মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ৩৬
তাসনিয়া নুর
অতিরিক্ত শকের ফলে বুকের ব্যাথা থেকে বেহুশ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি মাহির। কেবিনের বাহিরে পায়চারি করে যাচ্ছে মির্জা বাড়ির কর্তারা। মুন বেগম ছেলের এমন আকস্মিক অসুস্থতায় কেঁদে বুক ভাসাচ্ছেন। ফিরোজা বেগম ও সায়মা বেগম মুন বেগমকে স্বান্তনা দিয়ে যাচ্ছেন। আবইয়াজ ও আহির এক কোনে দাঁড়িয়ে কি যেনো ফিসফাস করছে ; দেখে মনে দুজনেই বেশ সিরিয়াস। আনোয়ার মির্জা তাদেরকে একবার পরখ করে আবার অন্যদের পরখ করেন। অতঃপর আবইয়াজ ও আহিরের দিকে পা বাড়ান।
— আজকে তোমাদের জন্য ছেলেটার এই অবস্থা হয়েছে, শুধু একবার বাড়ি চলো দেখাব মজা।
— ও তার মানে আমায় ও মেহুকে আপনি মেনে নিয়েছেন?
আবইয়াজের কথায় ভ্যাবাচ্যাকা খেলেন আনোয়ার মির্জা। তিনি ধীর অথচ রাগী স্বরে বললেন,
— আমি কখন বললাম আমি মেনে নিয়েছি? আমি কিছুতেই তোমার কাছে মেহুকে দিব না।
আবইয়াজ হাই তুলে বলল,
— দেখা যাবে।
ডাক্তার বলেছে মাহিরের হুশ ফিরলেই তারা দেখা করতে পারবে। অগত্যা সেভাবেই মির্জা বাড়ির সকলে বসে রইল। সবার ব্যস্ততার ভিড়ে আবইয়াজ মেহুর হাত টেনে নিয়ে যেতে থাকল।
— কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমায়?
— তোর শশুর বাড়ি।
— সেটা বহু দূরে।
আবইয়াজ হাঁটা থামিয়ে মেহুর দিকে ঘুরে বলল,
— দূরে কেনো হবে? তুই যেখানে থাকিস ওটাই তো তোর শশুর বাড়ি।
মেহু নিজের হাত ঝাড়া মেরে ছাড়িয়ে বলল,
— সেটা বাধ দিন। আগে বলুন এভাবে গরুর মতো টেনে হিছড়ে আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিলেন?
— কথা আছে তোর সাথে।
—কিন্তু আমি কোনো কথা বলতে চাইনা আপনার সাথে।
— এভাবে কেনো কথা বলছিস তুই?
মেহু চোখ ছোট করে উত্তর দিল,
— তো এখন কি আপনি চাচ্ছেন আমি মুখে মধু নিয়ে আপনার সাথে কথা বলি?
আবইয়াজ কেমন অসহায় নয়নে মেহুর পানে চাইল। কিন্তু মেহু আবইয়াজের সেই চাহনি উপেক্ষা করে গটগট পায়ে সেখান থেকে চলে গেল। আবইয়াজ মেহুর যাওয়ার দিকে অসহায় পানে তাকিয়ে ফোস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, অতঃপর তার পিছন পিছন সকলের কাছে গিয়ে উপস্থিত হলো। আবইয়াজের গুমরা মুখ দেখে আহির চোখ ছোট ছোট করে ফেলল। এখন থেকে এখন কি হলো ছেলেটার? একটু আগে ও তো চিত্রা আর ওর ব্যাপারে রাগারাগি করছিল। আহিরের ভাবনার মাঝেই তার দৃষ্টি আটকায় অন্য দিকে। একটা লোক হাতে ফ্লাওয়ার বুকে নিয়ে পাশের কেবিনের দিকে যাচ্ছে। আহির ফট করে বসা থেকে দাঁড়িয়ে আবইয়াজের কানে ফিসফাস করে সন্দিহান কন্ঠে শুধাল,
— আবইয়াজ লোকটাকে কেমন চেনা চেনা লাগছে না?
আহিরের কথা শুনে আবইয়াজ ও সেদিকে তাকাল। লোকটাকে দেখে আবইয়াজের ভ্রু কোঁচকে আসলো। আসলেই তো লোকটাকে কোথাও যেনো দেখেছে মনে হচ্ছে। ও হে মনে পরেছে লোকটাকে সেদিন এমপি পদপ্রার্থী আহসানুলের সাথে দেখেছিল।
— ওই এমপির লোক এখানে কেনো? কেউ মরেছে-টরেছে নাকি।
— চল দেখে আসি।
আবইয়াজ ও আহির কেবিনের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকতেই দেখল আহসানুল হক বেডে শুয়ে আছেন তার এক পা নিচ থেকে হাঁটু অবধি ব্যান্ডেজে মোড়ানো। পা-টাকে উপরে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। তার সহকারী ক্যাবলার মতো হেসে বুকেটটা এগিয়ে দিচ্ছে। আবইয়াজ ও আহির একে অপরের দিকে তাকিয়ে চোখে চোখে কথা আদান-প্রদান করে ভিতরে ঢুকে গেল। আবইয়াজ ও আহিরকে এই মুহূর্তে এখানে দেখে আহসানুল হক চোখ পাকিয়ে তাকালেন সহকারীর দিকে।
—- এদেরকে কেনো এখানে নিয়ে এসেছো? আমার বহু কষ্টে বেঁচে থাকা জিবনটাকে একেবারে মেরে ফেলতে?
সহকারী আমির আলী অসহায় পানে তাকাল। নিজের পক্ষ থেকে সাফাই গাওয়ার আগেই আবইয়াজ ও আহির ওদের সামনে এসে দাঁড়াল। আবইয়াজ আফসোসের স্বরে বিদ্রুপ করে বলে উঠে,
—- আহারে, আমাদের হৃদয়বান, বলিষ্ঠ কন্ঠের অধিকারী, চর্বি ওয়ালা ফিউচার মন্ত্রীর এই দশা করে কে পূন্যটা কামিয়ে ফেলল?
আবইয়াজের কথার মর্মার্থ বুঝতে পারলনা সহকারী আমির আলী। ছেলেটা সুনাম করল নাকি অপমান? তিনি বোকার মতো চেয়ে থেকে বলেলন,
— চর্বি ওয়ালা মানে?
— আরে এসব সাহিত্যিক ব্যাপার-স্যাপার, আপনি বোঝবেন না।
মনে মনে বিরক্তিতে হৃদয় বিষিয়ে এলেও তা মুখে প্রকাশ করলেন না আহসানুল হক। মুখে জোর পূর্বক হাসি টেনে বললেন,
— আরে তোমরা এখানে? কোনো কাজে এসেছো?
আহসানুল হকের প্রশ্ন শুনে আবইয়াজ সামান্য হেসে বলল,
— আসলে বাসায় অনেক বোর হচ্ছিলাম তাই ভাবলাম হাসপাতাল থেকে একটু ঘুরে যাই।
আবইয়াজের উত্তর শুনে আহসানুল হক ভ্রু কোঁচকে,
— হাসপাতাল কি ঘুরার জায়গা যে ঘুরতে এসেছো ?
— যখন জানেন ঘুরার জায়গা না তখন কেনো জিজ্ঞেস করছেন? নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা হয়েছে তাই এসেছি।
আহসানুল হকের মুখটা কেমন ভোঁতা বনে গেল। কিন্তু কিছুতেই খারাপ ব্যবহার করা যাবে না; সামনে তো আবার ইলেকশন। আহসানুল হক মুখে জোর পূর্বক হেঁসে আবারো বললেন,
—- বাসার সবাই ভালো আছে তো?
—- ভালো থাকলে এখানে থাকতাম?
আবার ত্যাড়ামি উত্তর। আহসানুল হক ভেবে পায় না এই ছেলেটা কি একটা উত্তর সুন্দর ভাবে দিতে পারে না? কই মির্জা বাড়ির সব কর্তা তো বেশ ভালো, তাহলে ছেলে গুলো এমন জাউড়া কিভাবে হলো?
— ও আচ্ছা। কে এখানে ভর্তি?
— আমাদের বাসায় একটা বলদ মন্ত্রী আছে ঠিক আপনার মতো, তাকে নিয়ে আসলাম। বেচারা অতি শকে হার্ট অ্যাটাক করেছে।
আহিরের কথায় বেশ অপমানিতবোধ করলেন আহসানুল হক। তিনি রেগে কিছু বলার আগেই ঘটে গেল বিপত্তিকর এক কাহিনী। ঠাস করে কিছু ফেটে গিয়েছে এমন শব্দ বের হলো কোথা থেকে যেনো, তার পরপর উৎকু দুর্গন্ধে ছেয়ে গেল সারারুম। আহির আবইয়াজ ও আমির আলী নাক চেপে ধরল। আবইয়াজের নাড়িভুড়ি গুলিয়ে যাচ্ছে গন্ধে। আহির নাক চেপে গেয়ে উঠে,
~ kaha se yeah Hawa aayi
Ghatayein Khali kyu chayi ~
অতঃপর আহির আবরও বলল,
—- কার পেট-টা যেনো পচেঁ একেবারে গলে গিয়েছে। ইসস মরে যাচ্ছি গন্ধে। ইয়াক।
মন্ত্রী আহসানুল হক মুখ লুকাতে ব্যস্ত। আবইয়াজ তার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড়িয়ে বলল,
— শালা জাউড়ারার নাতির পায়ের সাথে পেট-টা ও নষ্ট হয়েছে।
মাহিরকে ডিস্টার্জ দেয়া হয়েছে। হুশে আসার পর থেকেই গাল ফুলিয়ে বসে আছে। কারোর সাথে কোনরূপ কথা বলছে না। মাহিরকে তার রুমে শুয়ে দিয়ে ড্রয়িংরুমে উপস্থিত হোন সবাই। আনোয়ার মির্জা গম্ভীর হয়ে বসে আছেন। আয়ুব মির্জা শুধু বসে বসে ফোসফাস নিশ্বাস নিচ্ছেন। আর সাফিন মির্জা উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন আনোয়ার মির্জার দিকে। পরবর্তী সিদ্ধান্ত কি নেন কে জানে।
—- আমাদের বিয়েটা কবে দিবেন ভাবলেন আব্বু?
— বেয়াদব ছেলে, একটা ছেলে অসুস্থ হাসপাতাল থেকে মাত্র বাসায় ফিরল আর এখন আবার তোমরা বিয়ের কথা বলছো? নিজের বাবার কাছে বারবার বিয়ের কথা বলতে লজ্জা করে না?
— না করেনা। বিয়ের বয়স হয়েছে তো বিয়ে করব না? সারাজীবন চিরকুমার থাকব নাকি?
আবইয়াজের কথার মাঝে আহির বলে উঠল,
— বড়ো আব্বু আপনার রাজি না হওয়ার কারনটা কি?
আনোয়ার মির্জা তেতে উঠে বললেন,
— আমার ফুলের মতো মেয়েদের তোমাদের মতো বেয়াদবদের কাছে কিছুতেই দিব না। আর বিয়ে করে বউ-টা পালবে কি করে শুনি, নিজে-ই তো খাও বাপের টাকায়। এক টাকার মোরদ নেই আবার বলছে বিয়ে করবে।
আনোয়ার মির্জার কথাটা গায়ে লাগল আহির ও আবইয়াজের। আবইয়াজ রেগে বলল,
— খাবারের খোটা দিচ্ছেন? আগামি এক মাসের ভিতর নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আপনাকে দেখিয়ে দিবো।
— তুই কি এখন অন্যের পায়ে দাঁড়িয়ে আছিস নাকি?
এই সময়ে আহিরের এমন উদ্ভট প্রশ্ন শুনে আবইয়াজ চোখ পাকিয়ে বলল,
— চুপ থাক। আমি এস্টাবলিশ হওয়ার কথা বলেছি।
— ওও আচ্ছা।
আহির ও আবইয়াজের সাথে তাল মিলিয়ে বলে উঠে,
— হ্যাঁ আমরা এক মাসের ভিতর আপনাদের দেখিয়ে দিবো।
আবইয়াজ চোখ ছোট করে আহিরের দিক তাকিয়ে সন্দিহান কন্ঠে আওড়াল,
— কি দেখাবি তুই?
— আরে ব্যাটা ইস্টাবলিশ হয়ে।
ওদের কথার মাঝে ফোড়ন কেটে আনোয়ার মির্জা বললেন,
— ঠিক আছে যদি এক মাসের ভিতর কিছু করে দেখাতে পারো তাহলে তোমরা যা বলবে তাই।
আনোয়ার মির্জার এহেন শর্তে আবইয়াজ ও আহির খুশি হয়ে বলল,
— ঠিক আছে।
আহির ও আবইয়াজ সিঁড়ি বেয়ে উপর তলায় উঠে গেল। এখন থেকেই ভাবতে হবে কি করা যায়। আহির ও আবইয়াজ চলে যেতেই সায়মা বেগম আনোয়ার মির্জাকে জিজ্ঞেস করলেন,
— ভাইসাব আপনি কি সত্যি ওদের বিয়ে দিবেন ওরা যদি শর্ত পূরণ করতে পারে?
আনোয়ার মির্জা রহস্য হেঁসে বললেন,
— তোমার মনে হয় এক মাসের ভিতর কিছু করা সম্ভব? তা-ও এদের দ্বারা? আগে আগে দেখো না কি হয়।
আনোয়ার মির্জার কথা শুনে উপস্থিত সকলে বোঝতে পারলেন সামনে কিছু একটা ভয়াবহ হতে চলেছে।
লুকিয়ে লুকিয়ে এতক্ষণ যাবৎ সব কিছু শুনছিল মাহির। এখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু ঠোঁট কামড়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে এই প্রথম তার ভাইয়েরা তাকে ফেলে কোনো গেমে অংশগ্রহণ করে ফেলছে। না যে করেই হোক তাকে ও অংশ নিতে হবে। মাহির সটান হয়ে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে মাথা নেড়ে বলল না এখনই যেতে হবে ননীর কাছে। মাহির আর দেরি না করে দ্রুত পায়ে ননীর রুমের সামনে দাঁড়াতেই শুনতে পেলো ধনী কার সাথে যেনো বলছে,
মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ৩৫
— আরে না না দুটো ছেলে একসাথে সামলানো আমার পক্ষে সম্ভব না। আগে একটা দিয়ে ট্রাই করি সামলাতে পারলে পরে না হয় আরো মানুষ বাড়াব।
ননীর এমন উক্তি শুনে মাহির বুক চেপে ধরে বহু কষ্টে আওড়াল,
— এই মেয়ে বলে কি!! ইয়া মাবুদ এসব শুনার আগে তুমি আমাকে দুনিয়া থেকে কেনো নিয়ে গেলে না?
ধ্বপ করে বাহিরে কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ শুনে দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে ননী। মাহিরকে বাহিরে পড়ে থাকতে দেখে ননী চিৎকার করে উঠে,
—- মাহির ভাইইইইইই!!!
