ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ২১
ছায়া
আরিয়ান ধীরে ধীরে গ্রামের পথ ধরে হাঁটছে পায়ের নিচে ধুলো জমছে শরীর ক্লান্ত মুখে ঘাম জমে আছে। তার ভেতরটা ধীরে ধীরে রাগে টগবগ করছে মনে মনে একটাই কথা ঘুরছে,
আরিয়ানঃ- এই পাগল মেয়ে আমাকে কি বোকা বানাইলো।
রাস্তায় এক বৃদ্ধকে দেখে আরিয়ান থামলো বৃদ্ধ কে জিগ্যেস করলো
আরিয়ানঃ- চাচা তালুকদার বাড়ি কোন দিকে?
বৃদ্ধ চোখ সরু করে তাকিয়ে বলল,
“বাবা তুমি তো ভুলে রাস্তায় এসেছো তালুকদার বাড়ি এইদিকে না চার কিলোমিটার আগে একটা চারতলা পাকা বাড়ি দেখা যায় ওটাই তালুকদার বাড়ি।
আরিয়ানের মুখের ভাব মুহূর্তে পাল্টে গেলো চোখের কোণ শক্ত হলো ঠোঁটে হালকা এক বাঁকা হাসি ফুটলো।
আরিয়ানঃ- আচ্ছা বুঝেছি চাচা ধন্যবাদ।
আরিয়ান মাথা নেড়ে সামনে তাকালো বাতাসে তখন ধান গাছের গন্ধ কিন্তু আরিয়ানের চোখে আগুন আরিয়ান মনে মনে বলল
আরিয়ানঃ- মেয়ে আমাকে বোকা বানিয়ে পালিয়ে যাবে যেটা সম্ভব না। তোমাকে আমি খুজে বের করবো আরিয়ান খানের সাথে পাংগা নেয়ার মজা তুমি বুঝতে পারবে।
হালকা ঝড়ের মতো হাঁটতে শুরু করল আরিয়ান ঘাম গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে গলায়,কিন্তু ওর পদক্ষেপে কোনো ক্লান্তি নেই বরং প্রতিটা পা যেন এক একটা প্রতিশোধের প্রতিজ্ঞা।
এক ঘণ্টা পরে তালুকদার বাড়ির বড় গেটের সামনে এসে দাঁড়ালো আরিয়ান খান দরজার সামনে নাম লেখা“তালুকদার হাউস” সাদা পাথরের ফলকে খোদাই করা নামটা দেখে হালকা এক নিঃশ্বাস ছাড়লো। গেটে ঢুকতেই শায়লা খান চিৎকার করে উঠলেন দ্রুত তিনি তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে আরিয়ানকে জড়িয়ে ধরলেন।
শায়লাঃ- আরিয়ান আমার আদরের ভাইপো এত দেরি করলি কেনো। কতদিন পরে দেখা রে তোর সঙ্গে।
আরিয়ানঃ- ফুপি কেমন আছো?
তার মুখে এক চেনা শান্ত ভাব কিন্তু চোখে সেই তীক্ষ্ণ আত্মবিশ্বাস এখনো ঠিকই জ্বলছে। শায়লা খান নিশ্বাস ছেরে বললেন,
শায়লাঃ- এতক্ষণ ভালো ছিলাম না কিন্তু এখন ভালো আছি।
আরিয়ান এর বাবা শায়লা খানের বড় ভাই আরিয়ানের পরিবার ছিল সত্যিই সুখের। তার বাবা মেহরাব খান একজন ডক্টর তিনি সৎ ও পরিশ্রমী মানুষ,সবসময় ছেলেকে শেখাতেন “নিজের সম্মান নিজের হাতে রাখবি কারো কাছে মাথা নিচু করবি না” মা নাফিসা খান একজন টিচার ভীষণ মমতাময়ী আর দুই বোন নোহা খান আর নেহা খান এবার ssc দিবে নাফিসা খান আর নেহা খান আর নোহা খান তাদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লাতে থাকে। আরিয়ান আর তার বাবা ঢাকায় থাকে নোহা এনং নেহা হচ্ছে আরিয়ানের খুব আদরের। নোহা আর নেহা যখন যেটা চায় আরিয়ান চেষ্টা করে সেটা এনে দিতে। আরিয়ানের কলিজা তার দুই বোন। কিন্তু নোহা আর নেহা সব সময় আরিয়ান এর পিছনে লেগে থাকে।
পরিবারের হাসি আলোয় বড় হয়েছে আরিয়ান তবু তার মুখের কঠিন ভাবটা যেন কোনোদিন যায়নি। যেন ভেতরে একটা দুনিয়া লুকানো আছে যেখানে কেউ প্রবেশ করতে পারে না।
আরিয়ান এসে ফ্রেস হয়ে সবার সাথে দেখা করলো দুপুরের লাঞ্চ টাইমে বড় ডাইনিং টেবিলে সবাই একসাথে বসেছে।টেবিল ভর্তি খাবার পোলাও, মাটন, সালাদ, দই, মিষ্টি। খাবার খেতে খেতে শায়লা খান জিগ্যেস করলো
শায়লাঃ- তোর আসতে এত দেরি হয়েছিলো কেনো রে??
আরিয়ান খেতে খেতে তার সাথে ঘটা ঘটনার গল্প শুরু করলো
আরিয়ানঃ- ফুপি আজ আসার পথে একটা মেয়ে স্কুটিতে আমাকে চার কিলোমিটার ভুল পথে নিয়ে গিয়ে নামিয়ে দিয়েছে তাই আসতে এতো লেট হয়ে গেছে।
আরিয়ানের কথা শুনে সবাই হেসে উঠলো রাশেদ তালুকদার বলল
রাশেদঃ- ঐ মেয়ের সাথে তোমার কোনো শত্রুতা ছিলো নাকি বাবা??
আরিয়ানঃ- ঐ মেয়েকে আগে কখনো দেখিনি কিন্তু তার চোখ আমার খুব পরিচিত।
শায়লাঃ- তোর কপাল খারাপ এমন দুষ্ট মেয়ের পাল্লায় তাই পড়েছিস।
আরিয়ান ঠোঁট চেপে হালকা হেসে বলল,
আরিয়ানঃ- দুষ্ট না ফুপু ঐ মেয়ে বুদ্ধিমান তাই তো আমাকে বোকা বানাতে পেরেছে। তবে আমি মুখ চিনে রেখেছি আদিব এর বিয়ের আগেই সেই মেয়েকে খুজে বের করবো।
ঠিক তখনই ইলা নিজের দরজা থেকে বের হয়ে ডাইনিং এ আসছিলো তা দেখে সবার চোখ ঘুরে গেলো ওদিকে।ইলার মুখে হালকা ক্লান্তি, চুল ভেজা বাতাসে উড়ছে লম্বা চুল গুলো, সাদা সালোয়ার কামিজ নাকে ছোট্ট নোসপিন। যেন পুরো ঘরটা এক মুহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে গেল।ইলা ডাইনিং টেবিলের সামনে এসে থামলো ইলার চোখ সামনে পড়তেই স্থির হয়ে গেলো সামনে বসে থাকা সেই মানুষটা আরিয়ান বসে আছে। ইলার নিঃশ্বাস থেমে গেল মুখ শুকিয়ে গেল হৃদপিণ্ড যেন বুকের ভেতর ধাক্কা মারছে।
ইলাঃ- শেষ এবার বুঝি বাঁচা মুশকিল আম্মু জানলে আজ আমার জীবন শেষ।
ইলা ধীরে ধীরে পেছিয়ে গেল চুপচাপ নিজের রুমের দিকে চলে যেতে চাইল।কিন্তু হঠাৎ পিছন থেকে রাশেদ তালুকদারের কণ্ঠ
রাশেদঃ- ইলা কই যাচ্ছিস আয় মা লাঞ্চ সেরে নে শুনলাম আজ তুই আদিব এর মামাদের আনতে গেছিলি।
ইলার মুখ মুহূর্তে ফ্যাকাসে হয়ে গেল আর কোনো উপায় না দেখে পা টেনে টেনে ডাইনিং টেবিলের পাশে এসে বসল।রাশেদ তালুকদার হাসিমুখে বললেন,
রাশেদঃ- আরিয়ান এটা আমার মেয়ে ইলা তালুকদার।
ইলার মনে হলো বুকটা বন্ধ হয়ে যাবে চোখ নিচু করে বসে রইল গলা শুকিয়ে গেছে। আরিয়ান তখন চামচ নামিয়ে ধীরে মাথা তুললো চোখ সোজা ইলার চোখে তীক্ষ্ণ, স্থির, কিন্তু অদ্ভুত শান্ত দৃষ্টি। সবার সামনে ঠোঁটের কোণে হালকা এক হাসি এনে বলল
আরিয়ানঃ- আংকেল আপনার মেয়ে খুব বুদ্ধিমান মনে হচ্ছে।
শায়লাঃ- তুই কিভাবে জানলি ইলা বুদ্ধি মান তুই আগে থেকে চিনিস নাকি??
ইলা খাবার গুলো গিলতে চেয়েও গিলতে পারে না, ইলা জানতো না আরিয়ান আদিব এর মামাতো ভাই এই বাড়ির মেহমান জানলে হয়তো এই কাজ করতো না। এখন যদি বাড়ির লোকজন জানে ইলা এই কাজ করছে বাড়ির সবাই খেপে যাবে।
শায়লার কথাটা শেষ হওয়ার আগেই আরিয়ান ঠান্ডা কণ্ঠে যোগ করল
আরিয়ানঃ- না ফুপি তার সাথে তো আমার মাত্র দেখা হয়েছে। তবে তার ইনোসেন্ট ফেস বলে দিচ্ছে সে অনেক বুদ্ধিমান।
আরিয়ান এর কথা শুনে সবাই হাসলো কিন্তু ইলার মুখে রঙ উধাও তার মনে হলো “এই মানুষটা হাসছে ঠিকই কিন্তু চোখে আগুন লুকিয়ে আছে” এখন না হয় পার পেয়ে গেলাম কিন্তু পরে কপালে কি লিখা আছে আল্লাহ ভালো জানে।ইলা ভাত খেতে খেতে মনে মনে বলল,
ইলাঃ- আমি ভয় পাবো না মি. রাক্ষসেকে আমি হার মানবো না এই খেলা শুরু এখন থেকে।
আর টেবিলের ওপারে বসে থাকা আরিয়ান খান ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ এক হাসি টেনে ধীরে এক চামচ ভাত মুখে তুললো কিন্তু চোখ সরায়নি এক মুহূর্তের জন্যও ইলার দিক থেকে কারণ আরিয়ান এখন জানে এই মেয়ে সেই ইলা তালুকদার সেই ভার্সিটির ইলা।
লাঞ্চ শেষ হতেই সবাই ধীরে ধীরে টেবিল থেকে উঠে গেল।ইলা এমনভাবে হাফ ছাড়ল যেন বিশাল কোনো যুদ্ধ থেকে ফিরে এসেছে। গলার কাছে আটকে থাকা নিঃশ্বাসটা বেরিয়ে গেল এক দমে।হাতে পানির গ্লাস নিয়ে নিজের রুমের দিকে দৌড় দিল।
রুমে ঢুকেই দরজাটা বন্ধ করে বিছানায় ধপ করে বসে পড়ল চোখ বন্ধ করেই নিজের কপালে হাত রাখল।
ইলাঃ- অফ বাঁচলাম এখন কার জন্য কিন্তু ওই রাক্ষসটা আমার চেহারা চিনে ফেলেছে এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা কখন সবার সামনে কান ফাটিয়ে দেয় দেটা দেখার।
( আল্লাহ এই যাত্রায় বাচিয়ে দাও পরের ঈদের সব সালামির টাকা মিসকিন কে দিয়ে দিবো)
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল পরি আর হালিমা দারিয়ে আছে দরজায়
পরিঃ- ইলা দরজা খোল দেখি কি কারণে তুই খাওয়া শেষ করেই পালাইলি কি হয়েছে বল একটু।
দরজা খুলতেই পরি আর হালিমা হেসে ঢুকল হালিমার হাতে একটা ছোট্ট বাটি ভিতরে দই।
হালিমাঃ- তোর প্রিয় মিষ্টি দই আনছি খা তো দেখি।
ইলাঃ- তোরা তো জানিস না আমার পেট আজ ভয়েই ভর্তি হয়ে গেছে।
পরি আর হালিমা হেসে উঠল ঠিক তখনই দরজার পাশে কেউ কাশি দিল। সবাই ঘুরে দেখে রায়েদ দারিয়ে আছে
রায়েদঃ- তোমরা পার্টি করছো আমার ইনভাইটেশন কই?
রায়েদ এর চোখ সরাসরি হালিমার দিকে কিন্তু হালিমা একদম ঘুরে তাকিয়ে বলল
হালিমাঃ- আপনাকে কেউ ডাকেনি ইনভাইটেশন ছাড়া কারো পার্টিতে আসতে নেই জানে না।
রায়েদঃ- ওহ তাই নাকি তাহলে এই দইটা আমি খেয়ে নিই।
এই বলে ও হালিমার হাত থেকে দইয়ের বাটিটা টেনে নিল।
হালিমা চেঁচিয়ে উঠল।
হালিমাঃ- এই ছিনতাইকারী ফিরিয়ে দেন আমার দই এর বাটি।
রায়েদ হাসতে হাসতে বাটি থেকে দই মুখে তুলল হালিমা তেড়ে গেল দুজনের মধ্যে ছোটখাটো একটা হাসির যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল পরি আর ইলা হাসতে হাসতে কাত হয়ে পড়ল।
পরিঃ- তোমাদের এই দুজনের মধ্যে আসলে কে ছোট, কে বড় বুঝতে পারি না।
ইলাঃ- যাই হোক আজ হালিমা নিশ্চিত হেরে গেছে।
রায়েদঃ- তোমার হাসিটা সুন্দর হালিমা আর তোমার চোখ গুলো সুন্দর গরুর মত টানা টানা।
হালিমা এক ঝটকায় তাকাল গাল লাল হয়ে গেল
হালিমাঃ- আপনি পাগল নাকি।
বলে তেড়ে গিয়ে আবার বাটিটা ছিনিয়ে নিয়ে চলে গেলো রুমে হাসির ঝড় বইতে লাগল পরি হেসে বললো
পরিঃ- গাধা চোখ গরুর মত টানা টানা বলে না হরিণ এর মত টানা টানা হয়।
রায়েদঃ- এই রে তাহলে তো চাশমিস কে রাগায় দিলাম।
পরি আর রায়েদ হেসে দিলো কিন্তু এই হাসির মাঝে ইলার মনে এখনো সেই লাঞ্চের দৃশ্য ঘুরপাক খাচ্ছে আরিয়ানের সেই চোখদুটো যেগুলোর তীক্ষ্ণতা যেন ওর বুক কাঁপিয়ে দিয়েছিল।
অন্যদিকে গেস্ট হাউজ এর ছাদে বসে আদিব আর আরিয়ান বসে আছে হালকা হাওয়া পাশে কচি পাতা দুলছে।
আদিবঃ- ব্রো তুমি কিন্তু আগের মতই আছো ঠান্ডা, সিরিয়াস, আর সবাইকে দূরে রাখো।
আরিয়ানঃ- সবাইকে না শুধু যাদের ভেতরটা বুঝতে পারি না তাদের।
আদিবঃ- তুমি এখনো কি তাকে ভুলতে পারোনি?
আরিয়ান একদম চুপ করে গেল হাতে থাকা কাপটা টেবিলে রাখল চা ঠান্ডা হয়ে গেছে।
আদিবঃ- দেখো ব্রো তুমি আর আমি সেম বয়সের।যেখানে আমার কয়দিন পরে বিয়ে সেখানে তুমি এখনো তোমার সেই পুরনো চোখের শূন্যতা নিয়ে পড়ে আছো আমি দেখেছি মামা মামি চায় তুমি এবার একটা বিয়ে করে নাও। কিন্তু কেউ তোমার সামনে এই কথা বলার সাহস পায় না।
আরিয়ান গভীরভাবে দূরের দিকে তাকাল
আরিয়ানঃ- বিয়ে আদিব আমি এমন কারো সঙ্গে জীবন কাটাতে পারব না যাকে দেখে কিছু অনুভব করি না। আর যাকে একবার অনুভব করেছি সে আমাকে বুঝলো না।
আদিবঃ- তুমি নিজেকে কষ্ট দিচ্ছো জানো তো?
আরিয়ানঃ- মানুষের লাইফে কষ্ট না থাকলে মানুষ বেঁচে থাকে না।
আদিব আর কিছু বলল না ও বুঝতে পারল এই মানুষটার ভেতর একটা গভীর ঝড় আছে যেটা বাইরে থেকে কেউ টের পায় না।
গল্প করতে করতে বিকেল হয়ে গেলো দূরে তখন ইলার হাসির শব্দ ভেসে এলো হালকা প্রাণবন্ত। আরিয়ান মাথা ঘুরিয়ে তাকাল একবার ছাদ থেকে আরিয়ান দের গেস্ট হাউজ থেকে ঠিক দেখা যাচ্ছে ইলাদের ছাদটা ইলা ফুলের গাছে পানি দিচ্ছে। আরিয়ানের ঠোঁটে ক্ষীণ একটা হাসি ফুটল
আরিয়ানঃ- এই মেয়েটা আমার শান্তি কেড়ে নিবে বুঝতে পারছি।
আরিয়ান উঠে দারালো আদিব অবাক হয়ে বলল
আদিবঃ- ব্রো এখন কই যাচ্ছো কথা তো শেষ হলো না।
আরিয়ানঃ- তোর শালিকার ফুল বাগান থেকে ঘুরে আসি
ছাদের জ্যান্ত গরম আর খানিক হালকা হাওয়ায় ফুলের পাপড়ি গুলো দোলা খাওচ্ছে ইলা গুনগুন করে গান গাইছে আর ফুল গাছে পানি দিচ্ছে।আরিয়ান ছাদে এসে পিছন থেকে গম্ভির কন্ঠে বলল।
আরিয়ানঃ- বাহ এই ছাদটা তো ফুলের রাজ্য
ইলা হঠাৎ স্ট্যাচু হয়ে গেলো দুই চোখে বিস্ময় মুখে এক ঝলক রঙ ওঠে ইলা ধীরে ধীরে পেছনে পিছাতে লাগলো আর আরিয়ান ধীরে ধীরে এগোলো ইলা পেছাতে পেছাতে দেয়ালে আটকে গেল।দুজনই এমন এক ধূসর নীরবতায় আটকে দাঁড়াল যেন বাতাসও তাদের শ্বাস-প্রশ্বাস গুনছে। আরিয়ান তার ঠোঁট থেকে বেছে বেছে কিছু কথা বলল,
আরিয়ানঃ- ভুল রাস্তা দেখিয়ে দেয়ার মানে কী?
কণ্ঠটা ঠাণ্ডা কিন্তু ভাঙা ভাঙা কোন সুর লুকিয়ে আছে। ইলা কণ্ঠ কেঁপে উঠে বলল
ইলাঃ- দেখুন আমি শুধু মজা করছিলাম আমি ভাবছিলাম আপনি আমাকে খুঁজতে এসেছেন।
কথাটা মাঝেই থেমে গেল আরিয়ান আর কিছু বলতে দেয়নি হঠাৎই সে এক থাপ্পড় বসালো ইলার গালে যেন বাতাস চিরে গেল। ইলার গালে লাল চিহ্ন উঠল চোখে এক ঝলক বিস্ময় আর ব্যথা মিলেমিশে এল। তারপর আরিয়ান চোখ কুঁচকে উচ্চস্বরে বলল,
আরিয়ানঃ- ইস্টুপিড গার্ল নিজেকে কি ক্যাটেরিনা মনে করেন। যে আমি আপনার প্রেমে পড়ে ঢাকা থেকে এখানে আসবো আপনি ভাবছেন কি?
ইলার অচেতন গলায় শব্দ ওঠে কিন্তু সে নিজের ভিতর থেকে শক্ত হয়ে উঠল।পাশে একটু মাটির ঢিবি দেখা গেল ফুল লাগাতে রাখা মাটি। ইলা এক ঝটকায় মাটির বাক্সটা তুলে নিল আরিয়ানের দিকে ছুড়ে দিলো মাটি গুলো মাটির কণা আর কিছুটা ধুলো আরিয়ানের কাঁধে লেগে গেল আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলোর মাঝখান থেকে দোলা খাওয়া পাতার মতো সব কিছু থমকে গেল ইলা চেঁচিয়ে বলল
ইলাঃ- আমি আর ভয় পাবো না এটা আমার এলাকা আপনি যদি এটা ঢাকা ভাবেন তাহলে ভুল করছেন কারণ আমি ছেড়ে দিবে না আর।
আরিয়ান প্রশিত হয়ে তাকিয়ে রইল অজান্তে তার চোখে বিস্ময়ের নরম আলো ফুটে উঠল ইলা আরো বলল
ইলাঃ- আমি এখনি আব্বুকে বলব আপনি আমাকে থাপড় মেরেছেন।
চোখে অশ্রু না হলেও হুমকির তীব্রতা ছিল ইলা ছাদ থেকে নামতে গেলে আরিয়ান বলল
আরিয়ানঃ- ওকে ফাইন আমিও বলে দেবো আপনি আজ আমার সঙ্গে কি করেছেন। আর আমার এই সব ‘বিয়ে-হলুদ’ এসব কাজে ইন্টারেস্ট নেই।আমি এমনিতেও থাকতে চাই না এই সব অনুষ্ঠানে।
কণ্ঠে হালকা ঠোঁটচাপা হাসি কিছুটা আঠালো কিছুটা ব্যথা ঝাঁপটা। ইলা ক্রোধে কণ্ঠে গজগজ করে আবার পানির মগ নিতে তেড়ে আসলো আরিয়ানের দিকে ইলা আরিয়ান কে পানি দিতে আসছিলো ইলা আরিয়ানের কাছাকাছি এসে পানি দিতে যাবে আরিয়ান কে হঠাৎ আরিয়ান চট করে ইলার হাত ধরে ফেললো মগটা উপরের দিকে উঠিয়ে দিল। মগটা থেকে বয়ে পড়া পানি এক ঝলকে ইলার মাথায় পড়ল।
পানির ফোঁটা প্রথমে চুলের ভাঁজ ধরে তার পরে কাঁধে তারপর গলার নিচ দিয়ে পড়ে শরীর ভিজে গেলো। ইলার সামনের চুল গুলো থেকে গুটি গুটি করে পানি চোখের পাপড়িতে পড়ছে ঠোঁটে পানির ফোঁটা পড়াতেই ইলার শ্বাস আটকে এলে ঠোঁটটা একটু কাঁপল চোখে অচেনা উষ্ণতা বেরোতে লাগল।
আরিয়ান তখনই ধীর কণ্ঠে বলল,
আরিয়ানঃ- আপনাকে এই ভিজা চুলে একটু অন্যরকম সুন্দর লাগছে।
কথা বলার সময় আরিয়ানের স্বরটা স্নিগ্ধ কঠোরতাটা লুকিয়ে যেন এক ফোঁটা কোমলতা ঝরে পড়ল। ইলার গলার ভেতর ঠেসে থাকা ভালোবাসা আর ক্রোধ একসাথে জেগে উঠল।ইলা হঠাৎ চট করে আরিয়ানকে দেখলো। ইলার বুকে সাহস চোখে আগুন আর গলার ভিতরে অদ্ভুত এক নীরবতা। দুজনই কিছু ক্ষণ একে অপরের চোখে দেখেছিল একদিকে রাগ, অন্যদিকে অজানা টান আর মনকে করে দিল অচেতন অদ্ভুত শান্ত।
আরিয়ান একটু সামনে এগিয়ে এসে এক ফোটা পানি ইলার গালে ছুঁয়ে দিল সেই স্পর্শটা মিষ্টি কিন্তু কোনোমতেই হিমশীতল নয়। ইলা হালকা হাঁসফাস করে বলল,
ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ২০
ইলাঃ- ভাইয়া প্লিজ আমাকে ছেরে দিন আমি রুমে যাবো।
আরিয়ান একটু কণ্ঠ নরম করে বলল,
আরিয়ানঃ- বার বার থাপ্পড় মারার জন্য সরি আপনি আমার জন্য বিপজ্জনক এই বিয়েতে এসে হয়তো আমি সমস্যায় পরলাম।
দুজনের মাঝে এমন এক থমথমে কোমল উত্তেজনা কেঁপে উঠল।
