Home মৌটুসী মৌটুসী পর্ব ৩২

মৌটুসী পর্ব ৩২

মৌটুসী পর্ব ৩২
ঋতস্বিনী মাহবিশ

শীতের বিদায় ঘণ্টা বেজে গেছে বেশ ক’দিন হলো। কুয়াশার সাদা চাদর গুটিয়ে প্রকৃতি এবার বসন্তের পাতলা সবুজ ওড়না জড়িয়ে নিয়েছে। গাছের ডালে ডালে কচি পাতার উল্লাস, কৃষ্ণচূড়ার ডগায় লাল আগুনের আভাস, বাতাসে অচেনা ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ।
​এমনই ফুরফুরে বসন্তে, অজান্তেই আরও দুটি সপ্তাহ গড়িয়ে গেল।
​রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে লালবানু বেগমের রাতের বাসী থালা-বাসন পরিষ্কার করার টুংটাং আওয়াজ। জানালার ধারের বটগাছটার ডালে বসা চড়ুই পাখির কিচিরমিচির।
​চড়ুই তখনও বিছানায় পাতলা চাদর মুড়ে ঘুমে মগ্ন। এদিকে মৌটুসী আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রেডি হচ্ছে। আজকে তার তনী দেহের পরনে ছাইরঙা স্কার্ট আর সাদা শার্ট, শার্টের ওপর একটা সুন্দর হাতা কাটা গোল ফতুয়া। এতে আলাদা করে ওড়না নেওয়ার প্রয়োজন নেই। মাথার চুলগুলো ছেড়ে রাখা, তবে সে সুতোর বুননো একটা রুমাল দিয়ে সুন্দর করে গুছিয়ে নিল সেগুলোকে।

​এই কাকডাকা ভোরে এত গোছগাছ পরিপাটি হওয়ার কারণও আছে বটে। অফিস থেকে তারা নাটোরের প্রজেক্ট পরিদর্শন করতে সেখানে যাচ্ছে। শহরের বাইরে অপরিচিত একটা জায়গায় যাচ্ছে, তাও এত বড় একটা কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে, একটু পরিপাটি না হলে হয়?
​মৌ সবশেষে ঠোঁটে হালকা করে গ্লসি জেলি মেখে টিউবটা ড্রেসিং টেবিলের ওপর রেখে মেয়ের দিকে ফিরে দাঁড়াল। চড়ুই তখনও চোখ বুজে। মৌ ভাবছে, মেয়েকে ডাকবে কি ডাকবে না!
​তখনই রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে শাড়ির আঁচলে কপালের ভেজা হাত মুছতে ঘরে এলেন লালবানু বেগম। মেয়ের উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করলেন,

— “মৌ, তুই আইবি কহন?”
​ব্যাগ গোছাতে গোছাতে মৌটুসী উত্তর করল,
— “ঠিক নেই, আম্মা। কাজ শেষ হলেই রওনা দেব। তবে ফিরব কখন, সেটা তো বলতে পারছি না।”
​— “তুই একাই যাইবি?”
​— “না। একটা টিম, এই প্রায় ছয়-সাতজনের মতো!”
​লালবানু বেগম আবার জিজ্ঞেস করলেন,
— “ওই যে ছেরাটা… বীরের আব্বা, হেও যাইব?”
— “হ্যাঁ। উনিই তো কোম্পানির চেয়ারম্যান। উনি না গেলে হবে?”
​”মাম্মা, তুমি কোথায় যাচ্ছ?” ঘুমজড়ানো ছোট্ট কণ্ঠে প্রশ্নটা ভেসে এল।
​মৌটুসী চট করে বিছানার দিকে তাকাল। পিটপিট চোখে চেয়ে তার দিকেই আছে চড়ুই। মৌ হাসিমুখে এগিয়ে গিয়ে মেয়েকে কাছে টেনে নিয়ে কপালে চুমু খেল।
— “মাম্মা কাজ করতে যাচ্ছি, কিউটিপাই। আজকে নানিমনি তোমাকে স্কুলের জন্য রেডি করিয়ে দেবে। আর সাফওয়ান চাচ্চু নিতে আসবে। তুমি কিন্তু সারাদিন নানিমনির সঙ্গে একদম গুড গার্ল হয়ে থাকবে, কেমন?”
​চড়ুই আবার প্রশ্ন ছুড়ল,

— “পাপাও যাবে তোমার সাথে কাজে?”
​— “হ্যাঁ সোনা, যাবে।”
​— “আর বীর বন্ধু?”
​মৌটুসী হেসে মাথা নাড়ল।
— “না, মা। আমরা তো ঘুরতে যাচ্ছি না, কাজে যাচ্ছি। ঘুরতে গেলে তোমাদের রেখে যেতাম, বলো? বীর বন্ধু আর তুমি সাফওয়ান চাচ্চুর সাথে স্কুলে যাবে।”
​চড়ুই একটু ভেবে নিয়ে গম্ভীর মুখে বলল,
— “আচ্ছা… তাহলে যেখানে যাচ্ছ, সেখান থেকে চড়ুই পাখির জন্য অনেকগুলো মজা আর গিফট নিয়ে আসবে।”
মৌটুসী মেয়ের সারা মুখে চুমু একে আদুরী গলায় বলল,
​”তা আর বলতে? মাম্মা তার চড়ুই পাখির জন্য সুন্দর সুন্দর গিফট আনবে না তো কার জন্য আনবে?

​মৌটুসী দেরি করল না, চড়ুইকে বিদায় দিয়ে সোজা অফিসের পথে রওনা দিল। হলরুমে পা রাখতেই মৌটুসীর দৃষ্টি গিয়ে থামল মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার ওপর।
বাঁ হাতের ওপর হাতে মোটা একটি ফাইল, তার ওপর কয়েকটি প্রিন্টেড কাগজ। যুবকের কপালের চামড়া সামান্য কুঁচকানো, ডান ভ্রুর ওপরের আঁচিলটাও গুটিয়ে উঠেছে। বাদামী তীক্ষ্ণ চোখ দুটি কাগজের প্রতিটি লাইনে নিবিষ্ট। মাঝে মাঝে পাতার কোণা উল্টে কিছু একটা মিলিয়ে নিচ্ছে। চারপাশে কী হচ্ছে, কে আসছে বা যাচ্ছে— সেদিকে যেন তার কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই। ডানে-বাঁয়ে তাকে ঘিরে রেখেছে কয়েকজন অফিস স্টাফ।
​পরনে মেরুন রঙের ফুলহাতা শার্ট, অফ-হোয়াইট ফরমাল প্যান্টের সাথে ইন করা। চুলগুলো পরিপাটি হয়ে কপালের দুই দিকে ঝুঁকে আছে। লোকটা আজকে ক্লিন শেভ করেছে। মৌটুসী সামান্য ভ্রু তুলল। এই নিয়ে তৃতীয়বারের মতো বোরাককে ক্লিন শেভে দেখল সে। বলা বাহুল্য, ক্লিন শেভ করলে তার লম্বাটে মুখটা অন্যরকম সুন্দর লাগে। চোয়ালের ধার আর থুতনির খাঁজটা স্পষ্ট হয়।
​অস্বীকার করার উপায় নেই। লোকটা ভীষণ সুদর্শন। মৌটুসী অজান্তেই হলরুমের দরজা থেকে এক পা সরে পাশের দেয়ালে হালকা হেলান দিয়ে দাঁড়াল। দুই হাত পেছনে গুটিয়ে নীরবে তাকিয়ে রইল সামনের দৃশ্যটার দিকে।
​মৌটুসীর এই ঘোর কাটল বোরাকের গম্ভীর কণ্ঠে।

​— “এই ফাইল কে রেডি করেছে?”
​হলরুমে মুহূর্তেই থমথমে নীরবতা নেমে এল।
​— “আমরা আর পাঁচ-দশ মিনিট পরই একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে রওনা দেব। আর তার ডকুমেন্টে এতগুলো ভুল! ডাটা আপডেট নেই, দুই জায়গায় হিসাব মিলছে না, এমনকি সাইট রিপোর্টের শেষ পাতাটাও সংযুক্ত করা হয়নি। এই ফাইল নিয়ে গিয়ে কী করব আমি? মকবুল সাহেব, কী দেখেছেন আপনি?”
​পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা ম্যানেজার মকবুল খানিকটা অপ্রস্তুত গলায় বললেন,
— “স্যার… এই ফাইল রেডির দায়িত্ব মিস নওরীনের ওপর ছিল। উনি আজকে সকালেই সাবমিট করেছেন আমার কাছে। তাই চেক করার সময় হয়নি।”
​”সকালে করেছে মানে? আজকে সকালে? আরও এক সপ্তাহ আগে আপনাদের এই ডিলের কথা বলা হয়েছে। এত দিন কী করলেন আপনারা?”
​বোরাক একবার মাথা তুলে নওরীনের দিকে তাকাল। মেয়েটা কাচুমাচু করে বলল,
— “স্যার, সরি। আসলে গত সপ্তাহে আমি দুদিন ছুটিতে ছিলাম। তাই একটু দেরি হয়ে গেছে। আর তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে ভুল…”
​বোরাক শব্দ করে ফাইলটা বন্ধ করে নওরীনের দিকে এগিয়ে দিল। কাটকাট গম্ভীর কণ্ঠে বলল—

— “আপনি এখনই সব ভুলগুলো ঠিক করবেন। প্রয়োজন হলে গাড়িতে বসেও করবেন। নাটোর পৌঁছানোর আগেই আমি সংশোধিত কপি হাতে চাই। এরপর থেকে কোনো ফাইল আমার টেবিলে আসার আগে অন্তত দুবার ক্রস-চেক করা হয়। আই হোপ, আই মেইড মাইসেলফ ক্লিয়ার?”
নওরীন ফাইলটা হাতে নিয়ে মাথা নিচু করে বলল,
— “জি, স্যার। আমি এখনই ঠিক করে নিচ্ছি।”
​ততক্ষণে মৌটুসীও সেখানে এসে দাঁড়িয়েছে। বোরাক তাকে লক্ষ না করেই হনহন পায়ে তার কেবিনে চলে গেল। মৌটুসী নওরিনের দিকে তাকাল। অপমানে মেয়েটার মুখ থমথমে হয়ে গেছে। মৌয়ের খারাপ লাগল। নিজে বকা সে যেমন সহ্য করতে পারে না, অন্যদের দিলে তাতেও তার খারাপ লাগে।
​তবে কয়েক দিন বোরাকের সাথে অফিস করে সে বেশ বুঝেছে, মানুষটা তাদের সাথে যতটা মুক্ত আচরণ করে, হাসি রসাত্মক সুরে কথা বলে সবসময়। অন্যদের কাছে সে ততটাই গম্ভীর ও একঘেয়ে একটা মানুষ। কাজের বাইরে বাড়তি কোনো কথা ফোটে না মুখ দিয়ে। এমন কী তার উপস্থিতিতে অফিস স্টাফরাও কেমন তটস্থ হয়ে থাকে। মৌটুসী এতে বিরক্ত, একটা মানুষ স্থানভেদে এমন আলাদা আলাদা আচরণ করবে কেন?

​সামনে অফিসের হাইএস মাইক্রোবাসে টিমের সদস্যরা যাচ্ছে। আর তাদের পেছন পেছন বোরাকের ব্ল্যাক হুন্ডাই স্বাভাবিক গতিতে এগিয়ে চলেছে।
​ড্রাইভিং সিটে বোরাক। পাশের সিটে বসে আছে মৌটুসী।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর মৌটুসী বলল,
— “আচ্ছা, এটা কেমন হলো?”
বোরাক রাস্তা থেকে চোখ না সরিয়েই জিজ্ঞেস করল,
— “কোনটা?”
— “সবাই মাইক্রোবাসে যাচ্ছে, আর আমি আপনার সঙ্গে আলাদা গাড়িতে। সবাই কী ভাববে?”
বোরাক নির্বিকার ভঙ্গিতে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে গাড়িটাকে আরেকটা গাড়ি ওভারটেক করাল তারপর শান্ত স্বরেই বলল,
— “তাদের ভাবনায় কী আসে-যায়?”
মৌটুসী ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল।
— “অনেক কিছু আসে-যায়। আমরা সবাই কোম্পানির স্টাফ, একই টিমের সদস্য। অথচ তারা গাদাগাদি করে মাইক্রোবাসে যাচ্ছে, আর আমি কোম্পানির চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত গাড়িতে বসে যাচ্ছি। বিষয়টা অকওয়ার্ড লাগছে না?”

​”না, লাগছে না। তুমি কোম্পানির চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত গাড়িতে বসে যাচ্ছ, কেননা তুমি তার একমাত্র আদরের ছেলের প্রাণপ্রিয় মাম্মা হও। তারা কেউ না। সিম্পল!”
​মৌটুসী বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো চট করে তার দিকে ফিরে তাকাল।
আল্লাহ! এত স্পর্শকাতর একটা কথা মানুষটা এত সহজভাবে বলে ফেলল কীভাবে? বুঝেশুনে বলেছে, নাকি কথার ছলে? গলার স্বাভাবিকতা দেখে তো বোঝবারও উপায় নেই।
​মৌটুসীর হতবাক চাউনি লক্ষ করে বোরাক ঠোঁট চেপে হাসল। চোখ তখনও রাস্তার ওপরই।
— “কী হলো এভাবে তাকিয়ে আছো কেন? ভুল কিছু বলেছি?”
​মৌটুসী অপ্রস্তুত বোধ করল। দ্রুত ঘাড় ঘুরিয়ে সামনে তাকাল। খানিক থেমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে মৌ বলল,

— “আচ্ছা, একটা কথা বলুন তো, আপনার এই সুন্দর হাসিখুশি মুখটা অফিস টাইমে কোথায় লুকিয়ে রাখেন? অফিসে দেখি সবসময় গোমড়ামুখো হয়ে থাকেন, সবার সাথে গম্ভীর মুখে কথা বলেন, আমার তো শুনলেই ভয় লাগে। একটু হেসে হেসে কথা বললেও তো পারেন, তাই না?”
​”কেন তাদের সাথে এত হেসে হেসে কথা বলতে হবে? তারা কি আমার ঘরের বউ লাগে?” সহসা জবাব যুবকের।
​মৌটুসী বিরতিতে চোখ উল্টে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,

— “অহ! আপনার সঙ্গে সিরিয়াস কোনো কথাই বলা যায় না। আপনি একটা অসহ্য!”
​”জুনিয়র সাবধান, হ্যাঁ! এসব অসহ্য, অসভ্য, অভদ্র ওয়ার্ডগুলো কিন্তু ভীষণ রিস্কি। লাইক… মেয়েদের প্রেমে পড়ার সিন্ড্রোম।” বাঁকা হেসে কথাটা বলেই মৌয়ের দিকে একঝলকা তাকিয়ে চোখ টিপ দিল বোরাক।
​মৌটুসী এবার সত্যিই বিরক্ত। লোকটার আসলেই অসহ্য রকমের অসহ্য। প্রতিটা কথারই এমন একটা করে উত্তর ঠাস করে বলে দেয়, যেটার পর আর কিছু বলার থাকে না।
​মৌ আর ফিরতি একটা শব্দও উচ্চারণ না করে ব্যাগ থেকে মোবাইল আর ইয়ারফোন বের করল। ইয়ারফোনটা কানে গুঁজে ফোনে গান চালিয়ে দিল।
ব্যস! এই লোকের সঙ্গে আপাতত আর কোনো কথা নয়।
মাথাটা সামান্য কাত করে জানালার কালো কাচের ওপারে চোখ রাখল মৌটুসী। গাড়িতে এসি চলছে বলে জানালার কাচটা নামানোর কথা বলতে পারল না।
​তবে কিছুক্ষণ যেতেই বোরাক নিজেই মৌয়ের পাশের কাচ নামিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে একঝলকা বসন্তের নরম বাতাস এসে ছুঁয়ে দিল রমণীর ঊর্ধ্বাংশ। মৌটুসীর খুশি হলো, অজানা ভালো লাগা ছুঁয়ে গেল তাকে। জানালার নিচের অংশে কনুই ঠেকিয়ে গালে হাত দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল সে।

​গাড়িটা ধীরে ধীরে শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে গ্রামবাংলার বুক চিরে এগিয়ে যেতে লাগল।
রাস্তার দুই পাশে যতদূর চোখ যায়, শুধু সবুজের বিস্তার। মাঝেমধ্যে তালগাছের সারি, ছোট ছোট খাল আর দূরে টিনের ছাউনি দেওয়া দু-একটা বাড়ি চোখে পড়ছে।
বাইরের এই অপরূপ সৌন্দর্য ধীরে ধীরে গ্রাস করে নিল মৌটুসীকে।
ইয়ারফোনে তখনও গান বাজছে।
অজান্তেই সেই গানের সুরে ঠোঁট মেলাল সে। খুব আস্তে… প্রায় ফিসফিস করে গুনগুন করছে।
গাড়ির ভেতরের নীরবতায় সেই ক্ষীণ সুরটুকুও গিয়ে পৌঁছাল বোরাকের কানে।
সে মুচকি হেসে গাড়ির গতি একটু কমিয়ে বলল,
— “আরে মৌটুসী পাখি, আরেকটু জোরে, শুনতে পাচ্ছি না।”
মৌটুসী চমকে তার দিকে তাকাল। অবাক হয়ে সুধাল,

— “কী বললেন?”
​”বললাম, আরেকটু জোরে গাও, তাহলে তো আমিও একটু ভালোভাবে শুনতে পাই!”
​এবার কাহিনী বুঝে একটু লজ্জা পেল মৌ। ইয়ারফোনটা খুলে গলায় ঝুলিয়ে রেখে অপ্রস্তুত হেসে বলল,
— “আমি গান গাইতে পারি না। ফোনে বাজছিল, তার সাথে সাথে আনমনেই ঠোঁট মিলিয়েছি হয়তো।”
​”মিথ্যা কথা বলা ভালো না মেয়ে, জানো না? তুমি যে গান দুর্দান্ত গাইতে পারো, তা আমি খুব ভালো করেই জানি।”
একটু থেকে বোরাক উৎসাহী কণ্ঠে আবার বলল,
“এই মৌটুসী পাখি, গাড়িটা সাইড করি? তোমার কণ্ঠে একটা গান শুনেই ফের রওনা দেব!”
মৌটুসী চোখ বড় বড় করে বলল,
— “না, একেবারেই না। অলরেডি আমরা অনেক পিছিয়ে গেছি। আরও দেরি করলে পৌঁছাতে লেট হয়ে যাবে।”
​আশাহত হয়ে পড়ল যুবক। “আচ্ছা, তাহলে কখন শোনাবি বলো?”
​— “একসময়। যখন কোনো কাজ থাকবে না, তাড়া থাকবে না।”
​ফাঁকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল বোরাক। “তবে এই অধম সেই সোনালী ক্ষণের অপেক্ষায় রইল।”

​সকালের ক্লাসগুলো শেষ হতেই পুরো স্কুলজুড়ে টিফিনের ঘণ্টা বেজে উঠল।
​হাতে স্টিলের বড় তিনতলা একটি টিফিন ক্যারিয়ার হাতে অফিস রুম থেকে বেরিয়ে এল নীতি কবির। মুখে হাসি। এ দৃশ্য স্কুলের অন্যান্য শিক্ষকদের কাছে নতুন কিছু নয়।
ইদানিং প্রায় দিনই টিফিন বক্স হাতে নার্সারির রুমের দিকে যেতে দেখা যায় তাকে। বোরাক শিকদারের ছেলের জন্য নানান রকম খাবার থাকে সেগুলোতে।
বিষয়টি স্কুলের শিক্ষক মহলে নীরব এক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বীরের মা নেই— এই সত্যটা ইতিমধ্যে স্কুলের প্রায় সবারই জানা। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে নীতির এই অতিরিক্ত যত্ন সবাই যে শুধু নিছক স্নেহ হিসেবে দেখছে, এমনও নয়। ওর কলিগরা এর পেছনে অন্য উদ্দেশ্যটা ঠিকই খুঁজে পাচ্ছে, নিয়মিত আলোচনাও হচ্ছে চার দেয়ালের মাঝে।
​নীতির এমন আচরণে বোরাকও বিরক্ত। এসব বাড়াবাড়ি অস্বস্তি লাগে তার কাছে। বীরের অ্যালার্জি প্রবলেমের মতো নানা অজুহাত দেখিয়ে নিষেধ করার পরও থামছে না মেয়েটা। বরং দিন দিন বাড়ছে সে। সেদিন তো বোরাকের জন্যও কতগুলো খাবার পাঠিয়ে দিল সাফওয়ানের হাতে!

​— “মিস মৌ, একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি? কদিন ধরেই করব করব ভাবছি!”
​মৌটুসী অনুমতি দিল।
— “জি, মি. হাসিব, বলুন। সমস্যা নেই।”
​হাসিব একটু ইতস্তত করে বলল,
— “বোরাক স্যারের সঙ্গে অফিসের বাইরে কী আপনার কোনো সম্পর্ক আছে? মানে… অন্য কোনো পরিচিতি? প্লিজ, খারাপভাবে নেবেন না আমার কথা।”
প্রশ্নটা শুনে মৌটুসী ততটাও বিস্মিত হলো না।
বরং এমন কিছু শোনার জন্য সে প্রস্তুতই ছিল। মৃদু হেসে বলল,
— “উমম… হ্যাঁ। আসলে আমার মেয়ে আর উনার ছেলে একই ক্লাসে পড়ে। ওদের সূত্র ধরেই পরিচয়। তারপর ধীরে ধীরে একটা ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।”
— “ওহ, আচ্ছা… আমার কথায় আবার কিছু মনে করেননি তো?”
— “না, না। কিছু মনে করিনি।”
— “আমি কিন্তু একেবারেই সরল মনে জিজ্ঞেস করেছি। পৃথিবীটা খুব ছোট, বলুন? কার সঙ্গে কোথায়, কীভাবে পরিচয় হয়ে যায়, সেটা তো আর আগে থেকে বলা যায় না।”
মৌটুসী হালকা হাসল। “হুম, সেটাই।”
​না, সত্যিই লোকটার কথায় কটাক্ষ ছিল না।
এই মানুষটাকে সে গত কয়েক সপ্তাহে বেশ ভালোভাবেই চিনেছে। প্রথম প্রথম অতিরিক্ত মিশুক স্বভাব দেখে তাকে একটু ফ্লার্টি বলেই মনে হয়েছিল মৌটুসীর। কিন্তু সেই ধারণা বেশি দিন টেকেনি। তিনি আদতেই ভীষণ মিশুক স্বভাবের, কথাও বলেন স্বাভাবিকের থেকে একটু বেশি।

​নাটোরের প্রজেক্ট সাইটের কাজ শেষ হতে হতে বিকেল তিনটা বেজে গেল। সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে সবাই যেন একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। একটু এদিক-ওদিক হাঁটাহাটি করে গাড়িতে উঠে বসল তারা। অফিসের হাইএস মাইক্রোটা পুনরায় রওনা দিল রাজশাহীর উদ্দেশে।
​সবাইকে বিদায় দিয়ে মৌ আর বোরাকও তাদের গাড়িতে উঠে বসল। মৌটুসী আনমনে জানালার বাইরে তাকিয়ে পথ দেখছিল। কিন্তু মিনিট পাঁচেক যেতে না যেতেই তার ভ্রু কুঁচকে গেল। এটা তো রাজশাহীর রাস্তা নয়!
​সে একবার রাস্তার দিকে, আরেকবার বোরাকের দিকে তাকাল। কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করল,
— “মি. বোরাক, আমরা এদিকে কেন যাচ্ছি? এটা তো রাজশাহীর রাস্তা না।”
বোরাক কোনো উত্তর দিল না।
শুধু ঠোঁটের কোণে মিটিমিটি একটা হাসি ঝুলিয়ে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে আরেকটা কাঁচা রাস্তার দিকে গাড়ি তুলে দিল।
মৌটুসীর কপালের ভাঁজ আরও গভীর হলো।
​”দেখুন, আমি কিন্তু সিরিয়াসলি জিজ্ঞেস করছি। এদিকে কেন যাচ্ছি আমরা?”
​যুবকের চাপা হাসিটা এবারে ফিক করে মৃদু শব্দে বেরিয়ে এল। পুরুষালী বাদামী ঠোঁটজোড়া প্রসারিত রেখেই সে বলল,

“তোমাকে ছেলে ধরার কাছে বেচে দেব বুঝলে মৌটুসী পাখি? তাই কিডন্যাপ করে নিয়ে যাচ্ছি।”
​মৌটুসী কয়েক সেকেন্ড হা করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। কথাটা কিছুতেই বিশ্বাসযোগ্য না। মৌটুসী বিরক্ত হয়ে বলল,
​— “দেখুন, মজা করবেন না। কোথায় যাচ্ছি তা বলে দিলেই তো হয়ে যায়। না কি আমি জানতে পারি না?”
​— “আচ্ছা, শোনো তাহলে, এক বড় ভাইয়ের বাসায় যাচ্ছি আমরা।”
​— “এখন? কিন্তু… তাহলে ফিরব কখন?”
​— “এইজন্যই তোমাকে বলতে চাইনি। এত চিন্তা করো না। অফিস টাইম শেষ হওয়ার আগে তোমাকে পৌঁছে দিতে পারলেই হলো তো?”
​মৌটুসী আর কথা বাড়াল না। সিটে গা এলিয়ে ছোট করে বলল, “হুম।”
​গাড়ির দুলুনির সঙ্গে কখন যে মৌটুসীর চোখ লেগে এসেছিল, সে নিজেও টের পায়নি।
সারাদিনের দৌড়ঝাঁপে শরীরটা এমনিতেই ক্লান্ত ছিল।

— “মৌটুসী… এই মৌটুসী পাখি… ওঠো!”
পরিচিত কণ্ঠস্বরটা কানে আসতেই ধীরে ধীরে চোখ খুলল রমণী।
কয়েক সেকেন্ড দিশেহারা হয়ে চারপাশে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করল কোথায় আছে।
জানালার বাইরে তাকাতেই মাটির একটা বাড়ি চোখে পড়ল। গ্রামীণ এলাকা।
মৌটুসী, বোরাক দুজন দুই দিক থেকে দরজা খুলে নেমে দাঁড়াতেই চল্লিশোর্ধ্ব এক ভদ্রলোক হাসিমুখে এগিয়ে এলেন।
​বোরাকও সামনে গিয়ে তাঁর সঙ্গে হাত মেলাল।
​লোকটা গাল ভরে হেঁসে বললেন,
— “ভাইজান! এইবার কত্তদিন পর আইলেন!”
​বোরাকও মুচকি হেসে বলল,
— “নাটোরেই আসা হয় না ভাই। আর আসলে তো আপনার হাড়ি ছাড়া কখনো ফিরে যাই না।”
​লোকটা জোর করতে লাগলেন,
— “আয়েন ভাইজান, বাড়ির ভেতরে আয়েন। চা-পানি খাইয়া তারপর যাইবেন।”
​বোরাক হেসে মৌটুসীকে দেখিয়ে দিয়ে বলল,
— “আজ আর হবে না ভাই। সঙ্গে এই ম্যাডাম আছেন। তাঁকে সন্ধ্যার আগেই রাজশাহী পৌঁছে দিতে হবে। আরেকদিন সময় করে আসব। সেদিন দুপুরের ভাত আপনার এখানেই খাব, ইনশাআল্লাহ।”
​লোকটা মৌয়ের দিকে একবার তাকিয়ে আক্ষেপের সুরে বললেন,

— “তাইলে আর কী করার… কথা কিন্তু দিলেন।”
— “অবশ্যই দিলাম।”
তারপর লোকটা বাড়ির ভেতরের দিকে মুখ করে ডাক দিলেন,
— “ও শিউলি! হাড়িগুলা লইয়া আয় মা!”
কিছুক্ষণের মধ্যেই তেরো-চৌদ্দ বছরের একটি কিশোরী দুই হাতে দুটি বড় মাটির হাড়ি নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল।
এসেই লাজুক মুখে বলল,
— “আসসালামু আলাইকুম।”
​— “ওয়ালাইকুমুস সালাম।” হাসিমুখে উত্তর দিল বোরাক।
লোকটা হাড়িগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে বললেন,
— “ভাইজান, আপনি কালকেই কইছিলেন। তাই এক্কেবারে আলাদা কইরা বানাইছি। অন্য কারও হাতে দিই নাই।”
বোরাক মৃদু হেসে বলল,
— “জানি ভাই। তাই তো সবসময় আপনার কাছ থেকেই নিয়ে যাই।”
বোরাক দুই হাতে হাড়ি দুটো নিয়ে সাবধানে গাড়ির পেছনে রেখে আবার ফিরে এল।
শিউলির সামনে দাঁড়িয়ে স্নেহভরা কণ্ঠে বলল,

— “কেমন আছো, শিউলি মামনি?”
— “ভালা আছি চাচা।”
— “কোন ক্লাসে পড়ছ এবার?”
— “কেলাস এইট।”
— “মাশাআল্লাহ।”
বোরাক এবার ওয়ালেট থেকে কয়েকটা নোট বের করে শিউলির দিকে বাড়িয়ে দিল।
— “নাও মা, এটা রাখো।”
শিউলি সঙ্গে সঙ্গে দুই পা পিছিয়ে গেল।
লোকটাও তাড়াতাড়ি করে বললেন,
— “এইডা কী করেন ভাইজান! টেয়া দেওয়েন দরকার নাই। আপনার কাছ থেইকা কহনও টেকা নিই আমি?”
বোরাক একটু জোর করেই টাকাগুলো শিউলির হাতেই গুঁজে দিল।
— “আরে ভাই, আপনাকে দিচ্ছি না। আমি আমার ভাতিজিকে দিচ্ছি। এটা ওর সালামি। চাচার দেওয়া সালামি ফিরিয়ে দেওয়া কিন্তু ভালো না।”
লোকটা আর কিছু বলতে পারলেন না।
বোরাক এবার বাড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,

— “ভাবি আর ভাতিজার সাথে দেখা হলো না!”
— “পোলায় হের নানির বাড়ি গেছে, ভাইজান। লগে আপনার ভাবিও।”
— “ওহ, আচ্ছা। আজ তাহলে আসি, ভাই।”
— “আইচ্ছা, ভাইজান। আবার আইবেন, এবার তাড়াতাড়ি আইতে হইব।”
বোরাক হেসে বলল,
— “অবশ্যই, আল্লাহ চাইলে এর পরের বার পরিবার নিয়ে আসব।”
লোকটার মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল যেন। “তাইলে তো আরও ভালা হইব। আপনে আওনের আগে খালি আমারে একবার জানাই দিবেন।”
বোরাক বিদায় নিল।
​এতক্ষণ নীরবে সবকিছু দেখছিল মৌটুসী। ফিরে যাওয়ার আগে সেও মৃদু হেসে বিদায় জানাল,
— “আসি, ভাইজান। শিউলি, ভালো থেকো।”
​গাড়িতে উঠে বসল তারা। গাড়ি গড়াতে শুরু করল।
​মৌটুসী রিয়ার ভিউ মিররে একবার তাকিয়ে দেখল, মাটির বাড়িটা ধীরে ধীরে দৃষ্টির আড়ালে মিলিয়ে যাচ্ছে। কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকার পর সে জিজ্ঞেস করল,

— “আচ্ছা, হাড়িগুলোতে কী আছে?”
— “কাঁচাগোল্লা। খেয়েছ কখনো?”
​— “ওহ… নাটোরের কাঁচাগোল্লা! একবার খেয়েছিলাম। তবে নাটরে না, রাজশাহীতেই কিনেছিলাম।”
​— “তাহলে কাঁচাগোল্লার আসল স্বাদটাই পাওনি। আজকে পেতে চলেছ। এই গ্রামের বাসিন্দাদের প্রধান পেশা কাঁচাগোল্লা তৈরি করা। তারা নিজেরা গাভি পালে। সেই গরুর খাঁটি দুধ বাড়িতেই মিষ্টি তৈরি করে স্থানীয় বাজারসহ নাটোর মূল শহরের দোকানগুলোতে বিক্রি করে। আর নাটোরের বাইরে যে কাঁচাগোল্লাগুলো বিক্রি হয়, সেগুলো তৈরি হয় কারখানাতে। তাই তাতে একেবারে অথেন্টিক স্বাদটা পাওয়া যায় না।”
​মৌটুসী এবার কিছুটা আক্ষেপের সুরে বলল,
— “ওহ…. কিন্তু এটা আগে বললে কী হতো? জানলে তো আমিও কিনতাম!”
​— “সমস্যা নেই, আমি কিনেছি তো! সেখান থেকেই একটা নিও।”
​— “আমাকে একটা দিলে আপনার কম পড়ে যাবে না?”
​— “আরে বাবা, না। অনেক বড় হাড়ি না? প্রায় তিন-চার কেজি করে মিষ্টি থাকে একেকটা হাড়িতে। আমাদের বাড়িতে কজনই বা আছে?”
​কথা বলতে বলতেই তারা গ্রামটাকে পেছনে ফেলে অনেকটা দূরে চলে এল। এখন দুপাশেই শুধুই মাঠ।
​হঠাৎ বোরাক রাস্তার পাশে একটু খোলা জায়গা দেখে ধীরে ধীরে গাড়িটা সাইড করল।
মৌটুসী অবাক হয়ে তাকাল।

— “কী হলো?”
— “দুই মিনিট।”
এইটুকু বলেই বোরাক গাড়ি থেকে নেমে গেল।
গাড়ির পেছনের দিকি খুলে মাটির হাড়িগুলোর একটি নিয়ে সিটে ফিরে এল। গাড়ির স্টোরেজ বক্স খুলে সেখান থেকে একটা প্লাস্টিকের চামচ বের করে মৌটুসীর দিকে বাড়িয়ে দিল।
— “নাও, টেস্ট করে দেখো।”
মৌটুসী বিস্মিত চোখে চারপাশে তাকাল।
— “এখানে?”
​— “আরে, কিছু হবে না। আশেপাশে কেউ নেই। টেস্ট করে বলো তো, কেমন লাগে।”
মৌটুসী আর আপত্তি করল না।
হাড়ির মুখে বাঁধা কাগজটা ধীরে ধীরে খুলে ফেলল।
সঙ্গে সঙ্গে টাটকা ছানার মিষ্টি ঘ্রাণ ভেসে এল।
কাঁচাগোল্লা নাম হলেও, এগুলোর আকার মিষ্টির মতো গোল নয়। কোনো আকৃতিই নেই। একেবারে ঘিয়ে রঙের ছানা।
মৌটুসী আর লোভ সামলাতে পারল না। একপাশ থেকে এক চামচ তুলে মুখে দিল।
​পরের মুহূর্তেই স্বাদের আবেশে তার চোখ দুটো আপনাআপনিই বন্ধ হয়ে গেল। মুখে দিতেই যেন গলে মিলিয়ে গেল। চিবানোর প্রয়োজনই হলো না।
​কয়েক সেকেন্ড পর চোখ খুলে কিছুটা অবাক হয়ে বোরাকের দিকে তাকাল।

— “আসলেই… অনেক মজা!”
​বোরাক ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি টেনে বলল,
— “বলেছিলাম না, রাজশাহীতে যেটা খেয়েছিলে, সেটা শুধু কাঁচাগোল্লা ছিল। আর এটা নাটোরের আসল কাঁচাগোল্লা।”
​— “সত্যি! আমি এত সুস্বাদু মিষ্টি কোনো দিন খাইনি। একেবারে অন্যরকম স্বাদ। চিবোতেই হচ্ছে না।”
​মৌটুসী গপগপ করে বেশ কয়েক চামচ খেল। এরপর মনে হলো বোরাককে সাধানো হয়নি। একটু লজ্জিত হয়ে সে বলল, “অহ… দেখুন না! আমি একাই খেয়ে যাচ্ছি, আপনাকে তো একবারও অফার করলাম না!”
বোরাক হেসে মাথা নাড়ল।

— “সমস্যা নেই। তুমি খাও। আমি পরে খাচ্ছি। চামচ একটাই।”
​মৌটুসী আরও কয়েক চামচ খেয়ে ড্যাশবোর্ডের ওপর থেকে পানির বোতলটা হাতে নিল চামচটা পরিষ্কার করার উদ্দেশে। কিন্তু বোতলের ঢাকনা খোলার আগেই বোরাক হাড়িটা তুলে নিল, এরপর মৌয়ের এটো চামচটা দিয়েই নির্দ্বিধায় খেতে আরম্ভ করে দিল সে।
​এটা দেখে মৌটুসী মনে মনে খুব অবাক হলো, সাথে কেমন যেন অচেনা এক অনুভূতি বুকের ভেতর নরম করে ছুঁয়ে গেল তার। তবে সে কিছুই বলল না।
​চুপচাপ পানির বোতল থেকে কয়েক ঢোক পানি খেয়ে জানালার বাইরে মুখ ফিরিয়ে নিল।
চারপাশে যতদূর চোখ যায়, শুধু ফাঁকা মাঠ। মাঠের মাঝখানে লম্বা হয়ে চলে গেছে মাটির কাঁচা রাস্তাটি। যার ওপর তাদের গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে।
​বসন্ত বিকেলের এই নরম রোদে রাস্তার ধারের সবুজ ধানের ক্ষেতগুলো যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। কোথাও কোথাও সরিষার হলুদ ফুলের শেষ আভা, আবার দূরে সারি সারি তালগাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। খোলা আকাশ। রাস্তার দুই পাশে বুনো গাছে নানা রঙের ফুল ফুটেছে।
​চারপাশে এমন নির্জনতা যে মাঝেমধ্যে শুধু পাখির ডাক আর বাতাসের শব্দই শোনা যাচ্ছে।
​আসার সময় এই সৌন্দর্যের কিছুই দেখা হয়নি মৌটুসীর। তখন সে ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল।
এখন যেন প্রকৃতি নিজেই দুহাত বাড়িয়ে তাকে ডাকছে। মৌটুসী ঘাড় ঘুরিয়ে বোরাকের দিকে তাকাল। চোখে শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস।

— “আমি… একটু নামি এখানে?”
​— “হুম, অবশ্যই। জিজ্ঞেস করার কী আছে?”
​মৌটুসী আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। দরজা খুলে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। পা রাখল মাটির রাস্তায়। ধুলোর স্তরে জুতোজোড়া একটু দেবে গেল তার। তখনই দূর থেকে এক ঝলকা বসন্তের বাতাস ছুটে এল।
​বাতাসের সঙ্গে ভেসে এল কাঁচা ধান, মাটির সোঁদা গন্ধ আর নাম না জানা বুনো ফুলের মিষ্টি সুবাস। মৌটুসী গভীর করে একটা নিঃশ্বাস নিল। তারপর চোখ বন্ধ করে কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মনে হলো, বহুদিন পর সে বুক ভরে শ্বাস নিচ্ছে। ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক টুকরো নির্মল হাসি ফুটে উঠল।
​কিছুক্ষণ পর গাড়ির অপর পাশের দরজাটাও খুলে বোরাকও নেমে এল। দরজা বন্ধ করে সেখানেই দাঁড়িয়ে পড়ল।
কিছু বলল না। শুধু ঘাড় ঘুরিয়ে মৌয়ের মুখের দিকে একবার তাকাল। চোখে-মুখে তৃপ্তি ফুটে উঠেছে রমণীর। বোরাক তা দেখে নিয়ে আবার দৃষ্টি ফেরাল দিগন্তজোড়া সবুজের দিকে। এই সুন্দর মুহূর্তটাকে শব্দে ভাঙতে তারও ইচ্ছে করল না।
​মৌটুসী মুখ তুলে আবারও একবার গভীর করে শ্বাস টেনে নিল। এক ঝলক বাতাস এসে আবারও তার চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে গেল।
সে চোখ বন্ধ করেই মুগ্ধ কণ্ঠে বলল,

— “দেখুন… বাতাসটা কত শীতল! গায়ে লাগছে তো একদম অন্যরকম লাগছে, তাই না?”
বোরাক হালকা হেসে চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে বলল,
— “হুম। কারণ একটু দূরেই একটা শাখা নদী বয়ে গেছে। সেখান থেকেই এই ঠান্ডা বাতাসটা আসছে।”
​মৌটুসী কিছুটা বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “তাই? আচ্ছা নদীটা কি এখান থেকে অনেক দূরে?”
​— “না, খুব বেশি না। তবে ক্ষেতের আল ধরে একটু হাঁটতে হবে। যেতে চাও তুমি?”
​মৌটুসীর চোখ দুটো মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল। উৎসাহী চোখে চেয়ে জিজ্ঞেস করল,
— “নিয়ে যাবেন?”
বোরাকের ঠোঁটে ধীর, প্রশান্ত এক হাসি ফুটে উঠল।

মৌটুসী পর্ব ৩১

— “কেন নয়?”
এরপর যুবক সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রমণীর দিকে ফিরে আমন্ত্রণ জানাল,
— “তবে চলো প্রকৃতির মেয়ে, যাওয়া যাক তোমার প্রকৃতিতে হারাতে!”

মৌটুসী পর্ব ৩৩