মহামায়া পর্ব ৬২
তুশকন্যা
সকাল সকাল হাত-পা উসখুস করা একরাশ তীব্র অস্থিরতা আর অদমনীয় কৌতূহল নিয়ে আনায়া হাজির হয়েছে ব্লাডেনের বিশাল হেডকোয়ার্টারের মূল ফটকে। উদ্দেশ্য একটাই—যেমন করে হোক তার সাজানো মিশনকে পরবর্তী ধাপে নিয়ে যেতে হবে। এক বুক আশা আর বুকধুকপুকানি নিয়ে সে সুবিশাল ও দৃষ্টিনন্দন সেই হেডকোয়ার্টারের দরজা পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল।
আনায়া চঞ্চল চোখে লবির চারিদিকে তাকিয়ে হন্যে হয়ে কেবল একজনকে খুঁজতে লাগল—পাভেল! কারণ আপাতত পাভেল ছাড়া অন্য কেউ তাকে সাহায্য করতে পারবে না। কিন্তু সুবিশাল ফাঁকা লবি আর চারপাশের সুনসান নীরবতা দেখে সে ঘড়ির দিকে তাকাল। খেয়াল করল, আজ সে একটু বেশি সকালেই এখানে চলে এসেছে।
কেনীথ কিংবা ইমানি—কাউকেই এখনো এই চত্বরে দেখা যাচ্ছে না। তবে গতকালের কথা অনুযায়ী পাভেলের এই সময়ে আশার কথা। কাউকেই দেখতে না পেয়ে হতাশ হয়ে আনায়া যখন মূল ফটকের দিকে পা বাড়িয়ে ফিরে যেতে চাইল, ঠিক তখনই একজন স্টাফকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারল যে—পাভেল কিছুক্ষণ আগেই হেডকোয়ার্টারে এসে পৌঁছেছে এবং নিজের কেবিনে অবস্থান করছে।
আনায়া যেন এক লহমায় মনে মনে বিজয়ের আনন্দ অনুভব করল! উৎফুল্ল পায়ে তড়িঘড়ি করে পাভেলের এক্সিকিউটিভ কেবিনের সামনে গিয়ে হাজির হলো সে। কাচের দরজার ওপাশে উঁকি দিয়ে দেখল, পাভেল একমনে তার সুবিশাল ডেস্কে রাখা বেশ কিছু ফাইলপত্র নিয়ে কাজ করছে।
আনায়া অত্যন্ত সতর্কতার সাথে দরজায় মৃদু টোকা দিয়ে বেশ মিষ্টি সুর তুলে বলল,
“ভাইয়া, আসব?”
অসময়ে কেবিনের দরজায় আনায়াকে দেখে পাভেল দৃশ্যতই বেশ অবাক হলো। হাতের ফোল্ডারটি টেবিলে রেখে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে শুধাল,
“আনায়া? তুমি এত সকালে এখানে? কিন্তু তোমার তো আজকে বিকেলের শিফটে আসার কথা ছিল, তাই না?”
আনায়া মেকি এক চিলতে নিষ্পাপ হাসি ঝুলিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। চঞ্চল ভঙ্গিতে জবাব দিল,
“আ… ভাবলাম আজ একটু সকালেই চলে আসি। কারণ আজ বিকেলের দিকে একটা জরুরি কাজ থাকায়, তখন আমার আবার এখানে আসা সম্ভব হবে না”
পাভেল এক মুহূর্ত তার দিকে দুচোখ সরু করে তাকিয়ে থেকে বলল,
“তোমার আজ ভার্সিটিতে ক্লাস নেই?”
”আছে…”
আনায়া হাত দুটো পেছনে রেখে একগাল চটপটে মুচকি হাসি ফুটিয়ে বলল,
“তবে আজ ভার্সিটিতে গিয়ে ক্লাস লেকচার গেলার মতো কোনো মুড নেই আমার!”
পাভেল হালকা হেসে ফাইল দুটো একপাশে গুছিয়ে রাখতে রাখতে বলল,
“ওহ, তাই বলো! তা হঠাৎ এত সকালে আমার কেবিনে কী প্রয়োজনে এলে?”
আনায়া দ্রুত পাভেলের মুখোমুখি রাখা রিভলভিং লেদার চেয়ারটায় গিয়ে বসে পড়ল। দুই হাত টেবিলের ওপর রেখে সহজ ভঙ্গিতে বলল,
“উমমম… সত্যি বলতে কোনো বিশেষ প্রয়োজনে আসিনি পাভেল ভাই। এমনিতেই এলাম! এখনও তো হেডকোয়ার্টারে তেমন কেউ আসেনি, তাই ভাবলাম আপনার সাথে দেখা করে একটু আড্ডা দিয়ে যাই।”
পাভেল মৃদু হেসে মাথা নাড়ল,
“এ-তো বেশ ভালো কথা! এমনিতেও কাজের চাপে তোমার সাথে আলাদা করে গল্প করার তেমন সুযোগই পাওয়া যায় না। তা বলো, কেমন আছ তুমি? সবকিছু ঠিকঠাক চলছে তো?”
আনায়া অত্যন্ত নম্র-ভদ্র মেয়ের মতো মাথা নেড়ে সংক্ষিপ্ত সৌজন্যমূলক সাধারণ আলাপগুলো বেশ গুছিয়ে সেরে নিল। কিন্তু সৌজন্য সাক্ষাতের এই আড়ালে সে যে গুপ্ত উদ্দেশ্য উদ্ধার করতে এসেছে, সেটা তো যেকোনো মূল্যে বের করতেই হবে!
টেবিলের নিচে নিজের পরনের জামার এককোণ আঙুলের ডগায় অনবরত মোচড়াতে মোচড়াতে আনায়া হঠাৎ খুব কৌতূহলী চোখে সরাসরি প্রশ্ন করে বসল,
“আচ্ছা ভাইয়া… আপনাকে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করি?”
”হুম, বলো না!”
পাভেল ফাইল থেকে চোখ না সরিয়েই সায় দিল।
কিন্তু মুখে প্রশ্ন করার অনুমতি পেলেও, আসল কথাটা কীভাবে পাড়বে তা ভেবে কোনো কুল পাচ্ছিল না আনায়া। কেবিনের ভেতর বেশ কিছুক্ষণ ধরে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজ করতে লাগল। পাভেল ফাইল চেক করার ফাঁকে খেয়াল করল, মেয়েটি সম্পূর্ণ নীরব হয়ে নিজের নখ খুঁড়ছে। সে আনায়ার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকাল। মেয়েটির চেহারার দ্বিধা পরখ করে ভেবেচিন্তে বলল,
“কী হয়েছে, বলো তো? নির্দ্বিধায় বলতে পারো, কোনো ভয় বা দ্বিধার দরকার নেই।”
আনায়ার চঞ্চল মস্তিষ্ক তখন চরম ঘোল খেয়ে গেছে—কীভাবে মূল প্রসঙ্গে আসবে! শেষমেশ আর কিছু না ভেবে একদম আচমকা ও অপ্রত্যাশিত একটা প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
“আপনি বিয়ে করবেন কবে?”
হঠাৎ এমন অদ্ভুত, অসংলগ্ন ও অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন শুনে পাভেল কয়েক সেকেন্ডের জন্য একদম স্থাণু হয়ে গেল! সে হাতের কলমটা টেবিলে রেখে আনায়ার দিকে স্তম্ভিত হয়ে চেয়ে থেকে বলল,
“আমি বিয়ে করব কবে? হঠাৎ তোমার মনে আমাকে নিয়ে এই প্রশ্ন জাগল কেন, আনায়া?”
—“না মানে… আপনার তো বয়স কম হলো না!”
আনায়া অত্যন্ত গম্ভীর মুখে বিজ্ঞের মতো যুক্তি দাঁড় করাতে লাগল,
“আপনার ভাইয়ের তো বলতে গেলে বিয়ের বয়সই পার হয়ে গেছে! তবে আপনার সময় কিন্তু এখনো কিছুটা বাকি আছে, তাই না? তাহলে আর শুভ কাজে এতো দেরি করছেন কেন? সময় থাকতে বিয়েটা সেরে ফেললেই তো হয়!”
পাভেল নিজের হাতের ফাইলটা ফেলে দিয়ে এবার কেবিনের নিস্তব্ধতা ভেঙে হোহো করে হেসে উঠল! তার সেই অকারণ হাসি দেখে আনায়া ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কী ব্যাপার, এভাবে হাসছেন কেন আপনি?”
—“তুমি বলছো, আমার ভাইয়ের নাকি বিয়ের বয়স পেরিয়ে গেছে?”
পাভেল হাসি থামিয়ে চরম কৌতুকের সুর তুলে বলল,
“তোমার কোনো ধারণাই নেই আনায়া, আমার ওই কাঠখোট্টা ব্রো-এর পেছনে এখনো সুন্দরী সুন্দরী মেয়েরা কীভাবে আঠার মতো লেগে থাকে! কিন্তু ভাই ওদেরকে কখনো বিন্দুমাত্র পাত্তা দেয়নি বলেই, বেচারীগুলো আজ পর্যন্ত ঘুণাক্ষরেও কোনো সুযোগ পেল না! আর আমার কথা বললে…এসব কাজকর্মের পেছনে ছুটতে ছুটতে আমার আর সংসার-বিয়ের ব্যাপারে কোনো পরিকল্পনা নেই।”
আনায়ার চোখ-মুখ এক মুহূর্তে চুপসে গেল। সবকথা রেখে, কেনীথের বিষয়টা নিয়েই বুকের ভেতর এক লহমায় জ্বলে ওঠা জ্বলুনি চেপে রেখে, সে ওপর ওপর খুব স্বাভাবিক ও কৌতুহলী ভাব ফুটিয়ে বলল,
“ওহ, আচ্ছা…তাই নাকি! তা সেই সুন্দরী মেয়েগুলো নিশ্চয়ই ওনাকে পাওয়ার জন্য প্রচুর পাগলামিও করে, তাই না?”
—“হুমম… তা তো করেই।”
পাভেল খুব স্বাভাবিকভাবেই জবাব দিল।আনায়া এবার টেবিলের দিকে ঝুঁকে এসে একদম পাকা গোয়েন্দার ন্যায় ভঙ্গি করে ফিসফিস করে শুধাল,
”কেমন পাগলামি করে?”
আনায়া ক্ষণিকের জন্য থেমে,পুনরায় শুধালো,
“আই মিন… আপনাদের বাড়িতে ঢুকে গিয়েও কি কোনো কাণ্ড বা ঝামেলা পাকাতে চায়? সোজা বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ে? না ঢোকার কি আছে, ঢুকতেও তো পারে তাই না?”
পাভেল এবার পুনরায় গা দুলিয়ে হেসে উঠল,
“হা হা হা! তুমি এসব কী আজগুবি কথা বলছ, আনায়া? যে কেউ হুট করে আমাদের বাড়িতে কীভাবে ঢুকবে? ব্লাডেন হেলে ঢোকা কি এতই সহজ নাকি?”
আনায়া তার কাঙ্ক্ষিত ফাঁদটা পেয়েই তড়িঘড়ি করে জিজ্ঞেস করে বসল,
“কেন কেন? ওখানে ঢোকার জন্য কি বিশেষ কোনো কিছুর প্রয়োজন পড়ে?”
—“বিশেষ কিছু বলতে মেইন এন্ট্রান্সের ডোর পাসওয়ার্ডটাই হলো আসল চাবিকাঠি।”
পাভেল কোনো কিছু না ভেবেই অবলীলায় বলে চলল,
“ওটা তো আর সাধারণ যে কারোর পক্ষে জানা সম্ভব নয়! আর পাসওয়ার্ড ছাড়া স্বয়ং কোনো অশরীরীও ওই বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতে পারবে না।”
আনায়া অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে চোখ দুটো অতিরঞ্জিত মাত্রায় বড় বড় করে শুধাল,
“ওহ, আচ্ছা! তা সেই সিক্রেট পাসওয়ার্ডটা কী? আপনি নিশ্চয়ই জানেন?”
—“জানব না কেন? অবভিয়াসলি জানি।”
—“তাহলে বলুন না,সেই পাসওয়ার্ডটা কী?”
আনায়া মিষ্টি করে এক চিলতে নিষ্পাপ ও কৌতূহলী হাসি ফুটিয়ে তুলল।পাভেল চোখ ছোট করে সামান্য কৌতুকপূর্ণ ভঙ্গিতে তাকাল,
“আমাদের বাড়ির পাসওয়ার্ড, আমি তোমাকে কেন বলব?”
আনায়া থতমত খেয়ে চুপসে গেল। মুহূর্তেই আবার অভিমানের নাটক শুরু করে দিল। সে মুখ ঘুরিয়ে গাল ফুলিয়ে বিষাদের সুরে বলতে লাগল,
“বললে কী এমন হয়ে শুনি? আপনি কি আমায় ভয় পাচ্ছেন নাকি? ভাবছেন আমি আপনাদের বাড়িতে গিয়ে চুরি-টুরি করে আসব? ছিঃ পাভেল ভাই! শেষমেশ আপনি আমায় একটা চোর ভাবলেন? আমার মতো একটা নিষ্পাপ মনের মেয়েটাও কিনা আজ চোরের অপবাদ পেল? এই জীবন আমি কোথায় রাখবো? বাক্সতে নাকি মহাপুরুষের মনে?”
পাভেল হকচকিয়ে গেল রমণীর এরূপ আচরণে। অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে হাত নেড়ে উঠল,
“আরে আরে! তুমি আবার কী সব উল্টোপাল্টা ভাবছ! আচ্ছা শোনো, শোনো…প্রাইমারি সিকিউরিটি পাসওয়ার্ডটা হলো BLOØDEN367।”
আনায়া মনে মনে পাসওয়ার্ডের প্রতিটি হরফ মুখস্থ করে নিল, কিন্তু মুখে চরম তাচ্ছিল্যের ভাব ফুটিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এত্ত ইজি পাসওয়ার্ড? আমি তো ভাবলাম না জানি কি না কি হবে।”
পাভেল এবার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে চালাকিসুলভ রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে বলল,
“তুমি হয়তো ভাবছ শুধু এই পাসওয়ার্ডটুকু পেলেই কেল্লাফতে। কিন্তু না ম্যাডাম, এখানে আরো একটা কন্ডিশন আছে।”
—“যেমন?”
আনায়া কৌতূহল সামলাতে না পেরে সামনের দিকে আরও কিছুটা ঝুঁকে এলো। পাভেল দুই হাতের আঙুল একসাথে করে চেয়ারে হেলান দিয়ে খুব ধীরস্থিরভাবে বুঝিয়ে বলল,
“বাড়ির ভেতরে প্রবেশের জন্য এই পাসওয়ার্ড টাইপ করার পর, দ্বিতীয় ধাপে সেন্সর প্যানেলে বায়োমেট্রিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট ম্যাচ করাতে হয়। আর ওই সেন্ট্রাল হাই-সিকিউরিটি ডাটাবেজে আমি, ন্যান্সি, ইমানি আর ভাই ছাড়া অন্য আর কারো ফিঙ্গারপ্রিন্ট কাস্টমাইজড করা নেই। তাই তুমি চাইলেও, শুধু এই সামান্য পাসওয়ার্ডটা দিয়ে ওই বাড়ির ভেতরে ঢুকতে পারবে না!”
পাভেলের মুখ থেকে এই সত্যটুকু জেনে আনায়া খুব একটা অবাক হলো না। ধারণামতে সে এমন কিছুই যেন আশা করেছিল। কিন্তু আপাতত পাভেলের কাছে এসে সে যা পেয়েছে,সেটুকুই তার জন্য অনেককিছু।
সকাল দশটা। কেনীথের কেবিনের সামনে আনায়ার অস্বাভাবিক বিচরণ। লোকটা কিছুক্ষণ আগেই হেডকোয়ার্টারে এসেছে—এই খবর পাওয়া মাত্রই রমণীর চঞ্চল পদচারণা বেড়ে গেছে বহুগুণে। মাথায় নতুন এক ফন্দির জাল বুনে সে দরজার সামনে চরকির মতো ঘুরপাক খাচ্ছে। তবে ভেতরে প্রবেশ করার অদম্য ইচ্ছা থাকলেও পা দুটি যেন হঠাৎই থমকে যাচ্ছে; কিছুতেই সাহস সঞ্চয় করে সরাসরি ওই গম্ভীর মানুষটার মুখোমুখি হতে পারছে না সে।
ওদিকে ঘরের ভেতরে কেনীথ তখন নিজ খেয়ালে, স্বভাবসুলভ গুরুগম্ভীর ভাবমূর্তি বজায় রেখে টেবিলে রাখা ক্লাসিফাইড ফাইলগুলো খতিয়ে দেখতে ব্যস্ত। কেবিনের কাচের ওপাশে যে এক চপল রমণী অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে উসখুস করছে, তা অবশ্য ওই পুরুষের প্রখর দৃষ্টি এড়ায়নি। তবে কেনীথ বরাবরের মতোই অসীম ধৈর্য আর চরম নির্লিপ্ততায় আনায়ার উপস্থিতি টের পেয়েও না পাওয়ার ভঙ্গি করে রইল।
আনায়া আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। কাচের এপাশ থেকে কিছু মুহূর্ত কেনীথের গতিবিধি পরখ করে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তারপর এক প্রকার জেদ নিয়েই দরজার হ্যান্ডেল ঠেলে সোজা ভেতরে ঢুকে পড়ল। ঝড়ের গতিতে ছটফট করতে করতে সে গিয়ে দাঁড়াল কেনীথের সুবিশাল ডেস্কের ঠিক সামনে। কিন্তু মুখোমুখি রাখা চেয়ারটায় আর বসা হলো না তার; বরং টেবিলের ওপর সামান্য ঝুঁকে তীব্র অস্থিরতা নিয়ে ডেকে উঠল,
”শুনছেন?”
কালো রঙের শার্ট পরিহিত কেনীথের প্রখর নজর তখন স্রেফ ফাইলের পাতাতেই নিবদ্ধ। আনায়ার স্পষ্ট কণ্ঠস্বর তার কানে পৌঁছালেও সে ন্যূনতম গুরুত্ব না দিয়ে নিজের কাজ চালিয়ে গেল।
আনায়া তার এই চরম অবজ্ঞায় ক্ষিপ্ত হয়ে আবারও ডাকল,
”এই যে ভাইয়া, শুনুন না!”
কেনীথ হয়তো এইবার অন্তত মুখ তুলে তাকাত—কিন্তু সেই বিশেষ সম্ভাষণ কর্ণপাত হওয়ায় মাত্রই পুরুষের চিবুকের হাড় দ্বিগুণ শক্ত হয়ে এলো; মুখাবয়ব রূপ নিল এক কঠিন গম্ভীরতায়।
আনায়া নিজের মেজাজ সামলাতে দাঁতে দাঁত চিপল; অতঃপর ইচ্ছে করে অতি-মিষ্টি সুর টেনে দ্বিতীয়বার ডাকল,
”এই যে মুরুব্বি, শুনছেন?”
কেনীথ আক্রোশে চোয়াল শক্ত করল। হাতের মুষ্টি কঠিন করে সে ধীরগতিতে মুখ তুলে আনায়ার দিকে তাকাল। আনায়া সেই রুক্ষ চাহুনির মুখোমুখি হয়ে এক চিলতে অপরাধীর মতো মিষ্টি হাসি ফোটানোর চেষ্টা করতেই, কেনীথ সপাটে প্রশ্ন ছুড়ল,
—“কী চাই?”
—“টাকা চাই!”
আনায়ার সোজাসাপ্টা ও স্পষ্ট জবাব। কেনীথের গম্ভীর চেহারার অভিব্যক্তিতে এক নিমিষেই সামান্য পরিবর্তন ঘটল। সে ভ্রু জোড়া কুঞ্চিত করে গম্ভীর কণ্ঠে আওড়াল,
“হাহ?”
আনায়ার কণ্ঠনালী শুকিয়ে এলো। মুহূর্তের জন্য নিজেকে অসামান্য নির্লজ্জ মনে হলেও এখন আর পিছিয়ে আসার পথ নেই। সে মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দিল—
“এতো লজ্জা পেয়ে লাভ নেই। টাকা তো আর নিজের জন্য চাইছি না। ওনার জন্য অকাজ করতে গিয়ে, আরেকজনের জিন্দেগীর সর্বনাশ করে দিয়েছি। তাহলে তার প্রায়শ্চিত্ত আমি একা করব কেন? বউয়ের অকাজে, স্বামী হিসেবে ওনারও তো কিছু দায়দায়িত্ব আছে,তাই না!”
সমস্ত সংকোচ ঝেড়ে ফেলে, আনায়া শুষ্ক ঢোক গিলে এবার স্পষ্ট গলায় বলল,
”টাকা লাগবে আমার, বেশ কিছু টাকা!”
কেনীথ সম্পূর্ণ নিরুত্তর। সে পলকহীন, শীতল দৃষ্টিতে আনায়ার দিকে একনাগাড়ে চেয়ে রইল। আনায়া কাচুমাচু ভঙ্গিতে একটু ইতস্তত করে শুধাল,
—”জিজ্ঞেস করবেন না কত লাগবে?”
—”কত?”
কেনীথের সংক্ষিপ্ত ও থমথমে প্রশ্ন। আনায়া অমায়িক এক হাসি ফুটিয়ে বলল,
”বেশি না, মাত্র এক কোটি! আপনি চাইলে অবশ্য আরেকটু বেশিও দিতে পারেন।”
কয়েক সেকেন্ডের জন্য কেবিনের ভেতর পিনপতন নীরবতা নেমে এলো। আনায়ার ভেতরে তখন আশা আর নিরাশার তীব্র দোলাচল। ঠিক তখনই তাকে অবাক করে দিয়ে কেনীথ অত্যন্ত শীতল স্বরে প্রশ্ন করে বসল,
”আমি কেন তোকে টাকা দেব?”
মুহূর্তেই আনায়া স্তম্ভিত ও বাকরুদ্ধ হয়ে গেল! এমন তীক্ষ্ণ প্রশ্নের উত্তর কী হতে পারে, তা তার জানা নেই।
অন্যদিকে দাম্ভিক পুরুষটি দম্ভের সাথেই হাতের সাইনপেনটা ফাইলের ওপর দুবার হালকা ঠুকে দিয়ে, নির্লিপ্ত চোখে রমণীর জবাবের আশায় চেয়ে রইল। আনায়া নিজেকে সামলে নিয়ে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ল,
—“দেবেন না-ই বা কেন, শুনি?”
—“আমি যার-তার সাথে টাকা-পয়সার লেনদেন করি না। ফাইল-ডকুমেন্টস প্রপারলি রেডি করে নিয়ে আসুন, তারপর বাদবাকিটা ভেবে দেখছি।”
কেনীথ কথাটুকু বলেই অসংকোচে চোখ নামিয়ে আবার ফাইলের পাতায় মন দিল। আনায়া বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। লোকটার এমন বরফশীতল আচরণে তার মাথা ভনভন করে ঘুরতে লাগল—মন খুলে গালি দেবে নাকি নিজের ওপর ব্যথিত হবে, বুঝে উঠতে পারল না।
আনায়া চরম অসহায়ত্বের ভঙ্গি করে ফুঁসে উঠে বলল,
“এভাবে মুহূর্তের মধ্যে রূপ বলদে নিচ্ছেন? আপনার এতো টাকাপয়সা দিয়ে কি হবে শুনি—যদি মনটা এমন হারকিপ্টের মতো হয়? গরিব-মিসকিনদের কিছু-মিছু দান করে দিলেও তো সওয়াব পাওয়া যায়।”
—“দুঃখীত, আমি এখানে কোনো গরিব-মিসকিন দেখতে পাচ্ছি না।”
কেনীথ একই নির্ভাবনায় অকপটে কথাটা আওড়াল। আনায়া থমকে গেল সহসাই! পরক্ষণেই আবার আচমকা এক অদ্ভুত কাণ্ড করে বসল। দু-হাত উঁচিয়ে, নাড়িয়ে-চাড়িয়ে নিজেকে ‘মিসকিন’ রূপে জাহির করার প্রচেষ্টায় বলল,
”কিহ্, মিসকিন দেখতে পাচ্ছেন না? এই যে আমি!”
কেনীথ কাজ থামিয়ে মুখ তুলে আনায়ার দিকে তাকাল। লোকটার সেই প্রখর গম্ভীর দৃষ্টিপাতে আনায়া কিঞ্চিৎ ভড়কে গিয়ে বলল,
“না মানে, আমাকে না হয় মিসনিক ভেবেই দিয়ে দিন না প্লিজ এক কোটি! আমি আপনাকে সব টাকা খুব তাড়াতাড়ি ফিরিয়ে দেবো, প্রমিজ!”
—”মিসকিনকে টাকা দান করব; আবার সেই টাকা মিসকিন আমায় ফিরিয়েও দেবে?”
পুরুষের স্লেশাত্মক কটাক্ষ পেয়ে আনায়ার মেজাজ ভেতরে ভেতরে চড়ে গেলেও সে নিজেকে শান্ত রাখল। বুদ্ধিমতির মতো নিজেকে স্থির রেখে কেনীথকে আশ্বস্ত করার সুর তুলে বলল,
”হ্যাঁ,হ্যাঁ সত্যি দেব! এক টাকাও বাকি রাখব না!”
—“আর যদি না দিতে পারিস, তাহলে?”
কেনীথের সূক্ষ্ম ও রুক্ষ প্রশ্ন। আনায়া মুহূর্তের জন্য ভেবে নিয়ে আচমকা দু-হাতের তর্জনী দিয়ে নিজের পেটের দিকে ইশারা করে বলল,
—“উমমম… তাহলে এই যে উপায়!”
—“ওখানে কী?”
কেনীথ ভ্রু উঁচিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে জানতে চায়। আনায়া মিষ্টি হেসে সপাটে উত্তর দিল,
—“আমার দুটো কিডনি!”
—“তোর কিডনি দিয়ে আমি কি করব?”
দাম্ভিক পুরুষের ভ্রুযুগল অতিমাত্রায় কুঁচকে গেল। আনায়া কোনোপ্রকার ভণিতা না করে বলতে লাগল,
“আমি যদি আমার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আপনাকে সবগুলো টাকা সুন্দরমতো ফিরিয়ে দিতে না পারি—তাহলে আপনি আমার কিডনি দুটো নিয়ে নেবেন! ডিল ডান?”
রমণীর এমন আজব প্রস্তাব কেনীথকে খুব একটা অবাক করল না। এমন খামখেয়ালী মেয়ের কাছ থেকে এর চেয়ে বেশি বুদ্ধিদীপ্ত কিছু আশা করাটাও বোকামি। কেনীথ কথা না বাড়িয়ে আনায়ার পেটের দিকটায় কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। হাতের সাইনপেনটা ভ্রু-কোণে ঠেকিয়ে, বিশেষ এক মাপজোখ শেষে সপাটে উত্তর দিল,
”তোর এই দুই কিডনি মিলিয়ে বড়জোর দশ থেকে বারো লাখ টাকা পাওয়া যাবে। আর বাকি নব্বই লাখের কী হবে?”
আনায়া স্তব্ধ হয়ে গেল! এই লোক কি আবেগ বোঝে না? সত্যি সত্যি হিসেব-নিকেশ করে বসে আছে! এমন নিখুঁত ব্যবসায়িক গণনার উত্তর কী দেবে ভাবতে ভাবতেই আনায়া আমতা আমতা করে বলে ফেলল,
”আ… তাহলে কি আমার হাত-পা আলাদা করে ব্ল্যাকমার্কেটে বিক্রি করার কোনো প্রসেস আছে?”
কেনীথ এক চিলতে শুষ্ক-শীতল হাসিতে মুচকি হাসল। সেই হাসিতে আনায়ার সংশয় আরও বাড়ল। কেনীথ অত্যন্ত অকপটে বলতে লাগল,
“আই থিংক, তোর জন্য এরচেয়েও বেটার অপশন আছে। এভাবে আলাদা আলাদা করে বডিপার্টস বিক্রি না করে, আস্ত তুই-টাকেই একদম ফ্রেশ কন্ডিশনে বেঁচে দে। এতে-করে এমাউন্টটাও বেশ ভালো আসবে।”
—“সত্যি? তাহলে আমি বরং এটাই না-হয়… এক সেকেন্ড, পুরো আমিটাকেই বিক্রি করে দেব মানে?”
আনায়া অবুঝের মতো চেয়ে শুধাল। কেনীথ নির্লিপ্ত কণ্ঠে প্রত্যুত্তর করল,
“মানেটা খুব সহজ। রুশ-সিসিলিয়ান মাফিয়াদের কাছে তোর মতো অল্পবয়সী মেয়েদের বিশেষ চাহিদা রয়েছে। চাইলে…ভেবে দেখতে পারিস।”
আনায়ার উজ্জ্বল হয়ে ওঠা মুখাবয়ব এক নিমিষেই শুকিয়ে গেল। সে থমথমে স্বরে জিজ্ঞেস করল,
”ওরা আমাকে দিয়ে কী কী করাবে?”
কেনীথ মেকি গম্ভীরতা দেখিয়ে বলল,
“যা যা করতে চাইবি না, ঠিক তাই তাই!”
আনায়ার মাথা তখনও ঘুরপাক খাচ্ছে। সে অবুঝের মতো আবারও আওড়াল,
“মানে…ঠিক বুঝলাম না।”
আনায়ার না বোঝার কারণটা অযৌক্তিক নয়। সম্ভবত কেনীথের কাছে এমন প্রস্তাব সে আশা করেনি। ততক্ষণে কেনীথ ওষ্ঠকোণে বৃদ্ধাঙ্গুলি ঘষে,চাপা হেসে আবারও অকপটে বলল,
”যেগুলো তুই স্বপ্নেও করতে চাইবি না… ঠিক সেগুলোই! আরো ডিটেইলসে বোঝাতে হবে?”
আনায়া শুকনো মুখে চেয়ে, চোখ পিটপিট করে কিছুক্ষণ কেনীথকে দেখল। পরক্ষণেই আচমকা বলে বসল,
“কষ্ট করে ওগুলো ওদের করার কি প্রয়োজন? চাইলে আপনিই তো করতে পারেন!”
রমণীর সহজ অভিব্যক্তি। অথচ কেনীথের মুখাবয়ব ছেয়ে থাকা হাসিটুকু একনিমিষেই মিলিয়ে গেল। সে ভ্রু-যুগল অতিমাত্রায় কুঁচকে শুধাল,
“কি বলতে চাইছিস?”
মুহূর্তেই আনায়া থতমত খেয়ে গেল। অপ্রস্তুত হয়ে বলতে লাগল,
—“আ…না, কিছু না…মানে…”
পরক্ষনেই সে নিজেকে সামলে নিয়ে, কন্ঠস্বর রুক্ষ করে পুরুষকে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ল,
”আপনি আমার সাথে মশকরা করছেন,তাই না?”
কেনীথ দুদন্ড স্থির থেকে, নিস্পৃহে জোর গলায় বলল,
”নট অ্যাট অল। আই অ্যাম এক্সট্রিমি সিরিয়াস।”
আনায়া রাগে ফুঁসে উঠল। চোখ দুটো বড় বড় করে ঝাঁঝালো স্বরে বলল,
“লাগবে না আপনার টাকা। থাকুন আপনি আপনার ধনসম্পদ নিয়ে।”
কথাটা বলেই সে ঝটকা মেরে পেছনে ফিরে পা বাড়াল। তবে রমণীর এমন হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে যাওয়ার আগেই কেনীথ পেছন থেকে ডেকে উঠল,
”এ্যই, শোন!”
আনায়ার পা দুটো অনিচ্ছা সত্ত্বেও থমকে গেল। সে ঘাড় ঘুরিয়ে ত্যাড়া সুর তুলে বলল,
”কী হয়েছে আবার?”
কেনীথ কোনো উত্তর দিল না। সে ডেস্কের ড্রয়ারটা খুলে একটা চেকবুক বের করল। সাইনপেনের এক আঁচড়ে একটা ব্ল্যাঙ্ক চেকে দস্তখত করে, তা সটান ছিঁড়ে নিয়ে টেবিলের ওপর ঠেলে দিল,
—“এটা কী?”
আনায়া চোখ গোল গোল করে দু-পা এগিয়ে এলো। ডেস্কে রাখা সেই সই করা ফাঁকা চেকটার দিকে বিস্ময়ে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বলল,
”ব্ল্যাঙ্ক চেক! আই মিন… সিরিয়াসলি?”
কেনীথ আবার দৃষ্টি নামিয়ে নিল। পূর্বের মতোই সেই একই কঠিন গম্ভীরতায় ফাইলের পাতায় মনোযোগ স্থির করে বলল,
”যত লাগে, মনমতো অ্যামাউন্ট বসিয়ে নিস।”
আনায়া চেকটা হাতে নিয়ে এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। পরক্ষণেই তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টুমিমাখা হাসি ফুটে উঠল,
”ইচ্ছামতো? যদি আমি সত্যি সত্যি আপনার সব টাকা-পসয়া একবারে ক্যাশ আউট করে নিয়ে পালিয়ে যাই?”
আনায়ার এহেন প্রশ্ন শেষ হতেই কেনীথ ফাইলের পাতা থেকেই গম্ভীর কণ্ঠে প্রত্যুত্তর করল,
“কান ধরে টেনে এনে, সুদে-আসলে সবটা বুঝিয়ে নেবো।”
মানুষটার অপরিবর্তনীয় গম্ভীর ভাবমূর্তির মাঝেও, এহেন প্রত্যুত্তর পেয়ে আনায়া এবার না হেসে পারল না। সে নিঃশব্দে হেসে উঠে বলল,
“যতটা খারাপ ভেবেছিলাম, আপনি ততটাও খারাপ নন! ভালোই আছেন আপনি… দীর্ঘায়ু হোক আপনার! আমিন! আমিন!”
দু-হাত তুলে অতি-আহ্লাদী ঢঙে প্রার্থনা শেষে, আনায়া হাতের তালুয় শব্দ করে চুমু খেল। রমণীর এই স্বাভাবিক কাজকর্মে কেনীথের বিশেষ বাহ্যিক প্রতিক্রিয়া দেখা না গেলেও, আচমকা তার হাতে থাকা ব্যস্ত কলমটা থেমে গেল। এক অদ্ভুত, নিস্তব্ধ অনুভূতির ছায়া যেন গ্রাস করল তাকে। তবে দাম্ভিক পুরুষটি নিজের ভেতরে তৈরি হওয়া সেই দুর্বলতাকে প্রকাশ করতে সম্পূর্ণ অনিচ্ছা দেখিয়ে আবার তার সহজাত কঠোরতায় কাজে মন দিল।
ওদিকে আনায়ার ছটফটে পা দুটি এবার কেবিন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য তৈরি। সে চলেই যাচ্ছিল, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই তার নজর গিয়ে পড়ল কেনীথের ঘাড়-গলা আর কলারের সংযোগস্থলে। কৌতূহল সামলাতে না পেরে সে নিজের অজান্তেই সোজা কেনীথের একদম কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
হঠাৎ গা ঘেঁষে দাঁড়ানো রমণীর উপস্থিতিতে কেনীথ ভ্রুকুটি করে মুখ তোলার আগেই আনায়া ভ্রু উঁচিয়ে প্রশ্ন ছুড়ল,
”ওখানে কী হয়েছে আপনার?”
কালো শার্টের কলার ছাড়িয়ে উঁকি দিচ্ছে মাংস চিরে যাওয়া তাজা নখের আঁচড়! পুরো জায়গাটাই যেন জখম হয়ে আছে। আনায়া হতভম্ব হয়ে সেই ক্ষতচিহ্নের দিকে চেয়ে রইল। তার মাথার ভেতরে নিমেষেই ঘুরপাক খেয়ে গেল অসংখ্য অযাচিত সন্দিহান ভাবনাচিন্তা। অজান্তেই সে হাত বাড়িয়ে দিল; আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখতে চাইল সেই ক্ষত। অস্ফুট স্বরে আবারও আওড়াল,
”কী হয়েছে এখানে?”
আনায়ার আঙুল যখন কেনীথের তপ্ত ত্বক ছুঁইছুঁই—ঠিক তখনই তাকে কোনোপ্রকার বাঁধা না দিয়ে, কেনীথ চোখ তুলে রুক্ষ স্বরে জবাব দিল,
”এক অসভ্য বাঁদরের অসভ্যতার ফল!”
আনায়ার বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা বাতাসে জমে গেল! মুহূর্তে নিজের অপ্রস্তুত অবস্থান বুঝতে পেরে তার পূর্ণ হুঁশ ফিরে এল। লোকটার গায়ের ওপর ঝুঁকে থাকা নিজ শরীরটা এক ঝটকায় সোজা করে দাঁড় করাল সে। কেনীথের কথার সূত্র ধরে গতকালকের সেই ঘটনাগুলো মনে পড়তেই তার নিজের ওপরই ধিক্কার এলো—ইশশশ! কতবড় আহাম্মকের মতো কাজটাই না করেছে সে!
নিজের এই অনুশোচনার মাঝেই,তার চোখদুটো পুরুষের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সাথে মিলে যেতেই আনায়া অপ্রস্তুত হয়ে ওঠে। তড়িঘড়ি করে কয়েকপা পিছিয়ে গিয়ে, আমতা আমতা করে আওড়াল,
”আ… সরি! আই অ্যাম রিয়্যালি সো সরি!”
আনায়া আর এইমূহূর্তও বিলম্ব করল না। হাত-পা গুটিয়ে তৎক্ষনাৎ সে ছুটে পালালো যেন। কেনীথ চোয়াল বাঁকিয়ে একমনে তাকিয়ে তাকিয়ে রমণীর সেই প্রস্থান অবলোকন করল। আনায়া তার দৃষ্টির সীমা অতিক্রম করতেই, সে গম্ভীর স্বরে অস্ফুটে আওড়াল,
“প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি পেকে গিয়েছিস। এবার তোর একটা বিহিত না করলেই নয়!”
কেনীথ ভারী শ্বাস ফেলল। চেয়ারে গা এলিয়ে দিল আনমনে। চোখদুটো বুঁজে নিয়ে, হাতের কলমটা অনবরত ঠুকতে লাগল ফাইলের পাতায়। ‘ঠক,ঠক,ঠক…’ খানিকক্ষণ সব স্থির থাকার পর, হঠাৎ তার ওষ্ঠদ্বয় হতে অস্ফুটে নির্গত হলো,
মহামায়া পর্ব ৬১
“তোর আয়ু বাড়ুক হাজারটা বসন্তের আয়তনে; আলো হয়ে ফুটে থাকুক তোর প্রতিটা দিন। আর আমার সমস্ত অন্ধকার জমা থাক ঐ সীমান্তের ওপারে—যেখান থেকে কোনো অভিশপ্ত ছায়া আর কোনোদিন তোকে স্পর্শ করতে না পারে।”
