Home রাগে অনুরাগে রাগে অনুরাগে পর্ব ৪৩

রাগে অনুরাগে পর্ব ৪৩

রাগে অনুরাগে পর্ব ৪৩
সুহাসিনি ফাতেহা

“ও তাই? গন্ধ টা শুধু নাকেই সীমাবদ্ধ থাকুক সেটা তুমি চাওনা তাইতো? ওকে ফাইন,আজকে একটু সিগারেটের গন্ধ সহ্য করে নিতে পারবে।”
তিতলি পেলব ঝাপটে ফারাজের চোখে চোখ রাখল। ফারাজের দু’চোখের কোণ এখনো লাল হয়ে আছে। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপাল পর্যন্ত ঠেঁকেছে। পরিপাটি মানুষটার ওমন এলোমেলো রুপ তিতলির কাছে আজ নতুন। এত সুন্দর লাগছে কেন ইশশ্, সপ্তদশীর কিশোরী মনে খুব করে ইচ্ছে জাগলো হাত বাড়িয়ে চুলগুলো ঠিক করে দিতে। ফারাজ এখনো তার মুখের একদম কাছে মুখ নিয়ে চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে আছে। তার নেওয়া বড়বড় নিশ্বাস গুলো এখনো আগের ন্যায় তিতলির মুখের উপর চলমান। বলা যায় ইচ্ছে করেই এমন করছে ফারাজ। যেমন উত্তরের অপেক্ষা করছে।

তিতলি কানের পিঠে চুল গুঁজল লাজুক ভঙ্গিতে। সুযোগ বুঝে ভয়ডর সব ভুলে গিয়ে ধীরলয়ে হাত বাড়িয়ে দিলো ফারাজের চুলে। চিকন চিকন আঙুলের সাহায্য কপালের চুলগুলো পেছনে ঠেলে দিতেই আবেশে চোখদুটো আপনাআপনি বুঁজে নিলো যুবক। শুকনো অধরজোড়া জিভ ঠেলে খানিকটা ভিজিয়ে নিয়ে খুব সময় নিয়ে ফের চোখ খুলে তাকালো রমণীর পানে। তিতলি সে চোখে দৃষ্টি রাখতে পারল না। ওভাবে তাকালো কেন? চোখ নামিয়ে মিনমিনে আওয়াজে বলল,
“আগে বলুন আপনার রাগ কমেছে?’
ফারাজের চোখের দৃষ্টি বড্ড শীতল। চোখদুটোতে তার সে-কি সন্দিহান ভাব। ভাবছে, এইটুকুন একটা পিচ্চি মেয়ে, তার মধ্যে ঠিক কতটুকু সাহস থাকলে তার এত রাগ দেখেও ভয় না পেয়ে উল্টো তাকে সামলে নিতে চাচ্ছে। যেখানে তার রাগ উঠলে ভয়ে কেউ তার আশেপাশে থাকতে চাইনা। আশ্চর্য ভাবে কাজটা তার বড্ড ভালো লেগেছে। সে কিছু না বলে আচানক তিতলির ঈশুর তুলতুলে নরম পায়ের উপর আলগোছে নিজের শক্ত পা দুটো রাখল। বউকে একটু জ্বালানোর জন্য কন্ঠে রাগ মিশ্রণ করে শক্ত কন্ঠে ফারাজ জবাব দিলো,

“না!”
তিতলি চোখ পিটপিট করে তাকালো। যেহেতু সে রাগিয়ে দিয়েছে সেহেতু রাগ ভাঙিয়ে দেখিয়ে দেওয়া দরকার সে কতটা আদর্শ স্ত্রী। ফারাজের পায়ের নিচে থাকা পাদুটো নড়চে তার। নাক টেনে প্রশ্ন করে বসলো,
“আপনার রাগ এত বেশি কেন?’
গালের ভাঁজে জিভ ঠেলল ফারাজ। পরপরই ধারালো দাঁতের চাপায় পিষ্ট করল নিজ নিম্নাংশের ঠোঁট। কন্ঠে গম্ভীরতার প্রলেপ লেপে আওড়াল,
“শুধু রাগ নয়, আমার আরও অনেককিছুই বেশি।”
“আরও অনেককিছু সেগুলো কি কি?”
“দেখতে চাও নাকি ? তুমি চাইলে এক্সপেরিমেন্ট করিয়ে দেখাতে পারি!”

কথাটা বলে ফারাজ তিতলিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নিজ বলিষ্ঠ হাতের হেঁচকা টানে চেয়ার থেকে উঠিয়ে এনে নিজের দু উরুর উপর বসিয়ে আঁটকে নিলো রমণীর মেদহীন বাঁকানো কোমর। তুলোর সমেত মানবীকে নিজের উদোম দেহের সাথে পিষে ফেলতে চাচ্ছে যেমন। দাম্ভিকতার ভারে উঁচু হয়ে থাকা ঘাড়টা সামান্য ঝুঁকিয়ে এনে মুখ ঠেকালো রমণীর কানের কাছে। ধারালো দাঁতের ছোঁয়ায় তিতলির কানের পিঠে একটা কামড় বসিয়ে দিয়ে বিরক্ত কন্ঠে বলে উঠলো,
” ইচ্ছে করছে খেয়ে ফেলি?”
ফারাজের এরূপ কথায় ঘাড়টা সামান্য ঘুরিয়ে তরাগ চোখ তুলে চাইলো তিতলি। কামড়ে কান জ্বলছে তার। হাত তুলে কানে কামড় দেওয়া ব্যথিত স্থান ডলছে। জড়ানো গলায় ঠোঁট নাড়িয়ে শুধালো,

“খেয়ে ফেলবেন মানে? কা..কাকে?”
ফারাজের সহজ স্বীকারোক্তি এলো,
“তোমাকে! কতবার বলছি ইগনোর করা আমার পছন্দ নয়। এটা যন্ত্রনাদায়ক।”
তিতলির মুখখানায় হতভম্ব, হতবিহ্বল ভাব ধরেছে ফারাজের সোজাসাপটা স্বীকারোক্তিতে। সে ইগনোর করেছে এটা ওনার জন্য যন্ত্রনাদায়ক? তাকে তো ভালোবাসে না তাহলে? একবার কি জিজ্ঞেস করে দেখবে? জিজ্ঞেস করলেও তো কিছু বলেনা। তখন সে আরও কষ্ট পায়। কিছু একটা মনে করে হালকা শাসনের স্বরে তিতলি বলে,
“আপনাকে তো আমি কখনো সিগারেট খেতে দেখিনি। তাহলে আজকে খেয়েছেন কেন?”
“তোমার সমস্যা?”
তিতলি মুখশ্রী অন্ধকার করে সরু নাকের পাটাটা সামান্য ফুলিয়ে জবাব দিলো,
“না, না আমার কোনো সমস্যা নেই। আপনি সিগারেট খান, মদ খান, গাঁজা খান, আমার কি?”
“আরেকটা বাদ পড়ে গেছে।”
তিতলির চাহনিতে প্রশ্ন,

“কোনটা?”
ফারাজ শেষাত্মক ভাব ভাব-ভঙ্গিমা ধরে রেখে আচমকা মুখ নামালো তিতলির কানের বড্ড কাছে। অতঃপর ফিসফিসিয়ে আওড়ালো,
“আমাকে খান সেটা কে বলবে?”
“আমাকে খান….”
তিতলিকে পুরো কথা শেষ করতে দিলো না ফারাজ। পথিমধ্যে থামিয়ে দিয়ে ক্ষীণ নাচাতে নাচাতে বলল,
“উঁহুম, তোমাকে-ই তো খাবো।”
তিতলি আমতাআমতা করে বলল,
“ইয়ে মানে….আমি অন্য কিছু….”
তিতলির কথার মাঝেই ওর জামার পেছনের বড় গলাটা আরও একটু সরিয়ে দিয়ে উন্মুক্ত, মৃসণ, তুলতুলে, নরম বগলের কাছাকাছি মুখ এনে নরম জায়গায় আরেকটা কামড় বসিয়ে দিয়ে তিতলির চুপসে যাওয়া এইটুকুনি মুখের পানে চেয়ে দাঁতে দাঁত পিষলো ফারাজ। কি জানি কি ঝড় বয়ে যাচ্ছে যুবকের ভিতরে, তার জের ধরেই ফারাজ গম্ভীর স্বরে বলে উঠলো,
“সকালে মেসেজে কী যেন বলছিলে? যে পুরুষ রাতে বউ ছাড়া রাত কাটাতে পারে সে পুরুষের সাথে আমি কথা বলব না? তো মনে আছে এখন যে রাত?”

তিতলি নিশ্চুুপ। এই লোক তাকে এত কামড় দিচ্ছে কেন? বগলের কাছে কামড় দেওয়ার সময় মনে হচ্ছিলো সে আর নেই। শেষ, আজ আমি শেষ! কথাটা আওড়াচ্ছিলো। সে হাতের তালুতে কামড় দিয়েছে বলে কি তার থেকে এখন কামড়ের সুদ নিবে? কি বলবে কি করবে সম্পূর্ণ মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে তার। এই লোক এখন কত কথা বের করবে, কত কথা বলবে। কোন দুঃখে যে বলতে গিয়েছিল সকালে কথাটা। এখন কি করবে সে? মনে তো হচ্ছে ফারাজ তাকে ছাড়বে না যেভাবে পেঁচিয়ে নিয়েছে। আল্লাহ একটু রহম করুন।
“এ-এখন বেশি রাত হয়নি। মাত্র রাত সাড়ে সাতটা।”
“আমার জানামতে রাত মানেই রাত, সেটা কম রাত হোক কিংবা বেশি রাত। রুমে সাউন্ডপ্রুফিং লাগানোর ব্যবস্থা করতে হবে এক্ষুনি।”

“কেন?”
“একটু পর তো তুমি চিল্লাচিল্লি শুরু করবে। তোমার চিল্লাচিল্লি যাতে রুমের বাইরে না যায় সে ব্যবস্থা করতে হবে না? কি বলো?”
মানবের এহেন বেফাঁস প্রতিত্তোরে লজ্জায় মরি মরি অবস্থা তিতলির। তক্ষুনি নত হলো তার ঘাড়। কপোলদ্বয়ে হুট করেই দেখা মিললো একরাশ লজ্জালু লালিমা। উপচে পড়া লজ্জাগুলোতে একপ্রকার ঢাকনা দিয়ে মানবী ত্বরিত ঝাঁঝ ঢালল কন্ঠায়! দাঁত খিঁচে শুধালো,
“কি..কি করতে চাচ্ছেন আপনি? অসভ্য লোক।”
যুবক বাঁকা হাসলো। অতিষ্ঠ মানবী দাঁত খিঁচে অধর নাড়াবে তার পূর্বেই কর্ণকুহরে ভেসে এলো ফারাজের হাস্কিস্বর!
“একটু হালকার উপর ঝাপসা কিছু হয়ে গেলে মন্দ হয়না তাইনা? অবশ্যই তুমি রাজী থাকলে আমি এখনই শুরু…”
ফারাজের কথাগুলো শুনে তিতলি আজ লজ্জায় মরিমরি। ফারাজের দুহাত নিজের কোমর থেকে সরাতে সরাতে লজ্জিত রমণী বলে,

“খুব মন্দ হয়। আপনি ছাড়ুন আমায়। এসব বলার জন্য এতদূর থেকে এসেছেন?”
কালকের থেকে ধীরেধীরে যত আকাশসম রাগ, ক্ষোভ, ক্রোধ জমা হচ্ছিলো ঠিক সেভাবেই ধীরেধীরে রুঢ় মানবের রাগ গলে যাচ্ছে যেমন। তিতলিকে এত জ্বালাতে পেরে তার যেন পৈশাচিক আনন্দ লাগছে। বরং এতে সে সিডিউস হয়ে যাচ্ছে। এই মেয়ের কাছাকাছি থাকা যাবেনা মনে হচ্ছে।
ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“বলার জন্য নয় বরং করার জন্য এসেছি।”
“আমার ভয় করছে আপনাকে।”
“আমাকে রাগিয়ে দেওয়ার আগে মনে ছিলো না? তখন ভয় করেনি? মনে হয়নি একবারও আমি ঠিক কি কি করতে পারি তোমার সাথে?”
ফারাজ তিতলির থেকে কোনো উত্তর পাবার আশা না করে অধৈর্য হয়ে তিতলিকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে এনে ঝাপটে পড়লো তিতলির ঠোঁটের উপর। বাইর থেকে সিগারেট পুড়ে আসা ঠোঁটদুটো দ্বারা তিতলির কম্পিত ঠোঁটদুটো আকড়ে ধরে চুলের পেছনে হাত ঢুকিয়ে দিলো। তিতলি প্রথমে ছটফট করলেও পরপরই অনুভূতির সাগরে ভেসে তিতলিও ছটফট বন্ধ করে দিয়েছে। শক্ত করে চেপে রেখেছে ফারাজের উদোম শক্তপোক্ত পিঠ। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে তার। এতটাই বড়বড় নিশ্বাস যে সম্পূর্ণ কক্ষ জুড়ে শুধু তিতলির নিশ্বাস আর তাদের ভেজা চুমুর আওয়াজ হচ্ছে। ফারাজ তিতলির সম্পূর্ন শরীরে নিজের হাতের বিচরণ চালালো। অনেকক্ষণ সময় নিয়ে ছেড়ে দিয়ে বলল,

“এখন-ই এত বড়বড় নিশ্বাস নিলে হবে? এভাবে আরও গভীর হতে থাকবে রোজ। এখন থেকে একটু একটু করে এগুলো স্বভাব করে নাও, নিজেকে প্রস্তুত করো আমার জন্য। আরও বেশি সহ্য করতে হবে আমায়।”
তিতলি লজ্জায় মরে গিয়ে কোনোরকমে দৌড়ে দরজা খুলে বেরিয়ে যাবে যাবে ভাব। ফারাজও পেছন পেছন লম্বা কদমে আবারও পেছন পেছন উঠে এসে তিতলিকে টেনে ধরে কপট রাগ দেখিয়ে বলল,
“জামা না খুলে কোথায় যাচ্ছো স্টুপিড!”
তিতলি চোরাচোখে পেছনে ঘুরে নিচু স্বরে বলল,
“খু-খুলবো হে খুলবো।”
“ওকে খুলো!”
“আগে আপনি বের হন রুম থেকে।”
“সো হোয়াট? আমি বের হবো কেন? যা করার আমার সামনেই শেষ করা চাই।”

“আপনার সামনে শেষ করবো মানে?”
“ভাবো আমি তোমার কিছুই দেখিনি?”
“কিছু দেখছেন মানে?”
ফারাজ অধর কামড়ে ধরে একবার এদিক ওদিক নজর বুলিয়ে ফের তিতলির মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখে নিয়ে হাস্কিসুরে বলল,
“কিছু না।”
তিতলি জামা একটা নিয়ে দৌড়ে ওয়াশরুমে চলে গেলো ফারাজের কথা শেষ হওয়ার আগেই। বেহায়া নির্লজ্জ লোক। গম্ভীর, কথায় কথায় স্টুডেন্টদের ধমক দেওয়ার পেছনে এই রুপ লুকিয়ে ছিলো।

ঘড়িতে রাত দশটা। তিতলি এরপর থেকে ভুলবসত হলেও ফারাজের সামনে পরেনি। এমনকি ফারাজকে তো সে দেখেইনি। সে ছিলো ঝিলিক ময়না ওদের সাথে। মোবাইলে সবাই মিলে গোল হয়ে বসে লুডু খেলেছে একবার। তিতলির মোবাইল কই এটা নিয়ে সবাই প্রশ্ন তুলেছে। মোবাইলের কথা মনে আসতেই তিতলির মনে আকাশসম অভিমান যোগ হয়েছে। এই আইফোন সে এখন কই পাবে? এমন নষ্ট হতো না ফারাজ আইফোনটা ছুড়ে ফেলার সাথে সাথে টেবিলে রাখা মগ ভর্তি পানি ও পড়ে গিয়েছিল তাই মোবাইল ভেঙে যাওয়ার সাথেসাথে পানিতে ছুপছুপ হয়ে গিয়েছে।
ঝিলিক পাশ থেকে তুষারকে মেসেজর রিপ্লাই দিতে দিতে তিতলির উপর নজর দিলো। হঠাৎ তিতলির কানের কাছে চোখ যেতেই লাল দাগ দেখে চোখ সরিয়ে নিলো। মুচকি হেসে কিছু না বুঝার মতো করে বলল,

“ফারাজ ভাইয়া তোমার জন্য কত পাগল দেখলে?দুইরাতও থাকতে পারলো না।”
তিতলির দুগাল লাল হয়ে গেলো। কিন্তু তা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেলো। ভাবলো তার মোবাইল ভাঙার জন্য এসেছে। তাই বলল,
“ওনি আমার জন্য আসেন নি।”
“কচু আমি বুঝে গেছি!”
তিতলি ধরা পরে যাওয়ার মতো ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কি?”
“ফারাজ ভাইয়া এসেই কারো সাথে কথা না বলে ফুপুকে তোমার কথা জিজ্ঞেস করে তোমাকে খুঁজতে রুমে গিয়েছে। শুধু আমি কেন সবাই বুঝে যায়নি কিছু।”
তিতলি নিচে নামার পর থেকে দেখছে সবাই কীভাবে যেন তার দিকে তাকাচ্ছে। সে ভেবে আসছে তার মাঝে কি ভূতপ্রেত ভর করলো নাকি? বা তাকে বিশ্ব সুন্দরী লাগছে যে এভাবে তাকিয়ে দেখতে হবে?

“এমনি গিয়েছে।”
“থাক, থাক এমনে গিয়েছে আর যেমনেই যাক গিয়েছে তো।”
তিতলি লজ্জা সমেত উঠে চলে গেলো অন্যদিকে।
রাতের খাবার সবাইকে বাইরের পর্দার নিচে দেওয়া হয়েছে। প্রায় হাজার খানেক মানুষ পর্দার নিচে রাতের খাবার খাওয়ার জন্য উপস্থিত হয়ছে। হুশিয়ার সাহেব প্রায় পাঁচ হাজার মানুষজন দাওয়াত করেছেন মেজবানে। কেউ কেউ দুপুরে আসবেন আবার কেউ কেউ রাতেই এসে গেছেন। পুরো বাড়ি ভর্তি মানুষ। এমনকি তিতলি ঝিলিক, ময়না পলি ওরাও এসেছে সবার দেখাদেখি বাইরে। রাতের ভাত বিরিয়ানি আয়োজন করা হয়েছে।
তিতলিরা সবাই ভাত খেতে বসেছে বাইরে। তিতলি ভেতর থেকে ফারিন বেগমকে জানিয়ে সবার সাথে চলে এসেছে। এক টেবিলে ওরা মেয়েরা প্রায় ৭-৮ জন বসেছে। তিতলি আঁড়চোখে ফারাজকে খুঁজল৷ আশেপাশে নেই। সেই ঘটনার পর থেকেই দেখছেনা। চেনাজানা মানুষদের সাথে দেখা করতে গিয়েছে হয়তো।

রোহান কিছুক্ষণ পরপর তিতলির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ফোনে কার সাথে যেন কথা বলছে একটু সাইডে গিয়ে। ওপাশ থেকে রুমের দরজা লাগিয়ে কথা বলছেন নাছিমা বেগম।
“তোকে বলেছি যা করার ফারাজ আসার আগেই যেন করিস। এখন তো ফারাজ চলে এসেছে কিছু টের ফেলে জানে মেরে ফেলবে। তোকে কেন আমাকেও ছাড়বেনা।”
রোহান দূর থেকেই তিতলির উপর নজর রেখে বলল,
“আমার ওই মেয়েকে চাই আম্মু। ফারাজের থেকে কেড়ে নিয়ে হলেও চাই। আমার হিংসা হচ্ছে ছোট থেকেই ফারাজ আমার থেকে এক ধাপ উপরে উপরে চলছে।”
যা করার কর শুধু ফারাজের জীবন থেকে এই মেয়েকে সরিয়ে দে। এই মেয়ের জন্য আমাকে দশদিন বাতরুমে যেতে আর আসতে হয়েছে।
শোন তুই নিজে কিছু করিস না আবার..”
“আমি ওত বোকা নয় আম্মু। অলরেডি একজনের সাথে কথা বলে রেখেছি। কালকে যখন সবাই খাওয়া দাওয়ায় ব্যস্ত হয়ে যাবে তখন…”
“আচ্ছা কল রাখ কে জানি দরজা ধাক্কাচ্ছে।”

রোহান মোবাইল পকেটে ররখে তিতলিদের দিকে এগিয়ে গিয়ে সাধু পুরুষের মতো বলল,
“তোমাদের কারো কি কিছু লাগবে লাগলে আমাকে বলতে পারো?”
ঝিলিক ভ্রু কুঁচকে রেখে সবার দিকে এক পলক তাকিয়ে বলল,
“কিছু লাগবে না। আপনি আসতে পারেন ভাইয়া।”
রোহান ঝিলিকের কথায় কিছু মনে না নিয়ে তিতলিকে বলল,
“এইযে ভাবি একটু কথা বললে কি হয়? এত ভাব নিচ্ছেন কেন? ফারাজ ভাইকে খুঁজছেন মনে হয়?”
“না।”

“এদিক ওদিক তাকাচ্ছেন মনে হলো কাউকে খুঁজছেন তাই বললাম আরকি।”
রোহান ক্রুর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে অন্যদিকে চলে গেলো। তিতলিকে নজরে নজরে রাখছে।
আলভী অনেকক্ষণ ধরে সেটা খেয়াল করছে। এই রোহানের মতলব তো সুবিধার লাগছেনা। পকেট থেকে মোবাইল বের করে ফারাজকে কল দিলো। কয়েকবার রিং হওয়ার পর রিসিভ হলো,
“হ্যালো কই তুই তোর বউয়ের উপর তো কু নজরে পড়ছে।”
ওপাশ থেকে ফারাজ দাঁতে দাঁত চেপে আলভীকে বলল,
“তোকে বলছিনা আমার বউয়ের দিকে তাকাবিনা।”

“আমি তো তাকায় ছোট বোন +ভাবির নজরে কিন্তু তোর খালাতো ভাই রোহান আছে না ওটাকে দেখলাম তোর বউয়ের সাথে কথা বলতে গিয়ে কু নজর দিচ্ছে। মতলব সুবিধার লাগছেনা।”
ওপাশ থেকে ফারাজকে কল কেটে দিতে দেখা গেলো। নানারবাড়ির পুরানো বন্ধুদের সাথে দেখা করতে গিয়েছিল ফারাজ। ক্লাস ফাইব পর্যন্ত টাঙ্গাইলে পড়ায় টাঙ্গাইলের বেশ কয়েকজন বন্ধ রয়েছে। এখন ফোন কেটে দিয়ে ফারাজ সবার থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসলো।

তিতলিকে বাইর থেকে রুমে নিয়ে এসেছে ফারাজ। ঝিলিকদের সামনে থেকে উঠিয়ে নিয়ে এসেছে। এমনিকি রোহানের চোখেও সেটা দেখা বাদ গেলো না। পরে রুমে এনে কিছুক্ষণ নাস্তানাবুদ করেছে। ফারাজ বিরিয়ানি বাদ দিয়ো সাদা ভাত এনেছে প্লেটে করে। তিতলিকে নিজের হাতে ভাত খাইয়ে দিচ্ছে। তিতলি ফারাজের চোখে চোখ রেখে হঠাৎ বলল,
“আপনি খাবেন না?”
ফারাজের হঠাৎ কি হলো কে-জানে। মনে হলো যেন সে তিতলির চোখে কোনো কথা খুঁজে পেলো। তিতলির গালের ভেতরে অন্য একটা লোকমা দিয়ে মৃদুস্বরে বলল,
“তুমি খাইয়ে দিবে?”
তিতলির চোখ দুটো চিকচিক করে উঠে। সে চাই তো খুব করে ফারাজকে খাইয়ে দিতে। কিন্তু কখনো ভয়ে বলতে পারেনা। যদি বলে তোমার হাতে আমি খাবো? সে ভয়ে। এখন এতবড় সুযোগ হাতছাড়া করবে না সে। গালের ভাতটুকু গিলে নিতে গিয়ে হঠাৎ নাকে মুখে উঠে গেলো। ফারাজকে বিচলিত দেখাল। তিতলির পিঠে মাথায় হাত দিয়ে পানির গ্লাস এগিয়ে দিয়ে নরম গলায় বলল,

“এত খুশি হতে কে বলছে হুমম?”
তিতলি পানি খেতে খেতে আবার বলে বলল,
“আমি.. আমি আপনাকে খাইয়ে দেবো?”
“তাহলে হাত ধুয়ে আসি!”
“লাগবেনা হাত ধুয়ার প্রয়োজন নেই।”
“কেন?”
“আমি বলছি তাই।”
তিতলি খুশিতে গদগদ হয়ে ফারাজকে প্লেটের বাকি অর্ধেক ভাত খাইয়ে দিলো। সাথে লজ্জায় শেষ। খাওয়াতে গিয়ে ফারাজ মাঝেমধ্যে তিতলির আঙুল কামড়ে ধরছে। ফারাজের ঠোঁটে তার হাত লাগছে। হাতে খোঁচাখোঁচা দাঁড়ির লাগছে অন্যরকম অনুভূতি লাগছে তিতলির কাছে।

আজকে মেজাবান। বাড়িতে মানুষজন দিয়ে ভরপুর। তিতলি রেডি হয়ে গিয়েছে সবার দেখাদেখি। সকাল সকাল ছকিনা খাতুন তিতলিকে বললেন,
ঘরে যাও নাতবউ নাতি রুমে গেছে দেইখছো তো? কি লাগবো নো লাগবো গিয়া জিজ্ঞেস করো গা স্বামীর সেবা করা সুন্নত। সেটা মাথায় রাইখবা।
‘জ্বি নানু।”
তিতলি তাও দাঁড়িয়ে আছে দেখে ছকিনা খাতুন আবার বললেন,
“কি গো যাও!”
রুমে গিয়ে তিতলি দরজা খুলে ঢুকতেই ওয়াশরুম থেকে পানির পরার আওয়াজ পেলো। তিতলি ভাবলো চলে আসবে। এখানে থাকলে পরে দেখা যাবে আর দশ ঘন্টাতেও বেরোতে পারবে না। তাই আগেভাগেই চলে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। কিন্তু তখন ওয়াশরুমে থেকে ফারাজের হুকুম শোনা গেলো,

“মিসেস তিতলি? রুমে থাকলে আমার জন্য তোয়ালে নিয়ে আসা হোক।”
তিতলি চোখ বড়বড় করে দরজায় দাঁড়িয়ে গেলো। এই লোক কীভাবে জানলো সে রুমে এসেছে? দাঁত নখ কাটতে কাটতে ভাবনায় পড়ে গেলো কিন্তু আবার ডাক পড়তেই তিতলি চমকে উঠে বলল,
“আপনার তো তোয়ালে নেই। আপনি কি আসার সময় তোয়ালে নিয়ে এসেছেন? আপনি আসবেন না বলছেন আমি কিছু নিয়ে আসিনি। আপনি তো কোনো শার্ট প্যান্ট ও আনেন নি।”
“তো? তোমার তোয়ালে নিয়ে আসো!”
“না আমি পারব না।”
“তুমি কি চাও আমি সম্পূর্ণ খালি গায়ে রুম থেকে বের হয়?”
“এই না,না, নিয়ে আসছি।”

তিতলি তার তোয়ালেটা বেলকনির থেকে এনে ওয়াশরুমের দরজার সামনে গিয়ে কিছুক্ষণ চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ডাকবে নাকি ডাকবেনা সে ভাবনায় বিভোর। অনেক ভেবেচিন্তে দরজায় একটা টোকা দিতে না দিতেই সম্পূর্ণ দরজা খুলে গেলো। মানে দরজা খোলায়। ফারাজ ঝর্ণার নিচে পেছনে পিঠ করে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে শুধু কালো রঙা একটা আন্ডারও্যায়ার। বাকি সব উন্মুক্ত।
তিতলি লজ্জায় চোখ মুখ বন্ধ করে তোয়ালে দিয়ে মুখটা সামান্য ঘুরিয়ে বলল,
“নাউজুবিল্লাহ, নাউজুবিল্লাহ আপনি এটা কি পরে আছেন?”

রাগে অনুরাগে পর্ব ৪২

তিতলির কথা শুনে ফারাজ সামনের দিকে ঘুরে তাকাতেই এবার তো তিতলি অজ্ঞান হয়ে যাবে মনে হয়। তক্ষুনি দরজাটা ভিরিয়ে দিয়ে ওয়াশরুমের ভেতরে একহাত এগিয়ে তোয়ালে বাড়িয়ে দিয়ে তিতলি দাঁতে দাঁত খিঁচে বলল,
“আপনি তোয়ালেটা নিয়ে এবার আমাকে মুক্ত করুন তো।”

রাগে অনুরাগে পর্ব ৪৪