মৌটুসী পর্ব ৩৯
ঋতস্বিনী মাহবিশ
মিনিট বিশেকের মধ্যেই বোরাকের ব্ল্যাক হোন্ডা সিভিক জাদুঘরের মোড়ে এসে পৌঁছাল। মৌটুসী এই রাতে তাদের কলোনির ভেতর আসতে আগেই মানা করেছে। বলেছে, সে নিজেই চড়ুইকে নিয়ে মোড়ে এগিয়ে আসবে।
তাই আর ভেতরের দিকে গেল না বোরাক। গাড়িটা রাস্তার পাশে সাইড করে থামিয়ে বীরকে ভেতরেই বসিয়ে রেখে নিজে দরজা খুলে বেরিয়ে এল। রাত খুব একটা গভীর নয় বলে মোড়জুড়ে এখনো হালকা ব্যস্ততা রয়েছে। রিকশাগুলো টুংটাং বেল বাজিয়ে চলে যাচ্ছে, মাঝেমধ্যে মোটরসাইকেলের শব্দ ভেসে আসছে। রাস্তার পাশের চা-ফুচকার দোকানগুলো এখনো খোলা। রাতের আড্ডা অব্যাহত আছে সেগুলোতে।
বোরাক গাড়ির দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বাসায় পরা পোশাকেই বেরিয়ে এসেছে সে। পরনে কালো টি-শার্ট আর অ্যাশ ট্রাউজার। পায়ে সাধারণ একজোড়া স্লিপার। এই সাদামাটা বেশভূষাতেও যুবকের স্মার্টনেসের এতটুকুও কমতি লক্ষণীয় নয়। বলিষ্ঠ দুই হাত বুকের কাছে গুটিয়ে অপেক্ষমাণ দৃষ্টি মেলে সে তাকিয়ে রইল কলোনির ভেতরের রাস্তার দিকে।
কিছুক্ষণ পর ল্যাম্পপোস্টের হলদে আলোয় দুটি পরিচিত অবয়ব দেখা গেল। গাঢ় বেগুনি রঙের সাদামাটা একটি থ্রি-পিস পরে এগিয়ে আসছে মৌটুসী। ওড়নাটা সুন্দর করে গুছিয়ে মাথার ওপর তোলা। রাতের হালকা বাতাসে ওড়নার একপাশ সামান্য দুলছে। তার পাশেই ছোট্ট হাতটা মায়ের হাতে গুঁজে দিয়ে হাঁটছে চড়ুই। পরনে লাল টুকটুকে গোল ফ্রগ। চুলের চারখানা ঝুটি অবশ্য এখন দুখানা হয়েছে।
দূর থেকেই পাপাকে গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে স্বভাবতই চড়ুইয়ের পায়ের গতি বেড়ে গেল। বোরাকও ঠোঁটে প্রাণবন্ত হাসি টেনে সোজা হয়ে দাঁড়াল। ওরা কাছে আসতেই হাত বাড়িয়ে চট করে চড়ুইকে কোলে তুলে নিল। চড়ুই দুই হাতে বাবার গলা জড়িয়ে নিয়ে আহ্লাদে গদগদ হয়ে উঠল—
— পাপা! তোমাকে চড়ুই পাখি কত্তগুলো দিন দেখিনি!
বোরাক মেয়ের বুড়ির মতো কথা শুনে মুচকি হেসে কপালে চুমু এঁকে দিল। সেও তো মেয়েটাকে দু-তিন দিন ছুঁয়ে দেখতে পারেনি। সামনের কয়েকটা দিন কাজের প্রেসার হয়তো আরও বাড়বে। মাথার ওপরের প্রজেক্টটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই ব্যস্ততা কমবার নয়। তাই তো আজকের এই একটু সুন্দর সুযোগটা সে হাতছাড়া করতে চাইল না। তার ওপর তখন দুপুরে মৌটুসীর সাথে রুক্ষ ব্যবহারের পর থেকেই মনটা কেমন খচখচ করছিল। এই অশান্তি নিয়ে কয়েকটা দিন পার করা অসম্ভব।
চড়ুই ব্যস্ত চোখে চারপাশ দেখে নিয়ে বলল—
— আমার বীর বন্ধু কোথায়?
— এই যে মামনি, বীর বন্ধু গাড়িতে।
বলেই গাড়ির দরজা খুলে ধরল বোরাক। গাড়ির ভেতর ফ্রন্ট সিটে বাবু হয়ে বসে আছে বীর। একে অপরকে দেখেই উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়ল দুজনেই। বোরাক চড়ুইকেও বীরের পাশে বসিয়ে দিল। এরপর ফ্রন্ট সিটের দরজা আটকে দিতেই মৌটুসী দ্রুত বলে উঠল—
— আরে আরে, দরজা আটকাচ্ছেন কেন? বীরকে দিন, চলে যাই আমরা।
বোরাক কোনো জবাব দিল না। যেন কিছু শুনতেই পায়নি এমন ভান করে ঘুরে গিয়ে ব্যাকসিটের দরজাটা খুলে ধরল। তারপর একপাশে দাঁড়িয়ে অবিনব ভঙ্গিতে মৌটুসীকে ভেতরে বসার ইশারা করল। “বসুন ম্যাডাম।”
মৌটুসী ভ্রূ কুঁচকে তার দিকে তাকাল—
— বসব কেন? বাসায় যেতে হবে। রাত হচ্ছে।
— আমি জানি। উঠে বসো।
— না! কোথায় নিয়ে যেতে চাচ্ছেন তা আগে বলুন।
বোরাক একদম নির্লিপ্ত মুখে বলল—
— লেট নাইট ডেট, হয়েছে? এবার বসো।
মৌটুসীর চোখ গোল হয়ে গেল। তেড়েফুঁড়ে বোরাকের দিকে তাকিয়ে আরও একরোখা স্বরে বলল—
— না! আমি উঠব না।
বোরাক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিছুটা আশাহত হয়ে বলল—
— আরে বাবা, ভয়ের কিছু নেই। তোমাকে পাচার করে দিতে নিয়ে যাচ্ছি না। ওঠো। দশটা বাজার আগেই রেখে যাব। এক ঘণ্টারই ব্যাপার। ডিনার করিনি আমি, বাসায় রান্নাও হয়নি।
মৌটুসী এবার একবার নিজের পরনের পোশাকের দিকে তাকাল। এরপর বোরাকের দিকে তাকিয়ে চোখ মুখ কুঁচকে বিরক্তির স্বরে বলল—
— ভালো হচ্ছে না মি. বোরাক! দেখুন কী অবস্থায় আছি, এভাবে কোথাও যাওয়া যায়? আশেপাশের মানুষ এই ফকিন্নির হালে দেখলে কী ভাববে?
বোরাক এবার বুঝল, মৌয়ের আপত্তির আসল কারণটা কোথায়। সে ধীরেসুস্থে মৌটুসীর আপাদমস্তক একবার সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখে নিল। তারপর ঠোঁটের কোণে একটুকরো তীক্ষ্ণ হাসি টেনে মৌয়ের দিকে এক ধাপ এগিয়ে এসে দাঁড়াল। এরপর টানটান শিরদাঁড়া সামান্য কুঁজো করে উষ্ণ স্বরে বলল—
— ফার্স্টলি, ইউ আর লুকিং সিম্পল—বাট, অবিয়েসলি ভেরি সেরিন। সো, নিজেকে নিয়ে হেজিটেড ফিল করার কোনো কারণই নেই। আর সেকেন্ডলি, তোমার অস্বস্তি হয় এমন কাঁচা কাজ আমি বোরাক করব—এটা ভাবলে কীভাবে, মেয়ে?
বোরাকের এমন দৃঢ় আশ্বাসের বিপরীতে মৌটুসীর আর কিছু বলার রইল না। কয়েক মুহূর্ত বোরাকের চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে অবশেষে চোখমুখ কুঁচকেই গাড়িতে উঠে বসল সে।
বোরাকও বিজয়ের বাঁকা হেঁসে গাড়ির দরজা আটকে ওপাশ থেকে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বোরাক গাড়ি নিয়ে মালোপাড়ার একটা অভিজাত রেস্টুরেন্টের সামনে এসে থামল। মৌ গাড়ি থেকে নেমে কৌতূহলী হয়ে চারপাশে একবার তাকাল। রেস্টুরেন্টের নামটা চোখে পড়তেই ওর ভেতরের অস্বস্তিটা যেন তরতর করে বেড়ে গেল। এত বড় নামকরা একটা রেস্টুরেন্টে লোকটা তাদের এভাবে নিয়ে এল? প্ল্যান যখন করেছেই, তাকে আগে বললে কী হতো? একটু ভালোভাবে তৈরি হয়ে আসা যেত! নির্ঘাত রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষ তাদের ড্রেসআপ দেখে ফকিরের বংশধর ভেবে দরজা থেকেই তাড়িয়ে দেবে!
এদিকে ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে বোরাক একে একে বীর আর চড়ুইকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিল। তারপর মৌটুসীর দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল—
— চলো।
মৌটুসী কটমট চোখে তার দিকে তাকাল। বোরাক সেই দৃষ্টি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে বাচ্চা দুটোর হাত ধরে মৃদু হেসে বলল—
— হাত ফাঁকা নেই, মৌটুসী পাখি। ধরে নিয়ে যেতে পারব না। একটু কষ্ট করে পাশে পাশে হেঁটে আসো।
মৌটুসী ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। তারপর অনিচ্ছুক ভঙ্গিতেই বোরাকের পাশে এসে হাঁটতে শুরু করল।
ভেতরে ঢুকেই মৌটুসী আরেক দফা অবাক হলো। রেস্টুরেন্টের বিশাল হলঘরটা পুরো ফাঁকা। কয়েকজন নির্ধারিত সাদা পোশাক পরিহিত স্টাফ ব্যতিরেকে কোথাও কোনো কাকপক্ষী নেই। বোরাক সরাসরি মাঝামাঝি একটি টেবিলের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। পকেট থেকে ফোন আর ওয়ালেট বের করে টেবিলের ওপর রাখতে রাখতেই বলল—
— দেখো, কেউ নেই। তাও অস্বস্তি হবে?
মৌটুসী সন্দেহভরা চোখে চারপাশে একবার তাকাল—
— আর মানুষ নেই কেন?
তারপর চোখ দুটো সরু করে বোরাকের দিকে তাকিয়ে বলল—
— এখন আবার বলবেন না যে, পুরো রেস্টুরেন্ট আপনি একাই বুক করেছেন!
বোরাক কোনো উত্তর দিল না। শুধু ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি টেনে বীর আর চড়ুইকে পাশাপাশি দুটি চেয়ার বসিয়ে দিল।
তারপর নিজেও মৌটুসীর মুখোমুখি চেয়ারটাতে বসে মেনু কার্ডটা এগিয়ে দিয়ে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল—
— কী খাবে, সিলেক্ট করো।
তারপর বীর চড়ুইয়ের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল,
আচ্ছা, আমার বাবা দুইটা কী খাবে, বলো তো?
পুঁচকে দুইটা ভেবে ভেবে নিজেদের মতো ফরফর করে কয়েকটা খাবারের নাম বলে দিল। এদিকে মৌটুসী তখনও ঠাই বসা, মেনু কার্ডটা একইভাবে সামনে পড়ে আছে। বোরাক তা দেখে বিরক্ত হয়ে কার্ডটা নিজের দিকে টেনে নিয়ে বলল,”কোনো কাজের না তুমি।”
কথামতো রাত দশটা বাজার আগেই বোরাক ওদের জাদুঘরের মোড়ে পৌঁছে দিল। বীরকে নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে এল মৌটুসী। বোরাকও চড়ুইকে নিয়ে নেমে ছেলেকে নেওয়ার উদ্দেশে দুই হাত বাড়িয়ে দিল। কিন্তু বাবার দিকে তাকাতেই বীর ছোট্ট করে মাথা নাড়ল। তারপর মৌটুসীর গলা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
বোরাক খানিকটা অবাক হয়ে বলল—
— কী হলো বাবা, এসো?
বীর জবাব দিল না। বরং মুখটা মৌটুসীর কাঁধে গুঁজে দিল।
মৌটুসী মৃদু হেসে বীরের পিঠে হাত বুলিয়ে দিল—
— বীর তাহলে আজ আমাদের সঙ্গেই থাকুক।
সঙ্গে সঙ্গে চড়ুইও উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল—
— হ্যাঁ, পাপা! বীর বন্ধু আমাদের সঙ্গে থাকবে, তাহলে অনেক মজা হবে।
বোরাক একবার মেয়ের দিকে, তারপর ছেলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল—
— মাম্মার কাছে থাকবে, বাবা?
বীর সঙ্গে সঙ্গে ওপর-নিচ মাথা দোলাল। “মাম্মাল কাছেই থাকব।”
মৌটুসী মুচকি হেঁসে বীরকে আরও ভালো করে বুকে আগলে নিল।
অগত্যা বোরাক ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে কপালে চুমু এঁকে দিল। এরপর মৌটুসীর দিকে তাকিয়ে বলল—
— এগিয়ে দিতে হবে আমাকে?
— না না। এটুকু আমরা চলে যেতে পারব।
বোরাকও আর বাড়াবাড়ি করল না। এত রাতে তার ওদিকে যাওয়াটা ঠিকও হবে না। তাই বলল—
— আচ্ছা যাও। বাসায় ফিরেই আগে একটা কল দেবে আমাকে।
— ঠিক আছে। আসি, বাই।
– হুম, বাই।
চড়ুই আর বীরও পাপাকে টাটা দিয়ে বিদায় জানাল।
মৌটুসী মৃদু হেঁসে বাচ্চাদের নিয়ে ঘুরে গিয়ে হাঁটা দিল। ওরা বাসায় না পৌঁছানো পর্যন্ত বোরাক সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। মিনিট পাঁচেক পর মৌটুসীর ফোন পেয়ে সেও এবার গাড়িতে উঠে স্টার্ট দিয়ে প্রস্থান করল।
মায়ের কোমল বুকের উষ্ণতায় আরাম করে শুয়ে চুকচুক করে ফিডার খাচ্ছে বীর। মৌটুসী ওকে এক হাতে আগলে নিয়ে অন্য হাতে মুখে ফিডার ধরে রেখেছে। চড়ুইও মাম্মাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে বুকের একপাশে মাথা এলিয়ে দিয়ে রেখেছে। একপর্যায়ে টুপ করে বলে উঠল ও—
— মাম্মা, বীর বন্ধুকে ওই সুখরাজ্যের গল্পটা শোনাও!
চড়ুইয়ের মুখে গল্পের আবদার শুনে বীরও এবার উৎসাহে মুখ থেকে ফিডার সরিয়ে বলল—
— মাম্মা গল্প বলো, বীল গল্প শুনতে ভালোবাসে।
— তাই নাকি? বীর সোনা গল্প শুনতে ভালোবাসে?
— হুম। পাপা আল ফুফুমনি তো সুন্দল সুন্দল গল্প বলে।
— আচ্ছা, মাম্মাও গল্প বলছি।
— মাম্মা, সুখ রাজার গল্পটাই বলবে কিন্তু! ওটা সুন্দর।
— আচ্ছা, মা। ওটাই বলব।
মিষ্টি হেসে শুরু করল মৌ—
এক ছিল সুখরাজ্য। আর সেখানে ছিলেন সুখরাজা। রানি ও রাজপুত্রকে নিয়ে সুখরাজার ঘরে সুখের অভাব ছিল না। সেই সুখ দ্বিগুণ করতে এক সোনালী সন্ধ্যায় রাজার ঘরে আগমন করে দুটি ফুটফুটে রাজকন্যার। রাজকন্যাদের নাম রাখা হয়—শান্তিমতী ও রুদ্রিমতী।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজকন্যারা বড় হতে থাকে। শান্তিমতী হয়ে ওঠে তার নামের মতোই শান্ত, কোমল আর স্নিগ্ধ। আর রুদ্রিমতী—সে হয়ে ওঠে দুরন্ত, দুঃসাহসী আর ভীষণ চঞ্চল।
একজন ছিল টলটলে পানির বহমান শান্ত নদী, হরিণশিশুর মতো লাজুক, রূপে-গুণে পরিপূর্ণ বোকা-অবলা এক রাজকুমারী; আরেকজন আগুনের মতো দুরন্ত ও লেলিহান শিখা, চঞ্চলা হরিণ, বেপরোয়া পাখি। স্বভাবে দুই রাজকন্যা ছিল দুই মেরুর, তবু ভালোবাসায় ছিল এক প্রাণ। একে অপরকে ছাড়া যেন তাদের এক মুহূর্তও কাটত না। সারাক্ষণ হাত ধরাধরি করে রাজ্যের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়াত তারা, পাখির সুরে গান গাইত, প্রজাপতিদের সঙ্গে নাচ করত। তাদের স্পর্শে রাজ্যে বসন্ত নামত, ডালে ডালে ফুল ফুটত।
রাজপুত্রও তার দুই রাজকন্যা বোনকে বুকের ধন করে রাখত। তিন ভাইবোনের হাসিতে মুখর থাকত সুখরাজ্যের প্রতিটি সকাল, প্রতিটি সন্ধ্যা।
এভাবেই আনন্দে, ভালোবাসায় আর শান্তিতে কেটে যাচ্ছিল রাজার সুখের দিন। কিন্তু এক অমাবস্যার রাতে শনির কালো দৃষ্টি পড়ল সুখরাজ্যের ওপর। অশুভ ছায়া ধীরে ধীরে ঢেকে ফেলল প্রাসাদের আলো।
একদিন রাজপুত্র অজানা এক বন থেকে সঙ্গে করে নিয়ে এল এক ডাইনিকে। ডাইনি রাজা-রানির কোল থেকে তাদের রাজপুত্রকে কেড়ে নিল।
এরপর একসময় বোকা রাজকুমারী শান্তিমতী এক দুষ্টু রাজকুমারের প্রেমে পড়ে গেল। তাদের বিয়েও হলো! এবং শান্তিমতী তার রাজকুমারের সাথে অনেক দূরের এক রাজ্যে চলে গেল। এদিকে রুদ্রিমতী তো বোনকে ছাড়া একদম একলা হয়ে গেল! সে সবসময় মনমরা হয়ে থাকতে লাগল। তারপর অনেকদিন পর হঠাৎ একদিন রাজকুমারী শান্তিমতী সুখরাজার দুয়ারে ফিরে এল। আর তখন তার টাম্মিতে…
মৌটুসীর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে চড়ুই নিজেই পরবর্তী অংশটুকু বলতে লাগল—
— মাম্মা, এখন আমি বলি! তখন রাজকুমারীর টাম্মিতে একটা ছোট্ট বাবু ছিল, ছোটবেলায় যেভাবে আমি তোমার টাম্মিতে ছিলাম। তাই রাজকুমারীর টাম্মি অনেক মোটা হয়ে গিয়েছিল।
মৌটুসীর পেটে হাত দিয়ে দেখিয়ে দিল চড়ুই।
মৌটুসী মৃদু হেসে সায় দিল মেয়েকে—
— হুম, শান্তিমতীর টাম্মিতে একটা ছোট্ট সুখপাখি ছিল।
— মাম্মা, তাহলে বীর বন্ধু কার টাম্মিতে ছিল?
মৌটুসী থমকাল। চড়ুইয়ের এই প্রশ্নে বলার মতো কোনো উত্তর খুঁজে পেল না সে। কী উত্তর দেবে? তারও যে অজানা! নিজেকেও এই উত্তরের সরাসরি দাবিদার করবার অধিকার ও উপায় নেই। শূন্যে চেয়ে রইল সে।
মৌটুসীকে এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব থেকে বাঁচাতে বীর নিজেই এবার চট করে বলে উঠল—
— চুলুই পাখি, আমি তো পাপাল টাম্মিতে ছিলাম!
বীরের বোকা কথা শুনে ছোট্ট চড়ুই মিটমিট হেসে বলল—
— বাবু তো পাপার টাম্মিতে থাকে না, বীর বন্ধু। মাম্মার টাম্মিতে থাকে। আচ্ছা, আমি পাপাকে জিজ্ঞেস করব তুমি কার টাম্মি থেকে বের হয়েছ।
মেয়ের অতি পাকনা পাকনা কথায় ধমকে উঠল মৌ—
— চড়ুই পাখি, বেশি কথা বলছ তুমি! চুপ করে গল্প শোনো।
— আচ্ছা বলো, রাজকুমারীর টাম্মিতে বাবু ছিল, তারপর?
— তারপর রুদ্রিমতী শান্তিমতীকে ফিরে পেয়ে অনেক খুশি হয়ে গেল। তারা দুই বোন আবার একসাথে হেসেখেলে দিন পার করতে লাগল। তারা প্রতিদিন অপেক্ষা করত, কবে শান্তিমতীর টাম্মি থেকে ছোট্ট বাবুটি বেরিয়ে আসবে, আর তারা তাকে কোলে নিয়ে আদর করবে।
একদিন তাদের অপেক্ষা ফুরাল। এক আঁধার ঝড়ো রাতে শান্তিমতীর টাম্মি থেকে সত্যি সত্যিই ছোট্ট সুখপাখিটি বেরিয়ে এল। রুদ্রিমতীও এক আকাশ খুশিতে তাকে কোলে তুলে বুকে আগলে নিল…
ক্ষনিকের জন্য আনমনা হয়ে উঠল মৌ।
এদিকে মন দিয়ে গল্প শুনতে থাকা চড়ুই এই ব্যাঘাতে অধৈর্য হয়ে বলল—
— মাম্মা, থেমে গেলে কেন? তারপর কী হয়েছিল, বলো।
— তারপর? তারপর স্বার্থপর শান্তিমতী আবারও রুদ্রিমতীকে একা করে চলে গেল।
— কোথায় চলে গেল, মাম্মা?
সরল মুখেই প্রশ্ন করল বীর।
চড়ুই টুপ করে বলে উঠল—
— বীর বন্ধু, রাজকুমারী শান্তিমতী অনেক দূরে চলে গেছে। আল্লাহর কাছে। তাই না, মাম্মা?
— হুম, পাখি তার ধর্ম পালন করেছে, ফাঁকি দিয়ে উড়ে গেছে।
মৌটুসী পর্ব ৩৮
শূন্যে চেয়ে আলতো স্বরে অবলীলায় কথাটা বলে দিল মৌটুসী। তবে পৃথিবীর অগোচরে সেই মুহূর্তেই তার ডান চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল এক ফোঁটা উষ্ণ নোনাজল। নিঃশব্দে এসে মিশল তুলোর নরম বালিশে। কেউ তা দেখল না—শুধু মাথার নিচের বালিশটা তার একান্ত গোপন কিছু দীর্ঘশ্বাস সযত্নে নিজের বুকে লুকিয়ে রাখল।
