Home ভুলভাল অন্তরাল ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১৪

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১৪

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১৪
মুশফিকা রহমান মৈথি

কাঞ্চন সাধারণত মানুষকে ঘৃণা করতে চায় না। ঘৃণা শব্দটার ওজন অনেক বেশী। খুব তিক্ত কারণ ব্যতীত কাউকে ঘৃণা করা সম্ভব নয়। তবে নিজেকে সর্বেসর্বা ভাবা মানুষগুলোকে মোটেই সহ্য হয় না কাঞ্চনের। এইসব মানুষদের কাছে অন্যের অনুভূতির কোনো মূল্য থাকে না। এরা সবসময় ভাবে নিজেরাই সঠিক। অথচ তাদের কথার বানে অন্যমানুষটির ভেতরটা কতটা রক্তাক্ত হয়েছে কোনো ধারণাই নেই এদের।
এমন ই সর্বেসর্বা মানুষ স্নিগ্ধ। এতোকাল স্নিগ্ধকে সে অপছন্দ করতো! আজ কেনো যেন ঘৃণা হচ্ছে। তার দেওয়া আঘাতের ক্ষত এখনো তাজা। যখন ই সেই কথাগুলো মনে পড়ে কাঞ্চনের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যায়। নিজেকে সবচেয়ে নিকৃষ্ট কোনো কীটের মতো মনে হয়। মনে হয় কাঞ্চন ওই ঘরমোছার ন্যাকড়ার মতো, যার স্থান মানুষের পদতলে। নিজের ভাগ্যের উপর অভিমান হয়। সেই ক্ষতগুলো ভুলে কখনো কি সম্ভব এই লোকটার সোনা বউ হওয়া? এতোটা সহজ? এতোটা ঠুনকো তার আত্মসম্মানবোধ?
কাঞ্চনের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো। সেই সাথে একটা বিদ্রুপের তিক্ত হাসি ছড়িয়ে পড়লো ঠোঁটে। ক্ষীণ স্বরে বললো,

“তুমি কি জানো তুমি একটা অ্যাসহোল! আমি সাদা খাতায় লিখে দিতে পারি ভালো স্বামী হবার কোনো যোগ্যতা তোমার মধ্যে নেই!”
স্নিগ্ধ তার হাতের বাঁধন আরোও শক্ত করলো। কাঞ্চন এবং তার মধ্যকার দূরত্ব মাত্র অনেক ইঞ্চি। তার উষ্ণ নিঃশ্বাস কাঞ্চনের উপর আঁছড়ে পড়ছে। রুমের এসি চলছে ধীর লয়ে। ফ্যান বন্ধ। তাই একে অপরের হৃদস্পন্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। কাঁচা হলদেটে রোদ লুটোপুটি খাচ্ছে মেঝেতে। ঘর আলোকিত। ফলে একে অপরের মুখশ্রীর ছোট থেকে ছোট সংকোচন, প্রসারণও দেখতে পাচ্ছে। স্নিগ্ধ কাঞ্চনের চোখে চোখ রেখে বললো,
“হাউ ডু ইউ নো?”
“যে মানুষকে সম্মান করতে পারে না সে কখনো ভালো মানুষ হতে পারে না। তুমি রেড ফ্ল্যাগ না রেড কার্পেট।”
“তখন আমাদের সমীকরণ ভিন্ন ছিলো। ফুপাতো ভাই হিসেবে আমি জাউরা ছিলাম বলে স্বামী হিসেবেও জাউরা হবো সেটা ভাবাটা বোকামি। তখন আর এখন সম্পূর্ণ আলাদা সম্পর্ক আমাদের। তাই হিসেবটাও বদলাবে। তখন তুই বাকিদের মতোই ছিলি, সো আই ডোন্ট কেয়ার এবাউট ইউ, ইউর ফিলিংস। এটাই কি স্বাভাবিক না?”

“হ্যা, তাই তো তোমার চোখে আমি শুধু একটা এতিম মেয়ে ছিলাম। একটা প্যারাসাইট ছিলাম। যাকে এই বাড়ি দয়া করেছে। ফর ইউর কাইন্ড ইনফোরমেশন আমি এখনো এতিম প্যারাসাইট, ব্র‍্যাট ই আছি!”
কাঞ্চনের ধাঁরালো জবাবে স্নিগ্ধ কিছুসময় তাকিয়ে রইলো। তারপর বাঁকা হেসে বললো,
“তোরা মেয়েরা ইমোশনাল ফুল কেন? একটা বিষয়কে আর কত টানবি? টেনে টেনে চুইঙ্গাম না বানালে হয় না? ইট ওয়াজ জাস্ট এ এক্সপ্রেশন।”
কাঞ্চনের দৃষ্টি সরু হলো। স্নিগ্ধ তার থুতনি ধরে নিজের কাছে টেনে আনলো। গাঢ় স্বরে বললো,
“আমিও এতিম। একটা সময় আমিও এই মঞ্জিলের প্যারাসাইট ছিলাম। শুধু আমি না, মা, আমি এবং সানিয়া তিনজন-ই প্যারাসাইট ছিলাম। আমি তো তোর মতো ফ্যাতফ্যাত করছি না। নিজের দূর্বলতা এতো বেশি দেখালে মানুষ পেয়ে বসে।”
কাঞ্চনের গালটা একটু টিপে বললো,

“যা এজ মাই ওয়াইফ, আমি তোকে একটা প্রিভেলেজ দেই। তোর যদি রাগ হয় তুইও আমার মুখের উপর এতিম, প্যারাসাইট বলতে পারিস। আমি মাইন্ড করবো না। তবে এটা তুই চাইলেও অস্বীকার করতে পারবি না যে আমার সাথে বিয়ে হবার আগ অবধি তুই প্যারাসাইট-ই ছিলি। তোর আমার প্রতি থ্যাংকফুল হওয়া উচিত। কিছুদিন আগ পর্যন্ত তোর চাচারা যখন তখন তোকে উপড়ে ফেলতে পারতো। ইভেন তোর বড়চাচা তোর সই নকল করে তোর কিছু শেয়ার বিক্রিও করে দিয়েছে। এখন অবশ্য সিনারিও পুরো আলাদা। তুই এখন সরফরাজ পটনভীর স্ত্রী। এই পটনভী মঞ্জিলের কারোর সাহস নেই তোকে কিছু করার। ঘটে কথা গেছে?”
কাঞ্চনের চোখ মুখ কুঁচকে এসেছে। প্রচন্ড ঘৃণা নিয়ে বললো,
“আমি তোমাকে দয়া দেখাতে বলি নি! তোমার এই দয়া, করুনা আমার অসহ্য লাগে।”
“আমি কাউকে করুনা করি না। এই প্রিন্সেস ট্রিটমেন্টটা তুই পাচ্ছিস কারণ তুই আমার বউ। তোর জায়গায় অন্যকেউ হলেও আমি এমন প্রিন্সেস ট্রিটমেন্ট-ই দিতাম! সরফরাজ পটনভীর ওয়াইফ হিসেবে এটা তার পাওনা।”

কাঞ্চন হাসলো। অট্টহাসি। তবে সেই হাসিতে স্পষ্ট বিদ্রুপ ছিলো। হাসি না থামিয়ে হিনহিনে স্বরে বললো,
“তাহলে অন্য কাউকেই তুলে আনো। আমি তোমার প্রিন্সেস ট্রিটমেন্টের উপর লাথি মারি!”
স্নিগ্ধ হাসলো মৃদু। এই হাসিটাও কাঞ্চনের গায়ে জ্বালা তৈরি করলো। স্নিগ্ধ তার থুতনিটা আবার ধরে উঁচু করলো। চোখে চোখ রেখে বললো,
“কিছু করার নেই, আমার হবু বউকে পালাতে সাহায্য করার আগে তোর ভাবা উচিত ছিলো! এখন তুই আমার বউ। মৃত্যুর আগ অবধি তুই ই আমার বউ থাকবি। আই এম টু বিজি টু লুক আফটার আদারস।”
“আমি প্রীতি আপুকে ভাগাই নি। এক কথা কতবার বলব?”
কাঞ্চনের চোখে ক্রোধের আগ্নেয়গিরি দেখতে পেলো স্নিগ্ধ৷ সে খুব শান্ত স্বরে বললো,
“আমিও সেদিন ইচ্ছে করে তোর উদ্দেশ্যে কথাগুলো বলি নি।”
কাঞ্চন থমকালো। চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস ফেললো। তারপর শান্ত স্বরে বললো,
“তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। আমি তোমাকে স্বামী হিসেবে মানি না। এই বিয়েটাও মানি না।”
স্নিগ্ধ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো,

“আমাকে ধৈর্য্যের জন্য নোবেল দেওয়া উচিত। তুই আমার দিন দিন আমার ধৈর্য্যের পরীক্ষা নিচ্ছিস৷ আমি ওয়ার্ন করছি তোকে, আমার ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙ্গিস না।”
“কি করবে?”
“শিকল দিয়ে আমার সাথে বেঁধে রাখব।”
“যে কেউ শুনলে মনে করবে তুমি আমাকে ভালোবাসো!”
“ভালোবাসা ছাড়াও একটা হেলদি ম্যারেড লাইফ হয়। আমাদেরটাও হবে। আই উইল প্রুভ ইট টু ইউ। ভালো হাসবেন্ড হওয়ার জন্য ল্যাদল্যাদা প্রেমিক হবার প্রয়োজন নেই।”
“আমি কোনো লাভলেস ম্যারেজ চাই না। একে লাভলেস, উপর থেকে সেটা তোমার মত নার্সেসিস্ট, সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্সে ভোগা মানুষ– ইম্পসিবল। আমাকে কুত্তায় কামড়ায় নাই। জাস্ট ডিভোর্স মি!”
বলেই কাঞ্চন একটা সজোরে ধাক্কা মারলো স্নিগ্ধর বুকে। অতর্কিত ধাক্কায় স্নিগ্ধ বিছানায় পড়ে গেলো। পড়ে যাবার পরও মাথাটা তুলে নির্লজ্জের মতো মাথা তুলে চুলে হাত ঘোরাতে ঘোরাতে বললো,
“হাউ মিন। তোর হাজবেন্ড এখন একজন আহত রোগী!”
লোকটার কথা শুনলেই কাঞ্চনের গা কুটকুট করছে। ইচ্ছে করছে ঘাড়ে একটা কামড় বসাতে। রক্তচোষা ভ্যাম্পায়ার হয়ে যদি এই সিমেন্টের বস্তার রক্ত চুষে খেয়ে ফেলা যেত। কাঞ্চন ক্ষিপ্ত স্বরে বললো,
“আমার হাসবেন্ড হওয়ার কোনো যোগ্যতা নেই তোমার!”

“Lets make a deal then!”
“কি?”
“এক বছর, একবছর আমরা প্রোপারলি স্বামী স্ত্রী হয়ে থাকবো। এক বছর পর যদি তুই সবার সামনে প্রুভ করতে পারিস, আমাকে প্রুভ করতে পারিস যে আমি খুব খারাপ হাসবেন্ড তাহলে আমি কোনো প্রশ্নবিহীন তোকে ডিভোর্স দিব! কিন্তু তার জন্য এই এক বছর তোকে আমার লক্ষ্মী বউ হয়ে থাকতে হবে।”
কাঞ্চন বিদ্রুপের সাথে হাসলো। লোকটা নিজেকে কি ভাবে? ওর লক্ষ্মী বউ হওয়ার থেকে তিনতালা থেকে লাফ দিবে সে। বুকে হাত বেঁধে তীক্ষ্ণ স্বরে বললো,
“এক বছর! একদিন তোমাকে আমার সহ্য হয় না!”
“এক সপ্তাহ কেটে গেছে। আর একান্ন সপ্তাহ। ভেবে দেখ। এর থেকে ভালো ডিল নেই। আমি খুব বদান্যতা দেখাচ্ছি। এতে তোর লাভ। ভেবে দেখ! একবার আমার কোনো খুঁত পেয়ে গেলে তুই ক্লিন ভাবে এই বিয়ে থেকে বেরিয়ে যেতে পারবি।”

এবার যেন একটু থমকালো কাঞ্চন। কিন্তু একটা বছর এই লোকের সাথে কাঁটানো অসম্ভব। বিয়ে শব্দটার উপর ভরসা নেই কাঞ্চনের। পটনভী পরিবারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ভালোবাসাবিহীন বিয়েগুলো। বাহিরে চাকচিক্য থাকলেও ভেতরে সবকিছুই ফাঁকা, নোংরা, বিষাদময়। কাঞ্চনের পরিণতিও ব্যতিক্রম হবে না। স্নিগ্ধ তাকে কখনো ভালোবাসবে না। সে তাকে বুঝবে না। শুধু পুতুলের মতো নিয়ন্ত্রণ করবে। এই লোকটা সেটাই চায়। এর কাছে কারোর অনুভূতির দাম নেই। তাই কঠিন গলায় বললো,
“ওই ডিল নিয়ে পঁচা ডোবায় চুবে হেদিয়ে মর তুমি!”
বলেই হনহন করে হেটে ঘর থেকে চলে গেলো। স্নিগ্ধ বিছানাতে গা এলিয়ে দিলো। মৃদু হেসে বললো,
“কাঞ্চনজঙ্ঘার পাহাড়সম ত্যাদড়ামিকে বাগে আনতে আনতে আমি সন্ন্যাসী হয়ে যাবো।“

চোর কান্ডের পর পটনভী মঞ্জিলে আবার আগের মতো জীবন শুরু হলো। প্রীতির বিয়ের আয়োজন চলছে। বিয়ের আমেজে রমরমা ব্যাপার। কাজিনদের ভীড় বাড়ছে। তাবাসসুম, তিতিয়া চলে এসেছে। মঞ্জিলের বন্ধ ঘরগুলো খোলা হচ্ছে। পেছনের হোটেলের জন্য বরাদ্দ মঞ্জিলটাও পরিষ্কার করা হচ্ছে। এর মধ্যে সকাল সকাল আগমন ঘটলো বড় চাচার ছেলে তাশদীদের। তাশদীদ মুখরা ছেলে। তার মুখে কিছুই আটকায় না। সেমিস্টার ব্রেক পনেরো দিনের। এই ফাঁকে বিয়ে। সুতরাং বোর হবার উপায় নেই। তাশদীদ আসতে ঝিমানো কাজিনমহল একেবারে চাঙ্গা হয়ে গেলো। এসেই সে রিদমকে বললো,
“শুনলাম আমার বাপের মাথা ফাঁটিয়ে দিয়েছে ফরহাদ কাকা, তা বলে মাথার খোলা স্ক্রুগুলো কি জোড়া লেগেছে নাকি এখনো আগের মত?”
রিদম মাথা চুলকে বললো,

“মাথার স্ক্রু লাগে নি পেটের স্ক্রু খুলে গেছে।“
“যা শালা, এখন কি ডাইরেক্ট কেস?”
“নাহ, ভয় পেলে প্রেসার কন্ট্রোল করতে পারে না। চোরের ভয়ে একটুর জন্য কাপড় নষ্ট করেন নি, নয়তো।“
“আহারে, আমার বাপ। ভাগ্য করে একটা বংশ জুটেছে। বাই দ্যা ওয়ে আমাদের স্নিগ্ধ ভাইয়ের মেশিন কি চলছে? নাকি ঢপ মেরে বসে আছে।“
“আস্তে বল। স্নিগ্ধ ভাই শুনলে কাঁচা খেয়ে ফেলবেন।“
“এজন্যই তোকে বলসি। আমার বুকেও ভয় আছে। জীবন নিয়ে ফিরতে হবে। তোর প্রাক্তন আর চাপামাসি কোথায়?“

রিদম একটা শুকনো ঢোক গিললো। চোর কান্ডের পর থেকে পৃথুলাকে সে এড়িয়ে চলছে। আর একটা বিরাট সমস্যা হয়েছে। পৃথুলা এখনো তার কাছে শাকচুন্নী-ই আছে। কিন্তু শাকচুন্নীটার প্রতি সে আকর্ষিত হচ্ছে। পৃথুলা তার সামনে এলেই ইচ্ছে হয় মেয়েটার গাল টিপে দিতে। যখন কথা বলে নির্লজ্জের মতো তার ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে থাকে সে। চোরকান্ডে তার মাথায় ব্যামো হয়ে নিশ্চিত। অতিরিক্ত প্রেসারে নার্ভসের এলগোরিদম খসে গেছে। নয়তো পৃথুলা আর আমদানীর মা অসম্ভব। তাই কথা এড়াতে বললো,
“শাকচুন্নীর খবর আমি রাখি না। আর চাপামাসি এখন বিবাহিত। আমি রিদম বিবাহিত নারী থেকে দূরে থাকি। আমার এখন ধ্যান জ্ঞান আমার আমদানীর মাকে খোঁজায়।“
“আমদানীর মা কে?”
“আমার হবু বউ।“
তাশদীদ আশপাশটা দেখলো। চুলে হাত ঘুরিয়ে বললো,
“আমার বিল্লিটাকেও তো দেখছি না।“
“তুই বিড়াল পালতি? তোর বাপে জানে? যতদূর জানি বড়কাকার বিড়াল দেখলেই সিলিং এ উঠে যান।“
“এই বিল্লি সেই বিল্লি না ব্রো।“

বলেই চোখ ঘুরালো। হঠাৎ তার ঠোঁটে একচিলতে হাসি ফুটে উঠলো।
গরমে একেবারে গা জ্বলে যাবার যোগাঢ়। জ্যৈষ্ঠের গরম কি জিনিস তা বুঝানোর জন্য প্রকৃতি বদ্ধ পরিকর। কোনো বাতাস নেই, মেঘ নেই। কড়া রোদ। সেই রোদে শরীর থেকে সবটুকু শক্তি শুষে ফেলছে সূর্য্যিমামা। অঞ্জনার মনে হলো সে ছোটবেলার গ্লুকোন-ডির এডের এই বাচ্চা। ভার্সিটিতে শুধু একটা ক্লাসের জন্য গিয়েছিলো তাতেই অবস্থা নাজেহাল। টিস্যু দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে বললো,
“লাবুর মা, এক গ্লাস ঠান্ডা লেবুর শরবত দাও তো”
এর মাঝেই একটা শক্ত হাত তার চুল টানলো। অঞ্জনা তেড়ে পেছনে তাকাতেই কপাল কুঁচকে ফেললো। পেছনের মানুষটির ঠোঁটে নির্লজ্জ হাসি। বুকে হাত বেঁধে বলল,
“মিসড মি বিল্লি?”
অঞ্জনার কপালে তীব্র ভাঁজ পড়লো। সাধারণত নির্ভেজাল, নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ অঞ্জনা। সে পৃথুলা বা কাঞ্চনের মত ঝগড়া করতে পারে না। কিন্তু রফিকুল্লাহ চাচার ছেলেটাকে দেখলেই ওর গা জ্বলে উঠে। এই ছেলে রিদমের থেকে এক ডিগ্রী বেশি। এতো ফাতরামি করে যে মেজাজ ঠিক রাখাই সমস্যা হয়ে যায়। অঞ্জনা চিৎকার করে বললো,
“লাবুর মা, শরবত আমার ঘরে দিও। এখানে অনেক মাছি।“
বলেই সে হনহনিয়ে সিড়ি ধরে উপরে চলে গেলো। তাশদীদ বুকে হাত বেঁধে মেয়েটির যাওয়া দেখলো। বিড়বিড় করে বললো,
“আমার বিল্লি, আমাকেই ম্যাও।“

কাঞ্চনের ক্লাস শেষ হলো পাঁচটায়। আজ ভাইবোনগুলোর কারোর ক্লাস ছিলো না। তাই একা একাই তাকে ফিরতে হবে বাসায়। ভার্সিটির বাস থেকে নেমে রিক্সায় উঠলো সে। এখান থেকে বেশ দূর পটনভী মঞ্জিল। লোকাল বাসে করে আরেকটু সামনে যাওয়া যায়। কিন্তু কাঞ্চন রিক্সা নিলো সেফটির জন্য। রিক্সা ওয়ালা দামদর করলো না। কিছুদূর যাওয়ার পর রিক্সা একটা চিপা গলিতে ঢুকলো। গলিটা শুনশান। কেন যেন কাঞ্চনের বুকে কামড় পড়লো। সে বিস্মিত গলায় বললো,
“মামা, মেইন রাস্তা ছেড়ে এখানে কেন ঢুকলেন?”
“মেইন রাস্তায় জ্যাম মামা, তাড়াতাড়ি পৌছাবো।“
রিক্সাওয়ালার কথাটা শোনার পরও অস্বস্তি ভাবটা কাঁটলো না। তার ফোনের জিপিএস অন করা। একটু পর রিক্সাওয়ালা কাউকে ফোন করে বললো,
“মাল আনতেছি। তোরা রেডি থাকিস।“
কথাটা শুনতেই হিম রক্তস্রোত বইলো মেরুদন্ড বেয়ে। এই গলি সে চিনে না। গলিটা অসম্ভব নীরব। জনসাধারণ চোখে পড়ছে না। কাঞ্চন আবার বললো,

“মামা, মেইন রাস্তায় উঠেন। চিপা গলি দিয়ে যেতে হবে না।“
“জ্যাম মামা কইছি তো।“
“তাহলে রিক্সা থামান। এখনই রিক্সা থামান।“
কথা বলতে বলতেই সে লুকিয়ে পৃথুলাকে ফোন দিলো। কিন্তু পৃথুলা ফোন ধরছে না। কাঞ্চনের গলা শুকিয়ে আসছে। এক তীব্র অস্বস্তি আর ভয় গলা চেপে ধরলো। কাজিনমহলের গ্রুপে ফোন দিলো। কিন্তু কেউ ফোন ধরছে না। রিক্সাওয়ালা রিক্সা থামাচ্ছে না। কাঞ্চন চিৎকার করছে,
“রিক্সা থামান। আমি নামবো। এখন রিক্সা না থামলে আমি লাফ দিব?”

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১৩

রিকশাওয়ালা আরোও চিপা গলিতে ঢুকলো। এই গলিটা কাঞ্চন চিনে না। কাঞ্চনের কপালে ঘাম জমলো। কি ভেবে সে রিক্সার হুড ফেলেই লাফ দিলো। রাস্তায় আঁছড়ে পড়ায় তার হাটু ছিলে গেছে। উঠে দাঁড়ালো কোনো মতে। কিন্তু হাতের ফোনটা ছিটকে ভেঙ্গে গেছে। ফোনটা হাতে নিয়েই সে দৌড় দিলো। পেছনে ঘুরতেই দেখলো রিকশাওয়ালা রিকশা ফেলে তার পেছনে ছুটছে। কাঞ্চনের হাটু ছিলে গেছে। জ্বলছে। তবুও সে ব্যাগটা নিয়ে ছুটলো। সেই গলির থেকে অন্য একটা গলিতে ঢুকে পড়লো সে। আকাশ অন্ধকার হয়ে গেছে। বৃষ্টি নামবে। একটু থেমে ফোন অন করার চেষ্টা করলো। ফোনটা অন হচ্ছে না। হঠাৎ একটা ছায়া পড়লো তার ঘাড়ের পেছনে। পেছনে তাকাতেই একটা লাঠির আঘাত পড়লো তার মাথায়। সাথে সাথেই চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এলো। জ্ঞান হারালো কাঞ্চন…

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here