মহামায়া পর্ব ৫০
তুশকন্যা
ল্যাবের দীর্ঘস্থায়ী রূদ্ধশ্বাস পর্বের সমাপ্তি ঘটেছে। সারা দিনের নিরবচ্ছিন্ন ক্লাস আর ল্যাবের প্র্যাক্টিক্যাল ফাইলের চুলচেরা বিশ্লেষণের পর কমবেশি প্রতিটি শিক্ষার্থীর অবয়বেই ক্লান্তির স্পষ্ট ছাপ। তবে এই ক্লান্তির রেশটুকু ঝেড়ে ফেলার অবকাশ মেলেনি কারও; ল্যাব থেকে বের হতেই হাক-ডাক পড়ল, অডিটোরিয়ামে আয়োজিত আজকের ইভেন্টে। শিক্ষার্থীরা মন্থর পায়ে সেদিকেই অগ্রসর হতে লাগল।
হাঁটার মাঝেই চারপাশের জটলা থেকে কিছু ফিসফিসানি আর গুঞ্জন ভেসে আসছিল। জেইন কান খাড়া করে সেই আলোচনা শোনার চেষ্টা করছিল। হঠাৎ সে লারিসা আর আইজেলের দিকে তাকিয়ে বেশ অবাক হয়ে বলল,
“হেই লিসেন, আজকের এই ইভেন্টটা মূলত একজন প্রফেসরের রিটায়ারমেন্ট অ্যানাউন্সমেন্টের জন্য। তবে আসল খবর অন্যকিছু। যে প্রফেসর আজ রিটায়ার করছেন, তাকে আমাদের ইয়ারের স্টুডেন্টরা ওভাবে না চিনলেও, তার জায়গায় যাকে পরবর্তী উচ্চপদস্থ র্যাংকিং বা প্রমোশন দেওয়া হচ্ছে, সে আর কেউ নয়— আমাদের প্রফেসর ভিকে!”
আইজেল আর লারিসা খবরটা শুনে বেশ কৌতূহলী ও বিস্মিত হলো। আইজেল চোখ বড় বড় করে বলল,
“রিয়েলি! প্রফেসর ভিকে? উনি তো এমনিতেই এতটা স্ট্রিক্ট, এবার উচ্চপদস্থ র্যাংক পেলে তো ল্যাবে-ক্লাসে জীবনটা ভাজাভাজা করে ফেলবে। তবে মানতেই হবে, হি’জ হাইলি কোয়ালিফাইড।”
চারপাশে এই নিয়ে তুমুল ফিসফিসানি, বিস্ময়-অবাক হওয়া কিংবা প্রফেসরের এই সাফল্যে খুশিতে টুকটাক আলোচনা চললেও, আনায়ার মনে এই নিয়ে কোনো বিশেষ ভাবান্তর হলো না। সে যেন এক সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতের বাসিন্দা হয়ে হেঁটে চলেছে। তার মস্তিস্ক জুড়েই তখন প্রগাঢ়, গম্ভীর এক চিন্তার মেঘ। ল্যাবে কেনীথের সেই আকস্মিক স্পর্শ, তার এপ্রনের বেল্ট বেঁধে দেওয়া, আর আঙুল কেটে যাওয়ার পর সেই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে ক্ষতস্থান ড্রেসিং করে দেওয়ার দৃশ্যগুলো বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল।
অন্যকোনো মুহূর্তে সে হয়তো এসব বারংবার কল্পনা করে ছয়-সাতবার খুশিতে জ্ঞান হারাত; কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে সেসব নিয়ে তার মাঝে তেমন কোনো অনুভূতিই জাগছে না। বরং হিসেব-নিকেশ মিলিয়ে ভাবছে,কেনীথ আসলে কী চায়? তার আসল উদ্দেশ্যটা কী? প্রতিমূহূর্তে সে লোকটার নতুন নতুন রূপের সাথে পরিচিত হচ্ছে। অথচ তার খোলসের আড়ালে কোন সত্য লুকিয়ে, সেটাই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এবং চিন্তার এই গোলকধাঁধা হতে কোনোভাবেই বেরও হতে পারছে না আনায়া।
সকলে অডিটোরিয়ামে প্রবেশ করতেই খানিকটা অবাক হলো। ছোট্ট খাটো ইভেন্টের নামে এতো সাজসজ্জা? যদিও চারপাশের পরিবেশ দেখে যে কেউ মুগ্ধ হতে বাধ্য। একটি আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোটখাটো একটি অনুষ্ঠানও যে কতটা মার্জিত ও রাজকীয় হতে পারে, তা সেখানে না এলে অনুধাবন করা অসম্ভব।
বিশাল অর্ধ-বৃত্তাকার গ্যালারি থিয়েটারে মৃদু কিন্তু সুবিন্যস্ত ওয়ার্ম লাইটের আলো ছড়িয়ে রয়েছে এবং ছাদ থেকে ঝুলছে অত্যাধুনিক অ্যাকোস্টিক প্যানেল।স্টেজের একপাশে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যের প্রতীক সংবলিত ব্যানার এবং অন্যপাশে একটি মেহগনি কাঠের তৈরি ডায়াস। পুরো হলরুম জুড়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা স্কলার, প্রবীণ প্রফেসর এবং বিদেশি শিক্ষার্থীদের সমাগম হওয়ায়।
ল্যাবের ঘটনার মতো এবার আর অডিটোরিয়াম পৌঁছাতে বিন্দুমাত্র দেরি করেনি চারজন। জেইন আর আইজেলের তৎপরতায় একদম শুরুর দিকেই, স্টেজের বেশ কাছাকাছি একটি সারির আসন তারা দখল করে আগেভাগে বসে পড়ল। আনায়ার এসবে অংশ নেওয়া বা আগেভাগে সিট দখল করে বসার মতো বিশেষ কোনো আগ্রহ ছিল না; কিন্তু বন্ধুদের জোরাজুরিতে সে কোনো প্রতিবাদ না করে চুপচাপ তাদের কথামতোই প্রথম সারির আসনটিতে গা এলিয়ে দিল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটল। মঞ্চে একে একে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং ডিন এসে উপস্থিত হলেন। এরপর শুরু হলো দীর্ঘ স্পিচ বা বক্তৃতার পর্ব। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, বিদায়ী প্রফেসরের দীর্ঘ কর্মজীবন এবং পেশাদারিত্বের নানান দিক নিয়ে একের পর এক আবেগীয় ও গম্ভীর বক্তব্য দেওয়া হতে লাগল। উপস্থিত শিক্ষার্থীরা ক্লান্ত হওয়া সত্ত্বেও অত্যন্ত বাধ্য ও সুশৃঙ্খলভাবে পিনপতন নীরবতা বজায় রেখে সেসব শুনতে লাগল। খামখেয়ালী রমণী আনায়া সেসব শুনতে শুনতে কয়েকবার হাই তুলল। তা দেখে পাশ থেকে লারিসা থাকে সাবধান করে ফিসফিসিয়ে বলল,
“হুঁশশ, কি করছো তুমি। তোমার এই কান্ডকারখানা দেখলে নিশ্চিত এখান থেকে আমাদের দলবেঁধে বের করে দেবে।”
আনায়া নিজেকে তটস্থ করে গা-ছাড়া ভঙ্গিতে বলল,
“আমার ঘুম পেলে, আমি কি করব? আর দোষটা আমার নয় এনাদের। দেখো কত বোরিং স্পিচ দিচ্ছে, কোনো মজাই পাচ্ছিনা। অথচ আমাদের দেশে স্কুলে একবার কাউয়া মামা এসেছিল। অনেক সুন্দন ভাষণ দিয়েছে, শেষে স্টেজ ভেঙে পড়েও গেছে।”
আনায়ার ফিসফিসানো কথা শুনে, তিন বন্ধুই চোখগুলো ছোট ছোট করে আওড়াল,
“এসব আবার কি বলছো? কার কথা বলছো?”
আনায়া ভারী শ্বাস ফেলে বিড়বিড় করল,
“ও কিছু না, তোমরা ওনাদের চিনবে না। ওনারা আমাদের দেশের অনেক নামী-দামী লোকজন।”
এদিকে দীর্ঘ আনুষ্ঠানিকতা শেষে মঞ্চের ঘোষক মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে ঘোষণা করলেন যে, এবার মূল অনুষ্ঠানের সমাপ্তি টেনে একটি সংক্ষিপ্ত কালচারাল সেগমেন্ট শুরু হবে। শিক্ষার্থীদের মাঝ থেকে যারা গাইতে ইচ্ছুক, তারা যেন মঞ্চে চলে আসে। আর বোনাস হিসেবে, আজ তাদের সাথে সুর মেলাবেন স্বয়ং প্রফেসর ভিকে!
ঘোষণাটি শোনামাত্রই পুরো অডিটোরিয়ামে করতালির রোল উঠল। কেনীথের অবশ্য এই সব নিয়ে খুব একটা আগ্রহ ছিল না। ভার্সিটিতে তার স্বভাবজাত রাশভারী ব্যক্তিত্বের সাথে গান-বাজনার এই মেলবন্ধন কিছুটা বেমানান ঠেকলেও, সে আজ নিজের চিরচেনা জেদ বা মনমর্জিতে অটল রইল না। সে ভালো করেই জানে, অন্যান্য পেশাক্ষেত্রের চেয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে তার সামাজিক কিংবা একাডেমিক পরিচয়টা অনেক বেশি সম্মানজনক এবং স্পর্শকাতর। যে পেশাকে গত একবছরে সে আর সবকিছুর চেয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে। তাই মাঝেমধ্যে ব্যক্তিগত অনীহা থাকলেও কিছু প্রাতিষ্ঠানিক রীতিনীতি মানিয়ে নেওয়াই শ্রেয়।
অন্যদিকে অন্যান্য সময় সর্বত্র কেনীথের অবস্থান খুঁজে পেতে চাওয়া আনায়া এবার আর কৌতূহল নিয়ে, পেছন হতে কেনীথকে চোখে দেখার কোনো প্রচেষ্টাও চালাল না। মনের আন্দাজ ও আড়চোখে বুঝে নিল, লোকটা সরাসরি তার চোখের নাগালে না রইলেও বাদবাকি প্রফেসরদের সাথে একদম সম্মূখেই বসে আছে।
ঘোষকের আমন্ত্রণে বেশ কয়েকজন ইউরোপীয় শিক্ষার্থী মঞ্চের সামনে এগিয়ে এসে গিটার কিংবা সাধারণ মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্টের সুরে নিজেদের পছন্দের গান পরিবেশন করতে শুরু করল। খানিকটা অভূত হলেও, স্টেজের একদম প্রথম সারির একপাশের সোফায় পা ওপরে পা তুলে বসে থাকা গম্ভীর প্রফেসর রূপে ভিকে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে প্রতিটি ভাষার প্রতিটি গানের তালে মৃদু সুর মেলাতে লাগল।
স্টুডেন্টরা যখনই গাইতে গাইতে থেমে যাচ্ছে, তখনই সে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বাদবাকি দু-চারটে লাইন অকপটে গেয়ে দিচ্ছে। আর তাতেই যেন চারপাশে চাপা উল্লাসের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
মানুষটার ভাষাগত কিংবা শিল্পগত দিক হতে, এই অভাবনীয় ট্যালেন্টে আনায়া সহ বাকি অনেকেই বেশ অবাক হয়ে সম্মূখের কোণের দিকে উৎসুক হয়ে তাকিয়ে রইল। আপাতদৃষ্টিতে কেনীথের বিন্দুমাত্র প্রশংসা করার ইচ্ছে না রইলেও, আনায়া মনে মনে বিড়বিড় করল,
“লোকটার ট্যালেন্ট আছে বলতে হয়।”
ঠিক সেই মুহূর্তেই পাশাপাশি বসা, আইজেল আর লারিসা এক অদ্ভুত পাগলামিতে মেতে উঠল। তারা দুজন হঠাৎ জেইনকে গান গাওয়ার জন্য খোঁচাতে লাগল,
“হেই ব্রো, তোমারও উচিত একটা গান গাওয়া। প্লিজ প্লিজ, একটা গান গেয়ে আসো।”
আইজেল থামতে না থামতেই লারিসা বলল,
“প্লিজ জেইন, একজন জার্মান হিসেবে তোমার উচিত ওদের মতো আমাদের টিম থেকেও গান গাওয়া। তুমি চাইলেই পারবে, প্লিজ যা-ও না।”
জেইন তাদের কথা শুনল না। এই পাগল মেয়ে দুটোর চক্করে পড়ে তাকে এখন কি ছেড়ে কি করতে হবে কে জানে। সে বারবার মাথা নেড়ে ভদ্র ছেলের মতো বলল,
“সরি, এটা পসিবল নয়। আমি এভাবে সবার সামনের গান গাইতে পারব না, এমনিতেও আমার গানের কন্ঠস্বর ভালো নয়। প্লিজ গাইস, পাগলামি করো না।”
তাদের এমন চাপা স্বর আর ঠেলাঠেলির মাঝে, হঠাৎ আনায়া প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস নিয়ে পাশ থেকে বলে উঠল,
“হেই ছেলে-মেয়েরা! তোমাদের কি মনে হয়, আমার গান গাওয়া উচিত?”
হঠাৎ তার কণ্ঠস্বরে তিনজোড়া চোখ তার দিকে ফিরল। নির্বিকারে আসনে গা এলিয়ে, পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে খেয়ালী রমণী। বন্ধুদের দৃষ্টিতে আনায়াও তাদের দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকাল। লারিসা বলল,
“তুমি গান গাইবে? সত্যি?”
আনায়া কিঞ্চিৎ গলা খাকিয়ে বলল,
“হ্যাঁ,গাওয়াই যায়!”
সাথে সাথে আইজেল গদগদ হয়ে বলল,
“আনায়া, প্লিজ,প্লিজ! তুমি গিয়ে একটা গান সুন্দর করে গাও না! এখানে যারা গান গাইছে, তাদের বেশিরভাগই ইউরোপীয়ান। তুমি গিয়ে সুন্দর একটা এশিয়ান গান গেয়ে এসো। আমি মাঝেমাঝেই তোমার রুম থেকে গানের আওয়াজ পাই, তোমার গলা তো চমৎকার!”
নিজের মতো বন্ধুদেরকেও পাগলামি করতে দেখে, আনায়া কিছুটা উসখুস করল। সে তো মজার ছলে খামখেয়ালি করে কথাটা বলল; অথচ এরা তো সব সিরিয়াসলি নিয়ে নিচ্ছে!
কিন্তু জেইন আর লারিসাও নাছোড়বান্দা। তারা দুপাশ থেকে আনায়াকে রীতিমতো জোর করতে লাগল; অনুরোধের পর অনুরোধ করতে লাগল। বন্ধুদের এমন একরোখা জেদের সামনে অবশেষে আনায়া হাল ছেড়ে দিল। নিজের মানসিক অস্থিরতা ঢাকার জন্যই বোধহয় সে পরক্ষণেই অবহেলাভরে বলল,
“ঠিক আছে, তোমরা যখন এত করে বলছো, তাহলে একটা গান তো গাওয়াই যায়!”
তার মুখে সম্মতির কথা শুনে তিন বন্ধুই একযোগে ভীষণ খুশি হয়ে উঠল। জেইন হঠাৎ চোখজোড়া চকচক করে সোৎসাহে জিজ্ঞেস করল,
“সত্যি গাইবে? বাহ! তা কী গান গাইবে শুনি?”
আনায়া কোনো রকম ভণিতা না করে, পা নাচাতে নাচাতে অত্যন্ত নির্বিকার ঢঙে জবাব দিল,
“ল্যাংটা সুলেমান!”
কথাটা শোনামাত্রই জেইন সহ বাদবাকি দুজন ভ্রু-যুগল কুঁচকে নিল। আইজেল শব্দ দুটোর সাথে হয়তো কিছুটা পরিচিত হলেও, জেইন-লারিসা হতভম্ব এই অদ্ভুত গানের নাম শুনে। জেইন তৎক্ষনাৎ কৌতূহল নিয়ে অবাক সুরে বলল,
“লাংতা শুলামান? হোয়াট ইজ দিস?”
আনায়া ভারী দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আইজেলও লারিসার দিকে তাকিয়ে ইশারা করল যে সেও জীবনে এমন নামের কোনো গানের অস্তিত্ব শোনেনি। আনায়া তাদের এই কিংকর্তব্যবিমূঢ় দশা দেখে তাচ্ছিল্যের সহিত ক্ষীণ তির্যক হাসল। বলল,
“শোনোনি কখনো? তাহলে একটু ওয়েট করো, আমি গেয়ে আসছি।”
বলেই সে অত্যন্ত দৃঢ় পদক্ষেপে সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। গায়ের কালো হুডি সরূপ খোলা চেইনের জ্যাকেটটা খানিক টেনেটুনে ঠিক করে নিয়ে, আলগা খোঁপা বাঁধা চুলগুলো একটানে খুলে পিঠে ছড়িয়ে দিল। অতঃপর দৃঢ়তার সাথে মঞ্চের সামনের উন্মুক্ত জায়গার দিকে এগিয়ে গেল। ভাবভঙ্গি এমন যেন বিশ্বজয় করতে ময়দানে নেমেছে সে। একজন এশীয় রমণীকে মঞ্চের দিকে অগ্রসর হতে দেখে অডিটোরিয়ামের সিংহভাগ শিক্ষার্থী ও দর্শক উল্লাসে হাততালি দিয়ে উঠল।
কিন্তু যে অসীম দৃঢ়তা আর তেজ নিয়ে আনায়া সিট ছেড়ে উঠে এসেছিল, মঞ্চের ঠিক কাছাকাছি পৌঁছানো মাত্রই চারপাশের এতোশত উৎসুক মানুষের মুখ আর কৌতূহলী দৃষ্টি দেখে সে মুহূর্তের মধ্যেই ভড়কে গেল। তার বুকের ভেতরটা এক লহমায় ধক করে উঠল। নিমিষের মধ্যেই তার হাত-পা যেন বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে কাঁপতে শুরু করল।
আর এই চরম অস্বস্তির মাঝেই তার চোখ পড়ল একদম মুখোমুখি এক কোণে বসে থাকা নির্বিকার কেনীথের দিকে। কেনীথ তখনো হাতে একটি মাইক্রোফোন নিয়ে, পায়ের ওপর পা তুলে রাজকীয় ঢঙে বসে আছে। তার সেই শান্ত, শীতল অথচ তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সরাসরি এসে বিঁধল আনায়ার ওপর। পুরুষের তীব্র চাউনি যেন আনায়ার স্নায়ুর ওপর আরও বেশি চাপ সৃষ্টি করল; তার অবস্থা আরও নাজেহাল হয়ে উঠল।
ভয়ে ও জড়তায় আনায়া ঝট করে মুখ ফিরিয়ে পেছনের সারিতে বসা বন্ধুদের দিকে এক কাঁদো কাঁদো দৃষ্টিতে তাকাল। কিন্তু জেইন, আইজেল বা লারিসা—কেউই দূর থেকে তার মনের এই তীব্র অস্থিরতা ও ভীতি বুঝতে পারল না। উল্টো তারা দূর থেকেই ইশারায় হাত নাড়িয়ে তাকে গান শুরু করার জন্য উৎসাহিত করতে লাগল।
আনায়া বুঝতে পারল, এখন আর নিজের বেইজ্জতি করে এখান থেকে পালিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সে নিজের কাঁপতি শরীরটাকে কোনোমতে শক্ত করে তটস্থ হলো। অত্যন্ত শুষ্ক একটা ঢোক গিলে সে মঞ্চের পাশের টেবিলটার দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে রাখা একটি কালো রঙের কর্ডলেস মাইক্রোফোন সে নিজের কাঁপতে থাকা শক্ত হাতের মুঠোয় তুলে নিল।
শতশত বিদেশি চোখের তীক্ষ্ণ নজরদারির সামনে দাঁড়িয়ে, মাইক্রোফোনটা ঠোঁটের কাছে এনে আনায়া তার চোখদুটো ক্ষণিকের জন্য বুঁজে নিয়ে, মনে মনে বিড়বিড় করল,
“খোদা! ওয়াদা করছি, আর পাকনামী করব না। এইবারের মতো বাঁচিয়ে নাও আমায়। রহম করো, তবুও যেন নিজের বেইজ্জতি না হয়ে যায়।”
আনায়া চোখদুটো খুলল। বুক ভরে শ্বাস নিয়ে আর আশেপাশে তাকাল না। তাকালেই নজর চলে যাবে ঐ অসভ্য লোকটার দিকে। আর তারপর সবকিছু তালগোল পাকাবে। অতঃপর নিজের মনের সকল সাহস সঞ্চয় করে আনায়া দৃঢ়তার সাথে গাওয়ার সিন্ধান্ত নিল। পাশ থেকে একজন মিউজিশিয়ান এসে, তার কাছে এসে গানের সুরের ব্যাপারে বিস্তারিত জেনে নিল। মূহুর্তে স্পিকারে বেজে উঠল, তার কাঙ্খিত সেই গানের সুর।
ভার্সিটির বিস্তৃত অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত আয়োজনে, মাইক্রোফোন শক্ত হাতে আঁকড়ে ধরে, আনায়া সুমিষ্ট কন্ঠে গেয়ে উঠল,
⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀‘ভালোবাসা ফুরায় না,
⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀প্রেম কখনো হারায় না…!
⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀অনুভবে থাকে যার যার…’
কিন্তু প্রথম অন্তরাটুকু গাওয়ার পর তার পক্ষে আর একটি শব্দও উচ্চারণ করা সম্ভব হলো না। ভিনদেশী মাটিতে এই নিটোল বাংলা গানের সুর, আর চোখের সামনে এত শত মানুষের উৎসুক, স্তব্ধ দৃষ্টি— মুহূর্তের মধ্যেই আনায়াকে সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন করে ফেলল। সে সুর আর তাল হারিয়ে ফেলল। নার্ভাসনেসের চরম সীমায় পৌঁছে সে একহাতে শক্ত করে মাইক্রোফোনটা চেপে ধরল এবং অন্যহাতে নিজের পরনের আকাশী-নীল রঙের জামাটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল।
তার এভাবে আকস্মিক ও মাঝপথে থেমে যাওয়ায় পুরো অডিটোরিয়ামের পরিবেশ কিছুটা অপ্রস্তুত ও থমথমে হয়ে উঠল। দর্শকগণ একে অপরের দিকে তাকাতে লাগল। আনায়া লজ্জায় ও সংকোচে নিজের মাথা নুইয়ে নিল; এই মুহূর্তে কী করা উচিত তা সে ভেবে পাচ্ছে না।
কিন্তু ঠিক সেই বিব্রতকর মুহূর্তে, পুরো হলরুমকে স্তব্ধ করে দিয়ে এক অপ্রত্যাশিত কাণ্ড ঘটে গেল। প্রথম সারিতে বসে থাকা প্রফেসর ভিকে নিজের হাতের মাইক্রোফোনটি অন করে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার দীর্ঘদেহী বলিষ্ঠ অবয়ব নিয়ে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে স্টেজের দিকে তথা আনায়ার দিকে অগ্রসর হলো।
আনায়ার কণ্ঠস্বর যেখানে থেমে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল, ঠিক সেখান থেকেই প্রফেসর ভিকে তার নিজের গম্ভীর পুরুষালী কণ্ঠে সুর মিলিয়ে পাশ থেকে গাইল,
⠀⠀⠀⠀⠀‘কেউ না জানুক, আমি তো জানি ⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀
⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀আমি তোমার…!
⠀⠀⠀⠀⠀কেউ না জানুক, তুমি তো জানো ⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀
⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀তুমি আমার…!’
এক মুহূর্তের জন্য যেন পুরো অডিটোরিয়ামের সময়-আবহ সবকিছু থমকে গিয়েছে। আনায়া সহ উপস্থিত প্রতিটি শিক্ষার্থীর স্তব্ধ, হতবিহ্বল ও অবিশ্বাসী চোখ সমূহ তখন প্রফেসর রূপে সেই দৃঢ় যান্ত্রিক মানবের দিকে নিবদ্ধ। আনায়া আড়চোখে কেনীথকে নিজের অত্যন্ত কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে গেল। তার মনে হতে লাগল, চারপাশের পুরো পৃথিবীটা বুঝি ভনভন করে ঘুরছে। লোকটার কণ্ঠে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি সুরের তরঙ্গ যেন তার অন্তরালের সুপ্ত অনুভূতিগুলোতে এক তীব্র ঢেউ তুলে দিয়েছে।
এতটা অপ্রত্যাশিত, এতটা অলৌকিক কিছু সে নিজের দূরতম কল্পনাতেও আশা করেনি। একে তো শতশত উৎসুক দৃষ্টির সম্মূখে রমণীর হাত-পা অবশ হয়ে এসেছে; সেখানে আবার লোকটা যে এভাবে সবার সামনে তার সাথে বাংলায় দ্বৈত গান গাইবে, সে-ও তার ভাবনার অতীত।
আনায়াকে চুপ থাকতে দেখে, কেনীথ নিজের চোখ জোড়া সামান্য সরু করে, ইশারায় আনায়াকে গানের বাকি অংশটুকু গাওয়ার জন্য ইঙ্গিত করল। কিন্তু আনায়ার পক্ষে তখন আর নিজেকে সামলানো সম্ভব ছিল না। তীব্র মানসিক চাপ, ক্লান্তি কিংবা কেনীথের এই অতি-মানবিক মোহময় সান্নিধ্য—সবকিছু মিলে তার মস্তিস্কের ওপর এক প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করল।
গানের পরবর্তী সুর তোলার আগেই আনায়ার চারপাশের আলো যেন আঁধারে মিলিয়ে যেতে লাগল। তার শরীর সম্পূর্ণ অবশ হয়ে এল। সে নিজের ভারসাম্য হারিয়ে গা ঢলে আকস্মিক জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে পড়ে যেতে নিল।
কিন্তু কেনীথের ক্ষিপ্র দৃষ্টি কিংবা দৃঢ় হাত তা হতে দিল না। আনায়াকে ভারসাম্য হারিয়ে ঢলে পড়তে দেখামাত্রই, কেনীথ অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ও ক্ষিপ্রতার সাথে নিজের বলিষ্ঠ হাতটি বাড়িয়ে দিল। সে এক টানে রমণীর লতানো কোমরখানা নিজের শক্ত বাহুবন্ধনে টেনে আগলে নিল।
অবচেতনে আনায়া সরাসরি নিচে না পড়ে, সোজা কেনীথের প্রশস্ত উষ্ণ বুকে এসে আছড়ে পড়ল। পুরোপুরি জ্ঞান হারানো মাত্রই তার মাথাটা অবশ ভঙ্গিতে পেছনের দিকে হেলে গেল; দুই হাত আলগা হয়ে ঝুলে পড়ল। তার হাতের মুঠোয় থাকা মাইক্রোফোনটি ভারী শব্দ তুলে মেঝেতে পড়ে গেল।
মহামায়া পর্ব ৪৯
মুহূর্তের মধ্যে পুরো অডিটোরিয়ামের শান্ত পরিবেশ এক তুমুল হট্টগোলে রূপ নিল। জেইন, আইজেল আর লারিসা সহ দলভর্তি স্টুডেন্ট ও শিক্ষকেরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে সেই স্থানের দিকে গোলক আকারে ছুটে এসে এক বিশাল ভিড় জমাল। কিন্তু কেনীথের সেসবে কোনো খেয়াল নেই; জগতের সমস্ত হট্টগোলকে নূন্যতম পরোয়া না করেই, নিজের বুকের সাথে লেপ্টে থাকা অচেতন মেয়েটির দিকে এক অদ্ভুতপূর্বক ব্যাকুল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সে। আনায়া’র হঠাৎ এভাবে জ্ঞান হারানোটা তার স্বাভাবিক ঠেকছে না। আনায়া যে পুরোপুরি সুস্থ নয়,এটা তো তার জানা। উদ্বিগ্নতায় কেনীথের ললাটে ভাজ পড়ল। রমণীর মলিন মুখটার দিকে তাকিয়ে সে অস্ফুটে ডাকল,
“তারা!”
