Home মোহশৃঙ্খল মোহশৃঙ্খল পর্ব ২৬

মোহশৃঙ্খল পর্ব ২৬

মোহশৃঙ্খল পর্ব ২৬
মাহা আয়মাত

দুপুর তখন প্রায় তিনটা। কারদার ম্যানরের মেইন ডোরে লাগাতার কলিংবেল বেজেই চলেছে। যে বেল বাজাচ্ছে, সে যেন থামতেই চাইছে না। একের পর এক সুইচ চাপছে, এক সেকেন্ডে হয়ত দুই-তিনবার করে! কিচেন থেকে তাড়াহুড়া করে লিভিং রুমে চলে আসে মেইড। তার পেছন পেছন নাজনীন কারদারও এগিয়ে আসেন, দেখার জন্য কে এমন অসভ্যের মতো বেল বাজাচ্ছে।
মেইড দরজা খুলতেই দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখার জন্য নাজনীন কারদার উকি দেন। মুহূর্তেই উনার ভ্রু কুঁচকে যায়। হানিন ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলে,

— এতোক্ষণ লাগে দরজা খুলতে!
নাজনীন কারদার ঠাণ্ডা গলায় বলেন,
— উড়ে উড়ে এসে তো আর দরজা খুলে দিবে না। একটু সময় তো লাগবেই!
হানিন কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে,
— তাহলে এতো বড়লোক হয়ে লাভ কি হলো? যদি দরজা খুলার জন্য একটা হেলিকপ্টার না থাকে?
নাজনীন কারদারের চোখমুখ শক্ত হয়ে যায়। তিনি বলেন,
— ভুলে যাচ্ছো বোধ হয় কার সাথে কথা বলছো!
হানিন হালকা হাসি দিয়ে বলে,
— আপনাকে ভুলবো কিভাবে? আপনাকে ভুলা অসম্ভব! আমি ভুলতে চাইও না!
নাজনীন কারদার সন্দেহভরা দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকেন। হানিনের কথাগুলো অদ্ভুত, রহস্যময়। এমন কথার ধরন নাজনীন কারদারের মোটেও ভালো লাগেনি।
হানিন আবার স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,

— যাই আমি অর্তিহার কাছে?
নাজনীন কারদার কোনো উত্তর দেন না। কিছুক্ষণ নাজনীন কারদারের দিকে তাকিয়ে থাকে হানিন। তারপর হালকা হাসি দিয়ে উনাকে পাশ কাটিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে যেতে থাকে। নাজনীন কারদার ঘুরে আবার হানিনের দিকে তাকান। হানিনের কথাগুলো কেমন যেন প্যাঁচানো আর সন্দেহ জাগানো।
অর্তিহা বেডে আধশোয়া হয়ে আছে। তার মুখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ। সে আদ্রিকের ওপর ভীষণ বিরক্ত। শুধু বিরক্তই না, মনে হচ্ছে তার ধৈর্যের সীমা প্রায় শেষ হয়ে গেছে। কারণ সারাক্ষণই তাকে আদ্রিকের কথামতো চলতে হয়। এখনও তাই হচ্ছে। দুপুরে খাওয়া শেষ করে আদ্রিক তাকে ধরে বেশ কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করিয়েছে। তারপর আবার শুয়ে থাকতে বলেছে। কিন্তু অর্তিহা শুয়ে থাকতে চাইছিল না। তার ইচ্ছা ছিল একটু মেহজার কাছে যাবে। কিন্তু আদ্রিক সোজা না করে দিয়েছে।

শেষ পর্যন্ত আদ্রিকের কথামতো অর্তিহা ঠিকই শুয়ে আছে, কিন্তু এখন তার নিজের ওপরই রাগ হচ্ছে। মনে হচ্ছে, কেন সে আদ্রিকের কথা শুনল? দরকার হলে একটু ঝগড়া করলেই পারত! সে কেন সব সময় আদ্রিকের কথা মেনে চলবে? আর আদ্রিকই বা কেন তার ওপর এত শাসন ফলাবে? এইসব ভাবতে ভাবতেই বিরক্তিতে ভরে আছে অর্তিহা। ঠিক তখনি দরজায় নক হয়।
শব্দটা শুনেই অর্তিহার চোখ হঠাৎ খুশিতে জ্বলজ্বল করে ওঠে। তার মনে হয়, হয়তো মেহজা এসেছে।
মনে মনে সে ঠিক করে ফেলে, মেহজাকে বলেই এই রুম থেকে বের হয়ে যাবে। কারণ এই বাড়িতে একমাত্র মেহজাই আছে যে আদ্রিকের সাথে তর্ক করতে পারে। নইলে বাকি সবাই তো আদ্রিককে দেখলেই একেবারে নমনম করে থাকে।
আদ্রিক বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিল। ঠিক তখনি দরজায় নক করার শব্দ ভেসে আসে। শব্দ শুনে সে বেলকনির দরজা থেকে উঁকি দিয়ে রুমের ভেতরে দরজার দিকে তাকায়। অর্তিহা বেড থেকে নামার জন্য পা নামাতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনি আদ্রিক ফোনে বলে ওঠে,

— পরে কল দিচ্ছি।
অর্তিহা থেমে যায়। বুঝে যায়, আর নামতে হবে না, আদ্রিকই দরজা খুলবে। আদ্রিক ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যায় এবং দরজা খুলে দেয়। দরজা খুলতেই সামনে হানিনকে দেখে আদ্রিকের চোখ জোড়া একটু তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে।
হানিন হাসিমুখে বলে,
— কেমন আছেন ভাইয়া?
আদ্রিকও ঠোঁটে হালকা সুন্দর হাসি টেনে বলে,
— সব সময়ের মতো অনেক ভালো শালিকা!
হানিন ভ্রু তুলে বলে,
— তাই?
— জি তাই।
— ভেতরে ঢুকতে দিবেন না?
এরই মধ্যে অর্তিহা বেড থেকে নেমে আদ্রিকের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। আদ্রিক কিছু বলার আগেই অর্তিহা আদ্রিকের হাতটা দরজার চৌকাঠ থেকে সরিয়ে দিয়ে বলে,
— আয় ভেতরে আয়। দাঁড়িয়ে আছিস কেন?
হানিন মাথা নেড়ে বলে,

— হ্যা আসছি।
বলেই হানিন ভেতরে ঢোকার জন্য পা বাড়ায়। কিন্তু হঠাৎ করেই হোঁচট খেয়ে সোজা অর্তিহার ওপর গিয়ে পড়ে। অর্তিহা তাল সামলাতে না পেরে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই আদ্রিক দ্রুত হাত বাড়িয়ে অর্তিহাকে ধরে ফেলে। অর্তিহা একটু পেছনের দিকে হেলে আছে, পেছন থেকে আদ্রিক অর্তিহাকে ধরে আছে। আর সামনে হানিন অর্তিহার কাঁধে হাত রেখে ঝুঁকে আছে। আদ্রিক অর্তিহাকে ধরে ফেলায় হানিন সরে দাঁড়াতে যায়। কিন্তু সরে আসার সময় অর্তিহার গলার চেইনে তার হাত লেগে যায়। টান পড়তেই চেইনটা ছিঁড়ে যায়। ছেঁড়া চেইনটা এসে পড়ে হানিনের হাতে।
হানিন মুখটা মলিন করে চেইনটা দেখিয়ে বলে,
— ইশশ! আমি হোঁচট খেয়ে তোর চেইনটা ছিড়ে ফেললাম।
আদ্রিক অর্তিহাকে ঠিক করে দাঁড় করিয়ে ছেড়ে দেয়। অর্তিহা হানিনের হাতে থাকা ছেঁড়া চেইনটার দিকে তাকায়, তারপর একবার আদ্রিকের দিকে চোখ ফেরায়। আদ্রিক একদম স্বাভাবিক দৃষ্টিতে হানিনের দিকেই তাকিয়ে আছে।
হানিন আবার বলে,

— সরি অর্তি! তোর এতো স্পেশাল চেইনটা ভাইয়া তোকে গিফট করেছিলো, সেটা আমি ছিড়ে ফেলেছি।
অর্তিহা হালকা হেসে বলে,
— সমস্যা নেই। তুই তো ইচ্ছে করে করিসনি।
হানিন চেইনটা অর্তিহার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
— নে, এটা সাবধানে রেখে দে। নয়ত হারিয়ে যাবে। এতো দামি জিনিস।
অর্তিহা চেইনটা হাতে নিয়ে বলে,
— আচ্ছা, রাখবো। তুই আয় ভেতরে আয়।
অর্তিহা হানিনকে নিয়ে ভেতরে ঢোকে এবং হানিনকে সোফায় বসতে বলে। তারপর নিজে গিয়ে চেইনটা ড্রয়ারে রেখে আসে। ফিরে এসে আবার হানিনের পাশে বসে পড়ে। এরপর দুই বান্ধবী নানা গল্পে মেতে ওঠে। এতক্ষণে অর্তিহার চুপসে থাকা মুখটায় হাসি ফিরে এসেছে। একটু দূরেই আদ্রিক সেসবই মনোযোগ দিয়ে দেখছে। কথা বলতে বলতেই হঠাৎ হানিন কাশতে শুরু করে।
অর্তিহা উদ্বিগ্ন হয়ে বলে,

— কি হলো হানিন?
বলতে বলতেই অর্তিহা হানিনের মাথা আর পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে।
হানিন কাশতে কাশতেই বলে,
— একটু পানি দে?
অর্তিহা তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে টেবিলের কাছে গিয়ে দেখে বোতলে পানি নেই। অর্তিহা বলে,
— দাঁড়া, আমি নিচ থেকে পানি নিয়ে আসছি।
হানিন কাশতে কাশতেই মাথা নেড়ে ‘আচ্ছা’ বোঝায়।
অর্তিহা রুম থেকে বের হয়ে যেতেই আদ্রিক শান্ত গলায় বলে ওঠে,
— থেমে যাও। চলে গেছে অর্তি।
হানিন মাথা ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে সত্যিই অর্তিহা চলে গেছে। সঙ্গে সঙ্গেই হানিনের কাশি থেমে যায়। সে উঠে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে আদ্রিকের কাছে আসে। তারপর একটু গলা পরিষ্কার করে বলে,
— হ্যা, ঠিক হয়েছে। কি কাশিটাই না উঠেছিলো।
আদ্রিক হানিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। ঠোঁটের কোণে হালকা বাঁকা হাসি।
হানিন চোখ সরু করে বলে,
— আচ্ছা, আপনি মনে মনে বকছিলেন না তো? যেন কাশতে কাশতে মরে যাই?
আদ্রিক শান্ত কিন্তু ঠান্ডা স্বরে বলে,

— তোমার কেন মনে হলো? তোমাকে মারার জন্য আমার তোমাকে বকতে হবে? আমার হাত কি যথেষ্ট না তোমার গলাটা চেপে ধরে তোমার জানটা বের করে ফেলার জন্য?
হানিন বিন্দুমাত্র ভয় না পেয়ে বলে,
— তো মারছেন না কেন?
আদ্রিক আগের মতোই শান্ত স্বরে বলে,
— সবকিছুরই একটা নির্দিষ্ট সময় থাকে। তোমাকে মারার ক্ষেত্রেও তাই, শালিকা।
হানিন হালকা হাসি দিয়ে সুর টেনে বলে,
— আপনার নির্দিষ্ট সময়ের অপেক্ষায় রইলাম ভাইয়াআআআআ!
শেষের ‘ভাইয়া’ শব্দটা হানিন টেনে বলে। আদ্রিক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে হানিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। ঠোঁটের কোণে এখনও হালকা হাসি লেগে আছে।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে হানিন আবার বলে,
— আচ্ছা, আপনার একটা ফ্রেন্ড ছিলো না আদনান? লোকটা দেখতে অনেক সুন্দর! ভালো লেগেছে! তাকে একটু আসতে বলবেন? একটু দেখতাম! শেষবার সেই হলুদ সন্ধ্যায় দেখেছিলাম!
আদ্রিকের মুখের ভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন আসে না। শান্তভাবেই বলে,
— আমিও শেষবার সন্ধ্যায়ই দেখেছিলাম।
হানিন ঠোঁট উল্টে বলে,

— মিথ্যে বলেন কেন? আপনি তো শেষবার মাঝরাতে দেখেছিলেন! আমি কিন্তু জানি!
আদ্রিক ঘাড় বাকা করে হেসে ফেলে। হানিনও হাসে। ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— অবাক হয়েছেন?
আদ্রিক হালকা হাসি রেখেই মাথা নাড়ে,
— না।
হানিন বলে,
— কালকে একটা ভয়ংকর স্বপ্ন দেখেছি।
আদ্রিক মজা করে বলে,
— তাই? খুব ভয়ংকর? আমি ছিলাম নাকি?
হানিন মাথা নেড়ে বলে,
— হ্যা, একদম ঠিক। কালকে রাতে স্বপ্নে দেখলাম আপনি একটা সাংবাদিককে অনেক বিভৎস ভাবে মেরে ফেলেছেন! সাংবাদিকের চেহারাটা অনেক বিভৎস ছিলো। সাংবাদিকটার নাম মনে হয় ছিলো রুবেল। আপনি চিনেন তাকে?
আদ্রিক নির্বিকার গলায় বলে,

— নামই কখনো শুনিনি।
হানিন সঙ্গে সঙ্গেই বলে ওঠে,
— আবারো মিথ্যে বলছেন ভাইয়া! আপনি তো খুব ভালো করে চিনেন!
আদ্রিক হালকা কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে,
— হয়ত চিনি। জীবনে কত অপ্রয়োজনীয় মানুষের সাথেই তো দেখা হয়।
হানিন আবার জিজ্ঞেস করে,
— এবার নিশ্চয়ই অবাক হয়েছেন? আমি জানি কিভাবে?
আদ্রিক মাথা নেড়ে। অভ্যাসগত হাসিটা ঠোঁটের কোণে রেখে বলে,
— না।
হানিন চোখ ছোট করে ইশারায় জিজ্ঞেস করে,
— না?
আদ্রিক আবারও ইশারায় মাথা নেড়ে ‘না’ বোঝায়।
হানিন বলে,
— আচ্ছা। আমি তো কালকে স্বপ্নেই আপনাকে অমানুষ জানোয়ার বলে ফেলেছিলাম। ডোন্ট মাইন্ড।
আদ্রিক হেসে বলে,

— আই ডোন্ট মাইন্ড!
হানিন বলে,
— থ্যাংক ইউ। আর সরি।
আদ্রিক ভ্রু তুলে জিজ্ঞেস করে,
— সরি ফর হোয়াট?
হানিন বলে,
— আপনার দেওয়া এতো ভালোবাসার চেইনটা ছিড়ে ফেলেছি। সেজন্য।
আদ্রিক হেসে বলে,
— অনেক দিনের ইচ্ছে ছিলো তোমার, অর্তির গলা থেকে চেইনটা সরানোর। তাই ছিড়ে ফেলেছো! এতে কোনো সমস্যা নেই। আমি রাগ করছি না।
হানিন কিছু বলতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনি অর্তিহা পানির গ্লাস নিয়ে রুমে ঢোকে। হানিন সঙ্গে সঙ্গে আদ্রিকের সামনে থেকে সরে আসে। অর্তিহার কাছ থেকে গ্লাসটা নিয়ে পানি খেতে খেতে আড়চোখে একবার আদ্রিকের দিকে তাকায়। পানি খাওয়া শেষ করে হানিন গ্লাসটা অর্তিহার হাতে দিয়ে বলে,
— আয় আমার সাথে বস। কথা বলি।
অর্তিহা গ্লাসটা টেবিলের উপর রেখে দেয়। তারপর হানিনকে নিয়ে সোফায় গিয়ে বসে। এদিকে আদ্রিক রুম থেকে বের হয়ে যায়। হানিন একবার সেদিকে তাকায়। তারপর অর্তিহার দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করে,

— কেমন কাটছে সংসার?
অর্তিহা শান্ত গলায় বলে,
— ভালো।
হানিন কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— সত্যিই ভালো? হঠাৎ করে বিয়ে হয়েছে শেষ মুহূর্তে আদ্রিক ভাইয়ার সাথে। মানিয়ে নিতে পেরেছিস তো?
অর্তিহা শান্ত গলায় বলে,
— আমি সবসময় মানিয়ে নিয়েই আসছি। আমার থেকে ভালো আর কে পারবে মানিয়ে নিতে?
হানিন একটু ঝুঁকে জিজ্ঞেস করে,
— মানিয়ে নিচ্ছিস মানে? তোদের মধ্যে কি ভালোবাসা তৈরি হয়নি এখনো?
অর্তিহা ধীর স্বরে বলে,
— ভালোবাসা জোর করে কিংবা বললেই হয়ে যায় না। আর ভালোবেসে ফেললে দুনিয়া উল্টে গেলেও সেই ভালোবাসা মরে না।
হানিন সুযোগ পায়। পুরনো অনুভূতি জাগিয়ে দেওয়ার জন্য সায় দিয়ে মাথা নেড়ে বলে,
— ঠিক বলেছিস। জীবনে দ্বিতীয় ভালোবাসা আসলেও প্রথম ভালোবাসা ভুলা যায় না।
অর্তিহার মনে পড়ে মাওলিদের কথা। গভীর স্বরে বলে,
— সবার জীবনে দ্বিতীয় ভালোবাসা আসে না। কিংবা সবাই দ্বিতীয়বার ভালোবাসতে পারে না।
কথাটা বলার সময় অর্তিহার চোখের কোণে হালকা পানি জমে ওঠে। সে দ্রুত ঘাড় ঘুরিয়ে চুল ঠিক করার ভান করে চোখের কোণের সেই পানিটুকু মুছে নেয়।
তবে হানিন ঠিকই সেটা দেখে ফেলে। আড়ালে সে বাকা হাসে। তার কাজ হয়ে গেছে। হানিন উঠে দাঁড়ায়। অর্তিহার কাঁধে হাত রেখে বলে,

— আচ্ছা আমি গেলাম অর্তি। ভালো থাকিস।
অর্তিহাও উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
— আরেকটু বস?
হানিন মাথা নেড়ে বলে,
— না রে, আরেকদিন আসবো।
অর্তিহা বলে,
— আচ্ছা চল, তোকে নিচ পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি।
হানিন সঙ্গে সঙ্গে বাধা দিয়ে বলে,
— তা করতে হবে না। তুই এখানেই থাক। আমি যেতে পারবো। অকারণে কষ্ট করে সিঁড়ি বেয়ে নামবি।
বলেই হানিন অর্তিহার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে আসে। করিডোর দিয়ে কিছুটা হেঁটে গিয়ে সে আরভিদের রুমের সামনে এসে দাঁড়ায়। তারপর দরজায় নক করে। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে মেহজা।
হানিনকে দেখে মেহজা হেসে বলে,
— হানিন তুমি? কখন এসেছো?
হানিনও হাসিমুখে বলে,

— একটু আগেই এসেছিলাম। অর্তিহার সাথে কথা বলছিলাম এতক্ষণ। এই তো এখন চলে যাচ্ছি। ভাবলাম তোমার সাথে দেখা করে যাই।
মেহজা বলে,
— ওহ। আসো ভেতরে আসো।
হানিন মাথা নেড়ে বলে,
— না, ভেতরে আসবো না। ভাবলাম তোমার সাথে দেখা করে যাই। বাসায় যাবো এখন। রেস্ট নিবো। সেই সকালে যোগ দিয়েছিলাম আন্দোলনে।
মেহজা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— আন্দোলন? কিসের আন্দোলন?
হানিন ভ্রু কুচকে বলে,
— গতকালকের নিউজ দেখোনি? একটা মেয়েকে খুন করে আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের ময়লার ওপর ফেলে গেছে কয়েকটা ছেলে?
মেহজা মাথা নেড়ে বলে,
— হুম, দেখেছিলাম তো। আসামি ধরতে পেরেছে?
হানিন তাচ্ছিল্যের সুরে বলে,
— মেহজা, তুমিও না! আসামি ধরা তো দূরের কথা, এখন উল্টো মেয়েটাকেই মস্করা করছে। বলছে নাকি মেয়েটাকে ধর্ষণ করা হয়নি। অথচ কাল দুপুরেই পোস্টমর্টেম রিপোর্টে বলা হয়েছিল, মেয়েটার ওপর ৫–৬ জনের ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে।
মেহজা রাগ আর বিস্ময়ের কন্ঠে বলে,

— এটা কিভাবে বলতে পারে? সরাসরি বোঝা যাচ্ছে মেয়েটাকে ধর্ষণ করার পর খুন হয়েছে।
ঠিক তখনি ওয়াশরুমের দরজা খুলে যায়। তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে আরভিদ বের হয়ে আসে।
হানিন আরভিদকে দেখেই বলে,
— ওরা না বললে ওদের চাকরি থাকবে? এখানে তো ওদের যা বলছে তাই করছে ওরা।
আরভিদ থেমে যায়। ভ্রু কুঁচকে তাকায় হানিনের দিকে। মাঝখানে এসে কথাটা শুনেছে, তাই ঠিক বুঝতে পারছে না কোন বিষয়ে কথা হচ্ছে। কিন্তু হানিন যেভাবে তার দিকে তাকিয়ে বলেছে, তাতে মনে হচ্ছে কথাটা যেন তাকে উদ্দেশ্য করেই বলা।
মেহজা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— মানে?
হানিন শান্ত গলায় বলে,

— মানে সোজাসাপটা। যারা অপরাধ করেছে তারা ক্ষমতাশালী। সেজন্যই আইন চুপ হয়ে আছে।পোস্টমর্টেম রিপোর্টও চেঞ্জ হয়ে গেছে!
এবার আরভিদ বুঝতে পারে কথাটা কোন বিষয় নিয়ে। আর এটাও বুঝতে পারে, খোঁচাটা সরাসরি তাকেই দেওয়া হয়েছে। আরভিদের মুখ শক্ত হয়ে যায়। চোখ-মুখ কঠিন করে আরভিদ তাকিয়ে থাকে হানিনের দিকে। সে বুঝতে পারছে, হানিন ইচ্ছে করেই মেহজার সামনে এই কথাগুলো বলেছে। কিন্তু একটা বিষয় তার মাথায় আসছে না, হানিন কেন এই বিষয়টা নিয়ে তাকে খোঁচাচ্ছে? আর তার সাথে এমন শত্রুতার মতো আচরণ করছে কেন? হানিন আসলে কে?
মেহজা আবার জিজ্ঞেস করে,
— মেয়েটার নাম কি? যে মারা গেছে?
হানিন বলে,
— মেয়েটার নাম তুশি। কলেজে পড়ে। বাবা রিকশা চালক, আর মা বাড়ি বাড়ি কাজ করে। একটাই মেয়ে তাদের।
মেহজা রাগে কষ্টে বলে,
— আল্লাহ! যে জানোয়ার, ওই শয়তানগুলোকে বাঁচাচ্ছে, তাকে তুমি ধ্বংস করে দাও।
মেহজার কথায় আরভিদ হানিনের দিক থেকে চোখ সরিয়ে মেহজার দিকে তাকায়। দেখে, মেহজার মুখ রাগে একেবারে লাল হয়ে আছে।
হানিন বলে,

— আচ্ছা, আমি গেলাম মেহজা। ভালো থেকো।
তারপর পেছনে আরভিদের দিকে তাকিয়ে বলে,
— আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া, গেলাম।
বলেই হানিন চলে যায়। মেহজা দরজা বন্ধ করে পেছন ফিরে তাকায়। দেখে আরভিদ ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
মেহজা জিজ্ঞেস করে,
— আপনি কি বাইরে যাবেন?
আরভিদ বলে,
— হ্যা।
থেমে জিজ্ঞেস করে,

— রেগে আছিস কেন?
মেহজা ক্ষুব্ধ গলায় বলে,
— আপনাকে গতকাল একটা মেয়ের ধর্ষণের পর খুনের কথা বলেছিলাম না? সেই মেয়েটাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিলো ধর্ষণ করা হয়েছে, অথচ পুলিশ বলছে তাকে নাকি ধর্ষণ করা হয়নি। আচ্ছা, এই দেশে এমন ফালতু আইন কেন? আর মেয়েদের সাথেই বা কি শত্রুতা? এরা বারবার কেন ধর্ষকদের বাঁচিয়ে নেয়? আর যে এই ধর্ষকদের বাঁচাচ্ছে, দোয়া করি ওই শয়তানটা যেন ধ্বংস হয়ে যায়। আল্লাহ, তুমি গজব নাজিল করো ওই জানোয়ারদের ওপর।
অর্তিহা বেডে বসে ছিল। ঠিক তখনি কোথাও একটা ফোনের রিং বাজতে থাকে। অর্তিহা চারদিকে তাকিয়ে নিজের ফোনটা খুঁজতে থাকে। এবং পেয়েও যায়। দেখে, তার ফোনটা বালিশের পাশেই রাখা।
অর্তিহা ফোনটা হাতে নিয়ে স্ক্রিনে তাকায়, কোনো কল আসছে না। তখনি তার মনে হয়, রুমে নিশ্চয়ই আরেকটা ফোন আছে। অর্তিহা উঠে দাঁড়িয়ে বেডের চারপাশে, কোণাকাঞ্চি, সব জায়গায় খুঁজতে থাকে। কিন্তু কোথাও ফোন পায় না।

এরই মধ্যে ফোনের রিংটোন বন্ধ হয়ে যায়। অর্থাৎ কলটা কেটে গেছে। অর্তিহা অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বুঝতে পারে না, কার ফোনে কল আসছিল।
পরের মুহূর্তেই তার মনে হয়, আদ্রিক কি ভুলে ফোন রেখে গেছে? কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই তার মনে পড়ে, আদ্রিক যখন বের হচ্ছিল তখন তার হাতেই ফোন ছিল। ঠিক তখনি আবার ফোন বেজে ওঠে। অর্তিহা আবার খোঁজা শুরু করে। খুঁজতে খুঁজতে এবার এসে সোফার সামনে থামে। তার মনে হয়, ফোনটা এখানেই আছে।
সে সোফার কুশন সরাতেই একটা ছোট বাটন ফোন দেখতে পায়। অর্তিহা অবাক হয়ে ফোনটা হাতে তুলে নেয়। কিছুই বুঝতে পারে না। এই ফোনটা এলো কোথা থেকে? আর সবচেয়ে বড় কথা, এই বাসায় তো কেউই বাটন ফোন ব্যবহার করে না। বেশি না ভেবে সে বাজতে থাকা ফোনটা রিসিভ করে কানে লাগায়। নরম স্বরে বলে,

— আসসালামু আলাইকুম।
ওপাশ থেকে ভেসে আসে একটা কণ্ঠস্বর,
— ওয়ালাইকুম সালাম।
কণ্ঠটা যেন সরাসরি এসে অর্তিহার বুকে ধাক্কা মারে।
অর্তিহা থমকে যায়। কণ্ঠটা তার খুব চেনা মনে হয়।
নিজেকে সামলে নিয়ে সে জিজ্ঞেস করে,
— কে?
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। এদিকে অর্তিহার বুক কাঁপছে। সে উত্তরের অপেক্ষায় থাকে। কিছুক্ষণ পর ওপাশ থেকে তাচ্ছিল্যের সুরে ভেসে আসে,
— বাহ! নতুন স্পর্শ এত দ্রুত আমাকে মন আর স্মৃতি থেকে মুছে দিলো?
অর্তিহা কাঁপা কাঁপা গলায় কোনোভাবে বলে ওঠে,
— মা… মাও… মাওলিদ? তুমি?
ওপাশ থেকে শোনা যায়,
— যাক, তাহলে পুরোপুরি ভুলোনি! একটু হলেও মনে আছে।
অর্তিহা অবিশ্বাসে বলে,

— মাও… মাওলিদ, তুমি বেঁচে আছো?
মাওলিদ ধীর গলায় বলে,
— বেঁচে থেকেও মরে গেছি, যখন শুনেছি তোমার মনে এখন অন্য কেউ।
অর্তিহা দ্রুত বলে ওঠে,
— কে? কেউ নেই তুমি ছাড়া আমার মনে। আমি তোমাকে ভুলিনি। বিশ্বাস করো, একটুও ভুলিনি। আমার মনে শুধুই তুমি। আচ্ছা, এসব বাদ দাও। তুমি কেন আমাকে কল করেছো? তুমি বেঁচে আছো জানলে আদ্রিক ভাইয়া তোমাকে মেরে ফেলবে।
অর্তিহার শরীর কাঁপছে। জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে। মাওলিদ শান্ত গলায় বলে,

মোহশৃঙ্খল পর্ব ২৫

— কিছু করতে পারবে না।
অর্তিহা উদ্বিগ্ন স্বরে বলে,
— তুমি উনাকে চিনো না! উনি অনেক জঘন্য! যদি জানতে পারে তুমি বেঁচে আছো, তোমাকে মেরে ফেলবে। এবার তোমার কিছু হলে আমি শেষ হয়ে যাবো।

মোহশৃঙ্খল পর্ব ২৭