মেজর কারদার পর্ব ৩৯
ফিনারা ঝুমুর
নিশুতি পার হয়ে দিন গড়িয়ে ফের নিশুতির আগমন ঘটেছে। কারদার বাড়িতে একে একে পুনর্মিলন ঘটছে ভালোবাসার প্রতিটি মানুষের মাঝে।
আজ আয়োজিত হয়েছে জমকালো ‘হলুদ সন্ধ্যা’। কাঁচা হলুদ রঙের একখানা মোহনীয় লেহেঙ্গায় বধূ সাজে বসানো হয়েছে কিঞ্জাকে। কিঞ্জাকে ঘিরে গোল হয়ে বসে আছে বাড়ির সবাই। ওর ঠিক সামনে স্টেজে চলছে ঝকঝকে ও প্রাণবন্ত নাচের অনুষ্ঠান! ‘বালাম পিচকারি’ গানের তালে তালে একদম উড়াধুড়া নাচজুড়ে দিয়েছে ওর অবাধ্য ভাইয়ের দল! তবে আজকের এই আসরের সবচেয়ে বড় বিস্ময়ের বিষয় হলো সেই নাচে তাল মিলিয়ে পরম আনন্দে যোগ দিয়েছে গম্ভীর স্বভাবের মেজর শীর্ষও!
শীর্ষর এক গালে চকচকে জরি লেগে আছে, পরনে কাঁচা হলুদ রঙের চমৎকার পাঞ্জাবি আর গলায় ঝুলছে লাল রঙের একটা ওড়না। নাচতে নাচতে সে হুট করে মেঘের লেহেঙ্গার সুবাসিত দোপাট্টাটা নিজের হাতের তালুতে পেঁচিয়ে ধরে গান গেয়ে ওঠে,
“বালাম পিচকারি জো তূনে মুঝে মারি,
তো বোলে রে জমানা খরাবি হো গয়ি!”
কথাটা শোনামাত্রই মেঘ তার লেহেঙ্গার দোপাট্টাটা এক টানে কেড়ে নিয়ে নিজের সরু কোমরে দু-হাত রেখে মিষ্টি ঢঙে নাচতে নাচতে উল্টো সুর ধরে জবাব দেয়,
“মেরে অঙ্গ রাজা জো তেরা রঙ লাগা,
তো সিধি সাদি ছোরি শরাবি হো গয়ি!”
ওদিকে নাচের একই জোয়ারে ভেসে নোমানও নিজের মনের মানসী মিথিলার সাথে একদম তাল মিলিয়ে নাচে মেতে উঠেছে। এক কথায় বলতে গেলে—সদা গোমড়ামুখ গম্ভীর মেজর শীর্ষ কারদারও আজ নিজের মিষ্টি বিবির ভালোবাসার ফাঁদে পড়ে পুরোদস্তুর নাচিয়ে বনে গেছে!
গানের চরম মাতাল মুহূর্তটায় মেঘ সকলের অলক্ষ্যে সুযোগ বুঝে শীর্ষর দিকে চোখ টিপে একখানা মিষ্টি ফ্রেঞ্চ কিস ছুড়ে মারে! মেঘের কাছ থেকে পাওয়া এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ও খোলামেলা ভালোবাসার পরশ দেখে হুট করে শীর্ষর হাত থেকে খসে পড়ে মেঘের নরম হাত। আর সুযোগসন্ধানী মেঘও এক মুহূর্ত দেরি না করে শীর্ষকে আলতো এক ধাক্কা দিয়ে খিলখিল করে হাসতে হাসতে স্টেজ ছেড়ে নিচে নেমে যায়!
শীর্ষও আর এক মুহূর্ত দেরি না করে হালকা হেসে সোজা ছুট লাগায় চঞ্চল মেঘের পিছু পিছু! ওদের এই খুনশুটি ভরা মিষ্টি দৌড়াদৌড়ি দেখে তিথি সুযোগ বুঝে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নিরবের কানের কাছে পরম ভাব নিয়ে ফিসফিস করে বলে,
“নিজের ওই বড় চাচাতো ভাইয়ার থেকে অন্তত কিছুটা তো শেখো! দেখো, কীভাবে সার্বক্ষণিকভাবে বউয়ের আঁচলটা শক্ত করে ধরে পেছনে পেছনে ঘুরতে হয়!”
নিরব বিরস ও গম্ভীর মুখ করে দূর থেকে ছুটতে থাকা শীর্ষকে উদ্দেশ্য করে বিবিড় করে স্বগতোক্তি করে,
“তুই তো নিজে বিবির প্রেমে পইড়া মড়বিই… সাথে সাথে এমন আদর্শ দেখায়ে আমাকেও শেষমেশ মাইরা ছাড়বি রে ভাই!”
ওদিকে জনতার ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকা অহংকারী ইভান পরম আক্রোশ ও তীব্র হিংসাপূর্ণ চোখে চেয়ে আছে মেঘ আর শীর্ষর এই গভীর ঘনিষ্ঠতাপূর্ণ রূপের পানে। কিন্তু সেসব বিষাক্ত দৃষ্টিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, স্টেজের পেছনের নিরিবিলি আঁধার স্থানে মেঘকে দেয়ালের সাথে ঠেকিয়ে ওর সরু কোমর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে পরম অনুরাগে ওষ্ঠ মিলনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে বেপরোয়া মেজর শীর্ষ!
আর এভাবেই প্রেম, আনন্দ, খুনশুটি আর অগোচরে জমতে থাকা কালচে কুটিলতার মাঝে মহাসমারোহে সমাপ্ত হয় কিঞ্জার প্রাণবন্ত হলুদ রাত।
সকালে কারদার বাড়িজুড়ে চরম ব্যস্ততার ধুম লেগে গেছে। ওদিকে রান্নার দিকে রাজকীয় ভোজ তৈরিতে ব্যস্ত বাবুর্চির দল। আজকের বিশেষ খাবারের পদে রয়েছে সুস্বাদু কাচ্চি বিরিয়ানি, টক-মিষ্টি বোরহানি, শাহী ফিরনি, সুবাসিত চিকেন রোস্ট, ঝরঝরে পোলাও, রঙিন জর্দা, মুচমুচে জালি কাবাব, খাসির আস্ত রোস্ট, মসলাদার খাসির রেজালা, মাখা মাখা গরুর মাংস, তুলতুলে নান, তাজা দই, রসালো মিষ্টি আর সুবাসিত পান। সাথে বাহারি সালাদ তো আবশ্যক! সব মিলিয়ে রাঁধুনীগণ রান্না সামলাতে বেজায় ব্যস্ত।
অন্যদে বাড়ির অভ্যন্তরে ছোট-বড় সকলেই নিজেদের সাজগোজের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছে। নিজের ঘরের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পেঁচিয়ে থাকা শাড়ির কুঁচি বারবার ঠিক করার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মেঘ। ওর মেদহীন শ্যামলা শরীরে আজ শোভা পাচ্ছে মিষ্টি লাইট পিংক রঙের একখানা আকর্ষণীয় শাড়ি।
“ধ্যাত! কিছুতেই যে শাড়ির কুঁচিগুলো সোজা হচ্ছে না!”
“এনি প্রবলেম, মাই ব্ল্যাক ব্যাট?”
ঘরের খোলা দরজায় অতি আবেদনময়ী ও রাজকীয় রূপে দাঁড়িয়ে প্রশান্তির গলায় প্রশ্ন করে শীর্ষ। ওর সুঠাম শরীরে আজ শোভা পাচ্ছে অফ-হোয়াইট রঙের কটি যুক্ত আভিজাত্যপূর্ণ পাঞ্জাবি, আর হাতে বাঁধা চওড়া কালো বেল্টের বিলাস বহুল ঘড়ি।
“দেখুন না মেজর সাহেব, শাড়ির কুঁচিটা কিছুতেই মনের মতো করে করতে পারছি না!”
“এদিকে এসো!”
মেঘ অবুঝের মতো শীর্ষের কথা মেনে সোজা তার কাছে এগিয়ে আসে। শীর্ষ মুহূর্তের মাঝে কোনো দ্বিধা না রেখে ওর সামনে এক হাঁটু মুড়ে মেঝেতে বসে পড়ে, তারপর অতি যত্ন নিয়ে একে একে নিখুঁতভাবে ঠিক করে দেয় শাড়ির প্রতিটা ভাঁজ ও কুঁচি। মেঘ কেবল এক দৃষ্টিতে অপলক মুগ্ধতা নিয়ে দেখতে থাকে স্বামীর এই বিরল ও ভালোবাসা মাখানো দৃশ্য।
তবে মেঘের এই বিভোর অবচেতনার সুযোগ নিয়ে শীর্ষ আলতো হাতে ওর উন্মুক্ত নাভির নিচটাতে শাড়ির নিখুঁত কুঁচিগুলো গুঁজে দেয়! আচমকা সেই পুরুষালি স্পর্শে শিহরিত হয়ে কেঁপে ওঠে মেঘ! শীর্ষ ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে পরম অধিকারে মেঘের ফর্সা পায়ের পাতাটা তুলে নেয় নিজের সুঠাম হাঁটুর ওপর। হাতের সুকোমল স্পর্শ দেয় সেই নগ্ন পায়ে, যার ছোঁয়ায় মেঘের পুরো দেহে এক অচেনা তীব্র শিহরণ বয়ে যায়! নিমেষেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে মনের গভীরে থাকা অবাধ্য অনুভূতিরা।
শীর্ষ পরম অনুরাগে মেঘের নমনীয় পায়ের পাতায় নিজের ওষ্ঠ ডুবিয়ে এক গভীর চুমু খায়! মেঘ নিজেকে সামলে রাখতে শীর্ষর পাঞ্জাবির কাঁধের শক্ত অংশ দু-হাতে খামচে ধরে কোনোমতে দাঁড়িয়ে থাকে।
পায়ের পাতায় পবিত্র চুমুর পরশ এঁকে দিয়ে নিজের পকেট থেকে চকচকে একজোড়া নিখুঁত সোনার নূপুর বের করে শীর্ষ। পরম যত্নে তা মেঘের কোমল পায়ে পরিয়ে দেয়। গাঢ় ও নেশালো গলায় বিড়বিড় করে বলে,
“আমার একান্ত পুষ্পরিত ব্ল্যাক ব্যাট ফ্লাওয়ার… মাই অনলি ফ্লাওয়ার!”
মেজর কারদার পর্ব ৩৮
মেঘ পরম বিস্ময়ে চোখ নামিয়ে নিচে চেয়ে দেখে—সোনার সেই অপূর্ব নূপুরজোড়ার মাঝখানে অতি যত্ন ও সূক্ষ্ম কারুকার্যে আটকে দেওয়া রয়েছে একখানা ছোট চমৎকার ‘ব্ল্যাক ব্যাট ফ্লাওয়ার’!
ভালোবাসার এমন অপূর্ব নিদর্শন দেখে মেঘের মুখ থেকে আপন মনেই নির্গত হয়,
“অপূর্ব…!”
