যাত্রাপথ পর্ব ৬৬
মাশফিত্রা মিমুই
অনেকদিন পর ঘরের বাইরে খোলা আকাশের নিচে এসে দাঁড়ালেন ফরিদা। সচরাচর প্রয়োজন ছাড়া বের হতে তাকে দেখা যায় না। পরনে সাদা, হলুদের মিশ্রণে সাধারণ এক সুতি শাড়ি। গহনা বা পুরোনো সৌন্দর্যের অস্তিত্ব এখন আর নেই। কড়ই গাছের ছায়ায় বসে প্রতিবেশী মহিলার সাথে পান চিবোতে চিবোতে গল্প করছে বিথী। সাজসজ্জা একেবারে সধবা ফরিদার মতো। আটপৌরে শাড়ির আঁচলে ঝুলছে সাংসারিক চাবির গোছা। সে কী নিজেকে আজকাল পরিবারের কর্ত্রী মনে করছে? আচানক রাগে ফরিদার দেহ কেঁপে উঠলো। মাথার ঘোমটা ফেলে শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে এগিয়ে গেলেন সেদিকে। শাশুড়িকে আসতে দেখে বিথী উঠে দাঁড়ালো। মুনিয়ার মা হেসে বললেন,“ওইতো চাচী, মেলা দিন আমনেরে দেহি না। ঘরে একলা একলা বইয়া থাকলে হইবো?”
ফরিদা তাঁর কথার জবাব দিলেন না। পূর্বের মতো ভালো মানুষি দেখিয়ে সরল হাসলেন না। এসেই টেনে ধরলেন পুত্রবধূর আঁচল। বিথী অবাক হলো,“হায় আল্লাহ! কী করতাছেন, আম্মা? মাথা গেছে? ছাড়েন কইতাছি।”
“মাগী, আমার সংসারের চাবি ধরার সাহস পাইলি কইত্তে? এই চাবি, এই সংসার সব আমার। তোর গায়ের শাড়িডাও আমার। খোল কইতাছি।”
চাবিটা একপ্রকার ছিনিয়ে নিয়ে শাড়ি ধরে টানতে লাগলেন ফরিদা। বিথী নিজেকে ছাড়ানোর প্রচেষ্টা চালিয়ে কর্কশ স্বরে বললো,“বুইড়া হইয়া যাওনের পরেও লোভ কমে নাই? আমনের কী জামাই আছে যে চাবি লইয়া ঘুরবেন? ছাড়েন কইতাছি।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“জামাই থাউক আর না থাউক, তুই কওনের কেডা? আমার আলমারিত হাত দেওনের সাহস পাইছোস কইত্তে? তোর বুঝি জামাই আছে? তোর জামাই তো তোরে মুইত্তাও মারে না। পোলা মাইয়া দুইডার লাইগা খালি এহনো থাকতে পারতাছোস। না হইলে কবেই পাছায় লাত্থি মাইরা বাহির কইরা দিতো।”
শরীর জ্বলে উঠলো বিথীর। রাগে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে সর্বশক্তি দিয়ে শাশুড়িকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিলো নিচে। সুযোগে নোংরা কিছু গালিও দিলো। ফরিদার হুঁশ ফিরলো। এতকাল তার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা না বলা পুত্রবধূর হঠাৎ এত সাহস দেখে অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। সামিউল দেখে ফেলল স্ত্রীর কান্ড। কিছু বলার ইচ্ছে না থাকলেও মুনিয়ার মাকে দেখে চুপ থাকতে পারলো না। নাহলে মহিলা সারা গ্ৰাম ছড়াবে,“আমিরুল শাহ মরতে না মরতেই তাঁর বিধবা বউডার উপরে পোলা আর পোলার বউ অত্যাচার শুরু কইরা দিছে।”
সামিউল এসেই স্ত্রীর গালে সপাটে থাপ্পড় বসালো, “আমার খাইয়া, আমার বাড়িত থাইক্যা আমার মায়ের গায়ে হাত তুলোস, বান্দীর ঘরের বান্দী? বাড়ি থাইক্যা বাহির হো।”
চুলের মুঠি শক্ত করে ধরে স্ত্রীকে ঘরে নিয়ে যেতে লাগলো সামিউল। বিথী চিৎকার করছে। মুনিয়ার মা আফসোস করে বললেন,“কত্ত বড়ো খারাপ মাইয়া মানু! এতক্ষণ কী বড়ো বড়ো গপ্পো মারছে। আর এহন হড়ির গায়ে হাত তোলে? কী কপাল আমনের, চাচী! আমার শ্বশুর মরার পরেও আমি কহনো হড়ির লগে উঁচা গলায় কথা কই নাই। জামাই ছাড়া দুনিয়াত কেউ কারো না।”
মুনিয়ার মা চলে গেলেন। শিউলি এসে তাকে ধরে নিচ থেকে উঠালো। মর্জিনা সশব্দে হেসে উঠলেন। খোঁচা মেরে বললেন,“সবই কর্মফল। কর্ম এমনেই একদিন ফিরা আইয়ে। মনে আছে, দুইডা ধমক দেওয়ায় হড়ি আম্মারে ধাক্কা মারছিলেন একবার? আব্বায় হুইন্নাই তো সংসার আলাদা কইরা দিছিলো। দেহেন, আইজ আমনেরে আমনের পোলার বউয়েও হেমনেই ধাক্কাডা মারলো।”
মর্জিনা হাসি থামিয়ে মুখ বাঁকালেন। ঘরে যেতে যেতে পুত্রবধূর উদ্দেশ্যে বললেন,“ঘরে আইয়ো, বউ। হেগো মাঝে থাকলে তোমারেও হেগো রোগে ধরবো। তোমার হড়ি কিন্তু এর থাইক্যাও খারাপ। চোখ তুইলা কথা কইলে কানা কইরা দিমু।”
শিউলি শাশুড়ির পিছু দৌড়ালো। ফরিদা শরীরটাকে টেনে নিয়ে সিঁড়িতে গিয়ে বসলেন। জায়ের বৌদলতে হঠাৎ করেই পুরোনো কথা মনে পড়ে গেলো।
সামিউল সবে হাঁটতে শিখেছে। দাদী ছাড়া ছেলেটা কিছু বোঝে না। দাদীও বংশের প্রথম নাতি নিয়ে খুব আহ্লাদী। আয়েশা ফরিদার পেটে। সাত মাসের পেট নিয়েই মেজো জায়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা চলছে তাঁর। যে করেই হোক, সংসারে নিজের জন্য পাকাপোক্ত একটা জায়গা তৈরি করতে হবে। তাই শাশুড়ির অনুমতি ছাড়াই নিজের মতো রান্নাঘরে ঢুকলেন রান্না করতে। শ্বশুরবাড়িতে রান্না করা তাঁর জন্য নিষিদ্ধ ছিল। রান্না ছাড়া বাদবাকি সব কাজ শাশুড়ি তাকে দিয়েই করাতেন। কখনো কখনো সেই কাজের চক্করে দুপুরের খাবার খেতে হতো গিয়ে সন্ধ্যায়।
রান্নাঘরে তাঁর প্রবেশের কথা জানতে পেরে সেদিন আর খাবার খেলেন না শাশুড়ি। উল্টে শুনিয়ে দিলেন কয়েক কথা,“এহন এই মাইয়ার হাতের রান্ধা আমার খাইতে হইবো? এত খারাপ দিন কবে আইলো? সাহস কেমনে হয় আমার পাকঘরে ঢুকার? মেজো বউ, লগে লগে আমারে জানাইলা না ক্যান তুমি? আমার ভোলাভালা পোলাডারে ফাঁসাইয়া এই বাড়িত ঢুকছে। না হইলে চোরের মাইয়ার যোগ্যতা আছে শাহ বাড়ির বউ হওয়ার?”
ফরিদার গোটা জীবন এই একটা অপবাদেই কেটে গেলো। ছেলেবেলা খুব একটা ভালো ছিল না তাঁর। প্রতিবেশীরা বাঁকা চোখে দেখতো, গ্ৰামে কোনো অনুষ্ঠান হলে তাদের প্রবেশ ছিল নিষিদ্ধ। পরার জন্য ভালো পোশাক ছিল না, কোনোমতে দুবেলা ভাতের মার খেয়ে দিনাতিপাত করতে হতো। খেলতে বের হলে সমবয়সীরা খেলায় নিতো না, চোরের মেয়ে বলে ক্ষ্যাপাতো। অপমান, কষ্ট নিয়েই মা যৌবনকালে হঠাৎ একদিন নিষ্ঠুর দুনিয়া ত্যাগ করেছিলেন।
মায়ের মৃত্যুর পর অল্প বয়সী ফরিদা অথৈ সাগরে পড়ে গেলো। সংসার, ভাই-বোনদের সব দায়িত্ব এসে পড়ল তাঁর উপর। বাবা ছিল জোয়ারি, মাতাল। নেশার অর্থ জোগাড় করার জন্য নিশিরাতে এর ওর বাড়ি করতো চুরি।
বেশিরভাগ সময় ধরা পড়ে যেতো। গাছের সাথে বেঁধে বেধরক পেটানো হতো। তবুও তাঁর শিক্ষা হতো না। কখনো কখনো ধরা পড়তো না। তবে সেই চুরির এক পয়সাও সংসারে কখনো ব্যয় করেননি তিনি। সংসার যা চলতো, অন্যের বাড়িতে মায়ের গায়ে গতরে কাজ আর হাত পাতার কারণে। তবুও ‘চোরের মেয়ে’ উপাধি তাদেরকেই বহন করতে হলো। মা মারা যাওয়ার পর বাবা বহুদিন পর বাড়ি ফিরলেন গ্ৰামের বয়স্ক মহাজনকে নিয়ে। ছোটো বোন বিলকিসকে ডেকে বললেন,“তোর বুবু কই? তৈয়ার হইতে ক। আইজ তার বিয়া। দুলাভাইরে সালাম দে।”
অবুঝ বিলকিস লোকটার দিকে ফ্যালফ্যাল নয়নে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সালাম না দিয়েই ঘরে দৌড় দিলো। ফরিদা ভেতর ঘর থেকে সব শুনেছে। তাদের ঘর ছিল ছনের। বর্ষায় থাকতে কষ্ট হতো। গরমে কোনোমতে দিনাতিপাত করতো। মহাজন তাঁর বাবার থেকে বয়সে অনেক বড়ো। দু দুটো বউ আছে ঘরে। সে ঘরের ছেলে-মেয়ে ফরিদার থেকেও বেশ বড়ো। শুনেছে, বাবা এই বুড়োর থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে নতুন করে অন্যত্র সংসার পেতেছে। হয়তো ঋণ শোধের বিনিময়ে ফরিদাকে চেয়ে বসেছিল বুড়োটা!
মাকে যেই নরকে সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে দাঁত কামড়ে পড়ে থাকতে দেখেছিল, সেই নরকে ফরিদা কিছুতেই আর যেতে চাইলো না। একটু সুখ আর সম্মানের আশায় সেদিন বিকেলেই এক কাপড়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছিল আমিরুল শাহর হাত ধরে। আমিরুল শাহর সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ নাটকীয়ই ছিল। শালুক কুড়িয়ে বাড়ি ফেরার পথে হিংসুটে মেয়েগুলো তাঁর পিছু নিলো। চুলের মুঠি টেনে ধরে মারতে মারতে সব শালুক কেড়ে নিয়ে তাকে ধূলো মাখা রাস্তায় ফেলে দিয়ে চলে গেলো। তখনি কোথা থেকে যেন এক সুন্দর মতন যুবক এসে বাড়িয়ে দিলো সাহায্যের হাত। ফরিদা সেই হাত ধরলো না। তা দেখে যুবক মিটিমিটি হাসলো। হাতে ধরিয়ে দিলো দু পয়সার একটি লজেন্স। বললো,“দুর্বল গো মতন এমনে মাইর খাইয়া পইড়া থাকলে চলবো? মাঝেমধ্যে মাইরের বদলে মাইর দিতেও জানতো হইবো।”
ফরিদা অবাক হলেন। সেই থেকে ফরিদা নিজের হয়ে লড়তে শিখলেন, করতে শিখলেন প্রতিবাদ। গ্ৰামের ভেতরে মাঝেমধ্যেই নিয়ম করে যুবকটির সাথে দেখা হতে লাগলো। সেখান থেকেই কথা হলো, পরিচয় হলো। জানতে পারলেন যুবকটির নাম আমিরুল শাহ। ধনী পরিবারের বড়ো ছেলে। আমিরুল শাহ তাঁর ভঙ্গুর জীবনে এসেছিল আশার প্রদীপ হয়ে। লোক মারফত বিয়ের সংবাদ শুনে সেদিনই বাড়ির পেছনে এসে উপস্থিত হলেন তিনি। কাজীর অপেক্ষায় মুরুব্বিরা উঠোনে বসে গালগপ্পো করছে। সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন,“তোমার নাকি আইজ বিয়া?”
ফরিদা সেদিন সব লাজলজ্জা ভুলে বলেছিলেন, “আমি ওই বুইড়ারে বিয়া করমু না। আমারে এই নরক থাইক্যা মুক্তি দিবেন? বিয়া করবেন আমারে?”
আমিরুল শাহ তখন ভবঘুরে যুবক। সংসারে মন নেই। বাড়িতে বিয়ের কথাবার্তা চলছে। রোজ বাবার হাতে ঠ্যাঙানি খেতো হতো। বাড়ি থেকে টাকা পয়সা চুরি করে অসৎ সঙ্গে মিশে নেশা করতেন, রাতে জোয়া খেলতেন। মাঝেমধ্যে নারী সঙ্গতে মজে থাকতেন। সেই ছেলেটার কীভাবে যেন ফরিদাকে ভালো লেগে গেলো। শুধু ভালোই লেগেছিল নাকি মায়া হয়েছিল? কোনোকিছু না ভেবে লোকচক্ষুর আড়ালে ফরিদাকে নিয়ে সেদিন তিনি পালালেন। বন্ধুদের সাক্ষী রেখে বিয়ে করলেন মসজিদে। তারপর বাড়িতে এ নিয়ে কত ঝামেলা হলো! বাবা কিছুতেই বিয়ে মানবেন না, করতে চাইলেন ত্যাজ্যপুত্র। কিন্তু সন্তানের প্রতি মায়ের আকাশচুম্বী ভালোবাসা! কোনো ভুলচুক মানে না। তাই শেষ পর্যন্ত গরিব ঘরের মেয়ে ফরিদাকেই বাধ্য হয়ে বাড়িতে থাকতে দিয়েছিলেন। তবে পুত্রবধূ হিসেবে কখনো মেনে নিতে পারেননি।
সেই সংসারেও সদস্য রূপে ফরিদার জায়গা মেলেনি, একটু সুখ আর সম্মানের দেখা পাননি। বহু বছর থেকে গিয়েছেন কাজের লোক হিসেবে। যেখানে তার অনেক পরে বাড়িতে পা রেখেও মেজো জা সংসারের সর্বেসর্বা, আদর্শ বউ। ফরিদা পার্থক্য খুঁজতে বসলেন। পেয়েও গেলেন। পার্থক্য হচ্ছে, অর্থবিত্ত আর বংশ পরম্পরার। এমনকি বিয়ের প্রথম রাতেই দেখতে পেলেন স্বামীর আসল রূপ।
রাতে মাতাল হয়ে ফিরে নরম মেয়েলি দেহের উপর পাশবিক নির্যাতন চালাতে লাগলেন আমিরুল শাহ। রাতে স্বামী আর দিনে শাশুড়ির অত্যাচার, কটু কথায় কখন যে ফরিদার ভেতরের সব মায়া-দয়া, সরলতা হিংসা আর নির্মমতায় রূপ নিলো? টেরই পেলো না কেউ।
সেদিন প্রথম শাশুড়ির অপমান সইতে না পেরে রাগের মাথায় বুড়িকে ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেলে দিলেন তিনি। তা-ই দেখে ফেলল বাকি দুই জা। মর্জিনা নতুন বধূ। মাস দুইও হয়নি বাড়িতে এসেছেন। তাদের মধ্যেই কেউ হয়তো শ্বশুরের কানে সেকথা তুললো। কে তুলেছে তা জানেন ফরিদা।
ফতেহ আলী শাহ বউ ভক্ত মানুষ ছিলেন। স্ত্রী যা বলতেন তাই শুনতেন। তাই রেগে গিয়ে সেদিনই বড়ো ছেলেকে করে দিলেন সংসার থেকে আলাদা। তার জন্যও আমিরুল শাহ সেদিন চ্যালা কাঠ দিয়ে খুব মারা মারলেন স্ত্রীকে। দুদিন বিছানা থেকে বেচারি উঠতেই পারলেন না। ছোট্ট সামিউল ছোটো ছোটো হাত দিয়ে মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। আচ্ছা, সেকথা কী এখনো সামিউলের মনে আছে? অবশ্য থাকার কথাও নয়।
ফরিদার নিষ্ঠুরতা, হিংসা কী একদিনে জন্মেছিল? নাসরিন, মর্জিনা কী জানে অপবাদ, অসম্মানের ব্যথা? জানে স্বামীর নির্যাতনে কত দুঃখ? নাকি বোঝে স্বামীর দেহে পরনারীর স্পর্শ দেখার কষ্ট? তারা সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছিল এই ধরিত্রীতে। বিয়ের পরেও বিনা পরিশ্রমে সাজানো সংসার আর স্বামীর ভালোবাসা পেয়েছিল। তারা পৃথিবীর নিষ্ঠুরতা দেখেনি, অপমান সয়নি, প্রতি মুহূর্তে কষ্টে তড়পাতে তড়পাতে এক নারীর কোমলতা, শখ, আহ্লাদকে জলাঞ্জলি দিতে দেখেনি।
ফরিদার এখন আর কোনো আফসোস হয় না। যা করেছে সে নিজে বাঁচার জন্য করেছে। এই বিশাল সংসারে নিজের অস্তিত্ব তৈরির জন্য করেছে। সেদিন শাশুড়ি যদি তাঁর কষ্ট অনুভব করে মায়ের মতো পরম মমতায় তাকে বুকে জড়িয়ে ধরতো, তাহলে সংসারের আজ এই হাল হতো? যদি আমিরুল শাহ স্ত্রীকে একটু ভালোবাসতেন, তাহলে কী ফরিদার কোমলতায় মলিনতা জমতে পারতো? নাকি ফতেহ আলী শাহ পুত্রকে থামিয়ে শাসন করে বলতেন,“বউয়ের গায়ে হাত তুলিস না, আমিরুল। হেরে সম্মান করতে শিখ।” তাহলে কী বুড়োর ওই পরিণতি হতো? সিরাজ উল্লাহ পারতো শাহদের বাড়িতে ঢুকে ষড়যন্ত্রের জাল বিছাতে? কিংবা সুবহান আলী শাহ, নাসরিন সেদিন তাদের কথা মেনে নিলেও এই নির্মম পরিণতি হয়তো হতো না।
পৃথিবীতে কেউ খারাপ হয়ে জন্মায় না। প্রতি পদে পদে খুব যত্ন করে তাদেরকে খারাপ করে গড়ে তোলা হয়। ভালো মানুষের মুখোশ পরে থাকা সুযোগ সন্ধানী মানুষদের অবদানই এখানে সবচেয়ে বেশি।
অজান্তেই চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল ফরিদার। আলগোছে আঁচল দিয়ে সেই অশ্রু মুছে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। বিড়বিড় করে বললেন,“যা করছি নিজের লাইগা করছি, পেটের সন্তানের লাইগা করছি। ওরা এইসবেরই যোগ্য আছিলো।”
মুমিনুল শাহ দ্বিধাগ্ৰস্থতায় ভুগছেন। শালিসের পর থেকে ঠিকঠাক ঘুম হয় না। বড়ো ভাইজানের মতোই কী আজকাল ভয় পাচ্ছেন তিনি? বারবার মনে হচ্ছে নাজির এমন কিছু জেনে গিয়েছে যা জানা তার জন্য অনুচিত। আমিরুল শাহ বরাবরই সুবহান আলী শাহর দুই পুত্র আর ছোটো ভাইকে ততটা গুরুত্ব দেননি। গুরুত্ব দিলে কী আজ তাঁর এই পরিণতি হতো? তবে মুমিনুল শাহ তাঁর ঠিক বিপরীত স্বভাবের। সর্বদা মনে কুটিলতা নিয়ে ঘোরেন। কিন্তু এই মুহূর্তে তিনি ভেবে পাচ্ছেন না, বড়ো ভাইজান কী আসলেই নাজিরকে নিজের কুকীর্তির কথা জানিয়ে দিয়েছে? মুমিনুল শাহর বিশ্বাস হয় না। আবার অবিশ্বাসও করতে পারেন না। কোনো কিছু না জেনে এভাবে সবার সামনে এত বড়ো কথা নাজির বলবে না। তাহলে? কতটুকু আমিরুল শাহ বলেছেন তাকে?
অনেক কষ্টে নিজেকে রক্ষা করেছেন মুমিনুল শাহ। অনেক কষ্টে টিকিয়ে রেখেছেন এই সংসার। অথচ সেদিনের ছোকরাদের জন্য সব ছেড়েছুড়ে কিনা পালাবেন? এত ভালো মানুষ তিনি নন। না সেদিনও ছিলেন। সপ্তাহ খানেক ধরে ভেবে ভেবে নতুন একটা ফন্দিও এঁটে ফেললেন তিনি। একছুটে চলে এলেন কাচারি ঘরে। যেখানে এখন বসে সামিউল।
সামিউলের মেজাজ ভালো নেই। ঘরে সমস্যা, বাইরে সমস্যা, ব্যবসায় সমস্যা, চাচার সাথে ঝামেলা, ওদিকে আবার কতগুলো জমি হাতছাড়া হলো! তার মধ্যে অসময়ে চাচাকে দেখে বিরক্ত হলো। জিজ্ঞেস করল, “এইখানে কী দরকার?”
“দরকার ছাড়া আইতে পারমু না?”
“হেই সম্পর্ক আমগো মাঝে নাই। তাড়াতাড়ি কন।”
“মাথা গরম?” কেদারায় আরাম করে বসলেন।
“তো কী ঠান্ডা থাকার কথা?”
“তুই কী ভাবছোস, আমার বিরুদ্ধে গিয়া একলা একলা কিছু করতে পারবি? হেই হেডাম তোর আছে?”
“আমি একলা? কে কইলো আমনেরে?”
“তো কেডায় আছে তোর লগে? পারভেজ? তোর থাইক্যাও ওয় নাজিরের কথা হুনে বেশি। আর কেডা? আব্বাস? ওর চাচা আমার আব্বার চাকর আছিলো। ওর বাপে আমগো ক্ষেতে কামলা খাটতো। ওয় তোর আব্বার মাথায় ছাতা ধরতো, ফায় ফরমায়েশ খাটতো। জীবনেও তোর সাথ দিবো? চেয়ারম্যানও তো বদলাইছে। হাওয়া যেইদিকে মেম্বরও হেইদিকে। আর শ্বশুরবাড়ির কথা বাদই দিলাম। নাজিরের লগে আমার লগে ঝামেলা কইরা পারবি? আমার পোলারা সবসময় আমার পক্ষে। একলা টিকতে পারবি? তোর বাপ পারছে?”
“তো কী করতে কন? নাজিররে দেখলেই মাথা খারাপ হইয়া যায়। আমগো জমিতে নতুন ঘর তুলে হারামজাদায়। আমার তো এহন মনে হইতাছে, ওয় আমার আব্বার লগে কিছু করছে।”
মুমিনুল শাহ মনে মনে হাসেন। একে দিয়ে নাজিরকে একবার পথ থেকে সরিয়ে ফেলতে পারলে সব ভয় শেষ। তারপর সামিউলকে সরাতেও খুব বেশি সময় লাগবে না। বললেন,“ভয় ভীতি দেখাইতে হইবো। না হুনলে…”
কথা শেষ করতে দিলো না সামিউল,“জানে মাইরা দিমু? যেমনে মেজো চাচারে মারতে চাইছিলেন? তবে এইবার কাম অসম্পূর্ণ রাখা যাইবো না।”
মুমিনুল শাহর অধরের হাসিটা মিলিয়ে গেলো। ঠোঁট জোড়া ফাঁক করে তাকিয়ে রইলেন ভাতিজার দিকে। সামিউল বড়োই রহস্য নিয়ে হাসলো।
মিল্টনকে নিয়ে উত্তরের জমিতে দাঁড়িয়ে আছে নাজির। জমিটা বেশ বড়ো, খোলামেলা। চারিদিক গাছগাছালিতে ভরা। কাঠুরেরা অপ্রয়োজনীয় গাছ কেটে ফেলছে। নাজির হঠাৎ হাঁক ছাড়লো,“শিমুল গাছটা কাইটেন না।”
“এইডার লাইগা উঠানে ছায়া পড়ব।”
“পড়ুক, তবুও কাটার দরকার নাই। শিমুল গাছ, নিম গাছ অনেক উপকারী।”
প্রতি বছরের মতো এবারেও অর্ধেক জমি জুড়ে মিষ্টি কুমড়ার চাষ করা হয়েছে। দক্ষিণে মিস্ত্রী শুক্কুর আলী দুচালার মাটির ঘর তুলছে। তার আগের ঘরটাও সে-ই তুলেছিল। লোকটার কাজের হাত ভালো। সবে একটা দেয়াল তোলা হয়েছে।
এখান থেকে মাস্টার বাড়ির ফটক দেখা যায়। শাহদের জমিজমার অভাব নেই। তবে সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে একেক জায়গায় পড়ে আছে। যুদ্ধের আগে পরে দাদা সস্তায় যেখানে যা পেয়েছেন তাই নিজের নামে দলিল করেছেন। রাজমিস্ত্রী চারিদিক ঘুরে দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করলেন,“বাড়ি কত বড়ো হইবো? কেমন নকশা চান?”
“নকশা হইবো আধা খাওয়া চাঁনের মতন। ছাদ থাকবো, তবে বেশি একটা বড়ো না। চাইরটা শোবার ঘর, খাওয়ার ঘর, বসার ঘর আর সামনে দিয়া লম্বা একটা বারান্দা হইলে ভালা হয়।”
“পায়খানা দিবেন না?”
“গেরামে ঘরের ভিতরে পায়খানা কেডায় দেয়?”
“শহরে দেয়।”
“গেরামের চিন্তা করেন, মিয়া। পুরা জমি কাজে লাগাইতে হইবো। বামে ছাদ দিয়া বাড়ি হইবো। হিসাব নিকাশ আইজ দিয়া যান। বর্ষা থাকতে থাকতে সব সরঞ্জাম লইয়া আইতে চাই। পাশেই বড়ো কলপাড়, পায়খানা। ডানদিকের ওই শেষ মাথায় হইবো গোয়াল ঘর। তার আগে চারিদিকে টিনের বেড়া দিতে হইবো। বাড়িঘর করা শেষ হইলে না হয় ইটের বাউন্ডারি দেওয়ার কথা চিন্তা করমু।”
“আবার দেহি মাডির ঘরও উডাইতাছেন? এত ঘর দিয়া করবেন কী?”
এই মিস্ত্রীকে শুক্কুর আলীই এনেছেন। গ্ৰামে দালান তোলার জন্য ভালো নামডাক আছে। উত্তরে সে বললো,“মাডির ঘরে থাকতে শান্তি লাগে। একটা প্রবাদ হুনেন নাই? ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। মাটির বাড়ির মতন শান্তি ইটের বাড়িত নাই। তবুও বড়লোকি দেহাইতে ইটের বাড়ি করতে হইবো।”
“তা ঠিক। আইচ্ছা, চিন্তা কইরেন না আমনে। সব হইয়া যাইবো।”
“ইট, বালুর দাম কেমন?”
“বর্ষাকালে কম বেশি হয়। ট্রলার দিয়া নদীর পাড় থাইক্যা আইবো। তবে ভালা কোম্পানির সিমেন্টের দাম একটু চড়া।”
“আনলে ভালাডাই আনমু। ঘরবাড়ি কী মাইনষে বছরে বছরে করে? আইচ্ছা, কামে লাইগা পড়েন। আমার কিন্তু বাড়িডা তাড়াতাড়ি লাগবো।”
“সমস্যা নাই।”
মিস্ত্রী হিসাব-নিকাশ শেষে চলে গেলেন। মিল্টন বললো,“ওই বাড়ি আমনে ছাইড়া দিবেন, ভাইজান?”
“হ, একদিন সবাইরেই কিছু না কিছু ছাড়তে হয়।”
“মায়া লাগবো না? কত স্মৃতি!”
“মায়ার থাইক্যা শান্তির দাম বেশি, বল্টু। কতগুলা দিন নিজের ঘরে ঘুমাই না জানোস? খালি মনে হয়, কেডায় জানি আক্রমণ চালায়। ওইদিকে তোর ভাবি আমার উপরে অভিমান কইরা রইছে। এই সময়ে তার লগেও থাকতে পারতাছি না। নতুন বাড়ি না করলে কেমনে হয়?”
“হঠাৎ কী হইলো, ভাইজান? সব কেমনে কেমনে জানি বদলাইয়া গেলো।”
“এইডাই নিয়ম। হঠাৎ কোনো কিছুই বদলায় না। ভাবতাছি গরুগুলা বেইচ্চা দিমু।”
“কী কন!”
“অনেক ট্যাহা পয়সা লাগবো। এহনো এগারোডা গরু, বাছুর আছে। সব থাইক্যা বেশি দুধ দেয় লালডা আর সাদাডা না? ওই দুইডা আর কালা ষাঁড় রাইখা বাদ বাকি সব বেইচ্চা দিমু। ছাগলডিও বেইচ্চা দেইস। এই তিনডারে আপাতত তগো বাড়িত নিয়া রাখ।”
“ভাইজান!”
“মন খারাপ করিস না। আল্লাহ দিতে কতক্ষণ? এক সময় তো দুই বিঘা জমি ছাড়া আমার আর কিছুই আছিলো না। তোর কামের ব্যবস্থা আমি কইরা দিমু না হয়। সামাদ ভাইয়ের লগে কথা কইছি। আইজ রাইত থাইক্যা হেগো লগে ট্রলারে মাছ ধরবি। দিনের বেলায় লতিফরে লইয়া আমার ওই পাশের ক্ষেত করবি। সময় সুযোগ পাইলে এদিককার কাম তদারকি কইরা যাইস।”
যাত্রাপথ পর্ব ৬৫
“আর আমনে?”
“আমি তো আছিই।”
মিল্টন নাজিরের হাবভাব বোঝে না। সামাদ মিয়ার সব ঋণ নাজির শোধ করে দিয়েছে। বাদবাকি যা ঋণ, খরচ ছিল তা নওশাদের পাঠানো টাকা দিয়ে শোধ করেছে। এবার শুধু মাথা গোঁজার একটা স্থায়ী ঠিকানা তৈরির পালা।
