Home ভুলভাল অন্তরাল ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৩৫

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৩৫

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৩৫
মুশফিকা রহমান মৈথি

রাস্তায় আলো বলতে শুধু স্নিগ্ধের গাড়ির হেডলাইট। মাঝে মাঝে একটা দুটো গাড়ি যাচ্ছে। কিন্তু সেই গাড়ির পরিমান খুব স্বল্প। স্নিগ্ধের প্রশস্ত পিঠের থেকে উঁকি দিলো কাঞ্চন। বর্তমানে পাঁচজন ব্যক্তি তাদের দিকে দেশি কাট্টা বন্দুক তাক করে দাঁড়িয়ে আছে। বৃদ্ধ ব্যক্তিটি এদের সর্দার। বাকিদের মুখে গামছা বাঁধা, ফলে চেহারা দেখা যাচ্ছে না। পরণে ময়লা শার্ট আর লুঙ্গি, প্রায় হাটু অবধি তুলে রেখেছে। চামড়াটা রোদে পুড়ে তামাটে বর্ণের। শুধু সেই চারজনের চোখ দেখা যাচ্ছে। ডাকাত সর্দার বৃদ্ধটির ঠোঁটের একটা রহস্যময় হাসি। কেউ দেখলে অনুমান করতে পারবে না, এই লোকটি ডাকাত।

লোকটির বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি হবে হয়তো। বয়সের হিসাবটা অবশ্য তার মুখ দেখে বোঝা যায় না, কারণ রোদে পোড়া চামড়া আর দীর্ঘদিনের খাটুনির ছাপ বয়সকে একটু বাড়িয়েই দেখিয়েছে।
গায়ের রং শ্যামলা। মুখটা লম্বাটে ধরনের, গালের হাড় সামান্য উঁচু। কপাল বেশ চওড়া। কপালের ওপর দিয়ে অল্প কিছু পাকাচুল বের হয়ে আছে। মাথার চুল আর দাড়ি—দুটোতেই সাদার আধিপত্য। দাড়িটা খুব যত্ন করে ছাঁটা নয়। বরং মনে হয়, দাড়ি নিজের মতো করেই বড় হয়েছে। গোঁফের সঙ্গেও দাড়ি মিশে গেছে। মুখে সবসময় যেন হালকা গম্ভীর ভাব লেগে আছে, যদিও সেই গম্ভীরতার মধ্যে ভয় পাওয়ার মতো কিছু নেই। আর পোড়া ঠোঁটে রহস্যময়ী হাসি। তবে চোখগুলো খুব বিচিত্র, ঠোঁটের হাসি চোখে পৌছায় না।
মাথায় একটা পুরোনো টুপি। ময়লা হয়ে আসল রঙটাই বোঝা যাচ্ছে না। পরনে সাদা, কিংবা একসময় সাদা ছিল এমন একটা ঢিলেঢালা শার্ট। শার্টের নিচে গেঞ্জি দেখা যাচ্ছে। শার্টের কয়েকটা বোতাম খোলা। পকেটটা একটু ফুলে আছে। পকেটে কী আছে বলা কঠিন—হয়তো বিড়ির প্যাকেট, দেশলাই কিংবা এমন কোনো জিনিস যার প্রয়োজন একেবারে অপ্রত্যাশিত সময়ে পড়ে।

শরীর খুব ভারী নয়। রোগাও বলা যাবে না। বরং দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে তৈরি হওয়া শুকনো, শক্ত ধরনের শরীর। কাঁধ দুটো সামান্য ঝুঁকে আছে, কিন্তু তাতে দুর্বলতা নেই। সে বন্দুক তাক করে আছে স্নিগ্ধ এবং কাঞ্চনের দিকে। শক্ত পোক্ত তার হাত। মনে হয়, এই হাত দিয়ে জীবনে অনেক কিছুই করা হয়েছে—কোদাল ধরা থেকে শুরু করে হয়তো কারও মাথায় স্নেহের হাত রাখা পর্যন্ত।
লোকটির সবচেয়ে লক্ষ করার মতো ব্যাপার তাঁর পোশাক নয়, মুখের ভঙ্গি। লোকটার মুখশ্রীতে কোনো ক্রুরতা নেই। অথচ সে বন্দুক ধরে আছে স্নিগ্ধদের দিকে।
স্নিগ্ধর ধাঁরালো চোখ শিকারীর মতো করে পাঁচজনকে পরখ করে নিলো। তার কাছে বর্তমানে বন্দুক নেই। রিভালভার ডিউটি ছাড়া সে ব্যবহার করে না। নিয়ম নেই। স্নিগ্ধ খুব নিয়মের অধীনে থাকা মানুষ। চাকরি জীবনের কোনো নিয়ম সে না পারতে লঙ্ঘন করে না। দুবার করেছে সেটাও মা এবং কাঞ্চনের জন্য। যেকারণে এখন তার কাছে কোনো রিভালভার নেই। সে যদি হ্যান্ড কম্ব্যাট করে, তাহলে এদের পাঁচজনকে ধরাশায়ী করতে সর্বোচ্চ বিশ মিনিট লাগবে। এদের হাতে কাট্টা বন্দুক। তবে এদের হাতের নিশানা দেখে খুব পারদর্শী লাগছে না। এরা এই বন্দুক শুধু ভয় দেখানোর জন্যই ব্যবহার করে হয়তো। কিন্তু এখানে প্রধান সমস্যাই হচ্ছে কাট্টা বন্দুক এবং তার সাথে কাঞ্চন আছে। কাঞ্চন না থাকলে সে এদের পাঁচজন এখানেই নাস্তানাবুদ করে ফেলতো। কোনোভাবে এরা শ্যুট করলে এই নিশানা যেকোনো ভাবে লাগতে পারে। বাংলাদেশে এই বন্দুক এখন অবৈধ। অথচ ডাকাত দলের প্রতটা মানুষের হাতেই এই কাট্টা বন্দুক।
স্নিগ্ধ এখন রিস্ক নিবে না। ফলে খুব শান্ত স্বরে বললো,

“আমাদের কাছে খুব একটা মাল জিনিস নেই। মোবাইল আছে। এছাড়া খুব একটা সোনা বা টাকা নেই। কার্ডে টাকা। কার্ড নিলেও তো আপনারা সেটা দিয়ে টাকা তুলতে পারবেন না।”
“হাতের ঘড়ি, ম্যাডামের গলার চেইন এডিতেই তো লাখ খানেক হইবো। খুইলা লান, খুইলা লান”
স্নিগ্ধ তর্ক করলো না। নিজের ঘড়ি, মোবাইল, কাঞ্চনের গলার চেইন, মোবাইল, মানিব্যাগ সব খুলে সপে দিলো ডাকাত সর্দারের হাতে। লোকটির কাছে গামছা আছে। সে সেই গামছাতে সবকিছু নিলো। তবে খুব সাবধানতার সাথে স্নিগ্ধ কাঞ্চনের আঙ্গুলের আংটিটা আড়াল করে ফেলল। ফলে ডাকাতেরা সেটা দেখতে পেলো না। কাঞ্চনের হাত এখনো স্নিগ্ধের হাতের মুঠোতে। সে টিকটিকির মতো লেগে আছে স্নিগ্ধের সাথে। তার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। কাঞ্চন ভীতু নয় কিন্তু বেশি দিন হয় নি তার কিডন্যাপিং এর ঘটনার। ওখানে রক্তারক্তি তার মস্তিষ্কে আবারোও হানা দিয়েছে। তাই তার হাত কাঁপছে।
ডাকাত সর্দারের মুখে স্পষ্ট অপ্রসন্নতা। খুব বেশি মালদার ভেবেছিলো এদের কিন্তু লাখ তিনেকের বেশি জিনিস নেই এদের কাছে। কাঞ্চন স্নিগ্ধের পেছন থেকে উঁকি দিয়ে শুধালো,
“ডাকাত মামা আমাদের ছেড়ে দিন। সব তো নিয়েই নিয়েছেন!”
স্নিগ্ধ কাঞ্চনের কথায় এবার সত্যি চমকালো। ভ্রু উঁচিয়ে গম্ভীর স্বরে শুধালো,

“মামা লাগে তোর?”
“তো কি ভাই বলবো? বয়সে বড় তো!”
কাঞ্চনের কণ্ঠে অসহায়ত্ব। যেন এই প্রশ্নটাই এখন পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল সমস্যা। তাদের ফোন নেওয়া হয়েছে, ঘড়ি, মানিব্যাগ, চেইন সব তাদের কবজায়। অথচ কাঞ্চনের দ্বিধা সে ডাকাতকে মামা ডাকবে নাকি ভাই? স্নিগ্ধ কঠিন গলায় শুধালো,
“তোর হারায়ে যাওয়া আত্নীয় এরা?”
“আজিব। তো কি নাম ধরে ডাকবো?”
কাঞ্চন সত্যি সত্যি অসহায় গলায় শুধালো। স্নিগ্ধর চোখ বিস্ফারিত হলো। সে নিজেকে শান্ত রাখার যত চেষ্টা করে এই মেয়েটি ততটাই তাকে অশান্ত করে তুলে। যেন কাঞ্চনের ব্রত স্নিগ্ধের শান্ত সরোবরের জীবনকে উথাল-পাতাল করা। এদিকে ডাকাত সর্দার এদের দুজনের ঝগড়া দেখে অত্যন্ত বিরক্ত হলো। এই দুজন বিগত আঁধাঘন্টা ঝগড়া করেছে। ফলে ডাকাতদের ঝাড়ঝোপের মধ্যে বসে থাকতে হয়েছে। কত কত মশাকে তারা রক্ত দান করেছে সেটার ঠিক নেই। মুখ খিঁচিয়ে বললো,
“এই আপনারা এতো ঝগড়া করেন কেন?”
কাঞ্চন আবার তার মায়া মায়া গলায় বললো,
“এটা একটা ইতিহাস। আসেন বসেন বলছি। ডাকাতি তো করবেন ই, আসেন আমাদের ইতিহাসটা শুনেন। তারপর আপনারাই বিচার করেন কে ভুল আর কে ঠিক!”
স্নিগ্ধ হতভম্বের মতো চাইলো। তার বউয়ের মাথার তারগুলো জট পাকানো। বিষয়টা তার অজানা নয়। কিন্তু তাই বলে এতো? এই জট ছাড়ানো কি সত্যি সম্ভব?

ওয়াশরুম থেকে রেগে মেগে বের হলো পৃথুলা। তার হাত জ্বলছে। দু তিনটা চড়ও রিদমের পিঠে দিয়েছে সে। ফর্সা হাতের তালু টকটকে লাল হয়ে গিয়েছে। অথচ হাতের জ্বলুনি তার অনুভব হচ্ছে না। বুকের ভেতরের চিনচিনে ব্যথায় সে দগ্ধ হচ্ছে। চোখ জ্বলছে। বারবার চোখ লাল হয়ে যাচ্ছে। অশ্রু ভিড় করতে চাচ্ছে। ছেলেটা তাকে আর কত জ্বালাবে!
পৃথুলা এবং রিদমের প্রেমের সূচনা পৃথুলার পক্ষ থেকে হয় নি। হয়েছিলো রিদমের পক্ষ থেকে। কোনো এক গোধূলী রাঙ্গা বিকেলে ছেলেটা এসে তাকে বলেছিলো,
“এই শাকচুন্নী, আমার পার্সোনাল শাকচুন্নী হবি!”
“থাবড়া খাবি?”
রিদম তার কপালের উপর পড়ে থাকা সিল্কি চুলগুলো বা হাতে টেনে বললো,
“আরে বিয়ে তো পটনভীকেই করতে হবে। আমি কিন্তু ভালো অপশন।”
“মরে যা তো! বিষ কিনার টাকার অভাব হলে আমাকে বলিস!”

পৃথুলা সেই দফায় তাকে উড়িয়ে দিয়েছিলো। কাঞ্চনের প্রেমে ছ্যাকা খেয়ে বাঁকা হওয়া সিনারি স্বচক্ষে দেখার পর তার প্রেম করার সাহস হয় নি। উপর থেকে রিদম একটা দমকা হাওয়ার মত। এলোমেলো, বিচ্ছিন্ন, ছন্নছাড়া। ছোটবেলা থেকে নিজের বাবা-মার বিশ্রী, তিক্ত সম্পর্ক দেখতে দেখতে পৃথুলা অতিষ্ট। বাবা মায়ের আড়ালে তার সাথে প্রতারণা করছে। মা বুঝেও চুপ করে আছে এই আশায় যে বাবা তার ভালোবাসা ঠিক একদিন বুঝতে পারবে। মা যে মনের দিক থেকে কতটা যন্ত্রণা সহ্য করছেন সেটা তিনি ব্যতীত কারোর পক্ষেই বোঝা সম্ভব নয়। একটা মানুষকে নিজের আত্মসম্মান বলি দিয়ে ভালোবাসা, তার অনুগ্রহে বাঁচা যন্ত্রণাদায়ক ই বটে। সেই অসহ্য যন্ত্রণা কমাতেন তিনি পৃথুলার উপর অত্যাচার করে।
মা যখন পৃথুলার গায়ে হাত তুলতেন এবং তাকে গালমন্দ করতেন প্রথমে পৃথুলার মনে হতো দোষটা তার। তার জন্যই মায়ের এতো কষ্ট। কিন্তু ধীরে ধীরে অনুভূত হলো মা স্বার্থপর। সে তাকে দোষ দেয় কারণ এ ছাড়া তার অসহনীয় যন্ত্রণা উপশম করা সম্ভব নয়।মানুষ নিজের ভুল স্বীকার করার থেকে অন্যকে দোষারোপ করে একটু হলেও শান্তি খোঁজার চেষ্টা করে। পৃথুলার মা মনোয়ারা পটনভীও ব্যতিক্রম নয়।এই সবকিছুই হচ্ছে তার তীব্র ভালোবাসা আর অবসেশনের ফলাফল। তাই এই প্রেম থেকে যত দূরে থাকা যায় তত মঙ্গল।
তবে এটা তো মিথ্যে নয় রিদম একটা মায়াজাল। তার হাসিও ইন্দ্রজালের মত। পৃথুলার মতো অতিরিক্ত চিন্তা করা মেয়েটিও শত চিন্তা ভাবনার পরও বাউন্ডেলে ছেলেটার প্রেমে পড়লো। সে রিদমকে প্রথমেই জানিয়ে দিয়েছিলো,

“তোর মরার ভালোবাসার লোভ আমার নেই, কিন্তু তুই শুধু আমার হবি।”
রিদম শুধু হেসেছিলো তখন। পৃথুলা তার মাকে অপছন্দ করে। কিন্তু তার মধ্যেও মায়ের বৈশিষ্ট্যই বিদ্যমান। রিদমের প্রতি তার প্রেমটা কখন যে তিক্ত অবসেশন হয়ে গেলো সে টের পেলো না। রিদমের সাথে অন্য কারোর উপস্থিতি এতোটা অসহ্য লাগবে সেটাও তার অজানা ছিলো।
রিদম স্বাধীনচেতা পুরুষ। তার জনপ্রিয়তাও অনেক। তার বন্ধুর সংখ্যা অগণিত। মেয়ে ছেলের মধ্যে কোনো বাছবিচার নেই। যেহেতু তাদের ফ্যাকাল্টি আলাদা, ভার্সিটিতে পৃথুলার সাথে ব্রেক ছাড়া দেখা হত না। রিদম নিজের বৃত্ত নিয়েই ব্যস্ত থাকতো। পৃথুলা প্রায় তাকে দেখতো মেয়েদের সাথে আড্ডা দিচ্ছে, হাসাহাসি করতে। এই দৃশ্যটা তার মাথায় আগুণ জ্বালিয়ে দিত। রিদমকে যতবার শুধাতো, রিদমের ভাষ্য হত,

“ওরা আমার বান্ধবী শাকচুন্নী। আমি তোকে চিট করছি না।”
“তাহলে তোর ফেসবুক পাসওয়ার্ড দে!”
“তুই আমার ডিএম চেক করবি?”
“হ্যা!”
রিদমের মুখশ্রী শক্ত হয়ে যেত। গম্ভীর গলায় বলতো,
“তোর ট্রাস্ট ইস্যু আছে। আমি তো তোকে কিছু চেক করছি না। এটা তোর স্পেস। তুই আমাকে অন্তত আমার স্পেসটা দে।”
“ভয় পাচ্ছিস?”
“আমি তোকে চিট করছি না। কিন্তু আমার পার্সোনাল স্পেসে তোর এমন হস্তক্ষেপ আমার ভালো লাগছে না। তুই আমার গার্লফ্রেন্ড। আমি তোকে ভালোবাসি। কিন্তু এর মানে এটা না যে তুই আমার উপর খবরদারি করবি।”

পৃথুলা অধৈর্য হয়ে যেত। তার মনে সন্দেহ বাড়তো। একদিন রিদম বিরক্ত হয়ে তাকে নিজের সব চ্যাটও দেখিয়েছিলো। তাদের অনেক মেয়েদের ম্যাসেজ কিন্তু সন্দেহজনক কিছুই ছিলো না। তবুও পৃথুলার মন শান্ত হয় নি। তার মনে হয়েছিলো রিদম হয়তো চ্যাট ডিলিট করে দিয়েছে। সে রিদমের পাসওয়ার্ড, এক্সসেস চাইলো। রিদম তার বদলে সরাসরি বললো,
“পাসওয়ার্ড এক্সচেঞ্জ যদি আমার লয়ালটির প্রুফ হয়, সরি আমি ফেইল করাই পছন্দ করবো। প্রতিটা মানুষের নিজস্ব একটা স্পেস থাকা প্রয়োজন। আমার পার্টনার যদি আমার স্পেসকে সম্মান না দেয় তবে আই ডাউট আমার পার্টনার আমাকে আদৌও ভালোবাসে তো।”
ভালোবাসার কফিনে শেষ হাতুড়িটা পৃথুলাই মেরেছিলো। রিদমের প্রিয় এক বান্ধবীর চুল কেটে। এর পরই রিদম তাকে স্পষ্ট গলায় জানালো,

“তোর ভালোবাসাটা আমার স্বস্তি দিচ্ছে না, বরং গলা টিপে ধরছে পৃথুলা। আমি নিঃশ্বাস নিতে পারি না তোর সাথে। তোর এই টক্সিক বিহেভিয়ার আমার তিক্ত লাগে। আমি চাইনা তোকে ঘৃণা করতে। যে কাঁচে হাত কাটে, সে কাচের ঘর আমার চাই না। এর থেকে আমাদের আলাদা হওয়াই শ্রেয়।”
পৃথুলা রিদমকে আটকায় নি। কাজিনমহলকে জানানো হলো তাদের প্রেম ক্যান্সেল। যা ছিলো তা সব ফক্কা। তবে কাউকে ভালোবাসলে বোধহয় হুট করে বন্ধ করে দেওয়া যায় না। হৃদয়ে একজনকে স্থান দিলে তাকে ঠেলে বের করা যায় না। বরং সময়ের সাথে সেই টানটা গাঢ় হয়। পৃথুলাও পারে নি। রিদমও পারে নি। তাদের মধ্যকার টানটা চাইলেও আটকাতে পারে নি। না চাইতেও একে অপরকে ভালোবেসেছে। কিন্তু সেটা মুখে প্রকাশ করার ইচ্ছে হয় নি। তাদের ভেতরে তিলে তিলে ফোঁটা প্রেমকুসুমটা আঁকুতি জানাচ্ছে একটু বেঁচে থাকার। কিন্তু এক অদৃশ্য দেওয়াল তুলে দিয়েছে তারা। এই দেওয়ালটা এতোটাই শক্ত যে ভেঙ্গে গুড়িয়ে ফেলা সম্ভব নয়।
পৃথুলার চোখ লাল। ফর্সা মুখটাও কঠিন দেখাচ্ছে। পারভেজ ইংলিশে বললো,

“খাবে না?”
পৃথুলা ধীর স্বরে বললো,
“বাড়ি যাব।”
তাকে ক্লান্ত লাগছে। পারভেজের মুখ খানা বেজার হলো। সে নিজের অসন্তোষ লুকাতে পারলো না। জিজ্ঞেস করেই বসলো,
“কেন?”
“আমার খারাপ লাগছে”
পৃথুলা ছোট করে উত্তর দিলো। পারভেজ বিল চুকালো। সে আরোও ঘুরতো। একটু ক্লাবে যাওয়ার ইচ্ছে ছিলো। বাংলাদেশের কিন্তু পৃথুলা খুব বোরিং।
মার খেয়ে ওয়াশরুম থেকে এলোমেলা হালে বের হলো রিদম। তাকবীর তার অবস্থা দেখে ফিসফিসিয়ে শুধালো,
“তোর উপর কি ঝড় গেছে?”
“না, আয়লা আর সিডর মিক্স। হালকা করে সুনামি। আর সবশেষে ভুমিকম্প।”
“কি বলতেছিস?”
রিদম তাকবীরের কাঁধে হাত রেখে বললো,
“একটা জ্ঞান দেই, মেয়ে মানুষ আসলে সব এক। যতই মাদার তেরেসা লাগুক না কেন তার মধ্যেও রাখি সাবান্ত থাকে। তাই মেয়েদের থেকে দশ হাত দূরে থাকবি। একবার প্রেমে পড়লে তোকে বাঁচাতে কেউ পারবে না।”

গাড়ির বোনেটে ঠেস দিয়ে বুকের উপর হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে সরফরাজ পটনভী। তার দৃষ্টি স্থির। গালের ভেতরে জিহবা দিয়ে মাংস ঠেলছে সে একটু পর পর। পৃথিবীতে অনেক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে। কিন্তু তার চাকরি জীবনে এমন বিস্ময়কর ঘটনা ঘটেছে বলে মনে পড়ছে না। তার সামনে তার স্ত্রী নিজের গোলাপি আনারকলিটার ঘের ছড়িয়ে বসে রয়েছে। তাকে ঘিরে বসে রয়েছে ডাকাত দল। সর্দার নিজের বন্দুক নামিয়ে রেখেছেন। কাঞ্চন বেশ মনোযোগের সাথে তার বিয়ের গল্প করছে। শুরু থেকে এই পর্যন্ত। তারপর সে প্রশ্ন করলো,
“এবার আপনারা বলুন এই লোকের সাথে কি সংসার করা যায়?”
ডাকাত দলের সর্দার একটু চিন্তায় পড়লেন। তাদের খাবি খাওয়ার মতো অবস্থা। কাঞ্চনের গল্প শুনতে বসা জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। বিষয়টা তারা বুঝতে পারছে। সর্দার থুতনি ঠেকালেন আঙ্গুলে। তিনি দ্বিধান্বিত। মূর্খ ডাকাত মানুষের মস্তিষ্কের জটিলতা বুঝছে না। সে সরল গলায় বলল,

“মা, বিয়া তো হয়ে গেছে!”
“হ্যা, কিন্তু সেই বিয়ে তো আমার মত নেই। বিয়েটা তো আমার জন্য একটা শাস্তি। এই লোককে আমি পছন্দ করি না। তার বউকে আমি ভাগাইও নি। অথচ এই লোকটার গলায় আমাকে ঝুলিয়ে দেওয়া হলো। তাও যদি লোকটা একটু ভালো হলো। সবসময় আমার স্বাধীনতায় বা হাত ঢুকাবে। আমি কোথায় যাব, কি খাবো সব তার পছন্দ মত হবে! কেন?”
“স্বামীর কথা শোনা স্ত্রীর জন্য ফরজ!”
“কবে থেকে?”
“এইডা তো শুরু থেকে।”
সর্দারের মুখ ফ্যাকাশে। তিনি এই নারীকে বোঝাতে যেয়ে ক্লান্ত। কাঞ্চন ভ্রু কুঁচকালো। মাজায় হাত দিয়ে শুধালো,

“আর স্ত্রীর কথা? কোনো দাম নেই?”
“তা হইবো কেন?”
“আপনি আপনার স্ত্রীর কথা শুনেন?”
“আমার স্ত্রী অবুঝ মেয়ে মানুষ। ও নিজেই তো বুঝে না কিছু।”
সরল উত্তর। কাঞ্চন সাথে সাথে স্নিগ্ধর দিকে চাইলো। তার ঠোঁটে কুটিল, বাঁকা হাসি। যার অর্থ,
“কি উত্তর পেলি?”
কাঞ্চন হার মানলো না। সে প্রত্যয়ী স্বরে বলল,
“এই আপনাদের এক দোষ। স্ত্রী অবুঝ আর নিজেরা সেয়ানা। এই ছোকরা তুমিও কি তোমার বউয়ের কথার মূল্য দাও না।”
গামছা দিয়ে মুখ ডাকা ছোকরাদের একজনকে শুধাতেই সে লজ্জিত গলায় বললো,

“আমার বিয়ে হয় নি।”
“তুমি বাদ, নেক্সট!”
আরেকজন বললো,
“আমার স্ত্রী তো কথা বলতেই লজ্জা পায়। কিন্তু আমি তারে খুব ভালোবাসি।”
কাঞ্চন এবার স্নিগ্ধর দিকে চাইলো। ভ্রু নাচিয়ে ইশারা করলো। যার অর্থ,
“ডাকাতও তার বউকে ভালোবাসে।”
স্নিগ্ধ সাথে সাথে ভারী গলায় বলল,
“দে আর ক্রিমিনালস!”
“দেখেছেন, দেখেছেন। এই যে। এই কারণে এই লোকটাকে আমার অপছন্দ। কাউকে দাম দেয় না। নিজে যা বুঝবে সেটাই ঠিক। উনি হলেন নবাব হাতিউল্লাহ। আর সবাই তার দাস। বলি আমাকে ভালোবাসলেও আমি মানতাম। সে তো আমাকে ভালোবাসে না। লাভলেস ম্যারেজ চায়। লাভলেস ম্যারেজে শান্তি আছে? বলেন?”

“হেইডা কি?”
“যে বিয়েতে ভালোবাসা থাকে না।”
“এইডা তো ভালা কতা না স্যার।”
স্নিগ্ধ কঠিন চোখে তাকালো সর্দারের দিকে। সর্দার সাথে সাথেই বন্দুক তাক করলো। অস্বীকার করার জো নেই এই পুরুষের চাহনী ভয়ংকর। কেমন একটা বেপরোয়া ভাব। যদি এই মেয়েটা সাথে না থাকতো তবে হয়তো তাকে কোণঠাসা করা মুশকিল হত। কাঞ্চন এর মধ্যে উদাস গলায় বলে উঠলো,
“বিয়েটা আমার মতে হয় নি। আমআকে জোর করে দেওয়া হয়েছিলো। এখন পর্যন্ত যা হচ্ছে কিছুতেই আমার মতের কোনো দাম দেওয়া হয় নি। আগামীতেও আমার মতের কোনো দাম থাকবে না। কারণ নবাব হাতিউল্লাহর কাছে নিজে বাদে কারোর দাম নেই। আমি কাউকে অভিযোগও দিতে পারি না। আমার তো বাবা মাও নেই! কাকে বলবো? এখন বলুন আমি ঝগড়া করবো না তো কি করবো? অন্তত চুপ করে অন্যায় সহ্য করার থেকে প্রতিবাদ করা উচিত। ইনকেলাব জিন্দাবাদ!”
সর্দার অসহায় স্বরে বললেন,

“এমনে সংসার করবা কেমনে মা?”
“সংসার কে করবে?”
“সংসার করতা না? মাইয়া মানুষের সংসার হইলো শান্তির জায়গা। জানো তোমার মামী একটা ভালা মহিলা। আমার মতো পাপীর লগেও হাসি মুখে সংসার করতেছে। এখন বাড়ি যাইয়া তোমার মামীর হাতের ভর্তা আর গরম ভাত খামু!”
কাঞ্চন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
“এই আপনাদের জেনারেশনের সমস্যা। আচ্ছা, আপনি ডাকাতি করেও ভর্তা ভাত খাবেন? তাহলে ডাকাতি করে কি লাভ?”
সর্দার হাসলেন মৃদু। বুক চিরে আগত দীর্ঘশ্বাস গোপন করে বললেন,
“আমার একটা মাইয়া আছে। মাথা নষ্ট। বয়স হইছে কিন্তু বুদ্ধি বাচ্চাগোর। ওরে ইঞ্জেকশন দেওন লাগে রে মা। অনেক খরচ। ডাকাতি কইরা যা পাই তাই দিয়া ওর চিকিৎসা করাই। এতো খরচ কিডায় দিবে কও। এই পোলাডি। এরাও অসহায়। আর ডাকাতির বাজার মন্দা চলতাছে। কাস্টোমার নাই। আগে সপ্তাহে একটা হাত দিতাম, এখন মাসে একটা দেই। বড়ই সমস্যা!”
সর্দারের কথায় কাঞ্চনের মনটা নরম হলো। কেন যেন একটু মায়া হলো। পৃথিবীতে সবাই অসহায়। স্নিগ্ধ সময় গুনছে। ঘড়ি হাতে না থাকলেও সময় আন্দাজ করাটা কঠিন নয়। সে কাউন্ট ডাউন করছে,

“দশ, নয়.. তিন, দুই, এক”
বলতেই দুটো জিপ এসে ব্রেক কষলো। নড়ে চড়ে উঠলো ডাকাতেরা। সভা ভঙ্গ হলো। বাঘের মতো হামলে পড়লো ব্যারাকের অফিসাররা। তারা সুযোগও পেলো না নিজেদের সামলানোর। পালানো তো অকল্পনীয়। স্নিগ্ধের ঠোঁট চিরে হাসি উন্মোচিত হল। কাঞ্চন হতভম্ব হলো আকস্মিক ঘটনায়। অফিসাররা লাঠির দিয়ে পেটাচ্ছে ডাকাতদের পশ্চাতে। তারা ব্যথায় আর্তনাদ করছে। স্নিগ্ধ র‍্যাব অফিসার সেটা তারা চিন্তাতেও আনে নি। কাঞ্চনের দৃশ্যটা ভালো লাগলো না। কেন যেন মায়া হচ্ছে। স্নিগ্ধকে নিষেধ করার উপায় নি। সে আইনী লোক। ফলে মুখে না বলে শার্টের হাতা ধরে একটু টানলো। স্নিগ্ধ তার দিকে চাইতেই সে স্নিগ্ধর দিকে অসহায় চোখে তাকালো। স্নিগ্ধ কাঞ্চনের চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো কিছুসময়। তারপর চ সূচক শব্দ করে বিরক্তি জাহির করলো। অফিসারদের আদেশের স্বরে বললো,
“অফিসারস, স্টপ নাও। এই লোকেশনের আন্ডারের থানাতে এদের হ্যান্ডওভার করে আমাদের ফেরা উচিত।”
অফিসারেরা থেমে গেলো। ডাকাতদের অবস্থা খুব নাজেহাল। সর্দার কাবু হয়ে গেছে। তাদের এক কিলো দূরে থানাতে হ্যান্ডওভার করা হলো। এই ডাকাত দলটাকে বহুদিন ধরে খুঁজছে পুলিশ। স্নিগ্ধকে পারলে তারা মাথায় তুলে নাচে। থানার ওসি গদগদ স্বরে বললেন,

“স্যার আপনি একটুও ক্রেডিট নিবেন না?”
স্নিগ্ধ অন ডিউটিতে না। তাই ক্রেডিট সে নিবে না। ওসি এই রাতের মধ্যেও চা সাধলো কৃতজ্ঞতায়। সব ফর্মালিটিস মেইনটেইন করে জুনিয়ার অফিসার শুধালো,
“স্যার, আপনারা কি এখন বাড়ি ফিরে যাবেন?”
স্নিগ্ধ চাইলো কাঞ্চনের দিকে। কাঞ্চন কেমন চুপসে আছে। র‍্যাব অফিসারদের মায়াদয়াহীন আচারন দেখে সে কিছুটা হলেও বিভ্রান্ত। ফলে তার গায়ে হালকা টোকা দিয়ে টিটকারী দিয়ে স্নিগ্ধ বলল,

“আপনার মূল্যবান মতটা দিন ওয়াইফি। আমি শুনবো। পরে তো ভ্যা ভ্যা করবেন আমি আপনার মত শুনি না।”
“আমি এখন ঢাকায় যাব!”
“আচ্ছা, ব্যারাকে আজ রাতটা থাকবো। অলরেডি দশটার উপরে বাজে!”
কাঞ্চন হা হয়ে বললো,

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৩৪

“তুমি তো মাত্র বললে আমার কথা শুনবে।”
“শুনবো বলেছি। মানবো বলিনি তো!”
নির্লিপ্ত উত্তর স্নিগ্ধর। কাঞ্চন কটকট করে চেয়ে রইলো কিছু সময়। তার চোখ থেকে আগুণ ঝড়ছে। স্নিগ্ধ ঘাড়টা ঘুরিয়ে বললো,
“এতো তাকিয়ে থাকিস না। প্রেমে পড়ে যাবি।”
“অসহ্য!”

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৩৬