মৌটুসী পর্ব ২১
ঋতস্বিনী মাহবিশ
গাড়িতে ওঠার পরপরই নেশাগ্রস্ত মস্তিষ্ক আর ক্লান্ত শরীর নিয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ল আরোয়া। গাড়ির সিটে মাথা এলিয়ে দিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই সে গাঢ় ঘুমে তলিয়ে গেল। সাফওয়ান নীরবে ড্রাইভ করছে।
বাড়িতে পৌঁছে গাড়ি থামাল সাফওয়ান। ইঞ্জিন বন্ধ করার পরও চুপচাপ বসে রইল কতক্ষণ। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল আরোয়ার ঘুমন্ত মুখের দিকে। তারপর ওকে মৃদু স্বরে ডাকতে লাগল,
“আরোয়া! আরোয়া শুনছ? ওঠো। এই যে মেয়ে?”
অথচ আরোয়ার কোনো নড়চড় নেই। সাফওয়ান এবার ওর মাথাটা ধরে মৃদু ঝাঁকিয়ে ডাকতে লাগল,
“আরোয়া। বাড়িতে চলে এসেছি আমরা, ওঠো। আরোয়া?”
তাতেও কাজ হলো না বিশেষ। তরুণীর ঘুম ভাঙার নামই নেই। অতঃপর পকেট থেকে ফোন বের করে আশার নাম্বারে ডায়াল করল সাফওয়ান। কল রিসিভ হতেই বলল, “আপু, একটু বাইরে বেরিয়ে এসো তো।”
”কেন, তোরা কোথায়?”
”আমরা গেটের কাছে আছি। একটু তাড়াতাড়ি এসো। আর ভাইয়া যেন বুঝতে না পারে।”
”আচ্ছা। আসছি আমি।”
দুই মিনিটের মাথায় এক প্রকার হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এল আশা। গেট পেরোতেই গাড়ির পাশে সাফওয়ানকে উন্মুক্ত দেহে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বিস্ময়ে পা দুটো কিছু মুহূর্তের জন্য থমকে গেল তার।
ধুর! কী সব ভাবছে সে? আরোয়া কিংবা সাফওয়ান কেউই এমন কোনো ঘটনা ঘটাবার ছেলে-মেয়ে নয়! মন থেকে সব অযাচিত চিন্তা-ধারণা ঝেড়ে ফেলে আবারও পা বাড়াল আশা। কাছাকাছি আসতেই উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে সাফওয়ান, তোর জামা-কাপড়?”
”আপু, আরোয়া বমি করে আমার পোশাক নোংরা করে দিয়েছে।”
”বমি?”
”ইয়ে আসলে, সি ইজ ড্রাংক আপু।”
”হোয়াট?” আশার চোখ মার্বেল আকার ধারণ করল, “কোথায় ওই হতচ্ছাড়ি মেয়ে?”
”আপু, আরোয়াকে এখন কিছু বলো না প্লিজ। হয়তো বা কেউ ওর অগোচরে খাবারে কিছু মিশিয়ে দিয়েছে। গাড়িতে ঘুমাচ্ছে এখন।”
আরোয়ার ক্লাবে যাওয়ার ব্যাপারটা সাফওয়ান এখনই খোলাসা করল না আশার কাছে। তবে আরোয়ার কথায় বিষয়টা লুকিয়ে রাখবে, এমনও নয়। বরং একসময় করে ধীরে-সুস্থে জানাবে।
আশা দুই ধাপ এগিয়ে গাড়ির দরজা খুলে দিল। আরোয়ার মাথাটা সিটে বাঁ দিকে একটু বেঁকে আছে। আশা কয়েকবার কাঁধ ঝাকিয়ে ডাকল ওকে, কিন্তু আরোয়া চোখ খুলল না, ঘুমের মাঝেই কয়েকবার হু-হা করে উঠল শুধু। আশা কিছুক্ষণ এপাশ-ওপাশ তাকাল, ভাইয়াকে কোনোভাবেই ডাকা যাবে না এখন। অগত্যা সাফওয়ানকেই বলল, “সাফওয়ান, ওকে রুমে দিয়ে আসতে পারবি না?”
সাফওয়ান মাথা নেড়ে বলল,
“হুম। পারব।”
আশা সরে দাঁড়াল। সাফওয়ান এগিয়ে এসে সিট থেকে আরোয়াকে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে সোজা বাড়ির ভেতর হাঁটা দিল। গভীর ঘুমে তলিয়ে থাকা মেয়েটার নিথর শরীরটা তার বাহুর ওপর পড়ে আছে। মাথাটা লেগে আছে বুকের একপাশে।
আশা পিছে পিছে এসে বলল, “উপরে যাওয়ার দরকার নেই, আমার ঘরেই নিয়ে চল।”
সাফওয়ান আশার ঘরে নিয়ে বিছানার ওপর শুইয়ে দিল আরোয়াকে। তারপর পকেট থেকে ওর ফোনটা বের করে আশাকে দিয়ে ফিরে আসতে নিলে আশা দাঁড়াতে বলল তাকে। সে দ্রুত আলমারি থেকে হাসানের একটা ট্রাউজার আর শার্ট বের করে সাফওয়ানের দিকে বাড়িয়ে বলল,
“ভেজা প্যান্ট চেঞ্জ করে এগুলো পরে নে।”
”সমস্যা নেই আপু। বাসায় গিয়েই বদলে নেব।”
”আবার বেশি কথা? চেঞ্জ করে কোথায় যাবি যা।”
আশার গরম মেজাজ দেখে আর দ্বিমত করার সাহস পেল না সাফওয়ান। চুপচাপ বাধ্য ছেলের মতো কাপড়গুলো নিয়ে বাইরের ওয়াশরুমে চলে গেল।
আশা ঘাড় ঘুরিয়ে বিছানায় ঘুমিয়ে থাকা বোনের দিকে তাকিয়ে কটমট চোয়ালে বিড়বিড় করে উঠল,
”কত্ত বড় সাহস! রাত-বিরেতে মাতাল হয়ে বাড়িতে আসা! সকালটা হতে দে, তোর বারোটা যদি আমি না বাজিয়েছি?”
তখনি সাইড টেবিলের ওপর রাখা আরোয়ার ফোনটা সশব্দে বেজে উঠল। আশা এগিয়ে গিয়ে ফোনটা তুলে স্ক্রিনের দিকে তাকাল, নাম্বারটা বাংলাদেশের নয়। আশা অবাক ও একই সাথে কৌতূহলী হয়ে কলটা রিসিভ করে কানে ধরল। সাথে সাথেই অপর প্রান্ত থেকে একটি সুপরিচিত ও ব্যতিব্যস্ত কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “হ্যালো আরোয়া? তোমাকে অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে না কেন? জলদি নেটটা অন করো তো বোন!”
এপাশে আশা টোটালি স্তব্ধ।
”হ্যালো! শুনতে পাচ্ছ আরোয়া?”
সকালের স্নিগ্ধ রোদ জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরে এসে পড়েছে। আরোয়ার ভাঙা ভাঙা ঘুমের রেশ এখনো কাটেনি। চোখ মেলতেই অবাক হলো সে—এটা তো তার নিজের ঘর নয়! আরোয়া হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে উঠে বসল। মাথার ভেতরটা প্রচণ্ড ভারি হয়ে আছে, যেন কেউ হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে যাচ্ছে। কাল রাতের ঘটনাগুলো স্মৃতিতে ফিরে আসছে ঝাপসা ছায়ার মতো।
তখনি দরজার শব্দ হলো। হাতে ধোঁয়া ওঠা গরম কফির মগ নিয়ে ভেতরে ঢুকল আশা। তার মুখে রাগ নেই কোনো, বরং অসম্ভব মায়াবী একটা মিষ্টি হাসি।
”ঘুম ভেঙেছে?” আশা আলতো পায়ে জানালার পর্দাগুলো সরিয়ে দিল। ঘরের ভেতর এক ঝলক কড়া আলো আছড়ে পড়ল। কফির মগটা আরোয়ার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “নে, এটা খেয়ে নে। ভালো লাগবে।”
আরোয়া কাঁপাকাঁপা হাতে কফিটা নিল। আশার এই অস্বাভাবিক শান্ত ও মিষ্টি আচরণ তার ভেতরের ভয় আরো কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল যেন। গতকাল রাতে সে যা করেছে, তাতে এখন আশার রাগ আর চিৎকার শোনার কথা ছিল, কিন্তু তার বদলে এই শান্ত আচরণ তো মোটেও স্বাভাবিক নয়! কোনো বড় বিপদের আগের নীরবতা যেন এটাই। আরোয়া ভাবুক হয়ে কফির কাপটা ধরে বসে আছে, একটা চুমুক দেওয়ারও সাহস পাচ্ছে না।
আশা ভ্রু কুঁচকে হাসল, “কী হলো? খা। কফি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।”
আরোয়া ভয়ে ভয়ে কফিতে একটা চুমুক দিল। তিতকুটে কফিটুকু গলার ভেতর দিয়ে নামতেই ম্যাজম্যাজে শরীরটা যেন একটু সতেজ হয়ে এল। কফি শেষ হতেই আশা পাশ থেকে ফোনটা তুলে নিল। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে একটা নাম্বার বের করল সে, তারপর ফোনের স্ক্রিনটা আরোয়ার চোখের সামনে ধরে খুব নিচু অথচ ধারালো গলায় বলল, “এই নাম্বারটা কার?”
নাম্বারটা দেখামাত্রই আরোয়ার রক্ত যেন হিম হয়ে গেল। চোখ দুটো বড় বড় হয়ে উঠল, বুক ধড়ফড় করতে লাগল দ্রুত। সে একবার ফোনের স্ক্রিনের দিকে, আর একবার আশার নিথর শান্ত মুখের দিকে তাকাচ্ছে। কোনো কথা বেরোল না মুখ দিয়ে।
ঠিক সেই মুহূর্তেই কোনো সতর্কতা ছাড়াই আশার হাতের তালু সজোরে গিয়ে আছড়ে পড়ল আরোয়ার গালে। সপাং করে একটা শব্দ হলো সারা ঘরে। একপাশে ঘুরে গেল আরোয়ার মাথাটা, গালটা জ্বলে উঠল আগুনের মতো।
”আ… আপু?” চাপা একটা আর্তনাদ বেরোল আরোয়ার মুখ দিয়ে।
আশা তার দিকে এক পা এগিয়ে এল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “ওই মুখে আমাকে আপু ডাকবি না, তুই আমাদের বোন নোস।”
আরোয়া গালে হাত দিয়ে মাথা নুইয়ে নিঃশব্দে ফুপিয়ে উঠল।
ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে আশার উচ্চ কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো আবার—
“কোন বিবেকে তুই ওই মহিলার সাথে যোগাযোগ রাখিস? ওই নির্দয় নিকৃষ্ট মহিলাটার সাথে কিসের এত আন্তরিকতা তোর? সে আমাদের ভাইয়ের জীবন জাহান্নাম করে দিয়েছে, তুই সেই নরক যন্ত্রণা দেখিসনি?”
বলেই ধপ করে আরোয়ার পাশেই বসে গেল আশা। আরোয়া বোনের পায়ের কাছে বসে কোলে মাথা রেখে বলতে লাগল, “আপুনি আমি সরি। প্লিজ আপু ক্ষমা করো।”
তাচ্ছিল্য হাসল আশা,
”আমরা এত কষ্ট করে ডাইনিটার থেকে বীরকে আড়ালে রেখেছি, সেখানে আমাদের বাড়ি থেকেই প্রতিনিয়ত বীরের ছবি-ভিডিও হেঁটে হেঁটে তার কাছে চলে যাচ্ছে?”
”আপু বিশ্বাস করো, সে এমনভাবে কাকুতি-মিনতি করেছিল আমি ফেলতে পারিনি। একজন মা তার সন্তানকে এক নজর দেখার জন্য ছটফট করছিল, আমি… আমি কী করে… আমি ফিরিয়ে দিতে পারিনি আপু। কেবল এই নিয়েই আমাদের মাঝে মাঝে যোগাযোগ হয়। এর বেশি কিছু না, আমিও ঘৃণা করি ওই মহিলাকে।”
”মা? কিসের মা? যে মহিলা চার মাসের দুধের সন্তানকে ফেলে প্রেমিক কাজিনের হাত ধরে বিদেশ পাড়ি দিতে পারে, তাকে মা বললে এই পবিত্র শব্দটাকে অপমান করা হবে। একটা ডাইনির জন্য আমাদের সবকিছু এলোমেলো। আমাদের চার বছরের বাচ্চাটা আজ এত একাকিত্বে ভুগবে কেন, এত কষ্ট কেন তার এই ছোট্ট জীবনে? তার জন্মদাত্রী দুনিয়া থেকে মরে গেছে? আমার ভাই যখন রাত জেগে দুধের শিশুটার কান্না থামাতে বাড়ি জুড়ে ছুটে ছুটে নীরব অশ্রু বিসর্জন দিয়েছে, ওই স্বার্থপর নরাধম মহিলা তখন অন্য পুরুষের ফুলশয্যায় শুয়ে সুখের অশ্রুতে বালিশ ভিজিয়েছে। এমন একটা মা*গীর সাথে কথা বলতে তোর রুচিকে একটুও বাঁধে না আরোয়া? আমাদের বোন হলে, তুই ভাইয়ার বুকের ভেতরের রক্তক্ষরণটা ঠিকই বুঝতে পারতি!”
আশার প্রতিটি কথা ধারালো তীরের মতো আরোয়ার বুকে বিঁধতে লাগল। সেও তো চরম ঘৃণা করে ওই মহিলাকে, কিন্তু কী করবে? সন্তানের জন্য এক জন্মদাত্রীর আকুতি সহ্য করতে পারেনি। তার দিল নরম, এটা কি তার দোষ? আরোয়া বোনের পায়ের কাছে জড়সড় হয়ে বসে দুহাতে তার শাড়ির ঝুলে থাকা আঁচলটা খামচে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
”এত চিৎকার-চেঁচামেচি কিসের আশা?” বলতে বলতে দরজা ঠেলে ভুবনকে কোলে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল হাসান।
বিছানার দিকে এগিয়ে এসে আরোয়াকে এভাবে বসে কান্না করতে দেখে ভীষণ অবাক হলো সে। “আরোয়া! কী হয়েছে, কান্না করছ কেন বোন?”
আরোয়া নিরুত্তর। ফুঁপিয়েই চলেছে তরুণী।
হাসান স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে কড়া সুরে বলল, “আশা, কী বলেছ আমার বউকে? ও এভাবে তোমার পায়ে পড়ে কাঁদছে কেন?”
আশার চোখমুখ শক্ত। স্ত্রী, শালিকা—দুই বোনকেই মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকতে দেখে বিরক্ত হলো হাসান। “কী হয়েছে খুলে বললেই তো হয়।” সে ভুবনকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে নিজে আরোয়ার সামনে এসে বসল। ওর চোখের পানি মুছে দিয়ে আদুরে গলায় শুধাল,
“কী হয়েছে আরু বউ? না বললে ভাইয়া বুঝবে কীভাবে? আপু কেন বকা দিয়েছে? অযৌক্তিক কোনো কারণ হলে বলো, আমি তোমার আপুকে দেখে নিচ্ছি।”
আরোয়া দুই পাশে মাথা নাড়িয়ে ক্রন্দনরত সুরে বলল, “একটা অনেক বড় ভুল করেছি ভাইয়া।”
তৎক্ষণাৎ আশা মুখ খুলল, “একটা ভুল? একটা ভুল করেছিস তুই? কাল রাতে কোথায় গিয়েছিলিস আর কী করেছিস এখন তার কৈফিয়ত দিবি আমাকে।”
বীরকে হাত ধরে সিঁড়ি বেয়ে নামিয়ে নিয়ে আসছে বোরাক। বীরের ছোট ছোট উৎফুল্ল ধাপগুলো পাপার সাথে তাল মিলিয়ে মার্বেল সিঁড়িগুলো পার করে আসছে। ছোট্ট নাজুক শরীরে পরিহিত ব্লু কালারের রেশ বোর্ড সুইম সুট। ছোট্ট বীর যে এখন বাবার সাথে সুইমিংয়ের জন্য পুরাদস্তুর প্রস্তুত, তা তার ড্রেসআপ আর এটিটিউডেই প্রকাশিত।
সিঁড়ি পেরিয়ে ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই সোফার ওপর মধ্যবয়সী এক ভদ্রমহিলাকে চোখে পড়ল। পরনে স্কাই ব্লু রঙের একটি সুতির শাড়ি, অত্যন্ত পরিপাটি করে পরিহিত তা। চুলের মাঝে মেহেদির রঙিন আভা, কুঁচকানো ঠোঁটে হালকা লিপস্টিকের প্রলেপ—সব মিলিয়ে ভদ্রমহিলাকে বেশ অভিজাত্যের ধরক বলেই মনে হবে। কিঞ্চিৎ কুঁচকানো হাতে ধরা চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে।
বোরাক বীরকে নিয়ে এগিয়ে গিয়ে হাসিমুখে সালাম দিল, “আসসালামু আলাইকুম খালামনি।”
ভদ্রমহিলা মৃদু হেসে অত্যন্ত নমনীয় ও মায়াবী স্বরে উত্তর দিলেন, “ওয়ালাইকুম আস সালাম বোরাক বাবা। কেমন আছো?”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো খালামনি।”
ভদ্রমহিলা এবার বীরের দিকে হাত বাড়িয়ে ডাকলেন, “বীর দাদুভাই, এদিকে এসো সোনা।”
বীর বাবার হাত ছেড়ে দাদির দিকে এগিয়ে গেল। মিষ্টি স্বরে জিজ্ঞেস করল, “কালিমা দাদুন, তুমি কেমন আছো?”
ভদ্রমহিলা বীরের গাল ছুঁয়ে পরম স্নেহে বললেন, “ভালো আছি দাদুভাই। তুমি কেমন আছো বলো তো।”
”আমিও ভালো আছি।”
ভদ্রমহিলা বীরের আপাদমস্তক দেখে এক গাল হেসে বললেন, “বীর দাদু ভাই তো একেবারে সাঁতারু সেজেছে!”
বীর অমনি দুদিকে মাথা নেড়ে বলল, “না দাদুন! আমি তো সুইমাল সেজেছি। পাপাল সাথে সুইম কলব।”
বীরের বোকা বোকা কথায় সবাই হেসে দিল।
আশা বলল,
“বীর বাবা, সুইমার মানেই সাঁতারু। সুইমার ইংরেজি আর সাঁতারু বাংলা।”
ভদ্রমহিলা তাঁর ভেনিটি ব্যাগ থেকে ছোট একটা চকলেটের বক্স বের করে বীরের হাতে দিয়ে বললেন,
“হাসপাতালে ইদানীং খুব ব্যস্ত সময় যাচ্ছে। তোমাদের সঙ্গে কথা বলার বা দেখা করার মতো সময়টুকুও বের করতে পারছিলাম না, তাই ভাবলাম আজ সরাসরি চলেই আসি।”
বোরাক পাশের সোফায় বসতে বসতে বলল, “খুব ভালো করেছেন খালামনি। দেখা-সাক্ষাৎ না থাকলে সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়।”
”হুম, তা তো অবশ্যই। আচ্ছা, থেরাপিস্ট সেদিন বীরকে দেখে কী বলল?”
”তেমন কিছু না, বলেছেন বয়স বাড়ার সাথে আস্তে আস্তে উচ্চারণ ঠিক হয়ে যাবে। তবে ফিডার আর প্যাসিফায়ারের অভ্যাস যথাসম্ভব কমাতে বলেছে।”
ভদ্রমহিলা অবাক হলেন খানেক,
”বীরকে তুমি এখনও প্যাসিফায়ার দেও বোরাক?”
”সব সময় না। মাঝে মাঝে ঘুমানোর সময় দেওয়া হয়। প্যাসিফায়ার দিলে টানা ঘুমায়। কান্নাকাটি করে না।”
ভদ্রমহিলা চিন্তিত ভঙ্গিতে বললেন, “এই বয়সে প্যাসিফায়ার দেওয়া একেবারেই উচিত নয়, বোরাক। রাতেও দেবে না। প্যাসিফায়ারের কারণে বাচ্চাদের জিহ্বা সঞ্চালনে সমস্যা হয়।”
বোরাক শুধু মাথা নাড়ল। ভদ্রমহিলা বিষয়ের মোড় ঘুরিয়ে মৃদু হেসে বললেন, “যাইহোক, শুনলাম তুমি মুভ অন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছ? খুব ভালো সিদ্ধান্ত বাবা। বীরের জন্য এমন কি তোমার নিজের ভবিষ্যতের জন্যও এটা খুব জরুরি ছিল।”
বোরাক কোনো উত্তর দিল না, কেবল ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটল।
”তা আশা পাত্রী কী দেখেছিস, না-কি আমাকেই দায়িত্ব নিতে হবে?”
আশা হেসে বলল, “অবশ্যই তোমাকে নিতে হবে খালামনি। তোমার ছেলের বিয়ে, চাইলেই কি দায়িত্ব এড়াতে পারবে?”
”না! একদমই না।”
তাদের কথার মাঝেই আরোয়ার ঘর থেকে বেরিয়ে এল আরোয়া। এবং তার পিছু পিছু এল বেশ সুন্দরী এক যুবতী। যুবতী যে বেশ আধুনিক ও অত্যন্ত ফ্যাশন সচেতন তা যে কেউ এক পলকেই আন্দাজ করে নিতে সক্ষম হবে। পরনে তার মেরুন কালারের বডি-কন টপ আর স্কিনি জিন্স। পোশাকগুলো শরীরের সাথে ফিটিং হওয়ায় তার আকর্ষণীয় জিরো ফিগারের প্রতিটি ভাঁজ সুস্পষ্ট।
তবে সব চাইতে আকর্ষণীয় আর মনোমুগ্ধকর হলো, রমনীর দীর্ঘ কেশরাশি। কোমরের নিচ অব্দি লম্বা ঈষৎ লাল চুলগুলো ড্রয়িং রুমের নিয়ন আলোয় অদ্ভুত সুন্দর দ্যুতিতে চকচক করে উঠছে। তার এই অপূর্ব কেশরাশি আর রূপের ক্যারিশমায় বর্তমানে সে বিশ্বের নামিদামি ফ্যাশন ব্র্যান্ডের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে কাজ করছে ।
ডাইনিংয়ে পা রাখতেই সোফায় বোরাককে দেখে রমনীর পিয়ার্সিং করা ঠোঁটের কোণ প্রসারিত হয়ে উঠল। র্যাম্পিংয়ের সূক্ষ্ম ছন্দে হেঁটে এগিয়ে গিয়ে বোরাকের সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়ে ঝকঝকে গলায় বলল, “হাই বোরাক!”
বোরাকের এক হাতে বীরের চকলেটের বাক্স, আর অন্য হাতে ধরা চায়ের কাপ। বোরাক কী ইচ্ছা করেই মেয়েটার বাড়িয়ে রাখা হাতে হাত মেলাল না, নাকি পরিস্থিতির চাপে পারল না—তা বোঝা গেল না। সে কেবল মৃদু মাথা নেড়ে স্বাভাবিক গলায় উত্তর দিল, “হ্যালো!”
বোরাকের নির্লিপ্ততাতে মেয়েটি এতটুকুও বিচলিত হলো না। বরং হাত সরিয়ে একই ভাবে হাসিমুখে চকলেট খেতে থাকা বীরের গাল টেনে দিল, “উফ! চকলেট বেবিবয় উইথ আ বাস্কেট অফ চকলেট! হাউ সুইট!”
বীর পিটপিট করে চেয়ে আছে কাইরির দিকে। কাইরিকে সে ভালোভাবে চেনে না। কেবল জানে, আশা, আরোয়ার মতো এটাও তার ফুপুমনি হয়। অনেকদিন আগে একবার এসেছিল তাদের বাড়ি, তখনই তাকে এই পরিচিতি দেওয়া হয়েছে।
আশা বলল, “কাইরি তুমি তো কিছুই খেলে না। অন্তত এক কাপ চা তো নেও!”
পাশ থেকে কারিমা টিপ্পনী কেটে বলে উঠলেন, “হাহ্! কাকে চা খেতে বলছিস তুই মা? আমাদের কাইরি মেডাম চা পান করেন না, তিনি গ্রিন টি নেন। আমাদের চা খেলে তার ফিগার নষ্ট হয়ে যাবে।”
”মম!”
আরোয়া বলল, “আপুই ঠিকই আছে খালামনি। আমরা তো তিন বেলা চা আর চিনি খেয়ে খেয়ে দিন দিন ভুটকি হচ্ছি। আর আপুকে দেখো, মাশাল্লাহ, কী ফিগার! এমনি এমনি তো আর হয়নি।”
কাইরির ঠোঁটে সগর্বিত হাসি। আড়চোখে একবার বোরাকের দিকে তাকাল সে। বোরাক মন দিয়ে পাশে বসা ছেলের চকলেট খাওয়া দেখছে, তার মাঝে কোনো প্রতিক্রিয়া লক্ষণীয় নয়। এই পর্যায়ে সে বীরের হাত ধরে দাঁড়িয়ে গিয়ে কারিমার দিকে তাকিয়ে বলল, “খালামনি আপনি বসেন। আমরা একটু আসছি।”
বাবার দেখাদেখি বীরও বলল,
“দাদুন তোমাল সাথে পলে গল্প করব। এখন সুইম কলব।”
”আচ্ছা দাদুভাই তুমি যাও। পাপার সাথে সাঁতার কাটো। আমি আছি এখানে।”
বীরকে নিয়ে বোরাক চলে যেতেই আশা কাইরির দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল, “তা কাইরি, এবার কতদিন আছ? নাকি এবারো ফেরার টিকিট কেটেই আসছ?”
কাইরিও হাসিমুখে উত্তর করল, “না আপু, এবার হয়তো কিছুদিন থাকা হবে। ড্যাড তো এরকমই বলল।”
”তুমি তো এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি রাজশাহীতেই চলে এসেছ। তোমার ড্যাডের বাড়িতে যাবে না?”
”হয়তো বা না। সবটুকু সময় মমের সাথেই কাটাতে চাই।”
শিকদার ম্যানশনের পেছনের দিকটায় কার্টেন ওয়ালের গা ঘেঁষে বিশাল আকারের এক বিলাসবহুল সুইমিং পুল। শীতের দুপুরের মিষ্টি রোদ সরাসরি এসে পড়েছে পুলের লাউঞ্জ এরিয়া আর পাশের চেঞ্জিং রুমের ওপর। পুলের একপাশে গেঁথে ওঠা দেয়ালের কৃত্রিম ঝরনা থেকে পানি এসে পড়ছে পুলে। ওয়াটার কন্ডিশনিং সিস্টেম থাকায় পানি একেবারে হাড়কাঁপানো ঠান্ডা নয়, বরং ত্বকে আরামদায়ক মাত্রায় উষ্ণ। এছাড়াও পুলের ধারে নানা রকম গাছের টবগুলো পরিবেশের সৌন্দর্য দ্বিগুণ করেছে।
লাউঞ্জ এরিয়ায় এসেই বোরাক তার পরনের হাফহাতা শার্টটা খুলে পাশের ক্যাবারের ওপর ছুড়ে দিল। উন্মুক্ত হয়ে উঠল তার সুঠাম, পেটানো উজ্জ্বল শরীর, চাড়া দিয়ে উঠল বুকের লোভনীয় কালো কুচকুচে লোমগুলো। তার লম্বা দেহে পরনে এখন কেবল কালো ট্রাউজার। নড়াচড়ার সময় শর্টটি কোমরের একটু নিচে নেমে আসায় ভেতরের সিল্ককাট ব্র্যান্ডের কালো আন্ডারওয়্যারের ধারের অংশটুকু কিছুটা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। বোরাক দুই হাতে মাথার চুলগুলো একবার ব্যাকব্রাশ করে পেছনে ঠেলে দিল। তারপর হ্যাঙ্গার থেকে দুটো সুইমিং রিং নিয়ে সেগুলোর ওপর হালকা চাপ দিয়ে ছুঁড়ে দিল পুলে। পানিতে রিং দুটো টলমল করতে করতে ভেসে উঠল।
বীর পাশেই দাঁড়িয়ে বাবার কাজকর্ম দেখছে। বোরাক এবার ঝুঁকে ছেলের কপালে একটা চুমু এঁকে দিল, “চলো বাবা।”
ওকে আলতো করে তুলে ধরে পানিতে রিংয়ের ভেতর বসিয়ে দিল। এবার রিংয়ের সাথে সাথে বীরের ছোট্ট শরীরটাও ভাসতে লাগল। বীর তো মহা খুশি, হাত-পা ছড়িয়ে পানিতে দাপাদাপি শুরু করে দিয়েছে সে।
এবার বোরাক পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। টলটলে পানির তলদেশ চিরে এক টানে সাঁতরে পুলের এমাথা থেকে অন্য মাথায় গিয়ে ভেসে উঠল সে। তারপর আবার সাঁতরে বীরের কাছে চলে এল।
ডাইনিং স্পেসের ফ্রেঞ্চ উইনডো দিয়ে সুইমিং পুলের বড় একটা অংশ ভালোভাবে দেখা যায়। আশা ও কারিমা নিজেদের মতো গল্পে মশগুল, আরোয়া তার ঘরে। কাইরি সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। মাপা পায়ে হেঁটে সেই জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল সে, দৃষ্টি বাইরের সুইমিং পুলের দিকে।
কাঁচের এপাশ থেকে পুলের স্বচ্ছ নীল পানিতে বোরাককে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ছেলে আর পানি নিয়ে মত্ত বোরাক। তার পৌরুষদীপ্ত, ভেজা শরীর রোদের আলোয় চকচক করছে। পেশিবহুল বাহু আর চওড়া বুকের ওপর পানির ফোঁটাগুলো নিখুঁত শিল্পের মতো ছড়িয়ে আছে।
কাইরির কাছে এই পুরুষ কেবলই একজন সাধারণ পুরুষ নয়; সে গোটা তিনেক বছর ধরে লালিত এক অতৃপ্ত তৃষ্ণা, তার স্বপ্ন-পুরুষ। বিশ্বের কত বলিষ্ঠ-সুদর্শন পুরুষ তার সান্নিধ্যে এসেছে, রূপের প্রশংসা করেছে, শারীরিক তৃপ্তির চেষ্টা করেছে—তাতে কাইরির শরীর সাড়া দিলেও মন তৃপ্ততার নাগাল পায় নি। সেই আদিম পৌরুষের আগুন কোথাও যেন অনুপস্থিত ছিল। কোনো শরীরই তাকে পুরোপুরি তৃপ্ত করতে সক্ষম হয়নি। কারণ তার মনের বাসনায় কেবল একটি দেহেরই অবয়ব—কাঁচের ওপারের ওই উজ্জ্বল সুঠাম দেহ।
আজ থেকে তিন বছর আগের সেই ঝুম বৃষ্টির দুপুরটা কাইরির মনে আজও অমলিন। সেই বছর বাংলাদেশে এসে মায়ের জোরাজুরিতে সে প্রথমবারের মতো এই বাড়িতে পা রেখেছিল। বিলাসবহুল বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখার সময় তিন তলার জিমনেসিয়ামের দরজায় এসে দাঁড়াল সে। দরজাটা সামান্য ভেজানো, ভেতর থেকে ভেসে আসছিল ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ আর লোহা ঘর্ষণের মৃদু আওয়াজ।
কৌতূহলবশত দরজার ফাঁকটা আরেকটু প্রসারিত করে ভেতরে তাকাতেই তার পা দুটো সেখানেই আটকে গেল।
দরজার বিপরীতে মাথা রেখে মেঝের মাঝখানে পুশ-আপ দিচ্ছে বোরাক। পরনে শুধু কালো রঙের একটা ট্রাউজার, ঊর্ধ্বাঙ্গ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। জিমনেসিয়ামের ফকফকে আলোয় বোরাকের সুঠাম, চওড়া পিঠের ওপর ঘামের বিন্দুগুলো মুক্তোর মতো চিকচিক করে উঠছে। একেকটা পুশ-আপের সাথে তার পিঠের পেশিগুলো সংকুচিত হয়ে আবার ছিটকে ছড়িয়ে পড়ছে—যেন কোনো শিকারি বাঘের পেশিবহুল শরীরের নিখুঁত প্রদর্শনী।
কাইরি গুনতে শুরু করল। ৫০…৬০…৭০…। না, আর সম্ভব হলো না। সে পাশের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বুক হাত দিয়ে হাঁপাতে লাগল। একজন বাঙালি পুরুষের শরীরে এমন আদিম পৌরুষ আর এতটা শারীরিক সক্ষমতা যে থাকতে পারে, তা এতকাল তার বিশ্বাসেই যেন ছিল না।
ইশ! তার পরিচিত ওই উন্মুক্ত পিঠ, ভেজা চুল, চোয়ালের দৃঢ় রেখা, পানিতে পারদর্শী পৌরুষদীপ্ত দেহ। তৃষ্ণার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে রমনীর গলার সুভ্রূ ত্বকে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠল, কপালের কার্নিশ বেয়ে গড়াতে শুরু করল ঘামের চিকন সূক্ষ্ম ধারা। পিয়ার্সিং করা ঠোঁটজোড়াও যেন শুকিয়ে কাঠ হয়ে এল, উত্তেজনা দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁটটা জোরে কামড়ে ধরল রমনী। চোখ দিয়ে যেন সে বোরাককে গ্রাস করে ফেলতে চাইছে। মনের ভেতর কল্পনার অশ্বমেধ ঘোড়া ছুটতে শুরু করল, যা লোকলজ্জার সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূর। হৃদয়কুঠুরীতে থেকে ধ্বনিত হলো,
মৌটুসী পর্ব ২০
“তুমি সেই পুরুষ, যার আকাঙ্ক্ষা আমাকে বহু পুরুষদের সান্নিধ্যে ঠেলে দিয়েছে। এবং তুমিই সেই পুরুষ, যার সান্নিধ্য এই আমিটাকেই একনিষ্ঠ প্রণয়িনী প্রমাণ করতে সক্ষম। আমি তোমার সেই একনিষ্ঠ প্রণয়িনী হতে চাই, হ্যান্ডসাম। প্লিজ, বি মাইন!”
