Home মন পিঞ্জিরা মন পিঞ্জিরা পর্ব ২৫

মন পিঞ্জিরা পর্ব ২৫

মন পিঞ্জিরা পর্ব ২৫
শ্যামলী রহমান

মানুষের মুখ বন্ধ করতে এবং শেষ সম্মান বাঁচাতে মানিক শেষে রাজি হয়েছে। মন থেকে না হলেও চাপে পড়ে হলেও হয়েছে।পিয়াস বুঝিয়েছে এবং জবাব চেয়েছিলো তিনি কেন প্রহর কে ফিরিয়েছিলেন?প্রহর যখন মিথিকে বিয়ে করতে চায় বলেছিলো মানিক সাহেব তখনই তাকে মানা করে দেয়।আর এ্যাও বলে মিথি কিংবা এই বাড়ির কাউ কে এই বিষয়ে জানালে মিথির বিয়ে তখনই দিয়ে দিবে।

তার বংশ খারাপ,বাবা খারাপ এরকম অনেককিছু বলে অপমান করেছিলো।এর পর প্রহর আর কিছু বলেনি। পরের বার এসে শোনো পিয়াসের সাথে বিয়ে ঠিক করা হয়েছে এবং মিথির ম্যাটিক পরীক্ষা শেষ হলে বিয়ে হবে। সকলে এতে খুশি। প্রহর এতে আরো সরে গেলো।তবে অনুভূতিরা তো জেঁকে ধরলো।মানিক সাহেবের প্রহরকে অপছন্দের আরো একটি কারণ হলো প্রহরের মা পরমা কে পছন্দ করতো কিন্তু পরমা তাকে সে চোখে দেখেনি এবং প্রত্যাহার করেছিলো। বিয়ে করেছিলো পরিবারের পছন্দে।সুখের বদলে প্রাণ হারালো।হয়তো সেই ঘটনার প্রতিশোধ নিতে এমন করেছে।

পিয়াস নিজের কষ্ট চেপে নিজেকে স্বাভাবিক রেখেছে। সবাই কে বুঝাচ্ছে সে স্বাভাবিক এবং তার কোনো কষ্ট হচ্ছে না,খারাপ ও লাগছে না। অথচ তার ভেতর হাহাকার করছে।গ্রামে এই ঘটনা নিয়ে কানাঘুষা চলছে।কিন্তু সাহসের অভাবে সামনে বলতে পারছে না।দেওয়ান বাড়ির সকলে স্বাভাবিক তবে সুচরিতা বেগম ছেলের মুখ দেখে বুঝতে পারছে ছেলের অবস্থা কেমন।
তিনি ছেলের কাছে গেলেন।পিয়াস তখন বিছানায় বসে আছে।

“তুই খুশি থাকবি মিথি কে ছাড়া?
পিয়াস মায়ের মুখের দিকে তাকালো। মিথ্যে হাঁসি দিয়ে বলল,
“কেন থাকবো না আম্মা?আমার এই সিদ্ধান্তে যদি
প্রহরের জীবনে আনন্দ আসে তবে ক্ষতি কি?
সুচরিতা বেগম ঠিক বুঝলো না। তাই জিজ্ঞেস করলো,
“মানে?
“প্রহর মিথিকে আমার থেকেও বেশি ভালোবাসে আম্মা।
সুচরিতা বেগম চমকে উঠলো। বিস্ময়তা আকাশ ছুঁলো। তার জানার আগ্রহ দেখে পিয়াস সব খুলে বললো।সবকিছু কেমন গোলমালে লাগছে। তিনি ছেলের পাশে বসে মাথায় হাত রাখলেন।

“প্রহর কেন বললো না?সে কি আমাদের আপন মনে করেনা?
“দোষ একা প্রহরের নেই চাচা মানা করেছিলো।
আমি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছি না আম্মা?বড় ভাই হিসাবে তাকে ভালো রাখা কি আমার দায়িত্ব নয়?
সুচরিতা বেগম বাকরুদ্ধ কি বলবেন ভেবে পেলেন না।ছেলের মুখের বুলি তাকে কষ্ট দিচ্ছে। পিয়াস ও যে মিথিকে পছন্দ করে তা চোখ দেখে বুঝতে পারে।কিন্তু প্রহর ও তার ছেলেই সে হিসাবে তার কষ্ট ও মেনে নিতে পারবে না।
“তুমি যাও আম্মা।প্রহর কে এই পাঞ্জাবী টা দিয়ে এসো।আমি নিজের অন্য একটা পাঞ্জাবি পরপ নেবো।সুচরিতা বেগম পাঞ্জাবী টা হাতে নিয়ে বেরিয়ে আসলো।

চারদিকে আত্নীয়স্বজনের ভীড়।দুপুরের সময় আমন্ত্রিত সব মানুষ এসেছে।অনেকে খেয়ে চলে গেছে আবার কেউ আছে।একটু পর বিয়ে পড়ানো হবে।মিথি আর শার্লিন কে শাড়ি পরিয়ে দেওয়া হয়েছে।মিথি নিশ্চুপ পাথরের ন্যায় বসে আছে।বিয়ের জন্য তাকে দেওয়া শাড়িটা শার্লিনকে দিয়ে নিজে তার মায়ের বিশ বছর আগের একটা শাড়ি পরেছে।পুরনো শাড়ি হলেও মিথির গায়ে বেশ ফুটে উঠছে।গাঁয়ে কাঁচা হলুদের ছোঁয়ায় নাকি মেয়েদের সৌন্দর্য বাড়ে।সেই সৌন্দর্য দ্বিগুণ হয় বিয়ের সাঁজে।তার প্রমাণ প্রতিটা বাঙালি নববধূ।
সব সামাল দিলেও বাহিরের মানুষ ফিসফিস শেষ হয়নি।তারা কানাঘুষা করতে থাকবে এটা স্বাধীন।
মিথি নড়েচড়ে বসলো।অনিমা পাশ থেকে বলল,

“তুই খুশি?
“আমি খুশি অখুশি কোনোটাই নয়।বাবার সিদ্ধান্তকে সম্মান করে বিয়েতে রাজি হয়েছিলাম এখনো তাই।
“প্রহর ভাই কে পছন্দ করিস?মানিয়ে নিতে পারবি?
“অপছন্দের কারণ দেখিনা। মানিয়ে নেওয়ার নামই মেয়েদের জীবন।আর তিনি তো আমায় ভালোবাসেন।আমি আজ বাসিনা কাল বাসতেও পারি।বিয়ের আগে প্রেমের চেয়ে স্বামী রুপে ভালোবাসাই শ্রেয়।
অনিমা বেশ খুশি হয়েছে।তবে রিদিতার মন খারাপ। অনিমা ওকে বলল,
“মন খারাপ কেন?

“পিয়াস ভাইয়ের সাথে আপার বিয়ে হলে ঠিক হতো।শার্লিন আপার সাথে হচ্ছে খারাপ না।
“প্রহর ভাই কি ক্ষতি করেছে শুনি?তিনি তোর আপাকে ভালোবাসে বুঝলি?উনি কেমন মানুষ তা বুঝার ভার কম’জনেরই আছে। অনিমা সেই ডাইরিটার কিছু পাতা পড়েছে এবং শুনেছেও।
মানুষ হিসাবে এবং ভালোবাসায় প্রহর ভাইয়ের মতো কেউ হবে না।অনিমার মনে হচ্ছে প্রহর লড়াই না করে ভালোবাসার মানুষ কে পাচ্ছে।এটা ভুল ধারণা পরে বুঝতে পেরেছে।সে কি লড়াই করেনি?করেছে আড়ালে।ভালোবাসার লড়াই হয় প্রিয়জনদের সঙ্গেই।সেই প্রিয়জনদের সঙ্গে প্রকাশ্যে লড়াই করার ইচ্ছে তার ছিলো না। তার দুঃখময় জীবনে কাউকে জড়াতে চাইছিলো না।

মন বলছিলো আঁকড়ে ধরো,একবার হারিয়ে গেলে আফসোস শুধু রয়ে যাবে।
এর পরেও অপেক্ষা করেছে।অপেক্ষা ফুরলো কিন্তু সেখানে পেঁচিয়ে গেলো আপন মানুষরা তাই বাঁধ্য হয়ে দূরত্ব বাড়িয়েছিলো।সবাই ভালো থাকুক খুশি থাকুক এটাই চেয়েছিলো।লেখাগুলো পড়ে এমনই মনে হয়েছিলো অনিমার।
সন্ধ্যে নেমেছে।নামাজ শেষ করে গ্রামের পুরুষরা সব আসলো।মসজিদের মাইকে বলা হয়েছিলো বিয়ে পড়ানোর কথা এবং সবাই কে আসার জন্য।
শমসের দেওয়ান এদিক ওদিক ছুটছে। মন মালিন্যতা,কানাঘুষা শেষ পরিনয়ের সময় এসেছে।
প্রহর দূর থেকে এক পলক তাকালো। বধু সাজে তার শুকতারা কে অপরুপ সুন্দরী লাগছে। এই বহুরূপ তার জন্যই।সবই যপন স্বপ্ন মনে হচ্ছে।
আসিফ পাশ থেকে বলল,

“অবশেষে শুকতারা তোর হতে যাচ্ছে।শার্লিন মেয়েটা ভীষণ ভালো আজ মনে হচ্ছে। তার আত্মত্যাগে তোর পূর্ণতা।
“নিজের বোন হলেও হয়তো এতোটা ভাবতো না তাই না?
পাভেলের প্রতিত্তোরে প্রহর বলল,
“ছোট বেলা থেকে তার টান আমার প্রতি বেশি।ভাই ভাই করে মুখে ফেনা তুলতো।পিয়াস ভাই বড় হলেও তাকে এতো বলতো না। বড় হয়ে বাড়ি কম আসতাম কথা ও কম হতো তবুও যখন আসতাম খালামনির থেকে কত কিছু বানিয়ে রেখে দিতো।

তার মতে বোন সবার হোক।ওর কাছে কৃতজ্ঞতা আমার সারাজীবন থাকবে।তখনই পিয়াসের মুখখানা চোখে পড়লো ভাবলো, পিয়াস ভাইয়ের কাছে কি অকৃতজ্ঞ কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে রবো?
তার চোখে অভিমান স্পষ্ট।অভিমান কি আমার প্রতি নাকি যাওয়ার জন্য?
মিথি আর শার্লিন কে একসাথে বসানো হয়েছে।পাশে অনিমা রিদিতাও আছে।রিদিতা কালকে থেকে কিছু বুঝতে পারছে না। ডব কেমন তার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে।সবটা খোলসা নয় তার কাছে।শার্লিন অসুস্থ শরীরে মিথির দিকে তাকালো। বলল,

“মনে অনেক প্রশ্ন আছে?বিয়ের পর প্রহর ভাই কে করিস।উত্তর পেয়ে যাবি এর পর ও আমায় খারাপ মনে হলে মুখ ফিরিয়ে নিস।মিথি বামপাশে শার্লিনের দিকে তাকালো কিন্তু কিছুই বললো না।তখনই কাজির আগমন হলো। ওদিকের কাজ শেষে মিথির সামনে গিয়ে বলতে থাকলো বিয়ের পড়ানোর নিয়ম।প্রহরের কবুল বলা শেষে মিথিকে বলল,
“নগদ পঞ্চাশ হাজার মোহরানা ধায্য করিয়া পিতা মোঃ ওসমান চৌধুরীর ছেলে মোঃ প্রহর আহমেদ কে বিবাহ করিতে রাজি?তাহলে বলো কবুল।
মিথি কোনো ভনিতা ছাড়াই এক নাগারে বলে উঠলো,

“কবুল,
কবুল,
কবুল।
“আলহামদুল্লিলাহ।একসঙ্গে উচ্চারিত হলো।
কেউ আনন্দিত হলো কেউবা বুকের ভেতর তীব্র ব্যথা লুকিয়ে হাঁসলো।এর পরের পালা আসলো শার্লিনের।এভাবে পর,পর দুটো বিয়ে সম্পূর্ণ হলো।
কেউ হারালো,কেউবা পেলো।কেউবা নিজের ভালো থাকা বলি দিলো।চারদিকে উচ্ছাসে সকলের ভীড়।চেনা মানুষকে নতুন রূপে দেখতে। বিয়ে পড়ানো শেষে জামাই বউদের একসাথে বসানো হলো।চারজনের মধ্যে কারো মুখে হাঁসির রেখা টুকু নেই।সবাই নিশ্চুপ গম্ভীর। সমস্ত নিয়ম শেষে মেয়ে বিদায়ের সময় এলো।কাছাকাছি হলেও মেয়েকে বিদায় দিতে হবে।মানিক সাহেব বিষন্ন হয়ে মেয়ে প্রহরের হাতে তুলে দিলো,বলল,

“ভালো না রাখতে পারলে তার বাবার ঘরে দিয়ে যাবে।
প্রহরের বিষন্ন ঠোঁটে হাঁসি ফুঁটলো।মিথির হাতখানা তার হাতের উপর। ঠোঁট ভেঙে হেঁসে উত্তর দিলো,
“ভালো রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো। আপনাকেও দেখাবো ভালো রাখা কেমন। যদি অঢেল অর্থে উপর বসিয়ে রাখাকে বুঝান তবে আমি ব্যর্থ হবো।
আমি আমার স্ত্রী কে নিজ সামর্থ্যে ভালো রাখবো।
একদিন সে নিজে আপনাকে বলবে কেমন আছে সে।যদি বলে ভালো নেই তবে আপনার কাছে রেখে দিয়েন।র*ক্ত খারাপ,বংশ খারাপ বলেছিলেন কিন্তু আমি মানুষ তো আপনাদের মাঝেই হয়েছিলাম।
শিক্ষা আপনরাই দিয়েছিলেন।তার পরে কথাটুকু যুক্তিযত হয়নি।যে মানুষটাকে ঘিরে আমায় নিয়ে কথা বলেন আমি সেই মানুষটাকে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করি। এক সন্তানের কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত পিতা তিনি।এই পিতা কথাটা বলতেও আমার বাঁধে তবুও পরিচয় পত্রে ওই নামটাই দেখতে হয়।

মন পিঞ্জিরা পর্ব ২৩+২৪

মানিক সাহেব চলে গেলো।যেতে যেতে চোখের জল মুছলো।মেয়ের দিকে ফিরে তাকালো না। যাওয়ার আগে শুধু একবার তাকিয়ে মাথায় হাত রেখেছেন।
মিথির কি করা উচিত বুঝতে পারছে না।
মোহনিয়া বেগমের চোখ জল টলমল করছে।মিথি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে।অদূরে পিয়াস শার্লিন নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে।শার্লিন হাঁসলো।অবশেষে তার ইচ্ছে পূরণ হয়েছে।পূর্ণতার গল্প জুড়ে দিয়েছে এর চেয়ে আনন্দের তার কাছে কিছু নেই। তবে সে কি ভাবলো তার জীবন কোনদিকে যাবে?

মন পিঞ্জিরা পর্ব ২৬+২৭