মেজর কারদার পর্ব ২৮
ফিনারা ঝুমুর
রাতের শেষাংশ। শ্রাবণের সুবাসিত সূচনা হলো যেন আজ থেকেই। অন্দরের বাইরে মেঘ ভাঙা তাণ্ডব মেতে উঠেছে; জোরে বাতাস বইছে, গাছে গাছে পাতার হুহু রোদন আর শ্রাবণের অঝোর বারিধারা ধুয়ে দিচ্ছে সমস্ত শহরকে। ঠিক সেই মুহূর্তে কারদার বাড়ির অন্দরে চোরের মতো চুপিচুপি নিজেদের ঘরে এসে প্রবেশ করে শীর্ষ ও মেঘ। দু’জনেরই পরিধেয় বস্ত্রে কাদার প্রলেপ মাখা।
“আপনি কেন শুধু শুধু ওনার হাতের ওই বাঁশের মারগুলো চুপচাপ খেলেন বলুন তো, মেজর সাহেব?”
নিজের সুবিন্যস্ত ভিজে যাওয়া চুরিদারের ওড়না সামলাতে সামলাতে ভ্রু তুলে প্রশ্নটা করে মেঘ। শীর্ষ কাবার্ড থেকে তোয়ালে আর পরিষ্কার ড্রাই ট্রাউজার নিতে নিতে ধীর ও শান্ত গলায় জবাব দেয়,
“আমি প্রতিক্রিয়া দেখালে কাল সকালে পুরো শহর জেনে যেত শীর্ষ কারদারের বউ গভীর রাতে আম চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে। লোকমুখে তোমার নামে বদনাম রটতো, প্রিয়া! আর তা আমি হতে দেব কীভাবে?”
শীর্ষর ওয়াশরুমের পানে গটগটিয়ে যাওয়ার পথচলার দিকে মেঘের তীক্ষ্ণ ও শকুনি নজর স্থির হয়ে থাকে। ও খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছে, মানুষটা পশ্চাৎপদ আর কোমরে বেশ রগচটা আঘাত পেয়েছে। মেঘ এক গভীর ও ভারী দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে আওড়ায়,
“স্রেফ এই সামান্য আমিটার জন্য এত বড় একটা লোক এতটা অপমান আর বেদনায় ভরা ব্যথার মার হজম করে নিল!”
আপন মনে কথাগুলো শেষ করে ও দ্রুত ঘর থেকে বাইরে পা চালায়। মিনিট খানেক পরই ফিরে আসে হাতে একখানা কাপড়ে মোড়ানো আইস প্যাক নিয়ে।
“দেখি, একদম লক্ষ্মী ছেলের মতো বস্ত্র একটু নিচে নামিয়ে উল্টো হয়ে শুয়ে পড়ুন তো!”
চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন বদনে আদেশ জারি করে মেঘ। শীর্ষ তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে মেঘের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত কথার হেতু না বুঝতে পেরে একখানা চওড়া ভ্রু উঁচিয়ে তাকায়। তবে এখন বিস্তারিত বিবরণ দেওয়ার মতো বিন্দুমাত্র সময় মেঘের হাতে নেই। ও সংক্ষেপে তাগাদা দিয়ে বলল,
“আইস প্যাকের বরফ ঠান্ডা ছ্যাঁক দেব ব্যাথার জায়গায়। কোনো কথা না বাড়িয়ে চুপ করে শুয়ে পড়ুন তো দেখি!”
মেজর সাহেব আর কথা না বাড়িয়ে বাধ্য বালকের মতো শান্তভাবে বিছানায় উল্টো হয়ে শায়িত হলেন। মেঘ আস্তে আস্তে, পরম যত্নে আর মায়ায় শীর্ষর আঘাতপ্রাপ্ত রক্তাভ স্থানে বরফের ছ্যাঁক দিতে থাকে। শীর্ষ যদিও পুরো বিবস্ত্র ছিল না, তথাপি ছ্যাঁকের কাজটা নিখুঁত করতে নিজের পরনের ট্রাউজারের ওপরের অংশ খানিকটা নিম্নাঙ্গে নামিয়ে দেয়।
আর তাতেই মেঘের পুরো তনুদেহে যেন আগুন ধরে যায়! ফর্সা গাল দুটো মুহূর্তে লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠে, শরীর গরম হতে শুরু করে তীব্র লজ্জার ফলে! ও তড়িঘড়ি করে নিজের চঞ্চল দৃষ্টিটা সেই অনাবৃত পুরুষালী ত্বক থেকে অন্যপাশে সরিয়ে নেয়।
মেঘের এই কাঁপতে থাকা নাজুক অবস্থা সরাসরি না তাকিয়েও খুব ভালো করে উপলব্ধি করতে পারে শীর্ষ। নিজের পশ্চাৎপদে ও কোমরে মেঘের কাঁপতে থাকা ওই কোমল হাতের আলতো স্পর্শ শীর্ষর সুগঠিত দেহে এক ভিন্ন ও আদিম শিহরণ এনে দেয়! এক অদম্য পুরুষালী প্রবল চাহিদা ওর রন্ধ্রে রন্ধ্রে মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে আরম্ভ করে।
তবে এই বাসর রাতে নিজেকে দমন করাও যে এক চরম ও কঠিন যুদ্ধ! সেই মনস্তাত্ত্বিক মানসিক যুদ্ধে শীর্ষ কারদার নিজেকে হাসিমুখে জয়ী বানিয়ে, এক গভীর নিঃশ্বাস ফেলে ধীরেমধ্যে নিজের আঁখিজোড়া নিভিয়ে ফেলে পরম শান্তিতে।
“আমি আপনাকে একটু সাহায্য করি, বড় আন্টি?”
রান্নাঘরে সকালের নাস্তা তৈরিতে ব্যস্ত থাকা শিউলি বেগমকে সাহায্যের উদ্দেশ্যে অতি নম্র গলায় বলে মেঘ।
“কোনো দরকার নেই! তুমি তোমার স্বামীর কাছে যাও, ওখানেই তোমার জায়গা।”
শিউলি বেগমের এমন চরম রুক্ষ ও পরাঙ্মুখ আচরণে মেঘের কোমল হৃদয়ে এক তীব্র আঘাত লাগে। তার মনের গহীনে জমে থাকা ধারণাটাই তবে আজ ধ্রুব সত্য প্রমাণিত হলো শিউলি বেগম ওকে কারদার বাড়ির বড় বউ হিসেবে মন থেকে মেনে নেননি! আর মানবেই বা কেন? যে শিউলি বেগম বহু বছর ধরে নিজের আপন ভাইঝি সূচিতাকে এই বাড়ির পুত্রবধূ করার রাজকীয় স্বপ্ন বুনে এসেছেন, সেখানে তার এই অনাকাঙ্ক্ষিত উপস্থিতি উনি কীভাবে সহ্য করবেন?
মেঘ আড়ষ্ট ও ভারাক্রান্ত পদে ধীরপায়ে রান্নাঘর ত্যাগ করে ড্রয়িংরুমের দিকে এগিয়ে যায়। সোফার কাছাকাছি আসতেই হঠাৎ মুখোমুখি দেখা মেলে বৃদ্ধা জোবায়েদা খাতুনের সাথে। মেঘ তড়িঘড়ি করে মাথার ওড়নাটা আরও খানিকটা টেনে নিয়ে বিনম্র ভঙ্গিতে দাঁড়ায়।
“আসসালামু আলাইকুম, দাদিমা। শুভ সকাল!”
অতি মিহি ও মার্জিত গলায় সালাম প্রদর্শন করে মেঘ। জোবায়েদা খাতুন মেঘের এমন বিনয় ও নম্রতা দেখে মনে মনে বেশ খুশিই হলেন, যদিও মুখের গাম্ভীর্যের অভিব্যক্তিতে তা প্রকাশ পেতে দিলেন না। গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“ওয়ালাইকুম আসসালাম। তা নতুন বউ, সকাল সকাল নিচে কেন ঘুরঘুর করছ?”
“বড় আন্টির কাছে এসেছিলাম নাস্তায় সাহায্য করতে।”
“বড় আন্টি?”
সংকুচিত ও বিস্ময়ভরা চোখে প্রশ্ন করেন বয়স্কা জোবায়েদা খাতুন। মেঘ বেশ থতমত খায়, নিজের অপরাধীর মতো আনত মুখশ্রী আরও খানিকটা নিচু করে মৃদু স্বরে জবাব দেয়,
“মানে — মেজর সাহেবের আম্মু!”
“নিজের সদ্বংশের শাশুড়ীকে বড় আন্টি কেন ডাকছ, মা? ওনাকে কি মা বলে ডাকতে পারো না?”
মেঘ এক মুহূর্ত নিরব থেকে নিজের চোখের জ্বলন্ত সত্যতা তুলে ধরে অত্যন্ত প্রাঞ্জল ও বাস্তবিক কণ্ঠে বলল,
“উনি যেদিন আমায় নিজের মন থেকে আপন পুত্রবধূ হিসেবে গ্রহণ করবেন, ঠিক সেদিন থেকেই ওনাকে আমি মা বলে ডাকব, দাদিমা। মা বলার পরম অধিকারটুকু তিনিই নিজের হাতে আমায় দেবেন।”
মেঘের এমন পরিপক্ক ও যুক্তিসঙ্গত কথায় বৃদ্ধা জোবায়েদা খাতুনের মনটা ভেতরে ভেতরে অসীম শান্তিতে ভরে উঠল! মনে মনে ভাবলেন নাতি শীর্ষ তার খাঁটি রত্ন চিনতে ভুল করেনি, সমাজ যাই বলুক না কেন, ও সত্যিই জহুরির মতো এক খাঁটি হিরে কুড়িয়ে এনেছে এই সংসারে। নাতবউয়ের বাস্তববুদ্ধি আর ব্যক্তিত্বে উনি বেজায় সন্তুষ্ট হলেন।নিজের মুখের কঠোর ভাবটা খানিকটা শিথিল করে তিনি বললেন,
“বেশ, নাস্তা শেষ করে আমার ঘরে একবার এসো তুমি। তোমার সাথে আমার বিশেষ কিছু জরুরি কাজ আছে।”
মেঘ অমায়িক হেসে মাথা নেড়ে বিনীত গলায় বলল,
“আচ্ছা, দাদিমা।”
সম্মতি দিয়ে মেঘ দাদিমা জোবায়েদা খাতুনের সম্মুখ হতে ধীরপায়ে সরে যায়। লম্বা করিডোরটা অতিক্রম করে সে চলে আসে তার বাবা-মায়ের সাময়িক থাকার ঘরটার সামনে। দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই বাবাকে সুন্দর পোশাক পরে তৈরি হতে দেখে মেঘের মনে বিস্ময়ভরা প্রশ্ন জাগে,
“কোথাও যাচ্ছ তোমরা, বাবা?”
নিজের সুতি পাঞ্জাবির ওপরের বোতামটা লাগাতে লাগাতে মৃদু হেসে উত্তর দেন আবু সাত্তার মাস্টার,
“বাড়ি ফিরে যাচ্ছি রে, মা।”
বাবার মুখে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত বিদায়ের কথা শুনে এক লহমায় চমকে ওঠে মেঘ! বুকের ভেতর কেমন যেন এক অজানার মোচড় দিয়ে ওঠে। ধরা ও ভেজা গলায় কেঁদে ওঠার উপক্রম করে শুধায়,
“আমায় একা ফেলে রেখেখে এই অচেনা জায়গায় চলে যাচ্ছ তোমরা?”
আবু সাত্তার মাস্টার আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। হাত বাড়িয়ে আদুরে মেয়েটাকে পরম ভালোবাসায় নিজের চওড়া বুকে টেনে নেন। মেঘও কোনো দ্বিধা না করে একদম ছোট বিড়ালছানার মতো বাবার বুকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে হারিয়ে যায়।
“আহা মা আমার! কেঁদে বুক ভাসাচ্ছেন কেন?আগামী মাসে কিঞ্জা মা-র বিয়েতে আবার ঢাকা আসব তো আমরা। তখন তোকে সাথে করে আমাদের গ্রামে নিয়ে যাব, কথা দিচ্ছি।”
“কেন? আজই আমায় তোমাদের সাথে সাথে নিয়ে চলো না কেন, বাবা? আমি এখানে থাকতে চাই না!”
দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আলেয়া বানু মেয়ের এমন অবুঝ আকুতি দেখে চোখের কোণের জল মুছে মৃদু হাসেন। মেয়েটা এত বড় হয়ে কারদার বাড়ির বড় বউ হয়ে গেল, অথচ তার ছেলেমানুষি আর বাপের বাড়ির প্রতি টানটা যেন বিন্দুমাত্র কমেনি! এখনও সেই পুতুলখেলার বাচ্চাই রয়ে গেল।
আবু সাত্তার মাস্টার আলতো হাতে মেয়ের মাথায় রাখা সুবিন্যস্ত রেশম কুন্তলে হাত রাখেন, ভালোবেসে চুলের নরম ভাঁজে হাত চালাতে চালাতে স্নেহের সুরে বলেন,
“শীর্ষ বাবা যতদিন ছুটিতে এখানে আছে, তোকে আমরা এখন কীভাবে সাথে করে নিয়ে যাই, বল মা? জামাইকে একলা রেখে বাপের বাড়ি যাওয়া কি সাজে?”
বাবার মুখে শীর্ষর পক্ষে এমন দাপ্তরিক অজুহাত শুনে অভিমানে মেঘের দুই গাল ফোলা তুলোর মতো ফুলে ওঠে! সে চট করে বাবার বুক হতে মাথাটা তুলে একরাশ অভিমানী চোখ মেলে তাকায়। লাল টুকটুকে ঠোঁট দুটো উল্টে একবারে মুখ ভারী করে বলে ওঠে,
“তুমি একদম ভালো না, বাবা! আমায় ওই রাগী মেজর সাহেবের কাছে রেখে এভাবে পর করে দিলে! যাও, আমি আর কোনোদিনও তোমার ওই মফস্বলের বাড়ি যাবই না!”
আবু সাত্তার মাস্টার মেয়ের ওমন মিষ্টি ঝগড়া আর অভিমানী ভঙ্গি দেখে হো হো করে হেসে ফেললেন। তারপর পরম মমতায় মেঘের গালে হাত রেখে সানন্দ কণ্ঠে বললেন,
“আচ্ছা বাবা, বেশ! আমার ওই ভাঙা বাড়ি তোকে যেতে হবে না, তুই একবারে নিজের বাড়ি যেও!”
মেঘ আরও খানিকটা ঠোঁট ফুলিয়ে অভিমানে ধুপধাপ পা ফেলে ঘরের বিছানাটায় গিয়ে সটান বসে পড়ে। আবু সাত্তার মাস্টারের চোখের কোণ দুটো টলটলে জলে চিকচিক করে ওঠে। তবে নিজের ভেতরের দুর্বলতাটুকু মেয়ের সামনে প্রকাশ না পেতে দিয়ে উনি তড়িঘড়ি চশমাটা খুলে মুখ ঘুরিয়ে আড়াল করে নেন।
মেয়ের বাবা হওয়া যে কতটা কঠিন আর কষ্টের তা কেবল একজন বাবাই ভালো করে জানেন! বুক আগলে, পরম স্নেহে তিল তিল করে যাকে বড় করে তোলা হলো, তাকেই একদিন অন্য একজনের ঘরে আমানত হিসেবে তুলে দেওয়া কতটা যন্ত্রণাদায়ক! একটা মেয়ের বিয়ের পর প্রতিটা বাবার কলিজা যে কত টুকরো হয়ে ভেঙে খানখান হয়, তা হয়তো এই পৃথিবীর অন্য কেউ কোনোদিন পরিমাপ করতে পারবে না। মেয়ে চলে যাওয়ার পর বাপের বাড়ির সেই শূন্য নিথর ঘরটার দিকে তাকালে ওটা আর ঘর মনে হয় না, যেন এক নিস্তব্ধ মায়াপুরী কিংবা মৃত্যুপুরী মনে হয়!
আলেয়া বানু একপাশে দাঁড়িয়ে স্বামীর বুকের এই তোলপাড় করা কান্নার খবর খুব ভালো করেই বুঝতে পারেন। উনার নিজের মনটাও যে কোনোভাবে সায় দিচ্ছিল না! সত্যি বলতে, প্রথমে তো আলেয়া বানু আর আবু সাত্তার মাস্টার কেউই হঠাৎ করে হওয়া শীর্ষ আর মেঘের এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়েটা মেনে নিতে পারেননি। ওনারা একপ্রকার বেঁকে বসেছিলেন, কোনোভাবেই নিজের কোমলমতি মেয়েকে এমন সামরিক ও বিত্তশালী পরিবারে তুলে দিতে চাইছিলেন না।
কিন্তু শীর্ষ কালবিলম্ব না করে নিজে এসে ওনাদের ঘরে ঢোকে। দুই প্রবীণ মানুষের হাত দুটো ধরে দীর্ঘ সময় ধরে পুরো পেছনের নির্মম ইতিহাস আর যাবতীয় ঘটনাবলী সবিস্তারে খুলে বলে। মেজরের ব্যাকুলতা, সত্যতা আর সুগভীর ভালোবাসা অনুধাবন করে অবশেষে অনেক সময় পর দুজনে নিমরাজি হন। তবে ওনারা শীর্ষর সামনে একটা শক্ত শর্ত জুড়ে দিয়েছিলেন,“যদি কোনোদিন আমাদের মেঘ এই কারদার ভিটেতে সামান্যতম কষ্ট পায়, কিংবা ওর ওপর বিন্দুমাত্র মানসিক নির্যাতন বা অত্যাচার চালানো হয়; তবে সেদিনই আমরা আমাদের মেয়েকে চিরতরে ফিরিয়ে নিয়ে যাব! ছিন্ন করব এই সংসারের সমস্ত বাঁধন!” শীর্ষও বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে মাথা নত করে ওনাদের সেই শর্ত পরম শ্রদ্ধায় মেনে নিয়েছিল।
বিছানায় বসে থাকা অভিমানী মেঘকে এবার দুপাশ থেকে পরম মায়ায় জড়িয়ে ধরেন আলেয়া বানু আর আবু সাত্তার। স্নেহের এই স্বর্গীয় বন্ধনে মেঘও নিজের সমস্ত মান-অভিমান ভুলে গিয়ে নিবিড়ভাবে মিশে থাকে তার জন্মদাতা মা-বাবার বুকের পরম উত্তাপে!
সকালের নাস্তা পর্ব শেষ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজের উদ্দেশ্যে বের হয়েছে কিঞ্জা। রাস্তার মোড় থেকে একটি রিক্সায় উঠে বসেই নিজের কাঙ্ক্ষিত নম্বরে ডায়াল করে ফোনটা কানে ধরে সে।
“যা বলার জলদি বলে ফেলো!”
ওপাশ হতে প্রহরের ভীষণ রুষ্ট ও গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে উঠতেই কিঞ্জার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টু মিষ্টি হাসি ফুটে ওঠে। ও নিজের দুষ্টুমি বহাল রেখে চটপটে কণ্ঠে হুকুম ছাড়ল
“এখনই জলদি টিএসসির মোড়ে আসুন। আপনার সাথে বিশেষ কাজ আছে!”
“তোমার কথামতোই কি আমায় দিনরাত নাচতে হবে নাকি, হ্যাঁ? আসব না আমি, কী করবে তুমি?”
প্রহরের কাছ থেকে ঠিক যেমন ক্ষ্যাপাটে ও ত্যাড়্যা উত্তর আশা করেছিল কিঞ্জা, পেলও ঠিক তেমনই! ও এবার গলার স্বরে সামান্য কৃত্রিম ঝাঁঝ আর হুঁশিয়ারি ঢেলে বলল,
“সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে না এসে দেখুন একবার! না আসলে সেদিন অফিস রুমে যেমন চড় পড়েছিল, আজকেও ঠিক তেমনই পড়বে দুই গালে! সেদিন তো মাত্র চারটে দিয়ে ছেড়ে দিয়েছিলাম, আজ হিসেব কষে পুরো দশটা দেবো!”
প্রহরের কোনো প্রতিবাদী উত্তর শোনার আগেই কিঞ্জা ঝটপট কান থেকে মোবাইলটা নামিয়ে কট করে কলটা কেটে দেয়।
মিনিট বিশেক পর রিক্সাটা এসে টিএসসির মোড়ে থামে। রিক্সা ভাড়া মিটিয়ে নেমে চারপাশটায় নিজের চঞ্চল চোখ দুটো ঘোরাতে থাকে কিঞ্জা। দূরে এক সুবিশাল শিশুগাছের নিচে পিঠে দু-হাত শক্ত করে বেঁধে গম্ভীর ভঙ্গিতে কাউকে বিরক্তিকরের মতো দণ্ডায়মান অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ও। কিঞ্জা ঠোঁটে মুচকি হাসি ফুটিয়ে বড় বড় পা ফেলে সোজা গিয়ে দাঁড়ায় সেই চেনা মানুষটার একদম মুখোমুখি।
“কেমন আছেন, আমার গম্ভীর সাহেব?”
মানুষটি ধীরেসুস্থে সামনে ঘোরে। কিঞ্জার দিকে ছুড়ে দেয় এক চরম বিরক্তিকর ও রাগী চাহনি,
“রাস্তার গুন্ডা-মাস্তান মেয়েদের মতো অসভ্য আচরণ করাটা ঠিক কোথায় শিখেছ তুমি, হ্যাঁ?”
“আমার পরম আদরের প্রেমিকের কাছ থেকে!”
কিঞ্জা বিন্দুমাত্র ইতস্তত না করে জবাব দেয়।
“কে তোমার আবার সেই হতভাগা প্রেমিক?”
প্রহর একখানা ভ্রু উঁচিয়ে শুধায়।
“কেন? ঢাকার ৬ ও ৭ নং আসনের রাস্তায় দাপিয়ে ঘুরে বেড়ানো এই রুক্ষ মাস্তান প্রহর ইবনাতই তো আমার একমাত্র প্রেমিক, আমার স্বপ্নের কল্পপুরুষ!”
কিঞ্জার পরনে থাকা হালকা সবুজ সুতি শাড়িটার দিকে অপলক নজর রাখে প্রহর। সকালের রোদে সবুজ শাড়িতে মোড়ানো মেয়েটাকে হঠাৎ যেন বড্ড বেশি মায়াবী লাগছে! অজান্তেই প্রহরের বুকের গভীর গহ্বরে কেমন যেন একটা চেনা চিনচিনে টান মেরে উঠল! তবে ভেতরের সেই অব্যক্ত অনুভব বা ব্যথাকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে মুখশ্রীদের চরম গাম্ভীর্য ধরে রেখে শুধাল,
“এত ঢং না করে বলো, মাঝরাস্তায় এখন কেন ডেকে পাঠিয়েছ আমায়?”
“আমার এই রাজকীয় খোপার জন্য দু-ছড়া টাটকা বেলী ফুলের মালা কিনে দেওয়ার জন্য!”
“কেন? নিজের পকেটে কি টাকা-পয়সা নেই তোমার?”
“টাকা তো প্রচুর আছে! কিন্তু প্রেমিকের নিজের পকেটের টাকায় কিনে দেওয়া জিনিসের আসল মূল্য আর আবেগ যে অনেক বেশি, মাস্তান সাহেব!”
মেজর কারদার পর্ব ২৭
কথাটা শেষ করেই কিঞ্জা দু-কদম আরও কাছে এগিয়ে আসে। প্রহরের চওড়া বুকের ঠিক বাম পাশটায় নিজের ডান হাতের তর্জনী আঙুলটা আলতো করে ঠেকায়। তারপর পায়ের পাতায় ভর দিয়ে সামান্য দু-পা উঁচু হয়ে নিজের গোলাপী ঠোঁট দুটো প্রহরের কানের একদম কাছে নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে সুর তোলে,
“বুকের এই পবিত্র জায়গাটার একচ্ছত্র মালকিন কিন্তু স্রেফ আমি! আপনার এই তপ্ত হৃদযন্ত্রটা যেন দিনরাত কেবল আমার নামেই স্পন্দিত হয়, প্রহর ইবনাত। ভীষণ ভালোবাসি আপনাকে! এই পুরো দুনিয়ায় আমি শুধু আপনাতেই চরমভাবে আসক্ত!”
