মহামায়া পর্ব ৬
তুশকন্যা
ভোরের প্রারম্ভে বিস্তৃত আকাশে রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়েছে। সারারাতের গুড়িগুড়ি বৃষ্টির পর সবকিছু যেন নতুন জীবন পেয়েছে—মাটির গন্ধ, শিশিরভেজা ঘাস, সবুজ গাছগাছালির চকচকে পাতাগুলো—সবকিছু এক অদ্ভুত সতেজতায় ঝলমল করছে। বাতাসে ছড়িয়ে আছে শীতলতা। দূরের পাখির কাকলিতে ভাঙছে ভোরের নিস্তব্ধতা।
যথারীতি এহসান মঞ্জিলেও ভোরের আলো ক্রমশ ছড়িয়ে পড়েছে। পাপড়ি নামক ছোট্ট মেয়েটা ঝাড়ু আর কাপড় হাতে ঘুরে ঘুরে ঘর-বাগান পরিষ্কার করছে। এবং মনের আনন্দে গুনগুন করে গাইছে,
‘মুঝছে শাদি কারো গি____
মুঝছে শাদি কারো গি____
ট্যাটাং, ট্যাটাং _____’
সচারাচর তার সব গানের মূল বৈশিষ্ট্য থাকে,বিয়ে-শাদি বিষয়ক কথাবার্তা। অন্যদিকে কাশফিয়া রান্নায় ব্যস্ত, আর রোজ পাশে দাঁড়িয়ে তাকে সাহায্য করছে। নুরজাহান নামাজ শেষ করে তছবি হাতে বাগানের এদিক-সেদিক পায়চারী করছে। মাঝেমধ্যে পাপড়িকে চোখের সামনে পেলে,দুই-একটা ভুল ত্রুটি ধরছে। এতে পাপড়ি বিরক্ত হলেও,সকাল সকাল আর এই বয়স্ক মানুষটার সাথে কোনো ঝামেলা করতে চায় না। না জানি,কখন কোনটা মনে করে তাকে বদদোয়া দেবে—আর তার বিয়ে-শাদির আশা-ভরসা চিরতরে ভেঙ্গে যাবে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
এদিকে ভাহিদ গতরাতেও অনেক দেরিতে বাড়ি ফিরিছে। আবার সকাল হতে না হতেই, কোথায় যেন চলে গিয়েছে। ফলাফলস্বরূপ এখন অব্দি কেনীথ কিংবা পাভেলের সাথে তার দেখা সাক্ষাৎ হয়নি।
অন্যদিকে কেনীথ আর পাভেল আজ বহু দিন পর ভোর বেলাতেই উঠে পড়েছে। উদ্দেশ্য সকাল সকালই বাড়ি ছাড়তে হবে। কেনীথ ফ্রেশ হয়ে রুমে আসতেই দেখল,পাভেল এসেছে। দুজনে টুকটাক প্রয়োজনীয় কথা বলার পর, পাভেল নিচে চলে যায় কাশফিয়া হতে ট্যুরের অনুমতি নিতে। সে চলে যেতেই রুমে রোজ আর পাপড়ি প্রবেশ করে।
রোজ কেনীথের জন্য ব্লাক কফি এনেছে আর পাপড়ি সকাল সকাল ঘড় ঝাড়ু দিতে। তাদের দুজনকে দেখে কেনীথ স্বাভাবিক হয়। শুষ্ক হেসে দুজনের উদ্দেশ্যে আওড়ায়,
“গুড মর্নিং গাইজ!”
কেনীথের আন্তরিকতায় দুজনেই স্বাভাবিক হলো। নয়তো দুজনের মাঝেও বেশ দ্বিধাদ্বন্দ্ব চলছে। এমনিতেও বিদেশী বিদেশী দেখতে। তার মাঝে কত বড়সড় গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। কথাবার্তাও বেশি একটা বলে না।
তার কথায় রোজ মৃদু হেসে বলে,‘গুড মর্নিং’
তবে পাপড়ি তৎক্ষনাৎ বিস্তৃত হেসে বলল,
“সুবাহ বাখইর বড় ভাইজান।”
তার কথায় কেনীথ কিঞ্চিৎ কপাল কুঁচকে বলল,
“তোমার অরিজিন পাকিস্তান?”
পাপড়ি ক্ষণিকের জন্য থমকালেও,পরক্ষণেই মাথা নেড়ে বলে,
“হু,হু।”
এই বলেই সে নিজের কাজে লেগে পড়ে। এদিকে কেনীথ কফির কাপটা নিয়ে বারান্দার দিকে এগিয়ে যায়। অন্যদিকে রোজও আর এখানে বেশিক্ষণ থাকতে চাইল না। না জানি, অজান্তেই কখন কোন আচরণ করে ফেলে,আর তা কেনীথের নজরে ধরা পড়ে।
তবে সে চলে যাবে এমন মূহুর্তেই, পেছনে ঘুরে কেনীথ দুজনের উদ্দেশ্যে বলল,
“দুজনের কাজ শেষ হলে,দু’মিনিট ওয়েট কোরো।”
তার কথা মতো রোজ আর পাপড়ি দু’জনেই থেমে যায়। এবং উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে,কেনীথের দিকে। অন্যদিকে কেনীথ নির্বিকারে হেঁটে নিজের ব্যাগ বের করে। এই রুমে পাভেলেরও দুটো ব্যাগ পড়ে রয়েছে। কিন্তু কেনীথ কি বের করবে,তা-ই ক্ষণিকের মাঝেই ভুলে গেল। কফিতে চুমুক দিয়ে,গ্লাসটা টি-টেবিলের উপর রেখে, চিন্তিত ভঙ্গিতে ভ্রু কুঁচকে, ভাবতে লাগল এদের কি দেওয়া যায়। সে কি আসার সময় কারো জন্য ভেবে কিছু নিয়ে এসেছিলো?
পরক্ষণেই মনে পড়ল,এখানে আসার আগের দিনই তারা ব্লাডেনের স্টোর থেকে একগাদা জিনিস নিয়ে এসেছে। যদিও সেসব নিয়ে তার বিশেষ কোনো চিন্তাভাবনা ছিল না। যা করার নায়রা আর পাভেলই করেছে। কিন্তু এটা তো সত্য যে,সে-ও তাদের সাথেই ছিল। অথচ এতো দ্রুত কি করে সবটা ভুলতে বসেছে?
এসব হচ্ছে টা কি? অতিরিক্ত স্ট্রেস নাকি মেডিসিনের রিয়াকশন? না সবই হচ্ছে শুধুমাত্র এতোবছর পর ঠিক একই জায়গায় নতুন করে ফিরে আসার ফলাফল? কেনীথ দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে ওঠে। অন্যদিকে পেছন হতে দাঁড়িয়ে থাকা রোজ আর পাপড়ি—দুজনেরই কপালে কিঞ্চিৎ ভাজ পড়ে। কিছু একটা গড়বড় লাগছে। কেনীথ তাদের দুজনকে দাঁড়াতে বলে, ওখানে একা একা দাঁড়িয়ে কি ভাবছে?
এরিমধ্যে কেনীথ নিজেকে তটস্থ করে,শান্ত হয়। এসব নিয়ে যত ভাববে ততই সমস্যা। দ্রুত সে লাগেজের চেইনটা খুলে,গম্ভীর স্বরে ডাকে,
“দুজনে এদিকে আয়।”
অকস্মাৎ তার এহেন কন্ঠস্বরে দুজনেই চমকে ওঠে। নিজেদের কোনোমতে সামলে,কেনীথের দিকে এগিয়ে যেতেই সে সরে দাঁড়ায়। এবং কফির মগটা হাতে নিয়ে, তাতে ঠোঁট ভিজিয়ে আওড়ায়,
“ঐ ব্যাগে হয়তো চকলেটস্ আছে। পুরোটাই নিয়ে যা ।আর…।”
কেনীথ ক্ষণিকের জন্য থেমে,প্রথম ব্যাগ থেকে একটা আই প্যাডের বক্স বের করে পাপড়ির হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“যদিও আমার সঠিক ভাবে জানা ছিল না, বাড়িতে কে আছে না আছে…কিন্তু এটা তোমার। আই থিংক,এটা তোমার কাজে লাগবে।”
পাপড়ি সাদা আকৃতির বড়সড় বক্সটা হাতে নিয়ে উলোটপালোট করে দেখে। বক্সের উপর একটা খাওয়া আপেলের ছবি দেখে তার কপাল কিঞ্চিৎ কুঁচকে যায়৷ পরক্ষণেই মনে পড়ে,এই খাওয়া আপেলের জিনিস সে বিদেশী সিরিয়ালে দেখেছে। এটা বড় মোবাইলের মতো আর অনেক দামী। নিমিষেই পাপড়ির চোখমুখ খুশিতে জ্বলজ্বল করে ওঠে। এবং ওমনই সে কেনীথের দিকে মুখ উঁচিয়ে তাকিয়ে বলল,
“ভাইজান!আমি যেটা ভাবতেছি,এটা কি ওইটাই?”
—“মানে?”
কেনীথ কিঞ্চিৎ কপাল কুঁচকে তার দিকে তাকায়। পাপড়ি কিছু সময়ের জন্য থেমে আবারও তাকে জিজ্ঞেস করে,
“ওইসব বাদ দেন।খালি এইটা কন,এটার মধ্যে সুন্দর সুন্দর বেটাগোর ছবি দেখা যায়? নায়কদের ছবি দেখা যাবো তো?”
কেনীথ রুক্ষ ভাবে তাচ্ছিল্যের সহিত তির্যক হেসে মাথা নাড়ায়। পাপড়ির আর কিছু বলার নেই। সে ঝাড়ুটা কোনোমতে হাতের নিচে আঁটকে, এক দৌড়ে খুশিতে রুমের বাহিরে চলে যায়। এবং যেতে যেতেই কেনীথের উদ্দেশ্যে আওড়ায়,
“শুকরিয়া ভাইজান। ফেরাউন তো নব্বই বছর বাঁচছে। আল্লাহ আফনেরে হাজার বছর বাঁচায় রাখুক।”
পাপড়ির এহেন কথায় রোজ বেশম খেলো। কেনীথ কপাল কুঁচকে রোজের উদ্দেশ্যে বলল,
“ও কি এমনই?”
রোজ কিছুটা ইতস্তত স্বরে আওড়ায়,
“ঐ আর কি…আচ্ছা আমি যাচ্ছি।”
—“কোথায় যাচ্ছিস, দাঁড়া এখানে।”
রোজ যেতেই নিয়েছিল। পাপড়ি মেয়েটা কেমন বজ্জাতের মতো আগে আগে দৌড়েছে। অথচ ঘড় ঝাড়ু দেওয়ার বাহানায় সে তাকে ইচ্ছে করেই নিজের সাথে নিয়ে এসেছিল। আপাতত এখানে আর একা একা কেনীথের সামনে থাকা যাবে না। কিন্তু যাবার মূহুর্তে কেনীথের ধমকের ন্যায় কন্ঠস্বরে রোজ চমকে ওঠে। নিজেকে কোনোমতে সামলে নিয়ে চুপটি করে দাঁড়ায়।
অন্যদিকে কেনীথ একহাতে ব্যাগ হাতিয়ে একটা কালো রঙের বক্স বের করে। যার উপর লাল রঙের কারুকার্য করে ব্লাডেনের লোগো বসানো। কেনীথ তা রোজের হাতে দিয়ে বলল,
“দেখ তো পছন্দ হয় কিনা।”
রোজ বক্সটা খুলতেই দেখে,লালচে রঙের ভেলভেট কটনে মোড়ানো কালো-সোনালী ফ্রেমের চকচক এক ঘড়ি। যার গ্লাসের নিচে প্লেটে স্পষ্ট ভাবে লালচে-কালো রঙে লেখা ‘Bloøden’। নিমিষেই রোজের চোখ বিস্ময়ে ছেয়ে যায়। সে কেনীথের দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে বলল,
“এটা তো মারাত্মক সুন্দর! কিন্তু…”
কেনীথ কপাল কুঁচকে বলে,
“কিন্তু?”
রোজ খানিক ইতস্তত স্বরে আওড়ায়,
“মানে…এটা তো অনেক দামী। এই দেখো, ওখানে ইমানি ম্যামের সাইনও দেওয়া রয়েছে। আমার জানা মতে, এটা তার সিগনেচার ডিজাইনের মাঝে অন্যতম।”
কেনীথ কপাল কুঁচকে রোজের উদ্দেশ্যে বলল,
“তুই ইমানিকে চিনিস?”
—“হ্যাঁ,কেনো নয়। উনাকে জার্মানির ব্লাডেন গ্রুপ ইন্ডাস্ট্রির কুইন বলা হয়। তিনি পাবলিক ফিগার হওয়ায় বড় কোনো সেলিব্রিটির থেকেও কম না। যদিও প্রচুর স্ট্রিক্ট পারসোনালিটির, তবুও তিনি মেয়েদের গার্ল ক্রাশ।”
রোজের উৎসুক ভাবভঙ্গিতে কেনীথ ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“তুই ইমানি ছাড়াও ব্লাডেনের আর কাউকে চিনিস?”
রোজ খানিক ভাবুক স্বরে আওড়ায়,
“চিনি না তবে,এটা জানি যে পুরো ব্লাডেন ইন্ডাস্ট্রি এক পাওয়ারফুল ট্রিও দ্বারা পরিচালিত।এই দেখো,ঘড়ির মাঝেও ছোট করে VIP লেখা। এই ভিআইপি মানেও ঐ তিনজনের নামের ফাস্ট লেটার। যার মাঝে আই-তে ইমানি ম্যামই শুধু সামান্য কিছু নিজস্ব বিষয় পাবলিক করে। নয়তো আমি ইন্টারনেটে ঘেঁটেও বাদি দুজনের তেমন কোনো খোঁজখবর পাইনি। তবে এটাও শুনেছি,তাদের মাঝে নাকি এশিয়ানও রয়েছে। মজার ব্যাপার কি জানো? আমি সেই দুজনের লিক হওয়া কিছু ছবি দেখে তোমাকে আর পাভেল ভাইয়াকে ভেবেছিলাম। পরে মনে হলো,তোমরা কেনো ওসব হতে যাবে।
তুমি জানো ওনারা গানও গায়। ব্লাডেন ব্যান্ডের কনসার্ট, পুরো ইউরোপে জনপ্রিয়। অথচ এতো বড় সেলিব্রিটি লোকজন হয়েও ইন্টারনেটে তাদের বিষয়ে বিশেষ কোনো ইনফরমেশনই নেই। শুনেছি,তাদের অনেক পাওয়ারফুল অ্যার্টনি,সাইবার সিকিউরিটি কিংবা পিআর টিম রয়েছে। যারা সহজেই তাদের পারমিশন ব্যতীত কোনোকিছু পাবলিক হতে দেয় না।”
কেনীথ বেশ মনোযোগ দিয়েই রোজের কথা শুনল। এইটুকু তো বুঝেছে,সে তাদের ব্যাপারে কিছুই জানে না। এটা অবশ্য ভালো দিক। পাভেলও কিছু বলেনি,আবার নায়রাও বিষয়গুলো ভালোমতোই হ্যান্ডেল করছে। কিন্তু রোজের এতো ভালো মনমেজাজকে সে একটি বাক্যে বরবাদ করে দেয়।
—“পড়ালেখা বাদ দিয়ে সারাদিন এসব করিস?”
আচমকা কেনীথের এহেন গম্ভীর-তীক্ষ্ণ অভিব্যক্তিতে রোজ তব্দা খায়। মাথা নুইয়ে আমতা-আমতা করে আওড়ায়,
“না মানে…।”
—“কোন ক্লাসে পড়িস?”
—“অনার্স ফাস্ট ইয়ারে।”
রোজ ইতস্তত ভঙ্গিতে এহেন কথা বলেই থেমে যায়। উচ্চতায় কেনীথের কাছে নিজেকে বাচ্চা মনে হচ্ছে। অন্যদিকে কেনীথ তাকে একনজরে পরখ করে দেখে, আচমকা তার মাথার উপরিভাগে হাত বুলিয়ে, লালচে রঙের রেশমের ন্যায় চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে আওড়ায়,
“অনেক বড় হয়ে গিয়েছিস।”
এই বলেই সে,কফির কাপে চুমুক দিয়ে, নির্বিকারে রুম থেকে বেড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে রোজ হতভম্বের ন্যায় পেছন থেকে কেনীথকে চেয়ে চেয়ে দেখে।
সবাই মিলে খেতে বসেছে। ডাইনিং এ ভাহিদ ব্যতীত বাড়ির সকলেই রয়েছে। কাশফিয়া সেই কখন থেকে ভাহিদের অপেক্ষা করছে। নিজেও বুঝতে পারছে না, এটা কোন জাতের বাপ। যত ক্ষোভই থাকুক না কেনো,একবার সামনাসামনি এসে ছেলের সাথে তো একটু-আধটু কথা বলা দরকার। গতরাতেও কত দেরিতে ফিরিছে তাও সে টের পায়নি।আর সকাল হতে না হতেই,বাড়ি ছেড়েছে।
কাশফিয়া বেশ বিরক্তি নিয়েই,ছেলে-মেয়ে আর শ্বাশুড়িদের খাবার পরিবেশন করছে। কেনীথ চুপচাপ গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা নুইয়ে নিজের মতো খাচ্ছে। আশেপাশে কি হচ্ছে না হচ্ছে, তাতে তার কোনো মাথা ব্যাথা নেই। পাভেলের ক্ষেত্রেও বিষয়টা তাই। কেনীথের জন্য হলেও আগেভাগেই বাড়ি ছাড়তে হবে। সকাল সকাল কাশফিয়াকে রাজি করাতে একটু কষ্ট হয়েছে,তবে শেষমেশ কাশফিয়া মেনে নিয়েছে। এই অল্প দিনের ছুটিতে দু’দিনই তারা বাড়ির বাহিরে থাকার পরিকল্পনা করেছে। এমন সিন্ধান্তে কোন মায়ে সাই দেবে?
এরিমধ্যে নূরজাহান কাশফিয়ার উদ্দেশ্যে বলল,
“বৌ-মা! ভাহিদ কই? কাল রাতেও দেখলাম না। সকালেও দেখলাম না।”
কাফশিয়া কিছুটা চাপা বিরক্তির স্বরেই আওড়ায়,
“জানি না আম্মা।”
—“কিছু কি হয়েছে?”
নূরজাহানের সন্দিহান কন্ঠস্বরে কাশফিয়া নিরুত্তর রইল। এরিমধ্যে বাড়িতে ভাহিদের আগমন। ব্রাউন কালারের পাঞ্জাবি পরনে,বেশ তড়িঘড়ি ব্যস্ততা নিয়েই সে বাড়িতে প্রবেশ করে। ডাইনিং এ সবার উপস্থিতি দেখে সে নির্বিকারে গিয়ে,হাতটা ধুয়ে নিয়েই, মধ্য সারির বিশেষিত তার নির্দিষ্ট ফাঁকা চেয়ারে বসে পড়ে। এবং আশেপাশে না তাকিয়েই আওড়ায়,
“কাশফি তাড়াতাড়ি খেতে দাও, আমায় আবার যেতে হবে।”
ভাহিদের এমন অতিব্যস্ততায়, কাফশিয়ার চোয়াল শক্ত হয়ে। কোনোমতে নিজেকে শান্ত রেখে, তাকে খাবার বেড়ে দেয়। এদিকে সকলের মতো পাভেলও খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে, আঁড়চোখে চেয়ে একবার ভাহিদ তো একবার কেনীথকে দেখছে। কিন্তু দুজনে সেই একই ভঙ্গিতে খেয়ে চলেছে। দুজন দুজনের মুখোমুখি হয়ে বসে থাকার পরও,একজনও মাথা তুলে অপরজনকে দেখার প্রয়োজন বোধ করল না। এরিমধ্যে আচমকা ভাহিদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কাশফিয়া তার গায়ে আলতোভাবে গুঁতো দিয়ে তার মনোযোগ কাড়ে। ভাহিদ মাথা উঁচিয়ে তার দিকে তাকাতেই, কাশফিয়া চোয়াল শক্ত করে কেনীথের দিকে ইশারা করে।
তার ইশারা অনুযায়ী ভাহিদ সামনে তাকাতেই দেখে, পাভেল আর কেনীথ নির্বিকারে খেয়ে চলেছে। সে কিছুক্ষণ দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকার পর, স্বাভাবিক স্বরেই বলল,
“ওহ, তোমাদের সাথে তো এখন অব্দি কথাই হলো না। যাই হোক,আসতে কোনো সমস্যা হয়নি তো?”
ভাহিদের কথায় পাভেল মাথা তুলে,ইতস্তত ভঙ্গিতে খানিক মৃদু হেসে বলল,
“না, ফুপা। সব ঠিকঠাক ছিলো।”
এই বলেই সে পুনরায় মাথা নুইয়ে খেতে শুরু করে। কিন্তু কেনীথ এবারের জন্যও মাথা তুলে আশেপাশে তাকায় না। ভাহিদ পাভেল হতে নজর সরিয়ে,একপলক ছেলে ভিভিয়ানকে দেখে, পুনরায় নিজের মতো খেতে শুরু করে। বাপ-ছেলের এমন কাজকর্ম দেখে কাশফিয়ার তীব্র হতাশ হয়। হাতাশার পাশাপাশি তার বেশ রাগও হয়। তবুও চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যতীত সে আর কিছুই বলে না। এরিমধ্যে আচমকা ভাহির খেতে খেতে বলে ওঠে,
“খাওয়া শেষে দুজনে বাহিরে আমার অপেক্ষা কোরো। তোমাদের কিছু দেওয়ার আছে আমার।”
ভাহিদের এহেন নির্বিকার কথায় কেনীথের মাঝে কোনো প্রতিক্রিয়া না হলেও,বাকিদের মতো পাভেল খানিকটা অবাক হয়। তবে সে ছোট পরিসরে ‘জ্বী’ বলা ব্যতীত আর কিছুই বলে না।
এরিমধ্যে পুনরায় সবার মাঝে নীরবতা জমে। সবার খাবার খাওয়া প্রায় শেষের দিকে, এমন সময় কেনীথের পাশেই চুপচাপ খেতে থাকা পাপড়ি তার উদ্দেশ্যে বলে ওঠে,
“আচ্ছা ভাইজান,আপনারে একটা কথা কই?”
তার এহেন ভাষা শুনে শুরুতেই কাশফিয়া বাঁধা দিয়ে বলল,
“পাপড়ি,তোমাকে আগেও বলেছি ঠিকঠাক ভাষায় কথা বলবে।”
তার কথা শেষ হতে না হতেই, পাপড়ি তৎক্ষনাৎ বলে ওঠে,
“বড়-আম্মা! তুমি আগে তোমার শাউরিরে সামলাও। হেয় নিজেই ঠিকমতো ভাষার পয়োগ করে না।”
—“ঐ ছেমড়ী,বেশি কথা কস কেন। গুরুজন যা শিখায় তা তো শিখবি না। আমার আর তোর বয়স এক হইলো? আর তুই আমারে শিখাইবি কেমনে কথা কইতে হয়?”
আচমকা নূরজাহান আর পাপড়ির এমন তর্কে, কাশফিয়া ভারী শ্বাস ফেলে। পাপড়ি জবাবে আরো কিছু বলার পূর্বেই,সে তার চোখের ইশারায় তাকে থামিয়ে দেয়। তবে সে কেনীথের সাথে কথা বলতে থমকায় না। সবার হতে নজর সরিয়ে, কেনীথের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ভাইজান,কথাটা কই!”
কেনীথ গম্ভীর স্বরে আওড়ায়,
“হু!”
পাপড়ি অনুমতি পাওয়া মাত্রই খুশিতে গদগদ হয়ে বলল,
” বড় ভাইজান,আপনারা তো এতোদিন বিদেশ থাকছেন। ঐ খানে কি আমার জন্য কোনো সুন্দর বেটামানুষ ছিলো না? খাওয়া আপেলের বদলে হেরকম কিছু দিলে কিন্তু আমি মেলা খুশি হইতাম। সমস্যা নাই, খাওয়া আপেলেও আমি খুশি। কিন্তু…”
এরিমধ্যে পাভেল পাশ থেকে বলল,
“তোমার বয়স তো অনেক কম। আরেকটু বড় হও,তারপর না হয়…”
পাভেলের কথা শেষ হতে না দিয়েই, পাপড়ি ছ্যাত করে বলে ওঠে,
“কিসের কম? ষোলো-সতেরো পার হয়ে যাইতাছে। তাও আমারে বিয়া দেয় না। ছুটো ভাইজান আপনি জানেন? আগেকার কালে মাইয়াগোর বারোতে বিয়া হইয়া তেরোতে…আচ্ছা শুদ্ধ ভাষায় কই। বারোতে বিয়ে হয়ে তেরোতে বাচ্চাকাচ্চা হয়ে যেত। আর আমার মতো ষোলো-সতেরো হতে হতে নাতী-পুতির বিয়ে দিতো।”
পাপড়ি এটা কেমন হিসেব দিলো,তা পাভেলের বোধগম্য নয়।তবে পাপড়ির কথার লাইন কোথায় থেকে কোথায় যাচ্ছে, তা সবাই ভালোমতোই টের পায়। কিন্তু কেউ কিছু বলার আগেই,সে কেনীথের দিকে নজর ফিরিয়ে বিস্ফোরক এক মন্তব্য করে বসে,
“ভাইজান,আপনার কি কোনো পোলা নাই? আমি কিন্তু মাইয়া হিসেবে অনেক ভালা। আপনার পোলা থাকলে,আমার সাথে বিয়া দিয়েন। আমি তারে অনেক আদর-যত্নে রাখব।”
পাপড়ির অতিরঞ্জিত নাটকীয় লজ্জাভঙ্গিতে বলা এহেন কথায়, সকলেই থমকে গেল। প্রত্যেকের হাত থেমে গিয়েছে। স্তব্ধ চাহনিতে সকলেই কেনীথ আর পাপড়ির দিকে তাকিয়ে। যথারীতি কেনীথও স্তব্ধ মূর্তির ন্যায়,মাথা নুইয়ে গম্ভীর্যের সাথে বসে আছে। নূন্যতম নড়চড়ও নেই তারমাঝে। একঝাক চুল সামনের দিকে ঝুকে থাকায়,তার মুখের ভাবগতিকও স্পষ্ট নয়। কিন্তু পাভেল নিজেকে আর ঠিক রাখতে পারল না।
কেনীথের নিশ্চুপ ভঙ্গি আর পাপড়ির নির্দ্বিধায়ময় বিস্তৃত হাসিমুখ—একত্রে দুজনকে দেখে সে বেশম খেল। অকস্মাৎ হাসতে না পেরে তার কাশি উঠে গেল। না ঠিকমতো হাসতে পারছে আর না কাশতে পারছে। এমন সময় আচমকা পায়ের উপর কারো পায়ের সজোড়ে চাপা খেতই তার দাঁত মুখ খিঁচে এলো। তার আর বুঝতে বাকি নেই,তার এমন কার্যকলাপে কেনীথ নিশ্চুপ থাকলেও টেবিলের নিচে আসল খেলা দেখানো শুরু করেছে। কিন্তু সে নিরুপায় হয়ে নিজেকে সামলে নেওয়ার পূর্বেই, কেনীথ আচমকা তার খাওয়া সম্পূর্ণ না করেই উঠে দাঁড়ায়। এবং কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই,নিজের মতো চলে যায়।
এতোক্ষণ পর এসে পাপড়ি সবার দিকে তাকাতেই বোঝে, সে কোনো এক গড়বড় করে ফেলেছে। এবং কিছুক্ষণ ভাবনাচিন্তা করার পর, সে সরাসরি কাশফিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“বড়-আম্মা! তোমার পোলারে কি বিয়া করাও নাই? হের কি বউ-বাচ্চা নাই?”
কেনীথ আর পাভেল দুজনে বাড়ির বাহিরে এসেই বেশ অবাক হলো। তাদের গ্যারেজের কাছেই বড়সড় গাড়ির আকৃতির বস্তুর উপর সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা। কাল রাতেও তো এখানে এসবের কিছুই দেখেনি।নিশ্চয় এসব সকালেই নিয়ে আসা রয়েছে।
এসব নিয়ে পাভেলের মধ্যে বেশ আগ্রহ কাজ করলেও,কেনীথ সম্পূর্ণ নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে, বিষয়টা পরখ করছে। এরিমধ্যে তাদের সামনে উপস্থিত হয় ভাহিদ এহসান। বেশ তড়িঘড়ি ব্যস্ততার স্পষ্ট ছাপ তার ভাবগম্ভীর্যে। তবুও সে জোরপূর্বক মৃদু হেসে দুজনকে একপলক দেখে,পরক্ষণেই কিঞ্চিৎ কপাল কুঁচকে বলল,
“তোমরা কি কোথাও যাচ্ছো?”
পাভেল মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,
“জ্বী মানে…একটু রাঙ্গামাটির দিকে যাচ্ছি। এক-দুইদিন থেকে চলে আসব।”
ভাহিদ খানিকক্ষণ ভেবে নিয়ে, নির্লিপ্ত স্বরে বলে,
“ভালো।”
এই বলেই সে, কাপড় দিয়ে ঠেকে রাখা বস্তু দুটোর দিকে ইশারা করে বলল,
“এই দুটো তোমাদের জন্য। যেহেতু দুই ভাই,তাই যার যেটা ভালো লাগে মিলেমিশেই চালিয়ে নিও।… দেখো পছন্দ হয়েছে কিনা।”
অবাক করার মতো বিষয় হলেও,ভাহিদ আর কোনো কিছুই না বলে সেখান থেকে চলে যেতে লাগল। তবে শেষবারের মতো পিছনে ফিরে, দুজনের দিকে তাকিয়ে বেশ গম্ভীর্যের সহিত বলল,
“যেখানে যাবে ভালোমতো যে-ও। দুদিনের জন্য এসে আমার মানসম্মান যেন নষ্ট না হয়, সেদিকে খেয়াল রেখো।”
এই বলেই সে নির্বিকারে বাড়ির বাহিরে দাঁড় করানো নিজস্ব গাড়িতে চড়ে, কাজের গন্তব্যে চলে যায়। এদিকে পাভেল ভারী শ্বাস ফেলে কেনীথের দিকে তাকিয়ে আনমনে মৃদু হাসে। কেনীথও রুক্ষ হেসে,তাকে চোখে ঈশারা করে।
ওমনি পাভেল এগিয়ে গিয়ে দ্রুত সড়সড় কাপড়টা সরিয়ে নিতেই বিস্ময়ে থমকে যায়। কেনীথ নির্বিকারে দু’পা এগিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মার্সিডিজের SUV আর KTM এর বাইকটার দিকে তাকিয়ে থাকে৷ এদিকে পাভেল গাড়িটা ভেতরে বাহিরে দেখে নিয়ে,কেনীথের দিকে ফিরে বিস্ময়ের সাথে বলল,
“ভাই এটা তো তোমার ভ্যাম্পায়ার সিরিজের ভি-কোরের সিগনেচার কালেকশন। যেমনটা তুমি ব্যবহার করো ঠিক ওমনই। ঐ দেখো V-Kore এর লোগোও আছে। কিন্তু এটা এখানে কি করে এলো?”
এটা এখানে কি করে এলো,এই প্রশ্নটা অযৌক্তিক। তাই কেনীথ এসব নিয়ে ভাবছে না। সে ভাবছে ভিন্ন বিষয়। তার ভ্রু জোড়া কুঁচকে, বেশ গম্ভীর ভঙ্গিতে সে ভাবনাচিন্তা করছে।এরিমধ্যে পাভেল তার দিকে এগিয়ে এসে বলল,
“কি হলো ব্রো! কি ভাবছো?”
—“এগুলোর দাম জানিস?”
—“তা আর বলতে, এদেশে ট্যাক্স দিতেই তো বারোটা বেজে যায়। গাড়িটাই তো কম করে হলেও ত্রিশ কোটি পার হয়ে গিয়েছে। সে হিসেবে ফুপা এতোগুলা টাকা পেলো কোথায়? তোমার একাউন্ট থেকে নিয়েছে?”
কেনীথ নির্বিকারে জবাব দেয়,
“না,বাবা আমাদের সম্পর্কে এখনো কিছু জানেনা। আমার ব্ল্যাঙ্ক একাউন্টের পুরোপুরি এক্সেস বাবার কাছে থাকলেও,সে আজ পর্যন্ত শুধুমাত্র প্রয়োজনে কয়েক হাজারের চেয়ে বেশি টাকা কখনোই নেয়নি।”
এবার পাভেল খানিকটা বিস্ময়ের সাথে বলল,
“তাহলে এতো টাকা পেলো কোথায়? আমার জানা মতে ফুপা তো উল্টোপাল্টা কিছু করে না।”
কেনীথ নজর সরিয়ে পাভেল দিকে চেয়ে, গম্ভীর স্বরে আওড়ায়,
“কয়েক কোটির মতো ধার আর লোন নিয়েছে। কিছুটা টাকা বাবার অনেকটা জমি বন্ধক রেখে অ্যারেঞ্জ করেছে। বাদবাকি বলতে পারছি না।”
—“কি বলো এসব? এগুলোর জন্য কেউ এসব কাজ করে? আমাদের বললেই তো গ্যারেজ থেকে কয়েকটা এদেশে টপিকিয়ে দিতাম।”
—“পাভেল, মশকরা করিস না।”
—“আচ্ছা, কিন্তু তুমি এসব কখন জানলে?”
—“প্রায় কিছুদিন আগেই। অনেকদিন থেকেই টাকা ম্যানেজ করার চেষ্টা করছিল। বাই দ্য ওয়ে,তুই বুঝতে পারছিস এমন একটা কাজ করার মানে কি?”
পাভেল খানিকক্ষণ ভেবে চিন্তে, বিস্ময়ের সাথে আওড়ায়,
“ব্রো! ফুফার মাথায় নিশ্চয় বড়কিছু ঘুরছে। নিশ্চিত আমাদের কপালে বড়সড় বাঁশ দেওয়ার ব্যবস্তা করেছে।”
কেনীথ আনমনেই তির্যক হেসে বলে,
“এটা জানা কথা,বাপ আমার একটু বেশিই ভালো। এসব যখন করেছে,নিশ্চিত আমাদের দিয়ে বড়সড় কিছু করিয়ে নেবে।”
—“কিন্তু সেটা কি হতে পারে? আমাদের ধরে বেঁধে বিয়ে-টিয়ে দিয়ে দিবে না তো? এরচেয়ে বড় বাঁশ আর কি হতে পারে।”
কেনীথ গম্ভীর্যের সাথে আওড়ায়,
“যাস্ট শাট আপ,আমরা কোনো বাচ্চা নই।… হোয়ার এভার, এসব দিয়েছে যখন ভালোই হয়েছে। আগে গিয়ে ঘুরে আসি। তারপর দেখা যাবে,বাবা আসলে এবার কি খেলা খেলতে চাইছে!”
পাভেলও আর কথা বাড়ায় না। দ্রুত বাড়ির ভেতরে এগিয়ে যায় ব্যাগ আনতে। এক-দুইদিনের জন্য সাধারণ কিছু জামা-কাপড় আর প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়েছে। তবে কেনীথ পেছন হতে এটাও বলে দেয়,
“আসার সময় গিটারটাও নিয়ে আসিস। আর বাবার লোন সহ বাদবাকি ধার-দেনাও পরিশোধ করার ব্যবস্তা করে ফেলিস।”
এই বলেই সে গাড়ি আর বাইকের দিকে এগিয়ে যায়। বাইকটার দিকে নজর পড়তেই সে তাচ্ছিল্যেরের সহিত মৃদু হাসে। গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে আনমনেই চোখ বুঁজে নেয়।আর নিমিষেই হারিয়ে যায় সেই পুরোনো দিনের স্মৃতিতে। শহরের অলিগলি হতে মহাসড়ক—সর্বত্রেই বাইক নিয়ে শহর দাপিয়ে বেড়ানো সেই ভিভিয়ান এহসান।গম্ভীর স্বভাবের এক ছন্নছাড়া-উগ্র-বেপরোয়া ছেলে। পারিবারিক ব্যাকগ্রাইন্ড রাজনীতির বড় বড় পদের ব্যক্তির সাথে সম্পৃক্ত থাকায়, তাকে থামানো বা দমিয়ে রাখার মতো তখন কেউ ছিল না। ঢাকায় পড়তে গিয়ে যেমন স্কুল-কলেজ কাঁপিয়েছে,তেমনি কাঁপিয়ে শহর। সে শুধু একা নয়,ছিল তা পুরো একটি গ্যাং। যে গ্যাং এর লিডার হওয়ায় তার আধিপত্যও ছিল অগাধ।
কেনীথ এসব ভেবে থমকে দাঁড়ায়। এতক্ষণ আগের দাপুটে স্মৃতিগুলো কল্পনায় ফিরে এসে, তাকে খানিকটা আনন্দ দিয়েছিল। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। কারণ সেই সময়ে বাইক ছিল তার প্রথম সঙ্গী, জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ মাত্র একটি ঘটনা, একটি অতীতের দগদগে ক্ষত আর একজন মানুষের পছন্দ—আজ তাকে বাইকের কাছ থেকেও দূরে ঠেলে দিয়েছে।
কেনীথ এসব ভাবনা ঠেলে দিয়ে, সোজা গিয়ে গাড়ির ভেতরে বসে। ভ্যাম্পায়ার সিরিজের হওয়ায়, স্বাভাবিক ভাবেই বাহিরের পুরো স্ট্যাকচার কালো আর ভেতরের অংশ ডার্ক রেড। এতে সে বেশ খুশিই হলো। মনে মনে খানিক তাচ্ছিল্যের সহিত মৃদু তির্যক হেসে আওড়ায়,
“যাক,ছেলের এইটুকু পছন্দ যেও তুমি মনে রেখেছো, এটাই বা কম কিসের।”
দীর্ঘ যাত্রার অবসানে বিকেলের প্রহরে আনায়ারা পৌঁছায় রাঙ্গামাটি। পাহাড়শ্রেণী ও জলাশয়ের গাঢ় সমাহার যেন দূর থেকে আহ্বান জানাচ্ছিল তাদের। নৌকা ও সড়কের দীর্ঘ মিশ্রিত পথ অতিক্রম করতে করতে তাদের অন্তরে এক অদ্ভুত উচ্ছ্বাস জাগ্রত হলো। যেন নগরজীবনের কোলাহল থেকে মুক্ত হয়ে হঠাৎই প্রবেশ করছে নৈসর্গিক গৃহে। রিসোর্টে প্রবেশের মুহূর্তে প্রথমেই যে দৃশ্য চোখে ধরা দেয়…দিগন্তময় কাপ্তাই হ্রদ, সূর্যাস্তের সোনালি আভা তার জলে প্রতিফলিত ও চারিপাশে অগণিত পাহাড়ের সারির মেঘাচ্ছন্ন গহনাভিরাম আবেশে ডুবে থাকা এক অপার্থিব সৌন্দর্য।
আনায়া রিসোর্টের ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায়। তার দীর্ঘ কেশপাশ বৃষ্টিসিক্ত বাতাসে হালকা আন্দোলিত। হালকা আকাশী-নীল গাউনের গাঢ়তা মিশে গেল আকাশের নীলচেমেঘে। রনক, আলো, শিখা, সাবা, তাজিম ও সায়েম সবাই প্রকৃতির মুগ্ধতায় দাঁড়িয়ে রইল। কেউ মোবাইলে দৃশ্য বন্দি করছে, কেউ আবার নিঃশব্দে আকাশে ভেসে থাকা মেঘের রঙপট পর্যবেক্ষণ করছে। দূরে হ্রদের উপর ছোট ছোট নৌকার ক্ষুদ্র ছায়া। কোনো গ্রামীণ মৎস্যজীবীরা গৃহে ফিরছে ,আর তার দাঁড়ের শব্দ জলের বুক ছুঁয়ে দিচ্ছে স্নিগ্ধ ছন্দে।
বিকেলের প্রহরে ধীরে ধীরে গড়িয়ে এলো সাঁঝের অন্ধকার। নানান আলোর প্রদীপ জ্বলে উঠল রিসোর্টের আঙিনায়।দূরের পাহাড় কালো ছায়ায় ঢেকে গেল। তাদের চারপাশে কেবল হ্রদের বাতাস, পাহাড়ের গন্ধ, আর নক্ষত্রবীথির নীরবতা। এভাবে প্রথম দিনটি শেষ হলো। নগরজীবনের সব শব্দ যেন নিঃশেষ হয়ে তারা নিমগ্ন হলো রাঙ্গামাটির এক অপার্থিব চমৎকার সৌন্দর্যে।
দ্বিতীয় দিন ভোরের কুয়াশা তখনও পাহাড়চূড়ায় স্থির হয়ে আছে। হ্রদের জলতল থেকে উঠে আসছে মৃদু বাষ্পরেখা। এমন প্রভাতে আনায়া ও তার সঙ্গীরা যাত্রা শুরু করল রাঙ্গামাটির আশপাশের জনপদ অবলোকনের উদ্দেশ্যে। সরু বাঁশের সাঁকো, লতাগুল্মে আবৃত পথ, আর পাহাড়ের বুকে আঁকাবাঁকা রাস্তা…সবই যেন এক প্রাচীন গোপন অরণ্যের আবেশ সৃষ্টি করল।
তাদের প্রথম গন্তব্য স্থানীয় গ্রামীণ বাজার। এখানে পাহাড়ি নারীরা রঙিন বয়নশিল্পের কাপড় বিক্রি করছে। পুরুষেরা ফলমূল, শাকসবজি, বাঁশের তৈরি সামগ্রী নিয়ে বসেছে। আনায়া বিস্ময়ে লক্ষ্য করল, প্রতিটি মুখে এক অদ্ভুত শান্তি; পরিশ্রমে ক্লান্ত হলেও যেন প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সখ্য তাদের মুখাবয়বে প্রতিফলিত। আলো ও শিখা হাসিমুখে স্থানীয় নারীদের সঙ্গে কথা বলল। তারা শিখল পাহাড়ি তাঁতের গল্প। কীভাবে উজ্জ্বল রঙের সুতো দিয়ে কাপড় বোনা হয়, কীভাবে প্রতিটি রঙ প্রকৃতির কোনো না কোনো স্মৃতি কিংবা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্যকে বহন করে।
দুপুরে তারা এক পাহাড়ি পরিবারের অতিথি হলো। বাঁশের ঘরে ঢুকতেই ধোঁয়ার গন্ধ, মাটির চুলায় রান্না হওয়া ভাত ও মাংসের উষ্ণতা, আর অতিথি আপ্যায়নের হাসি—সব মিলিয়ে অন্যরকম অনুভূতি। রনক, সায়েম ও তাজিম তীব্র উচ্ছ্বাস নিয়ে খাওয়া শুরু করল। সাবা ও আলো বিস্ময়ে দেখল কীভাবে অল্প জিনিস দিয়েও পাহাড়ি পরিবারগুলো পরিপূর্ণ আতিথেয়তা দেখাতে পারে। আনায়া তার দীর্ঘ কেশগুচ্ছে বাতাসের স্পর্শ নিয়ে নিঃশব্দে চারপাশের স্নিগ্ধতা উপভোগ করল। এই নিঃস্বার্থ আতিথেয়তায় তার মনে এক গভীর শ্রদ্ধা জন্ম নিল।
বিকেলের শেষাংশে তারা অংশ নেয় পাহাড়ি কিশোরীদের নৃত্যে। স্থানীয় ঢোলের শব্দে তরুণীরা বৃত্তাকারে নাচছিল। পাহাড়ি জীবনের সরলতা, ঝিরিঝিরি বৃষ্টিময় আবহ , প্রকৃতির রঙ…সবই যেন এই নৃত্যে মূর্ত হলো। সায়েম ও রনক হাততালি দিয়ে উৎসাহ দিল, শিখা আর আলো হাসতে হাসতে সুরে তাল মেলাল। আর কেন জানি আনায়া শুধু এসব মুগ্ধ চোখে উপভোগ করলো। এই প্রথম তার মনে হচ্ছে, সে নিজের জীবনকে উপভোগ করতে পারছে । ইচ্ছে হলো,এখানেই বাদবাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে। অন্যদিকে সাবা শুরুর দিকে আশেপাশের অনেক কিছুতে নাক সিটকালেও, পরবর্তীতে ধীরে ধীরে সে-ও সবার সাথে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।
এভাবে সারাদিন আনন্দে কাটিয়ে দেওয়া পর, দিনের আলো ফুরিয়ে রাত্রি ঘনিয়ে এলো। ফিরে এসে তারা রিসোর্টের বারান্দায় বসলো। সবাই মিলে ট্রুথ-ডেয়ার গেইম সহ রাতভোর আড্ডা দিলো। এরিমধ্যে তারা অনূভব করে, পাহাড়ের গাঢ় অন্ধকারের মাঝে, দূরে কোথাও হতে একটি বাঁশির সুর ভেসে আসছে। হয়তো কোনো স্থানীয় যুবক বাজাচ্ছে। তারা এই বিষয়টিও বেশ উপভোগ করল। চারদিকে নক্ষত্রবীথি, হ্রদের জলে প্রতিফলিত আলো, আর নিস্তব্ধ শীতল বাতাস। এভাবেই দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনটা তাদের বেশ চমৎকার ভাবেই কেটে যায়।
আজ তাদের ট্রিপের চতুর্থ দিন। আর অল্প ক’দিন তারা এখানে স্থায়ী হতে পারবে। অতঃপর সবাইকে পুনরায় নিজেদের বাস্তবতার জীবনে ফিরতে হবে।যদিও স্বল্প সময়ের জন্য তারা তাদের পরিকল্পনা মোতাবেক তেমন কোথাওই আর যেতে পারবে না। কিন্তু কোনোমতে আজ রাতটা রাঙ্গামাটিতে কাটিয়ে, আগামীকাল সকলেই সাজেকের উদ্দেশ্যে রওনা দেবে।
সকালের প্রথম প্রহরেই রিসোর্টের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সবাই লক্ষ্য করল… ভারী মেঘে বিস্তৃত আকাশ ঢেকে রয়েছে। তার ফাঁক দিয়ে কখনো আলো ফুঁড়ে বেরোচ্ছে, আবার হঠাৎ আড়াল হয়ে যাচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে, সারাদিন হয়তো এভাবেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি আর রোদ-মেঘের খেলাতেই পেরিয়ে যাবে।
তবে আনায়ার চরিত্রে বৃষ্টি এক অবিচ্ছেদ্য প্রণয়ী। মেঘাচ্ছন্ন আকাশে জলধারার পূর্বাভাস দেখা মাত্রই তার অন্তরে সঞ্চারিত হয় এক অদম্য উচ্ছ্বাস। যেন নৈসর্গের প্রতিটি ঘন মেঘ তার জন্য আহ্বানপত্র। প্রতিটি বিদ্যুৎ চমক এক নিবিড় বার্তা।
ফোঁটা পড়তে না পড়তেই তার চিত্তে অনিবার্য আলোড়ন জাগে। সে আর কোনো বস্তুর প্রতি মনোযোগ রাখে না—বন্ধুসভা, কোলাহল, কিংবা পথের আহ্বান সব তুচ্ছ হয়ে যায় তার কাছে। বৃষ্টির প্রথম ছোঁয়াতেই সে সমর্পিত হয় প্রকৃতির বক্ষে। কেশপাশ ভিজে নামতে থাকে কাঁধ বেয়ে, গাত্রাবরণ সিক্ত হয়ে ওঠে স্নিগ্ধ আভায়। একইসাথে তার চোখে ফুটে ওঠে এক অচেনা দীপ্তি।
আনায়া বৃষ্টিকে কেবল ঋতুর দৃশ্যমান রূপ বলে ভাবেনা, সে অনুভব করে তাকে জীবনের অন্তঃসলিলা সঙ্গী হিসেবে। প্রতিটি বিন্দু তার কাছে পূর্ণিমার অমৃতের মতো। একইসঙ্গে শীতল ও মাদকতাপূর্ণ। এই কারণেই সে আকাশে মেঘ দেখলেই আপন উল্লাসে মেতে ওঠে, যেন পূর্বপরিচিত কোনো প্রেমিককে দূর হতে দেখেছে। বিষয়টা সাবার মতো অনেকের কাছে অতিরঞ্জিত ঠেকলেও,আনায়া এই বিষয়ে কারো বাঁধা মানতে নারাজ। বৃষ্টির সাথে তার ছোট হতে যে সখ্যতা গড়ে উঠেছে, তা হয়তো আর কোনো কালেই ছিন্ন হবে না।
তার বৃষ্টিপ্রীতিতে নেই কোনো বাহুল্য, নেই কোনো ভান। আছে কেবল আত্মার সমর্পণ, দেহের নিঃসংকোচ মিলন আর চিত্তের উন্মত্ত নৃত্য। প্রকৃতি যখন ঝরে পড়ে অবিরল ধারায়, আনায়া তখন হয়ে ওঠে তার একান্তই অনন্যা সাধিকা।
আনায়া, রনক, আলো, শিখা, সাবা, তাজিম আর সায়েম সকলে মিলে বেড়িয়ে পড়ল রিসোর্ট থেকে। পাথুরে সিঁড়ি ধরে যখন তারা হ্রদের ঘাটের দিকে নামছিল, দূর থেকে দৃশ্যমান হচ্ছিল পাহাড়ি গ্রামগুলোর আভাস।ছোট ছোট বাঁশের ঘর, ধোঁয়ায় উড়তে থাকা চুলোর ছায়া, আর অচেনা মানুষের নিস্তব্ধ সকালের হাঁকডাক। কাপ্তাইয়ের জলাশয় যেন এক অবিনশ্বর আয়না। তার ওপর ঝুঁকে পড়েছে পাহাড়ের বিস্তৃত দেহ। ভেজা মেঘে ঢেকে গিয়েছে শীর্ষচূড়া।
নৌকা ভেসে চলল হ্রদের বুক চিরে। সবাই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকল চারপাশের দৃশ্যে।একদিকে পাহাড় ঢালু হয়ে নেমে এসেছে পানির ভেতরে। অন্যদিকে বৃষ্টিভেজা বনানী থেকে পাখিরা উঠে আসছে।দূরে কোথাও কোনো মৎস্যজীবীর বাঁশের ফাঁদ দুলছে ঢেউয়ের সাথে। আনায়া তার হালকা ভিজে যাওয়া গাউনের আঁচল টেনে বুকে চাপা দেয়। চোখের সামনে যা ঘটছে তাতে যেন মনে হচ্ছে,সে একেবারে এক নতুন জগতে প্রবেশ করেছে।
কিছুক্ষণ বাদে তারা পৌঁছল সেই বিখ্যাত ঝুলন্ত সেতুতে। লোহার খুঁটি আর ইস্পাতের তারে বাঁধা সেতু, যা কাপ্তাই হ্রদের বিশাল বিস্তৃত জলরাশির ওপর স্থির…অথচ দুলতে থাকা এক অদ্ভুত মায়াবী উপস্থিতি। বৃষ্টি থেমে গেলেও মেঘ তখনও ঘন হয়ে লেপ্টে আছে পাহাড়ের গায়ে। সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে চারদিক দেখা যায় নিস্পৃহে। সবুজ পাহাড়ের শিখরে জড়ানো ধোঁয়া, নিচে হ্রদের অসীম গভীর নীলাভ জল, আর আশেপাশে ছড়িয়ে থাকা ছোট দ্বীপসদৃশ ভেসে থাকা পাহাড়ি গ্রাম।
এরিমধ্যে সেতুতে দাঁড়িয়ে আলো মোবাইল বের করে সেলফি তুলছিল। হঠাৎ রনক তার পাশে এসে দাঁড়িয়ে,মজার ছলে ভিজে চুলে হাত বুলিয়ে দিল। আলো ভ্রূ কুঁচকে তাকালেও হাসি আটকে রাখতে পারল না। দু’জনের মধ্যে সেই নির্দোষ ঠাট্টার মুহূর্ত দেখে,তাজিমও হেসে ওঠে। এবং তখন তখনই সে ঠাট্টা করে বলে উঠল,
“ওয়েই, হোয়েএএ! এই ঝিরিঝিরি বৃষ্টিময় স্নিগ্ধ আবহে যদি প্রেম না জাগে, তবে আর কবে জাগবে?”
তার কথা শুনে নিমিষেই রনক আলো হতে দূরে সরে আসে।তাজিমের দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকাতেই, সে আবারও হেসে ফেলে। আলোও খানিক সংকোচ বোধে সরে দাঁড়ায়। অন্যদিকে সায়েম আনমনে নিজের মতো ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলতে ব্যস্ত। সে সাবা সহ চারপাশে সবটাই ক্যামেরা বন্দী করছে। এরইমাঝে সেতুতে মানুষের ভিড়ও যেন বাড়তে লাগল। সবাই সবার মতো আলাদা হয়ে গিয়ে,নিজেদের মতো জায়গাটা উপভোগ করতে লাগল।
এদিকে আনায়ার মতো শিখাও সেতুর রেলিং ধরে চুপচাপ নিন্মের অতল পানির গভীরতা দেখছিল। এরিমধ্যে আচমকা তার পাশে সায়েম এসে দাঁড়ায়। শিখা আনায়ার মতোই নরম স্বভাবের মেয়ে। বেশিরভাগ সময় একাকিত্বে চুপচাপই থাকে। যথারীতি আচমকা নিজের পাশে কাউকে দেখে সে খানিক চমকে ওঠে৷ ওমনি সায়েম গম্ভীর স্বরে বলে,
“আস্তে! ঘাবড়ানোর কিছু নেই,নয়তো পড়ে যাবি।”
শিখা কিঞ্চিৎ নিচের দিকে তাকিয়ে ঢোক গেলে, অথচ সায়েম নির্বিকারে দূরের অজানায় তাকিয়ে। শিখা কিছুটা সময় চুপ থাকার পর বলল,
“কিছু বলবি?”
সায়েম আনমনে প্রশ্নসূচক কন্ঠে বলে, “হুম!”
পরক্ষণেই পাশে মুখ ফিরিয়ে শিখার উৎসুক দৃষ্টির দিকে তাকায়। মেয়েটার গায়ের রং শ্যামলা। অথচ দেখতে কি চমৎকার মায়াবী। সায়েম তার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই, আনমনেই মৃদু হাসে। মাথা এপাশ-ওপাশ নাড়িয়ে আওড়ায়,
“না, কিছুই না।”
এই বলেই সে পুনরায় নিজের নজর ফিরিয়ে নেয়। অন্যদিকে শিখাও চুপচাপ মাথা নুইয়ে ভাবে,‘এর আবার হঠাৎ কি হলো?’
এদিকে ভিড় ক্রমশই বেড়েই চলেছে। অথচ এমন পরিস্থিতিতেও, তাজিমকে জোরপূর্বক সাবার ছবি তুলে দিতে হচ্ছে। এই মেয়েটাকে তার অসহ্য লাগে। তবুও যে কেনো,এ তার সাথেই চিপকে থাকে কে জানে!
সবার এমন নিজস্ব ব্যস্ততার মাঝে,আনায়া আনমনেই সেতুর একপাশে ধরে হেঁটে হেঁটে দেখতে লাগল। কখনো প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে তো কখনো তার চারপাশের মানুষজনের দেখছে। হালকা ঝিরিঝিরি বৃষ্টির শুরু হতেই, রঙিন ছাতার ভিড় বেশ কড়া ভাবেই জমে উঠেছে। তবে আনায়া আর ছাতার নিচে নিজেকে আড়াল করার প্রয়োজন মনে করেনি। সে এভাবেই নিজের মতো সেতুর দুলুনি আর দৃশ্য উপভোগ করছে।
আনায়া আরেকটু এগিয়ে গিয়ে সেতুর মাঝখানে দাঁড়ালো। নিচে তাকিয়ে দেখল,হ্রদের জলে আকাশের প্রতিফলন। বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে ছোট ছোট গোলাকার ঢেউ তৈরি করছে।শীতল স্নিগ্ধ বাতাসে তার বেণীবদ্ধ চুলের উন্মুক্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কেশরাশি হালকা উড়ছে। সে আবেশে চোখ বুজে দীর্ঘ নিশ্বাস টেনে নেয় অন্তরালে৷ হালকা ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ফোঁটা তার সুদীর্ঘ অক্ষি ও অধরে লেপ্টে যায়।
হঠাৎই এমন মুহূর্তের ভিড়ের চাপ বেড়ে যায়। সামনে থেকে কয়েকজন পর্যটক সেতুতে ওঠায় পেছনের দিকে ঝাঁকুনি লাগল। আনায়ার হাত ফসকে গেল রেলিং থেকে, তার পা পিছলে একেবারে কিনারার দিকে চলে গেল।একইসাথে তার শরীর দুলে গিয়ে হ্রদের দিকে হেলে পড়ল। চোখের সামনে এক অন্ধকার গহ্বর, শরীরে শীতল শিহরণ—মুহূর্তেই যেন মৃত্যুর প্রান্তরেখায় দাঁড়িয়ে গেল সে।
কিন্তু সেই মূহুর্তেই এলো এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। এক শক্তপোক্ত হাত তার বাহু চেপে ধরল, এমনভাবে টেনে নিল ভেতরের দিকে যে, আনায়ার শ্বাসরোধ হয়ে এলো। বুক ধকধক করছে, হৃদস্পন্দন যেন মস্তিষ্কে ধাক্কা দিচ্ছে। আনায়ার চারপাশ নিমিষেই ঝাপসা হয়ে এলো।সে নিজেকে সামলাতে না পেরে,সম্পূর্ণ ভর ছেড়ে দিতেই আচমকা আবারও টান পড়ে তার উদরে। হঠাৎই এক বলিষ্ঠ হাত পেছন হতে তার কোমর শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। এবং তৎক্ষনাৎ সজোরে উল্টো দিকে টান দিয়ে নিজের দিকে টেনে নিল। পরের মুহূর্তেই আনায়ার শরীর গিয়ে ধাক্কা খেল এক অদম্য, শক্তপোক্ত দৃঢ় বুকের সঙ্গে। তার চোখ-মুখ খিঁচে উঠল নিমিষেই। নাক-মুখ গিয়ে ঠেকলো ব্যক্তির বিস্তৃত বুকের মধ্যিখানে।
আর তখনই সেই অদ্ভুত অনুভূতি জাগলো।ব্যক্তির গা হতে ছড়িয়েছে এক অদ্ভুত সুগন্ধি। আনায়ার মুখ, নাক, বুক সেঁধিয়ে আছে সেই বুকের গাঢ় আবেশে। অকস্মাৎ-ই আনায়া চমকে উঠল। গন্ধটা একেবারে রক্তের মতো তীব্র, অথচ অদ্ভুতরকমের মিষ্টি। মাতাল করা এক আকর্ষণে ভরা। শিহরণ বয়ে গেল তার সর্ব শরীর জুড়ে।
আনায়া একহাতে তার ভেজা গাউন আঁকড়ে ধরে কাঁপতে লাগল। অন্যহাত তার আগুন্তকঃ এর বুকের বা’পাশের টিশার্ট আঁকড়ে ধরা। ব্যক্তিকে দেখার চেষ্টায়, মাথা উঁচু করতেই আলোর প্রতিফলনের তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো। তবে ব্যক্তিটি মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে রাখায় সে তার চেহেরার কোনোকিছুই আন্দাজ করতে পারল না। নিমিষেই সে চোখমুখ খিঁচে মাথা নুইয়ে ফেলল।
তবে পরক্ষণেই সে আবারও চোখ মেলে তাকাতে চাইলো। দেখতে চাইলো, কে সেই মানুষ, যার বুকের ভেতর চাপা পড়ে এই অজানা উষ্ণতা আর রহস্যময় সুগন্ধি অনুভব করছে। কিন্তু সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই পুরুষটির বাঁধন আলগা হয়ে গেল।
আনায়া ভয়ার্ত চোখে সামলে উঠতে না উঠতেই পুরুষটি তাকে ছেড়ে দিয়ে, পেছন ঘুরে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যেতে শুরু করে।ভেজা সেতুর ভিড়ে, বৃষ্টির ঝাপটায়, কেবল এক পেছন ঘুরে যাওয়া পুরুষদেহের অবয়ব চোখে পড়ল তার।যার প্রশস্ত কাঁধ, কালো রঙের জ্যাকেট, আর কাঁধ অব্দি লম্বা ভিজে চুল থেকে জল ঝরছে। তার ভঙ্গি ছিল অনাড়ম্বর, অথচ অদ্ভুত এক আকর্ষণীয় দৃঢ়তায় ভরা।আনায়ার ঠোঁট কিঞ্চিৎ নড়ে ওঠে। একটুখানি ধন্যবাদও জানাতে পারল না। আর ঠিক তখনই দূর থেকে ভেসে এলো দৃঢ় ডাক,
“ব্রো! ওখানে কি করছো? এদিকে এসো। আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
আনায়া থমকে দাঁড়িয়ে রইল। বুকের ভেতর স্পন্দন বাড়ছিল অবিশ্বাস্য গতিতে। তার আঙুলে এখনও লেগে আছে সেই দৃঢ় স্পর্শের তাপ, আর নাকে-মুখে ভাসছে রক্তের মতো অথচ মায়াময় এক মিষ্টি সুগন্ধ।
মুখ দেখা হলো না। কেবল দৃঢ় স্পর্শ, অদ্ভুত সুগন্ধ, আর এক রহস্যময় ছায়া গেঁথে রইল তার মনের গভীরে।
কেনীথ আর পাভেল রাঙ্গামাটিতে এসে পৌঁছেছে এই কিছুক্ষণ আগেই। এবং কোথাও না থেমে, সরাসরি তারা এই ঝুলন্ত ব্রিজের কাজেই চলে আসে। এখানে শুধু আজকের রাতটা থেকে,আগামীকাল সোজা সাজেকে চলে যাবে। হাতে বেশি সময় নেই।
কিন্তু ব্রিজে উঠতে না উঠতে পড়ে যায় বিপত্তিতে। হঠাৎ এতো ভিড় দেখে দুজনই বিরক্ত হয়ে ব্রিজ ছেড়ে চলে যেতে নিয়েছিলো। কিন্তু পাভেল আগে চলে গেলেও,কেনীথ পেছনে রয়ে যায় এক বিশেষ কারণে। রেলিং এর কাছেই আচমকা এক মেয়েকে উল্টে পড়তে দেখে, ত্বরিতগতিতে সে তার কাছে পৌঁছায়। মেয়েটা কে কিংবা দেখতে কেমন,এসব নিয়ে কেনীথের কোনো মাথা ব্যাথা ছিল না। কিন্তু এইমূহূর্তে তাকে ধরে সামলাতে না পারলে , যে কোনো মূহুর্তে বড়সড় এক এক্সিডেন্ট হয়ে যেত।
যদিও কেনীথ মেয়েটিকে সাহায্য করার পরও, অত্যধিক ভিড়ের চোটে তার চেহেরাটা ঠিক স্পষ্টভাবে দেখার সুযোগ হয়নি। কিন্তু এতে কেনীথের কোনো ভাবনা নেই। সে পাভেলের আওয়াজ শুনেই,মেয়েটিকে ছেড়ে দিয়ে ভিড় ঠেলে তার কাছে এগিয়ে যায়। এবং কেনীথকে ফিরে আসতে দেখে পাভেল বলে,
“কি হয়েছে ব্রো? ঐখানে কি করছিলে?”
কেনীথ আর কথা বাড়ায় না। একবার পেছনে ঘাড় ঘুরিয়ে ফিরে তাকালেও, এতো এতো মানুষের ভিড়ে মেয়েটির ছায়া-নিশানও তার চোখে পড়ে না৷ কেনীথ ভারী শ্বাস ফেলে, পাভেলের উদ্দেশ্যে আওড়ায়,
“কিছু না, চল যাওয়া যাক।”
এই বলেই তারা দুজনে নির্বিকারে ব্রিজ পেরিয়ে চলে যেতে থাকে। অন্যদিকে আনায়ার খোঁজে রনক আর আলো এগিয়ে আসে। দুজনে তার দেখা পেতেই, অবাক স্বরে বলল,
“কি রে! তুই এখানে একা একা কি করছিস।”
আনায়া বেশ ঘাবড়ে রয়েছে। তাদের দুজনকে দেখে সে খানিক তটস্থ হয়ে নিজেকে সামলে নেয়। তবে কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া কোনো বিষয় সম্পর্কেই কিছু বলে না। আবারও নজর ফিরিয়ে পেছনটা একপলক দেখার পর, কিঞ্চিৎ ঢোক গিলে তাদের সাথে সে চলে যায়।
পরদিন সকাল সকাল আনায়া সহ তার গ্রুপের সবাই মিলে সাজেকের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। কিন্তু সকাল হতেই টের পায়, আজকের দিনটা যেন আরো বেশি মেঘলা। ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মাঝেই তাদের সাজকের উদ্দেশ্যে রওয়া দিতে হয়। নিশ্চিত আজ আর তেমন ঘোরাঘুরি হবে না।কখনো বৃষ্টির বেগ বাড়ছে তো কখনো কমছে।আবার কখনো হারিয়ে যাচ্ছে দূর অজানায়।
বৃষ্টি নিয়ে বাকিদের মাঝে বেশ বিরক্তি বোধ হলেও,আনায়ার এই নিয়ে কোনো মাথাব্যাথা নেই। জানালার পাশে গাড়িতে বসে, বৃষ্টি আর শীতল বাতাসের সংস্পর্শে ডার্ক চকলেট খেতে খেতে,সে এই আবহটা বেশ উপভোগ করছে। এরিমধ্যে তার নজর পড়ে পেছনের দিকের এক কালো রঙের গাড়ির দিকে। বেশ চকচকে মার্সিডিজ জি-ওয়াগন সাই-সাই করে ছুটে চলেছে। হঠাৎ এই সাধারণ জিনিসটায় তার নজর কেনো আঁটকেছে,তা আনায়া জানে না। অবশ্য গাড়ির প্রতি তার বিশেষ এক টান রয়েছে।হয়তো এই কারণেই। কিন্তু বাবার পারমিশন না থাকায় তাকে এই শখেরও জলাঞ্জলি দিতে হয়েছে। ড্রাইভিং শিখতে চেয়েও, কখনো আর শেখা হয়ে ওঠেনি।
কিন্তু এসব ছাড়িয়ে অকস্মাৎ তার মনে আগ্রহ জাগল,গাড়ির ভেতরে বসে থাকা লোকদের দেখার জন্য। কোনো বিশেষ কারণ নেই,মন চাইছে তাই দেখবে। বিনামূল্যে টাইমপাস। এই ভাবনায় সে জানালা হতে মাথা বের করে পেছন তাকানোর চেষ্টা করে। সরু নজরে পরখ করে দেখতে চায়,খোলা জানালা দিয়ে কাউকে দেখা যায় কিনা। কিন্তু তেমন কিছু দেখতে না পেলেও,আচমকা গাড়িটা সজোরে স্পিড বাড়িয়ে আচমকা তাদের গাড়ি অতিক্রম করে চলে যায়।নিমিষেই আনায়া চমকে ওঠে। আর হাত থেকে চকলেটের বারটা ধপাৎ করে নিচে রাস্তায় পড়ে যায়।
নিমিষেই আনায়ার মনমেজাজ বিরক্তিতে কুঁচকে যায়। সামনে মুখ ফিরিয়ে কালো রঙের গাড়িটা পেছন হতে তাকিয়ে দেখতে দেখতেই, বিড়বিড় করে আওড়ায়,
“কত বজ্জাত মানুষজন।”
তবে পরক্ষণেই সে নিজের প্রতিই বিরক্ত হয়ে মনে মনে বলল,
“এমন ছ্যাঁছড়াম মতো পেছনে তাকানোর দরকারই বা কি ছিলো। মাঝেমধ্যে কিসব যে করি আমি। নিশ্চিত আমাকে দেখেই,ভাব মে’রে গাড়িটা টান দিলো।”
প্রায় অনেকটা পথ জার্নির পর অবশেষে তারা সাজেকে এসে পৌঁছায়। এখানে তাদের কর্টেজগুলো আগে থেকেই ঠিক করা রয়েছে। তবে সমস্যা হলো আবহাওয়ার। কর্টেজের ভেতর চুপ করে বসে থাকা ছাড়া, আজ হয়তো আর সারাদিন কোথাও যাওয়া হবে না।যথারীতি শেষমেশ এমনটাই ঘটে।
দুপুর পেরিয়ে বিকেল গড়ালো,তবুও দিন ভালো হবার নাম নেই। বর্তমানে বৃষ্টি না হলেও,আকাশ ঘন মেঘে ছেয়ে রয়েছে। চারপাশে সবুজ গাছগাছালি উজ্জ্বলতায় চকচক করছে। আশেপাশে বইছে শীতল বাতাস। এমন আবহ দেখে কেউ আর বাহিরে ঘুরাঘুরির জন্য কোনো সিন্ধান্ত নেয় না। আনায়া, সাবা,শিখা আর আলো একটা কর্টেজে এবং অন্যাটায় ছেলেরা—নিজেদের মতো সময় কাটাচ্ছে।
তবে চুপচাপ ভেতরে বসে থাকতে আনায়ার বিরক্ত লাগছিল বিধায়,সে আনমনেই কর্টেজের বারান্দার কাছে এসে দাঁড়ায়। মুক্তবাতাসে প্রাণ খুলে শ্বাস ফেলে, চারপাশে চোখ বুলিয়ে নেয়। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ঝড়াতে মেঘেরা ছোটাছুটি করছে। আনায়ার কাছে ব্যাপারটা বেশ মজাদার লাগল। সে বিস্তৃত হেসে পাশে মাথা ফিরিয়ে দেখে,লাগাদার একটার পর একটা কর্টেজের সারি। তবে সে ব্যতীত হয়তো আশেপাশে বারান্দায় কেউই নেই।
কিন্তু এরইমধ্যে দূরে তার নজর পড়ল। না! কোনো একজনকে দেখা যাচ্ছে—গিটার হাতে বারান্দার বসে রয়েছে। কিন্তু সেই কালো পোশাক পড়া অবয়ব ব্যতীত আর কিছুই স্পষ্ট নয়। এরিমধ্য আচমকা বৃষ্টির আগমন হলো। হঠাৎ ঝিরিঝিরি বৃষ্টি দেখে আনায়ার মন খুশিতে লাফিয়ে ওঠে।
একটু আগেই গোসল করে লালচে রঙের বিশাল ঘেরযুক্ত এক গাউন পড়েছে। চুলগুলো শুকিয়ে লম্বা এক বেণী গেঁথেছে। অথচ আনায়া সেসবে পরোয়া না করেই, মুক্ত আকাশের নিচে গিয়ে দাঁড়ায়।
যেখানে সারাদিনব্যাপী ক্ষুদ্রবিন্দু-বৃষ্টির অনবরত অনুবৃত্তি চারিদিকে এক অনির্বচনীয় আবেশ বিস্তার করেছিল। সাজেকের অগাধ পর্বতমালা যেন মেঘের পর্দায় আবৃত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে—অর্ধপ্রচ্ছন্ন, অথচ মায়াবী রূপে। অদূরে কর্টেজগুলো একে অপরের অন্তরালে নিভৃত-অবস্থান করছে। ভেতরে সবাই আপন স্বকীয় অনুরাগে নিমগ্ন।
ঠিক সেখানেই আনায়ার হৃদয়ে সেই নির্জনতা স্থির থাকেনি। তার অন্তঃসত্ত্বা অস্থিরতা হঠাৎই বৃষ্টির মৃদু রূপলাবণ্যে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। গাঢ়-রক্তিম গাউন পরিহিতা সে,অনিমেষেই ধীরপদে কর্টেজের বারান্দায় উদ্ভাসিত হয়। তার দীর্ঘ কেশগুচ্ছ চমৎকার কৌশলে বেণীবদ্ধ। পর্বতের শীর্ষদেশে মেঘাচ্ছন্ন আকাশ যেন তার আহ্বানে সাড়া দেয়। আনায়া তার দুইহাত প্রসারিত করে। তার অরুণ অধর সামান্য থরথরিত। সহসাই অন্তঃকরণের মায়াজালে চোখ বুজে নিবিষ্ট হয়ে যায়। চোখ মুদে মেঘাচ্ছন্ন আকাশের অভিমুখে সঁপে দেয় নিজেকে ।যেন সমগ্র আকাশ-প্রান্তরকে আপন বক্ষে ধারণ করতে চাইছে।
অপরদিকে, দূরবর্তী উচ্চাভূমির কর্টেজের বারান্দায় বসে ছিল কেনীথ। তার আঙুলের ডগায় লালচে কালো রঙের গিটার। হালকা বৃষ্টিধারায় ভিজতে ভিজতে, তার আঙুলের ডগায় অন্যমনস্কভাবেই বেজে উঠছিল গিটারের টুংটাং শব্দ। অথচ তার কন্ঠস্বর যেন স্থিরতার সীমা ভেঙে ঘুরপাক খাচ্ছে।এরিমধ্যে বৃষ্টিসিক্ত পরিবেশে হঠাৎই তার দৃষ্টি স্থবির হলো। এক লাল-পরিধেয়া নারী-অবয়ব মেঘে-ঢাকা নৈসর্গে দাঁড়িয়ে। মুখাবয়ব অস্পষ্ট। তবু তার ভঙ্গিমায় ছিল এক অব্যক্ত উল্লাস, এক অপ্রকাশিত দীপ্তি।তার দেহভঙ্গি, তার প্রসারিত হাত, তার বেণী বাঁধা দীর্ঘ কেশপাশ আর আকাশমুখী সমর্পণ—অকস্মাৎ সবকিছুই এক অনির্বচনীয় প্রফুল্লতার প্রতীক হয়ে উঠল।
কেনীথ অবচেতনভাবে থমকে যায়।তার দৃষ্টি আর সরে না। আঙুল অনিচ্ছায় গিটারের তারে ছন্দ তোলে। কণ্ঠ হতে হঠাৎই নিষ্কৃত এক অনূদিত সুরধ্বনি—
‘Kabhi jo baadal barse
Main dekhoon tujhe aankhein bharke
Tu lage mujhe pahli baarish ki duaa.
Tere pahloo mein reh loon
Main khudko paagal keh loon
Tu gham de ya khushiyaan
Seh loon saathiya_____’
কাভি জো বাদাল বারছে,
মে দেখু তুঝে আখে ভারকে।
তু লাগে মুঝে পেহলি বারিশ-কি দুয়া ।
তেরে পেহলু-মে রেহ-লু ।
মে খুদকো পাগাল কেহ-লু,
তু ঘাম দে ইয়া খুশিয়া ছেহ লু ছাথিয়া____।’
দূর হতে আচমকা কারো গানের কন্ঠস্বর ও গিটারের আওয়াজে আনায়া থমকে যায়। সে এগিয়ে গিয়ে দূরে বসে থাকা ব্যক্তিটির দিকে রেলিং বেয়ে মাথা উঁচিয়ে তাকায়। বোঝার চেষ্টা করে ব্যক্তিটি কি তার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে?
এদিকে কেনীথের গান থেমে গিয়েছে। আচমকা কি হতে কি করছে,নিজেও জানে না। দূরবর্তী প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মেয়েটিক উৎসুক ভাবগতিকে সে তার নজর সরিয়ে ফেলে। মূল কথা, কেনীথ আনায়ার সকল ভাবগতিক এখান থেকে স্পষ্টভাবে দেখতে পেলেও,আনায়া তা বুঝতে পারছে না। কর্টেজগুলো ছায়ায় তা আর সম্ভব হচ্ছে না।
আনায়া কপাল কুঁচকে নিজেকে সামলায়। লোকটার গানের কন্ঠস্বর মারাত্মক। কোনো প্রফেশনাল সিঙ্গার মনে হচ্ছে। যথারীতি তাকে নিয়ে আনায়ার আগ্রহটাও বেশ তীব্র হলো। কিন্তু তাকে সঠিকভাবে পরখ করতে না পেরে,সে ভারী শ্বাস ফেলে স্বাভাবিক হয়। বৃষ্টির বেগ বাড়ছে। কিন্তু আনায়ার তাতে কোনো ভাবনাচিন্তা নেই। সে আনমনো বারান্দার অন্যপাশে গিয়ে দাঁড়ায়। তবে গানের আর কোনো আওয়াজ না পেয়ে,কয়েকবার সে পেছন ফিরেও তাকায়। কিন্তু তাতে আর কোনো লাভ হয়না।
আনায়ার মতো কেনীথও ভিজে সম্পূর্ণ জুবুথুবু হয়ে যাচ্ছে। পরনের কালো টিশার্ট গায়ের সাথে লেপ্টে গিয়েছে। একপা নামিয়ে অন্য হাঁটুতে কনুই ঠেকিয়ে গিটার হাতে বসে রয়েছে। তার গিটারের বিভিন্ন ফাঁকে পানি ঢুকে গিয়ে,পরিপূর্ণ হচ্ছে। কিন্তু সেসবে তার কোনো ধ্যান নেই। সে পুনরায় নজর ফিরিয়ে সেই দূরবর্তী মেয়েটি তথা আনায়ার দিকে তাকিয়েছে। আনমনে স্তব্ধ চাহনিতে সে যে কি দেখছে, তা নিজেই ভালো জানে।
এরিমধ্যে বারান্দায় তার কাছে পাভেল আসে। এতোক্ষণ বসে বসে ভিডিও গেইম খেলছিল বিধায়,আশেপাশে কোনোদিকে নজর ছিল না। তবে অনেকক্ষণ হতে নিজের আশেপাশে কেনীথের দেখা না পেয়ে, শেষমেশ নিজেই উঠে আসে। আর বারান্দায় প্রবেশ মাত্রই যেন চমকে যায়। পাভেল কেনীথের নজর অনুসরণ করে, দূরের কর্টেজের বারান্দার দিকে তাকাতেই, বিস্ময়ের স্বরে কেনীথের উদ্দেশ্য বলে ওঠে,
“ভাইইইইইই! এসব কি হচ্ছে?”
হঠাৎ কারো কন্ঠস্বরে কেনীথ মৃদু চমকায়। কিন্তু চোখরে সামনে পাভেলকে দেখে তার কপাল কুঁচকে যায়। এইকসাথে চোয়াল শক্ত হয়। সে গম্ভীর দৃষ্টিতে পাভেলকে একপলক দেখে,পুনরায় আনায়ার দিকে ফিরে তাকায়।
এদিকে পাভেল নিজেকে স্বাভাবিক করে, এগিয়ে এসে মেয়েটিকে বোঝার চেষ্টা করে। সে কিছুক্ষণ দূর হতে কিসব যেন ভাবনাচিন্তা করে,আনমনেই বলতে লাগল,
“এটা তো ঐ এইচএসসি দেওয়া স্টুডেন্টদের গ্রুপেরই কোনো মেয়ে হবে হয়তো। আমাদের সাথেই আজ রাঙ্গামাটি থেকে সাজেক এসেছে।”
পাভেলের এহেন কথায় কেনীথের কপাল কুঁচকে যায়। সে আনায়ার দিকে তাকিয়ে থাকা অবস্থাতেই,অবাক স্বরে আওড়ায়,
মহামায়া পর্ব ৫
“এতো ছোট?”
তার এহেন কথায়, পাভেল তৎক্ষনাৎ পেছনে ফিরে তাকায়। কেনীথের উদ্দেশ্যে বিস্ময়ের উদ্দেশ্যে আওড়ায়,
“ব্রো, সিরিয়াসলি? শেষে এই মেয়ে…এতো ছোট…কিভাবে কি?”
কেনীথের সম্মূখের বড়বড় চুলগুলো ভিজে কপালের একপাশে এলোমেলো ভাবে নুইয়ে পড়েছে। তা হতে অনবরত বৃষ্টির পানি ঝড়ছে। মাঝেমধ্যে তা চোখ ছেয়ে গেলেও,কেনীথের নজর আনায়া হতে সরে না। সে ভাবুক ভঙ্গিতে গিটারে হাত ঠেকিয়ে খানিক ঝুকে বসে রয়েছে। পাভেলের কথা শুনে কেনীথ আনমনেই তির্যক হেসে ফেলে। এবং পরক্ষণেই আনায়ার দিকে অবিরাম চাহনিতে তাকিয়ে থাকা পর,কিঞ্চিৎ ঠোঁট কামড়ে নির্বিকারে শীতল গম্ভীর্যের সাথে আওড়ায়,
“ব্যাপার না, আই উইল ম্যানেজ।”
