Home রাগে অনুরাগে রাগে অনুরাগে পর্ব ২০

রাগে অনুরাগে পর্ব ২০

রাগে অনুরাগে পর্ব ২০
সুহাসিনি ফাতেহা

সকালে ঘুম থেকে উঠেও তিতলি আরো একঘন্টা ধরে কোলবালিশ জড়িয়ে বিছানার এপাশ থেকে ওপাশে গড়াগড়ি খাচ্ছে। একটা সুন্দর স্বপ্ন দেখছে। এতটাই সুন্দর,রোমান্টিক যে চাইলেও এই স্বপ্ন থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। দেখছে সে ফারাজের গায়ের উপর দু পা পেঁচিয়ে আরামে ঘুমাচ্ছে। ফারাজ বিরক্ত হয়ে বলল,

“এসব কেমন ঘুম! পা নামাও বলছি!”
তিতলি কোলবালিশ আরো জড়িয়ে ফিসফিসিয়ে বলে , নামাবো না। টুনাটুনিদের বাপের উপরই ঘুমাবো হ্যাঁ!” একটু…একটু আদর করুন না। নিজের কথা যেন নিজেই শুনতে পেলো মেয়েটা। চোখ বন্ধের মধ্যে লজ্জায় মেয়েটা লালনীল, গোলাপি হয়ে উঠছে। ধরফড় করে চোখ খুলল । কোলবালিশ এখনো বুকে জড়ানো। ঘুমঘুম চোখে সহসা বিড়বিড় করে বলে,
“আল্লাহ! ওই ভাল্লুক টা মনে হয় আমাকে পাবনা পাঠায় দিবে।” বলে একটু লজ্জা পাওয়ার ভান করে দুহাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলল। সে-কি লজ্জা!

যদিও সে অনেক সময় ফারাজকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে ঘুমায় যার ফলস্বরুপ স্বপ্নেও ফারাজকে দেখে। কিন্তু আজ একটু বেশি বেশি দেখলো না? পরক্ষণেই সপ্তদশীর মন খারাপ হয়। রাতে ঘুমানোর আগে নাক টানতে টানতে বালিশ ভিজিয়ে কেঁদেছে। পাষান লোকটার মন পাওয়ার জন্য এত চেষ্টা করলো তাও মন পাইলো না। ইসস্ যদি স্বপ্নটা সত্যি হতো কতই না ভালো হতো। আসলেই ভাল্লুকটা তাকে একটুও বুঝে না। সে চাই লোকটা তাকে একটু বুঝুক! আদর করে রোমান্টিক কথা বলুক!
তিতলি ভাবনার মাঝেই দরজায় ধাক্কা দিয়ে আলেয়া শেখ গলা ছেড়ে ডাক দিলেন,
“এই তিতলি? এখনো ঘুম থেকে উঠিস নি?”
মায়ের ডাকে তিতলির ভাবনার রেশ কেটে গেলো। তৎক্ষণাৎ বিছানা থেকে নেমে দরজা খোলে দিয়ে বলল,
“উঠে গেছি আম্মু!”
আলেয়া শেখ কিছুক্ষণ মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“এত দেরি করে কেউ ঘুম থেকে উঠে? আরো একবার ডেকে গেছি।”
“আমি শুনি নাই আম্মু!”
আলেয়া শেখ কিছু না বলে মেয়ের রুমে ঢুকে বিছানা গুছিয়ে দিলেন। মেয়েটা তার বিছানা গুছানো থেকে উল্টো আগাছোলা করার জন্যই ভিষণ পন্ডিত। বিছানা গুছানো শেষে বললেন,
“নাস্তা করবি তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে আয়!”
“আসতেছি, আসতেছি!”
মা চলে যেতেই তিতলি দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকালো। আসলেই ঘড়ির কাঁটা দশটার কাছাকাছি। দৌড়ে ওয়াশরুমে চলে গেলো।

আজকে শুক্রবার। স্কুল, কলেজ, অফিস,আদালত যত সরকারী প্রতিষ্ঠান আছে সব বন্ধ। তৌসিফ শেখ বাসায় আছেন। সোফায় বসে বসে বেশ দুঃশ্চিন্তায় ভুগছেন। রাতেও আফজাল খানের সাথে কথা বলে এসেছেন। সঠিক কথা জানাতে পারেন নি। মন মানছে না ভদ্রলোকের। তার মেয়েটা এখনো তার চোখে বাচ্চা। একটু বেশি চঞ্চল লাফালাফি করার স্বভাব ! তিনি চান মেয়েটা আরেকটু বড় হোক। সবকিছু বুঝুক। পড়ালেখা করুক! তারপর বিয়ে দিবেন।
আলেয়া শেখ নিচে নেমে স্বামীকে একমনে কিছু ভাবতে দেখে বললেন,
“তিতলির বিয়ের ব্যাপারে কিছু ভেবেছেন?”
স্ত্রীর কথা শুনে তৌসিফ শেখ ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে বললেন,
“অনেক ভেবেছি আলেয়া! আমি আফজাল খানকে কি বলবো বুঝতে পারছি না। আফজাল খান শুধু ফোন করছেন।”

আলেয়া শেখ স্বামীকে বললেন,
“ওনাদের বাড়িতে আসতে বলেন! আমরা একসাথে নিজেদের মধ্যে কথা বলে দেখি।
ওনাদের নাকি কোনো আপত্তি নেই। তিতলিকে আগে দেখেছে। ছেলেকে অনেক কষ্টে এবার বিয়ে করাতে রাজি করেছেন। এবার যদি রাজি করাতে পেরেও বিয়ে করাতে না পারেন তাহলে আর পারবেন কিনা..”
আলেয়া শেখ স্বামীর কথা শেষ হওয়ার পূর্বেই সন্দেহের গলায় বললেন,
আমার মনে হয় ছেলের মাঝে কোনো সমস্যা আছে! না হলে বিয়ে করতে চাইছে না কেন?
আহ চুপ করো তো। ফারাজ ছেলে দেখতে শুনতে ভালো, টিচার। ওর মাঝে কোনো সমস্যা নেই। আমি অনেক সময় কথা বলেছি তিতলিকে কলেজে দিতে গিয়ে।
সব তো আপনি বলেন। যদি আমাদের তিতলির জন্য উপযুক্ত ছেলে হয় তাহলে হ্যাঁ বলে দেন।
তৌসিফ শেখ সোজা বললেন,
আমার মেয়েকে আমি বিয়ে দিলেও দু বছর নিজের বাড়ি রাখবো। এটা বললে রাজি হলে হবে না হলে নেই। আগে মেয়ে আরেকটু বড় হোক তারপর না হয় সে বাড়ি দিবো।
আলেয়া শেখ উঠে চলে যেতে যেতে বিড়বিড় করে বললেন,
মেয়ের বিয়ের কথা শুনলেই দরদ উথলায় পড়ে। নিজে যুবককালে আমারে না পাইলে পাগল হয়ে যাইতো এখন মেয়ের বেলায় সাদু সাজে..”

তৌসিফ শেখ আনমনে হেসে দিলেন। স্ত্রীকে অনেক ভালোবাসেন। যুবক কালে আসলে তিনিও স্ত্রী ছাড়া কিছু বুঝতেন না। স্ত্রী আর মেয়ের মধ্যে তিনি অনেকটা মিল খুঁজে পান। চঞ্চল জেদি আর একটু রাগী, ভালোবাসতো পাগলের মতো।
তখন তিতলিও নেমে এলো। এসে চুপচাপ নাস্তা করতে চেয়ার টেনে বসে গেলো। একটা একটা ব্রেড আলগোছে নিয়ে সেটা কাঁটাচামচ দিয়ে ধীরেসুস্থে খাচ্ছে৷ সে ভেবেচিন্তে নিয়েছে, নিজেকে ফারাজের মনের মতোন করার টিপস শুরু করবে। ভীষন ভদ্র, গম্ভীর, রাগী, ধীরসুস্থে কাজ করা,অনেক সুন্দর করে কথা বলার টিপস শিখতে হবে। সামনে থেকে কলেজে গেলে এসব টিপস শুরু করবে। তার এই পরিবর্তন দেখে নিশ্চয় ওই লোক তার প্রেমে পড়বে।
সহসা তৌসিফ শেখ মেয়ের হাতে ছিঁলে যাওয়া দাগ দেখে চিন্তার সুরে বললেন,
হাতে দাগ কিসের আম্মু!
তিতলির খাওয়া থেমে গেলো। মনে পড়লো গাছ থেকে দ্রুত নামার সময় কিভাবে যেন ছিঁলে গেছে। এটা বাবাকে বললে বাবা তাকে অনেক বকবে।
তাই বলল,

বিড়ালের নখ লেগেছে আব্বু!
তৌসিফ শেখ মেয়ের কথা বিশ্বাস করলেন না। বিড়ালের নখের দাগ কিছুতেই এমন হয় না।
তাও বললেন,
বিড়ালের আছড় লাগলে তো ইনজেক্শন দিতে হবে আম্মু!
তিতলি ভয়ে খাওয়া ছেড়ে উঠে দাড়ালো। খাওয়া শেষ। ইনজেক্শন কে সে ভীষন ভয় পায়। বাবাকে তো বলছে বিড়ালের নখ লেগেছে এখন কি বলবে? এবার কি মুরগীর আছড় লেগেছে বলবে? না ওটাও বিশ্বাস করবে না। কারণ কোনো মুরগী নেই।
এবার বেশ ভেবেচিন্তে বলল,
ভুল বলছি বিড়ালের না খোরগশের নখ আব্বু।
তৌসিফ শেখ আর কিছু বললেন না। মেয়ের মতিগতি বুঝা দায়। তখনি আবার ফোন বেজে উঠলো ওনার। স্ক্রিনে তাকিয়ে মেয়ের পানে একবার চাইলেন।
তিতলি বাবাকে ফোন ধরতে না দেখে বলল,
কে ফোন দিয়েছে আব্বু? ধরছো না কেন?
ধরতেছি তুমি রুমে যাও আম্মু!
তিতলি বাবার কথায় মেনে নিয়ে রুমে চলে গেলো।

খান বাড়ির ভেতরের পরিস্থিতি গুমোট এবং গম্ভীর৷ আফজাল খান সোফায় বসে। পাশে অয়ন বসে আছে। অয়নকে কিছু বলবেন আফজাল খান। অনেকক্ষণ পর বললেন,
তোর বন্ধু তুষারের বোনের জন্য আমাদের ফারাজের কথা বলছিলাম।
অয়ন অনেক আগ্রহ নিয়ে চাচার কথা শুনার জন্য বসে ছিলো। এমন কথা শুনবে ওটা কিছুতেই কল্পনা করেনি। সহসা বুকের ভেতরে কেউ যেন আগুন লাগিয়ে দিলো। কথা বলার ভাষা খুঁজে পেলো না ছেলেটা।
তাও মুখ অন্ধকার করে ছোট করে উত্তর দিলো,
“ওহহ!”
“কি ওহহ তুই ও তাদের বলে রাজি করা। এতদিন তো ফারাজ ভাইয়ের বিয়ে কখন হবে বলে নাচছালি। এখন ফারাজ বিয়ের জন্য রাজি হয়ছে।”

অয়ন ঠিকই ফারাজ ভাই বিয়ে করুক সেটা খুব করে চাই। কিন্তু তিতলিকে করুক এমনটাতো চাই না। কেন এত খারাপ লাগছে? নিজের মনকে শান্ত করে বলল,
তাহলে তো ভালো কথা চাচ্চু! তিতলি খুব ভালো মেয়ে। আঙ্কেলের সাথে কথা বলছেন?
ফারাজ খান কোথায় ও যাওয়ার জন্য শার্টের হাতা কুনই পর্যন্ত ভাঁজ করতে করতে নিচে নামছিলেন। তিতলি নামটা শ্রাবনইন্দীয় পৌঁছাতেই যুবকের মস্তিষ্কে জোড়ে বারবার প্রতিধ্বনিত হলো যেন। সহসা চোখের সামনে নিজের চেনা-জানা বেয়াদব এক মেয়ের মুখ ভেসে উঠলো। যুবক নিজের অনুভূতি নিয়ে বিরক্ত। অনুভূতিরা ও যেন আজ নিজের সাথে বেইমানি করে। ওই বেয়াদব মেয়ে তাকে এতটাই তীব্রভাবে নিজের দিকে টানছে যে অজান্তেই মেয়েটার কথা ভাবে। যেটা সে চাচ্ছে না। একদমই চাচ্ছে না। মেয়েটা তার কথা না শুনলে , ডাকলে না আসলে, তার দিকে চোখ তুলে না তাকালে তার ভীষণ রাগ হয়। তখন ইচ্ছে করে দুইটা চড় দিয়ে মনটা শান্ত করতে। মেয়েটা তাকে জ্বালায়। খুব জ্বালায়। তারও ইচ্ছে করে মেয়েটাকে অনেক জ্বালাতে, বকা দিতে আরো অনেককিছু। কিন্তু নিজের মন বাধা দেয়।
অয়ন ফারাজকে আসতে দেখে মন খারাপের মাঝেও খুশি মনে বলল,

ফারাজ ভাই আপনি নাকি বিয়ে করবেন?
অয়নের কথা শুনে ফারাজের ইচ্ছে হলো অয়নকে ইচ্ছেমতে পিটাতে। শক্ত মেজাজে বলল,
শুনেছিস যেহেতু তাহলে আবার বলছিস কেন? তোর মন চাইলে তুইও করে পেল।
অয়ন,বলেছে ফারাজ ভাই আসলে সত্যি বিয়ে করবে কিনা তা জানতে, আর ফারাজ ভাই উল্টো তাকেও বিয়ে করতে বলছে? ফারাজ ভাই কি জানে পাত্রী তিতলি? নাকি জানেনা। অয়ন ভাবুক হয়ে বলল,
তিতলিকে নাকি আপনি পছন্দ করেছেন ফারাজ ভাই! কথাটা কি সত্যি?
ফারাজ কয়েক মিনিট ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করলো কথাটা? সে কোন তিতলিকে পছন্দ করেছে? আর কখন বলছে এসব? কোনোভাবেই কি ওই বেয়াদব মেয়েটার কথা বলছে? তবে সে যে হবেই হোক তার বাবা মা যেহেতু সবাইকে হেসেহেসে বলে বেড়াচ্ছে সে পছন্দ করেছে তাই যু্বক কপাল কুঁচকে রেখে বলল,
“হুমম!”

বলে যুবক আর একমুহূর্ত না দাড়িয়ে হনহনিয়ে সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলো।
অয়ন অবাক হলো বৈকি। ফারাজ ভাইতো কখনো কোনো মেয়ের দিকে ভালো করে তাকানই নাই। আর সেখানে তিতলিকে পছন্দ করেছে? অয়নের বিশ্বাস হলো না। তাও বিশ্বাস করতে হলো। কারণ ফারাজ ভাই বলছে মানে সেটাই ঠিক।
আফজাল খান বেশ ভালোই বুঝলেন ছেলে রাগের মাথায় বলেছে। কারণ মেয়ে কে সেটাই তো ছেলেকে এখনো বলতে পারেন নি। তবে আজ আসুক খোলামেলা কথা বলবেন ছেলের সাথে। তার আগে ছেলের মেজাজ ভালো হোক। এখন ছেলে হ্যাঁ বলছে। কিন্তু হ্যাঁ তো হ্যাঁ-ই । এই হ্যাঁ–কেই তাদের কাজে লাগাতে হবে। ফারিন বেগম ট্রেতে চা নাস্তা এনে সেন্টার টেবিলে রেখে অয়নকে বললেন,
চা নাস্তা নে অয়ন। কখনো তো আসোছ না।
অয়নের মনটা খারাপ। তাও জোর করে ঠোঁঠের কোণে হাসি এনে বলল,

রাগে অনুরাগে পর্ব ১৯

আসলাম তো চাচিমনি।
ফারিন বেগম তাও থামলেন না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনমরা করে আবারও বললেন,
তোর বন্ধু তুষারের বোন আছে না ওকে ফারাজের জন্য চাইছি। আমাদের ফারাজের কি কম আছে কোনদিক দিয়ে? তুই একটু তুষারকে বুঝিয়ে বলিস। যদি ভেবে দেখতো।
অয়ন ভাঙা গলায় আশ্বাস দিয়ে বলল,
“আমি বলবো চাচিমনি।”
এর মাঝেই সহসা আফজাল খানের ফোন বেজে উঠলো!

রাগে অনুরাগে পর্ব ২১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here