Home যে পাখি মন বোঝে না যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ১০

যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ১০

যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ১০
মুন্নি আক্তার প্রিয়া

ভালোবাসা কী জিনিস তা আমি ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে শিখলাম রাহাত ভাইয়ের মাধ্যমেই। তিনি প্রতিটা দিন যেন আমাকে বাধ্য করছিল তাকে ভালোবাসার জন্য। উঁহুম! সে আমাকে কোন জোর করছিল না। তার ভালোবাসা প্রকাশের মাধ্যমগুলোই যথেষ্ট ছিল তাকে ভালোবাসার জন্য। মায়ায় তো অনেক আগেই আটকে গিয়েছিলাম, এখন নতুন যোগ হয়েছে ভালোবাসা শব্দটি। আমি জানিনা এটা আদৌ ভালোবাসা নাকি অন্যকিছু। তবে তাকে ছাড়া এখন আর আমি অন্য কিছুই ভাবতে পারি না। তাকে খুব বেশিক্ষণ না দেখে, কথা না বলতে পারলে অস্থির অস্থির লাগে। দম বন্ধ হয়ে আসে। আমার প্রায় সময়ই মনে হয়, তাকে সামনে বসিয়ে সারাক্ষণ শুধু দেখি। তার চুলে, মুখে হাত বুলিয়ে দিতে ইচ্ছে করে। তাকে ভালো থাকতে দেখতে ভালো লাগে। তার হাসি, তার কথা, যত্ন সব ভালো লাগে। এই অনুভূতিগুলোর নাম যদি ভালোবাসা হয় তবে আমি সত্যিই তাকে ভালোবাসি।

কিন্তু ঠিক এই জায়গাতেই আমি আবার থমকে যাই। চাচ্চু এবং চাচিমনির মুখটা ভেসে ওঠে চোখের সামনে। তারা কখনোই এই সম্পর্ক মেনে নেবে না। উলটো আরো ভীষণ কষ্ট পাবে। রাহাত ভাইয়ের ভালোবাসা গ্রহণ করে তাকে ভালোবাসা মানে হলো অন্যদিকে চাচ্চু এবং চাচিমনিকে কষ্ট দেওয়া। কিন্তু আমি যে আর মনের সাথেও যুদ্ধ করে পারছিলাম না!
আমি যখন ভাবছিলাম কীভাবে রাহাত ভাইয়ের সামনে এই বাড়ি থেকে বের হবো, ঠিক ঐ সময়েই রাহাত ভাইকে আবারও অফিসের কাজের জন্য ঢাকার বাইরে যেতে হলো। তবে এবার যাওয়ার আগে আমাকে বলে গিয়েছে। তার সেই মায়া মেশানো কণ্ঠে বলেছে,
“আমাকে ছেড়ে যেও না। খুব জলদিই আমি ফিরে আসব।”
আমি প্রতুত্তরে কিছুই বলতে পারিনি। তিনি কোন ছেড়ে যাওয়ার কথা বলেছেন আমি তাও জানি না। কিন্তু যখন ঢাকায় ফিরে দেখবে আমি আর নেই এই বাসায় তখন কী করবেন তিনি?
রাহাত ভাই চলে যাওয়ার পর আমি আস্তেধীরে আমার সব জিনিসপত্র গুছিয়ে নিচ্ছিলাম। ম্যাক্সিমাম জিনিসপত্র চাচিমনিই গুছিয়ে দিয়েছেন। টুকটাক যা ছিল সেসব আমি আর হৃদি গুছাচ্ছিলাম। আজ সকাল থেকেই হৃদির মনটা ভার হয়ে আছে। কয়েকবার দেখলাম চোখও ছলছল করছে। আমি বইগুলো গোছাতে গোছাতে জিজ্ঞেস করলাম,

“কী হয়েছে রে হৃদি?”
হৃদির কণ্ঠস্বর ভাঙা। ভাঙা ভাঙা গলায় বলল,
“কই?”
“তোর মন খারাপ কেন?”
“মন খারাপ না।”
“আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, তোর মন খারাপ। জলদি বল কী হয়েছে?”
হৃদি এবার হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দিয়েছে। আমি কাজ থামিয়ে ওর কাছে গেলাম। কাঁধে হাত রাখতেই বাচ্চা মেয়েটা আমাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলতে লাগল,
“আব্বু-আম্মু এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে আমি কল্পনাও করিনি। ভেবেছিলাম, তারা তোমাকে ভালোবাসে। এখন বুঝতে পারছি, তারা তোমাকে ভালোবাসে না। যদি ভালোবাসত তাহলে কখনোই এভাবে বাড়ি থেকে বের করে দিতে পারত না।”

“ধুর বোকা! তোর মাথায় এসব কী কথা ঘোরে? চাচ্চু আর চাচিমনি আমাকে সত্যিই ভালোবাসে। এমন তো না যে, আমাকে একদম রাস্তায় বের করে দিচ্ছে। আমার জন্য হোস্টেল খুঁজেছে। সেখানেই দিয়ে আসবে।”
“কিন্তু তবুও! জন্মের পর থেকে তোমাকে বড়ো বোন হিসেবে দেখে আসছি, এই বাড়ির একজন সদস্য তুমি জেনে আসছি। কিন্তু আজ…”
কথা বলতে বলতে মেয়েটার হেঁচকি উঠে গেছে। আমি ওর চোখের পানি মুছে দিয়ে বললাম,
“চুপ কর। কাঁদবি না একদম। তুই কাঁদলে কি আমার ভালো লাগবে বল? তুই সবসময় হাসি-খুশি থাকবি। আর শোন, রাহাত ভাইকে কিন্তু ভুলেও এখন কিছু জানাবি না। মনে থাকবে?”
কান্নার জন্য হৃদি আর কিছু বলতেও পারছিল না। আমি ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলাম।

বিকেলের মধ্যে সব গুছিয়ে আমরা হোস্টেলের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছি। চাচ্চু আর চাচিমনিও এসেছে সাথে। আমার হোস্টেল তিন তলায়। আজই প্রথম এলাম। এর আগে দেখতেও আসিনি। চাচ্চুর ওপর ভরসা ছিল। চাচ্চু অবশ্যই সেই ভরসা রেখেছে। বিশাল বড়ো একটা রুমে মাত্র আমরা দুজন থাকব। আমার রুমমেটকে অবশ্য এখনো দেখিনি। বাসায় নেই হয়তো। আমার সিট একদম জানালার পাশে। দখিনা বাতাস আসে এখান থেকে। ভেতর থেকেও সুন্দর একটা ভিউ দেখা যায়। কিন্তু আমার মনটাকে যেন আমি সেই বাড়িতেই আমার রুমে রেখে এসেছি।
চাচিমনি আমার পুরো রুমটাকে গুছিয়ে দিলেন। সব কাজ শেষ করতে করতে মোটামুটি সন্ধ্যা হয়ে গেছে। মাগরিবের আজানের পর কাজ শেষ হয়েছে। চাচিমনি হাতমুখ ধুয়ে এসে বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এদিকে আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল এই বুঝি আমি কেঁদে ফেলব।
চাচিমনি শাড়ির আঁচলে মুখ মুছে বললেন,

“আমি তাহলে এখন যাই।”
কান্না এসে অলরেডি আমার গলায় দলা পাকিয়ে বসে আছে। কথা বের হচ্ছিল না মুখ থেকে। কোনো রকম মাথা নাড়িয়ে বললাম,
“আচ্ছা।”
“নিজের খেয়াল রাখিস। আর সাবধানে থাকিস।”
“হুম।”
“কোনো কিছু দরকার হলে আমাকে জানাবি।”
“হুম।”
“গেলাম তাহলে।”
আমি মেইন গেইট অবধি গেলাম। চাচিমনি সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছে। যতক্ষণ দেখা গেল আমি শুধু ফাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়েই রইলাম। আমার বুকটা খাঁখাঁ করছিল। মনে হচ্ছিল কাউকে একটু জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদি। আমি দৌঁড়ে জানালার কাছে গেলাম। দেখি চাচ্চু আর চাচিমনি সিএনজিতে করে চলে যাচ্ছে। আমার চোখের পানি টপটপ করে পড়ছিল। থামানোর কেউ নেই। সত্যিই ভীষন অসহায় এক মেয়ে আমি এই দুনিয়ার বুকে। এবার আর আমি চুপ করে থাকতে পারলাম না। ফাঁকা রুমে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলাম।
কিছুক্ষণ বাদে কাঁধে কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে তাকিয়ে দেখি এক অচেনা মুখ। বিস্ময় নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে মেয়েটা। জিজ্ঞেস করল,

“আর ইউ ওকে?”
আমি কথা বলতে পারছিলাম না। চোখ ভেঙে যেন আরো বেশি কান্না পাচ্ছিল। মেয়েটা এবার আমার পাশে বসে কাঁধে, পিঠে হাত বুলাতে লাগল। আমাকে ঠান্ডা করতে পানির বোতল এগিয়ে দিল। আমি কোনোরকম এক চুমুক পানি খেয়ে নিজেকে থামানোর চেষ্টা করছি। বেশ কিছুক্ষণ পর স্থির হওয়ার পর মেয়েটা বলল,
“আমি অদিতি। তোমার রুমমেট।”
আমি কিছু বলতে পারছিলাম না। চুপ করে আছি। অদিতি তখন আর আমাকে ঘাঁটাল না। পিঠে হাত বুলিয়ে বলল,
“তুমি আগে শান্ত হও। পরে কথা হবে।”
অদিতি পরে নিজের সিটে চলে গেল। আমি তখনো মাথা নিচু করে বিছানায় বসে আছি। সব কিছু ছাপিয়ে আজ রাহাত ভাইয়ের কথা ভীষণ মনে পড়ছে। মনে হচ্ছে, একমাত্র তাকে সামনে পেলেই আমার অস্থির মনটা শান্ত হবে। কিন্তু ভাগ্যের এমনই নির্মম পরিহাস যে, সেই মানুষটাও এখন কাছে নেই। কয়েকবার মনের সাথে যুদ্ধ না করে তাকে অবশেষে ফোন করতে গিয়েছি। নাম্বার ডায়াল করেও কেটে দিয়ে জাস্ট একটা মেসেজ করেছি,

“আপনাকে ভীষণ মিস করছি!”
রাত বারোটা নাগাদ রাহাত ভাইয়ের কল এলো আমার ফোনে। আমি তখন অল্প একটু খাবার খেয়ে শুয়ে পড়েছি। বাসার কথা মনে করে একা একা কাঁদছিলাম। ফোন রিসিভ করতেই রাহাত ভাই আমার কণ্ঠ শুনে বুঝে ফেললেন। জিজ্ঞেস করলেন,
“কী হয়েছে প্রিয়? কাঁদছ কেন তুমি?”
আমার কান্নার দমক যেন আরো বেড়ে গেল। ফুঁপিয়ে উঠলাম সঙ্গে সঙ্গে। তিনি ফোনের অপর প্রান্ত থেকেই অস্থির হয়ে বলতে লাগলেন,
“এই প্রিয়? কী হয়েছে তোমার? বলো আমাকে। কাঁদছ কেন এভাবে? বাড়ির কেউ কি কিছু বলেছে তোমাকে?”
আমি কান্না আটকে বললাম,

“না।”
“তবে কাঁদছ কেন?”
“আপনার কথা ভীষণ মনে পড়ছে।”
“তাই? বোকা পাখিটা কি তবে সত্যি সত্যিই আমাকে ভালোবেসে ফেলল?”
আমি নিশ্চুপ। তিনি বললেন,
“কিন্তু আমার মনে হচ্ছে তোমার কান্নার কারণ শুধু এটাই না। আরো কিছু হয়েছে। বলো তো কী লুকাচ্ছ আমার থেকে?”
“কিছুই না।”
“আমি কি চলে আসব?”
রাহাত ভাইয়ের কণ্ঠে অস্থিরতা। আমি চোখ মুছে বললাম,
“না।কাজ শেষ করেই আসুন।”
“তাহলে কথা দাও কাঁদবে না? মন খারাপ করবে না?”
“হুম।”
“হুম কী? বলো কথা দিচ্ছি।”
আমি চুপ করে আছি। তিনি তাড়া দিয়ে বললেন,
“কী হলো? বলো?”
“কান্না আসলে কী করব?”
তিনি হেসে বললেন,
“আমাকে ভালোবাসবে। আমাকে মেসেজ করবে।”
সেদিন রাতে প্রায় বিশ মিনিটের মতো কলে আমার সাথে কথা বলেছেন তিনি। আমাকে হাসিয়েছেন। আমার মন ভালো করেছেন। আর ঠিক এভাবেই আরো এক পা যে এগিয়ে আমিও তাকে ভালোবাসতে শুরু করেছি।

সত্য সবসময় এতটাই ধারালো হয় যে বেশিদিন লুকিয়ে রাখা যায় না। তা একসময় না একসময় সামনে বেরিয়ে আসবেই। এই যেমন এত বড়ো ঘটনা এতদিন বন্ধুদের থেকে লুকিয়ে রেখেছিলাম ,কিন্তু আজ ঠিকই সবাই জেনে গেল। কলেজ ছুটির পর যখন আমি রিকশা না নিয়ে হেঁটে হোস্টেলের দিকে আসছিলাম ঠিক তখনই ওরা আমাকে চেপে ধরেছে। আমি মিথ্যা বাহানা দিলাম, যাতায়াতের অসুবিধার কথা বললাম। কিন্তু লাভের লাভ কিছুই হলো না। রাস্তার মধ্যেই আমাকে জোরজবরদস্তি করছে কী হয়েছে তা জানার জন্য। উপয়ান্তরহীন হয়ে সম্পূর্ণ ঘটনা আমি সংক্ষিপ্ত আকারে বললাম ওদের। খেয়াল করে দেখলাম সবার চোখেমুখেই বিরক্তি ও রাগ। সায়রা রেগেমেগে বলল,
“এগুলো কেমন ধরনের ফাইজলামি ভাই? স্বার্থে আঘাত লাগলে মানুষ এভাবে বদলে যেতে পারে?”
মিতু বলল,

“তাছাড়া এখানে প্রিয়তার দোষটা কোথায় আমি তো সেটাই বুঝতে পারছি না। তাদের ছেলে আগ বাড়িয়ে ওকে ভালোবাসছে। ও তো আর ভালোবাসতে যায়নি।”
সুমন খুব হতাশ হয়ে বলল,
“মানুষ এমন নিষ্ঠুরও হতে পারে?”
সবার চেয়ে বেশি রাগ দেখিয়ে আকাশ বলল,
“রাহাত ভাই এরকম নিশ্চুপ কেন এখন? তিনি কেন কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না? আমি তার জায়গায় থাকলে এতক্ষণে জোর করে হলেও বিয়ে করে ফেলতাম।”
আমি দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললাম,
“তিনি এখনো কিছু জানেন না।”
“কেন? বলিসনি তাকে?”
আমি উত্তর দেওয়ার পূর্বেই দেখলাম, রাহাত ভাইয়ের গাড়িটা এসে একদম আমাদের সামনে থেমেছে। তিনি যখন গাড়ি থেকে নামলেন তখন তার চোখেমুখে প্রচণ্ড রাগ। তার সঙ্গে আরো চারজন ছিল। দুজন মেয়ে ও দুজন ছেলে। কিন্তু তাদের কাউকেই আমি চিনি না। আমরা সবাই শুধু বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছি।
রাহাত ভাই কাছে এসে গম্ভীর হয়ে বললেন,

“বলোনি কেন আগে?”
আমি একটু থতমত খেয়ে বললাম,
“কী বলব?”
তিনি জবাব দিলেন না। হাত ধরে বললেন,
“চলো।”
“কোথায়?”
“বিয়ে করতে।”
আমিসহ আমরা সবাই হা করে তাকিয়ে আছি। বিস্ময় নিয়ে বললাম,
“কী?”

যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ৯

“কানে শোন না তুমি? সমস্যা হয়েছে কানে? কাজী কবুল বলতে বললে শুনবা তখন?”
“কীসব বলছেন!”
“বলেছি বিয়ে করব। বউ বানাব তোমাকে আমার।”
“হোয়াট!”
” আশ্চর্য! আবার কীসের হোয়াট? আমার প্রিয় আমার বউ হবে। সারাজীবনের জন্য নিজেকে আমার নামে লিখে দেবে। এবার বুঝেছ?”
আমার মনে হচ্ছিল, আমি সত্যিই এবার জ্ঞান হারাব।

যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ১১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here