মেজর কারদার পর্ব ২১
ফিনারা ঝুমুর
বাইরে তখন ইলশেগুঁড়িতে রাত আরও ঘন ও রহস্যময় হয়ে উঠেছে। আষাঢ়ের কালো আকাশে মেঘের ভয়ঙ্কর ঘনঘটার পাশাপাশি রক্তিম বিদ্যুৎ চমকানো যেন কোনোভাবেই থামছে না। না ঢাকা, না চট্টগ্রাম এই প্রলয়ঙ্করী বর্ষণের বিরাম নেই কোথাও।
সাতকানিয়ার বন্যাগ্রস্ত শত শত অসহায় মানুষকে নিরাপদ সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে তাদের থাকা-খাওয়ার সব ব্যবস্থা সুনিপুণভাবে শেষ করে এইমাত্র নিজের জোনের বাংলোতে ফিরেছে শীর্ষ । ওর পরনের সেই জলপাই রঙা আর্মি পোশাকে কাদার নোংরা দাগ লেগে আছে স্পষ্ট। বানের সেই ঘোলাটে পাহাড়ি ঢলের পানিতে একটানা ভিজেছে ওর শক্তিশালী দুই পা, তাও প্রায় উরু অবধি।
বাংলোয় এসেই ও নিজের পরিশ্রান্ত শরীরটা নিয়ে ঝটপট গোসলের ঘরে ঢুকল। শাওয়ারের ঠান্ডা পানির ঝর্ণা ছেড়ে দিয়ে তার নিচে দাঁড়াতেই সারা দেহ যেন এক স্বর্গীয় প্রশান্তিতে ভরে উঠল মেজরের। সমস্ত ক্লান্তি আর অবসাদ সেই শীতলতার নিগূঢ়ে ধুয়েমুছে বের হয়ে যাচ্ছে। বাথরুমের টাইলস করা দেয়ালে এক হাত ঠেকিয়ে, শাওয়ারের নিচে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল ও কিছুক্ষণ। ওর নিখুঁত আর্মি কাট চুলগুলো বেয়ে টুপটাপ পানি ঝরছে, যা ওর পৌরুষদীপ্ত সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। চোখের সেই চেনা স্টিল গ্রে রঙটা ক্লান্তিতে কেমন যেন কিছুটা ঘোলাটে আর রক্তাভ দেখাচ্ছে এখন। ঠোঁটের কোণে আর কপালে চিন্তার এক দৃঢ়, গম্ভীর চাপ।
গোসল শেষ করে একটা ধবধবে সাদা তোয়ালে কোমরে কষে জড়িয়ে ও বাথরুম থেকে বের হলো। আরেকটা ছোট তোয়ালে দিয়ে নিজের ছোট চুলগুলো অবহেলায় মুছতে মুছতে সে এগিয়ে গেল টেবিলের ওপর ফেলে রাখা নিজের ব্যক্তিগত মোবাইলের দিকে। ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে আর এক মুহূর্তও দ্বিধা না করে বাম হাত দিয়ে ডায়াল করল নিজের সেই ছোট্ট, মানাভিমানী প্রিয় বেগমের নম্বরে।দু-তিনবার রিং হতেই ওপাশ থেকে কলটা রিসিভ হলো। তারপরই ভেসে এলো,
“উম– হ্যালো! মেজর সাহেব!”
বাগেরহাটের ওপার থেকে মেঘের সেই পরম আদুরে ও ঘুমঘুম জড়ানো নরম গলাটা শোনামাত্রই শীর্ষর বুকের ভেতরের হৃদস্পন্দন যেন এক লহমায় থমকে দাঁড়াল! ভেজা চুল মোছা হাতটা মাঝপথেই আটকে গেল ওর। মেজরের তপ্ত বুক চিরে এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো, মনে মনে ও নিজেকেই শোনাল,
‘এই মেয়েটা আমায় একদিন নির্ঘাত মেরে ফেলবে ওর এই বুক কাঁপানো ঘুমঘুম কণ্ঠ দিয়ে! আল্লাহ দিলে তো দিলে, এক্কেবারে মোক্ষম এক মরণ অস্ত্রই ধরিয়ে দিলে এই সতেরো বছরের মেয়ের কাছে। আমার মতো জাঁদরেল মেজরের ঘাড় বাঁকানোর জন্য এগুলোই বোধহয় দুনিয়ার সবচেয়ে বড় মারণাস্ত্র!’
ওপাশ থেকে শীর্ষর কোনো চটজলদি সাড়া না পেয়ে এবং
মেজরের এই গভীর নীরবতার কারণ বুঝতে না পেরে, মেঘ কিছুটা ওলটপালট হয়ে কৌতূহলী গলায় প্রশ্ন করল,
“কী হলো? কথা বলছেন না কেন, মেজর সাহেব?”
মেঘের দ্বিতীয় ডাকে এতক্ষণে শীর্ষর মোহগ্রস্ত ধ্যান ভাঙল। সে নিজের ভেতরের সমস্ত রুক্ষতা আর মেজাজী ভাব ধুয়েমুছে ফেলে, গলার স্বরে এক মহাসমুদ্র সম কোমলতা ঢেলে দিয়ে অত্যন্ত মায়াবী সুরে শুধাল,
“রাতের খাবার ঠিকঠাক খেয়েছ তো, বউ?”
শীর্ষর পুরুষালী ও গম্ভীর মুখে হুট করে এমন অতর্কিত ও অধিকার খাটানো ‘বউ’ ডাকটা শুনামাত্রই মেঘের চোখের পাতা থেকে সমস্ত ঘুম এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল! সে বিছানার ওপর এক ঝটকায় সোজা হয়ে বসে চরম হকচকিত হয়ে গেল। ওর কানের একদম কাছে কে যেন মস্ত বড় একটা ভালোবাসার ড্রাম বাজিয়ে বারবার ওই একটা শব্দই প্রতিধ্বনিত করে চলেছে ‘বউ; বউ;বউ!’
ওর ছোট্ট অন্তরের জমিনে কে যেন এক লহমায় নতুন প্রেমের সুবাসিত বীজ বুনে দিয়ে গেল। মেঘের বুকের বাম পাশের মাংসপিণ্ডটা এত জোরে ধুকপুক করতে লাগল যে, মনে হলো এই বুঝি তা কায়া চিরে বাইরে বেরিয়ে আসবে! সে নিজের চরম বিস্ময় আর কাঁপন লুকিয়ে অত্যন্ত থমথমে অথচ চঞ্চল গলায় প্রশ্ন করল,
“আপনি– আপনি আমায় এইমাত্র ঠিক কী বলে ডাকলেন, মেজর সাহেব?”
ওপাশে ফোনের স্পিকারের ওপার থেকে শীর্ষ নিজের ভেজা চুলগুলো এক হাত দিয়ে পেছনে ঠেলে দিয়ে, ঠোঁটের কোণে এক চিলতে কড়া ও মুচকি পুরুষালী হাসি ফুটিয়ে তুলল। তারপর এক অদ্ভুত গম্ভীর ও দাবিভরা কণ্ঠে প্রতিউত্তর করল,
“বউ বলেছি, মেঘালয়া। তুমি আইনত এবং সামাজিকভাবে আমার একমাত্র বিবাহিতা বউ। সো, নিজের ঘরে থাকা সুবাসিত বউকে বউ না বলে অন্য কিছু বলাটা আমার জন্য ঘোর অন্যায় হবে।”
শীর্ষ ওর প্রতিটি কথার অমোঘ বাণে মেঘকে যেন জ্যান্ত স্তব্ধ করে দিচ্ছে। মেজরের এই অতর্কিত ও কড়া প্রেমের আক্রমণ মেঘ আর কোনোভাবেই সহ্য করতে পারছে না। তার বুক হুহু করে কাঁপছে। সে নিজের ওলটপালট হয়ে যাওয়া অনুভূতিগুলোকে সামলে নিয়ে অত্যন্ত মিহি ও দুর্বল স্বরে প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
“কিন্তু মেজর সাহেব– এই হুট করে হয়ে যাওয়া জোরপূর্বক বিয়ের কি আদেও কোনো আইনি বা সামাজিক ভিত আছে? আপনি–আপনি কি মন থেকে মানেন এই নামমাত্র বিয়ে?”
শীর্ষ ওপাশ থেকে তোয়ালে দিয়ে মাথা মোছা বন্ধ করে খাটের ওপর আরাম করে বসল। গলার স্বর আরও এক ডিগ্রি গম্ভীর ও গভীর করে বলল,
“বিয়ে মানবজীবনে একবারই হয় মেঘালয়া, বারবার নয়। তা পরিস্থিতিচক্রে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবেই হোক কিংবা মনের মতন কাঙ্ক্ষিতভাবেই হোক। এমনিতেও, আজ হোক বা কয়েক বছর পর আমায় একদিন না একদিন বিয়ে করতেই হতো। তো সেখানে তোমায় নিজের করে বরণ করে নিলাম, এতে ক্ষতিটা কী শুনি?”
শীর্ষর এমন যুক্তিপূর্ণ কথার পিঠে মেঘ নিজের মনের কোণে জমে থাকা সবচেয়ে বড় সন্দেহের তীরটা এবার ছুড়ে মারল,
“কিন্তু মেজর সাহেব– আপনার ফ্যামিলি থেকে তো আপনার আপন মামাতক বোন সূচি আপুর সাথে আপনার বিয়ে প্রায় ঠিকঠাক করে রেখেছে? সবাই তো সেটাই জানে!”
ফোনের ওপার থেকে ওই অহংকারী ও খিটখিটে ‘সূচি’র নামটা শোনামাত্রই শীর্ষর জোড়া কপাল তীব্র বিরক্তিতে কুঁচকে একাকার হয়ে গেল। সে এক ত্যাড়ছা নজরে বাংলোর জানালার ওপারে থাকা আষাঢ়ের নিকষ কৃষ্ণরজনীর বিদ্যুৎ চমকানো আকাশের দিকে চোখ রেখে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“সূচিকে আমি আমার এই জীবনে কোনোদিন কোনো সেকেন্ডের জন্যও বউয়ের চোখে দেখিনি, দেখা সম্ভবও নয়। ওকে বিয়ে করা আর নিজের গলায় কুড়ুল মেরে কচু গাছের সাথে ফাঁসি দেওয়া দুটোই আমার কাছে এক সমান কথা!”
শীর্ষর মুখে এমন জাঁদরেল মেজাজি ভঙ্গিতে বলা ‘কচু গাছের ফাঁসি’র লাস্ট কথাটা শোনামাত্রই মেঘ নিজের সমস্ত কান্না আর মান-অভিমান ভুলে বিছানায় শুয়েই ফিক করে শব্দ করে হেসে ফেলল। এতক্ষণের গুমোট ভাবটা এক নিমেষে কাটিয়ে ও বেশ ব্যাঙ্গাত্মক ও দুষ্টু সুরে বলে উঠল,
“বাব বাহ! জাঁদরেল মেজরও তাহলে দুনিয়ায় কাউকে না কাউকে বড্ড ভয় পায়! আপনার জীবনের মস্ত বড় একটা সিক্রেট আজ জেনে গেলাম কিন্তু, মেজর সাহেব!”
“আরেহ না, ওটা ভয় নয় মেঘালয়া। বিরক্তি! ও কানের কাছে এসে যেভাবে প্যানপ্যান করে, ওকে সামনে পেলেই আমার খামখাই খুন করতে ইচ্ছে করে। তার চেয়ে ও নিজের তারছেঁড়া মাথা নিয়ে দূরে বেঁচে থাকুক, সেটাই ভালো। তা প্রিয়া বউ, আপনার মনমেজাজ এখন কেমন? স্বামীর থেকে এত শত মাইল দূরে একা একা আছেন বলে কথা, মন কি আদেও ভালো থাকে?”
শীর্ষর এমন রসালো কথার পিঠে মেঘ নিজের মুখটা সামান্য বাঁকিয়ে চাপা গাল ফুলিয়ে বলল,
“আহা! এলেন আমার মস্ত বড় স্বামী গো! আপনি তো একটা অ-স্বামী! আপনাকে নিয়ে সাতপাঁচ আমি কেন ভাবতে যাব হ্যাঁ? আপনাকে নিয়ে ভাবলে ভাববে আপনার ওই ফিউচার বউ!”
শীর্ষ ওপাশে খাটে শুয়ে পড়ে বেশ দুষ্টু করে হাসল। চোখের কোণে মিটমিটে এক চিলতে পুরুষালী চাহনি ফুটিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“জানো বউ, আর্মি ক্যাম্পের আর এই সাতকানিয়ার আশেপাশে ইদানীং কত কত সুন্দরী ললিতারা ঘোরাঘুরি করে! ওসব দেখে আমার মনের ভেতর যে কী পরিমাণ কষ্ট হয়, তা তোমায় বলে বোঝাতে পারব না। যেহেতু আমি কাগজে-কলমে এখনও একা ও সিঙ্গেল, তাই এত এত ললিতা দেখে নিজের ঘরে থাকা বউয়ের অভাবটা বড্ড বেশি ফিল করি। বিশেষ করে এই একাকী নিঝুম রাতে একটু বেশিই ফিল করি আর কী!”
শীর্ষর মুখ থেকে অন্য মেয়েদের রূপের প্রশংসা আর ললিতা শব্দটা শোনামাত্রই মেঘের ঠোঁটের কোণের মিষ্টি হাসিটা ধাপ করে নিভে গেল! সে চরম থতমত খেয়ে, বুকের ভেতর এক তীব্র হিংসের জ্বালা অনুভব করে রাগে চেঁচিয়ে উঠল,
“অন্য মেয়েমানুষদের দিকে আপনার এত নজর যায় কেন হ্যাঁ? আর্মিরচাকরি করেন নাকি মেয়েদের ফিগার মাপেন?”
“কী করব বলো? আমি তো সিঙ্গেল পুরুষ। বউয়ের সাথে একটু মন খুলে রোমান্স করার, প্রেম করার স্বাদ আমার মনে অনেক অনেক জাগে। তো প্রিয়া, তুমি যদি আমায় একটু মন থেকে পারমিশন বা অনুমতি দাও, তাহলে ক্যাম্পের আশেপাশের কোনো একটা সুশ্রী গার্লফ্রেন্ড দেখে জলদি পটিয়ে ফেলি? রাতটা অন্তত ভালো কাটবে!”
শীর্ষর এই চরম উস্কানিমূলক ও গা-জ্বালানো কথা শোনা মাত্রই সতেরো বছরের মেঘ তো রাগে-অভিমানী হিংসেতে একেবারে ফুলে ফেঁপে বোম হয়ে গেল! এতক্ষণের সব নম্রতা, লাজুকতা আর মেজর সাহেব সম্বোধন এক নিমেষে হাওয়ায় উড়ে গেল। সে নিজের দাঁত কিড়মিড় করে চরম খ্যাঁচ করে এক্কেবারে আঞ্চলিক টোনে চেঁচিয়ে ওথল,
“সালা লুচুর বাচ্চা লুচু! নিজের নিকাহ করা ঘরের বৈধ বউয়ের দিকে তোর এক ফোঁটা নজর যায় না হ্যাঁ? আমি দেখতে কী এমন দোষ করছি শুনি? আমি জ্যান্ত থাকতে তুমি কোন সাহসে দুনিয়ার অন্য ছুঁড়িগো লগে গার্লফ্রেন্ড পাতাচ্ছ হ্যাঁ? দেখাচ্ছি মজা, হচ্ছে তোর! খালি একবার এই বাগেরহাটের আমাদের বাড়িতে আয় তুই– তোরে পিটিয়ে পিঠের চামড়া তুলে একদম আলুর দম বানাবো কইলাম, বদমাইশ!”
মেঘের মুখ থেকে এক নিঃশ্বাসে বের হওয়া সেই চরম অধিকার খাটানো রাগ, গালি আর হিংসেভরা হুমকি শোনামাত্রই ওপাশে ফোনের স্পিকারের ওপারে থাকা মেজর শীর্ষ কারদার এক পরম বিজয়ের প্রাণখোলা হাসিতে ফেটে পড়ল। সে বিছানা থেকে উঠে বসে অত্যন্ত চনমনে ও বিজয়ী কণ্ঠে মিটমিট করে বলে উঠল,
“অবশেষে নিজের ওই অবাধ্য মুখে নিজ থেকেই স্বীকার করেই নিলে প্রিয়া–দ্যাট ইউ আর মাই অফিশিয়াল ওয়াইফ! তুমিই আমার একমাত্র অর্ধাঙ্গিনী!”
শীর্ষর সেই বুদ্ধিদীপ্ত ও জালে ফেলার মতো মোক্ষম ডায়ালগটা শোনামাত্রই মেঘ নিজের ভুল বুঝতে পেরে ওলটপালট হয়ে ওপাশ থেকে লজ্জায় আর ক্ষোভে পুরো বোবা হয়ে গেল!
এছাড়াও, মেঘের মুখ থেকে এক লহমায় সমস্ত চপলতা আর রাগ উধাও হয়ে গেল। শীর্ষর সেই চতুর ও বিজয়ী কথার বিপরীতে সে হঠাৎ করেই বড্ড বেশি গম্ভীর আর শান্ত হয়ে গেল। ওপাশের নীরবতা টের পেয়ে শীর্ষর ঠোঁটের কোণের হাসিটুকুও ধীরপায়ে মিলিয়ে গেল। মেঘ একটা তপ্ত শ্বাস ফেলে বড্ড পরিণত গলায় বলল,
“আমি চাই মেজর সাহেব, আমার সাথে ঘর-সংসার করার এই রঙিন স্বপ্ন দেখার পূর্বে আমার আসল অতীতটা আপনি নিজে খুব ভালো করে জানুন। তারপর যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার নেবেন, বাকি ইচ্ছে সম্পূর্ণ আপনার।”
শীর্ষ ফোনের ওপার থেকে ভ্রুকুঞ্চিত করল,
“কী এমন অতীত মেঘালয়া, যা নিয়ে তোমার এত দ্বিধা?”
“মুখোমুখি যেদিন আমাদের দেখা হবে, সেদিন আমি নিজের মুখেই আপনাকে সবটা খুলে বলব।”
মেঘ খানিকটা দমে গিয়ে আবারও চাদরের কোণটা আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে বলল,
“জানেন মেজর সাহেব– আপনাকে হয়তো আমি মনে মনে একটু একটু করে বিশ্বাস করতে শুরু করেছি। দয়া করে, এই দুনিয়ার অন্য পাঁচটা স্বার্থপর পুরুষের মতো আমার এই কাঁচা বিশ্বাসটুকু ভেঙে চুরমার করে দেবেন না। যে মেয়েটা কোনোদিন কোনো পুরুষকে নিজের জীবনে জড়াতে চায়নি, কোনোদিন বিয়েই করতে চায়নি সেই আমিই আজ ভাগ্যের পরিহাসে হোক বা অন্য কোনো উপায়ে, আপনার নামের সাথে বিয়ের পবিত্র কালামে বাঁধা পড়ে গেছি। কোনো না কোনোভাবে আপনাকে খুব অন্ধের মতো বিশ্বাস করতে শুরু করছি আমি।”
মেঘের এই গভীর ও আর্তনাদভরা কথার পৃষ্ঠে শীর্ষ আর এক মুহূর্তও রসিকতা ধরে রাখতে পারল না। সে নিজের গলার স্বরে এক পৃথিবী সমান ভরসা আর পুরুষালী দৃঢ়তা ঢেলে দিয়ে বলল,
“ছোটবেলা থেকে শুনে আসছ না মেঘালয়া চাঁদের গায়েও নাকি মস্ত বড় কলঙ্ক থাকে? কিন্তু সেই কলঙ্কের জন্য কি পৃথিবীর কোনো মানুষ চাঁদকে কখনো দূরে ঠেলে দেয়? দেয় না, চাঁদ নিজেই আকাশ বুকে সবার থেকে দূরে একা থাকে। ঠিক তেমনই, তোমার গায়ে যদি সমাজের দেওয়া সহস্র কলঙ্কও লেপ্টে থাকে, তবুও তোমায় নিজের অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে মন থেকে গ্রহণ করতে এই শীর্ষ কারদারের এক সেকেন্ডের জন্যও কোনো সংকোচ হবে না। আর বিশ্বাসের কথা বলছ? এই খাকি পোশাকটার কসম খেয়ে বলছি, নাই বা কোনোদিন তোমার সেই বিশ্বাসের অবমাননা আমি করব!”
মেঘ মেজরের এই অমোঘ বাণীতে পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারল না, মনটা যে অতীতে বড্ড বেশি ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। সে ধীর গলায় শেষবারের মতো বলল,
“মানুষ বড্ড পরিবর্তনশীল প্রাণী মেজর সাহেব, সময়ের সাথে সাথে মানুষের মনেরও অনেক পরিবর্তন হয়। আজ যা সত্য, কাল হয়তো তা ফিকে হয়ে যায়। আপনার মনও কোনোদিন বদলে যেতে পারে। তাই সবকিছু ভেবেচিন্তে তারপরই নিজের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।”
কথাটা শেষ করেই মেঘ আর শীর্ষকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে দপ করে কলটা কেটে দিল।ওপাশে ফোনের স্ক্রিনটা কালো হয়ে যেতেই শীর্ষ বেশ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে সেদিকে চেয়ে রইল। মেয়েটার ভেতরের ছটফটানি আর ভয়টা ও খুব ভালো করেই অনুভব করতে পারছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা খাটের ওপর রেখে ও তোয়ালে বদলে একটা ক্যাজুয়াল ট্রাউজার আর টি-শার্ট গলিয়ে নিল নিজের সুঠাম দেহে। তারপর ধীরপায়ে এগিয়ে গেল বাংলোর লাগোয়া কিচেনের দিকে।
সারাদিনের এই হাড়ভাঙা উদ্ধারকাজের পর শরীরটাকে সতেজ রাখতে আর পুষ্টির ঘাটতি মেটাতে ও নিজেই চটপট নিজের রাতের খাবারটা বানিয়ে নেবে। ফ্রিজ খুলে চিকেনের ব্রেস্ট পিসগুলো বের করে ও কাউন্টারে রাখল। রাতের মেন্যুতে আজ ভারী কিছু নয়; ঝটপট বানিয়ে নেবে ধোঁয়া ওঠা গরম গরম এক বাটি চিকেন স্যুপ, সাথে দুটো গ্রিলড চিকেন স্যান্ডউইচ আর নিজের চেনা সেই হাই-প্রোটিন শেক।
রান্নাঘরের কাউন্টারে চিকেন স্যান্ডউইচের ব্রেস্ট পিসগুলো ওলটপালট করতে করতেই শীর্ষর ঠোঁটের কোণে আবারও এক চিলতে কড়া ও গভীর হাসি ফুটে উঠল। মেঘ তো ওপাশ থেকে কলটা এক প্রকার জেদ করেই কেটে দিয়েছে, কিন্তু ওর শেষ কথাগুলো যেন মেজরের পুরো মাথায় মস্ত বড় এক ঘূর্ণিঝড় তুলে দিয়ে গেছে।
সে হাতের ছুরিটা কিচেন বোর্ডের ওপর রেখে, দুই হাত কোমরে ঠেকিয়ে একটা তপ্ত নিশ্বাস ফেলল। জানালার ওপারে তখন আষাঢ়ের কালো আকাশ চিরে অবিরাম ধারায় ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি ঝরেই চলেছে। সেই বৃষ্টির শব্দের মাঝেই শীর্ষ নিজের চওড়া বুক চিরে এক গভীর, পৌরুষদীপ্ত স্বরে ফিসফিসিয়ে শূন্যে ছুড়ে দিল নিজের মনের আসল জাঁদরেল স্বীকারোক্তি,
মেজর কারদার পর্ব ২০
“তোমায় মাঝপথে এভাবে ছেড়ে দেওয়ার জন্য তো আর তোমার ওই নরম হাত দুটো নিজের এই শক্ত মুঠোয় ধরিনি, আমার অবাধ্য বিবিজান! এই দুনিয়ার সমস্ত ঝড়-ঝাপটা থেকে আড়াল করে, নিজের এই বুকের বাম পাশে সারাজীবনের জন্য বন্দি করার জন্যই তো আমার পুরো আয়ত্তে তোমায় ওমন অলিখিত বন্ধনে আটকিয়েছি। মুখে ভালোবাসি নামক ওই সস্তা শব্দটা আদেও তোমায় বলতে পারব কি না আমি জানি না; তবে আমি বড্ড মারাত্মকভাবে মায়ার আসক্ত একটা পুরুষ, মেঘালয়া। আর সেই মায়াটা অন্য কারোর নয় এক্কেবারে নিখাদ তোমার ওই মায়াবী চোখের মায়া!”
