Home যেই তুমি এলে যেই তুমি এলে পর্ব ১

যেই তুমি এলে পর্ব ১

যেই তুমি এলে পর্ব ১
সিনথিয়া ইসলাম সীমা

আজকে মির্জা বাড়ির একমাত্র মেয়ে কাইফা বিনতে কৃশানের সতেরোতম জন্মদিন। সেই সুবাদে ঘরময় এক অন্যরকম সুখের আমেজ বিরাজ করার কথা। তবে সেই সুখের উপর নেমে আসে এক ভয়ানক হাহাকার। আজ থেকে সতেরো বছর আগে কাইফার জন্মের সময় প্রসব যন্ত্রণায় হুমায়রা ঠিক যেভাবে চিৎকার করে কেঁদেছিল ঠিক সেরকম গগন বিদারী চিৎকারে আজও কেঁপে উঠছে পুরো মির্জা নিবাস। তাকে কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না। সকাল থেকে মেয়ের নিখোঁজ হওয়ার খবরে সে কেঁদেই যাচ্ছে। সারাদিন সিজদায় পড়ে নিঃশব্দে কাঁদলেও সন্ধ্যা নামতেই তার আহাজারি তে বাড়ির প্রতিটা দেয়ালও যেন ধসে পড়বে মনে হচ্ছে। হুমায়রার মন আর ঘরে টিকছে না।

সে বাইরে যেতে চায়, মেয়েকে নিজে খুঁজতে চায়। বাড়িতে তখন কোনো পুরুষ সদস্য নেই। সারাদিন ভর বাইরে থেকেই কাইফার খুঁজ করছে তারা। আর নারী সদস্য রা ঘরে থেকেই আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে চলছে। তবে ফলস্বরূপ কানে এসেছে- কাইফাকে এখনো পাওয়া যায়নি। আজকে তার মাদ্রাসা থেকে বাড়ি আসার কথা ছিল। কৃশান গতকাল রাতেই তার জন্য ছুটি নিয়েছে। মাদ্রাসা বাড়ি থেকে খুব বেশি দূরে নয়, দশ মিনিটের রাস্তা হবে বা এর চেয়েও কম। বড় হওয়ার পর থেকে কাইফা একাই আসা যাওয়া করে। কৃশান যেতে চাইলেও নিষেধ করে দেয়। আজকেও বলেছিল একাই চলে আসবে। সকালে মা- বাবাকে কল করেই মাদ্রাসা থেকে বেরিয়েছিল সে। তবে এখনো বাসায় ফেরেনি। এইদিকে তার খুঁজে দিশেহারা মির্জা বাড়ি। হুমায়রা কে সামলানো দায় হয়ে উঠেছে। ইকরা ও জিনিয়া তাকে ঝাপটে ধরে রেখেছে। হুমায়রা নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে। চিৎকার করে ডুকরে ওঠে বলে,

“ ইকরা আমায় ছাড়, ইকরা রে আমার মেয়ের কিছু হলে আমি শেষ হয়ে যাব। আল্লাহ তায়ালা কেন এমন করছে আমার সাথে! আমি যে তার পথেই সপে দিয়েছিলাম আমার মেয়েটাকে। তবে কেন আমার সাথেই এমন পরিণতি? সৃষ্টিকর্তা আর কত পরীক্ষা নিবে আমার! ”
“ শান্ত হ হুমায়রা, একটু শান্ত হ তুই। ইনশাআল্লাহ কিচ্ছু হবে না আমাদের কাইফার।”
চোখ দিয়ে অনবরত অশ্রু নির্গত হচ্ছে ইকরার। তবুও সখিকে শান্ত করার প্রয়াস চালাচ্ছে সে। হুমায়রা থামেনা ওর কান্নার গতি আরো বেড়ে যায়। ভাঙা গলায় উচ্চারণ করে,
“ আমি যে শান্ত থাকতে পারছি না রে ইকরা, আমার যে একটাই সম্বল, আমার মেয়ে! ”
বলতে বলতেই নেতিয়ে আসে জননীর ক্ষীণ দেহটা। শরীরের ভার ছেড়ে ইকরার কোলে আছড়ে পড়ে সে। এই নিয়ে তিনবার অজ্ঞান হয়েছে হুমায়রা। সবাই মিলে ওকে ধরে বিছানায় শোয়ালো। জিনিয়া এবার পরিচিত ডাক্তারের উদ্দেশ্যে কল লাগাল। এমন হতে থাকলে পরে অবস্থা সুচনীয় হবে মেয়েটার। সুতরাং এখন ওকে ডাক্তার দেখানো জরুরি। একে তো নাতিন সাথে ছেলে ও ছেলে বউয়ের অবস্থা দেখে ইয়াসমিন ও নাজমিন বেগমের দশাও খারাপ। তবে হুমায়রার পাগলামি দেখে নিজেদের শান্ত রাখার চেষ্টা করছে সকলে। নয়তো হুমায়রা আরও ভেঙে পড়বে।

নিজেদের এলাকা থেকে শুরু করে আশেপাশে যত এলাকা আছে সব জায়গায় কাইফাকে খুঁজে ফেলেছে কৃশান রা। কোনো জায়গাতেই মেয়ের কোনো খুঁজ না পেয়ে পা ভেঙে আসছে মানবের। সে আর এগোতে পারছে না। সবকিছু দিশেহারা লাগছে। দুনিয়া অন্ধকার হয়ে আসছে তার। ছেলের বেগতিক অবস্থা দেখে রাস্তার পাশে একটা বেঞ্চে তাকে বসাল জলিল মির্জা। তাদেরকে ঘিরে দাঁড়াল খলিল মির্জা, আলভি মির্জা ও আলভির পনেরো বছরের ছেলে আরহান মির্জা। আলভি ছোট ভাইয়ের পাশে বসল। ওর অবস্থা দেখে বলল,
“ ভেঙে পরিস না ভাই, ইনশাআল্লাহ কিছু হবে না। ভরসা রাখ আল্লাহর উপর। তুই ভেঙে পড়লে তোর বউকে কে সামলাবে? ”
কৃশান নীরব থাকে কিছু বলেনা শুধু ঘনঘন নিশ্বাস ফেলে। জলিল মির্জা ছেলের গায়ে হাত রেখে বলেন,

“ শক্ত থাকতে হবে কৃশান। ভেঙে পড়লে হবেনা। ”
কৃশান হুট করেই বৃদ্ধ বাবার কোমর জড়িয়ে ধরে। অতঃপর এতক্ষণ ভিতরে চেপে রাখা কান্নাটা বেরিয়ে আসে আপনা আপনিই,
“ বাবা আমার দিশেহারা লাগছে! ও যে আমার একমাত্র কলিজা বাবা, ওর কিছু হয়ে গেলে আমার জীবন এলোমেলো হয়ে যাবে। যে করেই হোক ওকে খুঁজে বের করতে করো। আমার মেয়েটাকে আমার কাছে এনে দাওনা বাবা! ”
ভদ্রলোক স্তব্ধ হয়ে গেলেন। জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে গেছেন এই অব্দি কখনো ছেলেকে এভাবে কাঁদতে দেখেন নি তিনি। তার সাথে দরকার ব্যতীত তেমন কথাই হয়না কৃশানের। আর কেঁদে নিজের কষ্ট প্রকাশ করা তো দূরে থাক। তিনি বলার মতো কোনো শব্দ খুঁজে পেলেন না। শুধু দুহাতে ছেলেকে আগলে ধরলেন।

কাইফার নিখোঁজ হওয়ার খবরে একে একে পাড়ার সকল মহিলাগণ মির্জা বাড়িতে হাজির হয়েছে। বিভিন্ন মুখে তখন বিভিন্ন কথা! কেউ বা হায় হুতাশ করছে আর কেউবা গুঞ্জনে লেগে গেছে। এর মাঝেই একজন মহিলা ইকরাকে দেখিয়ে অপর আরেকজন মহিলার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করলেন,
“ এই মেয়ের না একটা ছেলে ছিল আসেনি? কোথায় সে? ”
“ ওর ছেলে নাকি মারা গেছে কার থেকে যেন শুনেছিলাম। ”
“ ওমা কীভাবে? ”
“ জানিনা, তাদেরকে জিজ্ঞেস করলে বলে মারা গেছে আর কীভাবে মারা গেছে? কেন মারা গেছে কিছুই বলেনা। ”
“ আমারতো মনে হয় এই পরিবারে শুধুই রহস্য। ”

“ হ্যাঁ, আমারও। এখন আমার মনে হচ্ছে মেয়াটা বোধ হয় কোনো ছেলের সাথে পালিয়ে গিয়েছে। ”
“ হ্যাঁ ঠিক বলেছ! আমারও প্রথম থেকেই এটা মনে হচ্ছে। এখনকার মেয়ে মানুষের বিশ্বাস নেই। উপরে উপরে পর্দা করে ভালো মানুষ সেজে থাকে। আর ভিতরে ভিতরে নাগর জুটিয়ে রাখে! ”
এভাবেই সমাজের লোকগুলো যার যেভাবে ইচ্ছে কথা সাজাতে লাগলেন। এইদিকে পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ব্যস্ত আর অন্যদিকে সমাজের লোক ব্যস্ত তাদের গুঞ্জনে। তাদের কারো সুখে, দুঃখে কোনকিছুতেই ধ্যান নেই। শুধু সবজায়গায় অন্যকে নিয়ে সমালোচনায়ই মত্ত থাকেন তারা। আচ্ছা অন্যের সমালোচনা করে লাভ কোথায়? এর জন্য কি কোনো মাইনা পাওয়া যায়? না কারো মন জয় করা যায়? শুধু শুধু অন্যেকে নিয়ে গান গেয়ে নিজের সময় নষ্ট আর গুনাহ কামানোর কি দরকার? তারা কি এই আয়াত টি শুনেন নি,
“ দুর্ভোগ প্রত্যেক পশ্চাতে ও সম্মুখে পরনিন্দাকারীর।” (সূরা আল-হুমাজাহ,
আয়াত: ১)

“ আমাকে দয়া করে ছেড়ে দিন। আমি কি ক্ষতি করেছি আপনাদের? দোহাই লাগে দয়া করে ছেড়ে দিন আমায়। ”
শুনশান নীরবতায় ছেয়ে থাকা অন্ধকার কক্ষে হাত পা বাঁধা অবস্থায় করুন আর্তনাদ করছে এক সপ্তদশী কন্যা। তার পাশের কক্ষেই শব্দহীন বসে আছে এক কঠোর মানব।এমন আর্তনাদ বোধ হয় শুনে অভ্যস্থ সে। তাইতো রমণীর এতো আকুতি, মিনতি কোনকিছুতেই তার উপর কোনো প্রভাব ফেলছে না। এর মাঝেই আবারও নীরবতা চিরে বেরিয়ে আসে একটা ক্রন্দনরত নারী কণ্ঠ,
“ আপনাদের কি আল্লাহর ভয় নেই? ঘরে মা বোন নেই? এখানে কেন এনেছেন আমায়? আমি কি ক্ষতি করেছি আপনাদের! ”
“……..”
“ আপনাদের ভিতরে কি একটুকুও মনুষ্যত্ব নেই? একটা নারীর পেটে জন্ম হয়েই আরেকটা নারীকে পাচার করেন। যদি আপনার মা- বোনের সাথেও কেউ এমন করত? ”
“……”

“ দয়া করে আমাকে ছেড়ে দিন। নাহয় মেরে ফেলুন তাও আমাকে পাচার করবেন না। দয়া করুন একটু! ”
শেষদিকে এসে ডুকরে কেঁদে দিল রমণী। পাশের ঘর থেকে কান্নার শব্দ শুনতেই চ সূচক শব্দ করল রিক্ত। পুরো নাম #রাইয়ান_আহমেদ_রিক্ত। আপাতত যে কক্ষে সে রয়েছে তার মালিকের সবচেয়ে বিশ্বস্ত লোক। অর্থাৎ বিখ্যাত নারী পাচার কারী রিয়াজুল আহমেদের ডান হাত রাইয়ান আহমেদ রিক্ত। রিক্ত জানেনা পাশের কক্ষে থাকা মেয়েটা কে? আর তাকে কোথা থেকে তুলে আনা হয়েছে। তুলে আনার পর তাকে বলা হয়েছে মেয়েটাকে পাহারা দিতে আর সে ওটাই করছে। তবে আপাতত ইচ্ছে হচ্ছে গিয়ে গলাটাই কেটে দিতে ঐ মেয়ের। সে নিজের কালো মুখোশটা মুখে বেঁধে নেয়। পরপর পা বাড়ায় পাশের কক্ষে।
রিক্ত মোবাইলের ফ্লাশ জ্বালিয়ে কক্ষটায় পা রাখে। ধীর পায়ে এগোয় মেয়েটির নিকট। মেয়েটির চোখে আলোর উৎস পড়তেই চোখ মুখ খিচে নেয় সে। তখনি তার দিক নজর যায় মানবের। মেয়েটার পরণে বোরকা, সাথে সাত লেয়ারের হিজাব। এক জোড়া ভাসা ভাসা নারী চোখ ব্যতীত শরীরের অন্য কোনো অংশ দৃশ্যমান নেই। হাত, পা গুলোও মোজা দিয়ে আবৃত। রিক্তর ভ্রূ যুগল খানেক কুঁচকায়। মনে প্রশ্ন জাগে- মেয়াটা কি মাদ্রাসার মেয়ে নাকি? মাদ্রাসার মেয়ে তুলে এনেছে ওরা? পরক্ষণেই ভাবে যেখান কার মেয়েই হোক এতে তার কি! সে কিয়ৎক্ষণ চুপ থেকে ধমকে বলে,
“ এই মেয়ে এভাবে চেঁচাচ্ছো কেন? আরেকবার গলার আওয়াজ শুনলে গলাটা কেটে পানিতে ভাসিয়ে দিয়ে আসব। ”
মেয়েটি পিটপিট করে চোখ খুলে তাকায়। কান্নার দরূন চোখগুলো লালিত হয়ে ফুলে গেছে তার। ওভাবেই চোখের পানি ছেড়ে বলে ওঠে,

“ গলা কাটুন বা যা ইচ্ছে তাই করুন। তবুও দয়া করে আমায় কোনো পরপুরুষের হাতে তুলে দিবেন না। ঐ এক শাস্তি ছাড়া আপনি আমায় যেভাবে মারতে চান মারতে পারেন। ওটা ছাড়া সব ভাবেই আমি সাদরে মৃত্যুকে গ্রহণ করব। ”
রিক্ত কিছুক্ষণ ভ্রূ গুটিয়ে ওর চোখের দিক তাকিয়ে থাকে। ভাবে বোধ হয় কোনোকিছু। বেশ খানেক সময় নিয়ে শান্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে শুধায়,
“ নাম কি? ”
“ #কাইফা_বিনতে_কৃশান। ”
এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে যায় পরিবেশ। কাইফার মনে হলো লোকটা বোধ হয় থমকে গেছে। কেমন যেন চোখের পলকও ফেলছে না। এর মাঝেই রিক্তর হাত থেকে মোবাইল টা ধপ করে খসে পড়ে যায়। অতঃপর ফের অন্ধকার নেমে আসে চারিপাশে। কাইফার চোখে মুখে বিস্ময় ধরা দেয়। তখনি আঁধার কক্ষে শোনা যায় মানবের অদ্ভুত কণ্ঠ,
“ মায়ের নাম হুমায়রা জান্নাত হিমি? ”
কাইফা চমকে উঠে। তৎক্ষনাৎ হকচকিত গলায় বলে ওঠে,
“ জ্বি, আপনি জানলেন কি করে? ”

লোকটার তরফ থেকে এবার আর কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। কাইফা কিছুক্ষণ চুপ থেকে ফের মুখ খুলতে নিবে এর আগেই ওর হাতের দড়িতে কারো স্পর্শ অনুভব করে সে। পরপর হাত দ্বয় মুক্ত করে দেয়া হয় তার। রমণী হতবিহ্বল হয়ে যায়। তবে হাত দিয়ে পায়ের দড়ি খুলতে ভুলে না। এর মাঝেই কক্ষের দরজাটা খুলে যায়। মৃদু মন্দ চাঁদের আলোয় আলোকিত হয় আঁধার কক্ষ। কাইফা অবাক দৃষ্টিতে তাকায় দরজার পানে। দৃষ্টিগোচর হয় এক কালো মুখোশধারী মানব। অকস্মাৎ সেই মুখোশ ভেদ করে ভেসে আসে মানবের গম্ভীর কণ্ঠ,
“ যত দ্রুত সম্ভব চলে যাও এখান থেকে। ”

যেই তুমি এলে পর্ব ২