মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ২০
jannatul firdaus mithila
সেইন্ট পিটার্সবার্গ! আকাশের বুক চিঁড়ে নামছে স্নোফলের গুটি গুটি দানা। রাস্তাঘাটের সবত্র ঢেকে গিয়েছে টাখনু সমান বরফে। গায়ে মোটা জ্যাকেট, পায়ে পরিহিত লম্বা লম্বা ব্যুট জুতো। মাথা ঢেকে আছে মাঙ্কি ক্যাপে, মুখের সামনে ক্যাজুয়াল মাস্ক! গলায় একখানা লাল রঙা মাফলার পেঁচিয়ে এগুচ্ছেন মাইকেল, হাতে একখানা টর্চ লাইট। সুউচ্চ প্যালেসের ঠিক ডানদিকের রাস্তা দিয়ে খানিকটা এগুলেই জঙ্গল। বড় বড় পাইক গাছের জঙ্গলখানা দিনের বেলাতেও যা ভয়ানক! সেখানে সন্ধ্যার ওমন মৃদু অন্ধকারে জঙ্গলটা যে গা হীম ধরিয়ে দেবে যে কারো! ছিমছাম গায়ের গড়নের মধ্যবয়স্ক মাইকেল। চেহারায় এখনো খুব একটা বয়সের ছাপ পড়েনি তার। মানুষটা ভয়ে ভয়ে এগুচ্ছেন সামনে। হাতের টর্চ লাইটটা এতক্ষণ জ্বলতে থাকলেও যেইনা তিনি পা রাখলেন জঙ্গলে, ওমনি লাইটটা কেমন আচমকা বন্ধ হয়ে গেল! চলন্ত পাদু’টো হুট করেই থমকায় মাইকেলের।
চিন্তিত ভয়াল মুখে টর্চ লাইটটা হাতের তালুতে বারবার বারি দিচ্ছেন, তবুও লাইটটা কেন যে জ্বলছে না! মাইকেল ভয়ে তটস্থ, লাইট জ্বালানোর অনবরত চেষ্টায় মত্ত থেকে শুরু করলেন বাইবেল পাঠ। ঠিক তখনি অদূর থেকে ভেসে আসে নেকড়েবাঘদের আর্তনাদ। জঙ্গলের হিং-স্র পশুদের ওমন করুণ চিৎকারে ভয়ে গলা অব্ধি শুকিয়ে গেল মাইকেলের। বেচারা কেমন ক্ষনে ক্ষনে ঢোক গিলে ঘাড় বাকিয়ে এদিক ওদিক তাকালেন। যতদূর চোখ যাচ্ছে ততোদূর শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার। মাইকেলের আর সাহস হলোনা এহেন অন্ধকার মাড়িয়ে সামনে এগুনোর। বেচারা ভয়ে ভয়ে কদম পেছাতেই হঠাৎ কোত্থেকে একজোড়া শক্তপোক্ত হাত এসে পেচিঁয়ে ধরল বেচারাকে। একহাতে আঁকড়ে ধরল মাইকেলের গলা, আরেকহাতের শক্ত থাবায় চেপে ধরেছে বেচারার মুখ। মাইকেল গোঙাচ্ছে! নিজেকে ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টায় মত্ত থেকে হাত-পা ছুড়ঁছে অনবরত। অথচ পেছনের মানুষটা তাকে ছাড়ছেই না! সময়ের স্থায়িত্ব মিনিট খানেক পার হলো বোধহয়, মাইকেলের নিশ্বাস আঁটকে যাবার যোগাড় এপর্যায়ে। বেচারা হাত-পা ছোঁড়ার গতি বাড়াতেই পেছনের মানুষটা নিজ হাতের বাঁধন আলগা করল বুঝি।
মাইকেল খানিকটা সুযোগ পেয়ে তক্ষুনি ছিটকে পড়ল সম্মুখে। দু-হাটুঁ থোকায় থোকায় ঘাসে পরিপূর্ণ জমিনে ঠেকিয়ে, জিভ বার করে শ্বাস নিতে লাগল পাগলের মতো। ইশশ্! আরেকটু হলেই বোধহয় বেচারার প্রাণটা বেরিয়ে আসতো দেহ ছেড়ে। বেচারা একদিকে হাঁপাতে ব্যস্ত, অন্যদিকে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা কালো হুডি পড়া ব্যক্তিটি আলগোছে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো মাইকেলের মুখোমুখি। একজোড়া কালো ব্যুট পরিহিত পা বরাবর নজর পড়ল মাইকেলের। সে খানিকটা সময় নিয়ে ঘাড় উঁচিয়ে তাকাল। সফেদ রঙা প্লাস্টিকের ভুতের মুখোশ পড়ুয়া ব্যক্তিটি তার পানেই তাকিয়ে আছে বোধহয়। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, তাকে দেখে মোটেও অবাক হয়নি মাইকেল। উল্টো কন্ঠে একরাশ চিন্তা ঢেলে বলল,
“ আবারও কেনো ডাকলে আমায়? তুমি দেখছো না? চারপাশের পরিস্থিতি যে কতোটা গরম। ভালো হবে যদি আমরা এক’দিন এসব কাজ-কর্ম থেকে দূরে সরে থাকি।”
মুখোশ পরিহিত ব্যক্তি রা করল না তেমন। খানিকক্ষণ নিজের গ্লাভস পরা বা-হাত দিয়ে ঘাড়টা হালকা চুলকিয়ে, ঘাড় কাত করে রাখল। মাইকেল অন্ধকারে খুব একটা ঠাউর করতে পারলোনা উপস্থিত ব্যক্তিটির হাবভাব। ওদিকে মুখোশধারী নাক ফোলাচ্ছে! রাগে কটমট করতে করতে আচমকা ঝুঁকে এসে চেপে ধরে মাইকেলের কন্ঠা! মাইকেল ভড়কায়। ত্বরিত নিজের কন্ঠা ছাড়াতে চেয়ে চাপা স্বরে আর্তনাদ করে বলল,
“ ছাড়ো আমায়! ভুলে যেও না, আমি মরে গেলে তোমার সব খেল খতম। কেননা পেনড্রাইভ কোথায় আছে সেটা কেবল আমি-ই জানি!”
তৎক্ষনাৎ মাইকেলের কন্ঠায় চেপে রাখা হাতটা কেমন আলগা হয়ে গেল মনে হচ্ছে। এই সুযোগে মাইকেল নড়েচড়ে উঠল, দু’হাতে তক্ষুনি সজোরে ধাক্কা দিয়ে বসল মুখোশধারীর বুক বরাবর। এহেন অতর্কিত আক্রমণের তাল সামলাতে না পেরে মুখোশধারী গিয়ে উল্টে পড়ল পেছনে। মাইকেল এবার তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ায়। দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে আওড়ায়,
“ কথায় কথায় গলা চেপে ধরার বদঅভ্যেস বাদ দিন। ভুলে যাবেন না, আ’ম নট ইউর টয়। মনস্টারের গুহায় ঢুকে তারই নাকের নিচ থেকে প্রমাণাদি সংগ্রহ করা ইজ আ নট আ পিস অফ কেক। আপনার এতো তাড়া থাকলে আপনি নিজে যান না! ঐ সাইকির চোখ এড়িয়ে ঢুকুন গিয়ে মাদ্যেনা হাউজে। ওতো শক্তিশালী সিকিউরিটিস ডিঙিয়ে একবার যদি ভুলক্রমে ঢুকেও যান, তবে এটুকু গ্যারান্টী দিয়ে বলতে পারি — আপনার ফেরত আসা অসম্ভব! তাই বলছি ধৈর্য্য ধরুন। মেইডেন এবং সিডের মতো নির্মম পরিণতি না চাইলে ব্রেন খাটাতে শিখুন।”
মুখোশধারী মনোযোগ দিয়ে শুনল কেবল। ঠিকই তো বলেছে মাইকেল। মনস্টারের নাকের নিচ দিয়ে পার হওয়া কী আর চাট্টিখানি কথা?
নির্ধারিত সময় ২৪ ঘন্টা পার হতে চললো। আতঙ্কে শুকিয়ে কাঠ ডাক্তাররা। পেশেন্টের এখনো জ্ঞান ফিরেনি। আদৌও ফিরবে কি-না তার নিশ্চয়তা ৫০%। ডাক্তারদের ভয়ের শেষ নেই এখন! বেচারারা এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছেন লুকোতে। কেউ কেউ ইতোমধ্যেই গিয়ে লুকিয়েছে বড়সড় বিছানার নিচে। তো আবার কেউ গিয়ে গা ঢাকা দিয়ে বসেছে ওয়াশরুমে। মিয়ান দৌড়ে গিয়েছেন কাভার্ডের দিকে। কাভার্ডের একপাশে বেশ জায়গা! ছিমছাম গায়ের গড়নের মিয়ান বেশ সুন্দর মতো গা লুকোলো সেথায়। ওদিকে দামড়া ভুঁড়িওয়ালা দামিয়ান কেমন বাঁদরের মতো লাফাচ্ছে। বেচারাকে কেউই একটু জায়গা দিচ্ছে না লুকোতে। যতবার বেচারা কোথাও লুকোতে চাচ্ছে ঠিক ততোবার সবাই তাকে দূরদূর করছে। কেননা দামিয়ানের আবার বড্ড বায়ুদূষণ করার স্বভাব। অতিরিক্ত নার্ভাসনেসে বেচারা প্রায়শই এহেন উদ্ভট কাজকর্ম করে বসে। তাই আর তাকে নিয়ে লুকোনোর দুঃসাধ্য কেউ দেখালো না।
দামিয়ান বেচারা বড্ড অসহায় এপর্যায়ে। আজ বিপদে পড়ে মানুষ চিনলো সে। কোথাও একটু জায়গা দিলো না কেউ! বেচারা মনোকষ্টে পা বাড়ালো কাভার্ডের দিকে। কাভার্ডের দরজা আটকানো, দামিয়ান ত্রস্ত এগিয়ে এসে চট করে ঢুকে পড়ল কাভার্ডের আরেক পাশে। পাশেই জড়সড় ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মিয়ান। মুখ লুকিয়ে রাখা কাপড়ের আড়ালে। তন্মধ্যে বিশালাকার কাভার্ডটা হুট করে খানিকটা দুলে উঠতেই ভ্রু গোটায় মিয়ান। ত্বরিত ঘাড় বাকিয়ে তাকায় পাশে। মুহুর্তেই চোখাচোখি হলো দামিয়ানের সঙ্গে। বেচারা দামিয়ান ভেতরে ঢুকলেও তার বড়সড় বেয়াদব পেটটার জন্য কাভার্ডের দরজা আটকাচ্ছে না। তা নিয়ে দামিয়ানের আফসোসের শেষ নেই! বেচারা বুঝি এই প্রথম নিজের ভুঁড়ি নিয়ে ওতো প্যারা খাচ্ছে। ওদিকে মিয়ান হঠাৎ চিড়বিড়িয়ে উঠল তার কান্ড দেখে,
“ হোয়াট দা ফা*ক আর ইউ ডুয়িং হেয়ার? ম’রার জন্য আর কোনো জায়গা পাওনি? শেষমেশ আমার কাছে এসেই মরতে হলো তোমার?”
এমনিতেই পেটের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ দামিয়ান তারওপর মিয়ানের ওমন ঠেস মারা বাক্য! আগুনে বোধহয় ঘি পড়ল খানিকটা। দামিয়ান নিজেও তৎক্ষনাৎ দাঁত খিঁচে আওড়াল,
“ হ্যাঁ এখানেই মরব! তোমাকে সঙ্গে করে নিয়েই মরব। একা একা ম’রে কী লাভ?”
দাঁত কিড়মিড়িয়ে ওঠে মিয়ান। মুখ খুলে দু-চারটে শক্ত কথা আওড়াতে গিয়েও হঠাৎ থেমে গেল কেন যেন। তক্ষুনি অন্যত্র মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়ালো। এদিকে দামিয়ান এতক্ষণে কোনরকমে দরজাটা আটকালো। বুক ফুলিয়ে মোটা পেটটাকে কোনমতে খানিকটা চুপসে নিয়েছে বেচারা! এহেন অব্যর্থ চেষ্টায় বেচারার ফর্সা মুখখানা কেমন লাল হয়েছে দেখো। সে আর পারছেনা নিজেকে আটকাতে। পেটটা হঠাৎ গুড়গুড় শব্দ তুলছে। বোধহয় এক্ষুণি উদ্ভট কাজটা হয়ে যাবে তার দ্বারা। দামিয়ান জোর করে আঁটকে রাখল বায়ুদূষণ। তবে এসব কী আর বাঁধ মানে? ঠিকই সেকেন্ড ত্রিশেকের অতিরিক্ত চাপের ফলে এক বিকট শব্দে বায়ুদূষণ ঘটল। এহেন তীব্র শব্দে হকচকিয়ে ওঠে মিয়ান! ঘাড় বাকিয়ে তাকাতে না তাকাতেই মাত্রাতিরিক্ত দুর্গন্ধে গা গুলিয়ে উঠল বেচারার। আবদ্ধ জায়গা হওয়াতে দুর্গন্ধের তীব্রতা বেড়েছে বহুগুণ। মিয়ান তৎক্ষনাৎ নিজের নাকমুখ চেপে ধরে কাপড় দিয়ে। এতেও বুঝি লাভের লাভ হলোনা! গন্ধ একদম তরতর করে নাকের ছিদ্র দিয়ে ঢুকছে তার। মিয়ানের ভাব ধরেছে বমি করার। নাকমুখ চেপে রেখেই আগুন চোখে তাকালো দামিয়ানের দিকে। অতঃপর কঠিন কন্ঠে আওড়াল,
“ হোয়াট দা ফা*ক ইউ হেভ ডান ইডিয়ট? কয়দিনের বাসি পচা খাবার গিলেছো তুমি? কতবার করে বলেছি জলহস্তির মতো গপাগপ করে খাবার গিলতে না। ডাক্তার হয়েও জলহস্তির মতো শরীর ইডিয়টের! এই বের হও এখান থেকে।”
দামিয়ান কাচুমাচু করছে! পাশ থেকে মিয়ান তখন রাগে গজগজ করছে। বেচারা হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে তক্ষুনি দামিয়ানের ঘাড় ধরে তাকে বাইরে ছুড়ে ফেলল। অতঃপর পেছন থেকে নিজেও বাইরে এসে খোলা বাতাসে বুকভরে নিশ্বাস টেনে ধীরে ধীরে আওড়াল,
“ হলি শিট!”
দামিয়ান চিবুক নামিয়েছে গলার কাছে। লোকটা বোধহয় লজ্জা পেয়েছে বেশ! কিয়তক্ষন পার হতেই মিয়ান তার পানে ঘুরে তাকায়। দাঁত খিঁচে কিছু একটা বলতেই যাবে ওমনি তার দৃষ্টি আটকালো কক্ষের দরজার দিকে। এডউইন নামক গম্ভীর পুরুষ গটগটিয়ে ঢুকছে। তার পিছুপিছু একদল সশস্ত্র গার্ডস। মিয়ানের কলিজা শুকিয়ে গেল বোধহয়। এবার কোথায় লুকোবে সে? কিভাবে বাঁচবে এদের হাত থেকে? মেয়েটার তো এখনো জ্ঞান ফেরেনি। মিয়ান শুকনো ফাঁকা ঢোক গিলে কয়েক-কদম পেছাতেই গার্ডস এসে ধরে ফেলল তাকে। এডউইন গম্ভীর মুখে একবার নজর বুলালো শয্যাশায়ী মাহির পানে। মেয়েটাকে এখন অব্দি অচেতন দেখে দীর্ঘ নিশ্বাস বেরুলো তার বুক চিঁড়ে। সে কেমন কঠিন গলায় আওড়াল,
“ আপনাদের সময় শেষ! মনস্টারের ডাক এসেছে এবার। চলুন!”
হকচকিয়ে ওঠে সবাই। দামিয়ান ফের কান্না জুড়েছে বাচ্চাদের ন্যায়। আকুতি জানাচ্ছে — না মা-রার। এডউইন সেসব কানেও তুললো না বোধহয়। ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক-ওদিক দৃষ্টি ফেলে গলা উঁচিয়ে হুংকার ছুঁড়ল,
“ নেক্সট ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যে যে যেখানে আছেন সেখান থেকে বেরিয়ে না এলে, কপালে শনি লাগবে সবার। মাইন্ড ইট।”
এহেন হুমকিতে গাকাঁটা দিয়ে উঠল বাদবাকিদের। কেউই নড়চড় করল না তেমন। দামিয়ান এবার দুষ্ট বুদ্ধি আটঁল। তক্ষুনি এডউইনকে জানালো,
“ কয়েকজন খাটের তলায় লুকিয়েছে, আর কয়েকজন ওয়াশরুমে। কেউ কেউ লুকিয়েছে বুকশেলফের পেছনে।”
এহেন কথা কর্ণপাত হওয়া মাত্রই গার্ডস ছুটলো সেদিকে। মিয়ান কেমন দাঁত কিড়মিড় করে তাকিয়ে আছে দামিয়ানের পানে। দামিয়ান আড়দৃষ্টিতে দেখল তা। লোকটা কেমন মুখ বাঁকালো দেখো! তার ভাব এমন — মরলে আমি একা মরব কেন? সবাইকে নিয়ে মরব।
দু-হাটুঁ গেঁড়ে রাখা মেঝেতে, হাতদুটো টেনে কোমরের কাছে বাঁধা। মুখমন্ডল ঢাকা কালো কাপড় দিয়ে! একসাথে সারিবদ্ধভাবে বসে আছে ৩৫জন ডাক্তার। মানুষগুলো কাঁপছে ভীষণ। মুখ বরাবর টেপ লাগিয়ে রাখা বিধায় সামান্যতম কথাও বেরুচ্ছে না তাদের মুখ দিয়ে। সম্মুখের বিশাল চেয়ারে বসে আছে মনস্টার। দু’হাতে দুটো রিভলবার। গায়ে জড়ানো পাতলা ফিনফিনে একখানা কালো রঙা শার্ট। তাও আবার সবগুলো বোতাম খোলা! বোধহয় নিজের শক্তপোক্ত পেটানো দেহখানা দেখানোর অভিনব কৌশল এঁটেছেন তিনি। পরনের কালো রঙা গ্যাবাইডিন প্যান্টটা নেমে এসেছে নাভীর বেশ নিচে। সেদিকে অবশ্য ওতো পাত্তা নেই যুবকের। একহাতের রিভলবার নামিয়ে রেখে পাশ থেকে রা’মের বোতল তুলেছে হাতে। আঙুলের ভাঁজে গুঁজেছে জ্বলন্ত সিগার। সে কেমন ব্যাপক আয়েশে একটু একটু করে চুমুক বসাচ্ছে বোতলের সরু ডগায়। গলার তীব্র সৌন্দর্যমন্ডিত এডামস অ্যাপেলটা কী সুন্দর নৃত্য তুলছে প্রতিটা ঢোক গেলার তালে তালে। বার দুয়েক টানও বসিয়েছে সিগারে। নিজেকে বড্ড প্রশমিত করে যুবক এবার উদ্যোত হলো গান পয়েন্ট করতে। প্রথমেই রিভলবারের সরু লৌহ নল গিয়ে ঠেকলো মিয়ানের ললাট বরাবর। মিয়ান কেঁপে উঠল যেন। দু-চোখ বুঁজে নিয়ে শান্ত হলো নিজে নিজে। বারেবারে কল্পনা করতে লাগলো ছোট বেলার স্মৃতিগুলো।
অন্যদিকে, এডউইন গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে মাহির চিকিৎসাধীন কক্ষে। চোখদুটো নিষ্প্রাণ তার! মুখটা কেমন অন্ধকারে নিমজ্জিত। তার দৃষ্টি কেবল মাহির পায়ের কাছে নিবদ্ধ। মেয়েটার মুখপানে তাকানোর দুঃসাহস নেই তার। সে একদৃষ্টিতে মেয়েটার পায়ের দিকে তাকিয়ে থেকে ক্ষুদ্র নিশ্বাস ফেলে আওড়াল,
“ এটুকু বয়সেই আপনি গোটা অর্ধশত মানুষদের মৃত্যুর কারণ হয়েছেন! অথচ তা কী আপনি আদৌও জানেন?”
এডউইন বলতে বলতেই দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলল। দৃষ্টিটা খানিক সরাতেই হঠাৎ থমকে দাঁড়াল কেন যেন! এইমাত্র সে কী দেখল? মেয়েটার পাদু’টো কী নড়ল? এডউইন ত্রস্ত নজর ঠেকালো মাহির পায়ের দিকে। নিখাঁদ চোখে কিয়তক্ষন তাকিয়ে থাকতেই ফের দেখল মাহির পা জোড়ার অবাধ নড়চড়। সে ত্বরিত বিস্ফোরিত দৃষ্টি উচিঁয়ে আনল মাহির মুখের দিকে। মেয়েটার ফ্যাকাশে ঠোঁট দুটো কাঁপছে! কপালের চামড়ায় ভাঁজ পড়েছে বেশ। এডউইন তক্ষুনি ছুট লাগালো কক্ষের বাইরে। হন্তদন্ত পায়ে দৌড়ে যেতে লাগল প্রশস্ত করিডর দিয়ে। মার্বেলের মেঝেতে দৌড়াতে গিয়ে বারকয়েক হোঁচট খেতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিলো কোনমতে। এক্ষুনি মনস্টারের কাছে যেতে হবে তার। জানাতে হবে — মেয়েটার জ্ঞান ফিরছে! নাহলে যে নির্দোষ ডাক্তারগুলো অকালে ম’রবে।
তখন মিয়ানের কপাল বরাবর রিভলবার ঠেকালেও শ্যুট করেনি মনস্টার। কেননা পাশেই দামিয়ান নড়চড় করছিল বেশ। মনস্টারের মন বদলালো। সে পা ঘুরিয়ে এসে দাঁড়ালো দামিয়ানের সম্মুখে। অতঃপর রিভলবার ঠেকালো বেচারার মাথার তালু বরাবর। দামিয়ান এমনিতেই ভয়ে জড়সড় তারওপর কপাল বরাবর রিভলবারের ছোঁয়া পেয়ে লোকটা কেমন গোঙাচ্ছে। রীতিমতো বসে থেকে লাফাচ্ছে! মনস্টার নিজের ঠোটেঁর ফাঁকে গুঁজে রাখা সিগারে লম্বা টান বসিয়ে যেইনা ট্রিগার চাপবে ওমনি সেলের মধ্যে হন্তদন্ত পায়ে প্রবেশ করে এডউইন। এসেই আগে চিৎকার দিয়ে বলে ওঠে,
“ মনস্তার! শি ইজ রেসপন্সিং নাউ।”
মুহুর্তেই থামল নির্দয় মানবের কর্মকাণ্ড। রিভলবারের ট্রিগার থেকে বেরিয়ে গেল আঙুল। ঘাড়টা সামান্য কাত করে সে কেমন ক্রুর চাহনি নিক্ষেপ করল এডউইনের দিকে। গমগমে গলায় স্রেফ শুধালো,
“ ইজ ইট?”
এডউইন লম্বা লম্বা নিশ্বাস টানছে। তবুও কোনমতে মাথা দুলিয়ে বলে ওঠে,
“ ইয়েস মনস্তার।”
আচমকাই নির্দয় মানবের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে বাঁকা হাসির রেশ। দামিয়ানের মাথা বরাবর চেপে রাখা রিভলবারটা সরিয়ে এনে, নিজের ঘাড় চুলকালো তার নল দিয়ে। রয়েসয়ে ভারী কন্ঠে আওড়াল,
“ দ্যাটস ইট!”
আবদ্ধ সেলের মধ্যে নিজেদের আবিষ্কার করে ভারী চমকালেন সবাই। চারিদিকে কেমন মৃদু অন্ধকার ভাবসাব। এডউইন সবার হাতে একটা করে ছোট ঔষধ দিয়ে যাচ্ছে! ডক্টররা খানিক ভ্রু গোটালেন ঔষধ দেখে। তাদের আবার ঔষধ দেওয়া হচ্ছে কেনো? এটা আবার কিসের ঔষধ? মিয়ান নিজের উপচে পড়া কৌতূহল দমিয়ে রাখলেও দামিয়ান বড্ড পটপট করা মানুষ। তক্ষুনি সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ এটা কিসের ঔষধ? আর আমাদেরকেই বা দেওয়া হচ্ছে কেনো?”
এডউইন প্রতিত্তোরে মৌন রইল। সবাইকে একে একে ঔষধ দিয়ে আদেশ ছুড়ঁল,
“ হেভ ইট!”
ভড়কালেন সবাই! হতভম্বের ন্যায় একে-অপরের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন কয়েকজন। দামিয়ান ফের ভ্রু-দ্বয় কুঁচকে জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ কিসের ঔষধ সেটা আগে বলুন! না বললে খাচ্ছি না আমি।”
কথাটা শেষ হওয়া মাত্রই দামিয়ানের ফোলা ফোলা গাল বরাবর সপাটে বসল এক চড়! সে-ই চড়ের শব্দে ভোঁ ভোঁ করে বাজতে লাগল তার কান। বেচারা দামিয়ান তক্ষুনি হাত দিয়ে চেপে ধরে নিজের বাকিয়ে রাখা গাল। কিয়তক্ষন বাদেই কর্ণকুহরে ভেসে আসে এডউইনের কটমট কন্ঠ!
“ হয় ঔষধ খাবেন নয়তো গুলি! যেকোনো একটা তো খেতেই হবে। নাউ চয়েজ ইজ ইউরস।”
শুকনো ঢোক গিললো সবাই। তৎক্ষনাৎ এক সেকেন্ডও দেরি না করে পানি ছাড়াই গিলে নিলো ঔষধটা। দামিয়ানও মুখে পুরলো ঔষধখানা। অতঃপর সবটা শান্ত! মিনিট পাঁচেক পেরুতেই প্রতিটি ডক্টর কেমন দুলতে লাগলো ঘুমের ত্রাসে। কেউ কেউ ঢুলে পড়ল মেঝেতে। নাক টানার শব্দও ভেসে আসছে কারো কারো কাছ থেকে। সবাই যখন ঘুমে বুদ হয়েছে ঠিক তখনি বাঁকা হাসে এডউইন। প্যান্টের পকেটে দু’হাত গুঁজে, গলা উঁচিয়ে সেলের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডদের আদেশ ছুড়েঁ বলে ওঠে,
“ টেক দেম এওয়ে! দে’র টু ডে’স মেমোরি ইজ কমপ্লিটলি ডিসট্রয়েড নাউ।”
কথাটা ব’লে আর একমুহূর্তও দাঁড়ালো না এডউইন। তক্ষুনি গটগট পায়ে বেরিয়ে গেল সেল থেকে। এদিকে সে যেতেই গার্ডস এগিয়ে এসে, একে একে প্রতিটি ডক্টরকে কাঁধে তুলে নেয়। এদের এবার নিয়ে যাওয়া হবে বিমানে। ফের দিয়ে আসা হবে তাদের আস্তানায়।
মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ১৯
বিমানের প্রশস্ত সিটে বসিয়ে রাখা হয়েছে ডাক্তারদের। গায়ে কেবল সিট বেল্ট লাগানো। গার্ডরা বসে আছে সম্মুখের সিটগুলোয়। বিমানের একদম শেষের সিটগুলোর একটায় বসে আছে দামিয়ান। আচমকাই চোখ খুলল মধ্যবয়স্ক! তক্ষুনি জিভ উল্টে মুখ থেকে ঔষধখানা বের করে গুঁজে নিলেন নিজ শার্টের পকেটে। তখন ঔষধটা স্রেফ জিভের তলায় রেখেছিলেন তিনি। ভাগ্যিস গিলেননি! গিললো থোড়াই শুনতে পেতো ওতোসব কথা? দামিয়ান কেমন ক্রুর হাসলো। সিটের গায়ে মাথা এলিয়ে মনে মনে বলল,
“ দ্যা শ্যাডো মনস্তার! আপনারও তবে দূর্বলতা আছে!”
