মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪৬
jannatul firdaus mithila
“ তোকে মা-রার চেয়ে, ম’রা সহজ পিচ্চি!”
শক্ত ঢোক গিলতেই চোখদুটো আলতো করে বুঁজে এসেছে রূঢ় মানবের। রিভলবারের সরু ছিদ্রে প্রবেশ করেছে তার রুক্ষ তর্জনী! ধীরে ধীরে বাকঁ নিচ্ছে আঙুলের নরম হাড়। নির্দয় মানবের হৃৎস্পন্দনের গতি হয়েছে জোরালো! শ্যুট এই হলো বলে, আর ওমনি একখানা নরম তুলতুলে হাত এসে আচানক আঁকড়ে ধরল রূঢ় মানবের রুক্ষ হাত! তৎক্ষনাৎ থমকায় মুগ্ধ। ট্রিগারের সরু ছিদ্র হতে আঙুলখানা তার সরে গেল মুহুর্তেই। বলিষ্ঠ দেহখানা খানিক স্থির হতেই যুবকের কর্ণকুহরে ভেসে এলো সপ্তদশীর উঁচাটন ভরা কন্ঠ!
“ আরেহ! এ কি করছেন আপনি? মাথার পাশে বন্দুক ঠেকিয়ে রেখেছেন কেন?”
সপ্তদশীর এহেন হুটহাট ভড়কান কন্ঠে আলগোছে অক্ষিপুটের পর্দা সরালো মুগ্ধ। দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা অনলে এক পশলা বৃষ্টি নামার ন্যায়, মুহুর্তেই স্থবির হলো তার সকল ভঙ্গুরতা! কাঁধদুটোতে ভর করল একরাশ বাধ্যতা। যুবক কেমন বাধ্য বালকের ন্যায় তক্ষুনি নিজ মাথার পাশ থেকে ব-ন্দুকখানা নামিয়ে এনে আলগোছে রাখল মেঝেতে। অতঃপর মুখাবয়বে একরাশ তুষ্টি নিয়ে ঘাড় বাকিয়ে পেছনে তাকাতেই খানিক ঝটকা খেল নির্দয় মাফিয়া বিস্ট। সম্মুখেই উদ্বেগ নিয়ে বসে আছে সপ্তদশী। তার অর্ধ উম্মুক্ত নারী কায়া যেন চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে রূঢ় মানবের! মাখনের ন্যায় মসৃণ বদনে কেবল আঁটসাঁট হয়ে আঁটকে আছে একখানা কালো রঙা অন্তর্বাস! হুটহাট ঘুম ভেঙে উঠে বসায় তার গায়ের একপাশ উম্মুক্ত! সেখান হতে সরে গিয়েছে ব্ল্যাঙ্কেটের আবরণ। অথচ বোকা মানবীর সেদিকে থোড়াই খেয়াল আছে! সে-তো উদ্বিগ্ন। চোখদুটোতে একরাশ চিন্তার ছাপ ফুটিয়ে, কপাল কুঁচকে চেয়ে আছে মানবের পানে। এদিকে নির্দয় মাফিয়া বিস্ট থমকেছে! নিজ বেহায়া চোখদুটোকে বড্ড টানাহেঁচড়া করছে যুবক। সরাতে চাইছে অন্যত্র। অথচ কান্ড দেখো! বেহায়া চোখদুটো যেন আজ বড্ড অবাধ্য। সে স্পষ্ট টের পাচ্ছে তার কন্ঠায় খরা নেমেছে। সিক্ত জিভখানা এক্ষুণি বেরিয়ে এসে অধর ভেজাতে চাইছে। তবে রূঢ় মানবের বিচক্ষণ মস্তিষ্ক তা মানতে নারাজ। সে উল্টো মস্তিষ্কের প্রতিটি নিউরনে অনুরণন তুলেছে —
“ চোখ নামা শালা বেলাজা! ওকে ওভাবে চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছিস কেনো? লজ্জা নেই তোর? ছিহঃ!!!”
তক্ষুনি ধ্যানের ডোরে আকস্মিক চিড়ঁ ধরল রূঢ় মানবের। সম্বিৎ ফিরে পেয়েই সঙ্গে সঙ্গে পাষণ্ডের ন্যায় নিজের ওমন বেহায়াপনাটুকু ধামাচাপা দিয়ে বসলেন অন্তরের এককোণে। অতঃপর বিরক্তিতে কপাল গুছিয়ে তক্ষুনি ঘাড় নামিয়ে আনলেন মাফিয়া মনস্টার। মুখাবয়ব জুড়ে এতক্ষণের হিমশীতল ভাবস্রোতটুকু মুহুর্তেই হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে, সেথায় এবার ভর করালেন এক আকাশসম বিরক্তির ঝাঁঝ! তিতিবিরক্তিতায় চোখদুটো খিঁচে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে ঝাঝাঁল গলায় আওড়াল,
“ হোয়াট দ্য ফা’ক আর ইউ্য ডুয়িং বান্দীর মেয়ে? মুখ ছাড়া অন্যকিছু দেখাতে বলেছে কে তোকে? উফফ! এক্ষুণি গা ঢাক নির্লজ্জ মেয়েছেলে!”
বোকার ন্যায় হতবিহ্বলতায় ডুব দিলো মাহি। তন্দ্রার রেশ এখনো পুরোপুরি কাটেনি তার। তাইতো নড়বড়ে মস্তিষ্ক তৎক্ষনাৎ ধরতে পারেনি রূঢ় মানবের আওড়ানো বাক্যের গভীরতার্থ। সে কেমন ঘুম ঘুম চোখে আনমনে ঘাড় নামিয়ে তাকাল নিজের পানে। আর ওমনি একদফা ঝটকা খেল বেচারি! হতবুদ্ধির ন্যায় বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে বদন পানে তাকিয়ে রইল কেবল। তবে পরমুহূর্তে মস্তিষ্ক সজাগ হতেই মেয়েটা কেমন চেঁচিয়ে উঠল ঘর কাপিয়ে। তড়িঘড়ি করে দু’হাতে গায়ের ওপর ব্ল্যাঙ্কেট মুড়ি দিয়ে সে এবার কাঁপতে লাগল বেশ। কাঁপতে কাঁপতে আচানক কন্ঠ ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো ফোঁপানোর শব্দ! মুগ্ধ শুনল। ভ্রুক্ষেপহীন কায়দায় চোয়াল ফুটিয়ে বসে রইল চুপচাপ। অথচ বোকা মানবীর মনে তখন অজানা ঝড়ের আবির্ভাব ঘটেছে। বোকা মন অবচেতন কায়দায় বলছে,
“ আমার গায়ে কাপড় নেই কেনো? আর… আর লোকটা আমার ঘরে এভাবে বসে আছে কেনো? সে আমার ঘুমের ফায়দা লুটে উল্টাপাল্টা কিছু করেনি তো?”
ভাবনাটুকু শেষ হবার পূর্বেই ফোপাঁন বাড়ল মাহি’র। গায়ের সঙ্গে ব্ল্যাঙ্কেটটা আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে রেখে ভীষণ ঘৃণায় আওড়াল,
“ জানোয়ার লোক! আপনি এতো খারাপ? আমার…আমার ঘুমের সুযোগ নিয়ে.. শেষে কি-না!”
কথাটুকু গলার কাছে এসে আঁটকে গেল মাহি’র। বুকটা ধরে গেল অজানা ব্যথায়। রূঢ় মানব কথাটা শুনেছে বেশ। মুখাবয়বে এক আকাশসম রাগ নিয়ে দাঁতে দাঁত পিষছে! মাথাভর্তি অদৃশ্য অনলের দহনে হাতের মুঠোয় চেপে রাখা রিভলবারের গা-টা বোধহয় এক্ষুণি দুমড়েমুচড়ে ফেলবে সে। এরইমধ্যে বোকা মানবী করে বসল আরেক কান্ড! রাগে-দুঃখে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে বিছানার ওপর থেকে তক্ষুনি একখানা বালিশ হাতে নিয়ে ছুঁড়ে দিলো মুগ্ধের গায়ের ওপর। বেচারা নির্জীব তুলতুলে বালিশটা আচমকা গিয়ে চোট খেল দ্য শ্যাডো মনস্টারের ঘাড় বরাবরের। ঝড় আসার পূর্বে যেমন একমুহূর্তের জন্য স্তম্ভিত হয় চারপাশ, ঠিক তেমনি স্তম্ভিত হলো কক্ষের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ। মেয়েটা বড্ড বোকা। রাগের মাথায় কি করেছে, না করেছে সেদিকে পাত্তা না দিয়ে সে উল্টো ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“ এক্ষুনি বের হোন আমার ঘর থেকে ব্লা’ডি বিস্ট। কাপুরুষের মতো একটা ঘুমন্ত মেয়ের সুযোগ নিয়ে…”
ব্যস! এটুকুই যেন যথেষ্ট ছিলো দ্য গ্রেট রুশদী কিংয়ের গায়ে আগুন জ্বালিয়ে দেবার জন্য। বাক্যটুকু সম্পূর্ণ হবার পূর্বেই হিং স্র বাঘের ন্যায় তক্ষুনি সপ্তদশীর ওপর ঝাপিয়ে পড়ে রূঢ় মানব। শক্তপোক্ত ডানহাতের রুক্ষ আগ্রাসী থাবায় মেয়েটার চোয়াল শক্ত করে চেপে ধরে, অন্যহাতের বন্দুকখানা তাক করল মাহি’র ললাট বরাবর। এহেন অতর্কিত আক্রমণে ভড়কায় মাহি! ছলকে উঠে তার হৃৎপিণ্ড। সুদর্শনের রাগের তোড়ে লাল হয়ে যাওয়া মুখ, শক্ত চোয়ালের থরথর কম্পন, দাঁতের সনে দাঁতের রুক্ষ ঘর্ষণে উৎপন্ন হওয়া কটমট শব্দ! সবটা পূর্ণরূপে অবলোকন হওয়া মাত্রই অলক্ষ্যে ঢোক গিলল মাহি। বজ্রকন্ঠের ধমক শোনার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার পূর্বেই তার কর্ণকুহরে ভেসে এলো মাফিয়া বিস্টের হিং স্র গর্জন!
“ যত গালি দেবার দে, আই ডোন্ট কেয়ার! বাট চরিত্র নিয়ে কথা বলতে এলে একদম জিহ্বা টে-নে ছিঁড়ে ফেলব জানোয়ারের বাচ্চা! সবাইকে নিজের জানোয়ার বাপের মতো মনে করিস?”
বাবার ওপর কথা উঠতেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল মাহি। সপ্তদশীর ক্ষুদ্র বদনখানায় হুট করেই নেমে এলো এক আকাশসম শক্তি! সে কেমন এক ঝটকায় রূঢ় মানবের হাতখানা সরিয়ে দিলো নিজ চোয়াল থেকে। নয়ন দু’টোয় ক্ষুব্ধতা লেপ্টে কঠিন গলায় বলে ওঠে,
“ খবরদার কথায় কথায় আমার আব্বুকে গালমন্দ করবেন না! সে আর যাইহোক, আপনার মতো বিস্ট না।”
তক্ষুনি কপালের চামড়ায় আরও ক’খানা ভাঁজ দৃশ্যমান হলো মুগ্ধের। রাগের পারদ তরতর করে বেড়ে গেল বহুগুণ। সে এবার আচমকা আঁকড়ে ধরল মাহি’র সুকোমল রাজহংসীর ন্যায় সুদীর্ঘ কন্ঠনালী! অতঃপর এক ঝটকায় মেয়েটার ক্ষুদ্র মুখখানা নিজের মুখের বড্ড কাছে এগিয়ে এনে হিসহিসিয়ে শুধালো,
“ ওহ রিয়েলি বান্দীর মেয়ে? কতটুকু চিনিস তুই তোর বাপকে? তোর জন্মের আগে থেকে তোর বাপের সব নাড়িনক্ষত্র আমার জানা! তোর বাপ একটা ব্লা’ডি বাস্টার্ড! একটা রেপিস্ট জানোয়ারের বাচ্চাটা!”
কথাটুকু কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই থমকাল মাহি। থমকাল তার ক্ষুব্ধ দৃষ্টি। আনমনে কমে গেল দৈহিক মোচড়। মায়াবী হরিণী চোখদুটোর কোটরে জমলো এক সমুদ্র নোনাজল। কেউ বুঝি মাত্রই মেয়েটাকে ছুঁড়ে ফেলল হতবাকতার সাগরে। সে জানতো — নির্দয় মাফিয়া মনস্টার তাকে উঠিয়ে এনেছে শত্রুতার বশে। সে জানত, বিস্টের শত্রুতা তার বাবার সঙ্গে। তবে কি সে-ই শত্রুতা? তা যে এখনো অজানা সপ্তদশীর! মুগ্ধের এহেন কপটহীন বাক্যে অন্তরে ঝড় বইছে মাহি’র। মানবের রুক্ষ হাতের মুঠোয় কন্ঠনালী আঁটকে থাকা স্বত্বেও সে কেমন থেমে থেমে ভঙ্গুর কন্ঠে আওড়াল,
“ না…আপনার..কোনো কথা আমি বিশ্বাস করিনা। আমার আব্বু…আমার আব্বু খারাপ না। আপনি মিথ্যে বলছেন!”
মানবের চোখদুটোতে পরিবর্তন নামেনি। না কমেছে ঘৃণার ছাপ! মেয়েটার ছলছলে চোখদুটোতে অনড় দৃষ্টি ফেলে, সে কেমন কটমট কন্ঠে আওড়াল,
“ তোর বাপ যদি ভালোই হতো, তাহলে তুই এখানে কি করছিস?”
ফের কেঁপে উঠল মাহি’র ক্ষুদ্র বদন। যুবকের অনড় দৃষ্টে নিষ্পলক ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে সে। আশ্চর্য! রূঢ় মানবের চোখদুটো আজ ওতো স্পষ্ট কেন ঠেকছে তার নিকট? কেনো মনে হচ্ছে নির্দয় মাফিয়া বিস্টের চোখদুটোও আজ একই কথা বলছে? কেনো মন বলছে — বিস্টের কথায় কপটতা নেই! মাহি’র আর সাধ্যিতে কুলোলো না লোকটার চোখ পানে তাকিয়ে থাকতে। সে তড়িঘড়ি করে নজর লুকলো। কম্পিত কণ্ঠে পাল্টা উত্তরে বলল,
“ বিশ্বাস করিনা আমি আপনাকে! বিশ্বাস করিনা আপনার কোনো কথা। আমার আব্বু খারাপ নয়!”
ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটল সুদর্শনের। মেয়েটার পানে নিষ্পলক দৃষ্টি বজায় রেখে, তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে এক ঝটকায় ছেড়ে দিলো মেয়েটার কন্ঠনালী। অতঃপর নিজ উদ্যোগে মধ্যকার দুরত্ব বাড়িয়ে অনিহা মিশ্রিত কন্ঠে বলল,
“ র’ক্ত তো র’ক্তের কথাই বলবে! শত হলেও, সাপের ওরস্যে কোনদিন ভালো মানুষ জন্মায় না!”
সপ্তদশীর সর্বাঙ্গে ঝংকার তুলল কথাটা। হতভম্বতায় ডুবিয়ে দিয়ে গেল তাকে। রূঢ় মানব ঘর ছেড়েছে! অথচ মেয়েটাকে দেখো! সে কেমন দ্বিধাদ্বন্দে জড়িয়েছে। মন বলছে — রূঢ় মানবের মুখনিঃসৃত প্রতিটি বাক্য সত্যি, অথচ মস্তিষ্ক বলছে — আব্বু ভুল নয়! এ যে এক মহা পরিক্ষা মেয়েটার জন্য। এবার কাকে বিশ্বাস করবে সে?
বিপ বিপ বিপ…….
বিট-রেটের মনিটরের পর্দায় স্পষ্ট নাচছে হৃৎস্পন্দনের হার! শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কেবিনের নির্জীব বিছানায় শুয়ে আছেন — মধ্যবয়স্ক তায়েফ এহসান। তার উম্মুক্ত বক্ষে আঁটকে আছে বেশকিছু তারীয় সংযোগ! ডানহাতে পড়ে আছে ক্যানোলা। মুখে অক্সিজেন মাস্ক! তরতাজা মধ্যবয়সী মানুষটা ধীরে ধীরে বড্ড দূর্বল হচ্ছে। মুখাবয়বে পড়েছে বয়সের ছাপ। চোখদুটো দেবে গিয়েছে ভেতরে, কুচঁকে গিয়েছে চামড়া! মানুষটার নিস্তেজ বদনে ধীরে ধীরে নড়চড় হচ্ছেে। শরীরে মাত্রাতিরিক্ত ঘুমের ঔষধ প্রবেশ করায় মস্তিষ্ক ডুবেছে নিশ্চলাতায়। ধীরে ধীরে চোখদুটোর ওপর থেকে ভারী পর্দাযুগল সরে যেতেই তার ঝাপসা দৃষ্টিযুগল আচমকা গিয়ে আটকালো সম্মুখে। কে যেন একটা দাঁড়িয়ে আছে! মুখাবয়ব স্পষ্ট নয় তার। ঘোরে ডুবে থাকা তায়েফ এহসান মাস্কের আড়ালেই আচানক মুচকি হাসলো। নিবুনিবু চোখে তাকিয়ে থেকে অস্ফুটে আওড়াল,
“ মা-হি!”
সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা সফেদ রঙা এপ্রন পরিহিত শ্যাম সুদর্শন কি আদৌও শুনল কথাটা? সে উল্টো বিচলিত হলো চাচ্চুর নড়চড় দেখে। তক্ষুনি এগিয়ে এসে আলতো করে আকঁড়ে ধরল চাচার ক্যানোলা পড়া হাতখানা। অতপর ভারী কন্ঠে শুধালো,
“ চাচ্চু? আর ইউ্য লিসেনিং মি?”
মোটা মোটা দুটো বাক্য কর্ণে পৌঁছাল তায়েফ এহসানের। তা বুঝে উঠতে সক্ষম নন তিনি। মানুষটা কেমন দূর্বল কন্ঠে আবারও বলল,
“ মা-হি!”
কান পেতে দাঁড়িয়ে আছে রৌদ্র! এবার সঙ্গে সঙ্গে শুনতে পেল চাচ্চুর মুখনিঃসৃত বাক। তক্ষুনি সুদর্শনের বুক চিঁড়ে বেরিয়ে এলো এক দীর্ঘ নিশ্বাস। মনে মনে নিজেকে অপরাধী সাব্যস্ত করে আওড়াল,
“ আ’ম সরি চাচ্চু! আমার তখন সত্যিই উচিত হয়নি তোমাকে এ বিষয়ে কথা বলতে জোর করা।”
কথাটা মনে মনে আওড়ালেও বাইরে থেকে মুখখানায় আধাঁর ছেপেছে রৌদ্রের। বুক ফুলিয়ে লম্বা এক নিঃশ্বাস টেনে, সে কেমন আলগোছে হাত এনে রাখল চাচ্চুর মাথার ওপর। ধীরে ধীরে সেথায় আদুরে পরশ বুলিয়ে ভরাট কন্ঠে শুধালো,
“ একটু রেস্ট নাও চাচ্চু! এমুহূর্তে তোমার রেস্ট নেওয়া ভীষণ দরকার।”
শুনলেন তায়েফ সাহেব। নিবুনিবু চোখে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন রৌদ্রের পানে। ফ্যাকাশে অধরযুগল তিরতির করে কাঁপছে তার। যেন চাইছে কিছু একটা বলতে। ওদিকে রৌদ্র ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে। গলায় স্টেথোস্কোপখানা আলতো করে ঝুলিয়ে নিয়ে, পা বাড়িয়েছে দরজার পানে। অথচ তায়েফ এহসান কেমন আশভরা দৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন ছেলেটার চলে যাওয়ার পথে। তার দূর্বল কন্ঠফুড়েঁ কথা না বেরুলেও সে মনে মনে শুধচ্ছে,
“ ক্ষমা করে দিস রোদ! অর্ধেক সত্য মিথ্যের চাইতেও বড়ো ভয়ানক।”
কলকাতা ; রায় জমিদার বাড়ি!
পুরনো আমলের একখানা বিশাল পালংকের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পরিহিত কাপড়চোপড়! পালংকের এককোণের দ্বার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছেন হিমাংশু রায়। একখানা বড়সড় ব্যাগে একযোগে ভরে যাচ্ছেন নিজ পরিহিত কাপড়চোপড়। মানুষটা বড়ো অস্থির! অস্থিরতায় কাঁপছে তার সর্বাঙ্গ। এরইমধ্যে ঘরের দুয়ারে এসে দাঁড়ালেন কর্তাগিন্নি! স্বামীকে ওমন ব্যাগপত্র গোছাতে দেখে খানিক সন্দিগ্ধ হলেন তিনি। তক্ষুনি কুঞ্চিত দৃষ্টে ঘরে প্রবেশ করে গমগমে গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“ হ্যা গো, কি করছ তুমি এসব? হঠাৎ ব্যাগ গোছাচ্ছ যে? কোথাও নেমন্তন্ন পেয়েছ নাকি?”
তৎক্ষনাৎ জবাব দিলেন না হিমাংশু রায়। নিজ কাজে মহাব্যস্ত থেকে গম্ভীর কন্ঠে শুধালেন,
“ উহঃ বিরক্ত করো না তো সুদীপা! কাজ করছি দেখছ না? পারলে হাতে হাতে সাহায্য করবে, তা না!”
সহসা জিভে দাঁত কাটলেন কর্তাগিন্নি। তড়িঘড়ি করে স্বামীর হাত থেকে ব্যাগখানা নিজ হাতে নিয়ে কাপড়গুলো গোছাতে লাগলেন দক্ষ হাতে। খানিকক্ষণ চুপ থেকে ফের শুধালেন,
“ বললে না যে! এতো তোড়জোড় চালিয়ে কোথায় যাওয়া হচ্ছে?”
হিমাংশু রায় দু-কদম হেঁটে গিয়ে দাঁড়ালেন দেয়ালে ঝুলন্ত বিশাল এক আয়নার সম্মুখে। ব্যগ্র গাত্রোত্থানে নিজেকে নিয়োজিত করে আচমকা আওড়ালেন,
“ রাশিয়া যাবো!”
কথাটা কর্ণকুহরে পৌঁছান মাত্রই ঘরে কোথাও বিকট বজ্রপাত হলো যেন। সে বজ্রপাতে কম্পিত হলেন সুদীপা রায়। মানুষটা একপ্রকার বিভ্রম নিয়ে তাকালেন স্বামীর পানে। কম্পিত স্বরে আওড়ালেন,
“ কি বললে? রাশিয়া যাবে? আবারও ঐ অন্ধকার জগতে পা রাখতে যাচ্ছো তুমি ?”
গলা ধরে এসেছে সুদীপা রায়ের। তা বোধহয় আচঁ পেলেন হিমাংশু রায়। মধ্যবয়স্ক গম্ভীর পুরুষ ধীরে ধীরে কদম বাড়িয়ে এগিয়ে এলেন স্ত্রীর পানে। বুক ফুলিয়ে লম্বা এক নিশ্বাস টেনে স্ত্রীর কাঁধে আলতো করে হাত রেখে হিমশীতল কন্ঠে আওড়ালেন,
“ এবার আমার যাওয়ার কারণ ভিন্ন সুদীপা! এবার আমি যাচ্ছি মেয়ের সুখ কিনতে।”
তক্ষুনি বিভ্রান্তিতে জড়ালেন কর্তাগিন্নী। ঘাড়টা সামান্য উচিঁয়ে সরু দৃষ্টে তাকালেন স্বামীর পানে। তার এহেন জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দেখে মৃদু হাসলেন হিমাংশু রায়। আলতো করে স্ত্রীর কাঁধ চাপড়ে মোটা কন্ঠে শুধালেন,
“ মেয়ের সুখ বলে কথা! কথা দিচ্ছি, এবার আর খালি হাতে ফিরব না।”
সদ্য শাওয়ার নিয়ে বেরুলো সপ্তদশী! মাথার ওপর পেঁচিয়ে রাখা একখানা তোয়ালে। তার ফর্সা মুখশ্রীতে বড্ড ফ্যাকাশে প্রলেপ ছড়ানো, নরম তুলতুলে অধরযুগলের বেহাল দশা বোধহয় ক্রমশঃ বাড়ছেই! আগে একটুখানি ফোলা থাকলেও সময় যত পেরুচ্ছে, ততই যেন ফোলাভাব বাড়ছে ভীষণ! ঠোঁট দু’টো এখন যেন বালিশে পরিণত হচ্ছে। মাহি কেমন উদাস মুখে এসে দাঁড়ালো মেকআপ ভ্যানিটির সামনে। দুহাতে মাথার সিক্ত চুলগুলো মুছতে মুছতে,মুগ্ধের উদ্দেশ্যে ভীষণ রাগ নিয়ে বিড়বিড় করে আওড়াল,
“ রাক্ষস একটা! বজ্জাত বেহায়া লোক!”
“ কাকে বকছো বেবিগার্ল?”
কথার মাঝে হুট করে অপরিচিত কন্ঠ শুনতে পেয়ে ভড়কে যায় মাহি। তক্ষুনি হকচকিয়ে ঘাড় বাকিয়ে তাকায় শব্দের উৎসের পানে। আর ওমনি তার দৃষ্টি গিয়ে আটকালো — এক অদ্ভুত সাজে সজ্জিত মানুষের ওপর! গায়ে পুরুষদের মতো শার্ট-প্যান্ট পরুয়া মানব, তবে সাজ দিয়েছে মেয়েলী! গালে ডলেছে এক খাবলা গোলাপি রঙ! ঠোঁটদুটো সে-কি নৈসর্গিক সৌন্দর্যের প্রতীক তার! লাল টকটকে রঙে ঠোঁটদুটো যেন সাক্ষাৎ ফুটন্ত গোলাপের পাপড়ি। চোখদুটোর আই-ল্যাশে লাগিয়েছে কৃত্রিম পাপড়ি। ব্লন্ড চুলগুলো তার বব-কাট দেওয়া। দুয়ারের দ্বার ঘেঁষে দাঁড়িয়েও আছে মেয়েলী ভঙ্গিতে। মাহি বিভ্রান্তিতে ডুবল! লোকটা আদৌও ছেলে মানুষ তো? এদিকে তার ওমন ভাবনার মাঝেই অপরিচিত পা বাড়ায় সম্মুখে। আওয়াজ তুলে বলে,
“ কি ভাবছো বেবিগার্ল?”
দোনোমোনো করতে থাকা মাহি, মানুষটাকে এগোতে দেখে খানিক পিছিয়ে গেল দু-কদম। আমতা আমতা করে শুধালো,
“ ইয়ে মানে…আপনি?”
অপরিচিত একগাল হাসল! মেয়েলী ভঙ্গিতে দু’হাত এনে আলগোছে ঢেকে নিলো নিজ অধরযুগল। রয়েসয়ে জবাবে বলল,
“ আমি ক্ল্যারা! এই পুরো পেন্টহাউজ জুড়ে বসত করা একমাত্র মেয়ে! ওপস..সরি! এখন তো আমি একা নই। তুমিও আছো আমার সঙ্গে।”
অভ্যন্তরে হোঁচট খেল মাহি। দ্বিধা জড়িত দৃষ্টে লোকটাকে পরোখ করল আপাদমস্তক। একে দেখতে কোনদিক দিয়ে মেয়ে মনে হচ্ছে? কন্ঠও তো পুরুষালী! তবে ভাব ধরেছে মেয়েলী! অন্তর্মুখী মানবী চট করে বুঝে নিলো — ইনি বোধহয় তৃতীয় লিঙ্গের। নতুবা এমনটা করার কথা নয়।
মাহি সৌজন্যবোধে মৃদু হাসল। মনের কোণে আঁটকে থাকা শঙ্কা গুলো খানিক সাইডে রেখে মোলায়েম কন্ঠে আওড়াল,
“ নাইস টু মিট ইউ্য মিস: ক্ল্যারা!”
গাল ভরে চমৎকার হাসল ক্ল্যারা। তক্ষুনি এগিয়ে এসে চট করে একহাঁটু গেঁড়ে বসল মেয়েটার সম্মুখে। তার এহেন হুটহাট কান্ডে ভড়কায় মাহি! হতবুদ্ধির ন্যায় তাকিয়ে রইল কেবল। ক্ল্যারা কুর্নিশ জানাচ্ছে তাকে। আদুরে ভঙ্গিতে একহাত মেয়েটার পানে বাড়িয়ে দিয়ে বলে ওঠে,
“ লেট মি ওয়েলকাম ইউ্য রুশদী’স সিগনোরা!”
কপাল গোছায় মাহি। অবোধের ছাপ ফুটলো তার মুখাবয়বে। ক্ল্যারা এসব কি বলছে তাকে? রুশদী’স সিগনোরা মানে? মনের কোণে উত্থাপিত হওয়া প্রশ্নটুকু জিভের ডগায় এসে পৌঁছানোর পূর্বেই থমকে গেল মাহি। যেই শুনল ক্ল্যারার অবেদনী বাক্য!
“ গিভ মি ইউ্যর হ্যান্ড মনস্তার’স সিগনোরা! আমাকে অন্তত একটু বাধিত হতে দিন।”
এবারেও অবোধ মাহি! অবোধের ন্যায় বাড়িয়ে দিলো নিজ বাহাত। ওমনি হাতটা আলতো করে মুঠোয় তুলল ক্ল্যারা। মেয়েটার মসৃণ হাতের উল্টো পৃষ্ঠে তৎক্ষনাৎ আলতো করে নিজ দু-চোখ ছুঁইয়ে, পরক্ষণে সেথায় ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো আলগোছে। তার এহেন উদ্ভট কর্মে হাসফাস করছে মাহি! ছাড়াতে চাচ্ছে নিজ হাতটা। তবে ক্ল্যারা কেমন ধীরে ধীরে জোর বাড়াচ্ছে হাতের। আচমকা তীক্ষ্ণ দৃষ্টে মাহি’র পানে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, রহস্যময় বাঁকা কন্ঠে শুধালো,
“ ওয়েলকাম টু ইউ্যর ডেডি’স হোম সিগনোরা! আশা করি টক্সিক ড্যাডির সংস্পর্শে , এখন থেকে তোমার প্রতিটি মুহুর্ত বড্ড থ্রিলিং কাটবে! হোপ ইউ্য উইল ইনজয় ইট সিগনোরা।”
সংশয়ে ডুবল মাহি। ক্ল্যারা অর্ধেক বলছে ইংরেজি বাক্য, আর বাকি অর্ধেক রাশিয়ান। মেয়েটা আবার রাশিয়ান ভাষায় অপটু! তাই তো ওমন অবোধের ন্যায় চেয়ে আছে শুধু। এদিকে ক্ল্যারা ততক্ষনে ছেড়ে দিয়েছে মাহি’র হাত। মেঝেতে থেকে উঠে এসে চুপচাপ গিয়ে বসল বিছানার একপাশে। অতঃপর চোখেমুখে এক অদ্ভুত আকর্ষণ জমিয়ে লজ্জিত কন্ঠে শুধালো,
“ তুমি কত্তো লাকি সিগনোরা! জানো? কালকে থেকে তোমার প্রতি আমার বড্ড হিংসে হচ্ছে। আই মিন..উফফ! ইউ্যর ড্যাডি’স বডি। দ্যাটস সো ফা’কিং হট নাহ? কি করে সামলাচ্ছো সিগনোরা?”
আগাগোড়া কিচ্ছু ঘটে ঢুকলো না মাহি’র। সে কেবল হা করে তাকিয়ে রইল ক্ল্যারার পানে। ক্ল্যারা থামছেনা। কেমন উদ্ভট শরীরী ভঙ্গিমা দেখিয়ে চোখ বুঁজে ঠোঁট কামড়াচ্ছে নিজের। অস্ফুটে বলছে,
“ হলি ফা’ক! রুশদী’স বডি! হি ইজ সো হ্যান্ডসাম। মনস্তারের বডি দেখলেই না, আমার কেমন নেশা ধরে যায় জানো? ইচ্ছে হয় — তাকে কামড়ে খেয়ে ফেলি। লাইক, সে যখন জিম করে বের হয়। উফফ..গড ইন দ্যাট টাইম, তার বডি মুভমেন্ট। তার মাসেলস… গোশশশ! দ্যাট’স সো সে–ক্সি। এন্ড তার ব্যাকে ফুটে ওঠা বাটারফ্লাই’স দেখেছিলে সিগনোরা? দ্যাট’স সো হট নাহ?”
মুখ টিপে হাসছে মাহি। ধরা পড়ে যাবার আশঙ্কায় মুখের সামনে হাত উঠিয়ে রেখেছে মানবী। ক্ল্যারা থামতেই সে কেমন সন্দিহান গলায় বলে ওঠে,
“ ক্ল্যারা! আমার জানা মতে, মনস্টারের দিকে চোখ তুলে তাকানো নিষিদ্ধ। রাইট?”
আঁতকে উঠে ক্ল্যারা। তক্ষুনি সর্তক দৃষ্টি বুলিয়ে নেয় দরজার ওপারে। পরপরই মাহি’র পানে করুণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মিনমিনে স্বরে বলে,
“ প্লিজ এ কথা কাউকে বলোনা সিগনোরা। নাহলে মনস্তার আমার গর্দান নিবে! বাট আমি কি করব বলো? রুশদী ইজ ড্যাম হট এন্ড সে–ক্সি! আই কান্ট কন্ট্রোল মাইসেল্ফ। তাকে দেখলেই ইচ্ছে করে তাকে খুব কাছে পেতে।”
এবার আর হাসি আঁটকে রাখতে পারলোনা মাহি। ক্ল্যারার কথার মাঝেই সে কেমন খিলখিল করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে কল্পনায় ক্ল্যারা এবং মন্সতারকে পাশাপাশি দাঁড় করালো অসভ্য মেয়ে। আর ওমনি বাড়ল তার হাসির শব্দ! হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাবার যোগাড় হয়েছে মেয়েটার। ক্ল্যারা কেমন বোকার ন্যায় তাকিয়ে আছে। খানিকক্ষণ চুপ থেকে আচানক ঠোঁট ফুলিয়ে বলে ওঠে,
“ তুমি হাসছো কেন সিগনোরা?”
হাসি এখনো চলমান মাহি’র। মুখ খুলে যে-ই না কিছু বলতে যাবে ওমনি কক্ষের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়ালেন একজন সশস্ত্র গার্ড! লোকটা এসেই নতমুখে কুর্নিশ জানালেন। ভরাট কন্ঠে বলে উঠলেন,
“ হোলা সিগনোরা! মনস্তার ইজ কলিং ইউ্য।”
তক্ষুনি হাসিটা গলার কাছে আঁটকে গেল মাহি’র। বুকটা মুচড়ে উঠল অজানা কারণে। সে কেমন থতমত কন্ঠে পরক্ষণেই জিজ্ঞেস করল,
“ কেনো?”
উত্তর নেই গার্ডের মুখে। বোধহয় এরচেয়ে বেশি কথা বলতে গেলেই গর্দান যাবে তার। মাহি দোটানায় পড়ল যেন। ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে হাত কচলাতেই ক্ল্যারা সর্তক কন্ঠে বলে ওঠে,
“ তারাতাড়ি যাও সিগনোরা! মনস্তার একটা কথা রিপিট করতে পছন্দ করে না।”
বিশাল এক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ! এ যেন ব্যাডমিন্টন কোর্ট! নবাবী সাজে সজ্জিত কামরার চারপাশে নান্দনিকতার ছোঁয়া! যেন যেকেউ এক দেখায় বলতে বাধ্য হবে — রূচি আছে! সম্পূর্ণ ট্রান্সপারেন্ট কাঁচের তৈরী বিধায় মাথার ওপর আকাশটা সুস্পষ্ট! পায়ের তলায় যেন ভাসমান মেঘ। আশেপাশে মেঘেরা উড়োউড়ি করছে!
পা টিপে টিপে ঘরে প্রবেশ করল মাহি। দুরুদুরু করে কাঁপছে তার বুক। এক কদম এগোলে দু-কদম পেছাতে হচ্ছে ভয়ে। লোকটা আবার কি উদ্দেশ্যে ডাকল তাকে কে জানে! মেয়েটা কেমন ঢোক গিলছে বারংবার। কক্ষে খানিক উঁকি দিয়ে দু’টো কদম এগোতেই হঠাৎ পেছনের স্লাইডিং দরজাটা শা করে আটকে গেল। আর ওমনি আঁতকে উঠে বেচারি! তৎক্ষনাৎ পিছিয়ে এসে দরজা খুলতে গেলেই কক্ষ থেকে ভেসে আসে রূঢ় মানবের ভারী কন্ঠ!
“ কাম ইনসাইড সিগনোরা!”
শুকনো ফাঁকা ঢোক গিললো মাহি। পাদু’টো যেন আঁটকে গিয়েছে তার। থরথর করে কাঁপছে সর্বাঙ্গ! মেয়েটা এভাবেই এগোচ্ছে। ভয়ে ভয়ে বেশ কিছুটা পথ এগোতেই হুট করে তার দৃষ্টি আটকালো অদূরের বিশাল এক গোলাকার ঝুলন্ত বেডের পানে। যেথায় উদোম গায়ে উবু হয়ে শুয়ে আছে মাফিয়া বিস্ট। ভড়কায় মাহি। অভ্যন্তরীণ ভয়ডরে কাবু রেখে আমতা আমতা স্বরে বলে,
“ ক-কেনো ডেকেছেন?”
তৎক্ষনাৎ জবাব আসেনি মুগ্ধের কাছ থেকে। উল্টো বাহাতটা সামান্য উঁচিয়ে, যুবক দু-আঙুলপর ইশারায় নিঃশব্দে মেয়েটাকে কাছে ডাকলো। মাহি পড়ল বিপাকে। ঘরের দরজা আঁটকে গিয়েছে! এমুহূর্তে লোকটার কথা না শোনা মানে, নিজ পায়ে কুড়াল মা-রা। তাইতো ভয়াল সপ্তদশী কাঁপা কাঁপা কদমে এগোলো। বিছানার দ্বার ঘেঁষে এসে দাঁড়াতেই যুবক রাশভারি কন্ঠে আদেশ ছুঁড়ল,
“ কাছে আয়!”
কপাল কুঁচকায় মাহি! ভয়ডর ভুলে খানিক বিরক্ত হলো মেয়েটা। নিরবে পা বাড়িয়ে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো যুবকের হাঁটুর কাছে। এতেও বুঝি হলোনা মুগ্ধের। বালিশে মুখ গুঁজে রেখে মানব ফের ধমকের গলায় বলল,
“ পায়ে ঠাডা পড়েছে তোর? কাছে আসতে বলেছি না?”
“ আর কত কাছে আসব?”
“ যতোটা কাছে এলে আমার নিঃশ্বাসের প্রতিটা শব্দ তুই গুনতে সক্ষম হবি, ঠিক ততোটা!”
ভড়কায় মাহি। গাল বাঁকায় পরক্ষণে। তিতিবিরক্ত মেজাজে বলেই বসে,
“ আমার বয়ে গেছে আপনার নিঃশ্বাস গুনতে!”
যুবক কী হাসল? নরম তুলতুলে বালিশের কোলে মুখ গুঁজে ওমন নিরবে ঠোঁট কামড়ে চমৎকার হাসছে কে তবে? হাসি তো নয়, এ যেন মুক্তো ঝড়ানো জলপ্রপাত। তবে সে অলক্ষ্য হাসির স্থায়িত্ব বেশিক্ষণ রইল না। মুহূর্ত ব্যয়ে রূঢ় মানব ফিরলেন নিজ অবতারণে। তক্ষুনি বালিশের নিচ হাতড়ে একখানা ছোট কাঁচের শিশি বের করে এগিয়ে দিলো মেয়েটার পানে। ঝাঁঝিয়ে আওড়াল,
“ কাম ক্লোজার! এন্ড ম্যাসাজ মা’ই বডি!”
মাথায় বুঝি আকাশ ভেঙে পড়ল মাহি’র। চোখদুটো হলো বিস্ফোরিত! মেয়েটা কেমন তেজ দেখিয়ে তৎক্ষনাৎ বলে উঠল,
“ অসম্ভব! আমি পারব না এসব করতে!”
“ ফাইন! তাহলে আমি তোর বডি ম্যাসাজ করে দিব! কাম হটি! লেটস ডু সামথিং হটা…. র!”
আঁতকে উঠে মাহি। সহসা যুবকের এহেন প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে বলে,
“ না না না! আমি…আমি করছি! আমি করছি।”
বাঁকা হাসল মুগ্ধ। তক্ষুনি নিজ পাহাড়সম বলিষ্ঠ দেহখানা চিৎ করে এলিয়ে দিলো বিছানায়। মেয়েটাকে আরেকটু নাস্তানাবুদ করতে একহাতে আলগোছে নাভিকমল থেকে আরেকটু নিচে নামিয়ে দিলো ট্রাউজারের অংশ। তা দেখে মুখ কুঁচকায় মাহি! অজান্তেই বিরক্ত হয়ে মুখ ফসকে বলে ওঠে,
“ এতো না নামিয়ে একেবারে খুলেই ফেলুন! যত্তসব।”
তড়াক চোখ খুলল মুগ্ধ! মুখাবয়বে একরাশ দুষ্টুমি লেপ্টে ঠোঁটের কোণে ফোটাল বাঁকা হাসির রেশ। পরপরই ইচ্ছে করে ট্রাউজারের আগাটা আরেকটু নামাতে নামাতে ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে বলল,
“ ওহ রিয়েলি? ইউ্য ওয়ান্না বি ওয়াইল্ড? দাঁড়া! দাঁড়া! আমি আবার খোলাখুলি থাকতে বেশি প্রেফার করি।তুই যেহেতু বললি…!”
মুখ ফসকে বলে বসা কথাটার পরিপ্রেক্ষিতে এমন কিছু ঘটবে তা যেন ধারণার বাইরে ছিলো মাহি’র। মেয়েটা তৎক্ষনাৎ দু’হাতে চোখ ঢাকল নিজের। লজ্জিত কন্ঠে আওড়াল,
“ একটু তো লজ্জা করুন নির্লজ্জ লোক!”
“ নির্লজ্জদের আবার কিসের লজ্জা?”
এহেন জবাবে মৌন মাহি। খানিকটা স্থির হতে যাবে তার আগেই পাতলা কোমর বরাবর অনুভুত হলো এক হেঁচকা টান। এহেন অতর্কিত আক্রমণের তাল সামলাতে না পেরে মেয়েটা কেমন হুমড়ি খেয়ে পড়ল মুগ্ধের উম্মুক্ত লোমহীন পেটানো বক্ষভাজে। ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকানোর সময় অব্দি পায়নি বেচারি। তবে মুখ বরাবর যুবকের উষ্ণ নিশ্বাসের ছোঁয়াগুলো স্পষ্ট অনুভব করছে সে। নাকের সরু ছিদ্র দিয়ে ঢুকছে পুরুষালী দেহের সঙ্গে পারফিউমের মিলেমিশে তৈরি হওয়া এক অদ্ভুত সুঘ্রাণ। তার কাপত্রয়ী চোখদুটো নিজেদের পর্দা সরালো রয়েসয়ে। আর ওমনি তারা আটকালো যুবকের বাদামী চোখদুটোর অতল সমুদ্রে। মুহুর্তেই থমকায় সে। হারায় একমুহূর্তের জন্য! সপ্তদশীর সুশ্রী গৌরবর্ণা মুখ, যার মায়ায় থমকেছে রূঢ় মানব। মেয়েটার মুখের ওপর এসে আছড়ে পড়া চুলগুলো নিজ উদ্যোগে আলতো করে কানের পিঠে গুঁজে দিচ্ছে নির্দয় মাফিয়া বিস্ট। আচানক অতি হিমশীতল কন্ঠে শুধালো,
“ মানুষের সবচেয়ে বড় দূর্বলতা কী জানিস? তাদের মানবিকতা! যার মনে যত বেশি মায়া, সে তত বেশি দূর্বল!”
সপ্তদশীর আজ কি হলো কে জানে! সে আজ বিরক্ত হলো না। উল্টো এক অদ্ভুত ভঙ্গিতে বিচক্ষণতার সঙ্গে জবাবে বলল,
“ আর সে মানবিকতা কারোর মধ্যে না থাকলে, সে নিসন্দেহে হিং স্র প’শু! ঠিক যেমনটা আপনি।”
মাফিয়া বিস্ট অবাক হয়নি। কেবল মুগ্ধতার দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেয়েটার চোখের পানে। আবেগে প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“ আমি হিং স্র প*শু?”
“ নন কী?”
মাহি আজ বড়ো বুদ্ধিমতি! তার এহেন পাল্টা প্রশ্নে থমাকয়নি রূঢ় মানব। সে উল্টো অদ্ভুত শান্ত কন্ঠে শুধালো,
“ হয়তো! তবে হিং স্র পশুদের কী হৃদয় থাকে?”
“ থাকে বৈ কি! না থাকলে সে জীব থোড়াই হতো।”
কপালের চামড়ায় শিথিলতা বাড়ল মুগ্ধের। অজানা কারণে সন্দিহান কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪৫ (২)
“ তাহলে… আমারও কী হৃদয় আছে?”
মাহির আজ কি হয়েছে? সে কেমন মৃদু হেসে আলতো করে হাত ছোঁয়াল রূঢ় মানবের বুকের বাঁপাশে। অতঃপর মুগ্ধের চোখদুটোতে গভীরভাবে ডুব দিয়ে আওড়াল,
“ হয়তো! তবে সে হৃদয়ে কনক্রিট জমেছে! প্রতিশোধ আর হিং স্রতার কনক্রিট!”
