Home র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ২৭

র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ২৭

র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ২৭
ইয়ুশরা রিমু

ধরনীতে তখন ধীরে ধীরে রাত নেমে এসেছে। কিছুক্ষণ আগেও অস্তগামী সূর্যের রাঙা আভায় ঝলমল করা পানির বিস্তীর্ণ অংশটা এখন অন্ধকারের নরম চাদরে ঢেকে যাচ্ছে। নদীর দুই পাড়ে ছোট ছোট আলো জ্বলে উঠেছে, দূরে কোথাও মাঝিদের নৌকায় টিমটিম করে আলো জ্বলছে । শীতল বাতাসে ভেসে আসছে নদীর কাঁচা পানির ঘ্রান, আর সেই ঘ্রান সঙ্গে মিশে আছে সারাদিনের আনন্দময় ক্লান্তি।
ধীরে ধীরে মোটরচালিত বোটটি ঘাটের দিকে ফিরে এলো। মাঝি দক্ষ হাতে বোটটাকে কাঠের পাটাতনের সঙ্গে ভিড়িয়ে দিতেই সবাই একে একে নামতে শুরু করলো।বেলা এখনও একটু সাবধানে হাঁটছে। বোট থেকে নামার সময় ঢেউয়ের কারণে কাঠের পাটাতনটা হালকা নড়ে উঠতেই সে আবারও ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতে যাচ্ছিলো। ঠিক সেই মুহূর্তে সায়র বিন্দুমাত্র দেরি না করে তার কনুইটা আলতো করে ধরে ফেললো।খুব স্বাভাবিক কণ্ঠেই বললো,

—ধীরে নাম। এতো ছটফট করিস কেন সবসময়।
বেলা একবার তার দিকে তাকালো। তারপর নিচু স্বরে বললো,
— পা মু’চরে গেছে। ধীরেই নামছিলাম।
সায়র শুধু মৃদু মাথা নাড়লো। সবাই গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলো।ড্রাইভিং সিটে বসলো সায়র। পাশে বসলো বিহান। পিছনের সিটে জানালার পাশে বসলো বেলা, আর তার পাশে ইরা।গাড়ি ধীরে ধীরে নদীর ঘাট ছেড়ে শহরের রাস্তার দিকে এগিয়ে চললো।সারাদিনের ঘোরাঘুরির ক্লান্তি থাকলেও বিহানের মুখে যেন ক্লান্তি বলে কোনো শব্দই নেই। গাড়ি ছাড়তেই সে নাটকীয় ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
—আজকে আমার একটা জিনিস বুঝতে আর বাকি নেই।
সায়র স্টিয়ারিং সামলাতে সামলাতেই জিজ্ঞেস করলো,
—আবার কী বুঝলি?
—তুই আর আগের সেই সায়র নেই।
সায়র ভ্রু কুঁচকে তাকালো।

—মানে?
—আগে ছিলি গম্ভীর পুরুষ। এখন দেখি প্রেমিক পুরুষ ও হয়েছিস!
ইরা হেসে ফেললো।
—আপনি না, একদমই ভালো না।
বিহান সঙ্গে সঙ্গে বললো,
—আমি তো সত্যি কথাই বলছি।
বিহান ফের নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে,
—আজকে দেখলাম, নৌকায় ওঠানোর সময় কী যত্ন! কী ধৈর্য! কী ভদ্রতা!
সায়র গম্ভীর মুখে বললো,
—বেশি নাটক করিস না।
—নাটক করছি? আমি তো শুধু পর্যবেক্ষণ করছি।
ইরা এবার মজা করে বললো,
—আমার মনে হয়, বিহান ভাইয়ের আসল সমস্যা হলো উনি অন্যের ব্যাপারে বেশি আগ্রহী।
—অবশ্যই। আমি জন্মগত গোয়েন্দা।
—তাই নাকি?
—হুম। আর আমার গোয়েন্দাগিরি বলছে, আজকে কেউ একজন সারাক্ষণ কারও দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছিলো।
কথাটা বলেই সে দুষ্টু হাসি দিয়ে সায়রের দিকে তাকালো।
সায়র বিরক্তির ভান করে বললো,

—চুপ করে বসবি?
—না।
—কেন?
—কারণ আজকে তোকে প’চানোর এমন সুন্দর সুযোগ আমি হাতছাড়া করবো না।
সবাই হেসে ফেললো। শুধু একজন ছাড়া।বেলা।সে চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে।রাস্তার দুই পাশে একটার পর একটা দোকান, মানুষের ভিড়, উজ্জ্বল আলো, ব্যস্ত শহর সবকিছু যেন তার চোখের সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে। অথচ তার মনটা কোথাও আটকে আছে।আজকের পুরো দিনের প্রতিটি মুহূর্ত একে একে মনে পড়ছে।চুল বেঁধে দেওয়া,নৌকায় ওঠার সময় হাত বাড়িয়ে দেওয়া।সবকিছু যেন এখনও তার কানে বাজছে।অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে খুব ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠলো।
ঠিক তখনই রিয়ার ভিউ মিররে সায়রের চোখ পড়লো বেলার মুখের ওপর।সে এক মুহূর্তের জন্য তাকিয়ে রইলো।আজ সারাদিনে এই প্রথম সে বেলার মুখে এত শান্ত একটা অভিব্যক্তি দেখলো।নিজের অজান্তেই তার বুকের ভেতরটাও অদ্ভুত এক প্রশান্তিতে ভরে উঠলো।কিন্তু পরের মুহূর্তেই সে আবার চোখ ফিরিয়ে নিলো।একই গাড়িতে বসে থেকেও দু’জনের মধ্যে কোনো কথা হলো না।তবু নীরবতারও একটা নিজস্ব ভাষা থাকে।আর সেই ভাষাটা আজ দু’জনেই ধীরে ধীরে বুঝতে শিখছে।কিছুক্ষণ পর গাড়ি এসে থামলো ইরাদের বাড়ির সামনে।ইরা সিট বেল্ট খুলে হাসিমুখে বললো,

—আজকের দিনটা সত্যিই খুব সুন্দর ছিলো।
বিহান সঙ্গে সঙ্গে বললো,
—শুধু সুন্দর? আমার তো মনে হচ্ছে আবারও আসতে হবে।
—আসবেন। তবে এবার আগে থেকেই পরিকল্পনা করে।
সায়র মুচকি হেসে বললো,
— ওকে।
ইরা দরজা খুলে নামার আগে একবার বেলার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললো,
—ভালো করে বিশ্রাম নিস।
বেলা হালকা হেসে মাথা নাড়লো।
—তুইও।

ইরা সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেলো।আবারও গাড়ি চলতে শুরু করলো।এবার আর কেউ তেমন কথা বললো না।বিহানও হয়তো সারাদিনের ক্লান্তিতে একটু চুপ হয়ে গেছে।গাড়ির ভেতরে শুধু মৃদু সুরে বাজছিল পুরোনো একটি গান, আর জানালার বাইরে রাতের শহরটা দ্রুত পেছনে সরে যাচ্ছিলো।প্রায় বিশ মিনিট পর গাড়িটা এসে থামলো খান বাড়ির বিশাল লোহার গেটের সামনে।দারোয়ান দ্রুত গেট খুলে দিলো।গাড়ি ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকতেই বাড়ির বারান্দার উজ্জ্বল আলো চোখে পড়লো।বেলার বুকের ভেতরটা আবারও ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠলো।নদীর ধারের সেই প্রশান্তিটুকু যেন মুহূর্তেই কোথায় হারিয়ে গেলো।গাড়ি থেকে নেমে সবাই একসঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করলো।ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই সোফায় বসে থাকা মমতাজ বেগম চোখ তুলে একবার তাকালেন।তাঁর দৃষ্টি প্রথমে গিয়ে থামলো সায়রের ওপর।তারপর বিহানের দিকে।একটু পরে বেলার দিকেও তাকালেন বটে, কিন্তু সেই দৃষ্টিতে কোনো মমতা ছিলো না।মনে হলো, ঘরে বেলা নামে কেউ উপস্থিতই নেই।তিনি উঠে দাঁড়িয়ে শুধুই বললেন,

—-সায়র, এত রাত করলে কেন?
সায়র শান্ত গলায় উত্তর দিল,
—রাস্তা একটু জ্যাম ছিল, আম্মু।
—খেয়েছো কিছু?
—না।
—হাত-মুখ ধুয়ে নিচে এসো। খাবার গরম করছি।
কথাগুলো বলার সময় তিনি একবারও বেলার দিকে তাকালেন না।এমনকি বিহানকে বসতে বললেন, খোঁজখবর নিলেন, কিন্তু বেলাকে উদ্দেশ্য করে একটি শব্দও উচ্চারণ করলেন না।বেলা নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিলো।তার বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে মোচড় দিয়ে উঠলো।সে জানতো, মমতাজ বেগম তাকে পছন্দ করেন না।কিন্তু এভাবে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে দেওয়াটা যে এতটা কষ্টের হবে, সেটা সে কল্পনাও করেনি।তার মনে হলো, এই বিশাল বাড়িটায় সে যেন একজন অতিথিও নয়।বরং এমন একজন, যার উপস্থিতি ইচ্ছে করেই উপেক্ষা করছে মমতাজ বেগম।চোখের কোণে হালকা পানি জমে উঠলেও সে মাথাটা নিচু করে ফেললো।
—না।কাউকে নিজের দুর্বলতা দেখাবে না। নিঃশব্দেই সব সহ্য করবে না।কারণ এই সম্পর্কের ভার শুধু তার একার নয়।তবুও এই পরীক্ষাটা হয়তো তাকেই সবচেয়ে বেশি দিতে হবে।
সায়র আড়চোখে একবার বেলার মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝে গেলো মেয়েটা ভীষণ কষ্ট পেয়েছে।তার বুকের ভেতরটাও অদ্ভুতভাবে ভারী হয়ে উঠলো।কিন্তু মায়ের সামনে এই মুহূর্তে কিছু বললে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে যাবে।তাই সে শুধু নিঃশব্দে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো

বেলা ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এলো। প্রতিটি ধাপ যেন আজ অদ্ভুত ভারী লাগছে। খান বাড়ির বিশাল করিডোরটা নিস্তব্ধ। আলোগুলোর ম্লান আভা পুরো পরিবেশটাকে আরও নির্জন করে তুলেছে। একটু আগেই ড্রয়িংরুমে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। মমতাজ বেগমের সেই নির্লিপ্ত দৃষ্টি, ইচ্ছে করেই তাকে উপেক্ষা করে চলে যাওয়া।সবকিছু যেন বুকের ভেতর নিঃশব্দে কাঁ”টার মতো বিঁধে আছে।
নিজের কক্ষের দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে কিছুক্ষণ দরজার সঙ্গেই হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো বেলা। তারপর ধীরে ধীরে বিছানার ধারে গিয়ে বসে পড়লো।ঘরটা একদম নিঃশব্দ।জানালার বাইরে রাতের হালকা বাতাসে পর্দাগুলো দুলছে। দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ভেসে আসছে। অথচ বেলার ভেতরে যেন এক অদৃশ্য ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
সে আয়নার দিকে তাকালো।আয়নায় ভেসে ওঠা নিজের মুখটাকে আজ কেমন অপরিচিত লাগছে। এই কি সেই বেলা? যে সামান্য কথাতেই হেসে উঠতো, যে সারাক্ষণ ইরা আর বিহানের সঙ্গে দুষ্টুমি করতো, যার হাসিতে চারপাশ মুখর হয়ে থাকতো?আজ সেই মেয়েটাই যেন কয়েক দিনের মধ্যে অনেকটা বদলে গেছে।চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ, মুখজুড়ে নীরবতা, আর বুকভরা অজস্র অপ্রকাশিত কথা।
হঠাৎ সে নিজেই নিজের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বললো,

—না।এভাবে আর না।
কথাটা বলেই সে গভীর একটা নিঃশ্বাস নিলো,
—আমি কেন নিজের হাসিটা হারিয়ে ফেলবো? আমি কেন সবসময় মুখ গোমড়া করে থাকবো? কেউ আমাকে পছন্দ করুক বা না করুক, তার জন্য নিজের স্বভাবটা তো আমি বদলে ফেলতে পারি না।।
তার চোখে ধীরে ধীরে দৃঢ়তা ফুটে উঠলো,
—আগের সেই বেলাই আবার ফিরবে। আমি আবার হাসবো, গল্প করবো, সবাইকে নিয়ে আনন্দ করবো। নিজের কষ্ট নিজের ভেতরেই রাখবো, কিন্তু সেই কষ্টকে কোনোদিন আমার পরিচয় হতে দেবো না।একটু থেমে সে খুব ধীরে বিছানার ওপর রাখা ওড়নাটা গুছিয়ে রাখলো।
তারপর ফিসফিস করে বললো,
—তবে একটা জিনিস বদলাতে হবে।
সায়রের নামটা মনে আসতেই তার চোখ দুটো অন্যমনস্ক হয়ে উঠলো
আজ সারাদিনে মানুষটা তার জন্য যা যা করেছে, সেসব মনে পড়তেই বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে নরম হয়ে এলো।সে জানে, সায়র খুব ভালো পুরুষ।বরং যতদিন যাচ্ছে, ততই সে বুঝতে পারছে মানুষটার ভেতরের কোমল দিকগুলো।আর সেই কারণেই হয়তো তার নিজের মনটাও ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে।বেলা ধীরে বললো,

—আমাদের সম্পর্কের শুরুটাই স্বাভাবিক ছিলো না। জোর করে তৈরি হওয়া একটা সম্পর্ককে সময়ের আগেই অন্য কোনো অনুভূতির রঙ দেওয়া ঠিক নয়।আমি উনার প্রতি সম্মান রাখবো, কৃতজ্ঞ থাকবো কিন্তু নিজের মনকে আর এতটা কাছে যেতে দেবো না।যতটা দরকার, ততটাই কথা বলবো।যতটা প্রয়োজন, ততটাই কাছে থাকবো।এর বেশি নয়।কারণ যত বেশি কাছে যাবো ।তত বেশি কষ্ট পাওয়ার ভয় থাকবে। সায়রকে হারিয়ে ফেলার ভয়। সায়র নিশ্চয়ই ওকে বেহায়া ভাববে এতো কাছে গেলে।সে ধীরে ধীরে উঠে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো।রাতের আকাশে অসংখ্য তারা জ্বলছে।
সেই আকাশের দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত কণ্ঠে বললো,

—আগামীকাল থেকে নতুন করে শুরু করবো।সবাই আমাকে আগের মতোই দেখবে।হাসিখুশি, চঞ্চল, দুষ্টু সেই বেলাকে।কেউ বুঝতেও পারবে না, এই হাসির আড়ালে কতটা অস্থিরতা লুকিয়ে আছে।আর সায়র‌ আপনি আমার জীবনের একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হয়েই থাকবে, কিন্তু আমার অনুভূতিগুলো আমি আর আপনাকে বুঝতে দেবো না সায়র ভাই।সময়ই ঠিক করবে, আমাদের সম্পর্কের পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।এই দৃঢ় সিদ্ধান্তটুকু নিজের ভেতরে গেঁথে নিয়ে বেলা ধীরে ধীরে জানালার পর্দাটা টেনে দিলো।
কিন্তু সে জানতো না । মানুষ অনেক সিদ্ধান্তই নেয়, অথচ হৃদয় সব সময় সেই সিদ্ধান্ত মেনে চলতে পারে না।কখনও কখনও দুটি হৃদয়ের দূরত্ব বাড়ানোর সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সেই হৃদয় দুটোই।

সেদিনের দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি ধীরে ধীরে সবার শরীরে ভর করলেও খান বাড়ির প্রতিটি মানুষের মনে যেন ভিন্ন ভিন্ন অনুভূতির ঢেউ খেলছিলো। রাত আরও গভীর হয়েছে। পুরো বাড়িটা ধীরে ধীরে নিস্তব্ধতায় ডুবে গেছে। করিডোরের সাদা আলোয় দীর্ঘ ছায়াগুলো আরও লম্বা হয়ে মেঝেতে পড়ে আছে।
নিজের ঘরে একা বসে আছে সায়র।সোফার পিঠে মাথা এলিয়ে দিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করেছিলো সে। কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই আজ সারাদিনের ছোট ছোট মুহূর্তগুলো একটার পর একটা স্পষ্ট হয়ে ভেসে উঠছে।নদীর ধারে বাতাসে উড়তে থাকা বেলার চুল।লজ্জায় নিচু হয়ে থাকা মুখটা,চুল বাঁধতে গিয়ে তার নীরব সম্মতি,বোটে ওঠার সময় ভয়ে কেঁপে ওঠা হাত,আর নিজের হাত শক্ত করে ধরে রাখা সেই মুহূর্তটা অজান্তেই সায়রের ঠোঁটের কোণে একফোঁটা মৃদু হাসি ফুটে উঠলো।সে খুব আস্তে নিজেকেই বললো,
—মেয়েটা সত্যিই বদলে গেছে।
একসময় যার চোখেমুখে সারাক্ষণ দুষ্টুমি লেগে থাকতো, যে কোনো কথা না বলেই থাকতে পারতো না, আজ সেই মেয়েটাই কতটা নিশ্চুপ হয়ে গেছে! হাসতে গেলেও যেন আগে ভাবতে হয় তাকে। কথা বলতে গেলেও বুকের ভেতর কোথায় যেন একটা ভয় কাজ করে।এই পরিবর্তনের জন্য কে দায়ী?প্রশ্নটার উত্তর সায়রের অজানা নয়।

সে জানে, এই বিয়ে বেলার জীবনের সমস্ত হিসাব-নিকাশ এক মুহূর্তে বদলে দিয়েছে। নিজের স্বপ্ন, নিজের ইচ্ছা, নিজের ভবিষ্যৎ সবকিছু ত্যাগ করে পরিস্থিতির চাপে তাকে এই সম্পর্ক মেনে নিতে হয়েছে।সায়রের বুকের ভেতর হঠাৎ অপরাধবোধের একটা ভারী অনুভূতি জমে উঠলো।সে ধীরে ধীরে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো।বাইরে চাঁদের আলোয় বাগানের ফুলগুলো অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। রাতের শীতল বাতাস এসে তার মুখ ছুঁয়ে যাচ্ছে।সে নিচু স্বরে বললো,
—আমি জানি না তুই আমাকে কোনোদিন মন থেকে গ্রহণ করতে পারবি কি না, বেলা। কিন্তু একটা কথা আমি নিশ্চিত আমি কখনো তোর কষ্টের কারণ হতে চাই না।
তার চোখের সামনে আবার ভেসে উঠলো কিছুক্ষণ আগের দৃশ্যটা।মমতাজ বেগম ইচ্ছে করেই বেলাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করলেন। অথচ বেলা একটি কথাও বললো না। শুধু নিঃশব্দে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো।সেই নীরবতাই সায়রের বুকের ভেতরটা খাঁ খাঁ করছে।সে মনে মনে ভাবলো,
—-আগে হলে নিশ্চয়ই রেগে যেতো। মুখ ভার করে সবার সঙ্গে ঝগড়া করতো। কিন্তু আজ যেন নিজের সমস্ত অভিমানটুকুও লুকিয়ে ফেলেছে।
ঠিক তখনই দরজায় খুব আস্তে টোকা পড়লো।টক… টক…সায়র ঘুরে তাকিয়ে বলে,

—ভিতরে আসো ।
দরজা খুলে ধীর পায়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন সারোয়ার খান।মুখে আগের মতোই গাম্ভীর্য, কিন্তু চোখে ছিল গভীর স্নেহের ছাপ।
সায়র দ্রুত উঠে দাঁড়ালো।
—আব্বু, তুমি? এই সময়?
সারোয়ার খান হালকা হেসে বললেন,
—ঘুম আসছিলো না। ভাবলাম, তোর সঙ্গে একটু কথা বলে যাই।
তিনি ধীরে ধীরে সোফায় বসে পড়লেন। সায়রও তাঁর সামনের চেয়ারে বসলো ।কয়েক মুহূর্ত দু’জনেই চুপ করে রইলো।তারপর সারোয়ার খান ধীরে বললেন,
—সারাদিন তোদের দু’জনকে খুব মন দিয়ে দেখলাম।
সায়র ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
—কী দেখলে?
—-দেখলাম, তোরা দু’জনই চেষ্টা করছিস। কেউ কারও ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দিচ্ছিস না। সম্পর্কটা জোর করে এগিয়ে নিতে চাইছিস না। এই ধৈর্যটাই সবচেয়ে বড় জিনিস।
সায়র নীরবে শুনতে লাগলো।সারোয়ার খান এবার একটু গম্ভীর হয়ে বললেন,

—একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে এসেছি।
—জি, বলো।
—আগামীকাল থেকেই বেলাকে বলবি, সে যেন তোর রুমেই থাকে।
কথাটা শুনে সায়র একটু থমকে গেল।
—এখনই?
—হ্যাঁ। এখনই।
সায়র কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলো।সারোয়ার খান ছেলের মনের দ্বিধা বুঝতে পেরে শান্ত গলায় বললেন,
—আমি জানি, তোরা দু’জনেই সময় চাস। আমি এটাও জানি, তোরা এখনও একে অপরকে পুরোপুরি স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারিসনি। আমি তোকে কোনো সম্পর্ক জোর করে তৈরি করতে বলছি না। আমি শুধু চাই, আমার মেয়েটা নিরাপদ থাকুক ।
একটু থেমে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

—তোর মাকে তো তুই চিনিসই।তিনি সহজে বেলাকে মেনে নেবেন না। আজ যা দেখলি, এটা শুধু কেবল শুরু। সামনে আরও অনেক রকম কথা, অনেক রকম আচরণ দেখতে হতে পারে।
সায়রের মুখটা কঠিন হয়ে উঠলো।
সারোয়ার খান ধীরে ধীরে বললেন,
— আমি চাই তুই সবসময় বেলাকে সাপোর্ট করিস।
ঘরের বাতাসটা যেন আরও ভারী হয়ে উঠলো।সায়র শান্ত গলায় বললো,
—আমি চেষ্টা করবো, আব্বু।
সারোয়ার খান ছেলের কাঁধে হাত রেখে বললেন,
—-চেষ্টা না, দায়িত্ব।
এই একটা শব্দের মধ্যেই যেন হাজারটা অর্থ লুকিয়ে ছিল।তিনি আবার বলতে শুরু করলেন,
—আজ একটা কথা তোকে বলি, যেটা এতোদিন কাউকে বলিনি।
সায়র বিস্মিত হয়ে বাবার দিকে তাকালো।সারোয়ার খান মৃদু হেসে বললেন,
—অনেক আগে থেকেই আমার ইচ্ছে ছিলো, যদি কখনো সুযোগ হয়, তাহলে বেলাকেই তোর বউ করে রাখবো।
সায়রের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেলো,

— তুমি আগে থেকেই?
—হ্যাঁ।
—কিন্তু কখনো তো বলোনি!
সারোয়ার খান ম্লান হেসে উত্তর দিলেন,
—বলতে পারিনি।
—কেন?
সারোয়ার খান দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীর কণ্ঠে বললেন,
–কারণ আমি জানতাম, তোর মা কোনোদিন এই প্রস্তাবে রাজি হবেন না। বাশারের প্রতি তাঁর মনে যে অভিমান আর ঘৃণা জন্ম নিয়েছিলো, এত বছরেও সেটা একটুও কমেনি। সেই রাগের প্রভাব পড়েছে নাজনীন আর বেলার ওপরও। নাজনীনকে তিনি কোনোদিন মন থেকে আপন ভাবতে পারেননি, আর বেলাকে তো প্রথম দিন থেকেই ভুল বুঝে এসেছেন। এমনকি বিহানকেও খুব একটা পছন্দ করেনা, যদিও সেটা প্রকাশ করেন না।
তিনি কিছুক্ষণ থেমে আবার বললেন,

—ছোটবেলা থেকে তুই বেলার প্রতি একটু বেশি যত্নশীল , আর সেটাকেই তোর মা অন্য চোখে দেখতে শুরু করেছিলেন। তিনি মনে করতেন, বেলা ইচ্ছে করেই সবসময় তোর আশেপাশে থাকে। আমি বহুবার বোঝানোর চেষ্টা করেছি যে ওদের সম্পর্কটা একেবারেই নিষ্পাপ, কিন্তু তিনি কিছুতেই নিজের ধারণা বদলাতে চাননি।তাই নিজের ইচ্ছাটা নিজের মনেই চাপা দিয়ে রেখেছিলাম। এই বিষয়টা নিয়ে কথা বললে সংসারে শুধু অশান্তই বাড়বে। কিন্তু দেখ, মানুষের পরিকল্পনার চেয়ে আল্লাহর ফয়সালা কত বড়। আমি যে কথাটা মুখে বলতে পারিনি, আল্লাহ সেটাই এমনভাবে লিখে রেখেছিলেন যে, শেষ পর্যন্ত তোদের দু’জনের বিয়ে হয়েই গেলো। তাই আজ আর অতীত নিয়ে আফসোস করার সময় নেই। বেলাকে যেন আর কোনো অন্যায়ের মুখোমুখি হতে না হয়। আর সেই দায়িত্বটা আজ থেকে সম্পূর্ণ তোর।
সায়র ধীরে ধীরে মাথা নিচু করলো।
সারোয়ার খান এবার দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,

—এই বিয়ে কেবল একটা সামাজিক সম্পর্ক নয়, সায়র। এই সম্পর্কের সঙ্গে একটা মেয়ের সম্মান, নিরাপত্তা আর ভবিষ্যৎ জড়িয়ে আছে। আজ থেকে বেলার সবচেয়ে বড় আশ্রয় তুই। তাই ওর মুখের হাসিটা ফিরিয়ে আনার দায়িত্বও তোর, আর ওকে সব ধরনের কষ্ট থেকে আগলে রাখার দায়িত্বও তোর।
সায়রের বুকের ভেতরটা কেমন ভারী হয়ে উঠলো।সে ধীরে ধীরে বললো,
—আমি কথা দিচ্ছি, আব্বু। যতদিন আমি বেঁচে আছি, বেলার গায়ে কাউকে অন্যায়ভাবে একটা আঁচড়ও কা’টতে দেব না। ওর সম্মান, নিরাপত্তা রক্ষা করার জন্য যতটুকু করা দরকার, আমি করবো।
সারোয়ার খানের চোখে তৃপ্তির ছাপ ফুটে উঠলো।তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,
—এই কথাটাই শুনতে চেয়েছিলাম।
দরজার দিকে কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে আবার থেমে ছেলের দিকে ফিরে তাকিয়ে বললেন,

—আর একটা কথা মনে রাখিস।ভালোবাসা কখনো জোর করে আদায় করা যায় না। কিন্তু সম্মান, বিশ্বাস আর যত্ন দিয়ে মানুষের মন জয় করা যায়। তুই যদি কোনোদিন বেলার কাছ থেকে সত্যিকারের ভালোবাসা দেখতে চাস, তাহলে স্বামী হিসেবে অধিকার দেখানোর আগে একজন দায়িত্বশীল পুরুষ হয়ে তার পাশে দাঁড়াস। দেখবি, একদিন বেলা নিজের ইচ্ছায় তোর হাতটা শক্ত করে ধরে রাখবে।
কথাগুলো বলে সারোয়ার খান ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দে ঘরটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেলো।সায়র অনেকক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।তারপর জানালার বাইরে চাঁদের আলোয় ভেসে থাকা আকাশের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বললো,
—আমি কোনো তাড়াহুড়ো করবো না, বেলা। তোর বিশ্বাসটা অর্জন করেই একদিন তোর পাশে দাঁড়াবো। কারণ সম্পর্কের সবচেয়ে সুন্দর ভিত্তি ভালোবাসা নয় বিশ্বাস।

পরদিন সকালে,
খান বাড়ির বিশাল ডাইনিং রুমে সকালের নাস্তার আয়োজন করা হয়েছে। বড় কাঁচের জানালা দিয়ে নরম রোদের আলো ঢুকে পুরো ঘরটাকে আলোকিত করে তুলেছে। টেবিলের ওপর সারি করে সাজানো রয়েছে পরোটা, সবজি, ডিম, ফল আর ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ। অন্যদিনের মতো সবাই একে একে টেবিলে এসে বসেছে। বাইরে থেকে দেখলে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও, প্রত্যেকের মনের ভেতর যেন অদৃশ্য এক টানটান উত্তেজনা কাজ করছে।
সারোয়ার খান টেবিলের একপ্রান্তে গম্ভীর মুখে বসে খবরের কাগজে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিলেন। তাঁর মুখের শান্ত ভাবটা দেখে বোঝার উপায় নেই, তিনি মনে মনে ইতোমধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন।
মমতাজ বেগম নিঃশব্দে সবার সামনে নাস্তা পরিবেশন করছেন। তাঁর মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, তবে চোখেমুখের কঠোরতা স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছে মনের ভেতরের ক্ষোভ এতটুকুও কমেনি।সায়র চুপচাপ নিজের জায়গায় বসে আছে। বেলা ধীরে ধীরে ডাইনিং রুমে প্রবেশ করলো। মাথায় ওড়না টেনে, চোখ নিচু করে সবার দিকে সালাম জানিয়ে খুব শান্তভাবে চেয়ারে বসে পড়লো। তার ভেতরে এখনও সংকোচ কাজ করছে।
এদিকে ,বাশার খান আর নাজনীন সুলতানাও নীরবে নাস্তা করছিলেন। তাঁরা দু’জনেই মেয়ের মুখের দিকে বারবার তাকাচ্ছিলেন। বাবা-মায়ের চোখ এড়িয়ে যায় না সন্তানের মনের অবস্থা। বেলার মুখের নীরবতা তাঁদের বুকেও কষ্টের রেখা এঁকে দিচ্ছিলো।কিছুক্ষণ শুধু থালা-বাসনের শব্দ ছাড়া আর কোনো কথা শোনা গেলো না।হঠাৎ সারোয়ার খান খবরের কাগজটা ভাঁজ করে টেবিলের ওপর রেখে শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,

—একটা কথা বলার ছিল।
সঙ্গে সঙ্গে সবাই তাঁর দিকে তাকালো।তিনি ধীরে ধীরে বেলার দিকে দৃষ্টি স্থির করে বললেন,
—বেলা, আজ থেকেই তুই সায়রের রুমে থাকবি।
একটি মাত্র বাক্য।কিন্তু সেই বাক্য যেন পুরো ডাইনিং রুমের পরিবেশ মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ করে দিলো।নাজনীন সুলতানা বিস্ময়ে চোখ বড় করে মেয়ের দিকে তাকালেন।বাশার খানও কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে বসে রইলেন। যদিও জানতেন, বিয়ের পর একসময় এমনটা হবেই, তবুও এত দ্রুত সিদ্ধান্তটা আসবে, সেটা তিনি ভাবেননি।বেলার হাত থেকে চামচটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিলো। সে বিস্মিত চোখে সারোয়ার খানের দিকে তাকিয়ে রইলো।কয়েক সেকেন্ড পর খুব ধীরে বললো,

— চাচ্চু আমি…
সারোয়ার খান শান্ত স্বরে বললেন,
—কিছু বলতে চাস?
বেলা মাথা নিচু করে কাঁপা গলায় বললো,
—আমিআমি এখনই ওখানে থাকতে চাই না।
কথাটা বলেই সে সংকোচে চুপ করে গেলো।ডাইনিং টেবিলে আবারও নীরবতা নেমে এলো।
সায়রও মাথা তুলে বাবার দিকে তাকালো। সে বুঝতে পারছিল, বেলা অস্বস্তিতে আছে।ঠিক তখনই সারোয়ার খান খুব স্থির কণ্ঠে বললেন,
—আমি তোর অস্বস্তিটা বুঝি, মা। কিন্তু জীবনের কিছু সত্যি এড়িয়ে যাওয়া যায় না। সায়র তোর স্বামী। আলাদা আলাদা ঘরে থাকার কোনো যৌক্তিক কারণ আমি দেখি না।
বেলা খুব আস্তে বললো,

—কিন্তু…
তিনি এবার কথার মাঝখানেই থামিয়ে দিলেন।
—না, বেলা। এই বিষয় নিয়ে আর কোনো আপত্তি শুনতে চাই না।
তাঁর কণ্ঠে রাগ ছিলো না, কিন্তু এমন এক দৃঢ়তা ছিলো, যা অমান্য করার সাহস কারও নেই।তিনি আরও বললেন,
—আমি তোকে কোনো চাপ দিচ্ছি না। আমি শুধু চাই, তোরা স্বাভাবিকভাবে নিজেদের সম্পর্কটাকে সময় দিতে শিখিস। একই ঘরে থাকা মানেই সবকিছু বদলে যাবে এমন নয়। কিন্তু একে অপরকে বোঝার সুযোগটা তো তৈরি হবে।
বাশার খান ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।
–আমি মনে করি, ভাইজান ঠিকই বলেছেন। সম্পর্ককে সময় দিতে হলে দূরত্ব নয়, পারস্পরিক বিশ্বাস দরকার।
নাজনীন সুলতানা মেয়ের দিকে তাকিয়ে মমতাভরা কণ্ঠে বললেন,
— বড়দের কথা শুনতে হয় মা।
বেলা কোনো উত্তর দিলো না।সে শুধু একবার খুব আস্তে সায়রের দিকে তাকালো।সায়রও ঠিক সেই মুহূর্তে তার দিকে তাকিয়েছিলো।দু’জনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য মিললো।সায়র খুব অল্প করে আশ্বাসের ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো, যেন নীরবে বলছে,

—ভয় পাস না। তোর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছুই হবে না।
সেই ছোট্ট আশ্বাসটুকু বেলার অস্থির মনকে খানিকটা শান্ত করলেও, সংকোচ পুরোপুরি কা’টলো না।
অন্যদিকে মমতাজ বেগম এতক্ষণ একটিও কথা বলেননি।তাঁর মুখের কঠোরতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ঠোঁট শক্ত করে চেপে রেখেছেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত তাঁর একেবারেই পছন্দ হয়নি।মনের ভেতর প্রবল আপত্তি থাকলেও তিনি জানেন, সারোয়ার খানের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সবার সামনে কথা বললে সংসারে নতুন অশান্তি তৈরি হবে। আর তিনি এটাও ভালো করেই জানেন, একবার কোনো বিষয়ে সারোয়ার খান সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে তা পরিবর্তন করানো প্রায় অসম্ভব।তাই তিনি শুধু নীরবে বসে রইলেন।কিন্তু তাঁর চোখের দৃষ্টি বারবার বেলার দিকে ছুটে যাচ্ছিলো। সেই দৃষ্টিতে ছিলো অস্বীকৃতি, ক্ষো’ভ এবং এক নীরব প্রতিজ্ঞা।তিনি এখনও এই মেয়েটিকে তাঁর পুত্রবধূ হিসেবে মন থেকে মেনে নেননি।আর না কখনো মানবেন।
সবশেষে সারোয়ার খান শান্ত অথচ দৃঢ় স্বরে বললেন,

র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ২৬

—এই বিষয় নিয়ে আর কোনো আলোচনা হবে না। আজ বিকেলের মধ্যেই বেলার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সায়রের ঘরে নিয়ে দিস বাশার। এটাই আমার শেষ সিদ্ধান্ত।
কথাটা বলেই তিনি আবার নীরবে নাস্তা করতে শুরু করলেন।কিন্তু টেবিলে বসে থাকা বাকিদের আর কারও পক্ষেই স্বাভাবিকভাবে নাস্তা করা সম্ভব হলো না। প্রত্যেকেই বুঝতে পারছিলো।আজকের এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি ঘর বদলের নয়।এটি হয়তো সায়র আর বেলার সম্পর্কের নতুন অধ্যায়েরও সূচনা।

র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ২৮