মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৪৫
ঐশী রহমান
সকাল থেকেই পাহাড়ি কাঠের কটেজটিতে উৎসবের আমেজ। আজ ছোট্ট ওয়াসিকার প্রথম জন্মদিন। ধারা, লুইপা আর সামির মিলে পুরো কটেজ সাজাতে ব্যস্ত। দেয়ালে রঙিন বেলুন, টেবিলে সুন্দর করে সাজানো কেক—সবই প্রস্তুত। ধারার পরনে একটা হালকা নীল রঙের শাড়ি, এক বছরে সে যেন আরও একটু লাবণ্যময়ী হয়ে উঠেছে। কিন্তু এত আনন্দের মাঝেও ধারার মনের কোণে একটা সূক্ষ্ম মেঘ জমে আছে। সকাল থেকে ওয়াসিফের কোনো পাত্তা নেই। ফোন করলেও বারবার বন্ধ দেখাচ্ছে।
“কী রে ধারা, মুখটা অমন হাঁড়ি করে রেখেছিস কেন? ভাইয়া চলে আসবে, আর্মিতে ডিউটি থাকলে তো জানিসই, টাইমের কোনো ঠিক থাকে না,” লুইপা তিন মাসের আহনাফকে কোলে নিয়ে ধারাকে সান্ত্বনা দিল।
ধারা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তা জানি আপা। কিন্তু আজকে মেয়ের প্রথম জন্মদিন, অন্তত আজকের দিনটাতেও কি একটু আগে আসা যেত না? সকাল থেকে একটা বার ফোনও করেনি।”
সামির বেলুন ফোলাতে ফোলাতে বলল, “ভাবি, আপনি চিন্তা করবেন না। আমি স্যার কে চিনি, উনি ঠিক সময়ে এসে হাজির হবে।”
কিন্তু সময় যত গড়াতে লাগল, ধারার বুকের ভেতর অস্বস্তি তত বাড়তে লাগল। দেখতে দেখতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল, সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত আটটা বেজে গেল। আমন্ত্রিত অতিথিরা এসে অপেক্ষা করে করে শেষমেশ চলে যেতে বাধ্য হলেন। এক বছরের ছোট্ট ওয়াসিকা তার জন্মদিনের জমকালো ফ্রক পরে ড্রয়িংরুমের কার্পেটে বসে একা একাই খেলছে। ধারার চোখ দুটো ততক্ষণে জলে ভরে এসেছে। মেয়ের প্রথম জন্মদিনটা এভাবে ভেস্তে যাবে, সে কখনো ভাবেনি। পুরো আয়োজনটা যেন এক নিমিষেই বাঞ্চাল হয়ে গেল।
এদিকে ধারা যা জানে না, তা হলো গত কয়েকদিন ধরে মেজর ওয়াসিফের জীবনে এক তুমুল ঝড় বয়ে যাচ্ছে। আজ থেকে ঠিক তিন বছর আগে এক ভয়ঙ্কর ক্রিমিনাল গ্যাং ধারাকে কিডন্যাপ করেছিল। সেবার অলৌকিকভাবে ধারা বেঁচে ফিরলেও, ওয়াসিফের মনে সবসময় একটা খটকা ছিল—ক্যান্টনমেন্টের এত কড়া নিরাপত্তা ভেদ করে ক্রিমিনালরা ধারার খোঁজ পেল কী করে? কেউ একজন ভেতর থেকে তথ্য পাচার করেছিল।
গত তিন বছর ধরে ওয়াসিফ এই কেসের তদন্ত গোপনে চালিয়ে যাচ্ছিল। আর আজ, ঠিক ওয়াসিকার জন্মদিনের দিনই সে পৌঁছাতে পেরেছে সেই আসল কালপ্রিটের দোরগোড়ায়।
শহরের এক গোপন আস্তানায় তখন রেইড চলছে। মিলিটারির ঘেরাটোপে বন্দি সেই গ্যাং লিডার। আর তার ঠিক পাশেই হাতকড়া পরা অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে আর কেউ নয়—ওয়াসিফেরই সহকর্মী, ক্যাপ্টেন শশী!
শশীর দিকে তাকিয়ে ওয়াসিফের চোখ দুটো যেন আগ্নেয়গিরি হয়ে উঠল। তবে একটুও গর্জে উঠল না। চোখ মুখের ভয়াবহতা ধরে রেখে ধীর তবে সিংহের মতো ভারিক্কি কন্ঠে জানতে চাইলো “তোমারএত বড় সাহস শশী? এতো বড়ো? আমার কলিগ হয়ে, আমার বন্ধু সেজে যেই তোমাকে আমি বোনের জায়গাটা দিয়ে এসেছি সবসময় সেই তুমি আমার ওয়াইফ মুমতাহিনাকে তুলে নিতে হাত এগিয়েছো? আমার সংসারটা ধ্বংস করতে চেয়েছিলে? এই সবকিছুর পেছনে সব চাল তুমি চেলেছো?’
শশী মাথা নিচু করে রাখে, মুখ থেকে একটা শব্দ ও বের করছেনা। ওয়াসিফ ফের বলে।
‘ কি ভেবেছিলে? মেজর শাহেদ ওয়াসিফ ঘাসে মুখ দিয়ে চলে? শাহেদ ওয়াসিফ এতোটাই দয়াশীল যে তাকে কেউ পিঠের পেছনে ছুড়ি বিঁধে দিবে আর সে তা হাসতে হাসতে হজম করে ফেলবে? কখনো ই না। উল্টো ছুড়ির বিধার বদলে জবাই করে ফেলতে জানি’
শশী মাথা নিচু করে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “আমাকে মাফ করে দিন, স্যার। টাকার লোভে আর আপনার ওপর হিংসা থেকে আমি ওদেরকে আপনার ওয়াইফের সব ইনফরমেশন দিয়েছিলাম। আমি ভাবিনি ওরা এতদূর যাবে…”
এবার ওয়াসিফ ভয়ানকভাবে গর্জে ওঠে..
“তোর মতো মীরজাফরের জায়গা এই আর্মিতে নেই, শশী! তোকে আমি এমন শাস্তি দেব, যা তুই সারাজীবন মনে রাখবি, আমি মেয়েদের গায়ে হাত তুলিনা নয়তো এতক্ষণে হুশ থাকতো না। ওয়াসিফ চরম ঘৃণায় চোখ ফিরিয়ে মিলিটারি জিপে তোলার নির্দেশ দিল। তিন বছরের পুরনো সেই ক্ষত, সেই রহস্য আজ পুরোপুরি উন্মোচিত হলো। আসল কালপ্রিট এখন খাঁচায় বন্দি।
রাত তখন প্রায় বারোটা। কটেজের ড্রয়িংরুমের বাতিগুলো নেভানো, শুধু বারান্দার একটা ছোট লাইট জ্বলছে। পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ। লুইপা আর সামির অনেক বুঝিয়ে ধারাকে ঘরে পাঠিয়েছে। ওয়াসিকা অনেকক্ষণ কেঁদে কেঁদে ধারার বুকেই ঘুমিয়ে পড়েছে। ধারা বিছানায় শুয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে নীরবে চোখ দিয়ে জল ফেলছে। আজ তার মনটা ওয়াসিফের ওপর ভীষণ অভিমানে ভরে আছে।
ঠিক তখনই কটেজের মেইন গেট খোলার চেনা আওয়াজ হলো। ভারী বুটের শব্দ আস্তে আস্তে বারান্দা পেরিয়ে দরজার সামনে এসে থামল।
ধারা চট করে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। দরজা খুলতেই সামনে দাঁড়ানো দীর্ঘদেহী মানুষটাকে দেখে তার ভেতরের সমস্ত অভিমান কান্নায় রূপ নিল। ওয়াসিফের ইউনিফর্ম ধুলোবালি মাখা, চুলগুলো উসকোখুসকো, মুখটা ক্লান্তিতে তামাটে হয়ে আছে।
ওয়াসিফ ধারার চোখের জল দেখে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে এক পা এগিয়ে এসে ধারাকে শক্ত করে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল।
ধারা ওয়াসিফের বুকে হাত দিয়ে ধাক্কা মারার চেষ্টা করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “ছাড়ুন আমাকে! কেন এসেছেন এখন? মেয়ের জন্মদিন শেষ হয়ে গেছে। একটা বার মনে পড়েনি আমাদের কথা? কোথায় ছিলেন আপনি?”
ওয়াসিফ ধারার মাথায় হাত বুলিয়ে, তাকে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলল, “মুমতাহিনা, শান্ত হ। আমি তোদের ভুলেই যাইনি রে। আজ আমি আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রুটাকে খাঁচায় বন্দি করে এসেছি। যে তিন বছর আগে তোকে আমার থেকে কেড়ে নিতে চেয়েছিল, আজ তাকে চিরকালের মতো তার ক্যারিয়ার শেষ করে দিয়ে এসেছি।”
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৪৪
ওয়াসিফের মুখের এই কথা শুনে ধারা স্তব্ধ হয়ে গেল। সে কান্না থামিয়ে চোখ বড় বড় করে ওয়াসিফের মুখের দিকে তাকাল। তার মাথায় যেন কিছুই ঢুকছে না।
ওয়াসিফ ধারার কপালে গভীর এক চুমু খেয়ে বলল, “সব বলব তোকে, সব বলব। আগে আমার মা-মণিকে একটু কোলে নিই? বড্ড ক্লান্ত লাগছে, মুমতাহিনা…”
