মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ২৬
তাসনিয়া নুর
চোখ মুখ কুঁচকে স্টেজে উঠে পড়ে আহনাফ, আবইয়াজ । তারা উঠতেই মাইশা ফাহিম কে ইশারা করে গান ছাড়তে। গান শুরু হয়ে গিয়েছে অথচ তাদের নাচার নাম নেই। সবাই চিৎকার করে বলতে থাকে নাচ শুরু করতে। শেষে আহনাফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবইয়াজের কোমড় হালকা স্পর্শ করতেই আগ্নেয়গিরি লাভার ন্যায় ফুঁসে উঠে আবইয়াজ বলল,
— সর একদম স্পর্শ করবি না আমাকে। এই আমাকে কি তোর মতো গে মনে হয়?
— মুখ সামলে কথা বলবি । তোকে কে বলেছিল মেহুকে সরিয়ে নিজে আসতে?
আবইয়াজ রেগে বলল,
— তোকে নিষেধ করেছি না নিজের এই বস্তা পচাঁ মুখে আমার মেহুর নাম নিবি না।
এদের এমন ফিসফিসিয়ে ঝগড়া করতে দেখে মাইশা মাইক উচিয়ে বলল,
—- ঝগড়া করা বন্ধ করুন। কখন গান শুরু হয়ে গিয়েছে আর আপনারা এদিকে ঝাগড়া করেই যাচ্ছেন।
— এতো রুচির দুর্ভিক্ষ হয়নি আমার যে এই গে এর সাথে আমার ডান্স করতে হবে।
আহনাফ চেঁচিয়ে উচ্চস্বরে বলল,
— হ্যাঁ আমারও কোনো শখ নেই তোর সাথে ডান্স করার।
—এরা এমনভাবে কথা বলছে লাগছে হাজবেন্ড ওয়াইফ ।
মেহুর কথায় ননী, চিত্রা হু হা করে হেসে উঠে।
এদিকে রাগে আবইয়াজের মাথা ফেটে যাচ্ছে। আবইয়াজ ক্রুদ্ধ নয়নে আহনাফের দিকে তাকিয়ে আছে যেনো আস্ত গিলে ফেলবে । শেষে উপায়ান্তর না পেয়ে আবইয়াজ আহনাফের কোমরে হাত রাখে আর আহনাফ আবইয়াজের কাঁধে। গানের তালে তালে দুজন নেচে চলেছে।
আবইয়াজের শরীর রাগে রি রি করছে । আহনাফের স্পর্শে কেমন ঘিনঘিন অনুভূত হচ্ছে । কোথায় ভেবেছিল মেহুর সাথে আজকে ডান্স করবে এর জায়গায় ডান্স করতে হচ্ছে মেহুতেন্নেছা আবদুল খায়েরের সাথে ।
এদিকে আহনাফের একই দশা । ভেবেছিল মেহুর সাথে নেঁচে এই আবইয়াজকে জ্বলে পুড়ে ছাড়খাড় হতে দেখবে। আর কি থেকে কি হয়ে গেল। আবইয়াজ নিজেকে আর কন্ট্রোল করতে না পেরে হনহনিয়ে স্টেজ থেকে নেমে হাঁটা ধরে । এদিকে উপস্থিত সকলে হেঁসে কপোকাত ।
ননী গাল ফুলিয়ে মাহিরের পিছনে দাঁড়িয়ে রইল অথচ ব্যাটা তাকে পাত্তাই দিল না। নিজ মনে খেয়েই যাচ্ছে ।
হাসি-ঠাট্টার মধ্যে সময় অনেকটা পেরিয়ে গেল। ইতোমধ্যে সবার মেহেদি দেয়া শেষ। গ্রামের আশেপাশের মানুষ নিজেদের নীড়ে যেতে ব্যস্ত। রাত ১:২৫ মিনিট। ক্লান্তিতে অসার হয়ে আসা শরীরটা নিয়ে সবাই নিজের রুমে যাওয়াতে ব্যস্ত। শুধু হলরুমে রয়ে গেল আবইয়াজ, মাহির, আহির, চিত্রা, , মেহু, ননী । আহির এসেই ধপ করে সোফায় বসে পরে । একে একে সবাই বসতেই ননীর নজরে পরে টি-টেবিলে রাখা গ্লাসের উপর । এখানে আবার কে এগুলো রাখল। ননী কোক ভেবে টেবিল থেকে একটা গ্লাস নিয়ে ঢকঢক করে খেতে আরম্ভ করে। কিন্তু প্রথম চুমুকে টেস্ট কেমন যেনো লাগলো।
ননীর দেখাদেখি সবাই একটা করে গ্লাস নিয়ে তরল পানীয় গিলে ফেলে । কিছুক্ষন অতিবাহিত হওয়ার পর আহিরের মাথা দুলছে । সে চোখ ছোট করে মাহিরের দিকে তাকায়ি বলল,
— মাহির তুই আমার জমজ ভাই কিন্তু তোর পাশে তোর মতো দেখতে আরেকটা ভাই আসলো কোথা থেকে?
তারপর আহির এক হাত বুকে ভাঁজ করে আরেক হাত মাথায় দিয়ে চিন্তা করে হুট করে,
— বুঝেছি তোর পাশেরটা নকল ।দাড়াঁ এখুনি একে তক্তা বানাচ্ছি ।
আহির এলোমেলো পায়ে মাহিরের পাশে ঝাপ মারে কিন্তু বেচারা উল্টে নিচে পরে যায়। তা দেখে মাহির মাতলামো করে হাসতে হাসতে বলল,
— পরে গিয়েছে আহির পরে গিয়েছে।
পাশ থেকে আবইয়াজ নাক কুঁচকে বলে উঠে,
— To much disgusting ।
চিত্রা কোত্থেকে কয়েকটা লুঙ্গি এনে সবার মুখে ছুড়ে মারে। চিত্রার নিজের পরনে ছিল একটা লুঙ্গি। আহির ঝাপসা চোখে চিত্রার দিকে তাকিয়ে দেখে শাড়ির নিচে সাদা লুঙ্গি। আহির এবার চিত্রার দিকে তাকিয়ে হেসে উঠে। চিত্রা ঢোলতে ঢোলতে লুঙ্গি ধরে গান গেয়ে নেচে উঠ,
লুঙ্গি ডান্স লুঙ্গি ডান্স হেই লুঙ্গি ডান্সসসস।
চিত্রার নাচ দেখে মেহু, ননী বাচ্চাদের মতো হাত তালি দিতে থাকে। তারপর চিত্রার ছুড়ে মারা লুঙ্গি ননী, মেহু পড়ে তারাও নাচতে থাকে।
মেহু গাল ফুলিয়ে আবইয়াজের সামনে দাঁড়াতেই আবইয়াজ এক ভ্রু উচিয়ে জানতে চাইল,
— কি হয়েছে? মুখটাকে এমন পেঁচার মতো বানিয়ে রেখেছিস কেনো?
— ঘোড়া হোন আপনার উপর চড়ব আমি।
আবইয়াজ চোখ খুলার চেষ্টা করে বলল,
— হোয়াট!!
মেহু গাল ফুলিয়ে জোরে নিশ্বাস ফেলে,
— ঘোড়ায় না চড়ালে আমি কাঁদব ।
কথাটা বলে মেহু ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে দিল। আবইয়াজ দু-হাত তুলে মেহুকে শান্তনা দেয়ার মতো করে বলল,
— ঠিক আছে ঠিক আছে চড়াব। কিন্তু তার বদলে আমি কি পাবো?
মেহু গালে হাত দিয়ে চিন্তা করতে করতে বলল,
— পিংকিস চুমু দেবো।
আবইয়াজ ভ্রু উচিয়ে,
— পিংকিস চুমু আবার কি?
— আগে ঘোড়া হোন তারপর দেখাচ্ছি।
আবইয়াজ দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল,
— তোকে বিশ্বাস করে ঘোড়া হচ্ছি। পরে ফাঁকি দিবি না কিন্তু ।
মেহু জিব কেটে দু দিকে মাথা নাড়ে। আবইয়াজ মেঝেতে ঘোড়া সাজতেই মেহু ঝটপট বসে পড়ে । আর বলতে থাকে,
— চাল মেরে ঘোড়ে টিক টিক টিক।
কিছুক্ষণ ছড়ানোর পর আবইয়াজ মেহুকে নামিয়ে নিজে সোজা হয়ে দাঁড়াতে নিয়ে -ও ঢলে পরছে। কোনো রকমে দাঁড়িয়ে মেহুকে বলল,
— দে আমার পিংকিস চুমু।
মেহু আবইয়াজের কাছে এগিয়ে গিয়ে গালে হালকা করে ফু দিয়ে বলল,
— দিয়ে দিয়েছি স্পেশাল পিংকিস চুমু।
আবইয়াজ নিজের গালে হাত দিয়ে বোকা বনে গেল ।
— এ্যা এটাকে কেউ চুমু বলে নাকি। ছলনাময়ী নারী তুই আমাকে ঠকিয়েছিস ।
এবার আবইয়াজ ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদার ভান করতে থাকে। সেসময় হলরুমে হাজির হয় দুজন। ট্যারা মামুন ও আবির। ট্যারা মামুন এদের অবস্থা দেখে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে। আজকে সব প্রতিশোধ একসাথে নিবে।
— কি হলো বাছারা আজকে বুঝতে পারলে তো এই ট্যারা মামুনের সাথে পাঙ্গরা নেওয়ার ফল ।
আবইয়াজ ঘোলা চোখে মামুনকে দেখলো । তারপর এলোমেলো পায়ে মামুনের কাছে গিয়ে ঠাস করে গালে চড় মেরে দিল। মামুন গালে হাত দিয়ে চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করল,
— আমাকে মারলি কেনো?
— তুই আমার কান্নায় বাঁধা দিয়েছিস তাই ।
এর মধ্যে হুট করে কোথকে আহির এসে মামুনের অপর গালে চড় মেরে দিল। মামুন মুখটা কাঁদোকাঁদো করে,
— তুই কেনো মারলি বাপ?
আহির ঢোলতে ঢোলতে উত্তর দিল,
— তোকে একা মেরে এই আবইয়াজ জিতে যাবে। আমি থাকতে সেটা কিছুতেই সম্ভব না। আমি কাউকে জিততে দিব না তাই আমিও মেরে দিলাম।
আবইয়াজ কোমরে হাত দিয়ে আহিরের দিকে তাকিয়ে বলল,
— তাই নাকি। আমিও তাহলে তোকে জিততে দিব না।
কথাটা বলে আবইয়াজ আবারো মামুনের গালে সজোরে চড় মেরে দিল । আহির ও কি কম যায় নাকি সে-ও মামুনের অপর গালে চড় মেরে দিল। পরপর একজন একজন করে মারতেই থাকল।
ট্যারা মামুন দৌড়ে চলে গেল সোফার কাছে । কিন্তু সেখানে বাধল আরেক বিপত্তি । মাহির মামুনের হাত ধরে আবইয়াজ, আহিরকে বলল,
— এটারে দুলদুল খাওয়াতে পারলে একটু মজা লাগত।
এমন প্রস্তাবে আবইয়াজ, আহিরের চেহারা চকচক করে উঠে । আবইয়াজ, আহিরকে এগিয়ে আসতে দেখে মামুন ঢোক গিলে । এরা কি করতে চাচ্ছে তার সাথে?
আহির দৌড়ে এসে সোফায় দাঁড়িয়ে পড়ে। মাহির ও আহিরের পাশে দাঁড়ায়। হঠাৎ করেই আহির মামুনের ডান পা আর মাহির মামুনের বাম পা ধরে উপরে তুলে তাকে ঝুলিয়ে ফেলে । মামুনের মাথা ফ্লোরের দিকে, আরেকটু হলে মাথা নিচে লেগে যাবে। এবার আহির, মাহির মামুনকে উল্টো ঝুলিয়ে দোল খাওয়াতে লাগল । চিত্রা, ননী, মেহু বসে বসে কাহিনী দেখছিল। এর মধ্যে মেহু বলল,
— উহু ব্যাপারটা ঠিক জমছেনা। কেমন যেনো পাংসোটে লাগছে।
ননী বসা থেকে ঠাস করে উঠে দৌড়ে গিয়ে আবার ফেরত এলো ঝাড়ু সমেত । ঝাড়ুটা আবইয়াজের হাতে দিয়ে বলল,
— নেও এবার সুন্দর একটা সিনেমা দেখাও আমাদের।
আবইয়াজ খুশি মনে ঝাড়ুটা হাতে নিয়ে উল্টো লটকে থাকা মামুনের পশ্চাৎপদে, পিঠে মারতে থাকে। এদিকে মামুন চিৎকার করতে করতে বলল,
—- এবারের মত ছেড়ে দে আর কোনোদিন তোদের ত্রিসীমানায় আমু না । তোদের মতো পাগলের কাছে আসা আমার ভুল হইছে মাফ করে দে। ওরে পাগলের দল ছাড় আমারে ।
কিন্তু কে শুনে কার কথা ।শেষে আবইয়াজ হাঁপিয়ে বসে পড়ে ।আহির, মাহিরের একই দশা। মামুনকে ছাড়তেই সে দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,
মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ২৫
—- তোগোর মতো পাগল আমার জীবনে আমি দেখিনাই। পাগলের গোষ্ঠী সব ।
মামুন চলে যেতেই সবকটা আবার টলতে থাকে । কখনো নাচছে কখনো আবার একজন আরেকজনের মাথার চুল ধরে টানাটানি করছে। আবার ঝগড়া করছে। শেষে ক্লান্ত হয়ে কেউ মেঝেতে কেউ সোফায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
