Home ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮৬

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮৬

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮৬
প্রিয়স্মিতা তেহজীব রাই

“কিছু কি বলবে? কিছু বলার থাকলে বলো, নাহলে আমার অনেক কাজ আছে।”
প্রিয়স্মিতার পানে তাকিয়ে স্পষ্ট কণ্ঠে বলল নির্বাণ, তার চোখ মুখে উপচে পড়া বিরক্তি।
তার সম্মুখে নিলিপ্ত ভঙ্গিতে বসে ছিল প্রিয়স্মিতা।
সে লক্ষ্য করল যে চোখ দুটো এককালে অফুরন্ত মুগ্ধতা নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকত, সেই চোখ দুটোতে আজ কতই না বিরক্তি।
আচ্ছা, এই তিক্ততা, এই বিরক্তি— এগুলো কী আসলেই সত্যি, নাকি সবটাই অভিনয়?
প্রিয়স্মিতা আর নির্বাণ প্রায় ৩০ মিনিট যাবত মুখোমুখি বসে আছে উত্তরার একটা স্বনামধন্য ক্যাফে রেস্টুরেন্টে। মূলত প্রিয়স্মিতাই ডেকেছে নির্বাণকে। যদিও প্রথমে আসতে মানা করে দিতে নিচ্ছিল নির্বাণ, কিন্তু না বলতে গিয়ে ও কণ্ঠনালির কোথাও একটা ঠেকেছে।
তবে কোনো কথাই ভুলে যায়নি নির্বাণ, আর না কখনো ভুলতে পারবে সেই দগদগে তরতাজা ক্ষত, বেয়ে এখনো রক্ত ঝরে প্রতিনিয়ত। বিশ্বাস ভঙ্গের যন্ত্রণা মৃত্যু দেয়।
প্রিয়স্মিতা আজ অনেক কিছু বলবে বলেই ডেকেছে নির্বাণকে। কিন্তু কোথাও যেন একটা বাধছে, সে স্বাভাবিক হতে পারছে না।

সরি বলা বা অন্যায় স্বীকার করে নেওয়া আসলে প্রিয়স্মিতার ধাঁচে নেই।
কিন্তু একজনের সাথে অন্যায় যেহেতু করেছে, আর তার উপলব্ধিও হয়েছে, তখন অন্যায় স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে নেওয়াটা লজ্জার নয়। ক্ষমা মানুষকে লজ্জিত করে না, সহমর্মী করে তোলে।
আর তাই আজ মূলত ক্ষমা চাওয়ার উদ্দেশে ডেকেছে প্রিয়স্মিতা।
নির্বাণ প্রতীক্ষা করছে জবাবের আশায়। তার দৃষ্টি স্থির প্রিয়স্মিতার পানে।
প্রিয়স্মিতা কয়েক পল চুপ থেকে চোখ বন্ধ করে লম্বা একটা দম নিয়ে বলতে শুরু করল—
“আমি জানি আমার ওপর আপনি রেগে আছেন, আর রেগে থাকাটাই স্বাভাবিক।
কারণ আমি আপনার অনুভূতিগুলোকে আমার স্বার্থে ব্যবহার করেছি।
আসলে অন্ধ ভালোবাসায় উন্মাদনা ছিলাম আমি। তাই আপনার কাছে আমি ক্ষমাপ্রার্থী।
আমি আমার অন্যায় স্বীকার করে নিয়ে আপনার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। আপনি ভালো মানুষ, মহান মানুষ— তাই হয়তো সেই মহানুভবতার খাতিরেই ক্ষমা করে দেবেন।”
চোখ বন্ধ করে এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে থামল প্রিয়স্মিতা।
অতঃপর শান্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করল নির্বাণের পানে।
এতক্ষণ মনোযোগ সহকারে কথাগুলো শুনছিল নির্বাণ। তাচ্ছিল্য করে হাসল। একটু অবাক হওয়ার ভান ধরে বিদ্রূপ করে বলল—

“ও মাই গড! এ আমি কি শুনছি? আমার সামনে বসে কে ক্ষমা চাচ্ছে? তুই? তোর শরীর ঠিক আছে, নাকি ডক্টর চৌধুরী ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে বলে আবার নির্বাণের কথা মনে পড়ল?”
অপমানিত বোধ করলো প্রিয়স্মিতা।
“শাট আপ, নির্বাণ ভাইয়া!”
“ধমকাচ্ছিস কাকে? তুই কি ভেবেছিস আমি কিছু জানি না? হুহ! যে আমার জীবনটা চুটকিতে নষ্ট করে দিল, তার কোনো খবর রাখি না?।”
একটু থেমে আবার বলল নির্বাণ—
“তুই আমাকে তোর শিকার বানিয়েছিস, অন্য কেউ তোকে তার শিকার বানিয়েছে, বোকা মেয়ে মানুষ।”
“মানে?”
বাঁকা হাসলো নির্বাণ।
“ডক্টর চৌধুরী কোনোদিনও তোকে ভালোবাসেনি, বাসে না, বাসবেও না। তার সব থেকে বড় কারণ সে অন্য কাউকে ভালোবাসে। কাকে ভালোবাসে জানিস?”
প্রিয়স্মিতা জিজ্ঞাসু চোখে তাকালো। কিছুটা দৃঢ় কণ্ঠে বলল—

“শুধু শুধু আমাকে কথা ভুলানোর চেষ্টা করবেন না, নির্বাণ ভাই। সে আমাকে ভালোবাসে না জানি, কিন্তু অন্য কাউকে ভালোবাসে এটা বললে ও মানবো না।”
কপাল চুলকে হাসল নির্বাণ। ব্যঙ্গাত্মক কণ্ঠে বলল—
“তোমার মানা না মানাতে কি যায় আসে? ডক্টর চৌধুরী ভালোবাসে অনেকটা পাগলাটে সাইকো টাইপের। সেই নারী কে জানো?”
“কে?”
মুখ বিকৃত করল নির্বাণ।
“ছিঃ! এতদিন ওই একই বাড়িতে আছো, কতদিন এক ঘরে, এক বিছানায়, এক ছাদের নিচে থাকলে—
কত চালাক মহিলা তুমি, আর এতটুকু জানো না?”
“হেঁয়ালি না করে ঝটপট বলুন, নির্বাণ ভাই।”
প্রিয়স্মিতার বুক ধরফর করতে শুরু করেছে। কণ্ঠে উদ্বেগের আভাস পেল নির্বাণ। হয়তো ভেতরে জ্বলন ধরেছে।
প্রিয়স্মিতার অবস্থা দেখে পৈশাচিক হাসলো নির্বাণ। তৃপ্তি নিয়ে রয়ে সয়ে বলল—

“ইয়োর ফেক হাজব্যান্ড ডক্টর আবধ্য চৌধুরী শুদ্ধ ইজ অবসেসড উইথ ইয়োর সিস্টার।”
“হোয়াটটটট!”
“ইয়েস, ইয়োর সিস্টার তনয়া শিকদার প্রিয়তা।”
“ইমপসিবল!”
“এটাই ট্রু। ডক্টর চৌধুরী আজ থেকে নয়, সম্ভবত ১৫-১৬ বছর আগে থেকেই ভালোবাসে। চাইল্ডহুড লাভ। তার এত বছরের ভালোবাসা ফেলে সেখানে মনে হয় তোমাকে ভালোবাসবে?
সে কিন্তু তোমার মধ্যে প্রিয়স্মিতাকে নয়, প্রিয়তাকে খুঁজে বেড়িয়েছে। আর অবভিয়াসলি আমি যতটুকু দেখেছি তুমি ওই মেয়েটার মতো ০% ও নও। দুধের স্বাদ ঘোলে মেটেনি, তাই ছুঁড়ে ফেলেছে। আরও কোনো রিজন থাকতে পারে, আমি সঠিক জানি না।”
সে হয়তো তোমাকে অনেক ভক্কর চক্কর উদাহরণ দিতে পারে, ভুলভাল বুঝাইতে পারে যে এই ওই কারণে তোমার সাথে এটা করেছে, ওটা করেছে— কিন্তু ওসব ফাও কথা।
প্রিয়স্মিতা হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এলো মুহূর্তেই। তার ভেতরে ফুটছে লাভা নদী। মনে প্রচণ্ড ঘৃণার জন্ম হলো। এত বড় প্রতারণা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। প্রিয়স্মিতা শিকদার নাকি কারো রিপ্লেসমেন্ট!
প্রিয়স্মিতার প্রতিক্রিয়া দেখে মনে মনে ভীষণ রকমের পৈশাচিক তৃপ্তি পেলো নির্বাণ। তাচ্ছিল্য করে বলল—

“আমার জীবনের মস্ত ভুল তোকে ভালোবাসা। আমার অন্তরে যে আগুন জ্বালিয়েছিল, কি ভেবেছিলে— অন্য পুরুষের বুকে সুখে থাকবে? সেগুড়ে বালি।”
“খুবসুরত বহুত হ্যায় তু, লেকিন দিল লাগানে কি কাবিল নেহি হ্যায়…
বেবাফা তেরা মাসুম চেহরা ভুলে জানে কি কাবিল নেহি হ্যায়…”
গানের লাইনটা গলায় তুলে সুর করতে করতে উঠে চলে গেল নির্বাণ।
আজ বুকের ভেতরটা ভীষণ হালকা লাগছে। প্রশান্তিতে ভরে আসছে হৃদয়, ভারমুক্ত লাগছে অনেকটা। দীর্ঘ ছয় ছয়টা মাস সে কেবল এই দিনটা দেখার জন্যই তো বেঁচেছিল, প্রতিদিন একটু একটু করে তড়পেছিল। আজ শান্তি।
এই মেয়েটার প্রতি মনে আর অভিযোগ নেই। সে সত্যি সত্যি আজ মন থেকে ক্ষমা করে দিলো। আজও ভুলতে পারেনি মেয়েটাকে— ভালোবাসার পরিমাণ আজও একই আছে, আগে যতটা ছিল।
অনেক চেষ্টা করেছে ঘৃণা করতে, কিন্তু পারেনি। ভালোবাসার মানুষকে কি ঘৃণা করা যায়? আসলে ভালোবাসা, ঘৃণা করা— এগুলো মানুষের হাতে নেই।
তবে ভালোবাসা থাকলেও এই নারীকে জীবনে আর দ্বিতীয় বার ফেরত পেতে চায় না।

এসকে গ্রুপ আজ বেশ কয়েকটা ফরেন কান্ট্রির সাথে ডিল সাইন করবে। তাই সকল বোর্ড মেম্বারদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক।
বিশেষ করে গ্রুপের সিইও আবরার শিকদার প্রণয়কে যথাসময়ের পূর্বে পৌঁছে আগে থেকে রেডি করা সব পেপারস আর ডকুমেন্টস গুলো পুনরায় খতিয়ে দেখেনিতে হবে। আবরার শিকদার প্রণয় বিজনেস ফিল্ডে নিজের বিশাল সাম্রাজ্য দাঁড় করালেও এসকে গ্রুপের ওপর থেকে নিজের শেয়ার বা ওনারশিপ কোনোটাই তুলে নেয়নি। সে এখনো একসাথে দুটো কোম্পানির প্রতি সমানভাবে দায়বদ্ধতা পালন করে চলেছে। এতে অবশ্য বেশ বেগ পেতে হয় তাকে, তবে বড় ছেলের দায়িত্ব জ্ঞান দেখে পুরোপুরী নিশ্চিন্ত সাদমান শিকদার। তিনি তো সারাজীবন এটাই চেয়েছিলেন।
প্রণয় মাত্রই শাওয়ার শেষ করে বেরিয়েছে। কোমরে সফেদ তোয়ালে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে ড্রেসিং টেবিলের বড় মিররের সামনে।
পুরুষালী গা বেয়ে টপ টপ করে নামছে স্বচ্ছ পানির বিন্দু।
দ্রুত হাতে সিক্ত চুলের পানি ঝাড়তে ব্যস্ত প্রণয়। সকাল ১০টা বেজে ৪৫ মিনিট, সে অলরেডি লেট। মিটিং টাইম ১২টা।

সে বহু চেষ্টা করেও আজকাল সকাল-সকাল উঠতে পারে না। আরামের ঘুম তাকে ছাড়তেই চায় না। এতো আরাম লাগে যে মনে হয় খরগোশ ছানাটা বুকে নিয়ে দিনরাত শুধু শুয়েই থাকি।
শরীরে তোয়ালে চালাতে চালাতে “আউচ” বলে আচমকা মৃদু আর্তনাদ করে প্রণয় চোখ মুখ খিচে বন্ধ করে নেয়।
যুদ্ধ শেষে সৈনিকের দেহের অবস্থা যেমন আঘাত প্রাপ্ত ক্ষতবিক্ষত, তেমনই প্রণয় বুক-পিঠের অবস্থাও ঠিক তেমন নতুন পুরনো অসংখ্য লালচে আঁচড়ে ক্ষতবিক্ষত।
সোপ-সাবান পানি জাতীয় হার্স পদার্থ লাগাতে দীর্ঘক্ষণ যাবৎ তিরতির করে জ্বলছে। তবুও এই যন্ত্রণাটুকুও কত মধুর লাগছে প্রণয়ের নিকট। কত শান্তি, কত তৃপ্তি এই ব্যথায়। ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি চলে আসে প্রণয়ের।
প্রণয়ের দেহ মনে আজকাল পরিবর্তন এসেছে বেশ।
আগের মতো ডিপ্রেশন স্ট্রেস অ্যাংজাইটি না থাকায় চোখেমুখে উজ্জ্বলতা বেড়েছে কয়েকগুণ, সৌন্দর্য বিকশিত হয়েছে।

পুরুষালি শরীরের কোষে কোষে প্রতিনিয়ত প্রবাহিত হচ্ছে ডোপামিন অক্সিটোসিন।
নিয়মিত রিলিজে শরীরের উচ্চমাত্রার টেস্টোস্টেরন লেভেল এখন অনেকটা কন্ট্রোলড, হরমোনাল ব্যালেন্সডও একদম কাটায় কাটায়।
তাই এখন আর আগের মতো হুটপাট করে রেগে যায় না প্রণয়, মাথা ঠাণ্ডা।
তবে উত্তাল সাগরের প্রলয় এখনো শান্ত নয়, গর্জন করে ওঠে। তবে দুকূল ভাসিয়ে দিতে চায়, তবে তার পূর্বেই সামলে নেয় প্রিয়তা।

ওয়ার্ডরোবের হ্যাঙ্গারে ঝুলানো ব্ল্যাক আউটফিট বের করে বিছানার ওপর রাখলো প্রণয়। তোয়ালে দিয়ে শরীরের এক্সট্রা পানিটুকু মুছে সিল্ক চুলে জেল অ্যাপ্লাই করল। দ্রুত হাতে বিছানার ওপর পড়ে থাকা প্যান্ট তুলে তোয়ালে খুলতেই দরজা ঠেলে হন্তদন্ত পায়ে ভেতরে প্রবেশ করল প্রিয়তা।
হাতে থার্ড সেমিস্টার ফাইনাল রেজাল্ট। চোখ মুখে উপচে পড়া উচ্ছ্বাস নিয়ে খুশিতে লাফিয়ে বলল,
“প্রণয় ভাই আই গট হান্ড্রেড আউট অফ হান্ড্রেড দেখুন!”
বলেই উপরে তাকিয়ে প্রণয়ের দিকে কমলা রঙের খামটা এগিয়ে দিতেই থ হয়ে গেল প্রিয়তা। উক্ত দৃশ্যে সারা শরীর কাঁটা দিয়ে উঠলো মুহূর্তেই। উচ্ছ্বসিত চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল রসগোল্লার ন্যায়।
মুখ হাঁ করে নির্বাক চোখে কয়েক পল তাকিয়ে রইল প্রিয়তা। চোখের সামনে উন্মুক্ত পুরুষত্ব দেখে হাত-পা শিরশির করছে মেয়েটার, গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। এই দৃশ্যটা প্রিয়তার জন্য নিয়মিত, তাই অনেকটা সয়ে গেছে এখন। আগে হলে নিশ্চিত ধাক্কা সামলাতে না পেরে পটল তুলত।
প্রিয়তমার লোলুপ দৃষ্টি লক্ষ্য করে ঠোঁট কামড়ে হালকা হাসল প্রণয়। তবে চেহারার অভিব্যক্তিতে তা প্রকাশ পেল না। কণ্ঠে গাম্ভীর্য টেনে ধমকে বলল,

“লজ্জা-শরম কি গলা টিপে মেরেছিস যে যখন তখন একজন প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষের রুমে হুটপাট নক না করে ঢুকে পড়ছিস? এই যে সব দেখে ফেললি এখন আমার কি হবে?”
এমন ৩৬০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে পল্টি নেওয়াতে বোকা বনে গেল প্রিয়তা। হতোভম্ব গলায় বলল,
“এ্য্যহ্!”
আবার ঝাড়ি দিল প্রণয়,
“এ্য্যহ্ নয় হ্যাঁ। আমার মতো একটা সাদাসিধে আলাভোলা সরল ছেলের ইজ্জত এভাবে চিবিয়ে খেতে লজ্জা করল না তোর চুন্নি মেয়ে? ছি ছি এই মুখ আমি কাকে দেখাব!”
লোকটার অভিনয় দেখে প্রিয়তার নিজেকেই পাগল মনে হলো। যে লোকটা তাকে দিন রাত গোসল করাতে করাতে বারো মাস সর্দি লাগিয়ে রাখে, যে লোকের দিনে ৪২ বার বাসর না করলে মন ভরে না, সে লোকটা নাকি বলছে তার ইজ্জত হরণ হয়েছে! আচ্ছা এই কথা কি পাবলিক মানবে?
প্রিয়তাকে ভাবনার সাগরে তলিয়ে যেতে দেখে মনে মনে ক্রুর হাসল প্রণয়। ফ্লোরে লুটিয়ে থাকা তোয়ালেটা তুলে কোমরে পেঁচিয়ে নিতে নিতে বলল,
“দেখ তুই এখনো নির্লজ্জের মতো তাকিয়ে আছিস আমার ইজ্জতের দিকে। ছি ছি, এমন লজ্জা শরম হীন মেয়ে তো আমি চাইনি। ইজ্জতের আর কিছু রইল না আমার।”
ভন্ডামিতে বিরক্ত হলো প্রিয়তা। এতক্ষণে মুখ খুলল। এক পা দু’পা করে প্রণয়ের দিকে এগোতে এগোতে এক ভ্রু তুলে বলল,

“বউয়ের সামনে ঢেকেঢুকে পর্দা করে চলা নতুন ফজিলত নাকি পিরে মুকাম্মাল প্রণয় সাহেব? ভণ্ডামি করেন আমার সাথে হুমম!? জানেন আমি কে? কার বউ?”
প্রণয় চোখ সরু করে তাকাল। প্রিয়তার চোখেমুখে খেলছে শয়তানি। প্রণয় অজান্তেই পিছিয়ে গেল দুই পা। কোমর ঠেকল ড্রেসিং টেবিলের সাথে।
প্রিয়তা এগিয়ে এসে একদম প্রণয়ের গা ঘেঁষে দাঁড়াল। তার দুপাশের ড্রেসিং টেবিলের হাত রেখে ঝুঁকলো। নাক ঘষে ঘষে ভেজা শরীরের ঘ্রাণ নিয়ে বলল,
“Uff kya Mal hai pure cocen.”
প্রণয় নিজের মাথাটা পিছন দিকে ঠেলে সরিয়ে বলল,

“ছি ছি কি অশ্লীল কথাবার্তা! আল্লাহ্ এই চুন্নি মেয়ের হাত থেকে বাঁচাও আমায়। এই দূরে যা, গায়ের উপর উঠে আসছিস কেনো? আমার শরীর আনচান করছে।”
ঠোঁট চেপে হাসলো প্রিয়তা। উন্মুক্ত ঠাণ্ডা শরীরে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে স্লাইড করতে করতে হাস্কি কণ্ঠে বলল,
“দূরে যাওয়ার জন্য কি কেউ কাছে আসে যুবক!”
বলেই আস্তে আস্তে হাতটা নিচের দিকে নামাতে শুরু করলো প্রিয়তা। একটু একটু করে নামতে নামতে আচমকাই খপ করে তোয়ালের মাথা চেপে ধরল।
ঠোঁটে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে তুলে নিচের দিকে ইশারা করে বলল,
“আপনার এই হিট মুভি যে কতবার দেখেছি, সত্যি বলতে দুর্দান্ত লেগেছে। তবে যাই বলেন আর তাই বলেন, আপনার মুভিতে কিছু তো একটা ব্যাপার আছে। হাজার বার দেখেও বোর লাগে না, প্রতিবার নতুন মনে হয়। ইন্টারেস্টিং!”

প্রিয়তার এমন দুঃসাহসী বাক্য চয়ন দেখে চোখ বড় বড় করে ফেলল প্রণয়। বিস্ময় চড়ে আকাশে পৌঁছে গেল এক লাফে। মেয়েটা দুষ্টু, কিন্তু প্রশ্রয় দেওয়াতে এতটা সাহস দেখাবে সেটা ভাবি নি।
“কি হলো স্বামী, খুলে দেব আপনার বন্ধ দুয়ারের তালা?”
রিনরিনে কন্ঠে ঘোর থেকে বেরিয়ে এলো প্রণয়। গভীর বাদামী নেত্রজোড়া তাক করল সামনে দাঁড়ানো রমণীর দিকে। রমণীর শান্ত দিঘির ন্যায় নীলাভ নেত্রের মণিটা লাফাচ্ছে।
ঘাড়, গাল আর কপালের ভাঁজে জমা হচ্ছে বিন্দু বিন্দু শিশির। মানে বাঘিনী সিংহ শিকার করতে এসে মনে মনে নিজেই ভয় পাচ্ছে, কিন্তু ফুল আত্মবিশ্বাস। মজা পেল প্রণয়।
তোয়ালের উপর রাখা হাতটা ধরে ফেলল প্রিয়তার নিজের বিশেষ স্থানের সাথে আরো শক্ত করে চেপে ধরিয়ে বললো,

“বেয়াদবের মতো তোয়ালে ধরে টানাটানি করছিস কেন? ছাড়! ছাড় বলছি।”
প্রণয়ের কাণ্ড দেখে চোখ বড় বড় করে ফেলল প্রিয়তা। লোকটা শয়তানি দেখে ফেললো। জাতে মাতাল তালে ঠিক তার জামাই।
হাতের মুঠো আরও শক্ত করে টেনে ধরল প্রিয়তা। প্রণয়ের একদম কাছে গিয়ে বা গালে আলতো হাত রাখলো। কানের লতিতে ঠোঁট চেপে কানে কানে বলল,
“আর যদি না ছাড়ি?”
“পুরুষ নির্যাতনের মামলা দিমু আমি।”
“আচ্ছা কার নামে দেবেন? বউয়ের নামে? আচ্ছা পুলিশকে কি বলবেন শুনি? যে বউ আমার তোয়ালে ধরে টেনেছে? পুলিশ তো বীরপুরুষ বলে আখ্যায়িত করবে। আমি ও বলবো অমন মাল দেখে লোভ সামলাতে পারিনি।”
প্রণয় মৃদু বল প্রয়োগ করার অভিনয় করতে করতে বলল,
“ইসস কি বেলাজ্জা মেয়ে মানুষ! সর চুন্নি, নজর দেওয়া বন্ধ কর। কালো হয়ে যাবো!”
“উহু, নজর তো আমি দিবই।”
বলেই প্রণয়ের পায়ের পাতায় ভর দিয়ে উঁচু হয়ে দাঁড়াল প্রিয়তা। তোয়ালে ছেড়ে প্রণয়ের চুল টেনে ধরল দুই হাতে।
প্রিয়তার উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে মাথা পিছন দিকে এলিয়ে দিল প্রণয়। আর্তনাদ করে বলল,
“চুন্নি তুই আমার দেহ পাবি কিন্তু মন পাবি না!”
প্রিয়তা বিরক্ত হয়ে আবার জেল সেট করা চুলগুলো টেনে ধরে মাথা নিচু করল। ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দেওয়ার পূর্ণ মুহূর্তে নেশালো গলায় বলল,

“আমার দেহই চাই, মন দিয়ে কি আচার দেব?”
বলেই ওষ্ঠের ভাঁজে ওষ্ঠ মিলিয়ে দিল প্রিয়তা।
ঠোঁটে ঠোঁট পড়তেই সারা শরীর ঝঙ্কার দিয়ে উঠল দুজনের। যেমন ছ্যাত করে ওঠে গরম করাইতে পানি পড়লে। মৃদু ছন্দ উঠল প্রিয়তার অঙ্গে।
বলিষ্ঠ দুই হাতে প্রিয়তার বাঁকানো কোমর আকড়ে ধরল প্রণয়, চার আঙ্গুল দাবিয়ে দিল কোমরের ফর্সা চামড়ায়। ড্রাগের চেয়েও তীব্র নেশা হলহল করে ছড়াতে লাগল প্রণয়ের রক্তে। দুষ্টুমির মুহূর্তগুলো উন্মাদনার রূপ নিতে সময় নিল না।

ঠোঁট ছেড়ে প্রিয়তাকে ঘুরিয়ে নিজের জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিল প্রণয়, ড্রেসিং টেবিলের সাথে সজোরে চেপে আবারও পাগলের মতো হামলে পড়ল প্রিয়তার শিমুল ফুলের ন্যায় তুলতুলে অধরে।
প্রিয়তা দিশেহারা হয়ে পড়লো, নিঃশ্বাসের গতি অস্বাভাবিক ভয়াবহ। হাতের ধাক্কায় ড্রেসিং টেবিলের ওপর সজ্জিত সকল প্রসাধনী মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলল প্রণয়। কোমর আঁকড়ে ধরে তুলে বসাল টেবিলের ওপর। প্রিয়তা কাঁপছে, ঠোঁট ছিড়ে রক্ত বেরিয়ে এসেছে। রক্তিম ওষ্ঠ যুগল ফুলে উঠেছে ইতিমধ্যে। নিজের অবস্থা দেখে মনে মনে আফসোস করলো প্রিয়তা, সামান্য মজাতেও যে এই লোক ট্রিগার হয়ে যাবে কে জানত!
ঠোঁট ছেড়ে এলোমেলো নিঃশ্বাস ফেলছে প্রণয়। সে দুই সেকেন্ড কিছুই করল না, কেবল মাদকতা ডুবানো চোখে নেশাগ্রস্তের ন্যায় তাকিয়ে রইল প্রিয়তার সর্ব কায়াতে।
পুরুষের ছোঁয়া পেলে নারীর সৌন্দর্য ফোটে প্রস্ফুটিত ফুলের ন্যায়, তার লালিত সৌন্দর্য আবার সেই পুরুষের নিধনেই ব্যবহৃত হয়। কী আজব প্রকৃতি।

পুরুষের বিনাসে যেন এক পা এগিয়ে থাকে সর্বক্ষণ।
চোখ বন্ধ করে দ্রুত নিঃশ্বাস ফেলছে প্রিয়তা। ঠোঁট দুটো ফাঁক হয়ে আছে অভিন্যস্ত। ঘন ঘন নিঃশ্বাসের তালে উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ এর মতো ওঠানামা করছে তার আকর্ষণীয় বক্ষদেশ। দেখতে দেখতে পাগল হয়ে যায় প্রণয়। সুখ সুদা আহরণে এক প্রকার ঝাঁপিয়ে পড়ল প্রিয়তার নরম অস্তিত্বে।
আঁতকে উঠে প্রণয়ের পিঠ খামচে ধরল প্রিয়তা। আবেশের তরে চোখ বন্ধ হয়ে এলো আপনাআপনি। একের পর এক সংলগ্ন বেশামাল স্পর্শে তাকে দিশেহারা করে দিতে থাকল প্রণয়। উন্মাদনার একপর্যায় উরুতে গরম শক্তপোক্ত ধাঁচের কিছু একটার অস্তিত্ব অনুভব হতে লাগলো বারবার। এদিকে প্রণয়ের আদরের তীব্রতা ভীষণ রকম বাড়ছে, প্রিয়তার না চাইতেও অস্ফুট গুঙানি বেরিয়ে আসছে মুখ দিয়ে।
সুখের তাড়নায় বোধয় মৃত্যু হবে মেয়েটার।
সে প্রণয় ঘাড় চেপে ধরে খামচি দিতে থাকে।

উত্তেজনায় ছটফট করতে করতে আচমকা প্রিয়তার হাত ঠেকলো ভীষণ শক্ত, উত্তপ্ত কিছু একটায়। না দেখেই লাফিয়ে উঠলো প্রিয়তা। আঙ্গুলগুলো ছুঁয়ে গেলো অজান্তে, সাথে সাথে সাপের মতো ফস করে উঠলো প্রণয়। তার হাতের বাধন শক্ত হলো, ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে অস্ফুটে বেরোলো—
“আহ্ হোল্ড দিস সুইটহার্ট।”
শরীরের খেলায় মাতোয়ারা প্রিয়তার কোনো কথা কান দিয়ে যাচ্ছে না, ঘোরে আছে সে। কিন্তু গরম জিনিসটার ছাঁচ বারবার লাগাতে অনেকটা ঘোর কেটে গেল প্রিয়তার। বাধ্য হয়ে দৃষ্টি মেললো।
চোখ মেলতেই দৃশ্যপটে সর্বপ্রথম যেটা ভেসে উঠলো, সেটা দেখতেই গলার কাছে নিঃশ্বাস আটকে দম বন্ধ হয়ে এল প্রিয়তার। শরীর ঝাকুনি দিল। পা থেকে শিরশির করে কিছু একটা দৌড়ে উঠে গেল মাথায়। সে বুঝে গেল আজ আর তার রক্ষা নেই, কিন্তু কাল রাতের ব্যথায় শরীর পাকছে এখনো।
আতঙ্কে ঢোক গিলল প্রিয়তা। নাজুক দেহে আছড়ে পড়া লোকটার উন্মত্ত্ব বেসামাল শ্বাস-প্রশ্বাস অঙ্গ জ্বালিয়ে দিচ্ছে প্রিয়তার। সে ভয়ে ফের চোখ বুজে নিল। সাথে সাথেই কানের লতিতে উষ্ণ আদরের ছোয়া পেলো, শোনা গেল গভীর ফিচেল কণ্ঠ—

“আমার ছোঁয়ায় বিষ আছে জান, গিলে নে এই বিষ। তোকে মৃত্যু দেবে কিনা জানিনা, তবে সুখে পাগল করে দেবে নিশ্চিত।”
বুকের ভেতর মাধল বেজে উঠলো প্রিয়তার। কণ্ঠ শুনতেই ড্রেসিং টেবিল খামচে ধরল। প্রণয়কে এই মুহূর্তে ভীষণ দুর্বল। এই সময় দুর্বলতার শীর্ষে থাকে পুরুষ, প্রণয় ও তার ব্যতিক্রম নয়।
আর এই দুর্বলতার সুযোগ নিলো প্রিয়তা। দু হাত বুকে রেখে একটু জুড়ে ধাক্কা দিল। দুই হাত পিছিয়ে গেল প্রণয়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে নেশার সমুদ্রে ছুঁড়ে মেরে দৌড়ে পালালো প্রিয়তা।
এহেন কাণ্ডে বোকা বনে গেল প্রণয়। এমন পরিস্থিতিতে ছেড়ে গেলে কোনো পুরুষই সহ্য করতে পারে না। চরম সুখ পাওয়ার তাড়নায় শরীর আন্দোলন করে ওঠে, যা প্রণয়ের ওপর দেখা গেল আরও ভয়ঙ্করভাবে।
সে অস্থির কণ্ঠে পিছু ডাকল—

“জান, দাঁড়া বলছি, দাঁড়া না হলে!”
কিন্তু দাঁড়ালো না প্রিয়তা, জান হাতে নিয়ে পালালো। প্রণয়ও ছাড়ার পাত্র কোথায়? এক্ষুনি কাছে না পেলে হয় পাগল হয়ে যাবে নয় মরে যাবে। প্রণয় দ্রুত সোফার ওপর থাকা ট্রাউজার পরে খালি গায়েই পিছু নিল।
প্রিয়তা তিনতলার করিডোর পেরিয়ে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে চারতলায় উঠে গেল। হাসতে হাসতে দৌড়াচ্ছে প্রিয়তা, তার পিছন পিছন প্রণয়। প্রিয়তা আত্মরক্ষার্থে দৌড়ে চারতলার শেষ মাথায় প্রেমের আর্ট গ্যালারিতে ঢুকে পড়ল। দরজা বন্ধ করে দেওয়ার পূর্বেই দুটো বলিষ্ঠ হাত বলপূর্বক চেপে ধরল দরজা।
তার শরীর জ্বলছে, চোখ দুটোতে উপচে পড়ছে কামনার জোয়ার। প্রিয়তা ঢোক গিলে ভয়ার্ত চোখে তাকালো।
প্রণয় দ্রুত নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে প্রিয়তার বাঁকানো কোমর আঁকড়ে ধরে নিজের দিকে হ্যাঁচকা টান দিল। সাথে সাথেই হুড়মুড় করে বুকের ওপর আছড়ে পড়ল প্রিয়তা।
শরীরের সাথে শরীর চিপকে গেল চুম্বকের মতো। তলপেটের সাথে আবার সজোরে ধাক্কা লাগল সেই শক্তপোক্ত জিনিসটা।

চোখ বন্ধ করে ফেলল প্রিয়তা, সে নিশ্চিত আর নিস্তার নেই। ভেতরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল প্রণয়। পাগলামির শীর্ষে থাকা প্রণয় বা প্রিয়তা লক্ষ্যই করল না, কেউ একজন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল তাদের দিকে।
পুরো গ্যালারি জুড়ে অগুনতি স্কেচ, পেইন্টিং, ক্যানভাস, ব্রাশ, প্লেট পেইন্টিং কালার, অয়েল কালার, অ্যাক্রিলিক কালার, অন্যান্য টুলস—আরও কত কিছু। তবে প্রেম বা ঊষা কেউ নেই। গ্যালারি পুরো ফাঁকা দেখে মনে মনে ভীষণ খুশি হলো প্রণয়।
এক টানে প্রিয়তার টি-শার্ট খুলে ফেলতে ফেলতে বলল—
“মাঠ পুরো ফাঁকা জান।”
“আজ মনের মতো আঁকবো আমি তোর শরীরের ক্যানভাসে।”
বলে প্রিয়তার পালকের ন্যায় শরীরটা তুলে টুলের ওপর চেপে বসাল প্রণয়। তার কালচে লাল ঠোঁট দুটো যেন নিষিদ্ধ কোনো শরাবের পেয়ালা, প্রিয়তার ধবধবে ফর্সা শরীরের মুখ ডুবিয়ে দিল প্রণয়।
কালো ব্রা-এর স্টিচ খুলতে খুলতে চোখ রাঙিয়ে বলল—
“এবার যদি একটুও ডিস্টার্ব করেছিস তো…”
“তো?”
“জানের মায়া কী ছেড়ে দিছিস?”

কথা বলতে বলতে দুটো তৃষ্ণার্ত শরীর আদিম মিলনের খেলায় মত্ত হয়ে উঠলো। মত্ত হলো প্রিয় নেশায়। নরম ব্যথাযুক্ত আদরে ভরিয়ে দিতে থাকল প্রিয়তমাকে, তবে আস্তে ধীরে যত্ন করে সন্তর্পণে। প্রিয়তার সাথে কখনোই উগ্র আচরণ করে না প্রণয়; চরম থেকে চরম মুহূর্তেও নিজেকে কন্ট্রোল করে।
সীমা ছাড়ানো ভালোবাসার কিছুটা মধুর সময় অতিবাহিত হতেই পাগলামি বাড়লো। টুলটা কমফোর্টেবল না হওয়ায় ঠিকঠাক আরাম পাচ্ছে না প্রণয়। চাপা বিরক্তি নিয়ে নেশায় বুঁদ হয়ে বলল—
“আহ্ ধুর! এখান থেকে নাম, মেঝেতে আয় জান।”
প্রিয়তাও বাধ্য মেয়ের মতো টুল থেকে নেমে মেঝেতে চলে গেল। তাদের তুমুল তাণ্ডবে এদিক-সেদিক ধাক্কা লাগাতে ঠাস ঠাস করে আশেপাশের রঙের কৌটো গুলো পাল্টে ফ্লোরে পড়ছে মেঝেতে। কাচের কৌটো চূর্ণ হয়ে রং ছড়িয়ে যাচ্ছে মেঝেতে। ছিটকে লাগছে তাদের শরীরেও—তবে এতে কোনো হুঁশ নেই দুজনের।
প্রিয়তা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে প্রণয়ের পিঠ। প্রণয়ের ললাটে জমা হয়েছে বিন্দু বিন্দু মুক্ত।
প্রিয়তা সহ্য করতে না পেরে অবিরাম ঘাড়ে, গলায়, বাহুতে কামড় বসাচ্ছে—রক্তাক্ত করে দিচ্ছে তার প্রিয় পুরুষকে। প্রণয় কিছুই বলছে না।

প্রায় ২০ মিনিট পর হঠাৎ দরজায় করাঘাতের শব্দ হলো। বাইরে থেকে প্রেমের কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে—
“ভেতরে কে? দরজা খোলো।”
ভাইয়ের কণ্ঠ শুনেও না শোনার ভান করল প্রণয়। সম্পূর্ণ ইগনোর করে গেল। পাগলামিতে একটুও লাগাম টানল না; বরং আরও গভীরে, তীব্র থেকে তীব্রতর আদরের চাদরে মুড়িয়ে নিল প্রিয়তাকে—যেন দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্য এক জগতে বিচরণ করছে সে। দুনিয়ার সমস্ত শব্দ ছুড়ে ফেলেছে দরজার ওপারে।
মেঝেতে বিসর্জিত লাল রঙে আঙুল ডুবালো প্রণয়, প্রিয়তার উদরের শুভ্র ক্যানভাসে আলতো করে লেপ্টে দিল।
তাদের জামাকাপড় কোথায় তারা নিজেরাও জানে না। এদিকে প্রেমের দরজা ধাক্কানোর শব্দ বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। আরও ১৫ মিনিট পর থামল প্রণয়। সেই তীব্র কাঙ্ক্ষিত আনন্দের মুহূর্তে পৌঁছালো দুজন। নিজের উত্তপ্ত ভালোবাসার সবটুকু প্রিয়তার মধ্যে ঢেলে দিল প্রণয়। আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল।

প্রিয়তার অবস্থা নাজেহাল, তার অবস্থাও ভালো না। দুজনেই আঁচড়, কামড়ের সাথে সাথে রঙে মাখামাখি। দ্রুত নিশ্বাস ফেলছে প্রিয়তা, শরীর কাঁপছে এখনো। প্রণয়ের বুকের উষ্ণতায় লেপ্টে আছে এমনভাবে যেন সে এই দেহেরই অংশ—বাহিরের কেউ নয়।
কিছুক্ষণ সময় নিয়ে স্বাভাবিক হলো প্রিয়তা। লজ্জায় মরে যাচ্ছে সে। এই অবস্থায় কিছুতেই প্রেমের সামনে যেতে পারবে না।

কার্যক্রম শেষ করে প্রিয়তাকে বুকে টেনে নিল প্রণয়। বরাবরের মতো এবারও ললাটে দীর্ঘ চুম্বন আঁকল। চরম তৃপ্তিতে বুকের সাথে জড়িয়ে রাখল কিছুক্ষণ। অতঃপর নিজ হাতে আবারও জামা পরিয়ে দিল সযত্নে, নিজেও পরে নিল। তাদের দেখে স্পষ্টতই সব বোঝা যাচ্ছে, তবুও নির্বিকার প্রণয় এগিয়ে গেল দরজা খুলতে।
হাত টেনে ধরল প্রিয়তা। দুই পাশে মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি জানাল।
গালে হাত রাখল প্রণয়, কপালে চুমু দিয়ে নিজের পিছনে লুকিয়ে নিল।
এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দিল প্রণয়। এক ঝাঁক ঝাড়ি দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল প্রেম, কিন্তু দরজা খুলতেই নিজের বড় ভাইকে এমন বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখে পেটের মধ্যেই সব কথা গুলিয়ে ফেলল।
প্রণয়ের পিছনে লম্বা চুল নড়াচড়া করতে দেখল প্রেম। দুজনের অবস্থা দেখে এক মুহূর্ত লাগল সবটা বুঝে যেতে। এবার কিছু বলা তো দূরের কথা, লজ্জায় চোখ তুলে তাকাতেও পারল না প্রেম; মাথা নিচু হয়ে গেল আপনাআপ। সে নিশ্চুপ হেসে দরজা ছেড়ে দাঁড়ালো।
প্রিয়তাকে আগলে বেরিয়ে গেল প্রণয়। মিটিমিটি হেসে ভেতরে চলে গেল প্রেম।
ওদের দুজনকে একসাথে এমন অবস্থায় দেখে প্রহেলিকার কলিজা চিরে ফালি ফালি হয়ে গেল নিমিষেই। সর্বাঙ্গ জ্বলে গেল অনিল যন্ত্রণায়।

গ্যালারি থেকে বেরিয়েই প্রিয়তাকে কোলে তুলে সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় নেমে গেল প্রণয়।
মুখে দুই হাত চেপে ঝরঝর করে কান্না করে দিল প্রহেলিকা। ভালোবাসার মানুষটাকে অন্য কারো সাথে দেখতে তার অন্তর পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে।
ভালোবাসার মানুষটা অন্য কারো সাথে সুখে আছে—এটা কল্পনা করার থেকে ভালোবাসার মানুষ অন্য কারও ভালোবাসায় জড়িয়ে আছে—এটা নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করার যন্ত্রণাটা মস্তিষ্কের শিরা ছিঁড়ে পাগল করে দিচ্ছে প্রহেলিকাকে।
মাটিতে লুটিয়ে প্রহেলিকার চিৎকার দিয়ে কাঁদতে মন চাচ্ছে। সে পাগলের মতো ছুটে কয়েক পা এগোতেই ধড়াম করে ধাক্কা খেল কারো সাথে।
বিরক্তিতে মুখ কুঁচকাল প্রিয়স্মিতা। বাহু ডলতে ডলতে মুখ বিকৃত করে বলল—
“মাথায় কি কুদরতি ঠান্ডা পড়েছে? এভাবে দৌড়াচ্ছ কেন?”
বলতে বলতে প্রহেলিকার পানে চোখ পড়তেই থেমে গেল প্রিয়স্মিতা। ভ্রু দুটির মাঝ বরাবর ভাঁজ পড়ল আপনা আপনি।

নিজেকে আর কন্ট্রোল করতে পারল না প্রহেলিকা। চিৎকার দিয়ে মুমূর্ষু কান্নায় ভেঙে পড়ল প্রিয়স্মিতার সামনেই। হাঁটু মুড়ে পড়ে গেল মেঝেতে। দুই হাতে মুখ চেপে নির্লজ্জ বিলাপ করতে লাগল পাগলের মতো।
ঘটনা বুঝতে বাকি রইল না প্রিয়স্মিতার। মনে কোণে কোথাও একটা সামান্য খারাপ লাগা অনুভূত হলো। একতরফা ভালোবাসার যে কী জ্বালা, সেটা প্রিয়স্মিতা বোঝে।
মনে খারাপ লাগা থাকলেও চোখ মুখ শক্ত করল প্রিয়স্মিতা। প্রহেলিকাকে বেশি দূর দুঃখ বিলাস করতে না দিয়ে আচমকা হাত ধরে টেনে হিঁচড়ে দাঁড় করালো।
কড়া গলায় বলল—

“ছি! এত বেহায়া হয়ে বেঁচে থাকার থেকে মরে যাওয়া ভালো। দেখছো, ওই লোকটা তোমাকে ভালোবাসে না।
প্রহেলিকার ঝাপসা চোখে তাকিয়ে আচমকা জড়িয়ে ধরে প্রিয়স্মিতাকে হেঁচকি তুলে বলল—
“আমি তো পারি না ভুলে যেতে আমার ভালোবাসাকে। আমি কিছুতেই ভুলতে পারি না, কিছুতেই পারি না। আমার খুব কষ্ট হয়। তুই তো অনেক কিছু পারিস, তাহলে পারবি না আমার ভালোবাসাকে পাইয়ে দিতে?”
আচমকা চেপে ধরায় প্রথমে ভড়কে গিয়েছিল প্রিয়স্মিতা, তবে এবার নিজেকে সামলে নিল।
প্রিয়স্মিতা শান্ত হয়ে বলল—
“কি করতে বলছো?”
“শুধু আমার প্রণয়কে পাইয়ে দাও।”
“এটা সম্ভব নয়। দেখো, ভালোবাসা ওভাবে পাওয়া যায় না। ভালোবাসা, ঘৃণা—এগুলো মনের ব্যাপার। এখানে ব্যক্তির নিজস্ব কোনো ভূমিকা নেই।”
“আমি ওসব কিছু বুঝি না। আমি শুধু আর এগুলো সহ্য করতে পারছি না। প্লিজ, যা হোক কিছু করো।”
“শুধু কী?”
“শুধু আমার প্রণয়কে চাই।”
“প্রণয় তোমাকে চায় না।”

“তবুও আমি চাই। ভালো না বাসুক, মিথ্যা হোক, আগের মতো হোক—তবুও চাই।”
প্রিয়স্মিতা আর কিছু বলল না। কারণ একে বুঝিয়ে কোনো লাভ নেই। যাই বলো, এ বদ্ধ উন্মাদ কিছুই বুঝতে চাইবে না। আর তাছাড়া এসব হিজিবিজি ব্যাপারে তার কোনো ইন্টারেস্ট নেই। সে তো আগে থেকেই সব গুটি সাজিয়ে রেখেছে—শুধু সঠিক চালের অপেক্ষা।
তারপর ভেবে কুটিল হাসল প্রিয়স্মিতা।
প্রহেলিকার ফায়দা কতটা হবে সেটা নিয়ে যথেষ্ট সন্দিহান প্রিয়স্মিতা। তবে শিকদার প্রণয় যে পুরো ফিনিশ হয়ে যাবে—এটা পুরো নিশ্চিত।

সার্টিফিকেট ছাড়া ডাক্তার হিসেবে রাঙ্গামাটির এই ছোট্ট গ্রামে ভালোই নামডাক অর্জন করেছে আবির্ভাব। সে চায় না লোকের ভিড়ে হাইলাইট হতে, তবুও হয়ে গেছে। চেয়েও নিজের আসল সত্তা গোপন করতে পারেনি। তার দেওয়া মানসিক থেরাপিতে অনেক অসুস্থ ব্যক্তি উপশম পেয়েছে।
সকলের মতামত—সে একজন দক্ষ ও উন্নতমানের ডক্টর হওয়ার যোগ্যতা রাখে।
বাড়িওয়ালার মেয়ের অবস্থাও আগের থেকে অনেকটা বেটার। দীর্ঘ অনেকগুলো বছর যে মেয়েটা বদ্ধ উন্মাদ ছিল, সেই মেয়েটাকেই ধীরে ধীরে সুস্থতার দিকে এগিয়ে যেতে দেখে সাধারণ মানুষের মনে বিশ্বাস জেগে গেছে। এখন প্রায়শই অনেক মানুষ আসে তাদের মানসিকভাবে অসুস্থ আপনজনদের নিয়ে। আবির্ভাব অসহায় গরীব মানুষগুলোকে চেয়েও না করতে পারে না।
অবশ্য এটা নিয়ে শ্বেতার দুশ্চিন্তার শেষ নেই। সে খুব ভালো মতো জানে—এভাবে চলতে থাকলে তাদের ধরা পড়ে যাওয়া খুব নিকটে। কেউ ঠেকাতে পারবে না। তার আগেই তাদের এখান থেকে পালাতে হবে। কিন্তু কীভাবে?
জমানো টাকা-পয়সা সবই শেষ হয়ে গেছে। এখন দিন এনে দিন খেতে হয় তাদের।
সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মানো আবির্ভাব—যে কিনা কখনো স্টেথোস্কোপ ধরা ছাড়া অন্য কোনো কাজ জানত না—তাকে এখন দিনমজুরি করতে হয়। অবশ্য এতেও বেশ সন্তুষ্ট আবির্ভাব। সৃষ্টিকর্তার উপর বিন্দুমাত্র অভিযোগ নেই।
সে সর্বক্ষণ প্রার্থনা করে—

তার জীবনে যদি আরও দুর্ভোগ আসে আসুক, যতই পরীক্ষা দিতে হোক—সে সবকিছুর জন্য প্রস্তুত আছে। কিন্তু তার ভালোবাসাকে কোনো মতেই ছাড়তে প্রস্তুত নয়। মেয়েটা এখন রক্তে মিশে গেছে।
সে খুব করে চায়—এমন করেই বাকিটা জীবন পার করে দিতে, আর যেন কোনো ঝড়-ঝাপটা না আসে। কত মানুষই তো দিনমজুরি করে খায়, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তপ্ত রোদ্দুরে খেটে খুটে সারাদিনে একবার খায়, অথচ তারাও জীবনে কতটা সুখী।
আসলে সুখ-শান্তি মনের ব্যাপার। টাকা-পয়সা তো বিলাসিতা। মনে সুখ থাকলে কোনো কষ্টই গায়ে লাগে না। এদিক থেকে বলতে গেলে—হ্যাঁ, খুবই সুখে আছে আবির্ভাব।
শরীরটা আজকাল বেশ খারাপ যায় শ্বেতার। কেন কে জানে—কোনো খাবারই মুখে রুচতে চায় না। মাঝে মাঝে কোমর আর তলপেট জুড়ে ভীষণ ব্যথা করে। সামান্য গন্ধেও শরীর গুলিয়ে বমি পায়।
নিজের অসুস্থতা কোনোরকমে চেপে রেখেছে শ্বেতা। সে এখন নিজের অসুখের কথা শুনিয়ে আলাদা ঝামেলা বয়ে আনতে চায় না।

বাড়ির পেছনের ছোট্ট পুকুরপাড়ে বসে মাছ পরিষ্কার করছে শ্বেতা। কী আশ্চর্য—আজকাল মাছ-মাংসের গন্ধেও বমি আসে। কিন্তু আবির্ভাব আবার নিরামিষ পড়তে ভাত মুখে তুলতে চায় না।
শ্বাস আটকে রুই মাছের মাথা পরিষ্কার করছে শ্বেতা। ফুলকা সরিয়ে কানকো ছিঁড়তে তার জান বেরিয়ে যাচ্ছে। মাছটা বেশ পাকা, তাই এত শক্ত।
শ্বেতাকে পুকুরপাড়ে বসে থাকতে দেখে বাড়িওয়ালার স্ত্রী গরুর মাংসের লাল গামলা নিয়ে পাশে এসে বসলেন।
ভদ্রমহিলা বউটার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন—
“এই বউ, পাশের বাড়িতে গরু জবাই দিছে। তোর চাচা দুই কেজি মাংস নিয়ে এসেছে। এক কেজি নিয়ে যাস।”
উনার কথা শুনে চোখ বড় বড় করে ফেলল শ্বেতা। মনে মনে আওড়ালো—
“গরুর মাংস!”
বাড়িওয়ালার স্ত্রী পুনরায় বললেন—
“তোর চোখ এত শুকনো কেনলো বউ? মাংস কি আমি ধুয়ে পরিষ্কার করে দেব?”
শ্বেতা হাসার চেষ্টা করল। সাবধানে কথা কাটিয়ে বলল—
“ওই শরীরটা একটু খারাপ লাগছিল চাচি, এমনি ঠিক আছি। কিন্তু গরুর মাংস আমি আগে খেতাম, কিন্তু এখন অ্যালার্জি হয়ে গেছে। আর উনি তো মাংসই খান না।”
ভদ্রমহিলার হাসি হাসি মুখটা মলিন হয়ে গেল। তিনি মন খারাপ করে বললেন—

“সত্যি তোরা খাবি না?”
শ্বেতা দুপাশে মাথা নাড়িয়ে বলল—
“না চাচি, গা দিয়ে লাল লাল র‍্যাশ বের হয়।”
ভদ্রমহিলা আর কী বলবেন।
অসাবধানতায় হাতটা নাকের কাছে নিতেই হুট করেই আবার গা গুলিয়ে এল শ্বেতার। মেয়েটা অস্থির হয়ে গেল মুহূর্তেই। গড় গড় করে বমি করে দিল।
বাড়িওয়ালি চাচি আচমকা এহেন কাণ্ডে হকচকিয়ে গেলেন। গামলা ফেলে ছুটলেন উন্দাল ঘরে। জগে করে পানি নিয়ে আসলেন। পাশে বসে পিঠে মালিশ করতে করতে স্নেহমাখা কণ্ঠে বললেন—
“জোরে জোরে শ্বাস নে লো মা।”
শ্বেতার বমি করতে করতে অবস্থা কাহিল।
বাড়িওয়ালি চাচি মাথায়-পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে পানি খাইয়ে দিলেন।
“আহা, আস্তে আস্তে খা।”

শ্বেতা কিছুটা পানি খেয়ে শান্ত হলো।
চোখের কোনে পানি চলে এসেছে, এখনো গা গুলাচ্ছে।
বাড়িওয়ালি চাচি হাতের তালুতে পানি নিয়ে শ্বেতার চোখ-মুখ মুছে দিলেন। জহুরি চোখে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে সন্দিহান কণ্ঠে বললেন—
“তোর সব কিছুর গন্ধেই বমি আসে বউ?”
শ্বেতা উপর-নিচ মাথা দুলিয়ে নিচু কণ্ঠে বলল—
“জ্বী।”
“খাইতে পারস?”
“জ্বী না।”
“তোর শেষ শরীল খারাপ কবে হইছে?”

এমন প্রশ্নে প্রথমে কিছুটা বিব্রত বোধ করল শ্বেতা। মিনমিনে গলায় বলল—
“হয়নি অনেক দিন। ঠিক হিসেব করিনি। হবে হয়তো ৩-৪ মাস।”
বাড়িওয়ালি চাচি চোখ বড় করে ফেললেন মেয়েটার কথায়।
নিজের মাথায় হাত দিয়ে বললেন—
“এই মাইয়া এগুলা কী কও হ্যা? তুমি কি এখনো ছোট আছো? তোমার এত দিন শরীল খারাপ হয় না, তারপরও তুমি কিছু বুঝো নাহ্?”
শ্বেতা কিছুটা বিস্ময় নিয়ে বলল—
“কী বুঝব? আমার তো প্রায়শই ২-৩ মাস পিরিয়ড অফ থাকে, এর আর বড় কী?”
“আগের সময় আর এখনকার সময় কি এক আছে লো মেয়ে? তুমি কী জানো তুমি যে পোয়াতি!”
ভদ্রমহিলার কথায় শরীরের পশম দাঁড়িয়ে গেল শ্বেতার। মাথার ওপর পৃথিবীটা যেন চক্কর দিয়ে উঠল। ফট করে চোখ তুলে তাকাল উনার দিকে।
তিনি ফের বললেন—

“দেখো বউ, এই চোখ তো আর ভুল বলছে না। তবুও নিশ্চিত হতে ওই যে দোকানে কী সব পাওয়া যায়, ওগুলো এনে পরীক্ষা করে দেখো। আশা করি আমি যা বলছি তাই সত্য।”
উনার কথা কান দিয়ে ঢুকল না শ্বেতার। ভেতরটা কেঁপে উঠল অজানা ভয়ে। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল যেন মুহূর্তেই।
এই কথা যদি সত্যি হয়, তখন কী করবে শ্বেতা? কী জবাব দেবে আবির্ভাবকে? যে সে এতটা কেয়ারলেস—আর ভাবতে পারল না শ্বেতা।
তাদের নিজেদের জীবনেরই তো কোনো নিশ্চয়তা নেই। তার মধ্যে… কী করে হলো এটা?
মেয়েটাকে ভাবনার সাগরে তলিয়ে যেতে দেখে কাঁধে হাত রাখলেন বাড়িওয়ালি চাচি। চকিতে তাকাল শ্বেতা। সে খুশি হবে নাকি দুঃখ পাবে—ঠিক বুঝতে পারছে না।
শ্বেতা রান্নাবান্না শেষ করে বাড়িওয়ালি চাচির কথামতো ফার্মেসি থেকে একটা প্রেগন্যান্সি কিট এনে টেস্ট করল।
রেজাল্ট দেখে হাত-পা অবশ হয়ে এলো শ্বেতার। কিটটায় স্পষ্ট দুটো লাল দাগ। স্তব্ধ সে—তার মানে সত্যি সত্যি প্রেগন্যান্ট।

মায়াবী চোখ দুটো টলমল করে উঠল শ্বেতার। আপনা-আপনি হাত চলে গেল পেটে।
এ কোন নরকে সে তার নিষ্পাপ বাচ্চাটাকে ফেলতে চলেছে!
আচমকা মুখ চেপে ফুঁপিয়ে উঠল শ্বেতা। বিড়বিড় করে বলল—
“এই পরিবেশ তো তোমার আসার জন্য উপযুক্ত নয়। তাহলে তুমি কেন এলে? এখন তোমাকে কীভাবে একটা সুস্থ জীবন, সুন্দর ভবিষ্যৎ দেবে বাবা-মা? যেখানে তাদের নিজেদের জীবনের কোনো গ্যারান্টি নেই।”
“আমাদের সর্বনাশা জীবনে কেন জড়ালে নিজেকে?”
মুখ চেপে ডুকরে উঠল শ্বেতা।
সাথে সাথেই দরজায় করাঘাত পড়ল।
বাহির থেকে শোনা যাচ্ছে আবির্ভাবের বিধ্বস্ত কণ্ঠস্বর—
“মাই লাভ!”

শ্বেতা তড়িৎ গতিতে চোখ-মুখ মুছে নিল। হাতে থাকা কিটটা দ্রুত লুকিয়ে ফেলল বিছানার তলে। চোখ-মুখ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে দরজার ছিটকিনি খুলে দিল।
সাথে সাথেই তাকে বুকের সাথে জাপটে ধরল আবির্ভাব। সমগ্র শরীরের ভার এলিয়ে দিয়ে বলল—
“তোমাকে ছেড়ে একটা মুহূর্তও দূরে থাকতে ভীষণ কষ্ট হয়, মাই লাভ। হিল মি।”
শ্বেতা পিঠ জড়িয়ে ধরে পুরুষালী বুক-মুখ গুঁজল। ঘর্মাক্ত শরীর থেকে ঘামের গন্ধ আসছে।
শ্বেতা মিনিট পাঁচেক জড়িয়ে থেকে বলল—
“হয়েছে, যান সরুন। গোসল করে আসুন, আমি খাবার দিচ্ছি।”
আরো টাইট করে আঁকড়ে ধরল আবির্ভাব। অভিমানী কণ্ঠে বলল—
“ইস্! খালি আমাকে তাড়ানোর পাঁয়তারা? আচ্ছা আমার সুখ কি সহ্য হয় না তোমার? দেখছ না, আমার অন্তরটা কেমন খাঁ খাঁ করছে তার মাই লাভের জন্য। নিষ্ঠুর পাষাণী রমণী তুমি—বুঝবে না এ হৃদয়ের যাতনা।”
“উহ, হয়েছে ঢং! এখন যান।”
বলে আবির্ভাবকে ঠেলে গোসল করতে পাঠিয়ে দিল।
আবির্ভাব ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে পরনের টিশার্ট খুলে ফেলল। শ্বেতা সাবান, গামছা আর লুঙ্গি হাতে দিয়ে বলল—

“যান।”
আবির্ভাব দুষ্টু হেসে হাত টেনে হেঁচকা টান দিয়ে কাছে নিয়ে এলো। দুষ্টু হেসে বলল—
“তুমিও চলো না।”
আশেপাশে তাকিয়ে বুকে ধাক্কা দিল শ্বেতা। বাড়িওয়ালার মেয়েটা কেমন কাতর চোখে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে।
শ্বেতা ঝাড়ি মেরে বলল—
“নির্লজ্জ পুরুষ মানুষ! এটা কি বাড়ি পাইছেন? আশেপাশে কত মানুষ আছে, ছাড়ুন। জান, গিয়ে গোসল করে নিন।”
বলে লুঙ্গিটা মুখে মেরে ভেতরে চলে গেল শ্বেতা।
গাড় চুলকে হাসল আবির্ভাব।
গোসলখানাটাও বাড়ির পেছন দিকে। চার কোণায় চারটা বাঁশের খুঁটি গেঁড়ে কালো পলিথিনে ঘেরা ছোট্ট একটা ঘর।
দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে আবির্ভাব চলে গেল গোসল দিতে। ঘামে ভেজা শরীরটা কেমন চটচট করছে।

চল্লিশ তলা ভবনের কনফারেন্স রুমের আলো নিভানো।
কেবল দেওয়ালে টানানো বিশাল প্রজেক্টরের আলোতে অন্ধকারাচ্ছন্ন আলো-আঁধারির রহস্যময় জগৎ তৈরি হয়েছে।
মিটিং শুরু হয়েছে আরও দেড় ঘণ্টা। সকলের মনোযোগ রুমের শেষ প্রান্তে আর প্রজেক্টরে।
নিজেদের সর্বোচ্চটা দিয়ে বেস্ট প্রেজেন্টেশন দেওয়ার চেষ্টা করছে এমপ্লয়ীরা।
সাদমান শিকদার, প্রণয় শিকদারসহ এসকে গ্রুপের সকল বোর্ড মেম্বাররা উপস্থিত।
ফরেনার ক্লায়েন্টদের চোখমুখে সন্তুষ্টির স্পষ্ট ছাপ দেখে হালকা হাসলো প্রণয়।
৪০ মিনিট যেতে না যেতেই বোর হচ্ছে সে।
এর মধ্যেই বাহির থেকে মৃদু সোরগোলের আওয়াজ পেলো প্রণয়।
চেয়ারটা পেছনদিকে এলিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো বাহিরে।
ট্রান্সপারেন্ট গ্লাস ডোরের বাইরে পিয়ন আর সিকিউরিটি গার্ড কী নিয়ে যেনো তর্কাতর্কি করছে। কথা কাটাকাটি করতে দেখতে পাচ্ছে প্রণয়, কিন্তু শুনতে পাচ্ছে না।
ভ্রু কুঁচকে ফেললো প্রণয়।

“ভেতরে যাওয়া যাবে না, গুরুত্বপূর্ণ মিটিং হচ্ছে।”
“কিন্তু স্যারের কাছে আমার যাওয়াটা খুব জরুরি।”
“ওসব শুনবো না। যত জরুরি কথা সব জমিয়ে রাখেন। মিটিং শেষ হলে যা বলার বলবেন।”
“কিন্তু—”
“বললাম না এখন নয়।”
পিয়ন অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো ভেতরে। প্রণয় ওদের দিকেই তাকিয়ে আছে।
বসকে এদিকে চেয়ে থাকতে দেখে পিয়ন খুশি হলো। ইশারায় কিছু একটা বললো, কিন্তু সঠিক বুঝতে পারলো না প্রণয়।
হাতের ইশারায় ভেতরে ডাকলো।
গার্ড আর কিছু বলতে পারলো না, দরজা খুলে দিল।
পিয়ন পা টিপে টিপে সাবধানে গিয়ে দাঁড়ালো প্রণয়ের পাশে। নিচু হয়ে কানে কানে বললো—
“স্যার, দুজন মহিলা বাইরে আপনাকে নিয়ে ভীষণ ঝামেলা বাঁধিয়ে দিয়েছে। তাদের জন্য টেনথ ফ্লোরের শান্তি বিঘ্নিত হচ্ছে স্যার। তাদের চুলচুলিতে এবার বুঝি হাতাহাতির পর্যায়ে। কি ভয়ঙ্কর দুই মহিলা।”
পিয়নের বর্ণনা শুনে কপালের ভাঁজ দৃঢ় হলো প্রণয়ের।
“কোন মহিলা?”
“আপনার দুজন।”
“হোয়াট রাবিশ!”

“মায়ের থেকে মাসির দরদ বেশি তাই না বড় আপু? আমার স্বামী আমি বুঝবো। তোমার তো অত মাথা ঘামানো দরকার নাই। একদম আমার স্বামী নিয়ে কাড়াকাড়ি করবে না।”
“একদম গায়ে পড়ে ঝামেলা করবি না প্রিয়। এতদিন কোথায় ছিলি? প্রতিদিন আমি খাবার নিয়ে আসতাম, তাই ও আমার আনা খাবারটাই খায়। আজও ও খাবে।”
“এতদিন আমার স্বামীর দেখাশোনা করার জন্য ধন্যবাদ। এখন আমি আছি, আমি দেখে নেবো।”
“এত স্বামী স্বামী করিস না, মানুষ সন্দেহ করবে।”
“তুমি করতে পারছ না বলে কি তোমার হিংসে হচ্ছে?”
“বেশি বলছিস।”
“তুমিও কম বলছো না।”
“দেখ, ঝামেলা করিস না। যা এখান থেকে। ও আমার আনা খাবারটাই খাবে।”
“না, উনি আমার রান্না করা খাবারটাই খাবে।”
“দেখ, একদম বাড়াবাড়ি করবি না।”
“তুইও বাড়াবাড়ি করিস না আপু। পথ ছাড়ো।”

পায়ে পা লাগিয়ে মিনিট বিশেক ঝগড়া করে যাচ্ছে প্রহেলিকা আর প্রিয়তা।
পুরো ১০ তলার সমস্ত স্টাফ জড়ো হয়ে গেছে প্রণয়ের কেবিনের সামনে।
তাদের চোখমুখে ঠিকরে পড়ছে বিস্ময়।
এই দুই রমণীকে তারা খুব ভালো মতোই চিনে, কিন্তু তাদের এই ইন্টারেস্টিং ঝগড়া দেখতে মন্দ লাগছে না।
তারা মুখ হাঁ করে একবার প্রহেলিকার কথা গিলছে, তো একবার প্রিয়তার।
দুজনের মধ্যে কেউই যেন হেরে যাওয়ার পাত্রী নয়।
প্রহেলিকা নাক সিটকে বললো—
“বাড়িতে রান্না করা অতিরিক্ত তেল মশলা যুক্ত খাবার আমার প্রণয় খাবে না। তোরটা তুই খা।”
নিজের বলে দাবি করাতে এবার প্রচন্ড রেগে গেল প্রিয়তা।
রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে বললো—
“আমার প্রণয় মানেটা কি হ্যাঁ? ভাষা সংযত করার কথা বল। উনি আমার, শুধু আমার। আর উনি কি খেলো তাতে তোমার কি? আমার জামাইকে দরকার হলে আমি বিষ রান্না করে খাওয়াবো, ও সেটাই খাবে। তোমার কোনো সমস্যা?”
প্রহেলিকাও রেগে গেল। চিবিয়ে চিবিয়ে বললো—

“তোর বিষ তুই খা, প্রণয়।”
আর কিছু বলার পূর্বেই পেছন থেকে ভারী আওয়াজে ধমক ভেসে এলো—
“কি হচ্ছে এখানে? এটা কি মাছের বাজার? সবাই এখানে এমন ভিড় জমিয়েছেন কেন?”
পরিচিত আওয়াজ শুনে চুপ হয়ে গেল দুজনে।
একসাথে পেছন ফিরে তাকালো।
পকেটে হাত ঢুকিয়ে ভ্রু কুচকে কিছুটা দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে প্রণয়।
তার বাঁকানো দৃষ্টি দুজনের ওপর নিক্ষিপ্ত।
সে পুনরায় বললো—
“এখানে কি সার্কাস চলছে? সার্কাস দেখার জন্য নিশ্চয়ই আপনাদেরকে স্যালারি দেওয়া হয় না।”
স্টাফদের উদ্দেশ্যে গম্ভীর কণ্ঠে বললো প্রণয়।
বসের ঝাড়ি শুনে সকলের উৎসাহিত মুখগুলো চুপসে গেল।
সকলে একত্রে মাথা নিচু করে নিলেন। এক সঙ্গে বললেন—

“সরি স্যার।”
“গো টু ওয়ার্ক।”
স্টাফরা মস্তক তুললেন না।
বিনা বাক্যে স্থান ত্যাগ করলেন।
“প্রণয় ভাই—”
আর কিছু বলতে পারলো না প্রিয়তার।
পলক ফেলার পূর্বেই গট গট পায়ে এগিয়ে এলো প্রণয়। প্রিয়তার হাতের কব্জি চেপে ধরলো, প্রশ্ন করার সুযোগ দিল না। টেনে নিজের কেবিনে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল।
আচমকা ঘটে যাওয়া কাণ্ডে হতভম্ব হয়ে গেল প্রহেলিকা।
এত দ্রুত ঘটনাটা ঘটল যে কিছু বুঝতেই পারল না।
কিন্তু কয়েক পল গড়াতেই ভারী চোখের পাতা দুটো পানিতে টইটুম্বুর হয়ে গেল।
ভীষণ কষ্ট লাগলো মনে।

অভিমানের পাল্লা ভারী হয়ে দু চোখের কার্নিশে বর্ষণ নামলো।
ঝাপসা চোখে তাকালো কেবিনের দিকে।
ফ্রন্ট দেয়াল থেকে দরজা—সব কাঁচের তৈরি।
বাইরে দাঁড়িয়ে অনায়াসেই ভেতরের সবটা স্পষ্ট দেখা যায়।
প্রণয়ের বলিষ্ঠ হাতের বাঁধন ছাড়িয়ে প্রথমেই টুপ করে একটা চুমু দিল প্রিয়তা।
খিলখিল করে হেসে উঠলো।
লাঞ্চ বক্সটা টেবিলের ওপর রেখে বসে পড়লো সিইও-র চেয়ারে।
প্রহেলিকা দু চোখ ভরে সেই বিষাক্ত দৃশ্যগুলো দেখছে।
কষ্টের সাথে রাগের মাত্রা বাড়ছে পাল্লা দিয়ে।
প্রণয় বুকে হাত গুঁজে চেয়ে চেয়ে দেখছে তার খরগোশের বাচ্চাটার কর্মকাণ্ড।
একে দেখার জন্য বুকের ভেতরটা ভীষণ উচাটন হচ্ছিল এতক্ষণ, এখন শান্তি লাগছে।
প্রিয়তা চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে রানীর মতো পা ঝুলিয়ে বসলো।
ত্রিভুজ আকৃতির পেপারওয়েট আঙুলের ফাঁকে ঘুরাতে ঘুরাতে উচ্ছ্বাসিত মুখাবয় স্থির করে প্রণয়কে নকল করার চেষ্টা করল।
গম্ভীর কণ্ঠে বললো—

“হুমম, মিস্টার আবরার শিকদার প্রণয়। আমি আপনার তৈরি ফাইলস আর প্রজেক্ট গুলো দেখেছি, ভালো লেগেছে। আমাদের কোম্পানির জন্য আপনি খুব ভালো একজন এমপ্লয়ী। আমি খুশি হয়েছি। সামনের মাস থেকে আপনার স্যালারি দ্বিগুণ করে দেব। গুড জব।”
হুকুম শুনে ঠোঁট কামড়ে ধরলো প্রণয়।
টেবিলের ওপর দু হাত রেখে প্রিয়তার দিকে কিছুটা ঝুঁকে এলো।
মুখের কাছে মুখ এনে ঘোর লাগা কণ্ঠে বললো—
“মালকিনকে খুশি করাই তো শ্রমিকের কাজ, ম্যাডাম। আর মালকিন খুশি হলে শ্রমিকের তো বকশিশ প্রাপ্য।”
চোখ পিটপিট করে মাথাটা পেছন দিকে সরিয়ে নিল প্রিয়তা।
দম আটকে কথাগুলো শুনছিল, ব্যাটার লক্ষণ ভালো না—যখন তখন হুটহাট কাছে চলে আসে।
হাত পা কাঁপছে তার, কিন্তু কাঁপাকাপিকে পাত্তা দিল না।
পুনরায় মুখে গাম্ভীর্য টেনে বললো—
“উহু, ভাবছিলাম আপনাকে বোনাস দিতাম। কিন্তু একটা সমস্যা হয়ে গেছে যে, মিস্টার শিকদার প্রণয়।”
ভ্রু কুটি করে তাকালো প্রণয়।
প্রিয়তা ফের বললো—

“দেখছেন আপনাকে দাঁড় করিয়ে কথা বলছি। বসুন বসুন।”
বলে সামনের চেয়ারে বসতে ইশারা করলো প্রিয়তা।
প্রণয়ও বিনা বাক্যে বসে পড়লো।
সে কয়েকশো কোটি টাকার ডিল ফেলে এখানে একটা পুচকু মেয়ের এমপ্লয়ী হয়ে বসে আছে।
প্রিয়তা মুখে কিঞ্চিৎ হতাশা ফুটিয়ে বললো—
“নিরাস আমি খুবই নিরাস, সাথে হতাশও। ভাবলাম আপনাকে বোনাস দিতাম, মিস্টার শিকদার প্রণয়। আপনার সব কিছুই ঠিকঠাক। আপনার স্কিল, কোয়ালিফিকেশন সবই ভালো। কিন্তু এত হ্যান্ডসাম এমপ্লয়ী তো আমি কোম্পানিতে রাখবো না। ইটস টু রিস্কি।”
সিদ্ধান্ত শুনে চোখ মুখে অসহায়ত্ব ফুটিয়ে তুললো প্রণয়।
ব্যাথিত কন্ঠে বললো—

“তাহলে আমার কি চাকরিটা চলে যাবে, ম্যাডাম? এই চাকরি গেলে আমি আমার বউকে খাওয়াবো কি?”
“হোয়াট! আপনি বিবাহিত?”
চেঁচিয়ে বললো প্রিয়তা।
“ইয়েস ম্যাডাম।”
“তাহলে তো আর আপনাকে রাখাই যাবে না। বিবাহিত ব্যাটারা সারাদিন বউয়ের চিন্তায় ডুবে থাকে, কাজে মন দেয় না।”
“আচ্ছা, এই কোম্পানিটা কি আপনার ম্যাডাম? বেয়াদবি নেবেন না, জানতে ইচ্ছে হলো।”
প্রিয়তা গর্ব করে বলল—
“হ্যাঁ হ্যাঁ, দেখতে গেলে আমারই এটা। আমার বাপের কোম্পানি, ভাইয়ের কোম্পানি, জামাইয়ের কোম্পানি। ইনফ্যাক্ট আমার হাজবেন্ডের তো এর থেকে ও বড় কোম্পানি আছে। আপনার লাগলে বলবেন, আমি আমার হাজবেন্ডের সাথে কথা বলে আপনার চাকরি ব্যবস্থা করে দেব। শর্ত একটাই—মেয়েদের সাথে টাংকি মারা যাবে না।”
“ওহ্ আচ্ছা, বিরাট বড়লোকি ব্যাপার স্যাপর।”

প্রণয় আর কিছু বলবে, তার আগেই কেবিনের ল্যান্ডলাইনে ফোন এলো।
এমন সময় বিরক্ত করাতে ভীষণ চেতে গেল প্রণয়।
কট করে কেটে দিল ফোনটা।
হঠাৎ করে কিছু মনে পড়াতে গাল ফুলিয়ে ফেলল প্রিয়তা। লাঞ্চ বক্স ওপেন করতে করতে অভিমানী গলায় বললো—
“ওই চুন্নি আপনাকে রোজ রোজ খাবার এনে দেয়, আর আপনি সেটা খান?”
প্রণয় শান্ত থেকে জবাব দিল—
“হ্যাঁ, অফিস থেকে তো সবাইকেই লাঞ্চ প্রোভাইড করা হয়। তো এনে দেয় আরকি। আর তাছাড়া ওসব খাবারে কি আমার হয় নাকি? সেই তো বাড়ি গিয়ে তোমাকেই খেতে হয়।”
“একদম কথা ঘুরাবেন না।”
বলতে বলতে প্লেটে ভাত, ডাল, সবজি, তরকারি বেড়ে দিল প্রিয়তা।
প্রণয় বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়লো। একটা চেয়ার টেনে প্রিয়তার পাশে নিয়ে গিয়ে বসে পড়লো।
প্রিয়তার চেয়ারের হাতা টেনে একদম কাছে নিয়ে এলো নিজের। প্রিয়তার তুলতুলে গালে হাত রেখে আদুরে গলায় বললো—

“আমি কথা ঘুরাই না। তুই তো আমায় কোনোদিন বারণ করিসনি। আমি কিভাবে জানবো তোর এত হিংসে হবে?”
প্রিয়তা নাক টানলো। মনে মনে হাসলো।
প্রণয় প্রিয়তার নাকের সাথে নাক ঘষে বললো—
“খুব কী হিংসে হচ্ছে জান?”
“হুমম, খুব।”
মুখ কালো করে জবাব দিল প্রিয়তা।
“ওলে বাবারে, আমার বাচ্চাটা। আসো আদর করে দেই আমার হিংসুটে আহ্লাদী বউ।”
প্রিয়তা মুখ বাঁকালো।
প্রণয় নিজের উরুতে দেখিয়ে ইশারা করে বললো—
“এখানে আসো জান।”
অভিমান থাকলেও বিরোধিতা করলো না প্রিয়তা। চুপচাপ গিয়ে কোলের ওপর বসে পড়লো।
প্রণয় অন্ধকারাচ্ছন্ন মুখটা দেখে দীর্ঘনিশ্বাস ফেললো। কোমর চেপে ধরে কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে বলল—
“আচ্ছা, বউয়ের কথায় উঠবো, বউয়ের কথায় বসবো। সারাদিন বউয়ের আঁচল ধরে থাকবো। বউয়ের গোলাম হয়ে থাকবো। এবার খুশি?”

“তোর যাকে যাকে পছন্দ না, তার ছায়াও মাড়াবো না। এবার তো হাস।”
প্রিয়তা ঘাড় ঘুরিয়ে মুখের পানে তাকিয়ে বললো—
“সত্যি বলছেন?”
“হুম হুম, সত্যি। তিন সত্যি।”
মুখে হাসি ফুটে উঠলো প্রিয়তার। গলা জড়িয়ে ধরে কষে গালে দুটো চুমু খেলো।
সাথে সাথেই পাতলা দুটো লাল ঠোঁটের ছাপ বসে গেল প্রণয়ের গালে। প্রিয়তার ঠোঁট দুটো গ্লসি, তেলতেলে করছে।
প্রণয় গাল টেনে দিয়ে বললো—
“এবার এই অধমের কপালে খাবার জুটবে?”
প্রিয়তা দ্রুত মাথা ঝাঁকালো। নিজ হাতে ভাত মাখিয়ে তুলে দিল প্রণয়ের মুখে।
ইলিশ মাছের ডিমটা ভেঙে মুখের সামনে তুলে বললো—
“হা করুন।”

প্রণয়ও তাই করলো।
“মজা হয়েছে?”
“হ্যাঁ, তুই তো অনেক মজা।”
“অসভ্য নির্লজ্জ লোক! আমার কথা বলিনি, খাবারটা কি মজা হয়েছে?”
“বলতে পারবো না। কিন্তু নিজেকে মহাবিশ্বের সব থেকে সুখী মানুষটা মনে হচ্ছে।”
“বাট আই ক্রেভ মাই ফ্রেশ প্রোটিন।”
“ছিঃ!”
“এই তুই ছিঃ বললি কেনো?”
প্রিয়তার ভাবলেশহীন জবাব—

“যে কল চাপলে পানি বের হয় না, সে কলের পানি দিয়ে তৃষ্ণা মেটানো মানে পাগলের মনের সুখ হুহ।”
“চাপার মতো হাতে জোর থাকলে আর কলের প্রতি ভালোবাসা থাকলে পানি এক না একদিন ঠিক আসবে।”
“ছিঃ ছিঃ! আপনাকে ভালো করা আমার কর্ম নয়। চাপুন আপনার কল, দেখুন পানি আসে কিনা।”
বলে আরেক লোকমা খাবার তুলে দিল প্রিয়তা।
প্রণয় আঙুল চেটেপুটে নিচ্ছে।
প্রিয়তা ভীষণ তৃপ্তি পেলো তার প্রাণ পুরুষকে খাইয়ে দিতে পেরে। প্রণয়ের চোখ-মুখেও ফুটে উঠেছে তীব্র সন্তুষ্টির ছাপ।

দুজন সুখী মানুষ—যাদের চোখ-মুখের উজ্জ্বলতাই বলে দেয় যে তারা কতটা সুখী।
প্রহেলিকা আর দেখতে পারলো না। দৌড়ে চলে গেল সেখান থেকে।
প্রণয় খাবার শেষ করে তৃপ্তির ঢেকুর তুললো।
প্রিয়তার ওড়নায় মুখ মুছে বললো—
“প্রিন্সেস, আই এম হাংরি।”
প্রিয়তার যেন শক লাগলো! চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বললো—
“এ মাত্রই না আপনি ৪৫০ গ্রাম ভাতের সাথে ২৫০ গ্রাম তরকারি খেলেন!”
“বাহ্! তুই মেপে নিয়ে এসেছিস?”
“জ্বী না, ওই লাঞ্চ বক্সের অ্যাবিলিটিই অতটুক।”
“প্রিন্সেস!”
“এই এই এই, কি চাই আপনার? এমন করছেন কেনো? আপনার মতলব কিন্তু আমার ভালো ঠেকছে না।”
প্রণয়ের কণ্ঠে নেশা—
“উফ! এমনিতে ও আমার মতলব কখনোই ভালো থাকে না জান। আমার খিদে পেয়েছে। আই ওয়ান্ট টু ইট ডেজার্ট।”

কথা শুনে লাফ দিয়ে কোল থেকে উঠে পড়লো প্রিয়তা। ভয়ার্ত কণ্ঠে বললো—
“একদম এগোবেন না।”
বাঁকা হাসলো প্রণয়। সেও বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়লো। এক পা, দু পা করে পেছাতে পেছাতে গ্লাসের সাথে লেগে গেল প্রিয়তা।
প্রণয় পকেটে হাত গুঁজে ধীর কদমে এগোতে এগোতে কাছে এসে দাঁড়ালো। প্রিয়তার শরীরে ভাইব্রেশন মোড শুরু।
ঠোঁট কামড়ে হাসলো প্রণয়। কাঁচের দেয়ালের দুই পাশে হাত রেখে নিজের প্রিয়তমাকে বাহুবন্দিনী করলো। থিরথির করে কাঁপতে থাকা ঠোঁট দুটোর পানে ঘোর লাগা দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো কিছুক্ষণ।
প্রণয়ের নেশালো চাহনিতে শরীর শিরশির করতে শুরু করলো প্রিয়তার তনু শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে বললো—

“প্রণয় ভাই, এখানে না প্লিজ। কেউ দেখে ফেলবে।”
“উমমমম… শশশশশ!”
দেয়াল থেকে হাত সরিয়ে বাঁকানো কোমর পেঁচিয়ে ধরলো প্রণয়। হেঁচকা টান দিল, সাথে সাথেই বুকের ওপর হামলে পড়লো প্রিয়তা।
ঝুঁকে পড়ার তীব্রতায় চোখ-মুখ ঢেকে গেল দীঘল চুলে। বড় বড় আঙুল দ্বারা সামনে পড়া চুলগুলো পেছনে ঠেলে দিল প্রণয়।
থুতনিতে হাত রেখে অল্প কয়েকবার স্লাইড করলো গ্লসি ঠোঁট দুটোতে। তার উষ্ণ নিঃশ্বাসের ঝাপটা লাগছে প্রিয়তার গলায়-বুকে।
মোচড়ামুচড়ি শুরু করে দিলো প্রিয়তা। ছটফট করল কিছুক্ষণ, কিন্তু পুরুষালি শক্তির নিকট পরাস্ত হতে বাধ্য হলো শেষমেশ।
প্রণয় গভীর হ্যাস্কি কণ্ঠে বললো—

“তাহলে আমার ডেজার্ট খাই জান?”
প্রিয়তা লজ্জায় মাথা নিচু করে নিল। ছোট করে জবাব দিল—
“হুম।”
“গুড গার্ল।”
বলেই প্রিয়তার তুলতুলে ঠোঁট থেকে আঙুল সরিয়ে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিল প্রণয়। কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে নরম আদুরে স্পর্শগুলো যন্ত্রণা মেশানো সুখে পরিণত হতে লাগলো।
উন্মাদের মতো প্রিয়তাকে চেপে ধরে ঠোঁটে রাফ কিস করছে প্রণয়। প্রিয়তা চোখ বুজে প্রণয়ের ঘাড় খামচে ধরলো।
কয়েক মুহূর্ত যেতেই ছাড়ানোর জন্য ছটফট করে উঠলো প্রিয়তা। বুকে কিল-ঘুষি মারতে লাগলো একের পর এক, কিন্তু প্রণয়ের হুঁশ নেই; সে আউট অফ কন্ট্রোল। চরম নেশা চেপেছে মাথায়।
প্রিয়তার বাক্য অস্পষ্ট, এলোমেলো—

“ছাড়ুন প্রণয় ভাই… ও-ই ওদিকে!”
“ডোন্ট টক টু মাচ, বেবি গার্ল। জাস্ট ফিল মাই টাচ অ্যান্ড ফিল মাই লাভ।”
প্রণয় ঠোঁট ছেড়ে ধীর ধীরে নিচে নামতে শুরু করলো। শরীরের পুরুষালি হরমোনরা তাণ্ডব চালাচ্ছে।
গলা থেকে প্রিয়তার সাদা ওড়নাটা খুলে দূরে ছুঁড়ে মারলো প্রণয়। পাগলের মতো ডুবলো তার ব্যক্তিগত সাম্রাজ্যে—যে মায়াবী সাম্রাজ্যের সবটুকু সুখ ভোগ করার অধিকার কেবল তার।
প্রণয়ের অস্থিরতা কিছুতেই সামলাতে সমর্থ হচ্ছে না প্রিয়তা। তার চোখ আটকে আছে বাইরে, যেখান থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে কিছু এমপ্লয়ী এদিকে আসছে। ট্রান্সপারেন্ট গ্লাস—একবার চোখ তুলে তাকালেই দেখে ফেলবে!
“প্রণয় ভাই… ওউউউউ… আহহহহ প্রো…”

এমপ্লয়ীরা একদম কাছে চলে আসায় চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিল প্রিয়তা। খামছে ধরল প্রণয়কে।
প্রিয়তার নেশায় হারানো প্রণয় এক ফাঁকে রিমোট প্রেস করে দিল।
সাথে সাথেই ট্রান্সপারেন্ট স্মার্ট গ্লাস ব্লার হয়ে গেল। ভেতর থেকে বাহিরের দৃশ্য স্পষ্ট দেখা গেলেও বাহির থেকে ভেতরের সবটা অস্পষ্ট। এমপ্লয়ীরা অন্য দিকে চলে গেল।
প্রণয়কে ধাক্কা দিয়ে চেয়ারের ওপর বসিয়ে দিল প্রিয়তা।
প্রণয় অস্বাভাবিক কাঁপছে। তার নিঃশ্বাস বেগ বড্ড ভারী, এলোমেলো।
প্রণয় হেঁচকা টান দিয়ে প্রিয়তাকে নিজের ওপর বসালো। এবার তাল মেলালো প্রিয়তাও—মাথা খারাপ করে দিয়েছে লোকটা!
প্রণয়ের কালো ব্লেজার টেনেটুনে খুলে ফেললো প্রিয়তা। সাদা শার্টের ওপরের দিক থেকে বেশ কয়েকটা বোতাম খুলে দিয়ে পুরুষালি গলায় মুখ ডুবিয়ে দিল।

“উফফ মোর… মোর… মোর বেবি!”
দুজনের উন্মাদনা চরমে পৌঁছাতেই আবারো এক সাথে রুমের সব গুলো ফোন বেজে উঠলো। সাথে দরজায়ও টোকা পড়লো।
উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপছে দুজন।
পাগল পাগল লাগছে প্রণয়ের। রাগে রি-রি করে উঠলো মেজাজ। অসহায় চোখে তাকালো প্রিয়তার পানে।
অনাবৃত শরীরে হাঁপাচ্ছে মেয়েটা। দুই হাতে জাপটে ধরে রেখেছে প্রণয়কে।
দীর্ঘনিশ্বাস বেরিয়ে এলো প্রণয়ের বুক চিরে। প্রিয়তার কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো—
“তোকে অতৃপ্ত রাখতে কষ্ট হচ্ছে জান, কিন্তু সময় শেষ। এখন আমায় যেতেই হবে। বাকি আদরটুকু তুলে রাখিস রাতের জন্য।”

বলে প্রিয়তার ললাটে দীর্ঘ চুম্বন করলো প্রণয়। নাকে নাক ঘষলো।
তীব্র অনিচ্ছাতে উঠে যেতে নিলে হাত টেনে ধরলো প্রিয়তা। চোখ দুটো অসহায়—মনে হচ্ছে জ্বলন্ত উনুন থেকে কেউ এক টানে কাঠের টুকরা বের করে নিয়েছে।
বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলে প্রিয়তাকে কোলে তুলে নিল প্রণয়। বুকে আগলে নিজেদের জামাকাপড় গুলো কুড়িয়ে ঢুকে পড়লো ওয়াশরুমে।
প্রিয়তার চোখ-মুখে ঠান্ডা পানির ঝাপটা দিয়ে আবারো সুন্দর করে কাপড় পরিয়ে দিল। মেয়েটা এখনো কাপছে।
প্রণয় আদুরে গলায় বললো—
“গোসল করার মতো কিছুই হয়নি, তাই গোসল করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু রাতের জন্য রেডি থেকো, প্রিয়তমা।”
বলে চোখ টিপ দিল প্রণয়।
প্রিয়তা তীব্র লজ্জায় মুখ লুকালো প্রণয়ের বুকে।
প্রণয়ও উপরের বোতাম কটা লাগিয়ে ব্লেজার পরে নিল। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো দুজন।
এখনো ফোন বাজছে।
প্রণয় তীব্র বিরক্তি নিয়ে ফোন তুললো। ওপারের ব্যক্তিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বললো—

“আসছি। আর একবার ফোন দিলে খবর আছে।”
বলে খট করে ফোন কেটে দিল প্রণয়।
প্রিয়তাকে আবার নিয়ে নিজের চেয়ারে বসালো।
জাভেদকে ফোন দিয়ে দ্রুত বললো,
“আমার কার্ডটা নিয়ে যাও আর পাশের শপ থেকে কিছু কেক, পেস্ট্রি আর চকলেট নিয়ে আসো।”
বলে ফোন কেটে দিল প্রণয়।
৫ সেকেন্ডের মাথায় হুরমুর করে ক্যাবিনে প্রবেশ করলো জাভেদ। প্রণয় ওয়ালেট থেকে কার্ড বের করে জাভেদের হাতে দিল। সেটা নিয়ে চলে গেল জাভেদ।
প্রণয় চেয়ারের দুই পাশে হাত রেখে আবারো সময় নিয়ে চুমু খেল প্রিয়তার ললাটে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে নরম গলায় বললো,

“আমি যাই জান, মাত্র ২-৩ ঘণ্টা লাগবে।
যেটা চাই জাভেদকে বলবি, এনে দেবে।”
প্রিয়তা মাথা ঝাঁকালো।
“আমি যাচ্ছি।”
“হুম।”
ভ্রু কুঁচকালো প্রণয়।
“শুধু হুম?”
“তাহলে কি?”
“আমি যে এত গুলো আদর দিলাম, আমার বুঝি কিছুই পাওনা নেই?”
প্রিয়তা লজ্জা পেল। চোখ বন্ধ করে প্রণয়ের দুই গালে চুমু দিল।
“আসি জান, আমি না আসা পর্যন্ত তুই কিন্তু কোথাও যাবি না।”
বলে ক্যাবিন থেকে বেরিয়ে গেলেন শিকদার প্রণয়।
কিছুক্ষণ পর ঝুড়ি ভর্তি কেক, পেস্ট্রি আর চকলেট নিয়ে হাজির হলো জাভেদ। পাশে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে বললো,
“আর কিছু এনে দেবো ভাবী?”
প্রিয়তা ঝলমলে হাসি উপহার দিল। দুই পাশে মাথা নাড়িয়ে বললো,
“নাহ।”

প্রিয়তাকে হাসতে দেখে ভালো লাগলো জাভেদের। গলে গিয়ে বললো,
“আপনি অনেক ভালো ভাবী, কত সুন্দর করে হাসেন। অথচ স্যারকে কিছু বলতেই পারি না।”
“উনি ওমনি।”
তৎক্ষণাৎ জাভেদেরও ফোন এলো। বেরিয়ে গেল জাভেদও। প্রিয়তা পছন্দের চকলেটটা ছাড়িয়ে খেতে শুরু করলো।
মিনিট ২০ পার হতেই টুং টুং শব্দে ফোনে মেসেজ এলো। প্রিয়তা পায়ের ওপর পা তুলে ফেভারিট চকলেট পেস্ট্রি খেতে খেতে ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিনে প্রিয়স্মিতার নাম ভাসছে।
প্রিয়তা নোটিফিকেশনে ক্লিক করে হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকে দেখলো সেখানে বেশ কয়েকটা মেসেজ। মেসেজ গুলো এমন

“তুই যেখানে থাকিস যে অবস্থায় থাকিস, এক্ষুণি উদয় সরণির সামনে আয়।”
“জরুরি কথা আছে, খুব আর্জেন্ট।”
“এক্ষুণি মানে এক্ষুণি আয়। আমি অপেক্ষা করছি।”
মেসেজ গুলো দেখে কপাল কুঁচকে গেল প্রিয়তার। এত তাড়া কিসের? সে হোয়াটসঅ্যাপ থেকে বেরিয়ে প্রিয়স্মিতার নাম্বারে ফোন লাগালো। কিন্তু নাম্বারটা সুইচ অফ বলছে। প্রিয়তার মনে একটু অস্বস্তি আর একটু চিন্তার মিশেলে দোটানায় পড়ে গেল। সে কি প্রণয় ভাইকে না বলেই চলে যাবে? মানুষটা যদি রাগ করে?
প্রিয়তা দু-মিনিট ভেবে ও কোনো কূল পেল না। যেভাবে আর্জেন্ট বলছে, নিশ্চয়ই বড় কোনো দরকার। প্রিয়তা আর বেশি ভাবতে পারলো না।

প্রণয়ের বেরোতে ২-৩ ঘণ্টা লাগবে, তাই প্রিয়তা কাউকে কিছু না বলেই অফিস থেকে বেরিয়ে গেল। মনে মনে ভেবে রাখলো বাড়ি পৌঁছে ফোন করে জানিয়ে দেবে।
উদয় সরণির সামনে পর পর দাঁড়িয়ে আছে দুটো কালো জিপ। ভেতরে নারী পাচারকারী দালাল সন্তোষ আর তার সাঙ্গপাঙ্গ। এই সন্তোষই ASR তথা আবরার শিকদার প্রণয়ের নারী পাচার আর হিউম্যান ট্রাফিকিংয়ের অন্যতম সোর্স। এরাই হাজার হাজার নারী সাপ্লাই করে ASR এর কাছে। সাধারণ মেয়েদের ধরে নিয়ে বিক্রি করে দেয়।
এবার ASR এর অর্ডার আছে ২ দিনের মধ্যে এক হাজার মেয়ে লাগবে। তার তো শুধু অর্ডার করেই খালাস, আসল হেপা তো পোহাতে হয় সন্তোষকেই। বললেই হলো নাকি? মেয়ে কি গাছে ধরে নাকি রাস্তাঘাটে কুড়াতে পাওয়া যায় যে চাইলেই হাজির হয়ে যাবে? রাবিশ!
সন্তোষ দুই হাতে কপাল চেপে বসে আছে। তার সাগরেদ পলাশ বললো,

“ভাই এখনো ২০ টা মেয়ে বাকি আর সময় আজ সন্ধ্যায় শেষ। বস সময় মতো মাল না পেলে প্রচুর খেপে যাবে। ১০০০ মেয়ে রাশিয়াতে সাপ্লাই দেওয়া হবে, অ্যাডভান্স নেওয়া হয়ে গেছে। আজ সন্ধ্যার মধ্যে মেয়ে হাজির করতে না পারলে মাথা উড়িয়ে দেবে।”
মহা বিরক্ত হলো সন্তোষ।
“উফফ সরতো ঘ্যান ঘ্যান করিস না। দেখছিস চিন্তায় মরছি, তুই আবার কাটা গায়ে লবণের ছিটা দিস।”
“ভাট না বকে মেয়ে খুঁজ। আর ২০ বলিস কেন? মাত্রই তো দুটো গাড়িতে তুলে ফেলে রাখলাম।”
মাথা চুলকালো পলাশ।

“ওই আর কী ১৮ টা। বিদেশে বাঙালি মালের বহুত চাহিদা। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ১৮ টা মেয়ে জোগাড় করে ১০০০ এর মিল করতেই হবে।”
চিন্তায় মাথা ফেটে যাচ্ছে সন্তোষের। সে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালো। সাথে সাথেই হাত ধরে ঝাঁকি দিল পলাশ।
“ধুর শালা জ্বালাস কেন? দেখছিস না চিন্তায় আছি!”
“ভাই ওই দিকে দেখেন।”
“কোন দিকে?”
“ওই দিকে।”
বলে হাতের তর্জনী তুলে ইশারা করলো পলাশ।
সন্তোষ ভ্রু বাঁকিয়ে তাকালো ওদিকে। অপূর্ব সুন্দরী ও বেশ অল্প বয়সী একটা মেয়ে উদয় সরণির বিশাল স্ট্যাচুর ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে। দুপুরের ত্তপ্ত রোদে লাল হয়ে উঠেছে মেয়েটার ফর্সা মুখ।
সন্তোষ বাঁকা হাসলো পলাশের পানে চেয়ে। বললো,

“আরেকটা পাখি পেয়ে গেছি।”
“এটা নিবা? দেখো বড়লোক মনে হচ্ছে।”
“বড়লোক ছোটলোক দেখা আমাদের কাজ নয়। মালটা দেখ কি টসটসা খাশা একটা মাল। একদম অন্যরকম এসব মাল কি সহজে পাওয়া যায়?
এটা কিছুতেই হাতছাড়া করা যাবে না তাড়াতাড়ি তুল।
অন্য সব মাল এক দিকে আর এমন মাল এক দিকে। এই মালটা নিলামে তুললে ডাবল ডাবল প্রফিট হবে। বস ভীষণ খুশি হবে।”
“তাহলে তুলে আনি?”
“যা।”

পলাশ ছেলেদের ইশারা দিল। প্রিয়তার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে সিগারেট ধরালো সন্তোষ। তার নোংরা নজর ঘুরে ফিরে যাচ্ছে প্রিয়তার ফর্সা মাখনের শরীরে।
প্রিয়তা এই গরমে হাঁসফাঁস করছে। প্রচণ্ড বিরক্তির সাথে ক্ষিপ্ত সে প্রিয়স্মিতার ওপর। উদয় সরণির নিচে একের পর এক কল, টেক্সট দিয়ে যাচ্ছে প্রিয়স্মিতাকে, কিন্তু সেই মেয়েটির কোনো খবর নেই। অতিরিক্ত গরমে আর তেষ্টায় গলা শুকিয়ে কাঠ প্রিয়তার। পাশের ভ্যানওয়ালা থেকে ১০ টাকার পানির বোতল কিনে ঢকঢক করে পান করে নেয়।
পানীয়টুকু শেষ করে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না প্রিয়তা। মাথা চক্কর দিয়ে আসে। মাথা চক্কর দিয়ে আসে। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে অন্ধকারে তলিয়ে যায় পুরো পৃথিবী। হাত থেকে ছিটকে পড়ে যায় পানির বোতল। সেন্স হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে প্রিয়তা। সাথে সাথেই পলাশ তাকে কাঁধে নিয়ে দ্রুত জিপে ঢুকিয়ে দেয়। “ভাই এখন কি করবো?”
সিগারেটে সুখটান দেয় সন্তোষ।

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮৫

“যা, মাল তিনটাকে নিয়ে জায়গা মতো রেখে আয়। বাকি ৯৮০ টার কাছে আর ১৭ টা জোগাড় করলেই শেষ। আর হ্যাঁ, বসের অ্যাসিস্ট্যান্ট মিস্টার পিউরুসনের কাছে রেজিস্টার করে দিস, নাহলে ওই বিদেশি শালা মাল এদিক-ওদিক করবে তারপর দোষ তারপর দোষ হবে সন্তোষের।”
“আচ্ছা ভাই।”
বলে জিপ নিয়ে চলে গেল পলাশ।

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮৭

2 COMMENTS

Comments are closed.