Home মেজর কারদার মেজর কারদার পর্ব ১২

মেজর কারদার পর্ব ১২

মেজর কারদার পর্ব ১২
ফিনারা ঝুমুর

কক্সবাজার! বাঙালির কাছে সমুদ্র মানেই এক অদ্ভুত মায়ার টান। সেই মহেশখালী দ্বীপের শান্ত স্নিগ্ধতা, সোনাদিয়ার নির্জনতা থেকে শুরু করে ইনানী, লাবণী আর হিমছড়ির পাহাড়-সাগরের মিতালী—সব মিলিয়েই কক্সবাজার যেন এক স্বপ্নের শহর। আর ভৌগোলিক ও কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কক্সবাজারের রামু সেনানিবাস, যা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশনের সদর দপ্তর। সেখানেই আজ পোস্টিং হয়েছে মেজর শীর্ষ কারদারের।
​ঘণ্টাখানেক আগেই শীর্ষ তার জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি বাংলোয় এসে পৌঁছেছে। এই বাংলোটি মূলত সেনানিবাসের অন্তর্ভুক্ত ক্যান্টনমেন্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রিন্সিপালদের জন্য নির্ধারিত ছিল, যা এখন মেজরের জন্য প্রস্তুত। ওয়াশরুম থেকে গোসল সেরে বেরিয়ে এল শীর্ষ। নগ্ন শরীরে কোমরে কালো টাওয়াল জড়ানো, সুঠাম দেহের লোমহীন বুকে ঘাম আর পানির নোনাজল চিকচিক করছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আর্মি কাট করা চুলগুলো শুকাতে শুকাতে যখন সে নিজের পেশিবহুল শরীরের দিকে তাকাল, তখন আয়নায় প্রতিফলিত সেই দৃপ্ত সৌন্দর্য যেন আভিজাত্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছিল। সুগন্ধি পারফিউম গায়ে মাখিয়ে যখন সে তার আর্মি ফরমাল ড্রেসটা পরল, শোল্ডার ব্যাচের ওপর জ্বলজ্বল করা শাপলা তারা একজন মেজরের প্রতীকি চিহ্ন—তাকে আরও বেশি রুদ্র ও গম্ভীর করে তুলল। মিটিংয়ের জন্য বের হওয়ার সময় কানে এয়ারবাড গুঁজে সে দ্রুত পায়ে বাংলো ত্যাগ করল।

​অন্যদিকে, সকাল ১০টা বেজে ৫৫ মিনিট। ক্যান্টনমেন্ট কলেজের করিডোর ধরে টিফিনের ঘণ্টার শব্দে মুখরিত হয়ে উঠল ক্যাম্পাস। সকলে শিক্ষার্থীরা হুটোহুটি করে নিজেদের শ্রেণিকক্ষ ত্যাগ করছে। কেউ বা যাচ্ছে ক্যান্টিনে খাবারের উদ্দেশ্যে, কেউ বা খেলার তাড়ায় আর গুটি কয়েক রয়ে গেছে খাবার খাওয়ার তাগিদে।
ছুটির বেল বাজতেই ২০৪ নম্বর কেমিস্ট্রি ল্যাব থেকে গ্লাভস আর সাদা এপ্রন পরা অবস্থায় বেরিয়ে এল মেঘ, রাইসা, তানিয়া আর ফাতিমা।
​চার বান্ধবী মিলে ভিড় ঠেলে ক্যান্টিন থেকে ক্যারামেল মিল্ক টি নিয়ে বসল ক্যাম্পাসের এক কোণে, প্যারেন্টসদের জন্য নির্ধারিত বারান্দার নিচের বেঞ্চে। সেখান থেকে সবুজে ঘেরা পুরো ক্যাম্পাসটাকে এক নজরে দেখা যায়। চায়ের উষ্ণ চুমুকে যখন আড্ডাটা জমজমাট, তখন তানিয়া হঠাৎ উৎসাহিত হয়ে বলে উঠল,

“মেঘু, কক্সবাজার যাবি? বর্ষার এই মৌসুমে কক্সবাজারের ফিলিং-ই তো আলাদা!”
​তানিয়ার কথায় মেঘ ভ্রু কুঁচকে তাকাল। মৃদু গম্ভীর স্বরে বলল,
“তোদের ফ্যামিলি ট্রিপে আমি গিয়ে কী করব? থার্ড-পার্সন হয়ে তোদের ট্রিপ মাটি করার শখ নেই আমার।”
​তানিয়ার মুখটা যেন এক নিমেষে চুপসে গেল। মিনমিন করে বলল, “আরে না রে, এটা ফ্যামিলি ট্রিপ নয়! শুধু আমরা বন্ধুরা মিলে যাওয়ার প্ল্যান করছি। দেখ, রাসু আর ফাতুহও রাজি!”
​মেঘের ভ্রু আরও কিছুটা কুঁচকে গেল। ধীর গলায় জিজ্ঞেস করল,
“এই প্ল্যান কবে হলো?”
​“আজ রাতেই করেছি। তোকে ফোনে পাওয়ার অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু তোর ফোন বারবার অফ ছিল, তাই জানাতে পারিনি।”
​ফাতিমার কথায় মেঘের মনে পড়ল গত রাতের কথা। ওই অচেনা ‘লুচ্চা’ নাম্বার থেকে আসা মেসেজের জন্য রাগে ফোনটা অফ করেই ঘুমিয়েছিল সে। ক্যান্টনমেন্ট ক্যাম্পাসে ফোন এলাউ না থাকায় এখন ফোনটা নিশ্চয়ই বাড়িতে অনাদরে পড়ে আছে। মেঘ চিন্তিত গলায় বলল,
“পরিবারের কেউ রাজি হবে না। চারজন মেয়ে একা ট্রিপে যাচ্ছে শুনলে বাড়ি মাথায় তুলবে ওরা।”
​ওদের চারজনের মুখই শুকিয়ে গেল। মেঘও নিজের সুন্দর নখ কামড়াতে কামড়াতে ভাবতে লাগল। কিছুক্ষণ পর হুট করেই মেঘের চোখে একটা ঝিলিক খেলে গেল। সে ফিসফিস করে বলল,
“এইদিকে শোন, বুদ্ধি মাথায় এসেছে।”
​মেঘের কথা শুনে তিন জোড়া মাথা একত্রিত হয়ে গেল। মেঘ তার গোপন প্ল্যানটা খুলে বলতে শুরু করল। রাইসার মুখটা প্রথমে একটু ভয়ে ভয়ে থাকলেও, মেঘের বুদ্ধিদীপ্ত কথায় সে আশ্বস্ত হলো। এখন শুধু অপেক্ষা এই রহস্যময় প্ল্যান সফল হয় কি না!

কলেজ থেকে পায়ে পায়ে হেঁটে বাড়ির দিকে ফিরল মেঘ। এই জ্যৈষ্ঠের শেষ আর আষাঢ়ের শুরুর গুমোট গরমে শরীরটা ক্লান্ত লাগলেও বসার উপায় নেই, বিকেলেই আবার হোম টিউটরের কাছে পড়তে বসতে হবে। মেঘের মেজো ভাই অভ্র এবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের থার্ড সেমিস্টারে পড়ছে, আর বড় ভাই নোমান রয়েছে ঢাকার ইবনে সিনায়। নোমান মূলত একজন কার্ডিওলজিস্ট। সে যে সেই ইমার্জেন্সি অপারেশনের জন্য বাড়ি থেকে বের হলো, এখনও তার বাড়িমুখো হওয়ার ফুরসত মেলেনি।
​তবে ইদানীং ওদের বাড়িতে একটা নতুন আলাপ উঠছে। মেঘের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হলেই ওরা এই খুলনার পাট চুকিয়ে সবাই মিলে পাকাপাকিভাবে ঢাকার সাভারে সেটেল্ড হবে। কারণ নোমান এখন সাভারের ইবনে সিনা শাখাতেই নিয়মিত বসছে এবং ওখানেই সাভার ডিওএইচএস -এর ভেতরে একটা সুন্দর ফ্ল্যাট ক্রয় করছে সে। মা-বাবা আর ছোট বোনকে নিজের কাছাকাছি রাখার জন্যই বড় ভাইয়ের এই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা।
​বাড়ি ফিরে হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়েই দুপুরের খাবার খেতে বসে গেল মেঘ। কারণ, ঘড়ির কাঁটায় ঠিক চারটা বাজলেই স্যার পড়াতে চলে আসবেন। তাড়াহুড়ো করে খেয়েদেয়ে ও সোজা রান্নাঘরে মায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

​“আম্মু, তোমার মোবাইলটা একটু দেবে?”
​মেয়ের আচমকা আবদার শুনে আলেয়া বানু হাতা থামিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন। মেঘ দাঁত বের করে হেসে বলল,
“আমার সতীনের সাথে একটু জরুরি কথা বলব।”
​আলেয়া বানু টেবিলে রাখা মোবাইলটার দিকে ইশারা করতেই মেঘ একপ্রকার ছোঁ মেরে সেটা লুফে নিল। তারপর স্ক্রিন আনলক করে চটপট একটা পরিচিত নম্বরে ডায়াল করল। ওপাশ থেকে কলটা রিসিভ হতেই মেঘ ফোনের স্পিকারে মুখ লাগিয়ে বেশ রসিয়ে বলল,
“কী বড় সতীন, ভালো আছো?”
​মেঘের প্রশ্ন শুনে ওপাশ থেকে এক বয়স্কা মহিলা খ্যাপাটে গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন,
“তুই আর আমারে ভালো থাকতে দিলি কই রে ছুঁড়ি? তোর লাইগা আমার বুইড়া মরণডা খালি ঘরে বইসা দিন-রাত কাতরায়!”
​ওপাশের চেনা মানুষের এমন ঝাঁঝালো কথা শুনে মেঘের ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমিভরা হাসি আরও চওড়া হলো। সে গাল ফুলিয়ে বলল,
“কাতরানোরই তো কথা গো! একে তো তোমার নাতনী, তার ওপর আবার ওনার দুই নম্বর বউ বলে কথা! আমার জন্য বিরহজ্বালা হবে না তো কি তোমার মতো মাজা-ভাঙা বুড়ির জন্য হবে?”
​মেঘের মুখে এমন কথা শুনে ওপাশে থাকা ওর নানি জুলেখা ইয়াসমিন এক্কেবারে রেগে আগুন হয়ে গেলেন,
“ছোঁড়ি রে ছোঁড়ি! আমার ওমন রাজার মতন সুন্দর জামাইয়ের ওপর তোর নজর দিলি ক্যান? লজ্জা করে না?”

​“কী আর করব বলো? তোমার স্বামীই তো ছুডু বউ ছুডু বউ বলে আমারে এমন পাগল বানাল! এখন ওনারে ছাড়া তো আমার রাতে ঘুমই আসে না। তা আমার স্বামীটারে একটু লাইনে দাও না গো বড় সতীন, ওনার মায়াবী কণ্ঠডা শুইনা আমার কলিজাডা একটু জুড়াক!”
​নানি জুলেখা ইয়াসমিন এবার ওপাশে আরও মারমুখী হয়ে উঠলেন, যা মেঘ এপাশ থেকেই খুব ভালো বুঝতে পারছিল। নানার সাথে নানির বিয়ের এতগুলো যুগ পার হয়ে গেল, নাতনিদের বিয়ে দেওয়ার বয়স হতে চলল, তবুও নিজের স্বামী আকবর জুলানকে নিয়ে ওনার ঈর্ষা আর জেলাসি একটুও কমল না! জুলেখা ইয়াসমিনের সামনে ওনার স্বামীকে নিয়ে কেউ রসিকতা করলেই বয়স্কা রেগে আগুন হয়ে যান।​ঠিক তখনই ওপাশ থেকে ফোনটা হাতবদল হওয়ার খসখস শব্দ শোনা গেল। তারপরই এক প্রবীণ কিন্তু বেশ রসাত্মক পুরুষালী গলা ভেসে এল,
“কী গো ছুডু বউ! কচি কচি জোয়ান পোলা দেখ্যা বুইড়া সোয়ামিরে এক্কেবারে ভুইলাই গেলা? ওরে আর মনে টানে না?”
​নানার এমন রসিকতা শুনে মেঘের হাসির বেগ আরও বিস্তৃত হলো। ওদিকে রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে আলেয়া বানু তার জন্মদাত্রী জুলেখা ইয়াসমিন আর নিজের গর্ভের সন্তান মেঘের এই মধুর ও চিরচেনা ‘সতীন’ ঝগড়ার সিন দেখে মিটমিট করে হাসতে লাগলেন। এটা এই বাড়িতে কোনো নতুন বিষয় নয়, বরং অতি পুরাতন আর নিয়মিত এক বিনোদন।

​“কী যে কও না তুমি সোয়ামী! তোমারে রাইখা কি আর কাউরে আমার মনে ধরে? হুনো না সোয়ামী–”
​নানা আকবর জুলানের সাথে কথা বলতে বলতে মেঘ ধীর পায়ে হেঁটে নিজের ঘরের বারান্দায় চলে এল। চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“হুনো বুড়ো, তোমারে এক্ষান গোপন কতা কই। এক্কেরে চিল্লাইবা না, আর জোরে কোনো কথাও কইবা না। ভুলেও কাউরে কিছু জানাইবা না কিন্তু!”
​নানা আকবর জুলানও মেঘের মতো সুর মিলিয়ে ওপাশ থেকে ফিসফিস করে চোরের মতো বললেন,
“কী কতা বউ?”
​“আমি কদিনের মইধ্যেই তোমার বাড়িতে আমু (আসব)। মাগার তোমার এই খ্যাপা মাইয়া যেন কিচ্ছু না জানে! এই আগেভাগেই কইয়া দিলাম। খালি তোমার মাইয়া না, তোমার বুড়ি বিবি, তোমার পোলা কেউ যেন টের না পায়। বুসসোনি (বুঝছ নাকি)?”
​আকবর জুলান ওপাশে মুচকি হাসলেন। তিনি খুব ভালো করেই বুঝলেন তার এই পাজি নাতনি আবারও পড়াশোনা আর বাড়ির কড়া শাসন ফাঁকি দিয়ে নানাবাড়িতে হাওয়া বদল করতে এবং তাদের সেই বান্ধবীদের ট্রিপের প্ল্যান সফল করার কোনো ফন্দি আঁটছে। তাই তিনিও আর কোনো প্রশ্ন না করে মেঘের সাথে দুষ্টুমিতে তাল মেলালেন। মেঘও নানার আশকারা পেয়ে মনে মনে তার সেই গোপন ‘কক্সবাজার’ মিশনের চাল চালতে শুরু করে দিল।

মোবাইলটা কেটে দিয়ে মেঘের মাথায় হুট করেই একটা কৌতূহল চাপল। সে চট করে মায়ের ফোনের ফেসবুক অ্যাপে ঢুকে পড়ল। সার্চ অপশনে গিয়ে টাইপ করল ‘শীর্ষ কারদার’। সার্চ বাটনে ক্লিক করতেই সর্বপ্রথম ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল নীল টিক চিহ্ন ছাড়া একটা পার্সোনাল প্রোফাইল, যা অলরেডি ফলোয়ার্স পেজ হিসেবে কনভার্ট করা। প্রোফাইল পিকচারে শীর্ষর একটা নেভি ব্লু শার্ট পরা, চশমা চোখে দেওয়া অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও গম্ভীর ছবি। আইডিতে পোস্টের সংখ্যা হাতে গোনা গুটি কয়েক, কিন্তু ফলোয়ার্স সংখ্যা প্রায় পনেরো হাজারেরও অধিক! আর সেই ফলোয়ার্সদের প্রোফাইল ঘাঁটলে দেখা যায়, তার নব্বই শতাংশই হলো তরুণী ও মেয়ে ফলোয়ার।​স্ক্রল করতে করতে হঠাৎই মেঘের তীক্ষ্ণ চোখ জোড়া গিয়ে আটকাল গত পরশুর করা একটা রিসেন্ট পোস্টে। যেখানে ব্যাকগ্রাউন্ডে ঢাকা-খুলনা হাইওয়ের গোধূলির আলো আর ফোকাসে শীর্ষর একটা আবছায়া ব্লার ছবি প্রকাশ পাচ্ছে। আর সেই ছবির ক্যাপশনে অত্যন্ত খাঁটি বাংলায় খুব সুন্দর করে খোদাই করে লেখা রয়েছে,

​❝মায়াবন বিহারিণী! তোমারই অপেক্ষায় দিনাপাত করছে এক তৃষ্ণার্ত প্রেমিক পুরুষ। মরুভূমির ন্যায় শুষ্ক ও খাঁ খাঁ করা এই হৃদমাঝার শীতল হবে কেবল তোমারই উষ্ণ অধরের একপশলা অবাধ্য বৃষ্টিতে!❞
​শীর্ষর আইডিতে এমন রোমান্টিক ও কাব্যিক ক্যাপশন পড়ে নিজের অজান্তেই মেঘের ভেতরের পুরো দেহে কেমন যেন একটা তীব্র জ্বলন ধরে গেল। বুকের ভেতর এক চরম ঈর্ষা ও জেলাসি অনুভব করেও ও নিজেকে সামলাতে পারল না, অবাধ্য আঙুলে ঢুকে পড়ল কমেন্ট বক্সে। সেখানে হাজারো পরনারীদের ‘হট’, ‘ক্রাশ’ আর ‘হ্যান্ডসাম’ উক্তি শুনে মেঘের ভেতরের সেই জ্বলন যখন দাউদাউ করে বাড়ছে, ঠিক তখনই ওর নজরে পড়ল একটা মেয়ের করা টপ কমেন্ট। সেখানে একটা ফর্সা মেয়ে লিখে রেখেছে,
​“তোমার সেই মায়াবন বিহারিণী যদি কোনোমতে আমি হতে পারতাম শীর্ষ! তবে ইহকালের জন্য নিজেকে ধন্য মনে করতাম!”

​সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা মেঘ তখনই খেল, যখন দেখল সেই মেয়েটির কমেন্টে শীর্ষ নিজে ‘কেয়ার’ রিয়েক্ট দেওয়ার পাশাপাশি নিজের অফিশিয়াল আইডি থেকে রিপ্লাই করেছে,
​“স্বপ্ন দেখতে ক্ষতি কী? সুন্দর স্বপ্ন তো মানুষের জীবনে কখনো না কখনো বাস্তব রূপ নেয়ই।”
​শীর্ষর নিজের হাতে করা সেই রিপ্লাইটা স্ক্রিনে দেখামাত্রই মেঘের পায়ের নিচের চেনা জমিনটা অযাচিত কারণে এক লহমায় আলগা হয়ে গেল। চোখ দুটো চড়কগাছ হয়ে বড় বড় হয়ে উঠল ওর। নিজের চোখের দৃষ্টি যেন মুহূর্তের মধ্যে ঝাপসা আর ঘোলাটে হয়ে আসতে চাইল।
​“আমার—আমার বুকটা এমন অস্থির লাগছে কেন? কেন অন্য কোনো মেয়েকে উদ্দেশ্য করে লেখা মেজরের এই উক্তি আমার বুকে তপ্ত বাণের মতো এসে বিঁধছে?”
মেঘ নিজের এই অবাধ্য প্রশ্নের কোনো যৌক্তিক উত্তর খুঁজে পায় না। সে এক্কেবারে আলুথালু পায়ে বারান্দা থেকে রুমে ঢুকে মায়ের মোবাইলটা বিছানায় ছুড়ে ফেলে দিল। তারপর ধপাস করে লুটিয়ে পড়ল নিজের গোছানো বিছানার ওপর। ওর হাত-পা রাগে আর এক অজানা অভিমানে কাঁপছে।
​কিন্তু, এই একগুঁয়ে আর অবুঝ ব্যাচারি এটা বিন্দুমাত্র জানেও না যে শীর্ষর এই পুরো উক্তি আর ‘মায়াবন বিহারিণী’ সম্বোধনটা কেবল ওকেই ঘিরে লেখা! আর ওই কমেন্টের রিপ্লাইটা মূলত মেঘকে আরও একটু জ্বালানোর জন্যই মেজরের দেওয়া এক মস্ত বড় চাল ছিল। যদি মেঘ কখনও ওর আইডি স্ক্রল করে; তাহলে যেন তা দেখতে পায়।

​কক্সবাজারের সেই রুদ্ধশ্বাস অপারেশন প্ল্যান ও ইনটেলিজেন্সের মিটিং শেষ করে সদ্যই নিজের সরকারি বাংলোতে ফিরেছে শীর্ষ। ঘামে ভেজা দেহে এক্কেবারে আঁটসাঁট হয়ে লেপ্টে আছে মেজরের সেই ফর্মাল খাকি ড্রেসটি। রুমে ফিরেই সে বেল্ট আর বুট জুতো খুলে সোজা ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল। আরেক দফা ঠান্ডা পানিতে স্নান সেরে, শরীরটা মুছে সামান্য একটা আরামদায়ক থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট পরে সে কিচেনে গেল কফি বানাতে। চিনি ছাড়া কড়া ব্ল্যাক কফি।​কফির মগটা হাতে নিয়ে ল্যাপটপ কোলে নিয়ে সে বেডরুমের খাটে বসে পড়ল বর্ডারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অফিশিয়াল কাজ সারণি করার জন্য। চোখের ওপর চড়ে বসল একটা অ্যান্টি-রিফ্লেক্টিভ রিডিং চশমা, যাতে একটানা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে চোখে কোনো সাইড ইফেক্ট না পড়ে।
​একাধারে প্রায় ঘণ্টা তিনেক ল্যাপটপের কি-বোর্ডে আঙুল চালানোর পর, কিছুটা ক্লান্ত হয়ে ঘাড় উঁচিয়ে দেওয়ালে টাঙানো ঘড়ির দিকে তাকাল ও। দেখল ঘড়ির বড় কাঁটা টিকটিক করে জানান দিচ্ছে রাত এখন নয়টা বেজে পঁয়ত্রিশ মিনিট।

​শীর্ষ ল্যাপটপটা একপাশে রেখে নিজের শক্ত হাত দিয়ে ঘাড়ে মৃদু ম্যাসাজ করতে লাগল। এতক্ষণ একনাগাড়ে কুঁজো হয়ে কাজ করার ফলে ঘাড়ের পেশিতে বেশ ভালোই ব্যথা অনুভব করছে ও।
​বেডসাইড টেবিলে রাখা নিজের পার্সোনাল ফোনটা হাতে নিয়ে লক স্ক্রিন আনলক করতেই ওপরে ভেসে উঠল ল্যাভেন্ডার রঙের শাড়ি পরিহিত মেঘের সেই চঞ্চল ও মায়াবী একটা ছবি। ঢাকার ছাদ থেকে খুব গোপনে, মেঘের অজান্তে এই ছবিটি তুলেছিল শীর্ষ।
​স্ক্রিনের ছবিতে একদফা গভীর ভালোবাসার চুম্বন এঁকে দিয়ে শীর্ষ খাটের ড্রয়ার থেকে একটা কাঠের ছোট বক্স বের করল। যার ভেতরে সারি সারি সাজানো রয়েছে গোয়েন্দা বিভাগের কয়েকটি বেনামী সিমকার্ড। সেখান থেকে একটা নির্দিষ্ট সিম নিজের ফোনে ঢুকিয়ে সে কল লাগাল তার দূর দেশের সেই অভিমানী প্রেয়সীর নম্বরে।​ওপাশে রিং হতেই মাত্র দুই সেকেন্ডের মাথায় কলটা রিসিভ হলো। কিন্তু ওপাশ থেকে ভেসে আসা কণ্ঠস্বরটা শুনেই মেজরের ভ্রু কুঁচকে গেল,

​“কে বলছেন?”
​অন্যান্য সময় মেঘের গলার সেই ঝাঁঝালো, লোকাল ঢাকাইয়া টোনের চঞ্চলতার সাথে এখনকার গলার বেজায় পার্থক্য! কণ্ঠস্বরটা বড্ড ভারী, মনে হচ্ছে দীর্ঘক্ষণ বালিশে মুখ গুঁজে একনাগাড়ে কেঁদেছে ও। কিন্তু কেন?​শীর্ষ আর কোনো লুকোছাপা বা হেয়ালি করে সরাসরি নিজের চেনা পুরুষালী গলায় প্রশ্ন না করে ভিন্ন গলায় প্রশ্ন করল,
​“কাঁদছিলে কেন?”

মেজর কারদার পর্ব ১১

​গত রাতে এই কণ্ঠস্বর শুনে মেঘ চ্যাঁত করে উঠলেও, আজ অলরেডি ফেসবুকে ওই কমেন্ট দেখে মেজরের ওপর এক পাহাড় সমান অভিমান জমা হয়ে গেছে ওর বুকে। তাই ওপাশের কণ্ঠটা চিনতে পেরেও সে কোনো রাগ দেখাল না। এক চরম উদাস আর ভাঙা গলায় উত্তর দিল,
​“কান্না যার গলার মণিকণ্ঠ, তার না কেঁদে আর উপায় কী বলুন? এই দুনিয়ায় কান্নাই এখন আমার একমাত্র বন্ধু, আর কান্নাই আমার পরম শত্রু!”

মেজর কারদার পর্ব ১৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here