Home মেজর কারদার মেজর কারদার পর্ব ১৮

মেজর কারদার পর্ব ১৮

মেজর কারদার পর্ব ১৮
ফিনারা ঝুমুর

বিকেলের ম্লান আলো এসে ছুঁয়েছে আকাশকে, তবুও চারপাশটা কেমন যেন মেঘলা ও গুমোট। গত রাতে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে বয়ে যাওয়া সেই প্রলয়ঙ্কারী কালবৈশাখীর ছটা আজ এই ব্যস্ত নগরী ঢাকাকেও নিজের সাথী বানিয়ে নিয়েছে। সারারাত ধরে চলা বড় বড় ফোঁটার বৃষ্টি এই ইট-পাথরের শহরকে এক সুমিষ্ট নিদ্রা যাপনের শীতল রাত্রীতে পরিণত করেছিল। সাধারণ মানুষ ঘরের কোণে আরামের ঘুমে রাত পার করলেও, রাস্তার ধারে পড়ে থাকা গৃহহীন পথচারীরা যে বড়ই কষ্টে সেই দুর্যোগ মানিয়েছে, তা শহরের ভেজা পিচঢালা রাস্তাই সাক্ষ্য দিচ্ছে।
​ঢামেক থেকে কিছু সময় পূর্বেই অধ্যায়নের পাঠ চুকিয়ে বের হয়েছে কিঞ্জা। ওর পরনে রয়েছে কালচে খয়েরী রঙের একখানা কুর্তি আর ডেনিম জিন্স। গলার কাছে ঝুলছে ঢামেকের চেনা আইডি কার্ড। সালোয়ার স্যুটের ওপর শোভা বর্ধন করছে ডাক্তার বা হবু ডাক্তারদের চিরাচরিত সেই সাদা এপ্রোন, আর গলায় এখনও পেঁচানো রয়েছে স্টেথোস্কোপ। সদ্য শাঁখারি বাজার থেকে নিজের প্রয়োজনীয় কী যেন একটা জিনিস কিনে পুরান ঢাকার চিরচেনা গলির মুখে পা বাড়িয়েছে সে।

​বাড়ির ব্যক্তিগত দামী গাড়ি থাকা সত্ত্বেও অলস জ্যাম এড়াতে কিংবা নিজের ইচ্ছাতেই রিকশা কিংবা পায়ে হেঁটেই যাতায়াত করতে পছন্দ করে ও। বিত্তশালী পরিবারের মেয়ে হয়েও অতি সামান্য ও সাধারণ জীবনযাপন তার। এই গলির ঠিক চারটে গলি পরেই ওদের নিজস্ব বাসভবন। কিন্তু একি! গলির মুখে পা রাখতেই আচমকা কিঞ্জার তীক্ষ্ণ নজরে ভেসে উঠল অন্য এক অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্য।
​গলির ভেতরের অন্ধকারের আড়ালে কাকে যেন একটা শক্ত হকি স্টিক দিয়ে বেধড়ক পেটাচ্ছে এক দীর্ঘকায় শ্যামরঙা পুরুষ। মারের চোটে মাটিতে পড়ে থাকা লোকটাকে ইতিমধ্যে রক্তাক্ত করে পুরো কাদার সাথে মিশিয়ে দিয়েছে সে, তবুও যেন সেই মারকুটে পুরুষটির ভেতরের আদিম তেজ ও আক্রোশ বিন্দুমাত্র কমছে না। মারতে মারতে পুরুষটি হঠাৎ চুল ঝাঁকিয়ে মাথা তুলতেই কিঞ্জার চোখের সামনে দৃশ্যমান হলো এক ঘামার্ত, চেনা পৌরুষদীপ্ত আনন – প্রহর ইবনাত!
​তার পরনের কালো রঙা পাঞ্জাবিটা গায়ের ঘামে আর বৃষ্টির ছাঁটে যেন জুবুথুবু হয়ে লেপ্টে আছে শরীরের সাথে। কিঞ্জা নিজের চোখের কোণে এক অদ্ভুত উল্লাস ও মায়া নিয়ে ধীরপায়ে সামনে আগায়। ও যত আগাচ্ছে, আগুনের আলো-ছায়ার মতো প্রহরের সুগঠিত কায়া তত ওর সামনে সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে।
​“প্রহর ইবনাত এই প্রকাশ্য দিবালোকে জনসম্মুখে মানুষ পেটাচ্ছে! খুব গুরুতর কোনো কারণ তো বটেই, তাই না হবু এমপি সাহেব- ?”

​নিস্তব্ধ গলির মাঝে অত্যন্ত চেনা কারোর কণ্ঠস্বর শুনে প্রহর ইবনাতের হাতের সেই হকি স্টিকটা মাঝ আকাশেই থমকে গেল। মাটিতে পড়ে থাকা লোকটা ততক্ষণে মারের চোটে পুরোপুরি অজ্ঞান। প্রহর নিজের কপালে জমা ঘাম হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে, তীব্র ভ্রু কুঞ্চিত করে পাশে এসে দাঁড়ানো মেয়েটির দিকে তাকাল। বড়ই বিরক্ত ও শীতল তাহার সেই চোখের চ্যাঁতানো চাউনি।
​“হু— হু আর ইউ? আমার চেনা কেউ?”
​প্রহরের সেই বরফশীতল ও রুক্ষ স্বর শুনেও কিঞ্জার ভেতরের আত্মবিশ্বাসে কোনো চির ধরল না। ও নিজের আগের তেজ ও ঠোঁটের কোণের মৃদু হাসি বজায় রেখেই সপাটে প্রত্যুত্তর করল,
​“মাই নেইম ইজ কিঞ্জা। উহু, এভাবে চিনবেন না কিঞ্জা কারদার!”
​“আই সি। মেজর শীর্ষ কারদারের সিবলিংস ওর নট?”
প্রহর নিজের হাতের হকি স্টিকটা মাটিতে ঠেকিয়ে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিল কিঞ্জার পানে।​কিঞ্জা শাঁখারি বাজার থেকে ক্রয়কৃত জিনিসের প্যাকেটটা একহাতে শক্ত করে ধরে, দুই হাত বুকের ওপর বাঁধিয়ে এক মিষ্টি ও কায়দা করা হাসি হাসল।

​“হ্যাঁ, মেজর শীর্ষ কারদার আমার আপন বড় ভাইয়া।”
​প্রহর এবার নিজের হাতের হকি স্টিকটা পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তার বিশ্বস্ত চ্যালা নাহিদের হাতে চালান করে দিল। তারপর কিঞ্জার থেকে ঠিক দুই গজ একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে ওকে ফের প্রশ্ন করল,
“তা এই পুরান ঢাকার নোংরা রাস্তায় এই ভরসন্ধ্যায় তোমার কী কাজ, কন্যা?”
​ওর কণ্ঠে কোনো উচ্ছ্বাস বা উৎফুল্লতা নেই। স্রেফ এক শীতল, নির্জীব আর পাথুরে কাঠিন্য।​কিঞ্জা এপ্রোনের পকেটে এক হাত গুঁজে দিয়ে বলল,
“স্টাডি শেষ করে বাড়ি ফিরছিলাম। কিন্তু পথান্তরেই নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষের দর্শন পেয়ে গেলাম। ভাগ্য আমার আজ বড্ড তুষ্ট! যাকে মনে মনে খুঁজছিলাম, তাহার দেখা মিলল অবশেষে।”
​কিঞ্জার এমন সরাসরি ও সাহসী কথায় প্রহর ইবনাতের ললাটে কোনো চিন্তার ভাঁজ পড়ল না। সে নিজের স্বভাবসুলভ গম্ভীর জো বজায় রেখেই সোজাসুজি বলে দিল,
​“আমার পেছনে ঘুরে কোনো লাভ নেই কন্যা। আমায় কোনোদিন নিজের খাঁচায় পাবে না তুমি। বৃথা চেষ্টা ছেড়ে দাও।”

​কিঞ্জা এবার শব্দ করে হাসল। বড়ই মনমুগ্ধকর আর জাদুকরী তাহার সেই মুক্তোঝরা হাসি যে হাসির মায়ায় যেকোনো সাধারণ পুরুষ এক নিমেষে ফেঁসে যেতে বাধ্য। কিন্তু ফঁসল না এই পাষাণ পাথর মানব।​ওর হাসির রেশ টেনেই কিঞ্জা প্রহরের চোখের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় গলায় বলল,
“লাভ-লোকসানের কোনো হিসেবি কোঠার ভিত নেই আমার এই ছোট্ট মনের মাঝে। আপনাকে মনেপ্রাণে ভালোবাসি বলেই যে আমি লাভের খাতা খুলে লাভ-ক্ষতির অংক মেলাতে বসবো, তা নয় প্রহর ইবনাত। স্রেফ আপনাকে নিজের করে ছিনিয়ে নেবো। আমার রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়ার দায়ে, এই ভালোবাসার আজীবন কারাগারে আপনাকে আমি বন্দি করবই করব। এটা কিঞ্জা কারদারের চ্যালেঞ্জ!”
​প্রহর এবার আর অবাক না হয়ে পারল না। একটা মেয়ে তার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্য রাস্তায় এভাবে সরাসরি ভালোবাসা প্রকাশ করছে, আবার একই সাথে তাকে নিজের করে পাওয়ার মিষ্টি হুমকিও দিচ্ছে! ভালোই তো, কারদার বংশের রক্ত বলে কথা।​সে নিজের পাঞ্জাবির কলারটা সামান্য ঠিক করে নিয়ে এক পলক কিঞ্জাকে দেখল, তারপর গম্ভীর গলায় বলল,
“অনেক পাকামো হয়েছে। এবার সোজা বাড়ি যাও কন্যা।”
​বলেই প্রহর আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না, কিঞ্জাকে একাকী গলির মুখে ত্যাগ করে নিজের সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে গন্তব্যের দিকে হনহন করে চলে গেল। ওদিকে কিঞ্জাও কোনো মন খারাপ না করে, এক শান্ত ও তৃপ্ত মনে নিজের বাড়ির পথ ধরল। গোধূলির এই ম্লান আলোয় ভেজা রাস্তায় একা একা হাঁটতে ওর বড্ড ভালোই লাগছে আজ। তাই হয়তো এই হাঁটার ছলেই, অলক্ষ্যে দেখা মিলে গেল ওর জীবনের সেই আরাধ্য প্রেমিক পুরুষের!

বিকেল শেষে নিকষ কালো সন্ধ্যা নেমে এসেছে এই মায়াবী ধরিত্রীতে। বনের পাখিদের চেনা কোলাহল অনেক আগেই শেষ হয়েছে। দূরের ওইরাবার বাগান বা আশে-পাশের কোনো স্থানের দিক থেকে ভেসে আসা ঝিঁঝিঁপোকার দল যেন এখন সুরের মস্ত বড় গানের আসর বসিয়েছে এই ডাক্তার বাড়ির চারপাশে। বৃষ্টির জমা পানিতে তাদের সাথে কর্কশ সুরে গলা মিলিয়ে যুক্ত হয়েছে ব্যাঙরাও।
​জানালার কাঠের গ্রিল ধরে বেখেয়ালি মনে একাকী বসে আছে মেঘ। ওর চোখের মণি দুটো কান্নায় আর নিঘুম ক্লান্তিতে জবা ফুলের মতো লালচে হয়ে আছে। স্বভাবসুলভ চেনা শ্যামলা চেহারাটা আতঙ্কে ও বিষাদে একদম ফ্যাকাশে, নিস্প্রভ দেখাচ্ছে। কামড়ের চোটে ঠোঁটগুলোও কালচে রূপ নিয়েছে। গোসলের পর দীর্ঘ লম্বা ভেজা চুলগুলো ভালো করে না মোছার ফলে, তা থেকে টুপটাপ করে বরফশীতল পানি চুইয়ে পড়ছে ঘরের পুরনো সেগুন কাঠের ফ্লোরের ওপর।
​“মেঘ, ভেতরে আসব রে?”

​বাইরে থেকে ফাতিমার অপরাধী মেশানো গলা শুনেও মেঘ সম্পূর্ণ নিশ্চুপ রইল। কোনো পরিবর্তন বা নড়াচড়া দেখা গেল না তার শান্ত অবয়বের মাঝে। মেঘকে চুপ থাকতে দেখে ফাতিমা, তানিয়া আর রাইসা ধীরপায়ে ঘরের ভেতর প্রবেশ করে ওর একদম কাছে এসে দাঁড়ায়। তিনজনই মাথা নিচু করে ম্লান ও মনমরা মুখে বলে,
​“মেঘ, উই আর রিয়ালি সরি রে! কাল ওভাবে তোকে বাগানের মাঝে ফেলে একলা চলে আসার জন্য আমরা সত্যিই অপরাধী। আসলে নিজেদের মধ্যে আড্ডা আর কথায় কথায় তোকে যে আমরা পেছনে ফেলে এসেছি, সেই খেয়ালটাই আমাদের মাথা থেকে একদম উবে গিয়েছিল।”
​মেঘ এবারেও পাথরের মূর্তির মতো চুপ করে রইল, যেন ও এই ঘরে একা, কেউ নেই পাশে।
​“আমরা তো আসলে বিন্দুমাত্র বুঝতে পারিনি তুই হঠাৎ করে এভাবে সিক হয়ে যাবি। তোর নানার মুখে শুনলাম তুই নাকি সিএমএইচ-এ ছিলি। আমরা সত্যিই অনেক দুঃখিত রে বন্ধু।”
রাইসা সুর মেলালো।​কিন্তু মেঘের কোনো নড়াচড়া নেই। সে আগের মতোই শূন্য দৃষ্টিতে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। এবার মেঘের এমন গুমোট আর তাচ্ছিল্যপূর্ণ এটিটিউড দেখে ওরা নিজেদের অপরাধবোধ ভুলে ভেতর ভেতর বেশ বিরক্ত হয়ে উঠল। তানিয়া এবার নিজের ভেতরের রাগ সামলাতে না পেরে গলা চড়াও করে বলেই ফেলল,

​“ঐ মেঘ! তুই এমন একটা ভং ধরে বসে আছিস কেন বল তো? তোকে তো মাঝেমধ্যেই এমনভাবে ফেলে আমরা চলে এসেছি আর তুই আর সবসময় ফিরে আসতিস? কত নাটক রে তোর! বাব্বাহ! সামান্য একটু মাথা ঘুরে অজ্ঞানই তো হয়েছিস, মরে তো আর যাসনি! এত ভাব দেখানোর কী আছে? যত্তসব!”
​তানিয়া মাত্রই তার বিষাক্ত কথাটুকু শেষ করেছে, আর ঠিক তখনই চোখের পলকে মেঘ নিজের জায়গা থেকে চিতার মতো ক্ষিপ্রতায় উঠে দাঁড়িয়ে এক সপাটে কড়া চড় বসিয়ে দিল ওর গালে!

​নিস্তব্ধ ঘরটায় চড়ের আওয়াজটা তীরের মতো বিঁধল। তানিয়ার ফর্সা তুলতুলে গালে মেঘের হাতের পাঁচ আঙুলের গভীর ও রক্তাভ ছাপ স্পষ্ট হয়ে ভেসে উঠল মুহূর্তের মাঝেই।
​“আওয়াজ নিচে! নিজের ওই নোংরা গলার আওয়াজ একদম নিচে নামিয়ে কথা বল তানিয়া! চুরি চুরি,আবার সিনা চুরি? তোদের মতো স্বার্থপর, বিশ্বাসঘাতকদের মুখে এই চড়াও গলা একদম মানায় না রে। শুনতে হুবহু চোরের মায়ের বড় গলার মতোই শোনায়!”
​ওদের তিনজনের আকস্মিক ও বিস্মিত ফ্যাকাশে চেহারাটা অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় একবার পরখ করে নেয় মেঘ। তানিয়া তখন নিজের গালে হাত দিয়ে রাগে, অপমানে এক্কেবারে অগ্নিশর্মা হয়ে কাঁপছে।​মেঘ ওদের দিকে এক কদম এগিয়ে গিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“তোরা তিনজনে মিলে মনে মনে ঠিক কী ভেবেছিলি রে? গতরাতে আমায় ওই নরপশুদের, ওই ক্ষুধার্ত হায়েনাদের মুখে একলা নির্জন বাগানে ফেলে রেখে তোরা যে নিজেদের চামড়া বাঁচাতে পালিয়ে এসেছিস আমি সতেরো বছরের মেয়েটা তা বিন্দুমাত্র বুঝিনি? তোদের নিজেদের মতো এতটা বলদ আর বোকা মনে হয় আমাকে?”

​মেঘের মুখের এই অকাট্য ও ধারালো সত্য কথা শুনামাত্রই তিন বান্ধবীর মুখের সমস্ত রক্ত যেন এক লহমায় চুরমার হয়ে সরে গেল। ওরা ভয়ে ও আতঙ্কে কাঁপতে লাগল। ওদের চোখমুখ চিরে এবার মেঘ এক ভয়ঙ্কর আক্রোশে বলে উঠল,
​“তোরা চাইলে, তোদের ওই তিন জোড়া হাত বাড়িয়ে কাল অনায়াসে আমায় ওই নরক থেকে বাঁচাতে পারতিস! কিন্তু তোরা তা করিসনি। নিজেরা সুস্থ শরীরে পালিয়ে বেঁচেছিস। তা বলে তোরা ভুলেও ভাবিস না যে আমি তোদের এই বেইমানি এত সহজে ছেড়ে দিচ্ছি। এই মেঘালয়াকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার জন্য তোদের জীবনে অনেক বড় পস্তানি অপেক্ষা করছে, জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড সি!”
​রাইসা মেঘের মুখের এমন চরম অপমান আর হুমকির কথা কোনোভাবেই সহ্য করতে পারল না। সে নিজের অহংকারী রূপ নিয়ে ত্যাড়ছা ভাবে কোমর দুলিয়ে কদর্য সুরে বলে উঠল,
​“আরেহ রাখ তোর হুমকি! নিজে তো কাল রাতে একলা বনের ভেতর কার কার সাথে রাত কাটিয়েছিস খোদা ভালো জানে! একে তো তুই এক প্রকার ধর্ষিতা, তার ওপর আবার এত বড় বড় বাঘের মতো আনাগোনা দেখাচ্ছিস আমাদের? কী করবি রে তুই আমাদের, শুনি? সামান্য একজন স্কুল মাস্টারের গরিব মেয়ে হয়ে তুই এই শহরের এত বড় বড় নামকরা বিজনেসম্যানের মেয়েদের সাথে তোয়াক্কা করতে আসিস? আমাদের ক্ষতি করার ক্ষমতা আদেও তোর ওই মাস্টারের রক্তে আছে বলে মনে হয়?”

​“আর এই সামান্য মাস্টারের মেয়ের পেছনেই তো তোরা তিন কুত্তী এতদিন ধরে লেজ নেড়ে পা চাটতিস! তোদের এই বেইমান মুখগুলো এখন দেখলে আমার তীব্র ঘৃণায় বমি আসছে, ইচ্ছে করছে তোদের মুখের ওপর থুতু চেটাতে!”
​মেঘের করা এমন চরম ও জঘন্য অপমান ওরা তিনজনে চুপচাপ দাঁত কামড়ে মেনে নিতে বাধ্য হলো, কোনো পাল্টা জবাব দিতে পারল না। কারণ ওরা খুব ভালো করেই জানে, এটা মেঘের নানার বাড়ি। আর এই এলাকার দাপুটে ডাক্তার আকবর জুলানের বাড়িতে দাঁড়িয়ে নাতনির সাথে বেশি বাড়াবাড়ি বা চেঁচামেচি করলে স্থানীয় মানুষ ওদের জ্যান্ত পুঁতে ফেলবে!

দোতলার বদ্ধ ঘরের গুমোট নীরবতা চিরে হুট করেই নিচতলা থেকে ভেসে আসতে লাগল বেশ কিছু পরিচিত মানুষের কথাবার্তার চড়া আওয়াজ। মেঘ তখনও নিজেকে চার দেয়ালের মাঝে বন্দি করে জানালার গ্রিল ধরে একাকী বসে আছে। বান্ধবীদের করা চরম অপমান আর নিজের ভেতরের ট্রমার মাঝেও ওর সজাগ কান এড়াতে পারল না নিচে চলমান ড্রয়িংরুমের সেই কথার চমৎকার রেশ।
​“কই গো বড় বউমা! জলদি এদিকে এসো, দেখো কে এসেছে! আমাদের পিংকির বড় জায়ের সুপুত্র এসেছে। আমাদের এই গরীব গৃহে মেজরের পা পড়েছে, চটপট ওনার আপ্যায়নের ব্যবস্থা করো।”
​মেঘের নানা ডাক্তার আকবর জুলানের এমন উৎফুল্ল কণ্ঠস্বর শুনে নিচে সোফায় বসা শীর্ষর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মোলায়েম ও অমায়িক হাসি ফুটে উঠল। বাইরের সেই কঠোর, রক্তপিপাসু মেজরের রূপ ঝেড়ে ফেলে সে এখন এক আদর্শ বিনয়ী যুবক।​সে অত্যন্ত নরম গলায় বলল,
“আরে এত ব্যস্ত হবেন না নানা ভাই। আমি আসলে কোনো আপ্যায়ন নিতে আসিনি, এসেছি বড্ড জরুরি একটা দরকারে।”

​“তা তো আমি বুঝতেই পেরেছি নানা ভাই! কাজ আর দরকার ছাড়া কি আর এই বুড়ো ডাক্তারের ভাঙা বাড়িতে তোমার মতো বড় মেজরের পা পড়বে? তা বলো শুনি, কী সেই জরুরি দরকার?”
আকবর জুলান চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে কৌতূহলী চোখে তাকালেন।​শীর্ষ সোফায় আরও একটু আরাম করে বসতে বসতে পকেট থেকে একটা দামী স্মার্টফোন বের করে টিপয়ের ওপর রাখল। তারপর শান্ত গলায় বলল,
​“গতকাল রামু রাবার বাগানে মেঘের ফোনটা হুট করে হারিয়ে গিয়েছিল। ওটা ওখানেই পড়ে ছিল, আমার লোক কুড়িয়ে পেয়েছে। সেটাই মূলত মেঘের হাতে ফেরত দিতে নিজে চলে এলাম।”
​নাতনির হারিয়ে যাওয়া ফোন মেজরের হাত দিয়ে ফেরত এসেছে দেখে আকবর জুলান বেশ খুশি হলেন। তিনি মনে মনে শীর্ষর এই দায়িত্ববোধের তারিফ করে মিষ্টি করে হাসলেন। তারপর পরম স্নেহে শীর্ষর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে একগাল হেসে শুধালেন,

​“তা খুব ভালো করেছো নানা ভাই, অনেক বড় উপকার করেছো। তা এই সুযোগে তোমায় একটু খাতির-তোয়াজ তো করতে পারব। তা নানা ভাই, আর্মির চাকরি তো করছো ঢের হলো, তা বিয়েথা কি আদেও করেছো? নাকি এখনও আমার মতো এই বিয়ের আসল সুখ পাওনি? আমিতো বিয়েও করে বিয়ের সুখ পেলাম না”
​নানার মুখে বিয়ের কথা শুনতেই শীর্ষর চোখের কোণটা অলক্ষ্যে একবার দোতলার সিঁড়ির দিকে ঘুরে এল। যেখানে ওর সদ্য বিবাহিতা হবু রানী লুকিয়ে আছে। সে মুখটা সামান্য বাঁকিয়ে বেশ মাসুম একটা চেহারা বানিয়ে বলল,
​“কী যে করি বলুন তো নানা ভাই? বাজারে তো অনেক মেয়েই খুঁজলাম, কিন্তু আপনার এই গিন্নী অর্থাৎ আমার এই রূপবতী নানীর মতো তো আর দ্বিতীয় কাউকে পেলাম না! তাই মনে ধরে না কারও, বিয়েটাও আর করা হলো না। তবে আপনার রাজকপাল বটে নানা ভাই! আপনার তো এই মূল বউ ছাড়াও ঘরে আরও তিন-তিনটে চাঁদের মতো বউ রয়েছে!”
​শীর্ষর মুখে নিজের মিথ্যে বহুবিবাহের প্রশংসা শুনে আকবর জুলান যেন এক লাফে বিশ বছর তরুণ হয়ে গেলেন। তিনি বড়ই মিষ্টি আর গর্বের একখানা হাসি দিলেন।

​“আরেহ বলো না নানা ভাই! এই চার-চারটে বউ নিয়ে বেশ সুখেই আছি নাতি। তবে এই প্রথম জন, মানে আমার এই বুড়িটা ইদানীং বড্ড বেশি জ্বালাচ্ছে আমায়!”
​শীর্ষ এবার সুযোগ বুঝে চোখ টিপে দুষ্টু হেসে বলল,
“তাহলে এক কাজ করুন নানা ভাই, এই রেখা বুড়িকে নাহয় আমার করেই দিয়ে দিন! পাক্কা প্রমিস করছি আপনাকে, আপনার এই জানের টুকরো বউকে আমি নিজের হবু বউয়ের থেকেও অনেক বেশি আদরে আর রাজপ্রাসাদে রাখব।”
​শীর্ষর মুখে এমন ত্যাড়ছা কথা শুনে আকবর জুলানের মুখের হাসি এক নিমেষে চুপসে গেল! তিনি চরম রেগে গিয়ে ত্যাড়ছা চোখে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জুলেখা ইয়াসমিনের দিকে তাকালেন। আর তাকিয়েই দেখলেন তাঁদের সেই বুড়ি রানী মেজরের এমন রসিকতায় লজ্জায় লাল হয়ে মুখের শাড়ির সুতি আঁচলটা দাঁত দিয়ে গুজে ফিকফিক করে হাসছে!​জুলেখা ইয়াসমিন নিজের স্বামীর ওই হিংসুটে মুখ দেখে আরও দুষ্টু হেসে শীর্ষর দিকে তাকিয়ে আঞ্চলিক টোনে বলে উঠলেন,
​“আহো নাতি আহো! তোমারেই আইজ থেইকা আর পরানের সোয়ামী বানাইলাম। এমনেও এই খিটখিটে বুইড়াটারে আর আর সহ্য অয় না! খালি বুড়া বয়সে নাতিনগো বয়সী নাতিনগরে মিছা মিছা ঘরের বউ বানায়! হের চেয়ে তুমিই অনেক ভালা আছো নানা ভাই, আজ থেইক্যা তুমিই আর আসল সোয়ামী!”
​জুলেখা ইয়াসমিন চোখ নাচিয়ে শীর্ষকে দেখতে দেখতে কথাগুলো বলতেই, শীর্ষও এক কাঠি ওপরে গিয়ে চরম গা-জ্বালানো ভাব নিয়ে জুলেখা ইয়াসমিনের ডান হাতখানা নিজের শক্ত মুঠোয় টেনে নিল। তারপর আকবরের সামনেই দস্তুরমতো পরম আকুলতায় বুড়ির হাতের উপরিপৃষ্ঠে অকপটে একখানা গভীর চুমু খেল!​তা দেখে তো ডাক্তার আকবর জুলান রাগে এক্কেবারে আগুন হয়ে গেলেন! তিনি নিজের লাঠিটা সোফার পাশে ঠুকে চেঁচিয়ে উঠলেন,

​“ওই ছ্যাড়া ওই! একদম বাড়াবাড়ি করবা না কইলাম! যখনই সুযোগ পাও, আমার এই প্রবীণ বউ লইয়া কেন টানাটানি করো হ্যাঁ? নিজের মুরোদ থাকলে নিজে একটা জলদি বিয়া কইরা নিজের বউয়ের লগে গিয়া চিপকাও! আমার মালকিনরে ছাড়ো!”
​শীর্ষ এবার আরও নিষ্পাপ চেহারা বানিয়ে বলল,
“কী আর করমু নানা ভাই? আপনার মতো তো আর আমার রাজকপাল নাইক্কা যে ডানে-বাঁয়ে চারখান বিবি লইয়া রাজকীয় স্টাইলে ঘুরমু! নিজে তো চার-চারখান বিবি একলা বগলদাবা কইরা রাখছেন, এই গরিব নাতিরে নাহয় ওখান থেইক্যা এক্ষান দান কইরাই দেন!”
​আকবর জুলান আর সহ্য করতে না পেরে ঝট করে এগিয়ে এসে জুলেখা ইয়াসমিনকে নিজের এক বাহুর নিচে শক্ত করে জড়িয়ে নিলেন। তারপর শীর্ষর দিকে হাত ঝাড়া দিয়ে রাগত স্বরে বললেন,
​“যা যা, অনেক হইছে! আমার বাকি যে তিন বউ, তারা মানেই তো আমার তিনখান জোয়ান নাতীন! তো ওগো মইধ্যে থেইক্যা কাউরে পছন্দ হইলে ওরে লইয়াই এই ঘর থেইক্যা জলদি ভাগো!”

​নানার মুখে নাতনীদের প্রসঙ্গ তথা পরোক্ষভাবে মেঘের সবুজ সংকেত পাওয়ামাত্রই শীর্ষর চোখের মণি দুটো উল্লাসে চকচক করে উঠল। সে নিজের একদিকের ভ্রু নাচিয়ে জাঁদরেল গলায় বলল,
​“হাসা কইতেচুন নানা ভাই? পরে আবার মত পাল্ডাইবেন নি তো? যদি পরে মত পাল্ডান, তবে এই জুলেখা ইয়াসমিন বুড়িরে এই আর্মি জিপে তুইলা লইয়া গিয়া সোজা বাসর করমু কইয়া দিলাম!”
​আকবর জুলান এবার নিজের পায়ের চটি খুলে শীর্ষর দিকে মারার জন্য তেড়ে আসতে নিলেই, শীর্ষ নিজের স্বভাবসুলভ গাম্ভীর্য ভুলে হো হো করে এক চিলতে প্রাণখোলা হাসিতে ফেটে পড়ল। মেজরের সেই চনমনে হাসি দেখে রাগ ভুলে স্বয়ং আকবর জুলান আর জুলেখা ইয়াসমিনও একযোগে হেসেই কুটি কুটি হলেন।

নিচতলার সেই হাসির রেশটুকু পেছনে ফেলে ধীরপায়ে দোতলার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে আসে শীর্ষ। আকবর জুলান আর জুলেখা ইয়াসমিনের পরম যত্নের আপ্যায়ন গ্রহণ করেই অবশেষে নিজের সদ্য বিবাহিত, লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা লুকায়িত বউয়ের ঘরের সামনে এসে দাঁড়াতে পেরেছে সে। দরজায় মৃদু করাঘাত করে ভেতরে প্রবেশ করতেই শীর্ষর চোখ যায় জানালার দিকে।
​“হেলথের কী অবস্থা এখন?”
​পরিচিত সেই গম্ভীর অথচ ভেতর থেকে চুইয়ে পড়া মায়াবী কণ্ঠস্বর শুনে মেঘ জানালা থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। দেখে দ্বারের সামনে পরনে সেই স্টিল গ্রে রঙা শার্ট আর পকেটে দু-হাত গুঁজে এক রাজকীয় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে মেজর শীর্ষ কারদার।

​“ভেতরে আসুন।”
​মেঘ নিজের ভেতরের অস্বস্তিটুকু লুকিয়ে শীর্ষর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে কৌশলে প্রসঙ্গটা ঘুরিয়ে ফেলে। শীর্ষ ধীরপায়ে ঘরের ভেতর প্রবেশ করে। মেঘের সাথে অযাচিত কোনো দূরত্ব না রেখে, ওর একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। আগুনের মতো তীক্ষ্ণ চোখে মেঘের ফ্যাকাশে মুখটা মেপে নিয়ে ভ্রুকুঞ্চিত করে বলে,
​“নিজের শরীরের এই হাল করে রেখেছ কেন? এ কেমন অবস্থা করেছ হেলথের?”
​মেঘ একটা তাচ্ছিল্যের তপ্ত শ্বাস ফেলে জানালার গ্রিলটা শক্ত করে ধরে বলে,
“সমাজের চোখে এক ধর্ষিতা মেয়ের এর থেকে বেশি ভালো আর কী-ই বা দশা হতে পারে, মেজর সাহেব?”
​মেঘের মুখ থেকে ধর্ষিতা শব্দটা বের হওয়া মাত্রই শীর্ষর চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। সে এক কদমে মেঘের সাথে থাকা সমস্ত দূরত্বটুকু এক নিমেষে ঘুচিয়ে দেয়। মেঘ কিছু বুঝে ওঠার আগেই শীর্ষ নিজের চওড়া ও উষ্ণ দু-হাতের আঁজলায় মেঘের ফ্যাকাশে, চোয়াল বসে যাওয়া মলিন আননখানা আলতো করে ওপরে তুলে ধরে। ওর চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে এক সম্মোহনী ও বজ্রকঠিন সুরে বলে ওঠে,
“ধষির্তা নারী অপবিত্র হয় না। তারা পূর্বের ন্যায় পবিত্র

পুষ্পমঞ্জুরী রয়ে যায়। এ সমাজ যাকে কুলষিত, অপয়া, সতীত্বহীন বলে ; সেই আসলে শুভ্র নয় আধারি পুষ্প। যাকে বাহিরের অযাচিত রঙ স্পর্শ করতে পারে না। আমার চোখে তুমিই সেই নারী ; যে কোনো ধর্ষিতা নয় বরং আদরে মুড়িয়ে নেওয়া এক দিশারি রাজকন্যা।”
​শীর্ষর মুখের এই প্রতিটি গভীর ও জাদুকরী বাণী যেন মেঘের অবশ হয়ে যাওয়া হৃদয়ের কোষে কোষে গিয়ে এক তীব্র তোলপাড় সৃষ্টি করল। ওর চোখের পাতা বেয়ে টুপটুপ করে কয়েক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল শীর্ষর হাতের তালুতে। ভেতরটা যেন কেউ এক লহমায় ঘুরিয়ে দিল ওর। শীর্ষ আর এক মুহূর্তও মেঘকে দূরে সরিয়ে রাখল না; এক তীব্র পুরুষালী টানে ও মেঘকে নিজের চওড়া ও নিরাপদ বুকের মাঝে টেনে নিল। পরম তৃপ্তিতে নিজের থুতনিটা ওর রেশমী ভেজা চুলে ঠেকিয়ে এক আদুরে সুরে বলল,
​“তুমি ধর্ষিতা নও মেঘালয়া। গত রাতে কী ঘটেছিল, না ঘটেছিলতার সবটা আমি খুব ভালো করেই জানি। সো, নিজেকে আর কষ্ট দিও না।”
​মেঘ নিজের সবটুকু ক্লান্তি আর অধিকারবোধ নিয়ে শীর্ষর সেই স্টিল গ্রে রঙা শার্টের পেছনের অংশটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে। ওর চওড়া ছাতিতে মুখ গুঁজে সামান্য ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতেই ও অভিমানের সুরে বলে ওঠে,

​“এই একটা নামমাত্র মিথ্যে বিয়ে নিয়ে আপনি এত কেন মাতামাতি করছেন, মেজর সাহেব? কেন আর দশটা সাধারণ মানুষের মতো আপনিও মেনে নিচ্ছেন না যে আমি কলঙ্কিত, আমি ধর্ষিতা? কেন সপাটে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছেন না আমায় এই ঘর থেকে? কেন মিছেমিছি এই সান্ত্বনা দিচ্ছেন আমায়?”
​শীর্ষ মেঘের চুলে আলতো করে বিলি কেটে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“বিয়ে কখনো মিথ্যে বা নামমাত্র হয় না মেঘালয়া। এই বিয়ে ভাঙার বা সতীত্ব মাপার নোংরা খায়েশ যাদের মনে থাকে, তাদের বিয়েই একদিন সহজে ভেঙে যায়। আজ তোমার স্থলে যদি আমার নিজের দুটো ছোট্ট বোন মিথিলা আর কিঞ্জা থাকত, আর ওরাও যদি এমন কোনো পরিস্থিতির শিকার হতো, তখনও কি আমি বলতাম যে ওরা ধর্ষিতা বা অপবিত্র? না, বলতাম না। হ্যাঁ, মিথিলা আমার আপন বোন নয়, কাকাতো বোন। তাতে কী হয়েছে, বোন তো! ঠিক তেমনই তুমি আমার জীবনে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে জুড়ে যাওয়া এক পবিত্র অংশ। সমাজ তোমায় যা-ই বলুক না কেন, যতদিন না তোমার আর আমার এই সম্পর্কের চূড়ান্ত ইস্তফা হচ্ছে, ততদিন না হয় তোমায় এই শীর্ষ কারদার নিজের বুক দিয়ে আগলে রাখল।”

​কথাটা শেষ করেই শীর্ষ আবারও মেঘের মুখটা নিজের বুক থেকে আলতো করে উঁচুতে তুলে ধরে। মেঘ কিছু বুঝে ওঠার আগেই, মেজরের উষ্ণ ঠোঁট দুটো হুট করেই মেঘের কপোলের ওপরের ললাটের ঠিক মধ্যিভাগে এক গভীর ও পবিত্র ভালোবাসার পরশ এঁকে দেয়।​শীর্ষর সেই আকস্মিক ভালোবাসার অমোঘ বাঁধনের মাঝে মেঘের পুরো শরীরটা এক অজানা শিহরণে কেঁপে ওঠে। কেন যেন, এই অদ্ভুত দুর্যোগের দিনেও মেজরের এই পুরুষালী স্পর্শটা ওর মনের কোণে বিন্দুমাত্র খারাপ বা অপবিত্র লাগে না; বরং এক অদ্ভুত শান্তির চাদরে জড়িয়ে নেয় ওকে।​শীর্ষ ওর চোখের জলটা নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে মুছে দিয়ে এক অনুপ্রেরণাদায়ী কণ্ঠে বলল,

মেজর কারদার পর্ব ১৭

“তোমাকে অনেক বড় হতে হবে মেঘালয়া, অনেক বড়। মন দিয়ে লেখাপড়া করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে পুরোপুরি স্বনির্ভরশীল হতে হবে তোমাকে। এই দুনিয়ার অন্য কোনো মানুষের মন মতো চলার বা নিজেকে প্রমাণ করার কোনো দরকার নেই তোমার। এই বিষাক্ত সমাজকে নিজের মেধা আর জোর দিয়ে পিছু হঠাও। নিজেকে এমন শক্ত এক পাথরের ন্যায় গড়ে তোলো, যেন পৃথিবীর কোনো অপশক্তি বা কোনো পুরুষ কোনোদিন তোমায় ভাঙার দুঃসাহস না পায়!”

মেজর কারদার পর্ব ১৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here