন নম্বর ও নিয়েছিল। লাভ হয়নি। তাই আয়মানের মাধ্যমেই যোগাযোগ করতে বাধ্য হলো। অতঃপর যখন যোগাযোগের সুযোগ হলো তখন মিথি প্রথমে বলল
“ সমস্যা কি হিমেল ভাই? কি চাইছেন আপনি? আমার জীবনটা নষ্ট করতে উঠেপরে লেগেছেন কেন হিমেল ভাই?”
হিমেল মন এমনিতেই তিক্ত ছিল। মিথির প্রথমেই এমন কথা শুনে মেজাজটক আরেকটু খারাপ হলো। গম্ভীর শীতল স্বরে জানাল,

“ এমন কেন মনে হলো তোর?”
মিথি আবারও রাগ নিয়ে শুধাল,
“বাসা ছেড়ে চলে গিয়েছেন কেন? ”
“ মন চেয়েছে।”
“মন চেয়েছে কেন? আমার জন্য?নাকি আমি বলেছি আপনাকে বাসা ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য?কোনটা? ”
“ কোনটাই নয়। তুই ততোটাও গুরুত্বপূর্ণ নোস আমার জীবনে। ”
মিথি ফের বলল,
“ গুরুত্বপূর্ণ না হলেও কারণটাতে আমি জড়িত। একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ হয়ে ছেলেমানুষি করে বাসা ছেড়ে চলে যাওয়া কেমন যৌক্তিক কাজ? তাও আবার একটা ডিভোর্সি মেয়ের জন্য।”
হিমেলের মেজাজটা আরেকটু খারাপের পর্যায়ে গেল।চোখ মুখ শক্ত হয়ে এল। এই ডিভোর্সী সম্বোধনটা শুনলেই বিরক্ত লাগছে। পরিবারে এটা শুনতে শুনতে সে তিক্ত বিরক্ত। মিথিও যে এটা একপ্রকার খোঁচা দিয়েই বলল বুঝতে অসুবিধা হলো না। হিমেল উত্তর করল না। শুধু শুনল। এরপর অনেকটা সময় চুপ থাকতেই মিথি আবার ও শুধাল,
“ একটা ডিভোর্সী মেয়েকে স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়া,তার মেয়েকে আপনার মেয়ে হিসেবে পরিচয় দিয়ে তাকে বিতর্কের মুখে ঠেলে দেওয়া ঠিক কতটুকু যৌক্তিক ছিল হিমেল ভাই? কেন বলেছিলেন এই মিথ্যেটা? ”
হিমেল মুখচোখ শক্ত করে তাকানো তখনো। বলল,

“ তোকে বলতে বাধ্য নই। ”
“ বাধ্য। কারণ পরিচয়টা আপনি আমাকে নিয়েই দিয়েছেন। এতে আমিও সম্পৃক্ত।”
হিমেল হাসল এবারে মৃদু। চমৎকার হাসিটা ঠোঁটের কোণে রেখে উত্তর করল,
“ সবসময় সত্য বলেই বা কি সুখ পাওয়া যায়? কিছু কিছু মিথ্যে দিয়েই নাহয় আমরা মিথ্যে সুখ পাই জীবনে। ক্ষতি কি? ”
মিথি বুঝল না যেন। বলল,
“ মানে? ”
“ মানেটা তুই বুঝিস মিথি। তবুও না বুঝলে, বুঝার দরকার নেই। ”
মিথি আসলেই কি বুঝেনি? আসলেই কি বুঝছে না? শুধাল,

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৩৭

“ আমাকে বাঁচতে দিন হিমেল ভাই। একটু সুখ, একটু শান্তিতে থাকতে দিন হিমেল ভাই৷ আমি এই সমাজ, এই সমাজের তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে বারবার চাই না। দয়া করে আমায় নিজের মতো বাঁচতে দিন হিমেল ভাই।নিজের জীবন সাজিয়ে নিন সুন্দরভাবে। সাবিহা আপুকে অথবা ভালো দেখে একটা মেয়ে দেখে বিয়ে করে নিন। আমি সবসময় দোয়া করব আপনাদের জন্য। আমাকেও একটু শান্তিতে থাকতে দিন আপনারা।”
হিমেল এবারেও হাসল। তাচ্ছিল্যের হাসিটা ঠোঁটের কোণে রেখে বলল,
“ অন্য একজনের শান্তি নষ্ট করে নিজে শান্তিতে থাকতে চাইছিস মিথি। খুবই সেলফিশ তুই। ”

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৩৯