মহামায়া পর্ব ৩৮
তুশকন্যা
“কন্ট্রোল! আনায়া কি বাচ্চি, কন্ট্রোল ইউর সেলফ। এই আইটেম বো ম শুধু তোর—শুধুই তোর!”
আনায়ার মনের অবস্থা তখন বিধ্বস্ত; ক্ষণিকের তরে কিছু বলার হিতাহিত জ্ঞানও সে হারিয়ে ফেলেছে। বাইরে বৃষ্টির উন্মাদনা আরও বেড়েছে, ঠিক যেমনটা বাড়ছে আনায়ার ভেতরের অস্থিরতা। এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে সে মাথা নুইয়ে অত্যন্ত ক্ষীণ স্বরে শুধু আওড়াল,
”আ… ভালো থাকবেন, আসছি।”
কথাটি শেষ করেই সে গাড়ির দরজা খুলে বৃষ্টির অঝোর ধারার মাঝে বেরিয়ে পড়ল। কেনীথ তাকে থামানোর বা কোনো প্রত্যুত্তর দেওয়ার সুযোগই পেল না। তবে হুট করে এই বেখেয়ালি রমণীর বৃষ্টির ভেতর প্রস্থান তার দৃষ্টিকে আর নিস্পৃহ থাকতে দিল না।
আনায়ার গায়ে শাড়ির আঁচলের পাতলা আবরণটুকু থাকলেও, সে বৃষ্টির তোড়ে নিমেষেই দিশেহারা হয়ে পড়ল। মুহূর্তের ঝাপ্টায় সিক্ত হয়ে উঠল তার প্রতিটি অঙ্গ; গায়ের সাথে লেপ্টে থাকা শাড়ি আর ব্লাউজ তার লতানো শরীরের প্রতিটি ভাঁজকে এক প্রকার অবাধ্যতায় ফুটিয়ে তুলল।
গাড়ির ভেতর থেকে সেই সিক্ত রূপ কেনীথের দৃষ্টি এড়ালো না, বরং তার পৌরুষদীপ্ত ধৈর্যের বাঁধ যেন মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। দুই হাতের মুষ্টি শক্ত করে চেপে ধরে, একটি সুতীব্র সিদ্ধান্তে সে তৎক্ষণাৎ গাড়ি থেকে নেমে পড়ল।
ওদিকে আনায়া তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। আইজেল আর সাবা তো বোধহয় ভার্সিটির ভেতরেই রয়ে গিয়েছে। কিন্তু বৃষ্টির ঝাপ্টায় তার যা দশা হয়েছে, তাতে বাড়ি ফেরা ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর নেই। অথচ এই বিরূপ আবহাওয়ায় এখানে দেশের মতো কোনো রিকশা বা যানবাহন পাওয়াও দুষ্কর।
রাস্তার ধারে অগণিত মানুষের যাতায়াত আর যানবাহনের ভিড়; হয়তো কিছু পথচারীদের উৎসুক নজর তার লাবণ্যময় দেহের ওপরেও পড়ছে। কিন্তু আনায়ার সেদিকে কোনো হুঁশ নেই। কিছুক্ষণ আগে গাড়ির ভেতরে যে সুতীব্র স্নায়বিক উত্তে জনা তৈরি হয়েছিল, তাতে সে তখনো আচ্ছন্ন।
এরিমধ্যে হঠাৎ তড়িঘড়ি করে হাঁটতে গিয়ে শাড়ির কুঁচিতে পা আটকে আনায়া হোঁচট খেল। সে চোখ-মুখ খিঁচে প্রমাদ গুনল—ভাবল আজ বুঝি দিনের শেষ বিপর্যয়টুকুও তার কপালে এভাবেই লেখা আছে। কিন্তু আছড়ে পড়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তেই সে অনুভব করল এক অলৌকিক স্পর্শ। তার উন্মুক্ত কোমরে কোত্থেকে যেন একটি তপ্ত-বলিষ্ঠ হাতের ছোঁয়ায় হেঁচকা টান লাগল—যা তাকে নিমিষেই সম্মূখে মুখ থুবড়ে পতন হতে রক্ষা করল।
আনায়া ধূলিসাৎ হয়নি, বরং দুটি পেশিবহুল বাহুর ঘেরাটোপে সে শক্তভাবে বাধা পড়েছে। তার সমগ্র শরীর এখন আগুন্তকের নির্ভরতায়; একটি উষ্ণ ওভারকোটের আদলে ঢাকা।
আনায়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেই বলিষ্ঠ হাত দুটি তাকে ঘুরিয়ে নিজের দিকে ফেরালো। নিমেষেই তার চোখের সামনে উন্মোচিত হলো সুদর্শনের গম্ভীর মুখাবয়ব আর প্রশস্ত বুক।
কেনীথ দ্বিধাদ্বন্দে ছিল কি করবে। কিন্তু গাড়ি হতে বেড়িয়ে নিজের ওভারকোটটা খুলতে খুলতে, আনায়ার দিকে এগোতে গিয়ে দেখল, যা ভেবেছিল তাই! আশেপাশের সবগুলো মানুষ পারলে আনায়াকে যেন চোখ গিলে খাবে। অথচ রমণীর তাতে কোনো ধ্যানই নেই। সবটা তিক্ত নজরে পরখ করার পর, অচিরেই কেনীথের ওষ্ঠধর হতে বিরক্তিসূচক নির্গত হলো—
‘ইডিয়ট!’
এরিমধ্য অকস্মাৎ যখন দেখে—দিশেহারা আনায়ার হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ার দশা, ওমনি সে নিজের কালো ওভারকোট দিয়ে পেছন থেকে সম্পূর্ণ আনায়াকে নিপুণভাবে জড়িয়ে নিজের বক্ষদেশে টেনে নিল। ঘটনার আকস্মিকতা এতটাই প্রবল ছিল যে, শব্দ করার শক্তিও যেন তারা হারিয়ে ফেলল।
বলিষ্ঠ পুরুষের সেই প্রশস্ত বুকে নাক ঠেকিয়ে, পরিচিত সেই উগ্র পুরুষালি সুগন্ধে আনায়ার জ্ঞান হারানোর উপক্রম। কেনীথ আপাতদৃষ্টিতে স্বাভাবিক থাকলেও আনায়া তখন দিশেহারা। এক সেকেন্ড! এটি কি আদৌ বাস্তব, নাকি আবারও তার কোনো বেহুদা কাল্পনিক বিভ্রম? এই দাম্ভিক পুরুষটি কি সত্যিই নিজের ইচ্ছায় তার কাছে এগিয়ে এসেছে? সত্যিই এসেছে? সে যদি এখন চোখ মেলে দেখে, সে আসলে বাস্তবিক অর্থে রাস্তায় ধপাস করে পড়ে আছেআর এসবই তার কল্পনা—তবে কী হবে? না,না, এটা যেন কিছুতেই তার কল্পনা না হয়। এটা সত্যি হওয়া চাই!
আনায়া চোখ পিটপিট করে বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে অপলক তাকিয়ে রইল নিজের আরাধ্য পুরুষের মুখপানে; অনবরত শুষ্ক ঢোক গিলল সে। মনে মনে ভাবল—
‘ একটা মানুষ এত সুন্দর হয় কী করে! জানে।মেরে ফেলবে নাকি? ’ এ যেন আগুন-উত্তাপ রূপের মরণফাঁদ। যখন-তখন জ্যান্ত মেরে ফেলার পায়তারা করে এতো সুন্দর হয়েছে যেন।
কেনীথ আর এক মুহূর্তও কালক্ষেপণ করে না। যদিও ওভারকোট দিয়ে আনায়ার দেহ ঢাকা পড়েছে, কিন্তু কেনীথের নিজের কালো শার্ট আর চুলগুলো বৃষ্টির ছাঁটে সিক্ত হয়ে উঠছে।
সে কোনো কথা না বাড়িয়ে আনায়ার হাত শক্ত করে চেপে ধরে। আনায়া হকচকিয়ে যায় এরূপ কাজে। হাত ধরে তাকে পুনরায় নিজের গাড়ির দিকে নিয়ে গেল কেনীথ। আনায়া মোহনীয় দৃষ্টি পেছন হতে কেনীথকে দেখতে লাগল; তার পায়ের তালে পা মেলাতে না পারলেও, শূন্যে ভেসে চলা এক মানবীতে রূপান্তর হয়েছে সে।দুজনের চুলগুলো এলোমেলো,আনায়ার বেণীখানা আগলা হতে হতে খসে পড়ার উপক্রম, বৃষ্টির ছাঁটে গা ভিজে যাচ্ছে, মাথার উপর কালো মেঘের ঘটঘটা, চারপাশ হতে দমকা হাওয়া এসে গায়ে মিশে শিহরণ জাগিয়ে তুলছে আর তার আরাধ্য পুরুষ নিজে তার হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে চলেছে—আনায়ার কাছে সবারই কেবল স্বপ্ন নয় দুর্ধর্ষ কল্পনার মতো।
কেনীথ আনায়াকে সিটে বসিয়ে দিয়ে দরজাটি বন্ধ করে দিল; নিজেও ড্রাইভিং সিটে গাম্ভীর্যের সাথে চেপে বসল।
গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার আগে সে হঠাৎ আনায়ার দিকে ঝুঁকে পড়ল। কেনীথের দৃষ্টি সরাসরি আনায়ার চোখের দিকে না থাকলেও, আনায়া বেচারি আতঙ্কে আর উত্তেজনার আতিশয্যে প্রায় কেঁদেই ফেলবে এমন দশা। একনিমিষেই গলা শুকিয়ে হলো চৌচির; কেনীথের এতো সন্নিকটে ফেঁসে সে মূহুর্তেই হয়ে উঠল দিশেহারা উন্মাদ।
অথচ কেনীথ কেবল তার সিটবেল্ট বাঁধতেই মনোযোগী। ঠিক সেই একইভাবে অবজ্ঞার সাথে সে সিটবেল্টটি আটকে দিল, যেভাবে মাসখানেক আগে চট্টগ্রামে এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছিল। সেদিনও আনায়া সিটবেল্ট লাগাতে অপটু ছিল,কিন্তু আজ? একবার জিজ্ঞেসও করল না, নূত্যতম সময়ও নিল না। এরপরও কি বলবে, তারা দুজন কেবলই অপরিচিতা কিংবা তথাকথিত স্টুডেন্ট-প্রফসরের সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
আনায়ার মাথায় কোনো কিছু কাজ করছে না। লোকটার এই আকস্মিক আচরণ তার হৃদস্পন্দন কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এসব কি শুরু করেছেন উনি? এসব করে জানে মে’রে ফেলবে? সে তো পাগল হয়ে যাচ্ছে!
কেনীথ নিজের কাজ সেরে, ড্রাইভিং সিটে সোজা হয়ে বসল; গম্ভীর স্বরে শুধালো,
”এড্রেস…?”
আনায়া হকচকিয়ে কেনীথের দিকে তাকায়। কেনীথের দৃষ্টি রাস্তার দিকে নিবদ্ধ। আনায়া একটি ভারী শ্বাস ফেলে নিজের বাসার ঠিকানাটি বলে দেয়। কেনীথ নির্বিকার ভঙ্গিতে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে,একহাতে ড্রাইভ করতে শুরু করে।
নিস্তব্ধতায় আনায়ার বুক দুরুদুরু কাঁপছে। অত্যধিক খুশি নাকি চাপা উত্তেজনা—তা বলা মুশকিল। হাত-পা, মস্তিষ্ক সব অবশ হয়ে আসছে। বেহায়া নজরটা ঠিকই ঘুরেফিরে কেনীথের দিকে চলে যাচ্ছে।
ভেজা-সিক্ত বফুল-স্লিভের ব্ল্যাক শার্টটি কেনীথের পেশিবহুল শরীরের সাথে লেপ্টে আছে। স্টিয়ারিং ঘোরানোর সময় তাঁর হাতের পেশিগুলো শার্টের আদলে ফেঁপে ফুলে উঠছে। আনায়া অস্বস্তিতে ঠোঁট ভেজায়। নজর সরাতে চায়, কিন্তু অবাধ্য দৃষ্টি তাতে সায় দেয়না।
আনায়া আবারও কেনীথের আপাদমস্তক খুঁটিয়ে পরখ করতে থাকে। কেনীথের প্রশস্ত বুক,পেটানো শরীর, অবিন্যস্ত সিক্ত ঝাঁকড়া চুল—সবকিছু পেরিয়ে আনায়ার অবাধ্য দৃষ্টি গিয়ে আবারও স্থির হলো সেই সুঠাম তীক্ষ্ণধার অ্যাডামস অ্যাপেলে। আনায়া নিজের ওষ্ঠধর চেপে ধরল। তার দৃষ্টি এক নিমিষেই অ্যাডামস অ্যাপেলে হতে কেনীথের ভেজা পুরু ঠোঁটজোড়ায় নিবদ্ধ হলো।
আনায়া চোখ-মুখ খিঁচে ফেলে। নিজেকে সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে। এ কেমন মরণফাঁদ! লোকটা কিছু না করেই তাকে জ্যান্ত মেরে ফেলছে।আনায়া দ্রুত নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিল।
তার তলপেটে তখন যেন হাজারো উড়ুউড়ু প্রজাপতির মেলা বসেছে। কেনীথের ওভারকোটটি গায়ে জড়ানো থাকায় সে সবার আগে অগোচরে নিজের তলপেট চেপে ধরল। পায়ের সাথে পা ঘষে নিজেকে শান্ত রাখার বৃথা চেষ্টা করতে লাগল। ইচ্ছে হচ্ছে এখনই এই চলন্ত গাড়ি হতে নেমে দৌড়ে পালাতে।
নিজেকে শান্ত করার প্রয়াসের মধ্যেই আনায়ার হঠাৎ মনে হলো, কেনীথ হয়তো তাকে দেখছে। সে তৎক্ষনাৎ কেনীথের দিকে ফিরে তাকায়। কিন্তু দেখে না! লোকটা তার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। তার দৃঢ় দৃষ্টি কেবল রাস্তার দিকেই নিবদ্ধ। তবুও আনায়ার মনে এক সূক্ষ্ম খটকা থেকেই গেল। আনায়া আর এসব নিয়ে বেশি না ভেবে নিজেকে শুধু আশ্বস্ত করল—এখান থেকে দ্রুত কেটে পড়াই এখন একমাত্র উপায়।
গাড়ির অভ্যন্তরে তখনও এক অস্থির-রুদ্ধশ্বাস নিস্তব্ধতা বিরাজমান। সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে; কেবল বাইরের অবাধ্য বৃষ্টির একটানা শব্দ সেই নীরবতাকে আরও রহস্যময় করে তুলছে। আনায়া আড়ষ্ট হয়ে বসে আছে; তার চঞ্চল মস্তিষ্ক এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ অচল। কেনীথের এই গুরুগম্ভীর গাম্ভীর্য আর আবদ্ধ গুমোট পরিবেশ তাকে যেন কুরে কুরে খাচ্ছে। অস্বস্তিকর এই স্নায়বিক চাপ সইতে না পেরে সে হুট করে বলে বসল,
”আপনার গাড়িতে কি মিউজিক সিস্টেম নেই? মানে…গান-টান বাজে না?”
কেনীথ কোনো উত্তর দিল না। তার সেই চিরচেনা নিস্পৃহ মৌনতায় আনায়া আবারও দমে গেল। তবে কয়েক মুহূর্ত পর, অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবেই কেনীথ ড্যাশবোর্ডের স্ক্রিনে আঙুল ছুঁইয়ে মিউজিক প্লেয়ারটি সচল করে দিল। পরক্ষণেই স্পিকারে একটি স্কটিশ সফট মেলোডি বেজে উঠল। গানের ভাষা এবং সুর এতটাই অচেনা যে আনায়ার ভ্রু কুঁচকে এল। সে মনে মনে আওড়ালো,
’মানছি বেটা দেশী-বিদেশী মিলিয়ে উৎপাদন হওয়া এক মারদাঙ্গা আইটেম, তাই বলে গানটাও এমন উদ্ভট ভাষায় শুনতে হবে? কিছুই তো বুঝি না!’
বিরক্তিটা আর চেপে রাখতে না পেরে সে সরাসরি বলে ফেলল,
“এই ভাষার তো কিছুই বুঝতে পারছি না। অন্তত একটা ইংলিশ গানও তো প্লে করতে পারেন!”
আনায়া রয়েসয়েই কথাটা বলল, কিন্তু কেনীথ এবারও নির্বিকার। লোকটার এই নিরুত্তর থাকাটাই আনায়াকে এক প্রকার দুঃসাহস দিল। সে দ্বিধা আর সংকোচ ঝেড়ে ফেলে নিজেই হাত বাড়িয়ে গানের লিস্টে সার্চ দিতে শুরু করল। স্কটিশ গানটা সরিয়ে সে ইংরেজি গানের একটি প্লে-লিস্ট থেকে অবিন্যস্তভাবে একটা গান প্লে করে দিল। ওমনি স্পিকারে উদাত্ত ও চরম আবেদনময়ী কণ্ঠে একটি বোল্ড লিরিক্সের গান বেজে উঠল,
‘Touch me like you do, touch-touch-touch me like you do… what are you waiting for?’
গানের কা ম্যসিক্ত কথাগুলো কানে আসতেই আনায়া বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো চমকে উঠল। থমতমে এই পরিবেশে এমন গানের সুর যেন আগুনের হলকা ছড়িয়ে দিল। থতমত খেয়ে সে একবার মিউজিক সিস্টেমের স্ক্রিনের দিকে তো একবার ড্রাইভ করতে থাকা কেনীথের দিকে তাকাল। কেনীথ হুবহু আগের মতোই নিস্পৃহ, যেন পাশের আসনে বসা মেয়েটির এই কাণ্ডকারখানা তার কাছে অতি তুচ্ছ।
আনায়া দ্রুত হাত চালিয়ে অন্য একটি গান দিতে গেল, কিন্তু ভাগ্য বোধহয় আজ তার ঘোরতর বিরুদ্ধেই ছিল। পরের গানটি শুরু হলো আরও খোলামেলা শব্দে,
‘I’m a slave for you, I cannot hold it, I cannot control it…’
আনায়া এবার পুরোপুরি হকচকিয়ে গেল। লজ্জায় তার ফর্সা মুখমণ্ডল আর কান ঝাঝাঁ করছে। দ্রুত দুহাতে গান পাল্টাতে পাল্টাতে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল,
“আ… থাক, ইংলিশ গানের দরকার নেই। এখানে কি কোনো বাংলা গান নেই?”
বলতে বলতেই সে তাড়াহুড়ো করে বাংলা গানের ফোল্ডার থেকে একটি গান প্লে করে দিল। স্পিকারে বেজে উঠল,
‘ঝলসানো রাতে পোড়াবো তোকে, তুমি আমার অন্ধকার আর তুমিই রোশনাই…’
আনায়া দুদণ্ডও স্থির থাকতে পারল না। ‘অন্ধকার’ আর ‘ঝলসানো’ শব্দগুলোর মতো সাধারণ কিছু শব্দও তার কল্পনায় এক নিষিদ্ধ উন্মাদনা আর অযাচিত আবর্ত তৈরি করল। সে ভাবতেও পারেনি, এমন মূহুর্তেই তার বি কৃত মন-মস্তিষ্ক তার সহায় হচ্ছে না। সে আবারও গান পরিবর্তনের জন্য উদ্যত হয়ে, বাচ্চাদের মতো তীব্র অস্বস্তিতে বিড়বিড় করল,
“না না, এটা ঠিক যাচ্ছে না। এখন তো দিনের বেলা, অন্ধকার দিয়ে কী হবে!”
আনায়া নিজের অস্বস্তি লুকাতে বকবক করে যাচ্ছে, অথচ কেনীথ একবারের জন্যও তার দিকে মুখ ফেরালো না। ঠিক তখনই অন্য একটি গানের অর্ধেক অংশ হতে পরবর্তী লিরিক্সটা আছড়ে পড়ল,
‘…গালে চোখে-ঠোঁটে তোর আমি, চুমু এঁকেছি সবচেয়ে দামি…’
লাইনটা শুনেই আনায়া চোখ-মুখ খিঁচে ফেলল। এগান আরেকটু শুনলে সে এখানেই বিদঘুটে ভাবনায় অক্কা পাবে। বিরক্তি আর লজ্জার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে সে এক প্রকার জোর করেই মিউজিক সিস্টেমটা বন্ধ করে দিল। মূর্তির মতো গাল ফুলিয়ে সিটে বসে সে মনে মনে নিজেকেই সহস্র ধিক্কার জানাল।
‘কতবড় বেয়া দব, বে হায়া গেছিস তুই! ছিঃ আনায়া ছিহ্!’
কিছুক্ষণ সবকিছু নিথর থাকার পর, হঠাৎ কেনীথ নিজেই নিঃশব্দে একটি গান প্লে করল। এবার গাড়ির চারপাশ ছাপিয়ে ভরাট ও গম্ভীর এক কণ্ঠে বেজে উঠল,
‘তোর প্রেমেতে অন্ধ হলাম কী দোষ দিবি তাতে_____
বন্ধু তোরে খুঁজে বেড়াই সকাল দুপুর রাতে…!
আগুন জেনেও পুড়লাম আমি দিলাম তাতে ঝাঁপ,
তোর আমার প্রেমে ছিলরে বন্ধু ছিল পুরোটাই পাপ____!’
কেনীথ নিজের মতো শান্তভাবে ড্রাইভ করছে। কিন্তু গানের প্রতিটি ছত্র আনায়ার হৃতপিণ্ডে অদৃশ্য আঘাত করতে মত্ত হলো। সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো লিরিক্সগুলো উপলব্ধি করতে লাগল। গানের পরবর্তী অংশগুলো তার হৃদয়ে গভীর ক্ষতসরূপ অনুভূতি তৈরি করল,
‘পথ হারানো পথিক হলাম সব হারিয়ে নিঃস্ব,
তোর আমার এই প্রেমের কি দাম দেবে বিশ্ব?
প্রেমের নামে কিনলাম আমি নিঠুর অভিশাপ,
তোর আমার প্রেমে ছিলরে বন্ধু ছিল পুরোটাই পাপ_____!’
অচিরেই আনায়ার নাসারন্ধ্র হতে এক তপ্ত দীর্ঘশ্বাস নির্গত হলো। এভাবে এক অদ্ভুত ও স্নায়বিক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পথ চলতে চলতে হঠাৎ গাড়িটা থেমে গেল। আনায়া চমকে কেনীথের দিকে তাকাল; সে নির্বিকার-নির্লপ্ত। তৎক্ষনাৎ আনায়া জানালা দিকে মুখ ফিরিয়ে পাশে তাকিয়ে দেখল, সে তার বাসার গেটের সামনে পৌঁছে গিয়েছে।
পথ ফুরিয়েছে তবে! যা সে হয়তো এত দ্রুত প্রত্যাশা করেনি। একবার কি এই শেষ মুহূর্তে নিজের মনের কথাটি বলা যায় না? কিন্তু কেনীথের এই শীতল প্রতিক্রিয়ায় যদি সে চুরমার হয়ে যায়? আজ বরং থাক তবে! তার এতো বছরের জীবনকালে এটাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে রুদ্ধশ্বাস ও সুন্দর মূহুর্তের মাঝে অন্যতম। এই দিনটাকে সে আর নষ্ট করতে চায়না।
আনায়া নিজের সকল চিন্তাভাবনা চাপা দিয়ে, সামান্য মুচকি মলিন হেসে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। পুনরায় যেন সেই চঞ্চল আনায়া তার উপর ভর করল।যদিও শুরুতে কেনীথের জ্যাকেটটা তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার তার নূন্যতম ইচ্ছা ছিল না, তবে এই মূহুর্তে সে এই ওভারকোটটাও সাথে নিয়ে যেতে পারবে না। এতে কেনীথের প্রফেসরদের নেইম-প্লেট অব্দি লাগানো আছে।
আনায়া দ্রুত ওভারকোটটি খুলে ফেলল। সেটি পরিপাটি ভাবে কয়েক ভাঁজ করে কেনীথের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে,কিছুটা ঝুঁকে নিচু স্বরে বলল,
“ধন্যবাদ!”
আনায়ার অভিব্যক্তিতে কেনীথ তার দিকে ফিরে তাকাল। কিন্তু সেই দৃষ্টি বেশিক্ষণ স্থির রাখা তার পক্ষেও সম্ভব হলো না। তার চোয়াল শক্ত হয়; মস্তিষ্ক অস্বস্তিতে আনমনেই বলে ওঠে,
‘মেয়েটার হুঁশ-আক্কেল এতো কম কেনো? এমন সব দৃশ্য দেখিয়ে তো যে কোনো পুরুষের হাল বেহাল করে ছাড়বে।’
জ্যাকেটটি দেওয়ার জন্য আনায়া একটু সামনের দিকে ঝুঁকতেই, তার সিক্ত শাড়ির আঁচলটা অবাধ্য হয়ে সরে গিয়েছে। ফলে আঁটসাঁট ব্লাউজের উন্মুক্ত গলাটা গলিয়ে না জানি কোথাকার না কোথাকার লতানো গায়ের ভাজ সদৃশ্য হয়েছে।
কেনীথ এক মূহুর্তেই দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। কিন্তু চোখের সামনে হতে রমণীর গলার ভাঁজে ফুটে থাকা কুচকুচে তিলটা কোনোমতেই সরছে না। সেটা তো প্রতিবারের মতোই জ্বলজ্বল করছিল; কেনীথের দৃঢ় মন-মস্তিষ্ককেও অবাধ্য এক দৃঢ় আকর্ষণ-বলে টানছিল।
এই তিলখানা আনায়ার গায়ে শৈশব থেকেই নখদর্পণে। আরো একটি বিশেষ তিল রয়েছে, আনায়ার ডান হাতের বাহু আর কাঁধের ভাঁজের ঠিক মাঝবরাবর ফর্সা নরম মাংসপিন্ডে;জ্বলজ্বলে কুচকুচে কালো, আকারে কিছুটা বড়ও বটে—যা সে চট্টগ্রামে আদিবাসীদের গ্রামে আনমনা হয়ে সবাইকে দেখিয়ে বেড়িয়েছিল। কেনীথ সে-সবের কোনোটাই ভোলেনি। দুদণ্ড সময় নিয়ে ভাবতে নিলে, হয়তো আজোও সে গুনে গুনে রমণীর গায়ের প্রতিটি গোপন তিলের সন্ধান দিয়ে দিতে পারবে—যা আনায়ার কাছেও অজানা।
কেনীথের প্রত্যুত্তর না পেয়ে আনায়া আর দাঁড়ালো না; সে বেশ খুশি মনেই গাড়ির দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে, বৃষ্টির মাঝে চপল পায়ে বাসার দিকে দৌড়ে গেল। ঠিক যেন সেই ছোটবেলার অবাধ্য বৃষ্টিপাগল মেয়েটি; সময়ে-অসময়ে বৃষ্টিতে ভেজার জন্য কতই না জেদ ধরত।
কেনীথ এবার আর নিজেকে আটকাতে পারল না; নিজের কঠোর দৃষ্টি জানালার দিকে ফিরিয়ে সিক্ত আনায়ার সেই প্রাণবন্ত পলায়ন দেখল অপলক চোখে। বৃষ্টির ঝাপ্টায় মেয়েটির শরীর যেন আরও প্রস্ফুটিত-মোহনীয় হয়ে উঠেছে। কেনীথ পথহারা পথিকের ন্যায় শূন্য দৃষ্টিতে তা একনাগাড়ে দেখে গেল; দুবার শুষ্ক ঢোকও গিলল আনমনে। ক্রমশই যেন নিজের সব নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে সে।
এতক্ষণ আনায়ার সাথে পার করা প্রতিটি মূহুর্তই ছিল তার কাছে দুর্ধর্ষকর। তবুও কিভাবে যে নিজেকে এতোটা নিরেট রেখেছে,এটা তো কেবল সেই জানে। আনায়ার গা হতে বৃষ্টিস্নাত ও চেরিব্লাস্ট পারফিউমের একত্রিত সুগন্ধি তাকে শুরুতেই দিশেহারা করে দিয়েছিল।
অন্যদিকে আনায়া নিজের মতো ছুটে চলেছে;হালকা রঙের শাড়ি গায়ের সাথে সম্পূর্ণ রূপে লেপ্টে আছে। আগের চেয়েও সর্বাধিক সৌন্দর্যের সাথে রমণীর গায়ের প্রতিটি দৃশ্যমান অংশ অত্যধিক হাড়ে ফুটে উঠেছে। অথচ তাতে তার কোনো খেয়াল নেই। ঝমঝমে বৃষ্টির ছিঁটে নিয়েই, শাড়ির কুঁচি কিছুটা উঁচিয়ে ধরে, ঘন-অন্ধকার মেঘে ঢাকা আবহতেই প্রাণবন্তরূপে ছুটছে সে। অন্যদিকে পেছন হতে একজোড়া দৃষ্টি তাকে আপাদমস্তক স্পষ্টভাবে দেখার প্রয়াসে গাড়ির গ্লাস নামিয়ে দেখতে শুরু করেছে।
আনায়া দৃষ্টির আড়াল হতেই কেনীথ সম্বিৎ ফিরে পেল। দ্রুত কাঁচ তুলে দিয়ে, সে এই হাড়হিম ঠান্ডার মাঝেও এসিটা অন করে, পাওয়ার বাড়িয়ে দিল। কলার টেনে টাইটা এক হ্যাঁচকায় খুলে পাশে ছুঁড়ে ফেলল। ভারী ভারী দুবার শ্বাস ফেলে স্টিয়ারিংটা দুহাতে শক্ত করে চেপে ধরল। মাথাটা নুইয়ে স্টিয়ারিং এর উপর ঠেকিয়ে দুবার দীর্ঘ শ্বাস টেনে চোখ বুঁজে নেয়।
একনিমিষেই চোখের পাতায় ফুটে ওঠে রমণীর পূর্নাঙ্গ দেহের অবয়ব। ঘুরে-ফিরে সেই নমনীয় লতানো কোমড়, গলার ভাঁজের জ্বলজ্বলে তিল কিংবা রমণীর ঝুকে পড়ার তালে গ্রীবা হতে বেশ খানিকটা নিন্মে….আবারও কেনীথ চোখ-মুখ তীব্রতার সহিত খিঁচে নিল। রমণীর দেহের অযাচিত অংশগুলো চোখের সামনে থেকে হটছেই না। এখনো পুরো গাড়িতে আনায়ার রেখে যাওয়া চেরি-ব্লাস্টের সুগন্ধি ছড়িয়ে আছে। কেনীথের ঠিকমতো নিশ্বাস নেওয়াই দায় হয়ে যায়। সে তৎক্ষনাৎ মাথা তুলে দুহাতে মুখ চেপে ধরে। দুহাতে চুলগুলো পেছনে ঠেলে দিতে দিতে, ভারী শ্বাস ফেলে অস্বস্তি নিয়ে খাদে নামানো কন্ঠস্বরে আওড়ায়,
“ও বড় হবে কবে!”
এরিমধ্যে দৃশ্যপট খানিকটা বদলে যায়। কেনীথের নজর ফ্রন্ট মিররে পড়তেই সে থমকে গেল।তার নোস-ব্লি ডিং হচ্ছে। নাকে হাত দিতেই দেখল ঘটনা সত্য। আঙুলের ডগায় রক্ত দেখে কেনীথ বিস্ময়ে তাজ্জব বনে ভ্রু উঁচিয়ে আওড়াল,
“সিরিয়াসলি?”
পরক্ষণেই সে তাচ্ছিল্যের সহিত ক্ষীণ হেসে, কব্জি দিয়ে র ক্তখানি এক লহমায় মুছে নিল। তবে এলোমেলো হয়ে যাওয়া কেনীথের সেই অবজ্ঞা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। এক তীব্র অস্বস্তিতে সে নিজের দিকে মাথা নুইয়ে তাকাতেই, বিস্ময়ে তার কপালে ভাঁজ পড়ল।
এই বিস্ময় যেন কাটে না, বরং এক ধরণের তীব্র আত্মগ্লানি হয়ে তাকে বিদ্ধ করতে লাগল। তার মতো ইস্পাতকঠিন কঠোর-সংযমী পুরুষের ক্ষেত্রে, এটাও কি সম্ভব?
পরিহিত নিকষ কালো প্যান্টের অন্তরালে শরীরের এক অবাধ্য ও উদ্ধত স্ফীতি তার সমস্ত গাম্ভীর্যকে যেন এক নিমেষে ধূলিসাৎ করে দিতে চাইছে। কাপড়ের সেই টানটান অবয়ব স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছিল, তার শরীরের রক্তপ্রবাহ এখন আর তার মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণে নেই; বরং তা কোনো এক নিষিদ্ধ প্রমত্ততার অতল গহ্বরে অবগাহন করছে।
নিজের এই আকস্মিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত শারীরিক প্রতিক্রিয়ায় সে নিজেই নিজের কাছে তুচ্ছ হলো। এ যেন কোনোমতেই কাম্য ছিল না। অবাধ্য শরীরের এই উদ্ধত রূপ দেখে সে নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছিল না। এই অকস্মাৎ বহিঃপ্রকাশ মূহুর্তেই তার পুরুষালি দম্ভকে এক মুহূর্তের জন্য বিদ্রূপ করে বসল।
—”ড্যাম ইট! যাস্ট ফা*কিং গ্রোসসস!”
বিরক্তির চরম শিখরে পৌঁছে তার কণ্ঠস্বর হতে অস্ফুটে এই তিক্ততা নির্গত হলো।কেনীথ দুই হাতের তালুতে চোখমুখ চেপে ধরল। যেন নিজেকে আড়াল করতে চাইছে নিজেরই কা মা র্ত অস্তিত্ব হতে। ফুসফুস ভরে দুবার ভারী শ্বাস টেনে সে অস্থিরতাকে দমিয়ে রাখার বিফল চেষ্টা করতে থাকল।
মহামায়া পর্ব ৩৭
হঠাৎ ফোনের নোটিফিকেশনে কেনীথের ধ্যান ভঙ্গ হলো। ফোন চেক করতেই দেখল একটি ইমেইল এসেছে। ইমেইলটা দেখার সাথে সাথে তার মুখাবয়বে সেই চিরচেনা শীতল গাম্ভীর্য ফিরে এল। কিছুক্ষণ আগের সেই মোহময় মুহূর্তগুলো যেন এক লহমায় ফিঁকে হয়ে গেল। এই একটি ইমেইল হয়তো তার জীবনের পুরো সমীকরণটাই বদলে দিতে চলেছে কিংবা নিজের এরূপ অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন গুলোর পর তাকে তার জীবনের চূড়ান্ত সিন্ধান্ত নিয়ে আবারও নতুন করে ভাবতে হবে।
