Home মন পবনে বৃষ্টি মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ১৬

মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ১৬

মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ১৬
তাসনিয়া নুর

বিলের মাঝ দিয়ে হাটছে আবইয়াজ, মেহু, মাহির, আহির, চিত্রা, মাইরা, ননী ।আজকে আকাশ স্বচ্ছ। কুয়াশা নেই। সূ্য্যি মামা তার প্রখরতা নিয়ে ধরনীতে আবির্ভূত হয়েছে। বিলের চারদিক শা শা বাতাস বইছে । অদূর থেকে ভেসে আসছে পাখির কলকল ধ্বনি । চিত্রা দুহাত মেলে প্রকৃতি অনুভব করতে ব্যস্ত। আহির নিজ মনে বিড়বিড় করেই চলেছে। কে জানি আজকে আবার কি করবে, প্রত্যেকবার শুধু তাকে একা ফেলে সবগুলো পালিয়ে যায় । এবার না জানি কি হবে।
কখন থেকে হেটেই চলেছে কোথায় যাচ্ছে কেনো যাচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছেনা মাহির। শেষে বেশ বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে,

— আমরা যাচ্ছিটা কোথায় সেটা অন্তত বল। আর কতক্ষণ হাঁটব?
— উফফ এত অধৈর্য হলে চলে? গেলে তো দেখতেই পারবে।
চিত্রার প্রতিত্তরে আর কথা বাড়ায় না মাহির। মাঝখান দিয়ে তার ঘুমের পনেরোটা বাজালো মেয়েটা । আর কিছুদূর যাওয়ার পর চিত্রা হুট করে প্রফুল্ল মনে হাত উচিয়ে বলল,
— ওই তো আমরা চলে এসেছি। সামনে দেখো সবাই ।
বিরাট বড় এক পেয়ারা গাছ। সেখানে আবার বড় বড় টসটসা পেয়ারা দেখা যাচ্ছে । কিন্তু প্রশ্ন এইখানে এই গাছ লাগাল কে? আহির গাছের দিকে তাকিয়ে একমনে ভেবে চলেছে ।
—- তুই গাছ দেখানোর জন্য আমাদের এভাবে টেনে নিয়ে এসেছিস?
চিত্রা ঘুরে আবইয়াজের সম্মুখে দাঁড়ায়। কোমরে এক হাত ওপর হাত আবইয়াজের মুখে সামনে উচিয়ে তির্যক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,

— তুমি কি বুঝবে এই পেয়ারার মূল্য। তোমাকে পেয়ারা গাছ দেখানোর জন্য নয় গাছ থেকে পেয়ারা চুরি করার জন্য নিয়ে এসেছি।
— তোর কি মাথা খারাপ নাকি পেট খারাপ? কোনটা? আমি কেনো গাছ থেকে পেয়ারা চুরি করতে যাবো?
আবইয়াজের সাথে সহমত প্রকাশ করে আহির বলল,
— আমিও সহমত। খাবি তোরা আমরা কেনো চুরি করব? আর জানিস না চুরি করা মহাপাপ। পাপ লাগবে তোর পাপ। সেই পাপে পাপি হয়ে তোর পেট খারাপ হবে। একবার হয়ে কি শিক্ষা হয়নি?
—- আহিরের বাচ্চা চুপ থাক তুই ।আমাদের পেয়ারা চাই মানে চাই। কি বলিস মেহু, মাইরা, ননী?
চিত্রার প্রশ্নে মাইরা বলল,
— অবশ্যই চাই। আর যদি না দেয় তাহলে আম্মুকে বলব আহির ভাইয়া মাহির ভাইয়া আমাকে মেরেছে। হু।
আহির এগিয়ে গিয়ে মারার মতো হাত তুলে বলে,
— এতো যখন মারি মারি বলিস আয় আজকে তোকে মেরেই দেই।
এত কিছুর ভিড়ে ননীর চোখে কিছুটা ভীতির দেখা মেলল । ননী ভয় মিশ্রত কন্ঠে বলল,
— কিন্তু মতলব চাচা কিন্তু বেশ রাগী মানুষ। একবার যদি ধরা পরি তাহলে মেরে তক্তা বানিয়ে ফেলবে। উনার গাছ থেকে একবার একটা ছেলে পেয়ারা চুরি করার সময় ধরা পড়েছিলো । ওইদিন ছেলেটাকে পুরো গ্রাম দৌড়িয়ছিল। বেডা খুব ভয়ংকর। আর উনার একটা ছাগল আছে কাইল্লা নাম। ওইটাকে কেউ হালকা স্পর্শ করলেই মতলব চাচা সাংঘাতিক রেগে যান।
এতক্ষণ বেশ মনোযোগ সহকারে ননীর কথা শুনলো মাহির । এতক্ষণ বিরক্ত লাগলেও এখন তার মধ্যে একটা কৌতুহলী ভাব দেখা দিলো। মাহির বুক ফুলিয়ে মুখ ভেঙচি মেরে বলল,

— আমরা মির্জা বাড়ির ছেলে। আমাদের রক্তে সাহসিকতা বয়ে চলেছে। আজকে যদি এই গাছ খালি না করেছি তাহলে আমার নাম দুদু মিয়া।
বেশ সাহস নিয়ে গাছের সামনে দাঁড়ায় মাহির। আজকে যেভাবে হোক নিজেকে সাহসী বীর প্রমাণ করতেই হবে। মাহির একবার পিছন ঘুরে তাকায়। সবাই কেমন উৎসুক দৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। মাহির বাঁকা হেসে গাছ চড়তে শুরু করে। বড় মোটা একটা ডালে বসে পরে সে।হাত থেকে সামান্য দুরুত্বে একটা বড় পেয়ারা, মাহির অনেক চেষ্ঠা করেও পেয়ারা অবধি পৌঁছাতে পারছেনা । সে ঠোঁট গোল করে শ্বাস ছাড়ে, যে করেই হোক পেয়ারা নিয়ে নিচে যেতে হবে নইলে আজকে মানসন্মান ধুলোয় মিশে যাবে।
— এই বলদের দ্বারা কিছুই হবে না।
গাছে বসে থাকা মাহিরের দিকে তাকিয়ে কথাটা বলে আহির। পাশে থাকা চিত্রা কথাটা বেশ শুনতে পেলো। সে আহিরের দিকে মুখ ভেংচি মেরে বলতে আরম্ভ করে ‘ মাহির মাহির মাহির ‘। চিত্রার দেখা দেখি এবার ননী ও মাইরা বলতে শুরু করে।
শীতের সকালে সূর্যের দেখা মিলাটা কঠিন। আজ অনেক দিন পর সূর্যের দেখা পাওয়া গেলো। তাই দেরি না করে মতলব মিয়া গোসলটা সেরে নিলেন। বলা তো যায়না আবার কখন চলে যায়।কিন্তু উঠানে লুঙ্গি ছড়ানোর সময় বিলের কাছ থেকে কেমন হট্টগোল শুনতে পেলেন।মতলব মিয়ার বুঝতে আর বাকি রইলো না আবার কেউ এসেছে তার গাছের পেয়ারা চুরি করতে। ঘরের পাশে থাকা মোটা লাঠিটা নিয়ে বিলের ধারে এগিয়ে যান।

— আরেকটু আরেকটু হয়ে যাবে। হাতটা আরেকটু বাড়াও ।
ননী, মাইরা, চিত্রা উৎসাহ দিয়েই চলেছে । আবইয়াজ ও আহির চুপ করে এদের কাহিনী দেখছে । ঠিক সেই মুহূর্তে ভেসে এলো মতলব মিয়ার হাক ।
— ওই কেডারে আবার আমার গাছ থাইক্কা চুরি করতে আইছস। আজকে তোগো হাড্ডি সব না ভাইঙ্গা দিলে আমিও গোলামের পোত মতলব মিয়া না।
গোলাম মিয়া আসলে মতলব মিয়ার বাবার নাম।মতলব মিয়ার কন্ঠস্বর চিনতে পেরে ননী চিৎকার করে বলল,

— ভাগো সব মতলব চাচা এসে গেছে। ধরা পরলে খবর আছে।
ননী দৌড়াতে আরম্ভ করে । প্রথমে সবাই একটু হতবাক হয়ে গেলেও পরমুহূর্তে কাহিনী বুঝতে পেরে একে একে ছুট লাগায়। আবইয়াজের পাশে মেহু থাকায় সে মেহুর হাত ধরে ছুট লাগায়। শুধু থেকে যায় অবলা মাহির । মাহির তরিগরি পায়ে গাছ থেকে নেমে পড়ে। তবে ততক্ষণে অনেকটাই দেরি করে ফেলেছে। মতলব মিয়া গাছ থেকে একটা ছেলেকে নামতে দেখে পাছা বরাবর হাতে থাকা লাঠিটা দিয়ে বারি মারে।
‘উউ মা গো’ নিজের পিছনে হাত দিয়ে মাহির ছুট লাগায়। একবার পিছনে ঘুরে ও তাকায় না। মতলব মিয়া ও তার পিছনে ছুটে।
কুয়াশার কারণে বিলের মাটি ভেজা হয়ে আছে। এর উপর দিয়ে মাহির দৌড়ে চলেছে তার পিছন ছুটছে মতলব মিয়া । হুট করে মাহির ব্যালেন্স হারিয়ে ধপ করে আছাড় খায়। মতলব মিয়া সুযোগ বুঝে মাহিরের পাছায় ধামধুম মারতেই থাকে । এদিকে কাঁদায় পড়ে মাহিরের মুখের অবস্থা নাজেহাল। তার উপর পাষন্ড মতলব মিয়ার এক এক কড়াঘাত ।
মাহির পাশ থেকে কিছু কাঁদা মুষ্টিবদ্ধ করে গ্রীবা বাঁকিয়ে মতলব মিয়ার মুখে ছুড়ে মারে। মতলব মিয়া মুখের কাঁদা সরাতে সরাতে বলল,

— ওরে গোলামের পোতরে আইজকে তোর বংশের বাত্তি আমি নিভাইয়া দিমো রে..।
তারপর কিছু একটা মনে পড়তেই দু ধারে মাথা নারে। গোলামের পোত তো সে । এই সুযোগে মাহির নিজের জীবন বাঁচিয়ে পালায়।
মাহির দৌড়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,
— আজকে বুঝতে পেরেছি আহির কেনো সবকটাকে ঘষেটি ও মীরজাফরের বংশধর বলে।এরা সব রাজাকারের বংশধর । সবগুলো একমাত্র আমি ছাড়া।
কখন থেকে মাহিরের জন্য অপেক্ষা করছে সবাই বিল থেকে একটু দূরে। বেচারি ননী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নখ খোটাচ্ছে । ভিতরে ভিতরে সে বেশ অনুতপ্ত । এভাবে মাহিরকে একা ফেলে আসা উচিত হয়নি । সে তো জানে মতলব চাচা কেমন, না জানি মাহিরের কি অবস্থা।
বেচারা মাহির এতক্ষণ দৌড়ে আসলেও এখন আর হাঁটতে পারছে না। খুড়িঁয়ে খুড়িঁয়ে হাটছে। হাত এখনও পশ্চাৎপদে নিবদ্ধ । মাহিরকে আসতে দেখে সর্বপ্রথম ননী এগিয়ে যায় । উপর নিচ পরখ করে চিন্তিত স্বরে কেমন অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করে,

— আপনি ঠিক আছেন?
এই মুহূর্তে ননীর এমন প্রশ্ন মাহিরের শরীরে আগুন ধরিয়ে দিল। একে তো তাকে একা ফেলে চলে এসেছে এখন আবার জিজ্ঞেস করা হচ্ছে আপনি ঠিক আছেন? কথাটা বেশ বেঙ্গ স্বরে বলে মাহির তবে মনে মনে । সামনে তাকিয়ে দেখে তার গুনধর ভাই বোনেরা তার দিকে কেমন ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে ।
মাহির নিজেকে যথেষ্ট নরমাল রাখার চেষ্টা করে।কিছুতেই এদের সামনে ধরে পড়া যাবেনা। মাহির সটান হয়ে ভিতরে শ্বাস টেনে বলল,
— কি হলো এভাবে তাকিয়ে আছিস কেনো? আমি ঠিক আছি। আমার কিছু হয় নি। কার এতো বড় সাহস যে এই মাহিরের গায়ে হাত তুলবে?
— কিন্তু আমরা তো এমন কিছুই বলিনি যে তোকে কেউ মেরেছে?
আহিরকে এখন নিজের আপন ভাই কম শত্রু বেশি মনে হলো মাহিরের। এভাবে সত্য কথা বলতে হয়?
চিত্রা বেশ চতুর একটা মেয়ে। তার বুঝতে বেশি বেগ পোহাতে হলোনা । মাহিরকে দেখেই বুঝে গিয়েছে কয়েকটা কড়াঘাত খেয়ে এসেছে। এক্ষেত্রে তার একটু মায়াই হলো, কেননা যেমন করেই হোক দোষ তো তারই। মাহির যে সবার সামনে অস্বস্তি বোধ করছে ব্যাপারটা উপলব্ধি করতেই চিত্রা বলল,

— ননী, মাইরা ভিতরে চল।
মাইরা দ্বিরুক্তি করল না আর। কিন্তু ননী আবারো অস্থির হলো ভাবলো মাহিরের কিছু হলো কিনা।
তারা তিনজন চলে যেতেই মাহির ঠোঁট উল্টে বাচ্চাদের মত বলতে আরম্ভ করে,
— রাজাকারের গোষ্ঠী তোরা কিভাবে পারলি আমাকে একা ফেলে আসতে । ওই শালা আমার পশ্চাৎপদের অবস্থা খারাপ করে দিয়েছে এখন আমাকে কে বিয়ে করবে?
আহির আবইয়াজের হাসিতে মরি মরি অবস্থা।মাহিরের ভ্রু কুঁচকে যায় এরা কি আদেও তার আপন কেউ? মাহির এবার অন্য পন্থা অবলম্বন করল। নিজের গলা খাকারি দিয়ে,
— তোরা যদি আমার ভাই হয়ে থাকিস আর মির্জা বাড়ির রক্ত হয়ে থাকিস তাহলে তোরা আমার সাথে হওয়া অন্যায়ের প্রতিশোধ নিবি।নইলে আমি ভাববো তোদের পেয়ে এনেছে ।
মাহিরের বক্তব্যে বিশেষ কোনো পরিবর্তন দেখা গেলো না আহির ও আবইয়াজের মাঝে। কিন্তু ভাইয়ের সাথে হওয়া অন্যায়ের প্রতিশোধ অবশ্যই নিবে। মির্জা বাড়ির ছেলে মার খেয়ে আসবে আর তারা বসে বসে দেখবে? কিছুতেই না।
আহির হাত উচিয়ে গর্জে উঠে বলল,

এবারের সংগ্রাম প্রতিশোধ নেওয়ার সংগ্রাম
এবারের সংগ্রাম ভাইয়ের পাছায় মারার
প্রতিশোধ নেওয়ার সংগ্রাম । জয় বাংলা,
ভাইয়ের পাছার প্রতিশোধ নিতে মতলব মিয়ার
মন্ডুতে কর হামলা ।
মাহির ও আবইয়াজ হা করে আহিরের দিকে তাকিয়ে আছে। আহির আবারো গর্জে উঠে বলল,

মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ১৫

ভাইয়েরা আমার তোমাদের যে করেই হোক
আমার মাহির ভাইয়ের পাছায় মারার প্রতিশোধ নিতেই হবে। তোমরা সকলে কি প্রস্তুত??
আবইয়াজ ও মাহির হা করে থাকা অবস্থাতেই উপর নিচ মাথা ঝাঁকায় । যার মানে তারা প্রস্তুত।

মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ১৭