যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ১৫
মুন্নি আক্তার প্রিয়া
রাহাতের সাথে আমার সময়গুলো কখনো রঙিন, কখনো সঙ্গীহীন কাটছে তো কখনো আবার সঙ্গ দিয়ে। আমাদের দেখা হয় প্রায়ই। দুই, একদিন পরপরই তিনি হুটহাট সারপ্রাইজ দিতে হোস্টেলের সামনে চলে আসেন, আবার কখনো কলেজের সামনে চলে আসেন। মাঝে মাঝে তিনি ব্যস্তও থাকেন। ছুটির দিন এলে আমি মুখিয়ে থাকি কখন তার সাথে বাইরে বের হবো, ঘুরতে যাব। তিনি প্রতি সপ্তাহে সময় দিতে না পারলেও চেষ্টা করেন। আমিও তার ব্যস্ততা বুঝি। এতকিছুর মাঝে কিন্তু আমার পড়াশোনায় ফাঁকি দেওয়ার একদম সুযোগ নেই। তার এক কথা, যা খুশি তা হোক পড়াশোনাটা ঠিকমতো করতে হবে। রেজাল্ট ভালো না হলে খবর করে ছাড়বে। আমি জানিনা আসলেই রেজাল্ট ভালো না হলে তিনি রাগ করবেন নাকি, তবে আমি নিজ ইচ্ছাতেই এখন আগের থেকেও আরো ভালো করে পড়াশোনা করি। তার বউ তার মতো না হলে হবে? আমাকে নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন আছে। সেগুলো পূরণ করার জন্য হলেও তো আমায় পড়তে হবে।
সন্ধ্যা তখন মাত্র হয়েছে। আমি ইলেক্ট্রিক ক্যাটলিতে চা বানিয়ে নিয়ে পড়তে বসেছি। তখন দেখলাম অদিতি বিষন্ন হয়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমে স্বাভাবিক মনে হলেও এখন তা মনে হচ্ছে না। সন্ধ্যার আগে থেকেই এখানে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা। এতক্ষণ কে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকে? আমি বই আর না খুলে আগে ওর কাছে গেলাম। পাশে দাঁড়িয়ে নরম স্বরে ডাকলাম,
“অদিতি?”
অদিতি তৎক্ষনাৎ চোখের পানি মুছল। এরপর আমার দিকে তাকিয়ে মিথ্যে হাসি দিয়ে বলল,
“হ্যাঁ, বলো?”
আমি বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছি ওর দিকে। অনেকদিন হয়েছে আমরা একসাথে আছি। শুরু থেকেই অদিতিকে আমি হাসি-খুশি, প্রাণবন্ত ও স্ট্রং দেখে আসছি। কখনো ওকে মন খারাপও করতে দেখিনি। তাই আজ হঠাৎ ওর চোখে পানি দেখে অবাক না হয়ে পারিনি সত্যিই। কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলাম,
“কী হয়েছে? কাঁদছ কেন?”
ও সেই মিথ্যা হাসিটা তখনো ঠোঁটে রেখেই বলল,
“কই? বলো তুমি। কিছু বলবে?”
অদিতির কাঁধ ধরে আমার দিকে ঘুরিয়ে বললাম,
“কী লুকাচ্ছ?”
“কিছু না তো!”
“উহুম! বলো শুনি কী হয়েছে? আমাকে শেয়ার করতে পারো। হালকা লাগবে।”
এই পর্যায়ে অদিতি গভীর শ্বাস নিয়ে বলল,
“আর হালকা! আমি নিজেই এখন নিজের বোঝা প্রিয়তা। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে ম’রে যাই। বিধাতা যে কেন আমাকে ম’র’ণ দেয় না!”
এমন প্রাণবন্ত মেয়ের মুখে এমন কথা মানায়? অদিতি কিছুদিন পর এইচএসসি দেবে। আমার এক ইয়ার সিনিয়র। তবুও আমি নাম ধরে ডাকি। এটা অবশ্য ও নিজেই বলেছে। কিন্তু ওর এত কীসের দুঃখ আমি সেটা বুঝতে পারছি না। যদি ব্যক্তিগত কিছু হয় তাহলে জিজ্ঞেস করা ঠিক হবে কিনা তাও বুঝতে পারছি না।
আমি কিছু বলার পূর্বে অদিতি নিজেই বলল,
“আজ তার বিয়ে!”
আমি বিস্ময় নিয়ে বললাম,
“কার?”
“আমার প্রাক্তন প্রেমিকের। জানো ওর জন্য আমি পরিবার, সমাজ, বন্ধু-বান্ধব সবার বিরুদ্ধে গিয়েছিলাম, শুধু ওকেই বেছে নিয়েছিলাম। ওর জন্য আমি ধর্ম পাল্টাতেও রাজি ছিলাম। আর দিনশেষে ও কী করেছে জানো? আমাকেই ছেড়ে দিয়েছে। আমাকে হাজারটা স্বপ্ন দেখিয়ে এখন অন্য কাউকে বিয়ে করছে।”
অদিতিকে স্বান্তনা দেওয়ার ভাষা আমার জানা নেই। এই অবস্থায় কোন শব্দটা আসলে একটা মানুষকে স্বস্তি দিতে পারে আমি তাও জানি না। তবে আমি রাহাতকে ঐ ছেলের জায়গায় কল্পনা করতেই পুরো মনটা মুহূর্তেই বিষিয়ে যেতে লাগল আমার। সেই সঙ্গে অদ্ভুত এক ম’রণ যন্ত্রণাও হচ্ছে বুকের ভেতর। এই কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা মানুষের আছে? সত্যিই আছে?
অদিতি হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল,
“আমার এত ভালোবাসার বিনিময়ে আমি কী পেলাম প্রিয়তা? ভগবান যদি ওকে আমায় না-ই দিবে তাহলে কেন ওর জন্য আমার মনে ভালোবাসা তৈরি করল? ও যদি আমার সঙ্গে না-ই থাকবে তবে কেন আমাকে স্বপ্ন দেখাল বলো? আমি কীভাবে সহ্য করব আজ ও অন্য কারো সাথে থাকবে! এরচেয়ে তো আমার ম’র’ণও ভালো ছিল।”
আমি অদিতিকে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে পিঠে হাত বুলাতে লাগলাম। কখন যে আমার চোখ থেকেও পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল আমি বুঝতেই পারিনি। অদিতিকে কাঁদতে বারণ করিনি। কাঁদুক মেয়েটা। আমার ছোট্ট মাথায় কোনো শব্দ নেই। শুধু ফুঁপিয়ে বলতে লাগলাম,
“সৃষ্টিকর্তা কখনো আমাদের অমঙ্গল চান না। বরং আমরাই ভুল করি। ভুল করাটা অন্যায় বা দোষের না। মানুষ মাত্রই ভুল। আমরা কেউই সেই ভুলের ঊর্ধ্বে নই। কিন্তু তাই বলে ভুলকে আঁকড়ে ধরে থাকা যাবে না অদিতি। এই সম্পর্কে তোমাদের মঙ্গল ছিল না বলেই পথ আলাদা হয়ে গিয়েছে এটাই মেনে নাও। নিজেকে বোঝাও, তুমি তোমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছ এরপরও তাকে পাওনি, এখানে তোমার কোনো হাত নেই। আমরা সবসময় তা পাই না যা আমরা চাই। অতীতকে পেছনে ফেলে এবার সামনে আগাতে হবে। নিজেকে এবং নিজের মনকে বোঝাতে হবে। জানি বলা সহজ, মানা কঠিন তবে অসম্ভব নয় বিশ্বাস করো।”
অদিতি কিছু বলছে না। কাঁদছে তখনো। আমি ওকে বুকে জড়িয়ে আছি তখনো। আমার বারবার রাহাতকে হারানোর ভয়ে বুক ভেঙে কান্না পাচ্ছিল। সেই সন্ধ্যায় আমার আর পড়তে বসা হয়নি। অদিতির যেমন ঘুম হয়নি তেমনই ঠিক অযাচিত ভয়ে রাতে আমারও ঘুম হয়নি।
তার তিনদিন পরের কথা। অদিতি এখন আগের চেয়ে কিছুটা স্বাভাবিক। মন খারাপ থাকে কিন্তু পড়াশোনা, খাওয়া-দাওয়া, ক্লাস সব ঠিকঠাক করছিল। সকালে আমি ক্লাসে যাব বলে রেডি হচ্ছিলাম। অদিতি ততক্ষণে রেডি হয়ে বের হবে। ওর কলেজ আমার কলেজ আলাদা। ক্লাস টাইমও আলাদা। সবসময় আমার আগেই বের হয়। আজও ক্লাসে যাওয়ার সময় হঠাৎ করে আমার সামনে এসে বলল,
“থ্যাঙ্কিউ প্রিয়তা।”
আমি কিছুটা বিস্মিত হয়ে বললাম,
“কেন?”
ও হঠাৎ আমাকে আরো অবাক করে দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“সেদিন আমার পাশে থাকার জন্য। এবং এই তিনদিন আমাকে আগলে রাখার জন্য। তুমি না থাকলে আমি নির্ঘাত উলটা-পালটা কিছু করে ফেলতাম।তুমি অনেক ভালো মনের একটা মেয়ে। ঈশ্বর তোমাকে সবসময় দুধে-ভাতে ভালো রাখুক।”
ওর কথায় আমি হাসলাম। ভালো লাগছিল ওর পরিবর্তন দেখে। আমিও ওকে জড়িয়ে ধরে বললাম,
“তুমিও একদিন অনেক সুখী হবে দেখে নিও। তোমার জীবনেও এমন একজন আসবে যে তোমাকে তোমার মতো করেই ভালোবাসবে, আগলে রাখবে।”
“তোমার মুখে ফুল-চন্দন।”
হেসে কথাটা বলেই অদিতি কলেজে চলে গেল। আমিও রেডি হয়ে বের হবো তখন রাহাতের মেসেজ এলো,
“শুভ সকাল আমার পরি বউ। সন্ধ্যায় হোস্টেলের সামনে আসব। রেডি থেকো।”
মেসেজটা দেখেই আমার মন ভালো হয়ে গেল। অদিতি তো মন ভালো করেছিলই, আর এখন মন দ্বিগুণ ভালো হয়ে গেছে। কেননা গত দুদিন আমাদের দেখা হয়নি। ব্যস্ততার জন্য আসতে পারেনি সে। আর আমিও কোনো বায়না করিনি। বরং ঐ সময়টুকু আমি অদিতিকে দিয়েছি। কিন্ত আজ দেখা হবে ভেবেই আমি আকাশে-বাতাসে উড়ছিলাম।
সন্ধ্যায় আজ যখন কী পরব বুঝতে পারছিলাম না, তখন অদিতি বলল,
“শাড়ি পরো। আকাশি রঙের শাড়ি। তাহলে তোমাকে দেখতে একদম আকাশ আকাশ লাগবে।”
আমি ঠোঁট উলটে বললাম,
“হুট করে শাড়ি পরব। কেমন লাগবে?”
“কেমন আবার? বেশ লাগবে। তুমি এমনিও ভীষণ সুন্দর।”
“হয়েছে!”
“আমি সত্যি বলছি।”
অদিতির মন ও কথা রাখতেই আমি শাড়ি পরলাম। আকাশি রঙের একটা জর্জেট শাড়ি। হৃদির আজ জন্মদিন। সকালে উইশ করেছিলাম। ওর নাকি ইচ্ছে আমাকে নিয়ে কেক কাটবে। তাই রাহাত আজ ওকে নিয়ে আসছে। আমি রেডি হতে হতেই রাহাত চলে এসেছে। অদিতির থেকে বিদায় নিয়ে আমি নিচে চলে গেলাম। মেইন গেইট দিয়ে বের হতেই হৃদি দৌঁড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল। পিংক কালারের একটা গাউন পরেছে। কী ভীষণ মিষ্টি যে লাগছে দেখতে! ঠিক যেন ছোট্ট একটা বার্বি ডল। আমি ওকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেয়ে বললাম,
“তোকে ভীষণ সুন্দর লাগছে।”
হৃদি আহ্লাদী কণ্ঠে বলল,
“তোমাকেও।”
রাহাত গাড়ি থেকে নামেনি। ড্রাইভিং সিটে বসে ছিল। আমাদের উদ্দেশ্য করে বলল,
“ম্যাম, আপনারা কি গাড়িতে উঠবেন নাকি বাইরেই এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবেন?”
আমরা কেউই কোনো জবাব না দিয়ে পেছনে গিয়ে বসলাম। রাহাত বিস্ময় নিয়ে পেছনে তাকিয়ে বলল,
“দুজনই কেন পেছনে গিয়ে বসলি? আমি কি তোদের ড্রাইভার?”
হৃদি কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল,
“উফফ ভাইয়া! কতদিন পর আপুর সাথে দেখা হলো আমার। তুমি এমন করো কেন?”
“আজ তোর বার্থডে বলে কিছু বললাম না।”
হৃদি হেসে বলল,
“থ্যাঙ্কিউ।”
হৃদি আমার সাথে হাজারও গল্প জুড়ে দিয়েছে এর মধ্যেই। আজ সারারাত কথা বললেও ওর গল্প শেষ হবে বলে মনে হচ্ছে না। তোতাপাখির মতো টুকটুক করে কথা বলছে। আমিও মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম। গাড়ি হঠাৎ বাড়ির পথে যাচ্ছে খেয়াল করে জিজ্ঞেস করলাম,
“আমরা কোথায় যাচ্ছি?”
রাহাত বলল,
“বাড়িতে।”
আমি উৎকণ্ঠিত হয়ে বললাম,
“কেন?”
হৃদি তখন আমাকে শান্ত করে বলল,
“আমি আব্বু-আম্মুর থেকে পারমিশন নিয়ে নিয়েছি। আম্মুই তোমাকে নিয়ে যেতে বলেছে। তুমি কোনো টেনশন কোরো না।”
আমার টেনশন যেন তবুও কমছিল না। আজ কতগুলো দিন পর আমি বাড়িতে ফিরছি। সত্যি বলতে অজানা ভয়ের সাথে ভীষণ আনন্দ ও সংকোচ হচ্ছিল আমার। গাড়ি থেকে নেমে ভেতরে গিয়ে দেখি অনেক মেহমান এসেছে। সবাই এতক্ষণ আমাদের জন্যই অপেক্ষা করছিল। চাচ্চু ও চাচিমনি একদম স্বাভাবিক আচরণ করছিল আমার সাথে। চাচিমনি এসে আমাকে জড়িয়েও ধরেছে। তবুও কেন জানি এতদিন পর পরিচিত বাড়ি ও পরিচত মানুষগুলোকে কেমন যেন অপরিচিত ও আলাদা আলাদা লাগছিল।
কেক কাটা শেষ হলে রাতে ডিনার করে মেহমানরা বাড়িতে ফিরে গিয়েছে। আমিও রেডি হয়েছি হোস্টেলে ফিরে যাব বলে তখন চাচিমনি এসে বললেন,
“আজ আর এত রাত করে ফিরতে হবে না। কাল সকালে যাস। তোর রুম গুছিয়ে রেখেছি আমি। গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নে।”
আমি রাহাতের দিকে তাকালাম। সেও আমাকে ইশারায় থাকতে বলল। তাই আর কথা না বাড়িয়ে হৃদিকে নিয়ে রুমের দিকে পা বাড়ালাম। রুমে গিয়ে দেখি সব পরিপাটি করে গোছানো আছে। ওয়ারড্রবে আমার কিছু জামা-কাপড়ও ছিল। সব যেন আগের মতো থেকেও কিছুই আর আগের মতো নেই। এক সেট জামা নিয়ে আমি একদম গোসল করে বের হয়েছি তখন দেখলাম রাহাত মেসেজ করেছে,
“বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি এসে কেমন লাগছে?”
আমি লিখলাম,
“ভাগ্যিস আপনি বললেন এটা আমার শ্বশুরবাড়ি! নয়তো আমার তো মনেই থাকত না।”
“মনে থাকবে কীভাবে? বর ছাড়া কি আর শ্বশুরবাড়ির ফিল আসে? দুজন আলাদা দুই রুমে! মানে হয় কোনো?”
“তাহলে যান চাচ্চু আর চাচিমনিকে গিয়ে বলুন আপনার বউ আমি। আমার সাথে থাকবেন আপনি।”
“সত্যিই বলব?”
“ইশ না!”
রাহাত আমার শেষ মেসেজটা সিন করে রেখে দিল। আমিও ফোন রেখে তোয়ালে দিয়ে চুল মুছছিলাম, তখন আবার তার মেসেজ এলো,
“দরজাটা খোলো।”
যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ১৪
এই লোক কি পাগল? আমি গিয়ে দরজা খুলে দিলাম। তিনি বাইরে দাঁড়িয়েই আমার গালে টুপ করে একটা চুমু খেলেন। এরপর জড়িয়ে ধরে যখন রুমের ভেতর ঢুকছিলেন, তখন আমার মনে হলো খুব আবছায়াভাবে আমি বাইরে চাচিমনিকে দেখতে পেলাম!
