Home মির্জা সায়ান মুগ্ধ মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ১০

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ১০

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ১০
jannatul firdaus mithila

নিশ্চল মুগ্ধ! বড়সড় দেহটা তার চিৎ হয়ে পড়ে আছে মেঝেতে। চোখদুটো নিবুনিবু, দু’হাত ছড়িয়ে আছে দু’দিকে। একহাতের মুঠোয় এখনো চেপে রেখেছে ব্যবহৃত শূন্য সিরিঞ্জটা। বুকের উঠানামার গতি ক্রমশ কমছে যুবকের, কমছে বাদামী চোখজোড়ার পলক ফেলার ইচ্ছে। ভয়ানক যুবকের এহেন শান্তশিষ্ট ভাবখানা বোধহয় বেশ অবিশ্বাস্য! সে এবার ঘুমোতে চাচ্ছে, বুকের খাঁচায় লুকায়িত অঙ্গটার হুটহাট জ্বালাতন গুলো এখন আর ভাবাচ্ছে না তাকে। মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে ফাঁকা লাগছে তাঁর। একটা সময় চোখদুটোও বন্ধ হয়ে গেল আপনাআপনি। নিঃশ্বাসের গতি বাড়ল বেশ!

ঘুম জড়ানো চোখদুটো কোনরকমে টেনেটুনে খুলছে মাহি। গা টা কেমন ম্যাজম্যাজ করছে। মাথাটা যে কি ভার লাগছে! মনে হচ্ছে পুরো শরীরের তুলনায় আপাতত বোধহয় মাথাটাই বেশ ওজনের। মাহি কাতরাতে কাতরাতে হালকা নড়েচড়ে ওঠে বসার প্রয়াস চালাতেই চোখমুখ কেমন কুঁচকে গেল তার। সর্বাঙ্গ জুড়ে অসহ্য ব্যাথা! আজও গলা দিয়ে স্বর বেরুনোর বালাই নেই। মাহি কিয়তক্ষন থম মেরে পড়ে রইল বিছানায়। পরক্ষণে নিজের সঙ্গে একপ্রকার যুদ্ধ চালিয়ে অবশেষে শোয়া ছেড়ে উঠে বসল। মাথাটার অসৎ ভোতা যন্ত্রনায় কুপোকাত সে। দু’হাতে মাথার দুপাশ সজোরে চেপে ধরে মনে মনে ভাবল — বোধহয় শাওয়ার নিলে কিছুটা হলেও রেহাই পাবে এহেন যন্ত্রণা থেকে। তাই যে-ই ভাবা সে-ই কাজ! সমস্ত শরীরের অসহনীয় ব্যাথা নিয়েই মাহি পা রাখল মেঝেতে। তবে একমুহূর্ত আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে রইল কেমন! গতকাল রাতেই না পুরো মেঝেতে কাঁচের বোতলের চূর্ণবিচূর্ণ টুকরো গুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল? তাহলে এখন পুরো মেঝেটাই ওমন ঝা তকতকে হয়ে গেল কিভাবে? মাহি একমুহূর্ত মৌন থেকে পরক্ষণে নিজেকেই নিজে স্বান্তনা দিয়ে ভাবল — হয়তো মেইডদের মধ্যে থেকে কেউ এসে পরিষ্কার করে গিয়েছে। হয়তো সে ঘুমিয়ে ছিল বিধায় টের পায়নি। মাহি আর ভাবল না, এমনিতেই মাথাভর্তি ভোতা যন্ত্রনা, তারওপর ওমন উটকো ভাবনাচিন্তা! ওতোসব ভেবেচিন্তে তার কি লাভ শুনি? মাহি মুখ বাঁকায় নিজ ভাবনায়। রয়েসয়ে পাদু’টোতে কোনমতে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে এগোয় ওয়াশরুমের দিকে।

গায়ে জড়ানো মোটা সিন্থেটিক কাপড়ের পাজামা – জ্যাকেট, মুখ ঢাকা হসপিটাল মাস্কে! মাথায় কালো ক্যাপ, হাত-পায়ে মোটা মোটা গ্লাভস। বড় বড় স্ট্যান্ড মোপার হাতে নিয়ে ঘষে ঘষে লিভিং রুম পরিষ্কার করে যাচ্ছে পাঁচ’জন পুরুষ মেইড। গায়ে ওতো রক্ষাকবচ থাকলেও প্রত্যেকের বদনখানি কেমন কাঁপছে দেখো! কেননা পায়ের তলায় থাকা কাঁচের মেঝের নিচে আস্ত এক সুইমিংপুল, সেখানকার স্বচ্ছ পানিতে ডুবচ্ছে মাংসাশী হাঙরগুলো। গতকাল একজনকে আস্ত গিলেও এদের সাধ মিটেনি মনে হচ্ছে, ওপরের মানুষগুলোকে দেখে তারা কেমন দাঁত বের করে বাঁকা হাসছে! এটুকু যতবার নজরে পড়ছে ঠিক ততবার গা শুদ্ধ লাঠি-সোঁটা সবটা কাঁপছে বেচারাদের। তবুও তারা অসহায়, র*ক্তা*ক্ত মেঝেটা ঠিকমতো পরিষ্কার না করলে দেখা যাবে তাদেরকেই না আবার হাঙরদের খাবার বানিয়ে দেয়া হয়! লিভিং রুমের লাউঞ্জের একপাশে বুকের কাছে দু’হাত বেঁধে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে সিড। মুখটা কেমন গম্ভীর চিন্তায় নিমজ্জিত বেচারার। চোখদুটো বোধহয় এক জায়গায় স্থির। এরইমধ্যে লিভিং স্পেসে আগমন ঘটে মেইডেনের। অদূরে সিডকে ওমন গম্ভীরভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি খানিক এগিয়ে এসে সিঁড়ি বেয়ে দু’ধাপ নিচে নেমে এলেন। কোনরূপ কথাবার্তা ছাড়া নিঃশব্দে সিডের পাশাপাশি এসে দাঁড়ালেও খেয়াল করলেন সিডের তেমন হেলদোল নেই। মেইডেন ভ্রু গোটালেন, আলতো করে একহাত উঁচিয়ে রাখলেন সিডের কাঁধ বরাবর। এদিকে কাঁধে কারো শীতল স্পর্শ টের পেয়ে হকচকিয়ে ওঠে সিড, ভড়কে তাকায় পাশে। সম্মুখে মেইডেন ইরাকে দেখে ছেলেটা কেমন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল দেখো! চোখবুঁজে ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে আওড়াল,

“ ওহ্ তুমি! আমি আরও ভাবলাম… ”
“ মনস্টার! তাইতো?”
ঠোঁটের আগায় এসে থেমে যাওয়া শব্দটা মেইডেনের মুখ থেকে শুনে স্মিত হাসলো সিড। হালকা ঠোঁট কামড়ে আঙুল উঁচিয়ে সামান্য চুলকে নিলো ললাটের একপাশ। সময় নিয়ে জানালো,
“ হুম ঐ আরকি!”
মধ্যবয়সী মেইডেন কেমন ঠোঁট পিষে হাসলেন মনে হচ্ছে। পাদু’টো হালকা নাড়িয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন পরমুহূর্তে। দু’হাত বুকের কাছে বেঁধে কেমন রহস্যময় কন্ঠে বলতে লাগলেন,
“ ইদানীং মনে হচ্ছে.. মনস্টারকে একটু বেশিই ভয় পাচ্ছো? কই, আগে তো মনস্টারের হিংস্রতায় এতো ভয় পেতে না।”
সিড মৌন রইল কিছুক্ষণ। কর্মরত মেইডদের পানে ঠায় তাকিয়ে থাকতেই হঠাৎ মেইডেনের মুখে শুনল আরেক বাক্য!
“ মেয়েটাকে পছন্দ হয়েছে তাই-না?”
কথাটা শুনতেই পুরো বদন জুড়ে ঝংকার বয়ে গেল সিডের। বুকটা কেঁপে উঠল অজানা ভয়ে। ছেলেটা কেমন ক্ষনে ক্ষনে শুকনো ঢোক গিললো! এদিকে তার এহেন অবস্থা ঠিকই আড়দৃষ্টিতে খেয়াল করলেন মেইডেন। হালকা হেসে আলতো করে সিডের পিঠে হাত রেখে বিজ্ঞের ন্যায় শুধালেন,

“ যাকে একবার মনে ধরেছে, তাকে এতো সহজে হাতছাড়া করতে চাচ্ছো কেনো সিড? আমি তোমার চোখে স্পষ্ট দেখছি মেয়েটার প্রতি অবাধ মায়া।”
শুকনো ঢোক গিললো সিড। ঠোঁট ফাঁক করে নিশ্বাস ফেলছে ক্রমশ। সে মেইডেনের দিকে না তাকিয়েই মোটা হয়ে আসা কন্ঠে বলল,
“ নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি আমাদের কৌতূহল থাকবে এটাই স্বাভাবিক মেইডেন! তাই বলে এই কৌতূহলকে আমি ভালোবাসা কিংবা তারচেয়ে বেশি কিছুর নাম দিতে পারিনা।”
কথাটা বলেই সিড উদ্যোত হলো চলে যেতে। দু-কদম বাড়াতেই পেছন থেকে ভেসে আসে মেইডেনের দৃঢ় কন্ঠ!
“ তাহলে ও কাঁদলে তোমার চোখ থেকে পানি পড়ে কেনো? কাল রাত যখন মনস্টার ওর ওপর নির্মম অত্যাচার করছিল তখন তুমি কক্ষের বাইরে মেঝেতে বসে পাগলামি করছিলে কেন? কেন কাঁদছিলে নিঃশব্দে?”
চলন্ত পাদু’টো থামলো সিডের। শরীরটা একমুহূর্তের জন্য হয়ে গেল অসার। মেইডেন হাসলেন, ধীর কদমে এগিয়ে এসে পাশাপাশি দাঁড়ালেন সিডের। কন্ঠ খাদে নামিয়ে ফের বললেন,
“ যদি ভালোই না বাসো তাহলে রোজ সকালে মেয়েটার ঘরের জানালা দিয়ে ঢুকে, তাকে অনিমেষ চোখে দেখো কেন সিড?”

এবার আর নিজের শক্ত মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারেনি সিড। ছলছল নয়নে ঘাড় বাকিয়ে তাকালো মেইডেনের পানে। সময় নিয়ে ব্যাথিত কন্ঠে বলল,
“ দয়া করে এসব মনস্টারের কানে তুলবেন না মেইডেন। সে আমাকে মেরে ফেললেও আমার কোনো আফসোস নেই কিন্তু আমার জন্য মেয়েটার বিন্দুমাত্র ক্ষতি হোক তা আমি চাই না। তাই প্লিজ!”
মেইডেন একমুহূর্ত নিরব চোখে তাকিয়ে রইলেন কেবল। তার চোখদুটোয় হাজার প্রশ্ন তবে সিডের ওমন করুণ কন্ঠের পিঠে তার প্রশ্ন গুলো আর করা হলোনা। সিড আর দাঁড়ায়নি একমুহূর্তও। তৎক্ষনাৎ নিজের ছলছল চোখদুটো লুকিয়ে প্রস্থান ঘটালো লাউঞ্জ থেকে। ইরা পেছন থেকে চেয়ে রইলেন শুধু। আনমনে বিরবিরিয়ে আওড়ালেন,
“ একজন মেয়েটাকে মে’রে শান্তি পায়, আরেকজন মেয়েটার ব্যাথাগুলো অনুভব করে লুকিয়ে কেঁদে কেটে শান্তি পায়। আশ্চর্য!”

পেন্ট হাউজের বক্সিং ক্লাব! শক্তপোক্ত পাঞ্চের ধুপধাপ শব্দ গুলো যেন পুরো ঘরময় গুঁজছে। দু’হাতে বক্সিং গ্লাভস, উদোম পেটানো শরীরে ঘামের তীব্র উপস্থিতি। একের পর এক জোরালো পাঞ্চের ভারে নুইয়ে যাচ্ছে পাঞ্চিং ব্যাগ। তবুও থামছেনা যুবক। এক অদম্য রূঢ়তায় নিজের সকল রাগগুলো যেন একাধারে মিটিয়ে যাচ্ছে সে। এদিকে ক্লাবের কাঁচের তৈরী দরজাটা দিয়ে মাত্র ঢুকলো এডউইন। চোখেমুখে তার সে-কি উদ্বিগ্নতা! সে গটগটিয়ে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো বক্সিং রিংয়ের সম্মুখে। ব্যগ্র কন্ঠে জানালো,
“ মনস্টার! আমাদের ২টো শিপমেন্ট আঁটকে দেওয়া হয়েছে।”

ব্যস! তক্ষুনি থামলো মুগ্ধের চলন্ত হাত। ঘনঘন নিশ্বাস ফেলে যুবক রয়েসয়ে ঘাড় বাকিয়ে তাকায় একপলক। এডউইন সঙ্গে সঙ্গে তটস্থ হয়ে দাঁড়াল। দেখল মুগ্ধ নামক মনস্টারের কঠিন মুখাবয়ব! সুদর্শন মুখটা কেমন লাল হয়ে আছে! তা আদৌও রাগের বশে না-কি অন্য কারণে কে জানে! তার ঘর্মাক্ত ভেজা চুলগুলো থেকে চুইয়ে পড়ছে ঘামের কণা। ঠোঁটের কোণে আচমকা ফুটে উঠেছে এক চিলতে ক্রুর হাসির রেশ। এডউইন থমকায়। মনস্টারের এহেন ক্রুর হাসিতে গলা শুকিয়ে কাঠ বেচারার। সে খানিক শুকনো ফাঁকা ঢোক গিলে চোখদুটো অন্যত্র সরাতেই খেয়াল করে পাঞ্চিং ব্যাগ থেকে চুইয়ে পড়ছে লাল তরল। এডউইন হতভম্ব! পাঞ্চিং ব্যাগ থেকে হঠাৎ ওসব কি গড়াচ্ছে? ওদিকে তার ভাবনার মাঝেই মুগ্ধ নামক বলিষ্ঠ পুরুষ ততক্ষণে রিংয়ের পানে এগিয়ে এসেছে। ধারালো দাঁতের সাহায্যে একটানে হাতের গ্লাভসগুলো খুলে নিয়ে, পরিশেষে লম্বা লাফে ঝাপ দিয়ে বেরিয়ে এলো রিং থেকে। ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকায় এডউইন। ত্বরিত পিছিয়ে যায় দু-কদম। মুগ্ধ তার পানে কোনরূপ দৃষ্টিপাত করলো না, উল্টো মুখাবয়ব শক্ত রেখে সিনা টানটান করে দাম্ভিকতা বজায় রেখে চলে গেল ক্লাব থেকে। এডউইন তক্ষুনি সুযোগ পেয়ে ছুটে গেল বক্সিং রিং এ। দৌড়ে এসে ব্যগ্র হাতে পাঞ্চিং ব্যাগটা খুলে দিতেই মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল এক ভিনদেশী যুবকের থেঁতলে যাওয়া বিধ্বস্ত শরীর। এডউইন এবার আশ্চর্যের চরম সীমানায় দাঁড়িয়ে! এ ছেলে ঐ গার্ডটা না? যে কি-না গতকাল রাতে সমুদ্রের বর্ডারে মনস্টারের শিপমেন্টটা আঁটকে দিয়েছিল? কিন্তু তাকে মনস্টার কোথায় পেলো? আর তার বলার আগেই মন্সটার এর খবরও পেয়ে গেলো? এডউইন ছেলেটার পানে তাকিয়ে থেকে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলল। নিজ ব্যর্থতার ওপর মহা আফসোস করতে করতে নিজেকেই শুধালো,
“ তোমার আরও ফাস্ট হতে হবে এডউইন!”

জানালার পাশের কাউচে গা এলিয়ে বসে আছে মাহি। মুখাবয়বে তার বিষাদের ছাপ স্পষ্ট! খোলা চুলগুলো বাতাসে উড়ছে রীতিমতো। তার দৃষ্টি আপাতত অদূরের চেরি ব্লসমের বাগানে। বাতাসের মৃদু দুলুনিতে উড়ছে ফুলগুলো, পুরো বাগানের জমিন ছেয়ে গেছে ফুলের সৌন্দর্যে। মাহির মনটা আকুপাকু করছে ওতো সুন্দর বাগানটায় একটু খালি পায়ে হাঁটতে, চেরি ব্লসম ফুলগুলোকে একটুখানি ছুঁইয়ে ছুঁইয়ে দেখতে! তবে মনের ওতোবড় সাধ কী আর সহজে পূরণ হয়? চারপাশে হাজারো দৃষ্টিনন্দিত সৌন্দর্য থাকলেও তার কি আর যাবার সাধ্যি আছে? নিজের এহেন অসহায় পরিস্থিতির কথা মনে পরতেই তাচ্ছিল্যের সাথে হাসল মাহি। কেন যে সে এতো দূর্বল হলো! কেন আরেকটু শক্ত হলোনা নিজের জন্য? কেন পারছেনা ম*রে যেতে? সে যে বড্ড ভীরু! এতোটাই যার দরুন বহুবার ম*র*তে গিয়েও ব্যর্থ হয়েছে প্রতিবার। মাহির বুক চিঁড়ে আচমকাই বেরিয়ে আসে এক দীর্ঘ নিশ্বাস। মস্তিষ্কে চলছে হাজারো কথা, বাড়ির মানুষগুলো এখন কেমন আছে? তারা কী তাকে মনে করছে? আহি কেমন আছে? সে কি এখনো আগের মতো রাগ-গোসসা করে? মাহির বুক ভার হয়ে গেল বাড়ির চিন্তায়। চোখদুটোর কার্নিশ ভরে গেল অশ্রুতে। ঠিক তখনি ঘরের দরজা দিয়ে প্রবেশ করল মিলা। হাতে একখানা বড়সড় ট্রে, সেথায় সাজানো বাহারি ফলের বাহার। মিলা ঘরে ঢুকেই কেমন উচ্ছ্বসিত কন্ঠে আওড়াল,

“ হেই মুনলাইট! দেখো কি এনেছি তোমার জন্য। এগুলো আমাদের বাগানের ফ্রুটস। ভীষণ টেস্টি, একটু খেয়ে দেখো।”
মাহি আশ্চর্য বনে গেল যেন। সে কেমন হতবাক চোখে তাকিয়ে আছে মিলার পানে। মিলা গদগদ হয়ে এগিয়ে আসছে তার দিকে। মুখে কি সুন্দর হাসি! অথচ এক’দিনে মেয়েটাকে একবারও হাসতে দেখেনি মাহি। যতবার দেখেছে ততবারই কেমন তটস্থ থাকত ভয়ে। তবে আজ দেখো, কী প্রানবন্তই না দেখাচ্ছে তাকে! মিলা হাসিহাসি মুখে মাহির পায়ের কাছে এসে বসতে চাইলেই মাহি তক্ষুনি নিজের পাদু’টো গুটিয়ে নিলো। মিলা তেমন গা করলোনা এহেন কান্ডে। ঠোঁটের কোণে চমৎকার হাসি ধরে রেখে হাতের ট্রে টা নামিয়ে রাখল দু’জনার মাঝে। নিজ উদ্যোগে একটা ব্লু বেরি তুলে নিয়ে মাহির পানে এগিয়ে ধরে বলল,
“ নাও! খেয়ে দেখো।”
মাহি হতবাক হয়ে ঠিকই তুলে নিলো ব্লু বেরিটা। এদিকে মিলা তাকে আরেকটু অবাক করে দিয়ে ব্লু বেরি তুলে তুলে মুখে পুরতে লাগল নিজের। গালের পাশে অনন্য স্বাদের ফলটা চিবুতে চিবুতে মাহিকে তাড়া দেখিয়ে বলল,
“ খাচ্ছো না কেনো? খাও খাও, ভীষণ মজা।”
মাহি ওপর নিচ মাথা নাড়ায় হতবুদ্ধির ন্যায়। ধীরে ধীরে ব্লু বেরিটা যেইনা মুখে পুরলো ওমনি সুস্বাদে চোখদুটো আপনাআপনি বন্ধ হয়ে এলো মেয়েটার। মিলা আড়চোখে দেখল সবটা, পরক্ষণে কেমন খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে বলল,

“ খুব মজা তাই না?”
মাহি তৎক্ষনাৎ চোখ খুলল। দৃষ্টি নত রেখে মাথা ঝাঁকাল নিঃশব্দে। মিলা তখন আরও কিছু ফল মাহির পানে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“ এগুলোও টেস্ট করো। দেখবে খুউব ভাল্লাগছে।”
মাহি তা-ই করল। মেয়েটার কথামতো আরও কিছু নাম না জানা সুস্বাদু ফল মুখে পুরলো। এদিকে মিলাও তখন আয়েশে ফল চিবুতে চিবুতে হঠাৎ মাহির উদ্দেশ্যে বলল,
“ নিচে যাবে? চেরি ব্লসম গার্ডেনে?”
কথাটা শুনতেই মাহির অবচেতন মনটা কেমন লাফিয়ে উঠল খুশীতে। তবে নিজস্ব অন্তর্মুখীতায় মত্ত মেয়েটা বাইরে থেকে একদম স্থির। রয়েসয়ে কেবল আওড়াল,
“ আমি গেলে সমস্যা হবে না?”
মিলা গা দুলিয়ে হাসলো কেন যেন। হাসতে হাসতেই বলল,

“ কি সমস্যা হবে বোকা মেয়ে? এখানে থাকা প্রতিটা মানুষ যখন-তখন একটা নির্দিষ্ট গন্ডীর মধ্যে যেখানে খুশি সেখানেই যেতে পারবে। তুমিও চলো আমার সাথে, গেলে দেখবে খুউব ভালো লাগছে। সারাদিন একা একা ঘরে বসে থাকলে থোড়াই মন ভালো থাকবে?”
মিলার কথায় যথার্থ যুক্তি পেয়ে স্মিত হাসলো মাহি। যেভাবে আছে সেভাবেই উদ্যোত হলো নিচে যেতে। মিলা তখন আগ বাড়িয়ে বাঁধ সাধলো মেয়েটাকে। মাহি থামলো, জিজ্ঞাসু চোখে মিলার পানে তাকাতেই মিলা কেমন খিটমিট করে বলে ওঠে,
“ এ অবস্থাতেই যাবে?”
মাহি নিজের পানে তাকায় একপলক। গায়ে জড়ানো কালো একখানা ফ্লোরাল প্রিন্টের গোল ফ্রক, যার দৈর্ঘ্য পায়ের কনুই থেকে দু-আঙুল উঁচুতে। ফ্রকের হাতাগুলো বেশ সুন্দর! ফুলেফেঁপে থাকা মাঝখানে দু-তিনটে ভাঁজ। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে পিঠ ছাড়িয়ে কোনমতে গিয়ে ঠেকেছে কোমরের ওপরে। মাহি অবোধের ন্যায় চোখ তুলে তাকায় একপলক। মন খারাপের সুরে বলে,

“ আমাকে কী খুব খারাপ দেখাচ্ছে?”
মিলা আলতো হেসে মাহির নরম চিবুকে আঙুল ঠেকায় একটুখানি। আদুরে কন্ঠে বলে,
“ মোটেও না! তোমাকে একদম পরীর মতো দেখাচ্ছে। তবে চুলগুলো তোমার বড্ড এলোমেলো! এসো, আমি তোমার চুলগুলো বেঁধে দেই।”
মাহি চটপট রাজি হলো এহেন প্রস্তাবে। ছোট ছোট কদম ফেলে তক্ষুনি গিয়ে বসল মেক-আপ ভেনিটির সামনে। যদিওবা মেয়েটার মেক-আপের প্রতি তেমন কোনো ইন্টারেস্ট নেই কিন্তু মুগ্ধ মহাশয় সেদিন তো গোটা শপিং মলটাই তুলে এনেছেন তার জন্য। সঙ্গে এসব মেক-আপও যুক্ত ছিলো বৈকি!
সম্মুখে বিশাল আয়না! মখমলে ড্রেসিং টুলের ওপর বসে আছে মাহি। তার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে আছে মিলা, মুগ্ধ চোখে মাহির চুলগুলো দেখে যাচ্ছে কেমন। সে নিজের মুগ্ধতা ছাপিয়ে একফাঁকে বলেই বসল,

“ তোমার চুলগুলো কিন্তু খুব সুন্দর মুনলাইট।”
মাহি আলতো হাসল। পুতুলের মতো বসে থেকে জিজ্ঞেস করল,
“ তুমি আমাকে মুনলাইট ডাকছো কেন?”
মিলা হাসিহাসি মুখে মাহির চুলগুলোতে চিরুনী চালাচ্ছে। এরইমধ্যে মাহির করা এহেন প্রশ্নের পিঠে মুচকি হেসে জবাব দিলো,
“ মুনলাইট অর্থ হচ্ছে চাঁদের আলো। আমার চোখে তুমি শুরু থেকেই চাঁদের আলোর মতো নরম, স্নিগ্ধ। তাই আদর করে ডাকনাম দিলাম তোমায়, তোমার কি এ ডাক শুনতে খারাপ লাগছে?”
মাহি তৎক্ষনাৎ মাথা নাড়ায় দু’ধারে। মিলা নিজ কর্মে মহাব্যস্ত। দক্ষ হাতে আঙুল চালাচ্ছে মাহির চুলে। এরইমধ্যে তার হঠাৎ করে কি হলো কে জানে! সে কেমন দোনোমোনো করতে করতে আওড়ায়,

“ মুনলাইট?”
“ হু!”
মাহির ছোট উত্তরে হাত থামায় মিলা। সর্তক দৃষ্টিতে ঘরের দরজার কাছটা এক-আধবার পরোখ করে কেমন ভয়ার্ত ঢোক গিলে বলে ওঠে,
“ একটা কথা বললে শুনবে তুমি?”
মিলার কন্ঠে কিছু একটা ছিলো বোধহয়। মাহি তৎক্ষনাৎ নড়েচড়ে আয়নায় চোখ রাখল। ভ্রু দ্বয়ের মাঝে খানিক ভাঁজ ফেলে সন্দিহান গলায় বলল,
“ কি কথা?”
মিলা তক্ষুনি চুল ছেড়ে দিয়ে মাহির পায়ের কাছে হাঁটু মুড়ে বসল। মাহি হতভম্ব হয়ে গেল এরূপ কান্ডে। মিলার চোখমুখ লাফাচ্ছে ভয়ের চোটে। তার ওমন হুটহাট ভয় পাবার কারণ বোধগম্য হলোনা মাহির। সে কেমন উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল,

“ কি হয়েছে তোমার? তুমি এতো ভয় পাচ্ছো কেনো?”
মিলা রয়েসয়ে ঢোক গিললো। শুকনো হয়ে যাওয়া অধরজোড়া জিভ দিয়ে সামান্য ভিজিয়ে নিয়ে সর্তক কন্ঠে শুধালো,
“ এ বাড়িতে যতদিন থাকবে দয়া করে কাউকে বিশ্বাস করবেনা। কাউকে বলতে কাউকে না! এখানে সবাই সবার শত্রু। তুমি যাকে একমুহূর্তের জন্য আপন ভাববে পরমুহূর্তে দেখবে সে-ই তোমার সবচেয়ে বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানকার মানুষ ছলচাতুরী বোঝে মুনলাইট। তুমি নতুন, নিরীহ! তাই তোমাকে বলছি, যতদিন অব্ধি কোনকিছু নিজের চোখে না দেখবে, নিজ কানে না শুনবে, নিজে উপলব্ধি না করবে, ততদিন অব্ধি কারো মুখের কথা মোটেও বিশ্বাস করবেনা। মনে থাকবে?”
হতবাক মাহি! আশ্চর্যের সাথে শুনলো সবটা। মনের মধ্যে একরাশ প্রশ্ন নিয়ে যেইনা মুখ খুলবে ওমনি কর্ণকুহরে ভেসে এলো মেইডেন ইরার গম্ভীর কন্ঠ!

“ কি হচ্ছে এখানে?”
তৎক্ষনাৎ দরজার কাছে দৃষ্টি ফেলে মাহি। দেখতে পায় — মেইডেন ইরা কেমন সরু চোখে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। অন্যদিকে তার কন্ঠ পেয়েই বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে মিলা। আশ্চর্য হলেও সত্যি মেয়েটার এতক্ষণের হাসি হাসি মুখটায় মুহুর্তেই ছেয়ে গিয়েছে রাজ্যের আধার। শরীর কাঁপছে অজানা ভয়ে। মাহি ঠিক দেখল সবটা। মেইডেন ইরা তখন ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে তাদের নিকট। কিয়তক্ষন বাদেই তিনি এসে দাঁড়ালেন মিলার একদম পাশ ঘেঁষে। অতঃপর বলা নেই কওয়া নেই আচমকা মিলার ডানহাতের কব্জিটা চেপে ধরতেই চোখমুখ কুঁচকে ফেলে মিলা। মেয়েটার মুখ দেখে মনে হচ্ছে তার কব্জিটায় বোধহয় বড্ড পীড়া হচ্ছে এমুহূর্তে। কিন্তু মুখ ফুটছেনা তার! মাহির নজর এড়ায়নি এতকিছু। সে ঠিকই দেখল মিলার নিরব কষ্ট। এদিকে মেইডেন তখন গম্ভীর মুখে মিলাকে বলতে লাগলেন,

“ তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে। বাইরে চলো!”
মিলার না বলার ক্ষমতা নেই। কুঁচকে রাখা চোখ-মুখে সে কেবল মাথা কাত করে সম্মতি জানালো। মেইডেন কেমন হালকা হেসে তাকে নিয়ে প্রস্থান ঘটাতে চাইলেই মাহি চেঁচিয়ে বলল,
“ কিন্তু ও তো এখন আমার সাথে বেরোবে। আমরা নিচের গার্ডেনে যাবো।”
মেইডেন থামলেন। ঘাড় বাকিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন নতমুখী মিলার পানে। হাতের বাঁধনে জোর বাড়ালেন কি-না কে জানে! তবে মিলার চেহারায় ব্যাথাতুর ছাপ স্পষ্ট বাড়ল কেন যেন। মেইডেন কেমন সন্দিগ্ধ গলায় মিলাকে জিজ্ঞেস করলেন,

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৯

“ তাই না-কি মিলা? তুমি গার্ডেনে যাবে?”
নতমুখী মিলা তক্ষুনি ঘাড় নাড়ায় দু’ধারে। নিঃশব্দে জানায় — না। তা দেখে হতবাক মাহি তৎক্ষনাৎ বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। গলায় খানিক সন্দিহান ছাপ ফুটিয়ে বলে ওঠে,
“ কিন্তু কিছুক্ষণ আগে তুমিই তো…”
“ আমি যাবো না মেয়ে। তোমার ইচ্ছে হলে তুমি একা যাও।”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ১১