তোমাতেই বসন্ত পর্ব ২০
জেরিন আক্তার
প্রাণেশা দুপুরের খাবার খেতে বসেছে। আর স্নিগ্ধকে নিয়ে কি যেনো ভাবছে। স্নিগ্ধ ওর দিকে তাকিয়ে বলল,
“কি ভাবছো এতো? খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে খাবে কখন?”
প্রাণেশা মাথা নাড়িয়ে খাওয়ায় মনোযোগ দিলো। স্নিগ্ধ নরম কণ্ঠে বলল,
“তোমার মুডের ঠিক পাইনা। একেক সময় একেক মুডে থাকতে ভালো লাগে তোমার?”
প্রাণেশা মাথায় নাড়িয়ে বলল,
“হুমম খুব ভালো লাগে। বিশেষ করে আপনাকে জ্বালাতে ভীষণ ভীষণ ভালো লাগে।”
স্নিগ্ধ বাকা হেসে বলল,
“দিনে যত জ্বালাও কিচ্ছু বলবো না তবে রাতে কিন্তু আমার পালা।”
প্রাণেশা স্নিগ্ধর তাকিয়ে হেসে বলল,
“রাতে আমি যাবোই না আপনার রুমে। একাই ঘুমাবেন। বুঝেছেন?”
স্নিগ্ধ হেসে হেসে বলল,
“ঠিক আছে তুমি শুধু রুমে ঢুকো তারপর দেখি বের হতে পারো কিনা।”
সৌরভ মিটিংয়ে ঢুকে ডিলটা সাইন করে এসে নিজের কেবিনে ঢুকলো। এরপরে সুটটা খুলে সেখানে যে রুম আছে, সৌরভ সেখানে ঢুকে বেডে শুয়ে পড়লো। মাথায় আঘাত খাওয়ার পর থেকে এতো কথাবার্তা ভালো লাগে না। আগে আরও ভালো লাগতো না, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে মেডিসিন খাওয়াতে এখন আগের থেকে ভালো লাগে।
আরশাদ খান এসে বিছানায় বসে বললেন,
“খারাপ লাগছে নাকি?”
সৌরভ এসির পাওয়ার বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল,
“না কি বলবে তাড়াতাড়ি বলো।”
আরশাদ খান শ্বাস ছেড়ে বললেন,
“ইভাকে পছন্দ করো কি? নাকি ইভাই শুধু তোমাকে পছন্দ করে? এই প্রশ্নটা জানতে চাই।”
সৌরভ ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বলল,
“আমি কাউকে পছন্দ করি না। আর না ইভাকে। ওই পাগলটা সবসময় পেছন পেছন ঘুরে। অসহ্য লাগে।”
আরশাদ খান গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“তাহলে সুবহাকে পছন্দ করো কি?”
সৌরভ উঠে বসে কপালে ভাজ ফেলে বলল,
“তুমি ওর কথা বলছো কেনো?”
আরশাদ খান বললেন,
“সেদিন তুমি যে ওকে থাপ্পড় মারলে সেটা আমি দেখেছি। কি কারণে থাপ্পড় মেরেছো তাও শুনেছি।”
সৌরভ আবারও শুয়ে পড়ে বলল,
“তাহলে বুঝতেই তো পারছো কাউকেই পছন্দ করিনা। আর না হবে।”
আরশাদ খান বললেন,
“ইভাকে আমারও পছন্দ না। এর আগে এক ছেলের সাথে কি কাহিনী হলো ভুলে যাইনি। তবে সুবহাকে ভালোই লেগেছে। চাইলে ওর সাথে তোমার বিয়ের কথা বলতে পারি।”
সৌরভের মেজাজ তিরিক্ষে উঠল। আবারও উঠে বসে রাগী কণ্ঠে বলল,
“বাবা তুমি পাগল হয়ে গিয়েছো? বললাম তো ওদের থেকে কাউকে চাইনা। তুমি এসব কি বলছো?”
আরশাদ খান বললেন,
“তোমার ভালোর জন্যই বলছি। সুবহা ভালো মেয়ে তোমাকে ভালো রাখবে।”
সৌরভ তপ্ত শ্বাস ছেড়ে উঠে দাড়ালো। রাগে হন হন করে যেতে যেতে বলল,
“এসব নিয়ে আর ভালো লাগছে না। একে তো ইভা তার উপরে আবার সুবহার কথা বলছো।”
সৌরভ চলে গিয়ে সুটটা হাতে নিয়ে আবারও ফিরে এসে কড়া গলায় বলল,
“তোমার বোন আর তার মেয়েকে এখনই চলে যেতে বলো। সেই যে এসেছে আর যাওয়ার নাম নেই। এখন তো বিয়ে শেষ তাহলে থাকছে কেনো? আমি বাড়িতে গিয়ে যদি ওদের দেখি তাহলে দেখো কি করি।”
সৌরভ এরপরে হনহন করে বেরিয়ে গেলো। আরশাদ খান ফোন বের করে ড্রাইভারকে কল দিয়ে বললেন,
“গাড়ি বের করো সৌরভ বাড়িতে যাবে। ওকে ড্রাইভ করতে দিও না।”
“ওকে স্যার।”
প্রাণেশা রাতের খাবার খেয়ে বিছানায় উঁবু হয়ে শুয়ে ফোন দেখছে। স্নিগ্ধ রুমে এসে প্রাণেশাকে দেখে চুপচাপ ওর উপরে শুয়ে পড়ে। ওর হাতের ফোনটা সরিয়ে কানে কানে ফিসফিস করে বলল,
“জান বাহিরে বৃষ্টি হচ্ছে। সেই একটা ওয়েদার এর মধ্যে খুব প্রেম প্রেম পাচ্ছে।”
প্রাণেশা দাঁত চেপে বলল,
“তা না হয় ঠিক আছে। কিন্তু আমাকে মেরে ফেলবেন নাকি?”
স্নিগ্ধ জিভে কামড় দিয়ে প্রাণেশার উপরে থেকে সরে গিয়ে বলল,
“এবার ঠিক আছো?”
“হুমম।”
রাত ১০ টা খান বাড়িতে,
সৌরভ ড্রইং রুমে বসে আছে। তার সামনে আরশাদ খান। তিনি মর্জি ধরে আছেন সৌরভ যেনো সুবহাকেই বিয়ে করে। কিন্তু সৌরভ করবে না মানে করবেই না।
আরশাদ খান আর ছেলের কথা শুনলেন না। উপরে চলে গেলেন। সৌরভ রাগে সিগারেট ধরালো। একটার পর একটা শেষই করছে। ভাবলো,, নাহ, এভাবে ওর কোনো কথাই শুনবে ওর বাবা। ওকেই এখানে থেকে চলে যেতে হবে কোথাও। সৌরভ সিগারেট খেতে খেতে উপরে চলে গেলো। রুমে এসে ল্যাপটপ নিয়ে বসলো। লন্ডনের টিকিটও কেটে ফেলল। এমনকি লেদারও গুছিয়ে ফেললো। কালকে তো হুট্ করে যাওয়া হবে না। তাই পরশু দিন যাওয়ার টিকিট কেটে ফেলেছে। যাওয়ার আগে শুধু প্রাণেশার সাথে দেখা করে যাবে, শেষ। এরপরে ওখানে পৌঁছে জানাবে।
এদিকে সকাল সকাল আরশাদ খান স্নিগ্ধকে কল দিলেন। স্নিগ্ধ গভীর ঘুমে। প্রাণেশার ঘুম ভেঙে গেলো। স্নিগ্ধর থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে রিসিভ করলো,
“হ্যালো বাবা কেমন আছো?”
“ভালো। তুমি কেমন আছো?”
“ভালো। বাবা এতো সকালে কল দিলে কিছু হয়েছে?”
“না স্নিগ্ধর সাথে একটু কথা বলতাম। কোথায় ও?”
“ঘুমিয়ে আছে। উঠেনি।”
“ওহ উঠলে কল ব্যাক করতে বলো।”
“ঠিক আছে। ”
একই সাথে তিনি সাঈদ রেজা চৌধুরীকেও কল দেন। ফোনে তো সব বলা যায়না তাই তিনজনে বসেই কথা বলবে।
সৌরভ ঘুম থেকে উঠে ঠান্ডা মেজাজে ড্রইং রুমে এলো। কোনো চিন্তাই যেনো নেই। আরশাদ খান ছেলেকে স্বাভাবিক দেখে বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন। সৌরভ ফোন বের করে স্ক্রল করছিলো। আরশাদ খান বললেন,
“অফিসে যাবে কবে থেকে?”
সৌরভ নিরেট কণ্ঠে বলল,
“যাবো না।”
“কেনো?”
“এমনেই।”
“তাহলে বিয়ে?”
সৌরভ ঠান্ডা গলায় বলল,
“রাতে অনেক ভাবলাম তোমার যা ইচ্ছে তাই করো।”
আরশাদ খান খুশি হয়ে বললেন,
“যাক বুঝেছো। আমি তাহলে কথা বলছি ওদের সাথে।”
এই শুনে সৌরভ নিজেই হাসছে। বলুক কথা, এরপরে ওকে পেলে তো! তার আগেই নিজের কাজে চলে যাবে। তখন বিয়েটাও করতে হবে না।
সৌরভ সকালের খাওয়া-দাওয়া শেষে শপিংয়ে বেরোলো।
আরশাদ খান সাঈদ রেজা চৌধুরীর কাছে সৌরভ আর সুবহার বিয়ের প্রস্তাব দিলেন, সাথে স্নিগ্ধও ছিলো। আরশাদ খান সাঈদ রেজা চৌধুরীকে বললেন,
“সাঈদ ভাই ওরা দুজন হয়তো দুজনাকে পছন্দ করে হয়তো বলতে পারছে না। আমার ছেলেটার বড্ড ইগো। সে ভাঙবে তবুও মচকাবে না। সুবহা ওকে নিজের ভালোবাসার কথা বলে এখন কষ্ট পাচ্ছে। আমি মেয়েটার কষ্ট মেনে নিতে পারছি না। ওদের বিয়েটা দিয়ে দেই সময়ের সাথে সাথে দুজন দুজনাকে বুঝবে। আর আমার ছেলেকে যদি কেউ ভালো করতে পারে সেটা সুবহাই পারে।”
সাঈদ রেজা চৌধুরী তা শুনে ভাবুক গলায় বললেন,
“ভাই বাড়ি ফিরে স্নিগ্ধর সাথে কথা বলে আমি জানাবো।”
আরশাদ খান স্নিগ্ধর হাত ধরে নরম হয়ে বললেন,
“স্নিগ্ধ আমাকে নিরাশ করো না। প্লিজ!”
স্নিগ্ধও মাথা নাড়িয়ে বলল,
“হ্যা দেখছি।”
বিকেলে শপিং থেকে ফিরে সৌরভ সবকিছু গুছিয়ে নিলো। এরপরে লাগেজটা রুমের পর্দার আড়ালে রেখে এবার পাসপোর্ট, টিকিট সব গুছিয়ে নিচ্ছিলো। রোকেয়া বেগম রুমে এলেন কফি নিয়ে। কফিটা রেখে হেসে বললেন,
“তোমার বিয়ের কথাবার্তা চলছে।”
সৌরভ তালে তালে হেয়ালি কণ্ঠে বলল,
“চলুক তাতে আমার কি? আমি কি বিয়ে করবো নাকি?”
তখন সৌরভের ফোনে কল আসে আর ও কফিটা নিয়ে ব্যালকনিতে চলে যায়। রোকেয়া বেগম ওর কথাগুলো ভাবতে ভাবতে বের হয়ে এসে আরশাদ খানকে বলে দিলো।
সৌরভ যে পালাতে চাইছে আরশাদ খানের বুঝতে বাকি রইলো না। তিনি তৎক্ষণাৎ বাড়ির সিকিউরিটি বাড়িয়ে দিলেন। এই ছেলেকে কোত্থাও যেতে দিবেন না। অন্যদিকে দিকে স্নিগ্ধ আর প্রাণেশাকে বাড়িতে আসতে বললেন। ওরা সন্ধ্যার আগেই চলে এলো।
সৌরভকে আচ করতে পারছে কিছু একটা হবে তাই একটা নিজের কাঁধব্যাগে ল্যাপটপ, টাকা, চার্জার আর দরকারি কাগজপত্র গুছিয়ে নিলো। ও শুধু প্লেনে উঠতে পারলেই হয় জামাকাপড় তো ওখানেই কিনতে পারবে।
রাতে প্রাণেশা এলো সৌরভের রুমে। ভাইকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে কোনো কথাই বের করতে পারলো না।
পরেরদিন, সারাদিন কোনোরকম চলে গেলো। সৌরভের আজকে রাত ১০ টায় ফ্লাইট।
তখন সন্ধ্যা—
ও খাবার খেয়ে রুমে এসে রেডি হচ্ছে। প্রাণেশাও আজ সারাদিন বিড়ালের বাচ্চার মতো সৌরভের পেছনে পড়ে ছিলো। এখনও রুমে এসে বলল,
“কোথাও যাচ্ছো ভাইয়া?”
“সাব্বির কল দিয়েছিলো, ঘুরতে যাবে।”
“কখন ফিরবে?”
“এই ১০ টা কি ১১ বাজবে।”
“তাড়াতাড়ি এসো।”
“হুমম।”
সৌরভ প্রাণেশার সামনেই সাব্বিরকে কল দিলো। সাব্বির কল ধরে বলল,
“বাইক নিয়ে এসেছি আয়।”
“হুমম।”
সৌরভ ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে প্রাণেশার কাছে এসে হেসে বলল,
“টা টা।”
“হুমম তাড়াতাড়ি ফিরে এসো।”
সৌরভ হেসে বলল,
“সম্ভব হলে।”
প্রাণেশা অতো খুঁটিয়ে ভাবলো না ওর কথা। ভাবলো হয়তো বাহিরে যাচ্ছে তাই ব্যাগ এই ব্যাগ কাঁধে নিয়ে যাচ্ছে। যদি পালাতো তাহলে তো লাগেজ নিতো। ওই ব্যাগ নিতো না।
সৌরভ বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় সদর দরজার সামনেই দেখলো আরশাদ খান আর স্নিগ্ধ কথা বলছে গার্ডদের সাথে। সৌরভ ওদের পাশ কাটিয়ে চলে গেলো। দুজনই সৌরভকে দেখে স্বাভাবিকভাবেই নিলো।
সৌরভ বাকা হেসে গেটের কাছে এসে সিয়ামের বাইকে উঠল। স্নিগ্ধ তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে দেখছিলো সৌরভকে। সাথে সাথে ও আরশাদ খানকে বলল,
“সৌরভ একবারে চলে যাচ্ছে।”
আরশাদ খান তৎক্ষণাৎ গেটের দিকে দৌড়ে গিয়ে বলল,
“সৌরভ! প্লিজ যেও না সৌরভ!”
সাব্বির তৎক্ষণাৎ বাইক স্টার্ট দিয়ে চলে গেলো। অতঃপর আরশাদ খান স্নিগ্ধকে বললেন,
তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১৯
“স্নিগ্ধ তাড়াতাড়ি এসো।”
স্নিগ্ধ যেতে যেতে গার্ডদের বলল,
“ইমিডিয়েট গাড়ি বের করুন। ওই বাইক এয়ারপোর্ট পৌঁছানোর আগে যেনো আপনারা ওকে ধরতে পারেন। আমি অন্যদিক হয়ে যাচ্ছি। দেখি ও এয়ারপোর্টে ঢুকে কেমনে।”
