মহামায়া পর্ব ৬৩
তুশকন্যা
বিকেলের শেষভাগে ব্লাডেন হেল নামক সুবিশাল ট্রিপলেক্স ম্যানশনটির সামনে এক রমণীর চঞ্চল অথচ ইতস্তত আনাগোনা চলছিল ভীষণভাবে। বাদামী-বেইজ রঙের হুডিতে নিজের মুখখানি আংশিক আবৃত করে দাঁড়িয়ে রয়েছে আনায়া। উন্মুক্ত উদ্যান আর দূর থেকে দৃশ্যমান অট্টালিকার গম্ভীর স্থাপত্যের দিকে চেয়ে সে যেন কোনো কূল পাচ্ছে না। এই মুহূর্তে ভেতরে পা বাড়ানোর সাহস যেমন তার সঞ্চার হচ্ছে না, তেমনি ব্যর্থ হয়ে প্রস্থান করার সংকল্পও সে গ্রহণ করতে পারছে না।
এমনই এক দ্বিধাদ্বন্দ্বের মাঝে উদ্যানের পথ ধরে এগিয়ে আসতে দেখা গেল গৃহের সুদীর্ঘকালের বিশ্বস্ত কর্মী ন্যান্সি-কে। পরনে সুতি সাদা গাউন আর মাথায় জড়িয়ে রাখা হালকা স্কার্ফ। ন্যান্সি উদ্যানের সতেজ পত্রপল্লবের দিকে ধীর পায়ে অগ্রসর হতেই, বাউন্ডারি দেয়ালের বাইরে দাঁড়ানো আনায়া সুযোগ হাতছাড়া না করে অমায়িক কণ্ঠে ডাক দিতে হলো,
”হ্যালো মিস!”
ন্যান্সি থমকে দাঁড়িয়ে ফটকের সুবিন্যস্ত ধাতব গ্রিলের ফাঁক দিয়ে বাইরে দৃষ্টিপাত করল। মুহূর্তেই তরুণীর চপল অবয়বটি দেখে তার স্মৃতিপটে অতীত কিছু দৃশ্য ভেসে উঠল। সে কিছুটা অপ্রস্তুত ও ইতস্তত পদক্ষেপে এগিয়ে এসে সন্দিগ্ধ চোখে শুধাল,
“আ… আপনি এখানে? ভার্সিটির সেই স্টুডেন্টদের একজন না?”
আনায়া চটজলদি মুখে কিঞ্চিৎ সৌজন্যমূলক হাসি ফুটিয়ে প্রত্যুত্তর দিল,
”আ… হ্যাঁ! একদম ঠিক ধরেছেন।”
ন্যান্সি ললাটে কিঞ্চিৎ কুঞ্চন সৃষ্টি করে সময়টা অনুধাবন করার চেষ্টা করল। প্রফেসরের অনুপস্থিতিতে এই রমণীর অহেতুক আগমন তার কাছে মোটেও স্বাভাবিক ঠেকলো না। সে শুষ্ক গলায় বলল,
”উমমম… বাড়িতে তো প্রফেসর ভিকে নেই। সে তো ল্যাব আর হেডকোয়ার্টারের কাজ সেরে এখনো ফেরেননি।”
—“জানি আমি,”
আনায়া নিজেকে সামলে নিয়ে বিনীত সুরে বলল,
“প্রফেসরের খোঁজে আমি আসিনি। আমার শুধু আপনার একটা বিশেষ সাহায্যের প্রয়োজন।”
ন্যান্সি এবার বিস্ময় ও সংশয়ভরা দৃষ্টিতে চাইল। ব্লাডেন হেলের মতো কঠোর নিরাপত্তা পরিবেষ্টিত ব্যক্তিগত বাসভবনে এসে প্রফেসরের এক সাধারণ শিক্ষার্থী সরাসরি তার কাছে সহায়তা প্রার্থনা করছে—ঘটনাটি ন্যান্সির নিকট নিতান্তই অসংলগ্ন বলে মনে হলো!
—“আমার সাহায্য? দেখুন মিস, আমি কেবল এই ম্যানশনের পরিচর্যা ও তদারকি করি। প্রফেসরের শিক্ষার্থীদের পারসোনাল বা একাডেমিক কোনো বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার অধিকার আমার নেই। আপনি বরং কাল সরাসরি ভার্সিটিতেই প্রফেসরের কেবিনে গিয়ে কথা বলুন।”
ন্যান্সি কথোনেতি টেনে প্রস্থান করতে উদ্যত হতেই আনায়া তড়িঘড়ি করে গেটের ধাতব অংশে হাত রেখে বলে উঠল,
”দয়া করে দাঁড়ান! আপনি যা ভাবছেন বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। আমি ওনার কেবল কোনো সাধারণ স্টুডেন্ট নই… আই অ্যাম সামওয়ান ভেরি স্পেশাল টু হিম!”
চাপা সংশোয়ে একপ্রকার মুখ ফস্কেই বলে ফেলল আনায়া। ন্যান্সি থমকে দাঁড়িয়ে ধীর পায়ে ফিরে দাঁড়াল। তার মুখাবয়বে স্পষ্ট অবিশ্বাসের ছায়া। ব্লাডেন হেলের দীর্ঘ ইতিহাসে তার মাস্টার ভিকের অনুসঙ্গে কোনো রমণীর বিশেষ সম্পর্ক বিদ্যমান—এমন কথা ন্যান্সির কাছে স্রেফ কাল্পনিক ও দুঃসাহসিক কৌতুক ছাড়া আর কিছুই নয়।
সে কঠোর সংবৃত্ত কণ্ঠে বলল,
“মিস, আপনি সম্ভবত ভুল জায়গায় এসে আজব রসিকতা করছেন। মাস্টার ভিকের সঙ্গে কোনো মেয়ের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে—এমন অসংলগ্ন গল্প অন্তত আমাকে বিশ্বাস করাতে আসবেন না।”
—“জানতাম, আপনি আমার কথা বিশ্বাস করবেন না…”
পরিস্থিতির বেগতিক দেখে আনায়া বেশ ঘাবড়ে গিয়েছে। তথাপি আনায়া নিজের পকেটে রাখা হাত দুটো সামলে নিয়ে ন্যান্সির দিকে সামান্য ঝুঁকে কন্ঠে জোর দিয়ে বলল,
“বেশ! আপনি আমার কথা বিশ্বাস না করলে এখনই পাভেল ভাইকে একটা কল করুন। কল করে জাস্ট বলুন—গেটে আনায়া এহসান নামের একটা মেয়ে এসেছে। ব্যস, আর কিছু বলতে হবে না। ফোনটা লাউডস্পিকারে দিয়ে ব্যাকগ্রাউন্ড শুনবেন, তাহলেই বুঝতে পারবেন।”
আনায়ার অবয়বে কোনোপ্রকারের ইতস্তত ভাব না দেখে ন্যান্সি মুহূর্তের জন্য দোটানায় পড়ে গেল। মেয়েটির এই অচিন্তনীয় আত্মবিশ্বাস তাকে বাধ্য করল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে। সে স্বীয় মোবাইল সেটটি বের করে পাভেলের ব্যক্তিগত নম্বরে ডায়াল করল এবং স্পিকার অন করে কান থেকে খানিকটা দূরে রাখল।
কয়েক মুহূর্ত রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে পাভেলের সাবলীল ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
”বলো ন্যান্সি, এনিথিং আর্জেন্ট?”
ন্যান্সি আনায়ার দিকে ক্ষণকালের জন্য তীক্ষ্ণ নজরপাত করে উত্তর দিল,
”নো মিস্টার হান্স। আর্জেন্ট কিছু তো নয় কিন্তু… আসলে বাড়ির মেইন গেটের বাইরে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে বলছে তার নাম… আনায়া এহসান।”
সংযোগের ওপাশে এক মুহূর্তের স্তব্ধতা বিরাজ করল। অতঃপর পাভেলের কণ্ঠে এক অদ্ভুত চটপটে ও ইতস্তত ভাব স্পষ্ট হয়ে উঠল। সে কিছুটা হালকা স্বরে বলে উঠল,
”ওহ, আনায়া? আচ্ছা আচ্ছা! ওকে ওকে… শোনো ন্যান্সি, ওকে একদম বাহিরে গেটে দাঁড় করিয়ে রাখবে না। ভেতরে নিয়ে যাও, প্রপারলি কেয়ার করো আর কমফোর্টেবল ফিল করাও। দেখো ওর যেন বিন্দুমাত্র কোনো সমস্যা না হয়!”
ন্যান্সি চূড়ান্ত বিস্ময়ে অক্ষিপট স্ফীত করে ফেলল। সে নিজের আত্মসংযরণ বজায় রেখে কৌতূহল সম্বরণ করতে না পেরে শুধাল,
”মিস্টার হান্স… আই মিন, উনি কি আপনাদের পরিচিত কেউ?”
ফোনের ওপাশ থেকে পাভেল নিজের কোনো চাতুরি ঢাকতে সামান্য কেশে নিজেকে গুছিয়ে নিল। অতঃপর চটপটে ভঙ্গিতে বলল,
”উমম… হ্যাঁ, অবভিয়াসলি ও আমাদের ক্লোজ রিলেটিভ। আর… বলা যায় ভেরি স্পেশাল ওয়ান। সো, নো কেয়ারলেসনেস, ওকে?”
কথাটি কানে পৌঁছানো মাত্রই ন্যান্সির পাশাপাশি বাইরে অপেক্ষমাণ আনায়াও ভেতরের দিক থেকে চরম চকিত ও তাজ্জব বনে গেল! সে স্রেফ পাভেলের সঙ্গে চেনা জানার সুবাদে এই উপস্থিতির সুযোগটুকু নিতে চেয়েছিল; কিন্তু পাভেল যে এক লাফে তাকে নিজেদের রিলেটিভ কিংবা ‘স্পেশাল ওয়ান’ আখ্যা দিয়ে ন্যান্সির সমীহ আদায় করে দেবে—তা আনায়ার ধারণাতীত ছিল!
—“ইয়েস মিস্টার হান্স, অ্যান্ডারস্টুড।”
ন্যান্সি বিস্ময় দমন করে সায় দিল। পাভেল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতেই ন্যান্সি স্তম্ভিত চোখে কিছুক্ষণ আনায়ার দিকে চেয়ে রইল। তার চোখ থেকে সন্দেহের মেঘ এক নিমেষে অপসৃত হয়ে সেখানে গভীর আতিথেয়তা ও শ্রদ্ধা স্থান নিল। সে দ্রুগামী পদক্ষেপে সিকিউরিটি লক মুক্ত করে বিশাল ফটকটি উন্মুক্ত করে দিল।
—“আই অ্যাম রিয়্যালি সরি, মিস আনায়া।আমি বুঝতে পারিনি। অনুগ্রহ করে ভেতরে আসুন, আমি আপনার জন্য লিভিংরুমে রিফ্রেশমেন্টের ব্যবস্থা করছি।”
ন্যান্সি তাকে সম্মানের সঙ্গে অভ্যন্তরে প্রবেশের আমন্ত্রণে পা বাড়াতেই আনায়া এক পা পিছিয়ে গেল। সে হাত নেড়ে অমায়িক হেসে বলল,
”আরে না না। রিল্যাক্স! আমার বাড়িতে প্রবেশ করার কোনো প্রয়োজন নেই, আর আমি ভেতরে যেতেও চাই নই।”
ন্যান্সি খানিকটা থতমত খেয়ে বলল,
”কিন্তু মিস্টার হান্স তো আপনাকে ভেতরে নিয়ে আপ্যায়ন করতে নির্দেশ দিলেন! আপনি বাইরে অবস্থান করলে ওনারা তো অসন্তুষ্ট হবেন।”
আনায়া হুডির পকেটে হাত গুঁজে নিজের চপল অভিব্যক্তিটিকে চরম গম্ভীর আর বিচক্ষণ করে তুলল। সে চারপাশটা একনজর পরখ করে ন্যান্সির নিকটবর্তী হয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
—”বললাম তো, ভেতরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই! আমার আসল উদ্দেশ্য বাইরেই। আপনার নিকট হতে আমার একটি অতীব জরুরি সহায়তা প্রয়োজন, মাননীয় আপ্পি!”
রমণীর এরূপ ছলাকলায় ন্যান্সি ভুরু কুঁচকে শুধাল,
“জ্বী বলুন, আমি আপনাকে কি সাহায্য করতে পারি?”
আনায়া অত্যন্ত সতর্ক ভঙ্গিতে চতুর্দিক পর্যবেক্ষণ করে, ন্যান্সির কানের কাছে সামান্য ঝুঁকে অত্যন্ত সোজাসাপ্টা ও চটপটে গলায় একের পর এক নির্দেশনা দিতে লাগল। ন্যান্সি চুপচাপ সেসব শুনে গেলেও, প্রতিমুহূর্তে তার চোখদুটো যেন বিস্ময়ে বিস্ফোরিত হতে লাগল।
আনায়ার কন্ঠনিঃসৃত এমন সঙ্গোপন, ভয়ঙ্কর ও বিপজ্জনক প্রশ্ন শ্রবণে ন্যান্সির চোখ জোড়া একপ্রকার কপালে ওঠার জো! সে এক নিমিষে বাকরুদ্ধ হয়ে, চরম বিভ্রান্তি ও বিস্ময়ে থতমত খেয়ে আনায়ার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। আনায়া ইতস্তত করে একগাল মুচকি হেসে, ন্যান্সির হাতদুটো চেপে ধরে, আকুতি মিনতি করে বলতে লাগল,
“প্লিজজজ না করবেন না। এইটুকু সাহায্য করে দিন, খোদা আপনার ভালো করবেন। আমি অনেক দুয়া করে দেবো; আপনার বিয়ে না হলে, ডিজনিল্যান্ডের প্রিন্সের সাথে বিয়ে হবে। আর আপনি বিবাহিত হলে, প্রিন্সেস সোফিয়া, মোয়ানা, এরিয়েল…আর কি কি যেন, হ্যা সিন্ড্রেলা, বেল্লা, টিয়ানা ওদের মতো সুন্দর সুন্দর কিউট কিউট কুচুপুচু বাচ্চা হবে। অনেকগুলো হবে, দোয়া করে দেবো আমি। তবুও এই হতভাগীকে নিরাশ করে বাড়ি ফেরাবেন না প্লিজ!”
রমণীর খামখেয়ালিপনায় ন্যান্সি প্রতিমুহূর্তে হতভম্ব হয়ে চলেছে। সে কিছু বলার আগেই, আনায়া আবারও অবাধ্য বাচ্চার মতো ছটফট করে বলতে লাগল,
“দেখুন মিস ন্যান্সি, শুধু আপনার বাচ্চাকাচ্চা হলেই তো হবে না তাই না? আমারটাও তো ব্যবস্থা করতে হবে। আপনি কি চান না, এই অভাগী তার নিরামিষ স্বামীটাকে আমিষ বানিয়ে বংশবিস্তার করুক? আমি মা হলে আমারও ডজন ডজন ছানাপোনা হোক, আপনি চান না বলুন?”
ন্যান্সি এই মেয়ের কথাবার্তার কোনো আগাগোড়া খুঁজে পাচ্ছে না। সে হতভম্ব হয়ে কেবল এইটুকুই মুখ ফস্কে বলে ফেলল,
“কিন্তু আমার তো মনে হচ্ছে, আপনি নিজেই একটা বাচ্চা! মাস্টার আপনাকে বাচ্চা দিবে কি করে?”
মুহূর্তেই আনায়া হতভম্ব হয়ে গেল। মুখখানা চুপসে গেল এক লহমায়। সে কিছু বলে ওঠার আগেই, ন্যান্সি নিজের অভিব্যক্তিতে থতমত খেয়ে আওড়াল,
“আ…আচ্ছা আচ্ছা আমি দেখছি, ক… কি করায় যায়।”
দিনের শেষ আলো বিলীন হওয়ার মুহূর্তে ব্লাডেন হেলের সামনে এসে থামল কেনীথের সুদৃশ্য গাড়িটি। ড্রাইভওয়ে ধরে এগোতেই কেনীথের প্রখর নজর আটকালো সাইড মিররে।
উন্মুক্ত উদ্যানের এক কোণে, রক্তিম চেরি গাছের সারির আড়ালে এক ছায়ামূর্তি চতুরতায় কী যেন করছে।
মুহূর্তেই গাড়ি থামিয়ে নিচে নেমে এলো কেনীথ। মূল ভবনের দিকে না গিয়ে সে দীর্ঘ পদক্ষেপে পেছনে ফিরে, বাগানের দিকে অগ্রসর হলো। চেরি গাছের ঘন সারির কাছাকাছি পৌঁছাতেই সে অনুধাবন করল—তার অনুমান বিন্দুমাত্র ভুল ছিল না।
ডাল থেকে টকটকে রসালো চেরিগুলো এক প্রকার তাড়াহুড়ো করে ছিঁড়ে নিজের হুডির পকেটে পুরতে ব্যস্ত আনায়া। উঁচু ডাল পেরিয়ে, ঘাসের ওপর জমে থাকা হৃষ্টপুষ্ট চেরিগুলোও সে হুড়মুড় করে পকেটে চালান করছে। অপেক্ষাকৃত পরিষ্কার চেরি হুডির কাপড়ে ঘষে নিয়ে সোজা মুখে পুরে দিচ্ছে। পেছনে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষের উপস্থিতি সম্পর্কে তখনো সে সম্পূর্ণ অজ্ঞ।
কিছুক্ষণ পর আনায়া ঘাস থেকে চেরি তুলতে মাথা নুইয়ে সামনের দিকে ঝুঁকতেই, এক বলিষ্ঠ হাতের থাবা আছড়ে পড়ল তার পিঠের ওপর। অকস্মাৎ পেছন থেকে সুঠাম হাতে তার হুডির টুপি চেপে ধরে সজোরে ব্যাকওয়ার্ড টান দিল কেনীথ। আনায়া আকস্মিক টানে ভারসাম্য হারিয়ে ছিটকে পিছিয়ে এলো এবং সোজা কেনীথের চওড়া বুকে আছড়ে পড়ল। পিঠটা এক প্রকাণ্ড শক্তপোক্ত অবয়বের সাথে ঠেকতেই রমণীর চোখ-মুখ শুকিয়ে চুপসে গেল। ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাওয়ার আগেই কেনীথ তাকে নিজের মুখোমুখি করে নিল।
আনায়া শুষ্ক ঢোক গিলে দৃষ্টি তুলে চাইল। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দাম্ভিক পুরুষটির প্রখর ও শীতল চাহনি তার দিকে নিবদ্ধ।
কেনীথ তখনও হুডির টুপিটা একহাতে শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে। রমণীর ভয়ার্ত মুখখানি থেকে নজর সামান্য নামাতেই কেনীথ দেখল—আনায়া তড়িঘড়ি করে সবকটা চেরি হুডির পকেটে ঠেলে ঠেলে ঢুকিয়ে গোপন করার চেষ্টা করছে। কেনীথ নিঃশব্দে সেই কাণ্ড পরখ করল।
আনায়া কিছু বলার আগে কেনীথ সংক্ষিপ্তে থমথমে শীতল সুরে প্রশ্ন ছুড়ল,
”এখানে এসব কী করছিস?”
আনায়া কোনো যুক্তি খুঁজে না পেয়ে কৃত্রিম এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল,
”এমনি… ঘুরতে এলাম!”
কেনীথ আরও একবার তার আপাদমস্তক মেপে নিল। এত বড় মেয়ে, অথচ সামান্য চেরি খেতে গিয়ে মুখের কী বেহাল দশা করে রেখেছে! চেরির গাঢ় লাল রসে রমণীর গোলাপী ওষ্ঠদ্বয় ভিজে আরও রসালো ও খামিক লোভনীয় দেখাচ্ছে। একনাগাড়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতে থাকতে পুরুষের নিরেট মনেও এক বিশেষ আলোড়নের সৃষ্টি হলো। কেনীথ নিজের অজান্তেই কিঞ্চিৎ শুষ্ক ঢোক গিলল।
আনায়া পুরুষের এই অদ্ভুত চাহুনির অর্থ বুঝতে না পেরে ভাবল—তার চেহারার বেহাল দশা দেখে লোকটা মনে মনে মজা লুটছে। সে ঝটকা মেরে ডান হাতের কবজি দিয়ে ঠোঁট দুটো শক্ত করে মুছে ফেলল।
আনায়ার এই আচমকা নড়াচড়ায় কেনীথের তন্দ্রা ছুটল। সে আনায়ার হুডির টুপি ছেড়ে দিয়ে পিঠ থেকে হাত সরিয়ে নিল।
আনায়া বাহানা খোঁজার ধ্যানে ছিল, কিন্তু তার আগেই পুরুষটি সামান্য ঘাড় ঘুরিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে ডেকে উঠল,
”ন্যান্সি!”
আনায়া চমকে পেছনে ফিরতেই দেখল, অত্যন্ত ইতস্তত ভঙ্গিতে ন্যান্সি তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। সুযোগ বুঝে আনায়া দ্রুত কিছুটা দূরত্ব বাড়িয়ে সরে দাঁড়াল। ন্যান্সি মুখোমুখি এসে আড়চোখে আনায়াকে দেখে,পরক্ষণেই সোজা কেনীথের উদ্দেশ্যে মাথা নুইয়ে বলল,
—“ইয়েস, মাস্টার!”
—–“এখানে…”
কেনীথের কথা শুরু হওয়ার আগেই আনায়া ব্যস্ত হয়ে বাধা দিল,
—“আমি এখন আসছি, ঠিক আছে?”
কথাটি বলেই সে হুডির পকেটে হাত গুঁজে ছিটকে পালিয়ে যাওয়ার তোড়জোড় করল। কিন্তু কেনীথের পাশ কাটিয়ে পথ পার হতে গিয়েও আচমকা থেমে গেল আনায়া। দাম্ভিক পুরুষ এতে কিছুটা অপ্রস্তুত হলো; কিন্তু ততক্ষণে আনায়া নিজের কাজ সেরে ফেলেছে। সোজা কেনীথের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, পকেট থেকে আস্ত এক চেরি বের করে কেনীথের মুখে ঠুসে ঢুকিয়ে দিয়ে বলল,
”চোরের অপবাদ দেবেন না কিন্তু! ওনাকে বলেই এগুলো নিয়ে যাচ্ছি। জ্যাম বানিয়ে আপনাকে কিছুটা দিয়ে যাব, ঠিক আছে?”
আনায়ার এই আচমকা কণ্ডকারখানায় কেনীথের পাশাপাশি ন্যান্সিও সম্পূর্ণ হতভম্ব হয়ে গেল। এতক্ষণ যে সন্দেহ ছিল, এবার তা নিশ্চিত হলো—মেয়েটি তাকে যা বলেছে ঘটনা তবে সম্পূর্ণ সত্য! অবিশ্বাস্য!
ততক্ষণে আনায়া আবারও বিনীত সুরে বলল,
”ভালো থাকবেন!”
মাথাটা টুপিটা দিয়ে ঠেকে নিল আনায়া।পকেট থেকে একটি করে চেরি বের করে মুখে পুরতে পুরতে সে বাড়ির সীমানা পার হলো।
ন্যান্সি ভেবেছিল এমন কাণ্ডে কেনীথ ক্ষিপ্ত হবে,কিংবা বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখাবে। কিন্তু তাকে সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত দেখে ন্যান্সি আরও অবাক হলো। কেনীথ এবার ন্যান্সির দিকে তাকাল। মুহূর্তেই তার চেহারায় নেমে এলো কঠোর গম্ভীরতা।
—“এখানে কি প্রায়শই যাকে-তাকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে?”
হঠাৎ এমন গুরুগম্ভীর প্রশ্নে ন্যান্সি ভড়কে গেল। নিজেকে সামলে নিয়ে দ্রুত বলল,
—“আ… সরি মাস্টার! আসলে আমি মিস্টার হান্সকে ফোন করেছিলাম। উনি পারমিশন দিয়েছিলেন বলেই ওনাকে…”
কেনীথ আর কিছু বলল না। ন্যান্সির কথা শেষ হওয়ার আগেই সে দীর্ঘ পদক্ষেপে মূল ভবনের দিকে চলে গেল। তাকে দৃঢ়পায়ে প্রস্থান করতে দেখে পেছনে ন্যান্সি বিড়বিড় করে আওড়াল,
”এইসব ঘটনা কি ইমানি ম্যামও জানেন? ঈশ্বর রক্ষা করো… না জানি আর কী কী আশ্চর্যজনক জিনিস দেখা বাকি আছে আমার!”
রাত নয়টা। কেনীথের সুবিশাল মাস্টার বেডরুমে ন্যান্সি ঘর পরিষ্কারের ছলে এক বিপজ্জনক কাজে ব্যস্ত। এক হাত তার ঝাড়ু ও ধুলো ঝাড়ার কাপড়ের আড়ালে থাকলেও, অন্য হাতে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সে ছোট ছোট কিছু উচ্চ প্রযুক্তির হিডেন ক্যামেরা ঘরের নানা গোপন কোণে সেট করে চলেছে।
কাজ প্রায় শেষপর্যায়ে, ঠিক তখনই করিডোর ধরে কারোর ভারী পদশব্দ কানে আসতেই ন্যান্সির অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। হাতে এখনও অবশিষ্ট দুটো ক্যামেরা! ভয়ের চোটে ঠিক-ভুল অনুধাবনের ক্ষমতা হারিয়ে সে তাড়াহুড়ো করে বাথরুমের দিকে ছুটে গেল। সেখানে পৌঁছানোর পর তার মনে হলো—সে পাগলের মতো বাথরুমে কেনো এসেছে?
কিন্তু অনুশোচনা বা ভাবনার সময় তখন আর ছিল না। ধরা পড়ার চরম আতঙ্কে সে ক্যামেরা দুটি বাথরুমের দুই কোণে তড়িঘড়ি লুকোচুরি করে বসিয়ে দিল। দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে, ঝাড়ু হাতে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে রুম থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম করতেই দরজার হ্যান্ডেল ঘুরল।
কপোকাত ন্যান্সি নিজেকে আড়ষ্ট করে দাঁড়াল। দরজা ঠেলে কেনীথ ভেতরে প্রবেশ করতেই অসময়ে ন্যান্সির উপস্থিতি দেখে তার ললাটে কুঞ্চন রেখা ভেসে উঠল। সন্দিগ্ধ ও গম্ভীর স্বরে সে শুধাল,
”ন্যান্সি, তুমি এই সময়ে এখানে?”
ন্যান্সি দুই হাত এক করে ঝাড়ু আর কাপড়টা শক্ত করে চেপে ধরে আড়ষ্ট গলায় জবাব দিল,
”দুঃখিত মাস্টার… আসলে এই রুমটা আজ ঠিকমতো পরিষ্কার করা হয়নি। তাই…”
ন্যান্সির কথা অসম্পূর্ণই রয়ে গেল। কেনীথ স্থির, ক্ষুরধার দৃষ্টিতে তার পানে চেয়ে রইল। কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা যেন ন্যান্সির কাছে ঘণ্টার মতো ঠেকলো। সে ইতস্তত করে দ্রুত বলল,
”আমি… আমি আসছি। গুড নাইট, মাস্টার।”
ন্যান্সি অতি দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কেনীথ পেছনে ভারী দরজাটা লক করে দিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অজান্তেই আড়চোখে ঘরের চারপাশটা একবার পরখ করে নিল সে। পরক্ষণেই নিজের ভাবনায় নিজেই বাঁধ সাধল—অযথা সন্দেহ করছে সে। যা-ই হোক, ন্যান্সির মতো আনুগত্যশীল ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে সন্দেহ করার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই।
তবুও মনের কোণে একটা খটকা থেকেই যায়। সাধারণত তারা বাড়িতে থাকাকালীন ন্যান্সি রাত করে এখানে থাকেনা, কিন্তু আজ হঠাৎ মেয়েটা এখানেই স্থির হয়েছে। কিন্তু…. কেনীথ ভারীশ্বাস ফেলল।
চিন্তাটা মাথায় চেপে বসলেও কেনীথ আর তা বাড়াল না। সে নিজের ক্লোজেটের দিকে এগিয়ে গেল। একটি কালো ট্রাউজার আর সাধারণ টি-শার্ট বের করে নিয়ে পা বাড়াল বাথরুমের দিকে। গভীর রাতে গোসল করার একটা পুরোনো অভ্যাস তার রয়েছে; তবে আজকের ধকলের পর একটু আগেই কাজটা সেরে নেওয়ার ইচ্ছে হলো তার।
অহেতুক চিন্তা ঝেড়ে ফেলে কেনীথ সোজা বাথরুমে প্রবেশ করে ভেতর থেকে দরজা আটকে দিল।
অন্ধকার ঘরে এক থমথমে পিনপতন নীরবতা। অন্ধকারকে চরম ভয় পাওয়া মেয়েটাও আজ রহস্যময় এক ঘোরে রুমের সব লাইট অফ করে চুপচাপ বিছানায় বসে আছে। এক হাতে একটি জ্বলন্ত সাদা মোমবাতি; প্রখর দৃষ্টি তার ল্যাপটপের উজ্জ্বল স্ক্রিনে নিবদ্ধ। জমজমাট এক বদ্ধ আবহে সে তীব্র মনোযোগের সহিত কিছু একটা দেখার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সাথে আবার একটা নোটপ্যাড ও কলম নিয়েও বসেছে; বিশেষ কিছুর হিসেব-নিকেশ খাতার পাতায় তুলতে।
আনায়া মোমবাতিটাকে একটি ছোট্ট স্ট্যান্ডের ওপর বসিয়ে সাবধানে বিছানার ওপর রেখে দিল। ল্যাপটপের স্ক্রিনের নীলাভ আলো আর মোমবাতির হলদেটে শিখা মিলে এক অদ্ভুত আবহের সৃষ্টি করল।
বাড়ি ফিরেই তড়িঘড়ি করে গোসল সেরে নিয়েছে সে। গায়ে সাদামাটা গাঢ় লাল রঙের একটি সুতি গাউন, তার ওপর দস্যির মতো মাথা আর গায়ে জড়ানো সাদা সুতির ওড়না।
আনায়া তার ওষ্ঠকোণ কামড়ে ধরে বিশেষ একটি ফাইল ওপেন করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
মুহূর্তের মধ্যেই সেই বহু আকাঙ্ক্ষিত দৃশ্যপট তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। প্রিয় আরাধ্য পুরুষের সেই বিশাল বেডরুমের আনাচে-কানাচের সকল কোণই এখন তার সম্মুখে সুস্পষ্ট! কামড়ে ধরা ঠোঁটের কোণে এখন এক বিশ্বজয়ের হাসি।
তবে পরমুহূর্তেই তার জোড়া ভ্রু কুঞ্চিত হয়ে এলো; বেডরুমের সিসিটিভি অ্যাঙ্গেল পেরিয়ে হঠাৎ বাথরুমের ভেতরের লাইভ ফুটেজ দেখতে পেয়ে সে হতভম্ব হলো। সে কি এক সুবিশাল আধুনিক ঘরনার বাথরুম; চারপাশ স্বচ্ছ ঝকঝকে, সৌখিনতায় কোনোকিছুরই কমতি নেই। অথচ লালচে আলোর আবহে অদ্ভুত এক ভূতুড়ে অনুভূতি! সবটা পরখ আনায়া বিস্ময়ে বিড়বিড় করল,
”হোয়াট দ্য হেল ইজ দিস! বাথরুমের ফুটেজ এলো কোত্থেকে? ন্যান্সি কি… সিরিয়াসলি? উনি বাথরুমেও হিডেন ক্যামেরা সেট করে দিয়েছেন?”
মুখে নীতির কথা আওড়ালেও, রমণীর চপল হাবভাবে প্রকাশ পেল সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ। চোখের সামনে তখন কেনীথের গোসলের দৃশ্য দৃশ্যমান! বলিষ্ঠ সেই সুঠাম দেহে জড়ানো কেবল একটি সাদা তোয়ালে;যা কোমড় হতে অনেকটাই নিচে নেমে এসেছে। আর পিঠটা আনায়ার স্ক্রিনের দিকে ফেরানো। মুখটা দেখা না গেলেও, মাথার ওপর থাকা শাওয়ার থেকে জলের ধারা ঝরে পড়ে সর্বাঙ্গ ভিজিয়ে দেওয়ার সেই মোহাবিষ্ট দৃশ্য দেখে, আনায়ার অবাধ্য চোখ দুটো মুহূর্তেই জ্বলজ্বল করে উঠল। এ যেন মেঘ না চাইতেই জলপ্রপাত!
আনায়া দুই হাতের তালু একত্র করে ঘষতে ঘষতে, আচমকা তার ওষ্ঠকোণ কামড়ে ধরেই গুনগুন করে গেয়ে উঠল,
⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀একলা পাইয়াছি হেথা,
⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀পলাইয়া যাবে কোথা?
⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀চৌদিক ঘিরিয়া রাখব,
⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀সব সখীগণে…………
⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀আজ পাশা খেলব রে, শাম!
নিজের এমন অদ্ভুত কাণ্ডকারখানায় নিজেই কিঞ্চিৎ লজ্জা পেল আনায়া। চট করে সাদা ওড়নার আড়ালে নিজের মুখটা চেপে ধরল; কিন্তু বেহায়া চোখ দুটো তার ঢাকা পড়ল না।রমণীর বেহেয়া কৌতুহলী চোখদুটো যেন পুরুষের অর্ধনগ্ন শরীরটাকে গিলে খাবার উপক্রম করেছে। আনায়া এবার ধীরস্থিরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সবটা পরখ করতে শুরু করল।
পুরুষের পিঠের পেশিবহুল গঠন, শাওয়ারের নিচে নড়চড় হতে থাকা সুঠাম দুটো হাত আর চুল বেয়ে শরীরে গড়িয়ে পড়া পানির বিন্দুধারা—সবই আনায়াকে এক প্রকার রুদ্ধশ্বাস অনুভূতির মুখোমুখি দাঁড় করাল। সে বুঝে উঠতে পারল না, এ কেমন ভয়ানক অনুভূতি! মুহূর্তেই তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল; এক তীব্র শ্বাসরুদ্ধকর অনুভূতি তার পুরো অস্তিত্বকে গ্রাস করল। স্বনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আনায়া হুট করে হালকা শিষ বাজিয়ে উঠল,
—“ওয়েই হোয়েই হোয়েইইই!”
—“উফফফ! কী বডি রে মাইরি… উম্মাহ!”
স্ক্রিণের সেই পুরুষকে উদ্দেশ্য করে, বাতাসে এক চিলতে চুমু ছুড়ে দিল আনায়া।বেখেয়ালিপনায় এক ভদ্র ঘরের অতিভদ্র সুশীল মেয়ের মুখে এমন অশোভন অঙ্গভঙ্গি রীতিমতো তাজ্জব করে দেবার মতো হলেও, আনায়া এখন নিজের হুঁশে নেই! সে আলিবাবার কোনো বিশেষ ধনরত্ন খুঁজে পাওয়ার ন্যায় উল্লাসে-উন্মাদনায় লাজলজ্জা ভুলে আজব এক মোহে মেতে উঠেছে। পরক্ষণেই ফের খানিকটা লজ্জাবোধ হতেই, রমণীর তার ডান হাতের তর্জনী দন্তপাটির নিচে কামড়ে ধরে, অদ্ভুত উৎকন্ঠা নিয়ে বিড়বিড় করল,
“হায়য় মাওলা! উনকি কাড়াক্ জাওয়ানি-নে তো হামারি দিল কি আঙ্গান মে আগ লাগা দি!”
এমন আবোলতাবোল বকতে বকতেই, আনায়া হঠাৎ অনুভব করল জার্মানির এই হাড়হিম করা শীতেও তার ভীষণ গরম লাগছে। তীব্র বিরক্তি নিয়ে গায়ের ওড়নাটা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বিড়বিড় করল,
“ধুর! ধুর! মাইনাস চৌদ্দ ডিগ্রি ঠান্ডার মাঝেও, এভাবে ঘেমে যাচ্ছে কী-করে?”
এদিকে আবার তৃষ্ণায় গলাটাও কেমন যেন চটচটে হয়ে গেছে। তবে এই সুবর্ণ মুহূর্তে পানি আনতে গিয়ে সময় নষ্ট করার কোনো মানেই হয় না!
—“পাগল নাকি! এই সুযোগ কি জীবনে বারবার আসে? যা দেখার এখনই দেখে নিতে হবে!”
আনায়া পুনরায় তার পুরো মনোযোগ পুরুষের সেই মোহনীয় অবয়বের দিকে স্থির করল। আবারও একনিমিষেই গলে গেল তার মন। চোখ দুটো আহ্লাদে পিটপিট করতে করতে বলল,
”একদম ইয়াস্মি-ইয়াম্মি, ক্রিমি-ক্রিমি আইসক্রিম…!”
পরক্ষণেই আবার স্ক্রিন হতে নজর না হটিয়েই, ওষ্ঠদ্বয় বিড়বিড় করে আনায়া আওড়াল,
“আচ্ছা আমার কি পাপ হচ্ছে? ধুররর, পাপ কেন হবে? নিজেরই তো জিনিস; দেখলে সমস্যা কই?”
এতটুকুতেও ক্ষান্ত হলো না আনায়া। বাথরুমের ফুটেজে সম্মানিত সেই মহাপুরুষ কিংবা প্রফেসর স্বরূপ স্বামীর গোসল করার দৃশ্য এবার সে অতিশয় লজ্জাবতীর ন্যায়, চোখের সামনে দুহাত দিয়ে ঢেকে, আঙুলের ফাঁক গলিয়ে দেখতে শুরু করল! এ-যেন বেহায়াপনা আর লজ্জাশীলতার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ।
ধীরে ধীরে অনুভূতি মাত্রাতিরিক্ত হয়ে উঠতেই, আনায়া নিজেই এবার নিজেকে ধমকে শাসিয়ে অস্ফুটে আওড়াল,
“থেমে যা শয়তান, থেমে যা! বেটার মনও পাবি, দেহও পাবি! কিন্তু এই মূহুর্তে না থামলে—তোর কপালে মরণ নিশ্চিত!”
মহামায়া পর্ব ৬২
কথাটা বলেই আনায়া তীব্র প্রচেষ্টায় চোখ দুটো শক্ত করে বুজে নিয়ে, একপ্রকার খিঁচে ধরল। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধান। চোখ মেলেই সে এক মুহূর্তে তাজ্জব বনে গেল! ল্যাপটপের স্ক্রিনে কেনীথকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না; শাওয়ারটাও বন্ধ! আনায়া প্রচন্ড হতভম্ব ও একইসাথে হাতাশায় বিষাদগ্রস্ত হয়ে মুখ ফুলিয়ে বিড়বিড় করল,
“এটা কি হলো? কই, কই…কই গেল লোকটা? আরেকটু দেখিয়ে গেলে কি এমন ক্ষতি হতো? ধুর, ভাল্লাগে না কিসু!”
