Home বুনো মেঘের হাতছানি বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৮

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৮

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৮
ইসরাত জাহান দ্যুতি

আজকের পর্বের মতো সামনের কিছু কিছু পর্ব একটু খোলামেলা কথোপকথন ও পরিস্থিতি দেখানো হবে। অবশ্যই শালীনতা বজায় রেখে দেখানোর চেষ্টা করা হবে৷ সতর্কতা হিসেবে হেডনোট দিলাম৷
এদিকে মারিশাকে দেখাল কিংকর্তব্যবিমূঢ়! অপ্রত্যাশিত ঘটনাটাই হতবাক সে। তারপরই এক ধমকে বলে উঠল‚ “অ্যাই স্টুপিড! ছাড়ো আমাকে!”
ধমকটা দিয়ে সে নিজেই হাতটা ছাড়িয়ে নিল। বিস্ময় ভুলে কেমন গাঢ় চাউনিতে আশফি দেখছে ওকে! স্থির চাউনিতে তার পলক পড়ছে না দেখে চাদরটা টেনেটুনে গায়ে জড়িয়ে নিতে নিতে মারিশা আরেকটা ধমক লাগাল‚ “আশ্চর্য! চোখ সরাও‚ ফাজিল! তাকিয়ে দেখার কী আছে?”

“কিছু নেই?”
“থাকলেই বা দেখতে হবে কেন? আমি কি তোমাকে দেখাতে চেয়েছি?”
“নাটক এবার বন্ধ করো”‚ গাম্ভির্যের সুরে কথাটা বলে সরে এল সে মারিশার থেকে। তখনই পায়ের কাছে বাঁধল ককটেলের বোতলটা৷ মারিশার দিকে চাইলো তারপর বিরক্তির সঙ্গে‚ “তুমি কী করে তোমার বাবার বিজনেস সামলাতে‚ হ্যাঁ? আমার তো সন্দেহ হচ্ছে! এখনো যার ভেতর ছেলেমানুষি‚ পাগলামি‚ সে সিরিয়াসলিই বিজনেস সামলাতে জানে?”
মারিশা তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল‚ “সব কিছু তুমিই জানো শুধু!”
“আমি কী জানি আর না জানি‚ সেটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ না। তুমি নিজে কী করছ আমাকে পেতে‚ একবার সেটা ভাবো!”
বিরক্ত ক্রমশ বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কী একটা চিন্তাও হতে লাগল আশফির। আর চিন্তা বা প্রচণ্ড রাগ হলেই সে স্বভাবজাত অস্থিরভাবে হাঁটাহাঁটি করে। সে সময় কথা বললে হাত নানান ভঙ্গিমায় নেড়েনেড়ে কথা বলতে থাকে। এখনো তাই-ই দেখা গেল।

অস্থিরতায় দুয়েক পা হাঁটতে থাকল আর হাত নেড়েনেড়ে বলতে লাগল‚ “আমার সামনে নিজেকে অ্যালকোহোলিক দেখাচ্ছ… ড্রাঙ্ক হও না বলেও ড্রাঙ্কেননেসের মতো আচরণ করছ বারবার‚ আর সিডিউস করার চেষ্টা করতে করতে তো একদম বদ্ধ উন্মাদের মতো কাজ করে বসে আছ। এসব কী‚ মাহি? এসব কখনো তোমার মতো গর্জিয়াস‚ পশ‚ এলিট পর্যায়ের মেয়ের সঙ্গে যায়? টিনএজ মেয়েগুলোর মতো পাগলামি শুরু করেছ। আমি কি এখন সেই পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের প্রথম প্রেমে পড়া যুবকটা আছি‚ যে তোমার এমন আজব কাণ্ড কারখানায় তখনের মতো মজা পাবো… ইমপ্রেস হব… তারপর একইভাবে প্রেমে পড়ে যাব? বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ভাবনাচিন্তা‚ পছন্দে-অপছন্দে‚ নানান সিদ্ধান্তে পরিপক্বতা আসে। তোমার না এলেও আমার তা এসেছে। আমি এখন ইমপ্রেস হওয়া তো দূর‚ রীতিমতো টেনশনে পড়ে গেছি‚ কী করে তোমাকে সামলে নিয়ে তোমার ভাইয়ের কাছে পৌঁছাব! না পারব তোমাকে ফেলে চলে যেতে‚ আর না পারব তোমার এই পাগলামি টলারেট করতে। প্লিজ‚ ফর ওয়ান্স‚ অ্যাক্ট উইদ সাম ম্যাচিউরিটি! তোমার কিছুই এখন আর ভালো লাগছে না আমার৷ তাই আমাকে অ্যাট্রাক্ট করার জন্য এসব বোকামি কাজকর্ম বন্ধ করো এবার। বরং তুমি আমাকে সব থেকে বেশি খুশি করতে পারো এখান থেকে চলে গিয়ে। তাহলে আমি কোনো চাপ ছাড়া নিশ্চিন্তে ট্যুরটা শেষ করতে পারব৷ আমি এখানে এসেছি মাইন্ড রিফ্রেশ করতে‚ এক্সট্রা স্ট্রেস নিতে না।”

আজও খালি পেটে মদ পড়ায় নেশাটা সত্যিই একটু চড়েছে মারিশার। পেছনের চারটা বছরে যা কিছুর সম্মুখীন হয়েছিল সে‚ সেসব ভাবতে ভাবতেই একাকিত্ববোধ আর রাগ-দুঃখের সংমিশ্রণে নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে ছিল বিছানায়। মাথাতেও ছিল না তোয়ালেটা বদলে পোশাক পরতে হবে। ঘুম পাচ্ছিল বলে ওভাবেই চাদরের নিচে ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা চালাচ্ছিল৷ এর মাঝে কখন তোয়ালে খুলে গেছে‚ তা তো সে নিজেও টের পায়নি। তারপরই হঠাৎ আশফির কণ্ঠ এল। বিষণ্ণ থাকা মনটা ওর কেমন ফুরফুরে হয়ে উঠল নিমিষেই‚ অকারণ হাসিও পেতে লাগল—আশফির ডাকাডাকিতে একটু দুষ্টুমিও পেয়ে বসল।

তবে এসব কয়েক মুহূর্ত আগের কথা৷ আশফির শক্ত‚ ধারাল কথাগুলোতে হালকা নেশাটা ইতোমধ্যে কেটে গেছে মারিশার। অপরাধ সে করেছে‚ এ কথা সে কোনোদিনও অস্বীকার করতে পারবে না। কিন্তু অতীতে আশফির সঙ্গে অপরাধটা না করলেও বাবার সঙ্গে করতে হত… যে-কোনো একজনকে কষ্টটা দিতেই হত ওকে! পরিস্থিতিই তো সেভাবে তৈরি হয়েছিল৷ মাত্র বিশ বছর বয়সে ওকে সেদিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল ত্রিশ বছরের নারী রূপে। কিন্তু তা কি আর বুঝতে চাইবে আশফি? হয়তো তার জায়গাতে বাবা থাকলে আজ বাবাও ওকে বুঝতেন না। সবাই-ই নিজেদের অভিমান আর কষ্টটাই বড়ো করে দেখত। ওর কষ্ট বোঝার দায় কারও নেই৷ সত্যিই কারও নেই। থাকলে সেদিন ওর বদলে ওর ভাই-ই যেত বাবার ডাককে অবহেলা না করে। আজকে ওর এই এলোমেলো জীবনের জন্য ওর ভাইটাই কি কম দায়ী? কিন্তু আজ সবাই-ই ভালো আছে‚ নিজ নিজ জীবনে এগিয়ে গেছে সবাই। আশফিও সত্যিই সুখী আজ। কিন্তু মাঝখান থেকে সব কিছু হারিয়েছে সে‚ কেবল বাবার ছেলের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে… বাবার ভালোবাসার মূল্য চুকাতে গিয়ে।

দিনের পর দিন ভেতরে জমে থাকা কষ্টটা অটল অভিমানে পরিণত হলো ওর মুহূর্তেই৷ না‚ শুধু আশফির প্রতিই নয়। বাবা‚ ভাই‚ সকলের ওপরই কঠিন অভিমান হলো ওর। কেবল মায়ের জন্যই মনটা কোমল রইল। কারণ‚ সে যে ওর চেয়েও বড়ো ভুক্তভোগী‚ সারা জীবন সুখ হারানো নারী।
বেপরোয়া রাগটার সঙ্গে হঠাৎ জেদটাও মাথা চাড়া দিয়ে উঠল মারিশার—আজকের পর আর কখনোই সে দাঁড়াবে না আশফির সামনে‚ ফিরবেও না ইস্তাম্বুল। এই ছোট্ট জীবনে যদি কারও কাছে কোনোদিন ফিরতেই হয় ওকে‚ ফিরবে শুধু মায়ের কাছে।
চোখদুটো ভিজে উঠলেও অশ্রুটুকু বিসর্জন হতে দিল না আর। ভারী স্বরে‚ কর্কশভাবে তির্যক অপমান করে বসল আশফিকে‚ “বেরিয়ে যাও!”
কিন্তু অপমানটা গায়ে লাগল না আশফির। অধিকন্তু বিদ্রূপ সুরে বলল‚ “এতক্ষণে তোমার সেল্ফ রেসপেক্ট সজাগ হলো!”
“আই’ম ডান টকিং”‚ চেঁচিয়ে উঠল মারিশা‚ “আউট অফ মাই রুম‚ নাউ।”
খুব রূঢ়তা ছিল এবারে। তবে আশফি রাগল না মোটেও। কারণ সে জানে‚ ঠিক এমন প্রতিক্রিয়া আসার মতোই কথাগুলো বলেছে। চুপচাপ ফিরে গেল সে বারান্দা হয়েই৷ যাওয়ার আগে অবশ্য মনে করে ককটেলটা নিয়ে যেতে ভুলল না।

সেসব দেখেও কিছু বলল না মারিশা। উঁচু করে রাখা দু হাঁটুর ওপর মাথাটা কাত করে রাখল নিঃশব্দে। প্রলম্বিত শ্বাসটা ফেলে অনেকক্ষণ পর হঠাৎ বিড়বিড় করে বলল‚ “ভালো থাকার অধিকার সবারই আছে। তুমি তোমার জায়গাতে সঠিক‚ আশফি। তোমার জায়গাতে আমি হলে তো কোনোদিনও তোমার মুখ দেখতাম না৷ তোমার মুখে শুনেই সহ্য করতে পারিনি‚ আমার বদলে তুমি আরও বহু নারীকে ডেট করেছ! সেখানে তোমার পরিচয়ের বদলে আমি অন্য পুরুষের পরিচয় বহন করেছি দীর্ঘ তিনটা বছর। সব কিছু ভোলা সম্ভব হলেও এই সত্য ভোলা কঠিন। আমিই ভুলতে পারি না। কিন্তু আমি ভুক্তভোগী‚ এও মিথ্যা না। অবশ্য এখানে তোমার কোনো দায় নেই যে‚ সব কিছু মেনে নিয়ে আমাকেই তোমার অ্যাক্সেপ্ট করতে হবে। যেখানে তুমি আমার চেয়েও বেটার অপশন পাচ্ছ।”

সময়টা ভোর চারটার আশেপাশে। ভোরের আলো তখনো ফোটেনি। রূপাকোট রিসোর্টের শান্ত আঙিনা ছেড়ে কাঁধে ব্যাগপ্যাক নিয়ে মারিশা সাবধানে নিচের দিকে নামতে শুরু করল। নামতে নামতে অনুভব করল রাতের জমে থাকা শিশির মাড়িয়ে যতই এগোচ্ছে‚ ততই অদ্ভুত ঠান্ডা আর ভেজা এক অজানা গন্ধ পাচ্ছে চারপাশে। বোধ হয় শিশির ভেজা রাতের শেষ প্রহরের ঘ্রাণ! পথটি কোনো সরলরেখা নয়। বরং পাহাড়ের ঢাল বেয়ে একটি নিদ্রিত সাপের মতো এঁকেবেঁকে নেমে গেছে নিচের দিকে। পথের প্রথম দিকটায় ঘন গাছপালা আর ঝোপঝাড় দেখা গেল শুধু। কারণ এটা এখনো পাহাড়ের উপরের অংশের প্রাকৃতিক পরিবেশ। গাছের ফাঁক দিয়ে নিচে উপত্যকার দৃশ্য অস্পষ্টভাবে মারিশার চোখে পড়ল। বাতাসটাও অনুভব করল বেশ শীতল আর আর্দ্র। ​চারপাশ খুব নিস্তব্ধ। শুধু ওর পায়ের নিচে শুকনো পাতার মচমচ শব্দ আর দূরে কোনো এক ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছিল। ভোরের কুয়াশা উপত্যকার গভীরে এক পাতলা সাদা চাদরের মতো ছড়িয়ে আছে। যার ওপর দিয়ে কেবল পাহাড়ের চূড়াগুলো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে নিঃশেষ অপেক্ষায়। মারিশা ধীরে ধীরে নিচে নামতে লাগল‚ আর প্রতিটি বাঁকে কুয়াশার সেই চাদর সরে গিয়ে নিচের পৃথিবী স্পষ্ট হতে থাকল।

যখন ওর চোখে প্রথম রূপা ও বেগনাস লেকের জল পড়ল‚ তখন মনে হলো যেন উপত্যকার গভীরে দুটি বিশাল কালো আয়না স্থির হয়ে আছে। কুয়াশার আড়ালে তাদের রূপ তখনো অস্পষ্ট। কিন্তু সেই নীরব জলরাশিই যেন ভোরের প্রথম আলোর জন্য অপেক্ষা করছে। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামার সময় হ্রদগুলো ধীরে ধীরে বড়ো হতে থাকে‚ আর তাদের চারপাশের ধাপে ধাপে দেখতে পাওয়া যায় সাজানো সবুজ ফসলের ক্ষেত। যতই নিচে নামতে থাকে মারিশা‚ ততই দৃশ্যপট বদলাতে থাকে। পথের দু’পাশের ঝোপঝাড় কমে আসে আর ফসলের ক্ষেত ও লোকালয় দেখা যেতে থাকে। কুয়াশার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে পথের পাশে ছোটো ছোটো মাটির বা পাথরের তৈরি বাড়ি।
ভোরবেলার নীরবতা ভেঙে হঠাৎ জেগে উঠল পাখির কিচিরমিচির‚ দূর থেকে ভেসে আসতে লাগল কুকুরের ডাক‚ কোনো এক বাড়িতে জেগে ওঠা মোরগের ক্ষীণ কণ্ঠস্বর আর তারপর বাতাসে ভেসে আসলো মানুষের প্রথম ব্যস্ততার শব্দ। মারিশা বুঝল‚ এই পথটি ওকে শুধু একটি জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে না‚ এটি তাকে পাহাড়ের নির্জনতা থেকে উপত্যকার গ্রামীণ জীবনের প্রাণবন্ততায় পৌঁছে দিচ্ছে।

মারিশা ছেড়ে যাওয়ার পর নির্ঘুম রাতগুলোতে যে ছটফটানি নিয়ে সারাটা রাত জেগে থাকত‚ আজ বহু দিন পর সেই ছটফটানি অনুভব করল আশফি। মনটাকে তো কবেই শিকলে বেঁধে নিয়েছিল! কিন্তু কখনো ভাবেনি‚ এত বছর পর ছেড়ে যাওয়া মানুষটা সামনে এসে দাঁড়ালে সেই মনটা বাঁধনহারা হতে ছটফটাবে।
তার মতো কাঠখোট্টা‚ দুঃসাহসিক অভিযাত্রী পুরুষ ভাইয়ের আদরের‚ বাবার আদরের আহ্লাদী স্বভাবের পুতুল পুতুল মেয়েটাকে কখনো ভালোবেসে ফেলবে সহজেই‚ আর ভালোবেসে সেও আহ্লাদেই মুড়িয়ে রাখবে‚ কোনোদিন তো সেটাও ভাবেনি। সেই আহ্লাদ দেওয়া মানুষটাকে কটা দিন ধরে কত কঠিন কঠিন কথা শুনিয়ে যাচ্ছে সে! সব থেকে বেশি আঘাতটা বোধ হয় আজকের কথাতেই ছিল। ওর পাওয়া আঘাতের কাছে এ অবশ্য সামান্যই৷ কিন্তু তবুও এক দণ্ড শান্তি পেল না আশফি৷ যাকে নিজের বর্তমান থেকে মুছেই ফেলেছে‚ যাকে নিজের অধিকার‚ অভিমান‚ ক্ষোভ‚ সব কিছু থেকে মুক্ত করে দিয়েছে—তার প্রতি রাগ প্রকাশ করা‚ কঠোর হওয়া মানে তো তাকে গুরুত্ব দেওয়া… তাকে বোঝানো যে‚ এখনো সে ওর জীবনে প্রভাব ফেলে৷ কিন্তু এমনটা তো নয়৷ মারিশাকে ওর সকল প্রশ্ন‚ ওকে কষ্ট দেওয়ার সকল অপরাধ থেকে মুক্ত করে দিয়েছে বহু আগেই৷ তাহলে কেন মেয়েটাকে এমন আঘাত করবে তিক্ত কথার বাণে?

বিছানার কোণে বসে সিগারেটের ধোঁয়াতে ডু্বে এসবই ভাবতে ভাবতে সময় কাটাচ্ছিল আশফি৷ লম্বা পথ যাত্রা শেষে শরীরটার বিশ্রামের দরকার ছিল। ঘুম না হওয়ায় মাথাটা বেশ ব্যথাও হচ্ছে‚ কেমন ভার ভারও লাগছে। সিগারেটটা শেষ করে উঠে পড়ল হঠাৎ। বাইরে থেকে একটু হাঁটাহাঁটি করে এসে তারপর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেবে। নয়তো এখন শোয়ার পর মস্তিষ্কে মারিশাই ঘুরপাক খেতে থাকবে৷ ফোনটা পকেটে ঢোকানোর সময় সময়টা দেখল—রাত সাড়ে চারটারও বেশি। মারিশা না থাকলে আর একটা ঘণ্টা পরই ওদের বেরিয়ে পড়ার কথা ছিল আজ। কিন্তু মারিশাকে ইস্তাম্বুলের ফ্লাইটে না বসিয়ে দেওয়া অবধি কোথাও যে এক পা-ও সরতে পারবে না সে।
বেরিয়ে পড়ল ঘর থেকে। নিচে নামার পূর্বে হঠাৎ এক পলের জন্য মারিশার ঘরের সামনে পা’টা থামল ওর। কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলে নেমে এল তারপর লবিতে। জেগে থাকা রিসেপশনিস্টের চোখে চোখ পড়তেই তাকে সৌজন্যপূর্ণ মুচকি হাসি দিল সে। ওকে চিনতে পারার পর থেকে এখানে বেশ আলাদারকম সুবিধা আর যত্ন দিচ্ছে সবাই-ই। কিন্তু রিসেপশনিস্টের চোখে হঠাৎ কেমন কৌতূহল খেয়াল করল ও। কিছু বলবে না-কি লোকটা? হাঁটা থামিয়ে জিজ্ঞেস করেই বসল তাকে‚ “হ্যালো… অ্যানিথিং টু সে?”

লোকটা বিব্রত হেসে মাথা নাড়ল‚ “নো স্যার‚ আমি ভেবেছিলাম আপনিও চেক আউট করতে এলেন বোধ হয়।”
“আমিও…” প্রশ্ন চোখে চাইলো আশফি‚ “আর কার কথা বলছেন?”
রিসেপশনিস্ট নামটা মনে করতে পারল না বলে চট করে কম্পিউটার স্ক্রিন থেকে নামটা দেখেই বিনয়ী হেসে জানাল‚ “আপনার ফ্রেন্ড‚ মারিশা বারিশ সুলতানের কথা বলছি।”
যতটা সহজ করে হেসে জানাল রিসেপশনিস্ট‚ ঠিক ততটা সহজে হজম করতে পারল না আশফি। চোখ-মুখ নির্বিকার থাকলেও বুকটার ভেতর ধক করে উঠল ওর। উত্তেজিত পায়ে ডেস্কের কাছে এগিয়ে এল।
“কখন চেক আউট করেছে?” চঞ্চল গলায় জিজ্ঞেস করল রিসেপশনিস্টকে।

হাসিটা সরে রিসেপশনিস্ট একটু থমকাল আশফির প্রতিক্রিয়াতে‚ “প্রায় চল্লিশ মিনিটের মতো হয়ে গেছে‚ স্যার।”
মাথা খারাপ হওয়ার যোগাড় আশফির৷ ভোর হতে এখনো কত দেরি! মেয়েটা কী করে এমন সময়ে বের হতে পারল? আর বেরিয়ে যাবেই বা কোথায়? ফিরতি ফ্লাইট ধরার হলে তো এখন বের হওয়ার কথা নয়৷
দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়লেও খুব দ্রুত নিজেকে শান্ত করে নিল আশফি। নয়তো ভাবনাচিন্তাটা ঠিকভাবে করতে পারবে না৷ ঝড়ের গতিতে দোতলায় উঠে গিয়ে পরাগদের দরজায় জোরে জোরে চপেটাঘাত করে ওদের ডাকল। ডেকেই দৌড়ে গেল নিজের ঘরে৷ পরনের পোশাকও বদলাল না৷ ঝটপট নিজের প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস ছোটো একটা ব্যাগে ভরে আবার বেরিয়ে এল ঘর থেকে৷ তখনই বড়ো হাঁ করে হাই তুলতে তুলতে ঘুম জড়ানো চোখে দরজাটা খোলে হৃদয়। আশফি ওকে দেখেই তড়িঘড়ি করে জানাল‚ “আমি বের হচ্ছি একটু৷ ওরা উঠলে জানিয়ে দিস।”

“অ্যাঁহ…”‚ একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেল হৃদয়‚ “বের হচ্ছিস? আমাদের ছাড়াই? বাজে কত?”
“গাধার বাচ্চা”‚ মস্ত এক ধমক বসাল আশফি‚ “পরাগকে ডাক!”
ঘুমে কাতর হৃদয় যে বিছানায় শোবার পর সব ভুলে যাবে‚ তা খেয়াল হতে নিজেই ঘরে ঢুকে চেঁচিয়ে ডাকল সে পরাগকে। ঘুমের মধ্যে এমন চেঁচামেচিতে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো পরাগসহ দিব্য আর সৌভিকও। তাই তিনজনকেই দ্রুত বলল সে‚ “মাহি বেরিয়ে গেছে… ওকে খুঁজতে বের হচ্ছি আমি।”
“মাহি…!” অদ্ভুত কিছু শোনার ভঙ্গিতে নামটা বলে উঠল সমস্বরে পরাগ আর হৃদয়।
আশফি মোটেও ওদের কৌতূহল মেটানোর জন্য অপেক্ষা করল না। ফোনে দিশানের নাম্বারটা বের করে তাকে কল করতে করতে বেরিয়ে যেতে লাগল৷ তখনই পরাগ ডেকে উঠল পেছন থেকে‚ “ওই‚ দাঁড়া!
বিছানা ছেড়ে জলদি উঠে এসেই আশফির পথ আগলে দাঁড়াল সে‚ “মারিশার কথা বলছিস? ও বেরিয়ে গেছে? কোথায়?”

“আমাকে দেখে তোদের মনে হচ্ছে‚ তোদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো অবস্থাতে আছি আমি?” প্রচণ্ড বিরক্তিতে চেঁচিয়েই উঠল আশফি। ওদিকে দিশানও কল তুলছে না! দিশানের মাধ্যমে মারিশাকে আটকানোর একটা চেষ্টা করতে চেয়েছিল সে।
পরাগ আশফির অস্থিরতা বুঝতে পারলেও সেও ধমক লাগাল‚ “মারিশা বের হয়েছে মানে কী‚ সেটা তো বোঝার মতো কিছু বলবি? যদি সিরিয়াস ম্যাটার হয়‚ তাহলে সবাই-ই বের হব আমরা।”
“আর আমি এটাও জানতে চাই এখনই‚ মারিশা তোর হয় কে?” বিরক্তস্বরে দিব্য বলে উঠল‚ “তোদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে‚ সেটা সবাই-ই বুঝছি। তাহলে এই ঘোড়ার ডিম চেপে রাখার মানে কী‚ এটাই বুঝছি না! জিজ্ঞেস করলেই বারবার ইগনোর করছিস‚ মেয়েটার সঙ্গে রুডও হচ্ছিস‚ পজেসিভও হচ্ছিস তাকে নিয়ে। আবার এখন তার চিন্তাতে মরেও যাচ্ছিস।”

দিব্যর কথা শেষ হতেই পরাগ জিজ্ঞেস করল‚ “ও কি তোর সে-ই…?”
এমন সময়ে এদের এত জেরা দেখে আশফির ইচ্ছা করল সব কটাকে ঘরে বন্দি করে রেখে বেরিয়ে পড়তে। কেউ-ই ওর অবস্থাটা বুঝতে পারছে না। উপরন্তু মারিশার ওপর রাগ চড়ে ওঠায় রেগেমেগে উত্তর দিল‚ “ও আমার কোনো সে-টে না। আমার ফুপুর স্টেপ ডটার ও। তাই সম্পর্ক একটাই‚ আমার কাজিনের বোন ও। আর একটা কোনো প্রশ্ন করবি না এরপর। তোদের কারও লাগবে না আমার৷ একাই খুঁজে নিতে পারব আমি।”
কাউকে কোনো উত্তর দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে‚ কারও কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখে গটগটিয়ে হেঁটে নেমে এল সে লবিতে৷ তখনই খেয়াল হলো‚ মারিশার ফোন নম্বরটাই তো নেই ওর কাছে৷ পরাগদের কারও কাছেও নেই৷ দ্রুত রিসেপশনিস্টের কাছ থেকে মারিশার নম্বরটা চেয়ে নিল৷ তাকে ফোন করতে করতে দৌড়ে রিসোর্ট থেকে বেরিয়ে পড়ল৷ তবে বের হওয়ার মুহূর্তে সিকিউরিটি গার্ডদের কাছে জিজ্ঞেস করল মারিশার কথা৷ তারা জানাল‚ কোনো ট্যাক্সি আসেনি ওই সময়ে৷ হেঁটেই যেতে দেখা গেছে তাকে।

আঁকাবাঁকা পথ ধরে এগোতে লাগল আশফি দ্রুত পা চালিয়ে। কল ধরছে না মারিশা৷ ও-ও থামল না৷ লাগাতার কল করতে করতেই এগোতে লাগল। কিন্তু কোথায় খুঁজবে মেয়েটাকে? ট্যাক্সি যেহেতু নেয়নি‚ তার মানে কি গ্রাম থেকে বের হয়নি? না-কি সামনে গিয়ে ট্যাক্সি নিয়েছে? এমন অসময়ে অনলাইনে ট্যাক্সি বুকিং দিলেও আসতে তো সময় লাগার কথা। প্রায় একটা ঘণ্টার মতো হলো বেরিয়েছে সে। এতক্ষণে যদিও পৌঁছে যাওয়ার কথা ট্যাক্সি৷ কিন্তু আশফির মন বলছে‚ ট্যাক্সি ধরেনি মেয়েটা। আর অধিকাংশ সময়ই মারিশাকে নিয়ে ভাবা ওর মনের কথা ঠিক প্রমাণিতই হয়।

ভোরের আলো এখনো ঘন হয়ে নামেনি। হিমালয়ের কোলে রূপাকোট গ্রামের ঘুম ভাঙছে ধীরে ধীরে। আশফি দৌড়াতে দৌড়াতে লোকালয়ের কাছাকাছি এসেই থামল—রাস্তার ধারে৷ ভোর পাঁচটা বেজে দশ মিনিট। কোথায় যাবে‚ কোনদিকে খুঁজবে‚ দিব্যদের ডাকবে কিনা‚ এসবই ভাবতে ভাবতে ফোনটা কানে ধরে মারিশাকে বিরতিহীন কল করতে থাকল৷ একটা মেসেজও পাঠিয়েছে এর মাঝে। আশা করছে মেসেজটা দেখে রেগে গিয়ে কটা কথা শোনানোর আশায় হলেও কলটা ধরবে মারিশা!
তারপর মাত্র তিন মিনিট অপেক্ষা করতে হলো আশফিকে৷ ফোনের ওপাশ থেকে রিসিভ হতেই চেঁচিয়ে উঠে বৃটিশদের অশ্লীল গালিতে অশ্রাব্য গালাগাল করতে লাগল মারিশা‚ “ইউ ব্লাডি আর্সহোল! ইউজলেস টোয়াট! হাউ ডেয়ার ইউ স্নিয়ার অ্যাট মাই চেস্ট! কজন মেয়ের ক্লিভেজে ঘুমিয়ে এসে তুলনা করছ আমার সঙ্গে? নিজেকে খুব পারসোনালিটি ফিলড ভাবো‚ না? বাট ইউ আর অ্যাক্টিং জাস্ট লাইক এভরি ব্লাডি এক্স।”
গালিগুলো শুনেও খুব ধীরে স্বস্তির প্রশ্বাসটা ছাড়ল আশফি। তারপর দুষ্টু হেসে যোগ দিল মারিশার আপত্তিজনক কথোপকথনে। একটু ফিসফিসানির মতো বলল‚ “ইয়েস‚ মাই ব্লাডি এক্স। আমি সত্যি বলতে দ্বিধা করি না। ইয়োর বুজম লুকস কিউট টু মি‚ বাট ইট ডাজেন্ট মেক মি ফিল অ্যাট্রাক্টেড।”

“শাট ইয়োর গব‚ আশফি! আমি তোমার মুখ ভেঙে দেব নয়তো। এসব শোনানোর জন্য ফোন করেছ তুমি? ইউ ফিলদি ক্যাড! শেইম অন ইউ!”
মারিশার চেঁচামেচির মাঝেই মোরগের ডাক ভেসে এল ফোনের ভেতর। আশফি চুপ থেকে খুব সতর্কভাবে কান পেতে শুনতে চেষ্টা করল আশপাশের আওয়াজগুলো। পাখির কিচিরমিচিরও হালকা শুনতে পেল। বুঝে ফেলল তারপরই‚ গ্রামের পথে ঢুকেছে মারিশা। আর গ্রামের পথে ঢোকার উদ্দেশ্য কী হতে পারে? কেবল বেগনাসকোট পাহাড়? ভাবতে ভাবতেই একটু থমকাল আশফি। তারপরই চোখদুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল ওর। এই এলাকার একটি জনপ্রিয় হাইকিং রুট হলো বেগনাসকোট পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার পথ। এটা রূপাকোটের কাছাকাছি আর এই পথটা পর্যটকদের জন্য খুবই সহজগম্য। বেগনাসকোট পাহাড়ে যাওয়ার জন্য গ্রামের মাঝ দিয়ে যাওয়া হাঁটার পথটিই ব্যবহার করতে হয়। আর ​এই পথটা কোনো যানবাহন চলাচলের রাস্তা নয়‚ বরং এটা একটা ট্রেকিং রুট। যা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উপরে উঠেছে। এবং পথটা সরাসরি ফসলের ক্ষেত‚ ছোটো ছোটো গ্রাম আর বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে নিয়ে যায়।

আশফির আর দাঁড়িয়ে থাকার প্রয়োজন হলো না। ফোনটা কানে চেপে মারিশার যাত্রাপথেই এগোতে লাগল। আর ফোনটা যাতে না কাটে সে‚ এজন্য আর রাগানোর চেষ্টা করল না তাকে। বরং পুরনো দিনগুলোর মতো কণ্ঠে দুষ্টুমি মেশানো ফ্লার্টি কথা শুরু করল‚ “আমি তো ফোন করেছিলাম তোমার ঘরে আরেকবার আসার পারমিশন পাবো কিনা‚ সেটা জিজ্ঞেস করতে। তুমি তো আর জানো না‚ তোমাকে একেবারে বম্বশেল লাগছিল! তোমাকে দেখে আসার পর আমি কেমন এলোমেলো হয়ে আছি! চোখ বুজলেই শুধু তোমাকে দেখতে পাচ্ছি৷ না চাইতেও দুষ্টু দুষ্টু চিন্তা মনে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। এভাবে কি ঘুমানো যায়?”

ফোনের ওপাশে মারিশা চুপ করে রইল এক মুহূর্ত। তাকে না দেখেও আশফি কল্পনাতে দেখতে পেল‚ পাগল বৈজ্ঞানিকের মতো ভ্রুজোড়ার মাঝে ভাঁজ ফেলে সে ভাবছে‚ হঠাৎ করে কেন ফ্লার্টিং শুরু করল ও!
ব্যাপারটা ঘটেছেও তেমনই৷ ভ্রু কুঁচকে দাঁড়িয়ে পড়ে মারিশা গম্ভীর কণ্ঠ বলে উঠল‚ “আমার সঙ্গে একদম চিজি ফ্লার্ট করার চেষ্টা করবে না! আমি স্পষ্ট টের পাচ্ছি তুমি হাঁপাচ্ছ। মনে হচ্ছে দৌড়াদৌড়ি করছ।”

সত্যিই আশফি হাঁপাচ্ছে। মারিশাকে যাতে ধরতে পারে তাড়াতাড়ি‚ তাই কখনো দৌড়াচ্ছে‚ কখনো দ্রুত হাঁটছে। ওর বিশ্বাস‚ খুব বেশি দূর এগোতে পারেনি সে। কারণ‚ রুট তো আর চেনা নয় তার। এবং নিশ্চয়ই গুগল ম্যাপের সাহায্য নিয়ে নিজেকে বিশাল এক বুদ্ধিমতী ভাবছে ছিটিয়ালটা? কিন্তু প্রধান সড়ক ছাড়া গ্রামের ভেতরের পথগুলো অনেক সময় ম্যাপে সম্পূর্ণ তথ্য সংযোজন করা থাকে না। স্থানীয় কোনো গাইড বা স্থানীয় মানুষের সাহায্য নিতে হয়। নয়তো পথ হারানো বা অন্য কোনো অসুবিধা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে প্রবল। হাফ বৃটিশটা কি আর সেসব মাথায় নিয়ে বেরিয়েছে? বেরিয়েছে তো খ্যাপা রাগ আর জেদ নিয়ে।

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৭

“পুশআপ দিচ্ছি”‚ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল আশফি‚ “তোমাকে ছোঁয়ার পর থেকেই শরীর গরম হয়ে আছে৷ কিন্তু কাছে পাওয়ার সুযোগ তো আর নেই। তাই মন-মগজ ডাইভার্ট করতে এক্সারসাইজ করছি।”

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৯