Home মাটির পিঞ্জর মাটির পিঞ্জর পর্ব ১৭

মাটির পিঞ্জর পর্ব ১৭

মাটির পিঞ্জর পর্ব ১৭
নূরায়েশা মাহনূর

– আপনার সাহসটা প্রয়োজনের সীমানা ছাড়িয়ে যাচ্ছে, ইজতিহাদ ভাই !
সাইফের কপালের ভাঁজ গাঢ় হয়ে উঠলো। জামাইকে ভাই বলে কে ডাকে? কণ্ঠে লুকোনো অভিমান মিশিয়ে গাঢ় স্বরে বললো,
– আমি আপনার ভাই নই।
– তো কী?
– জামাই বলতে পারেন না?
এক মুহূর্ত থেমে রইলো দৃষ্টি। লোকটার দুঃসাহস নেহাৎই সীমা ছাড়াচ্ছে। সে সামান্য এগিয়ে এলো সাইফের কাছটায়। সেই অদ্ভুত নৈঃশব্দ্যের ভারে সিঁটিয়ে উঠে অজান্তেই এক কদম পেছালো সাইফ। গলায় শুষ্কতা, বুকের গভীরে হঠাৎ ঠেলে ওঠা এক অচেনা গুঞ্জন।

– শেখ সাহেব, আপনার মস্তিষ্কে একটা স্নায়ু বিচ্যুতি ঘটেছে, অর্থাৎ আপনার মাথার একটা তার ছিঁড়ে গেছে! এটা জানেন তো?
– হ্যাঁ জানি ।
নিস্তরঙ্গ স্বর, নিঃসংকোচ স্বীকারোক্তি। সাইফের উত্তর শুনে চোখে বিস্ময়ের ঝিলিক উঠলো দৃষ্টির। ভাষাহীন হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। শেষমেশ ঠোঁট দুটো শক্ত করে বলেই ফেললো,
– এখুনি বেরিয়ে যান এখান থেকে। এই রকম দুঃসাহস আর একবারও করবেন না।
সাইফ কিছুটা এগিয়ে এসে কাতর মিনতির স্বরে ফিসফিস করলো,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

– আপনাকে একটু দেখি দৃষ্টি? শুধু একটু! এরপর চলে যাবো সত্যি।
দৃষ্টির ভেতর হঠাৎ করেই অজানা এক টানাপোড়েন শুরু হলো। হৃদয়ের অতল গহ্বরে এক গোপন কাঁপন, এক অদৃশ্য মোচড়। কৃষ্ণপল্লব চাহনি আটকে রইলো সাইফের চোখের গভীরে। মনটা ফিসফিস করে বলে উঠলো, “এমন করবেন না শেখ সাহেব… আমি দুর্বল হয়ে পড়ি।” তবু ঠোঁট অবিচল রইলো। কোনো শব্দ উচ্চারিত হলো না। নিজেকে টেনে তুলে নিলো এক কঠিন আবরণে।

সাইফ বুঝে ফেলেছিল সেই অপ্রকাশ্য ভাষাও। হালকা এক রহস্যময় হাসি ফুটলো ঠোঁটে। সে এক পা, দুই পা করে এগিয়ে এলো… দৃষ্টির একেবারে সামনে এসে দাঁড়ালো। দৃষ্টি স্থবির। অনড়। নড়ল না একটুও। এখন তাদের মাঝে শুধু এক নিঃশ্বাসের ব্যবধান। চোখে চোখ রেখে সময়টাকে থমকে দিয়ে সাইফ ধীরে স্পষ্ট উচ্চারণে বললো,
– আপনাকে… একটুখানি ছুঁয়ে দেখি দৃষ্টি?
কোনো শব্দ উচ্চারিত হলো না দৃষ্টির ঠোঁট থেকে। তবু সেই নিরবতায় অস্বীকৃতি ছিল না। চোখে ছিল এক অদ্ভুত সম্মতি, এক অনুচ্চারিত আহ্বান। সাইফ দুহাত তুলে রাখলো দৃষ্টির গালে। তার আঙুলের ছোঁয়া পেতেই বিদ্যুৎপিষ্ট শরীরের মতো কেঁপে উঠলো দৃষ্টি। হঠাৎ কোনো পুরনো ব্যথা ছুঁয়ে গেল মমতায়। সাইফ কণ্ঠে বিস্ময় মেশানো যন্ত্রণার রেখা টেনে বললো,

– আর কতদিন এভাবে নিজেকে কষ্ট দেবেন? আপনার কি ধারণা, আপনি আমার কাছে এলেই আমি বেদনাহত হবো? কষ্ট পাবো?
নীরব, নির্বাক দৃষ্টি। তার স্তব্ধতাই হাজার প্রশ্নের জবাব। সাইফ আবারও বললো,
– আর কতটা করলে আপনি বুঝবেন… আপনি আমার একমাত্র শান্তি? আপনার অস্তিত্বই তো আমার প্রাপ্তির শেষ প্রান্ত। কী করলে আপনি সত্যিই জানবেন আপনি আমার কাছে থাকলেই আমি দুনিয়ার সবচেয়ে সৌভাগ্যবান পুরুষ হয়ে উঠবো? বলুন… আমি তাই করবো। নিজেকে নিঃশেষ করেও যদি আপনার ভুল ধারণাকে ভুল প্রমাণ করতে হয় তবুও আমি তাই করবো।

– আমি তো আপনার সঙ্গে নিজেকে সুখী মনে করি না। আর না… আমি আপনাকে ভালোবাসি। যাকে ভালোবাসি না, তার সাথে কেমন করে বাঁচবো?
শব্দগুলো টলমল করে বেরিয়ে এলো দৃষ্টির ঠোঁট ছুঁয়ে। কণ্ঠে নৈরাশ্যের কম্পন, অথচ চোখে স্পষ্ট দ্বিধার কুয়াশা। সাইফ হেসে উঠলো। চাপা দাঁড়ির ফাঁকে তার খয়েরি ঠোঁট দু’টি আলতোভাবে প্রসারিত হলো, আর সেই হাসির আড়ালে উঁকি দিলো মসৃণ শুভ্র দাঁতের দীপ্তি।
এক ধ্বংসাত্মক মুগ্ধতায় আটকে গেল দৃষ্টি… কয়েক নিঃশ্বাস ধরে অপলক তাকিয়ে রইলো। এই মানুষটিকে অসম্ভব সুন্দর লাগে তার কাছে, অসহনীয়রকম আকর্ষণীয়। সাইফ কি সত্যিই এমন সুদর্শন আর আকর্ষণীয়? নাকি কেবল তারই চোখে, কেবল তারই দৃষ্টিতেই এই লোক এক রহস্যময় সৌন্দর্যের পরাকাষ্ঠা? সাইফ চোখ সরাল না। সেই হাসির রেখা নিয়েই বললো,

– আর কতদিন এভাবে নিজের মনকে শান্তনা দিয়ে যাবেন, দৃষ্টি? কি ভাবেন আমি বুঝি না আপনাকে? আমার চোখের সামনে একটু একটু করে বড় হয়েছেন আপনি। আপনার পায়ের নখ থেকে মাথার একেকটা চুল পর্যন্ত আমার চেনা। আর আপনি… আপনি আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এ কথাগুলো বলছেন? আপনি কি সত্যিই ভাবছেন, আমি এতটাই অচেনা? যে আপনার প্রতিটি অস্বীকারের ভেতরে লুকানো স্বীকারোক্তি আমি টের পাই না?
– আপনি ভুল ভাবছেন!
– আমি কষ্টে ভেঙে পড়বো বলেই তো আপনি দূরে সরে থাকেন.. এটাই কি আমার প্রতি আপনার ভালবাসা নয়, দৃষ্টি?

কথাগুলো ধীরে গলে পড়লো সাইফের ঠোঁট থেকে। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা দৃষ্টির চোখে চোখ রেখে। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাসের মতো ঢোক গিলে ফেললো দৃষ্টি। না না, কিছু নয়। কোনো টান, কোনো টুকরো অনুভব নেই তার ভেতরে। একা, একা সে ভালো আছে… অন্তত নিজেকেই তো সে এমন বুঝিয়ে এসেছে এতদিন।
– আপনার প্রতি আমার কোনো ভালোবাসা নেই… কারো প্রতিই নেই। আমি একাই যথেষ্ট। আমার জীবনে আমি একাই বাঁচতে চাই । চিরকাল একাই থাকবো।

একেকটা শব্দ নিজের বুকেই গেঁথে নিচ্ছিলো সে। সাইফ কিছু বললো না। চোখে এক বিন্দু ওলটপালট না এনেই নিরবে আরেকটু এগিয়ে এলো। তার ঠোঁট গিয়ে থামলো দৃষ্টির নাকের ঢগায়…একটা আলতো চুমু খেলো সেথায়। এরপর আরেকটা.. একটার পর একটা,চোখের পাতায়, কপালে ,গালের রেখায়…মুহুর্তেই দৃষ্টির মুখাবয়ব স্নিগ্ধ প্রেমের পবিত্র জলছবিতে পরিণত হলো ।
স্থির হয়ে গেলো দৃষ্টি। তার সমস্ত শরীর নিথর… নিস্পন্দ। অদ্ভুত এক আবেশে চোখ বুজে ফেললো সে। অশ্রুর দুটি কণা রুদ্ধ কণ্ঠের ভাষা হয়ে গড়িয়ে পড়লো গাল বেয়ে। কিন্তু তা নিচে পড়ার আগেই সেগুলো স্নেহভরে ঠোঁটে চেপে শুষে নিলো সাইফ।

তারপর…দৃষ্টির অনিশ্চিত হাত সাইফের পাঞ্জাবির কোনা মুঠোবন্দী করে ধরলো। সে জানে না সে কী করছে, কী চায়, কোথায় দাঁড়িয়ে আছে। সাইফ ধীরে মাথা সরিয়ে নিয়ে নিজের হাত দু’টি তুলে আনলো।আঙুলের ফাঁক দিয়ে আলতো করে সরিয়ে নিলো দৃষ্টির কপালের ওপর এসে পড়া চুলগুলো। তারপর সযত্নে কানের পাশে গুঁজে দিলো।
– আমি আপনাকে জোর করবো না, দৃষ্টি। আপনার জন্য জনমভর অপেক্ষা করতে পারি আমি। শুধু… আমাকে পাশে থাকতে দিন। এই যে আপনি একা একাই সমস্ত যন্ত্রণা গিলেন, বুকের ভেতর পোড়ান…একা একাই সব কষ্ট উপভোগ করেন, এতে আমার দারুণ হিংসে হয় জানেন? এ দৃশ্য, এই নীরবতা… আমাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দেয়। আপনার কষ্টের ভাগ আমিও চাই, দৃষ্টি। তবে বিনামূল্যে নয়, তার বদলে আমার সমস্ত সুখ, নিঃশেষ আনন্দ আপনার পায়ের কাছে অর্পণ করতে চাই।
দৃষ্টি মাথা তুলে তাকালো। কণ্ঠে একটা বিদ্রূপাত্মক ঝলক,

– কে বললো আপনাকে যে আমি কষ্ট পাই? এই জগতের যাবতীয় সুখের মালিক আমি। আমার আবার কিসের কষ্ট, বলুন তো?
সাইফ একটু ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বললো,
– একটু জড়িয়ে ধরি আপনাকে?
আবারও থমকে গেলো দৃষ্টি। আজ কি হয়ে গেছে লোকটার? সাইফ তো এমন নয়… কখনোই এমন নয়। তবু না বলতে পারছে না দৃষ্টি। মস্তিষ্ক থেকে একশো বার বলছে, ঠেলে দাও, সরিয়ে দাও,কিন্তু হৃদয় তার একবারও সে আদেশ মানলো না।
বারবার একটা প্রশ্ন এসে গুঁতো দিতে লাগলো, স্ত্রী হয়ে এইটুকুনি আবদারও কি সে পূরণে অক্ষম? দৃষ্টি চোখ বন্ধ করে নিলো… আর সেই চুপচাপ সম্মতির ভাষা বুঝেই সাইফ দুহাতে আগলে নিলো তাকে। বুকে জড়িয়ে নিলো তার প্রিয়তমাকে ।

সেই বুকের গভীরে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে উঠলো দৃষ্টি।
নতমুখী কান্নায় ভিজে গেলো সাইফের বুকে কাছের পাঞ্জাবিটুকু। আশ্চর্য! দৃষ্টি ভাবতেই পারছে না, সে আবার কবে থেকে এতটা ভঙ্গুর আর দুর্বল হয়ে উঠেছে? সাইফের চোখেও বোধহয় দু’ফোঁটা অশ্রু ঠিকরে পড়েছিল… তবে সাইফ তা মেনে নিলো না। পুরুষ তো কাঁদে না! অন্তত সমাজের চোখে,কাঁদা তাদের সাজে না…
কয়েক মুহূর্ত, নিঃশ্বাস থামা সেই নিরবতায় দাঁড়িয়ে থাকলো দুজন। দৃষ্টি সাইফের বুকের গভীরে মুখ লুকিয়ে রেখেই ছিল, কিন্তু হঠাৎ মনে পড়লো নিজের সযত্নে গড়ে তোলা প্রাচীর!
মাথা তুললো সে। দুচোখ জলে টলমল, তবু গম্ভীর। সাইফের বুকে এক হালকা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো।পেছনে একধাপ গিয়ে দাঁড়াল সে,তারপর হাত দিয়ে তাড়াতাড়ি চোখ-মুখ মুছে ফেললো, যেন কান্না বলে কিছু কখনও ছিলই না। তারপর সেই অচেনা কাঁপা-কাঁপা কণ্ঠের বদলে চেনা কঠোর স্বর ছুঁড়ে দিলো সাইফের দিকে,

– এখনই বের হন এখান থেকে! নইলে সবাইকে ডেকে এনে এমন এক দোলাই দেবো, আমিও স্মৃতি থেকে মুছে যাবো আপনার!
সাইফ হালকা হেসে বললো,
– গিরগিটিরও এত রঙ পাল্টানোর ক্ষমতা নেই, আপনার যা আছে!
– এক্সকিউজ মি? আমি গিরগিটি?! এক মিনিট দাঁড়ান শেখ সাহেব, এখন আপনাকে আমার আসল রঙ দেখাই!
চোখ দুটো চকচক করে উঠলো দৃষ্টির। পাশের দরজার কোল ঘেঁষে রাখা মোটা লাঠিটা হঠাৎ চোখে পড়তেই সে হুড়মুড়িয়ে গিয়ে সেটা তুলে নিলো হাতে। মুহূর্তেই সেই কোমল মুখ থেকে মুছে গেল আবেগের ছাপ।চোখে এক দৃষ্টে ঝলসে উঠলো বিদ্যুৎ।

– বের হবেন, নাকি পিঠিয়ে বার করবো আপনাকে?
সাইফ চোখের পলকে পরিস্থিতির মর্ম বুঝে ফেললো। লাঠির হুমকি একেবারে নিছক নাটক নয়। এই রমণী সত্যিই কিছু করে ফেলতে পারে। নিজের একটুখানি দুর্বলতা প্রকাশ করে দিয়েছে, সেটা ঢাকার জন্য হলেও আজ সাইফের হাড্ডি ভাঙ্গতে পারে। তাই একটু দূরে সরে গিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করলো সাইফ। ঠিক তখনই দরজায় হালকা কড়া নাড়ার শব্দ। সেই শব্দের ফাঁক গলে বাহির থেকে ভেসে এলো ইমনের চাপা গলা,

– ভাই, বাকি রোমান্স পরে কইরেন। এখন তাড়াতাড়ি বের হন। ধরা পড়লে ইজ্জতের দফারফা হয়ে যাবে।
সাইফের মুখে এক পশলা আতঙ্ক, এক ফোঁটা লজ্জা।
আর ঠিক তখনই দৃষ্টি রক্তচক্ষু নিয়ে এগিয়ে এলো, হাতে মোটা লাঠি। লাঠির ভয়ে হালকা ঘাম নামলো তার কপাল বেয়ে। আর কিছু না ভেবে সাইফ চিটকিনি খুলে হুড়মুড় করে বেরিয়ে গেলো। বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকা ইমনের ওপর গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়লো সে।
ইমন হতবাক! যার নামে পুরো পাড়া কাঁপে, সেই সাইফ কিনা নিজের বউয়ের কাছ থেকে লাঠির ভয়ে পালাচ্ছে? এই দেখে ইমন চোখ কুঁচকে বলেই ফেললো,

– এ যে দেখি বাঘ নয় ভাই, ঘরে ঢুকলেই বিড়াল!
তখনই দৃষ্টি মাথায় আচল টেনে গম্ভীর মুখে সামনে এসে দাঁড়ালো দরজার সামনে। চোখে লেলিহান অগ্নি।
– আর যদি আপনাদের দুজনকে এই বাড়ির আশেপাশেও দেখি, লোক ভাড়া করে মাইর খাওয়াবো…
তা দেখেই ইমন ফিসফিস করে বলে উঠলো,
– ইশ ভাই, আপনার কপাল খারাপ!
সাইফ-ইমনের ফিসফিসানির মাঝে ঘরের অন্ধকার ফুঁড়ে পায়ের ধাক্কায় হেঁটে এলো আরেক বিপর্যয়, মরিয়ম!
ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখ, এলোমেলো চুল, আধাখোলা মুখে হাই তুলে সে বেরিয়ে এলো করিডোরে। তা দেখেই দুজনে থম মেরে গেলো।
দূর থেকেই তাদের ফিসফিস আওয়াজে হঠাৎ করেই মরিয়মের ঘুম ছুটে গেলো। চোখ কুঁচকে তাকালো সামনের দৃশ্যের দিকে। ধোঁয়াশার ভেতর ঝাপসা দুই অবয়ব… মরিয়ম হঠাৎ দু’চোখ বিস্ফারিত করে চিৎকার করে উঠলো,

– চোর! চোর! চোররর!
তার চিৎকারে বাড়ির গায়ে ভূকম্পন নামলো ! দৃষ্টির মুখও ফ্যাকাশে। মরিয়মের গগণ বিদায়ী চিৎকারে নিজেই কিছুক্ষণের জন্য বোকা বনে গেলো। ইমন কিছু না বুঝেই আগেভাগে ছুটে পালিয়ে গেলো। সাইফও দৌড় দিতে গিয়েছিলো, কিন্তু থেমে গেলো হঠাৎ!একবার ফিরে তাকালো দৃষ্টির দিকে। হুট করে আনমনা, হতভম্ব দৃষ্টির গালে বসিয়ে দিলো এক চুমু।
তারপর এক ঝলক হাসি দিয়ে মুহূর্তেই উধাও! দৃষ্টি তাকিয়ে রইলো স্থির চোখে…হতভম্ব, বাকরুদ্ধ, হতাশা আর আশ্চর্যের এক বিশ্রী সংমিশ্রণে। মনে মনে বলতে লাগলো,

– এই লোককে… পরেরবার হাতের কাছে পেলে..মাথাটাই কে/টে ফেলবো।
মরিয়মের হাকডাকে পুরো বাড়ি গমগম করে উঠলো।গেইটের কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল ইশিতা। তার মুখভঙ্গি অতিরিক্ত স্বাভাবিক! কারণ ভালো করেই জানে সে, এই মাঝরাতের দৌড়ঝাঁপের আসল রহস্য। মূলত এই রাত্রিকালীন অভিযানে সহায়ক হয়ে ওঠার কৃতিত্ব তারই। চুপিসারে সাইফ আর ইমনকে ঢুকতে দিয়েছিল সে। আর যখন সে নিজে না থাকে, তখন সাইফের জন্য গেইটের এক্সট্রা চাবিটাও সযত্নে রেখে দেয়।
সাইফ-ইমন যখন মরিয়মের চিৎকারে বের হয়ে আসছিল, তখনই ইশিতা তাদের দ্রুত গেইটের বাইরে পাঠিয়ে দিলো। তারপর গেইট লাগিয়ে নিজেও কিছুই জানে না এমন ভান করে ছুট লাগালো । এদিকে মরিয়ম এখনো উত্তাল।

– চোর! আমি নিজ চোখে চোর দেখছি! দৃষ্টি আম্মার ঘরের সামনে দাঁড়ায়া আছিল!
দৃষ্টি একটু এগিয়ে এসে বললো,
– কি হইছে খালা? এমন গলা ছিঁড়ে ফেলতেছো কেন?
মরিয়ম হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,
– দৃষ্টি আম্মা তোমার দরজার সামনে দাঁড়ায়া আছিলো দুজন মানুষ। আমি নিজ চোখে দেখছি। চোর! নিশ্চিত চোর!
দৃষ্টি আরেকটু সামনে এলো মুখভঙ্গি একেবারে নিরুত্তাপ।
– কই চোর? আমি তো কাউকে দেখিনি। ঘরের বাইরে একটু শব্দ শুনে বের হয়েছিলাম, কিছুই তো পাই নি ।
মরিয়ম চোখ কুঁচকে তাকালো দৃষ্টির দিকে, সন্দেহে ঠোঁট চেপে ধরলো।
– কিন্তু আমি দেখছি… সত্যি বলতাছি…!
উজান ছুটে এলো পূর্বদিকের করিডোর ধরে। যেহেতু তার কক্ষই সবচেয়ে নিকটবর্তী। নিঃশ্বাসে তাড়া, কণ্ঠে উদ্বেগের কম্পন।

– কী হইছে খালা? কোথায় চোর?
মরিয়ম কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠলো,
– আমি নিজ চোখে দেখলাম উজান বাবা, এখানেই ছিলো চোর। এখন কোথায় গেলো আল্লাই জানে!
– চেহারা দেখেছো তুমি?
মরিয়ম হঠাৎ একটু দ্বিধায় পড়ে গেলো…ঝাপসা দেখেছে, ঠিকঠাক মুখ মনে নেই, তবে ঘটনাটা যে ঘটেছে, তাতে সন্দেহ নেই। তার ঠিক পর মুহূর্তেই ইশিতা উঠে এলো সিঁড়ি ভেঙে।

– কোথায় চোর? সবকিছু তো নিখুঁত অবস্থায় আছে। দরজা-জানালা, গেট সবে তালা আঁটা। আমি নিজেই যাচাই করে এলাম। এখন তো মনে হয়, চোর হয়তো মেঘ ছুঁয়ে আকাশপথে গেছে !
ইশিতার কথার মাঝে দৃষ্টি তাকালো তার চোখের গভীরে। শব্দের পেছনে যে ইঙ্গিত তাতে স্পষ্ট, নাটকের সূতা বোনা হয়েছে এখান থেকেই। ইশিতা হঠাৎই এক চোখ টিপে দিলো দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে। ষড়যন্ত্রের অদৃশ্য সিলমোহর বসালো।
দৃষ্টি দীর্ঘ নিঃশ্বাসে স্বস্তি গিলে নিয়ে মরিয়মকে কোমল কণ্ঠে শান্ত করলো, পাঠিয়ে দিলো তার কক্ষে। উজান একবার তাকালো দৃষ্টির দিকে, আবার ইশিতার দিকে। তার চোখে একরাশ সম্ভাব্য সন্দেহের ছায়া। কী বুঝলো সে? কে জানে!

নির্বাক নিস্তব্ধতার বুক চিরে আচমকাই অন্ধকার কক্ষে জ্বলে উঠলো একটি একাকী মোমবাতি। মোমের কম্পমান শিখায় উদ্ভাসিত হলো একজোড়া ঔজ্জ্বল্যে ভরা দন্তপংক্তি। যার বিস্তৃত হাসিতে লুকিয়ে আছে এক মায়াবি বিভীষিকা।
পায়ের শব্দ লুকিয়ে ব্যাক্তিটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো আয়নার সামনে। আয়নার প্রতিবিম্বে সেই মোমের আলোয় ফুটে উঠলো একটি ছবি। তুলে আনা হলো নিঃসাড় হাতে, কোনো প্রেতচিত্র ধারণ করা হলো বাস্তবের ফ্রেমে। ছবির ভেতর সজলের মুখ ঠিকরে উঠছে কুয়াশার মতো উজ্জ্বলতায়। অথচ সেই আলোয় নেমে আছে এক গভীর অভিশাপের ছায়া। ছবির দিকে এক পলক তাকিয়ে মুখটা সামান্য নিচু করে, ঠোঁটের ফাঁকে ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো ব্যাক্তিটি,

– ওপারে খুব খারাপ থেকো! দোয়া করি, যেই যন্ত্রণায় তুমি মরেছো এই দুনিয়ায়, সেই যন্ত্রণা তোমার কাছে যেনো শীতল মনে হয়… কারণ পরপারে হয়তো তুমি জ্বলবে দ্বিগুণ অনলে!
আর ঠিক তখনই, কক্ষ কাঁপিয়ে উঠে এলো তার হাহাকারে ভেজা, বিকৃত উল্লাস। হো হো হো…করে হেসে উঠলো সে। সেই হাহাকার-ভেজা হাসির অভিঘাত এমনই ভয়ানক ছিলো যে, যদি সেখানে কেউ উপস্থিত থাকতো তবে নিশ্চিত তার শ্বাস থেমে যেতো আতঙ্কের নিঃশেষে। সেই হাসি কোনো অশরীরির মতই শুনালো।

কিন্তু হঠাৎই সেই ভয়াবহ অট্টহাস্য নিজের বুকেই গিলে ফেললো ব্যাক্তিটি। চোখদুটি স্থির সজলের ছবির দিকে। ধীরে একপাশে ছবিটি ধরে মোমের শিখা চেপে ধরলো ঠিক তার কিনারায়। প্রথমে আলতো আগুনে গলে উঠলো কাগজের আবরণ, তারপর মুহূর্তেই তা দাউদাউ জ্বলে উঠলো এক নিঃশেষ প্রতিশোধের মহাযজ্ঞে।

মাটির পিঞ্জর পর্ব ১৬

ছবির রেখার সঙ্গেই পুড়ে গেলো কারো অস্তিত্ব। যার নাম ছিলো, সজল। অন্তিম ছাইয়ের উষ্ণতা ব্যাক্তিটি পায়ের নিচে পিষে দিলো নীরবে। আগুনের গর্ভে চাপা পড়ে থাকা শেষ অভিশাপকেও নির্মমভাবে ধ্বংস করলো।
আয়নার সামনে আবারো দাঁড়ালো সে। এইবারের চাহনিতে নিজেকেই খুঁজে পেলো বিভৎস রূপে। এক বিকৃত, বিকলাঙ্গ আত্মার সঙ্গী। ঠোঁটের কোণে টেনে তুললো আরেক দানবীয় হাসি, তারপর এক ফু দিয়ে নিভিয়ে দিলো শেষ আশার আলো,মোমটা। আর মুহূর্তেই কক্ষটা ডুবে গেলো অতল এক অন্ধকারে…

মাটির পিঞ্জর পর্ব ১৮