ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৩৪
মুশফিকা রহমান মৈথি
আলোহীন রাস্তায় রাত একটু বেশি গভীর লাগে। কাঞ্চনদের ক্ষেত্রেও তেমন হলো। স্নিগ্ধ গাড়ি থেকে বেরিয়ে চাকাতে ফ্লাশলাইট মারলো। চাকাটা বসে গেছে। তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। কাঞ্চন গাড়ি থেকে বের হয়ে শুধালো,
“কি হয়েছে?”
স্নিগ্ধ উত্তর না দিয়ে কঠিন চোখে চাইলো। তার দৃষ্টি এতোটাই প্রখর ছিলো যেন চাকা পাঞ্চার কাঞ্চনের কারণেই হয়েছে। কাঞ্চন সেই চাহনীর প্রেক্ষিতে শুধালো,
“আমার দিকে এভাবে তাকাচ্ছো কেন? আমার প্রশ্নের জন্য তো তোমার টায়ার পাঞ্চার হয় নি!”
স্নিগ্ধ উত্তর দিলো না। বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলে ডিকির কাছে গেলো। স্পেয়ার চাকা থাকলে এ যাত্রায় বেঁচে যাবে। কিন্তু আফসোস, ডিকিতে কোনো স্পেয়ার চাকা নেই। এতোটা খামখেয়ালি কাজ কখনো সে করে না। রাগে গা কাঁপছে ফলে সজোরে বোনেটে একটা ঘুষি মারলো। স্থিতিশীল স্নিগ্ধও মাঝে মাঝে নিয়ন্ত্রণ হারায়। আজকে হয়তো সেইদিন। প্রকান্ড ঘুষিতে বোনেট একটু ডেবে গেলো। আবার ঘুষি মারতে যাবে অমনি হাত টেনে ধরলো কাঞ্চন। তার লাল হয়ে যাওয়া হাতের দিকে তাকিয়ে ব্যগ্র গলায় বললো,
“রাগ দেখাচ্ছো কেন জড় বস্তুটার উপর?”
স্নিগ্ধ তার দিকে না তাকিয়েই গমগমে স্বরে বললো,
“কারণ জীবন্তটার উপর রাগ দেখাতে পারছি না। না ছুঁয়েই তো ফ্যাতফ্যাতানির শেষ নেই। ছুঁয়ে দিলে তো ফাঁসিতে ঝুলাবে। বিয়ে তো করি নি, আস্তো একটা যন্ত্রণার পুটলি মাথায় নিয়েছি!”
স্নিগ্ধর ভারী স্বর আরোও বেশি ভারী শোনালো। কাঞ্চন তাজ্জব হয়ে গেলো। তার চোখে মুখে বিস্ময় ছলকালো। সেই বিস্ময় খুব সময় স্থায়ী হলো না। কৌতুক করে সে হাসলো। মাজায় হাত দিয়ে চোখ গরম করে শুধালো,
“আমি যদি যন্ত্রণার পুঁটলি হই, যেচে পড়ে তো তোমার মাথায় উঠি নি। তুমি উঠিয়েছো। করেছো কেন বিয়ে? আমি বলেছিলাম?”
তার রাগকে বরাবরের মতো একেবারেই পাত্তা না দিয়ে স্নিগ্ধ ভারী স্বরে বললো,
“ঝগড়া করিস না তো! পাড়ার ফকিন্নি মহিলাদের মতো সারাক্ষণ ঝগড়া করিস! বিরক্ত লাগে।“
কাঞ্চনের মুখ হা হয়ে গেলো। পাড়ার ফকিন্নি মহিলা বললো তাকে সিমেন্টের বস্তা? এতো বড় অপমান। ফলে একপ্রকার জেদ মাথায় চেপে বসলো তার। বুকে হাত বেঁধে নাকের পাটা ফুলিয়ে বললো,
“আলবৎ করবো, একশ বার করবো। পার্ফেক্ট হাসবেন্ড না তুমি আমার? তোমার সাথেই আমি ঝগড়া করবো। দিনে রাতে গুনে গুনে হোমিওপ্যাথির বড়ির মতো ঝগড়া করবো। চার বেলা পনেরো ফোঁটা করে। কে জানে বলতো “আমি তোকে হ্যান্ডেল করতে পারি।” এখন কপাল চাপড়াচ্ছো কেন?”
“এখন আমার তোর সাথে ঝগড়া করতে ইচ্ছে হচ্ছে না। প্লিজ লেট মি থিংক। সো শুশ!”
“মোটেই শুশ না। আগে বলো এখানে আমার কি দোষ! তোমার গাড়ির চাকার পেট ফুলে গেছে। সে আত্মহুতি দিয়েছে এতে আমার কি দোষ!”
স্নিগ্ধ তার কপালের চামড়া টেনে ধরলো। প্রথমে সিদ্ধান্ত নিলো স্ত্রীর কথার উত্তর এখন দিবে না। ফোনটা বের করতেই কাঞ্চন এক রকম ছিনিয়ে নিলো মোবাইলটা। স্নিগ্ধ কঠিন গলায় বললো,
“কি?”
“আগে উত্তর দেও।“
স্নিগ্ধের রাগের পারদ বাড়লো। ফলে গমগমে স্বরে বলল,
“বলেছিলাম দ্রুত বের হতে! তাড়াতাড়ি বের হলে অন্তত এই অন্ধকারে তো আমাদের ফাঁসতে হতো না। রেডি হতে হতে এক ঘন্টা লাগিয়েছে কে?”
“আজিব! কে বলেছিলো বান্দরের মতো না ঘুরতে। মানুষের বাচ্চার জামা পড়তে! আর আমি কি দেরি করেছি নাকি! তোমার মুড সুইংয়ের তো শেষ হয় না। কে বলেছিলো রাস্তায় রাগ দেখিয়ে বসে থাকতে! ওখানে তুমি দেড় ঘন্টা খেয়েছো।”
“রাগটা তুলেছিলো কে?”
কাঞ্চনের চোয়াল খসে পড়ার যোগাড়। মুখমন্ডলে চমক এখনো কাটে নি। হতবিহ্বল স্বরে বললো,
“এখানেও আমার দোষ? আমি তোমাকে রাগিয়েছি? আমি?”
“তুই তো খুব সাধু, ওই ছাগল ছোকড়াটার হয়ে সালিসি বসিয়েছে কে?”
ছোট করে বললো স্নিগ্ধ। কাঞ্চন বিমূঢ় গলায় শুধালো,
“তোমার ভুল হয়েছে সেটা বলা যাবে না?”
“আমার ভুল?”
স্নিগ্ধর মুখশ্রীতে বিস্ময় উঁকি দিলো। যেন তার পক্ষে ভুল করা সম্ভব ই না। কাঞ্চন চুল টেনে ধরলো। গাল ফুলিয়ে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
“অবশ্যই তোমার ভুল! তুমি আমার খাবার আমাকে না জানিয়ে ফেরত দিয়েছো কেন? এটা ভুল না? কেউ যত্ন করে কিছু পাঠালে সেটা গ্রহণ করতে হয়।”
“আমি তোর সাথে আর এই নিয়ে আর কথা বলতে চাই না!”
বলেই কাঞ্চনের হাত থেকে থেকে ফোনটা ছিনিয়ে নিলো। নিজের ব্যারাকের একজনের ফোনে ডায়াল করলো সে। কাঞ্চন মোটেই শান্ত রইলো না। সে বলে উঠলো,
“কেন বলবে না। আমি বলবো। কথা না বললে আমি তোমার সাথে সংসার কি করে করবো?”
স্নিগ্ধ তার ঠোঁট দুটো চেপে ধরলো ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল এবং তর্জনী দিয়ে। ওপাশের মানুষটি তত সময়ে ফোনটা ধরেছে। ফলে স্নিগ্ধ তাকে নিজেদের অবস্থার কথা সংক্ষিপ্তভাবে বললো,
“আমরা হাইওয়েতে আছি। গাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে। লোকেশন পাঠাচ্ছি।“
ওপাশের মানুষটি বুঝে গেছে। স্নিগ্ধ ফোনটা কেঁটেই বললো,
“খুব সংসার করে উদ্ধার করে দিচ্ছো তুমি?”
কাঞ্চন তার হাতটা ঠোঁটের থেকে সরিয়ে দিয়ে বললো,
“তাহলে তুমি কি চাও আমি তোমার পাপেট হয়ে যাই৷”
“পাপেট?”
অস্পষ্ট স্বরে শুধালো স্নিগ্ধ। তার ভ্রু কুঞ্চিত হলো। কাঞ্চন গলার স্বরে ভারিক্কী এনে বলল,
“আর নয়তো কি? তোমার কাছে তো সংসার মানে তোমার কথা মত চলা। শুরু থেকে এই পর্যন্ত আমার মতের কোনো প্রাধান্য আছে?”
স্নিগ্ধ বুকে হাত বাঁধলো। স্ত্রীর দিকে এবার সরাসরি চাইলো। স্থির চাহনী। বোনেটে গা ঠেস দিয়ে শীতল স্বরে বললো,
“যেখানে তোর মত মানেই শুধু ডিভোর্স আর পালিয়ে বেড়ানো, বাঁদরামীর একশ এক উপায়ের বইয়ের লেখিকা হওয়া সেখানে আমি তোর মতের প্রাধান্য কি দিব? স্টিল আই এম ট্রাইং। সর্বোচ্চ ধৈর্য্যশীল হয়ে আমি তোর সকল বাদরামী সহ্য করছি। তোর কি ধারণা আমি চাইলে তোকে হ্যান্ডেল করতে পারবো না? যদি আমার কাছে তোর মতের প্রাধান্য না থাকতো আই উইল ফোর্স ইউ। তোকে নিজের সাথে বেঁধে রাখার অনেক উপায় আছে আমার কাছে। স্টিল আমি চাই যেন তোর কাছে আমাদের সমীকরণটা সহজ হোক। ভুলভাল হতে চাই না আমি। আই ওয়ান্ট এ পার্ফেক্ট ইক্যুয়েশন।”
আবার সেই অহমিকা। স্নিগ্ধর কথার আড়ালে শুধু অহমিকাটাই চোখে পড়লো কাঞ্চনের। স্নিগ্ধর এই দাম্ভিকতাটাই সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে কাঞ্চন। সবসময় সে সঠিক। তার সিদ্ধান্তই সঠিক। কাঞ্চন অধৈর্য্য, ক্লান্ত স্বরে বললো,
“তুমি, তুমি, তুমি! শুরু থেকে তুমি চাও। আর আমি কি চাই তার বেলায় ঠেঙ্গা। সংসার মানে যদি শুধু তোমার চাওয়াটাই প্রাধান্য পাবে তাহলে আমার এই সংসার চাই না। সবকিছু তোমার মতো করে হতে হবে কেন? তুমি চেয়েছো বিয়ে করতে। তুমি চেয়েছো সংসার। তুমি এখানে আমাকে নিয়ে এসেছো। তুমি চাও নি তাই সরে এসেছো। সব তুমি ই চাচ্ছো। আমি কোথায়? আমার চাওয়া শুনেছো কখনো? আমাকে জিজ্ঞেস করেছো কাঞ্চন তুই এই রিলেশনে কি চাস? তোমার আমার হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে না। আমি তো চাই না সেটা। তুমি এতো ডমিনেটিং কেন?”
স্নিগ্ধ কপালের চামড়া টেনে বিরক্তি ভরে বললো,
“কারণ তুই অবাধ্য! তুই তো রিলেশন ই চাস না। আমি তোকে জিজ্ঞেস করবো কি? এই যে স্টিল ওই ছেলেটার হয়ে তুই ঝগড়া করছিস।”
“তুমি ভুল স্বীকার করলেই তো হয়!”
স্নিগ্ধ সোজা হয়ে দাঁড়ালো। তার লম্বা ছায়াটা হেডলাইটের আলোতে আরোও লম্বা দেখালো। কাঞ্চনের দিকে এগিয়ে এলো সে। ঝুঁকে এসে ভারী স্বরে সতর্ক করলো,
“এখানে আমার ভুল নেই। এজ ইউর হাসবেন্ড, তোমার এবং কিছু ছাগলপাগলদের মধ্যে বাউন্ডারি সেটা করাটা আমার দায়িত্ব এবং এটা আমি করবোই। কোনো লাফাঙ্গা আমার ওয়াইফের প্রতি মোহিত হবে আর আমি বসে বসে দেখবো?”
“আল্লাহ গো! তুমি এতো অসহ্য কেন! তোমার সমস্যা হলো তোমার মতে তোমার কখনোই ভুল থাকে না। এটলিস্ট নিজের ভুলগুলো ওন করা শেখো।”
“হোয়াই আর ইউ রিয়েক্টিং!”
কাঞ্চন ক্লান্ত স্বরে বললো,
“আই এম নট রিয়েক্টিং। এটাই সমস্যা তোমার। তুমি আমাকে বুঝোও না। বিষয়টা মাহফুজ ভাইয়ের নয়। বিষয়টা আমার হয়ে ডিসিশন নেওয়ার। এখানে মাহফুজ ভাইয়ের জায়গায় কোনো পিঁপড়া হলেও আমি এভাবেই বলতাম। ইউ নো হোয়াট, তোমার কাছে কখনোই যায় আসে না আমি কি ফিল করছি। আমার কেমন লাগছে। তোমার মনে আছে, একবার তোমার জন্মদিনে আমি তোমার জন্য চকলেট বানিয়েছিলাম। তুমি সেটা ফেলে দিয়েছিলে ডাস্টবিনে। আমি ঘন্টার পর ঘন্টা পরিশ্রম করে বানিয়েছিলাম। অথচ তোমার কাছে সেটার মূল্যও ছিলো না।”
স্নিগ্ধর খুব ভালো করে মনে নেই। সে জন্মদিনে কম চকলেট বা উপহার পায় নি। কখনো সেগুলো তার জন্য প্রাধান্য ছিলো না। কাঞ্চনও যে তাকে চকলেট দেয় নি এমন না। কিন্তু সেগুলো হয় সে মানুষকে দিয়ে দিত নয় নষ্ট হয়ে গেলে ফেলে দিতো। ফলে সরাসরি উত্তর দিলো,
“ফাস্ট অফ অল আমি চকলেট খাই না। চকলেট গুলো নষ্ট হয়েছিলো। সেকেন্ডলি, আমি জানতাম না ওটা তুই বানিয়েছিলি।”
“জানলে কি খেতে!”
স্নিগ্ধ উত্তর দিলো না। সে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলো। কাঞ্চন কৌতুক ভরে বললো,
“চুপ করে আছো কেন? খেতে না তাই তো! ফেলে দিতে ময়লা ঝুড়িতে।”
“আমি চুপ করে আছি কারণ আমি জানি না আমি কি করতাম। দ্যাট ওয়াজ পাস্ট। পাস্ট নিয়ে পড়ে থাকলে জীবন চলে না। তখন আমাদের ইক্যুয়েশন আলাদা ছিলো। আমার কাছে সেটা ইম্পোর্টেন্ট ছিলো না। আমার কাছে আমার বৃত্তের মানুষ ব্যতীত কেউ কখনো প্রাধান্য পায় নি। এবং পাবেও না। সিনারিওটা এখন হলে আমার রিয়েকশন ডিফারেন্ট হত।”
স্নিগ্ধ আবারোও খুব সহজ গলায় উত্তর দিলো। কাঞ্চনের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। বিষাদ উগড়ালো কণ্ঠে,
“ডোন্ট ইউ ফিল এটা ফানি? হুট করে আমার ইম্পোর্টেন্স বেড়ে গেছে? আমি তো আমি-ই আছি!”
“না, তুই আমার জন্য সেই তুইটা নস এখন। এখন তুই আমার হালাল সার্টিফাইড ওয়াইফ। ইক্যুয়েশনের সাথে প্রায়োরিটি বদলায়। এখন তুই আমার বৃত্তের ভেতরের মানুষ। এখন আমার কাছে তোর প্রতিটা কাজ, প্রতিটা স্টেপ, প্রতিটা নিঃশ্বাস ইম্পোর্টেন্ট। আই হ্যাভ টু প্রটেক্ট ইউ ফ্রম এনিওয়ান। ইনক্লুডিং ইউ।”
“সেটাই আমি জানতে চাচ্ছি। আজ যদি আমি তোমার বৃত্তের মানুষ না হতাম তাহলে আমার ইমোশনের কোনো দাম থাকতো না তোমার কাছে? কাল যদি আমি তোমার বৃত্ত থেকে আমি বেরিয়ে যাই তাহলেও কি আমি কাঞ্চন ফেলনা হয়ে যাবো?”
এবার ধৈর্য্যচ্যুত হলো স্নিগ্ধ। খপ করে ধরলো কাঞ্চনের বাহু। নিজের দিকে টেনে দিনে কঠিন গলায় বলল,
“আর ইউ ইডিয়েট? মাথার মধ্যের ঘিলু আছে অন্তত সেটা কাজে লাগা। আই টুক বুলেট ফর ইউ! তোর সত্যি মনে হয় আমি তোকে কখনো আমার বৃত্ত থেকে বের হতে দিব? মরে গেলেও না। কবর পর্যন্ত তুই আমার ওয়াইফ ই থাকবি! তোর স্বামীর জায়গাটাতে আমি থাকবো। আমার স্ত্রীর জায়গাটায় তুই-ই থাকবি।”
“এতো শিওর হচ্ছো কি করে? ডু ইউ লাভ মি?”
আকুল স্বরে শুধালো কাঞ্চন। চমকে উঠলো স্নিগ্ধ। তার মস্তিষ্ক ছেপে গেলো একটা প্রশ্নে। কিছু বলার জন্য মুখটা খুলতেই যাচ্ছিলো ঠিক তখন ই পেছন থেকে একটা লোক বলে উঠলো,
“স্যার, আপনারা কি সমস্যায় পড়েছেন?”
শ্লেষ্মাজনিত কণ্ঠ শুনতেই চমকে উঠলো কাঞ্চন। সূক্ষ্ণ চিলের নজরে তাকালো স্নিগ্ধ। সাথে সাথেই বিশাল দেহটা নিয়ে আড়াল করলো কাঞ্চনকে। কাঞ্চন তার শার্টটা খামচে ধরলো। স্নিগ্ধ নিজের হাতটা পেছনে নিয়ে কাঞ্চনের ঈষৎ কাঁপতে থাকা হাতটা শক্ত করে ধরে এগিয়ে আনলো। কঠিন স্বরে বললো,
“কি চাই?”
লোকটা হাসলো। সরল হাসির পেছনে কুটিল মতলবটা যেন চোখে ছড়িয়ে পড়ছে।
পারভেজ অনেক কিছু অর্ডার করেছে। পৃথুলা একবার ছোট করে শুধালো,
“এতো কিছু? আই এম ফুল।“
পারভেজ হেসে ইংলিশে বললো,
“পারলে খেও, নয়তো প্যাক করে নিব।“
এক সন্ধ্যায় ঘুরতে বের হয়েই প্রথম যে ব্যাপারটা পৃথুলার নজরে পড়ল তা হলো ছেলেটা অত্যন্ত খরচ করতে পছন্দ করে। খরচ বলা উচিত নয়। বলা উচিত অপচয়। প্রচন্ড নাকউঁচু স্বভাবের। বাংলাদেশ নোংরা, চিপ কথাগুলো বহুবার বললো। এতো দামী ক্যাফেতে আসার পরও তার নাক শিটকানো কমে নি। বাংলাদেশের মানুষ এখনো গরীব আছে। তাদের মধ্যে সেই ব্যাপারটা নেই। সেই ব্যাপারটা কি সেটাও জানে না পৃথুলা। নিজের দেশকে দিনে রাতে গাল্লালেও অন্যকেউ নিজের দেশের নামে কিছু বলবে বিষয়টা কেন যেন গায়ে লাগে। পৃথুলা একবার কড়া করে বলেছিলোও,
“প্রতিটা দেশ আলাদা। কালচার আলাদা। তুমি যে দেশে বড় হয়েছো, বাংলাদেশ তার থেকে আলাদা।“
“ক্লাব, ডিস্কো এসব নেই এখানে?”
“আছে। কিন্তু আমার অবগত নেই।“
“তুমি অনেক সেকেলে।“
“হ্যা কিঞ্চিত।“
পারভেজ হাসলো। পৃথুলার চোখে চোখ রেখে বললো,
“আই লাইক ইট। ইউ আর ডিফারেন্ট।“
পৃথুলা সৌজন্য দেখিয়ে হাসলো। চোখ সরাতেই দুই টেবিল পরে মুখের উপর মেন্যু কার্ড ধরে রাখা দুটো লোক চোখে পড়লো। মুখ না দেখলেও কেন যেন চিনতে সমস্যা হলো না। এর মধ্যেই খাবারগুলো চলে এলো। ওয়েটার তাদের টেবিলে খাবার সার্ভ করতে হিমসিম খেলো। টেবিলটা ছোট। ফলে অসাবধানতা বশত তার হাত থেকে কফির কাপটা পড়ে গেলো পৃথুলার গায়ে। গরম কফি পড়তেই লাফিয়ে উঠলো সে। ফলে কাপ মেঝেতে পড়ে ভেঙ্গে গেলো। ওয়েটার লজ্জিত গলায় ক্ষমা চাইতে নিলে পারভেজ তার স্থিতিশীলতা চুরমার করে তার কলার টেনে ধরলো। ইংলিশে বহু গালি সে দিলো। পৃথুলার মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। একটা সাধারণ বিষয়ে এতোটা সিনক্রিয়েট করার কিছু হয় নি। প্রতিটা মানুষ হা করে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। পারভেজকে সরি বলতে ম্যানেজার চলে এলো। কিন্তু সে ইচ্ছে মত গালাগাল করছে,
“ছোটলোক, অদক্ষ মানুষকে কাজে রাখেন কেন? শো কেসে সাজিয়ে রাখেন এই গাধাগুলোকে।“
পৃথুলা তাকে বহুবার থামানোর চেষ্টা করলো কিন্তু সে থামলো না। ফলে একসময় সে পারভেজের হাত টেনে বলল,
“আমি ঠিক আছি। তুমি যদি এখন শান্ত না হও আমি বাসায় চলে যাব।“
ফলে পারভেজ অবশেষে ঠান্ডা হলো। পৃথুলা জামার কফিটা পরিষ্কার করতে ওয়াশরুমে গেলো। এই পুরো ঘটনাটা দেখলো রিদম। পৃথুলার কি ভালো লাগে, কি খারাপ লাগে সেটা খুব ভালো করেই জানে সে। ফলে সে আর বসে থাকলো না। হাত ধোয়ার বাহানায় বেসিন এরিয়াতে গেলো।
পৃথুলা জামাটা পরিষ্কার করার চেষ্টা করছে। ঠিক তখনই রিদম তার পাশে এসে দাঁড়ালো। কোনো কথা বললো না। তার মুখ দেখা যাচ্ছে না। তবুও পৃথুলা শুধালো,
“আমাকে ফলো করছিস কেন?”
রিদম চমকে উঠলো। সে অস্বীকার করতো কিন্তু সেই উপায় নেই। পৃথুলা তীক্ষ্ণ চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। অগ্নি দৃষ্টিতে কাউকে ভস্ম করা গেলে রিদম ছাই হয়ে যেত। তাই পালানোর জায়গা নেই। কিন্তু নিজেকে দমালে তো হবে না। তাই বলল,
“এহ! আমার খায়ে কাজের অভাব নাকি?”
“তাহলে এখানে কি করছিস?”
পৃথুলা ছোট করে শুধালো। রিদম একটু তেঁতে উঠলো,
“ঘুরতে এসেছি! কেন? রেস্টুরেন্ট কি খালি তোর বিদেশী ভেড়ার জন্যই বরাদ্দ?”
“টঙ্গে চা খাওয়া বাদর ফ্রেঞ্চ ক্যাফেতে এসেছে ঘুরতে, আমাকে শিখাস?”
আবার অপমান। হ্যা, রিদম এই শু শা ভালো লাগে না। টাকা থাকলেও খুব দামী ক্যাফেতে সে ঘুরে না। ভালো লাগে না। দমবন্ধ লাগে। এই কথাটা পৃথুলা জানে। তাই তার কাছে মিথ্যে বলার উপায় নেই। ফলে আশপাশে মাথা ঘুরিয়ে চট করে বললো,
“আমি এখানে ডেকোরেশন দেখতে এসেছি। টাইলসগুলো কি সুন্দর! বেসিন থেকে পানিটা কি সুন্দর করে পড়ে দেখেছিস!”
পৃথুলা সাথে সাথে হাত বাড়িয়ে দিলো রিদমের চুলের দিকে। ফলে ক্যাপটা পড়ে গেলো মেঝেতে। সিল্কি চুল মুঠোবন্দি করতে বেগ পেলেও ঠিক টেনে ধরলো। “আহ” “আহ” করতে লাগলো রিদম। পৃথুলা তবুও ছাড়লো না। রিদম চাপা স্বরে বললো,
“চুল ছাড় শাকচুন্নী!”
“ছাড়বো না। টাইলস দেখছিলি না। দেখ।”
পৃথুলার কণ্ঠে রাগ উগড়াচ্ছে। তার হাতদুটো মুঠোবন্দি করে রিদম বলল,
“আমি আমদানীর মার জেন্টালম্যান বলে তোকে কিছু বলি না। তবে আমার একটা চুল ছিড়লে কিন্তু ভালো হবে না। আমি তোর চুল ন্যাড়া করে দিবো শাকচুন্নী। তারপর ন্যাড়া মাথায় বিয়ে করবি, বলে দিলাম। আমার চুলে হাত দেওয়ার রাইট শুধু আমদানীর মার।“
পৃথুলা ইচ্ছে করে দুটো চুল ছিড়লো। রিদমের চুল অনেক সুন্দর। সিল্কি হলেও খুব শক্ত। তাই ছিড়তে বেগ পেতে হলো। চুল ছিড়ে রিদমের হাতে ধরিয়ে বললো,
“আমার থেকে একশ হাত দূরে থাকবি নয়তো ওই আমদানীর দুনিয়ায় আসার প্রসেস নষ্ট করে দিব।“
বলেই হনহন করে সে চলে গেলো। রিদম হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইলো। কালবৈশাখী ঝড়ে উপড়ে যাওয়া গাছের মতো দাঁড়িয়ে থেকে বিড়বিড় করলো,
“রাখি সাবান্ত কোথাকার। যত অত্যাচার আমার উপর। ধ্যাত।“
ঘড়িতে আটটা বাজে। রাস্তায় গাড়ি কম সেখানে একজন অপরিচিত লোকের আগমন খুব শুভ নয়। কাঞ্চন ভীত চোখে লোকটির দিকে তাকিয়ে আছে। সে একটা বিড়ি ধরিয়ে স্নিগ্ধকে আবার শুধালো,
“স্যার, কি বিপদে পড়ছেন? গাড়ি নষ্ট হইছে?”
স্নিগ্ধ বিচলিত হলো না। খুব স্বাভাবিক স্বরে বললো,
“না কিছু হয় নি।“
লোকটি হাসলো। যার অর্থ সে বিশ্বাস করে নি। বিড়িতে টান দিয়ে বললো,
“সমস্যা হইলে কন। আমরা সাহায্য করতে পারুম। তোয় স্যার যাচ্ছেন কোয়ানে?”
“বললাম তো সমস্যা নেই।“
“স্যারের গাড়ি তো খুব দামী। সাথে দামী ফোন টোন আছে নি? টাকা পয়সা? দিনকাল ভালা না। এই রাস্তাটাও নির্জন। ডাকাতি হয় আজকাল। ডাকাতরা রাস্তায় পিন ফেলায়ে রাখে। গাড়ির টায়ার পাঞ্চার হয়ে যায়। তারা থাকে রাস্তার পাশে ক্ষেতে লুকায়ে। সুযোগ বুইঝা আক্রমণ করে। অনেকে ধরতে চাইতেছে তাগোরে। পারে না। সেদিন বাসে ছিনতাই করলো। বন্দুক ধইরা সব লুইটা নিছে। খবর পড়ছেন?”
ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৩৩
কাঞ্চন আরোও মিশে গেলো স্নিগ্ধর পিঠের সাথে সে কাঞ্চনকে একেবারে নিজের প্রশস্ত শরীরের আঁড়ালে নিয়ে নিলো। লোকটা এরপরেই একটা সাংঘাতিক কাজ করলো। একটা শিষ দিতেই ক্ষেতের পাশ থেকে ছয় সাতজন বন্দুক ধারী লোক বেরিয়ে এলো। স্নিগ্ধের সাথে কথা বলতে থাকা লোকটি তার লুঙ্গির ভাঁজ থেকে বন্দুকটা বের করে মাথায় ঠেকালো স্নিগ্ধর। তারপর ঠোঁটে সেই সরল হাসি বের করে বললো,
“স্যার, আপনের কাছে যা আছে বের করে দেন। কথা দিচ্ছি। জিনিসগুলো নিয়েই আমরা চলে যাব।“
