রুপুর বিয়ে পর্ব ৯
Bobita Ray
বীথি রানীর হাসফাস লাগছে। রুপু বীথি রানীর আশেপাশে থাকলেই অটোমেটিক প্রেশার বেড়ে যায়। রুপু ঘরের মেঝেতে আরাম করে শুয়ে পড়ল। বীথি রানী বলল,
“তুমি সত্যি সত্যি এখানে ঘুমাবে নাকি?”
“হুঁ..”
“তুমি ঘরে যাও। আমি একাই ঘুমাতে পারব।”
“মা বিরক্ত করবেন নাতো। অনেক রাত হলো। চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়ুন।”
বীথি রানী ভীতু কণ্ঠে বলল,
“তুমি কী আমাকে মেরে-টেরে দেওয়ার প্ল্যান করছ নাকি?”
কথাটা শুনে রুপুর এত হাসি পেল। হাসি লুকিয়ে রুপু গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“সবাইকে আপনার মতো ভাববেন না মা।”
“এই… এই কী বললে তুমি?”
“কিছু না। ঘুমান এখন।”
“সত্যি করে বলো ময়নার মা কোথায়?”
“একদম ভয় পাবেন না। আপনার যে ভেড়া মার্কা ছেলে। ময়নার মায়ের সাথে কিছু করার সাহস পাবে না।”
“ছিঃ ছিঃ কী কথার ছিরি। সকাল হোক বিনয়কে সব বলব আমি। তোমার কত বড় সাহস। আমার ছেলেকে তুমি ভেড়া বলো।”
“সে আপনি বলে খুশি থাকলে অবশ্যই বলবেন। এখন দয়া করে কানের কাছে মশার মতো গুন-গুন না করে ঘুমিয়ে পড়ুন তো মা।”
বীথি রানী আর কিছু বলার সাহস পেল না। শুধু মানে মানে সকালটা হোক। তারপর এই মেয়েকে ইচ্ছেমতো ছাই দিয়ে ধরা যাবে।
অনেক রাতে বিনয় রুপুকে ডাকতে এসে দেখল, মায়ের ঘরের দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। বিনয় নিচু কণ্ঠে ফিসফিস করে রুপুকে বার কয়েক ডাকল। রুপু সারা দিল না। বিনয় হতাশ হয়ে ফিরে গেল।
“কিছু কী বুঝলেন মা?”
বীথি রানী চমকে উঠল। আচ্ছা জ্বালা হলো তো। মেয়েটা বুঝল কীভাবে বীথি রানী জেগে আছে। বীথি রানী সারা দিল না।
“মা আমার সাথে ভান করবেন না। আমি আপনার বড় ছেলের মতো বোকা না।”
“কী বলতে চাইছ তুমি?”
“এইতো বুলি ফুটেছে।”
“ঠিক করে কথা বলো।”
“ঠিক করেই কথা বলতে চাই মা। আপনিই তো বেঠিক করে কথা বলতে বাধ্য করেন। দুদিনের বউয়ের জন্য আপনার ছেলের রাতের ঘুম কিন্তু উড়ে গেছে মা।”
“রুপু, ভুলে যেও না আমি তোমার শাশুড়ীমা।”
“ভুলে যাইনি দেখেই তো ভদ্র ভাবে বললাম।”
“এত পকপক না করে বিনয়ের ঘরে যাও।”
“আমি এখন চলে গেলে সবচেয়ে বেশি আপনি কষ্ট পাবেন মা।”
“পাকামি তোমার রক্তে মিশে আছে।”
“সে একটু আধটু আছে বৈকি!”
রুপু সকাল থেকে বিনয়ের সাথে কথা বলছে না। বিনয় অনেক চেষ্টা করেছে রুপুর সাথে একটুখানি কথা বলার। রুপু বিনয়ের দিকে তাকাচ্ছে না পর্যন্ত। আচ্ছা জ্বালা হলো তো। গতকাল পর্যন্ত সবকিছু তো ঠিকই ছিল। হঠাৎ কী এমন হলো। কেনই বা রুপু কথা বলছে না। কোন কারণে কী বিনয়ের উপরে রেগে আছে রুপু? সেই কারণটা কী? ভেবে ভেবে পাগল হবার জোগাড় হলো। তাছাড়া মা সেই সকাল থেকে রুপুর নামে একগাদা নালিশ করে যাচ্ছে। মায়ের কোন কথা বিনয়ের কান ভেদ করে মস্তিষ্কে ঢুকছে না। উল্টো এই প্রথবারের মতো মায়ের বলা কথাগুলো বড্ড বিরক্ত লাগছে।
রুপুর ছোট পিসি শাশুড়ি খবর পেয়ে রুপুর অসুস্থ শাশুড়ীমাকে দেখতে এসেছে। সারাক্ষণ রুপুর শাশুড়ীমা রুপুর পিসি শাশুড়ীর কাছে রুপুর নামে নিচু কণ্ঠে ফিসফিস করে বদনাম করছে। রুপু ওনাদের তাকানো, কথা বলার টোন দেখে স্পষ্ট বুঝতে পারলেও কিছু বলছে না। চুপচাপ কাজ করে যাচ্ছে। রুপুর পিসি শাশুড়ী যতবার রুপুর দিকে তাকাচ্ছে। ততবারই ভ্রু কুঁচকে ফেলছে।
রুপু শাশুড়ী মায়ের জন্য খাবার ঘরে নিয়ে এলো। শাশুড়ী মায়ের সামনে খাবারের প্লেট বাটি সাজিয়ে দিয়ে পিসি শাশুড়ীকে বলল,
“খেতে আসুন।”
রুপুর শাশুড়ীর একটুও ইচ্ছে ছিল না। বীণা মানে রুপুর পিসি শাশুড়ী রুপুর সাথে তিনতলায় খেতে যাক। শেষে দেখা যাবে দুই কুটনিতে একসাথে বসে বসে বীথি রানীর নামেই বদনাম করছে। বীথি রানী রুপুকে বলল,
“তুমি বরং বীণার খাবারটা এই ঘরে এনে দাও।”
“না বউদি। নতুন বউমাকে আর কষ্ট করতে হবে না। আমি তিনতলায় গিয়েই খেয়ে নেব।”
বীণা উঠে দাঁড়াল। বীথি রানীর মুখটা শুকিয়ে একটুখানি হয়ে গেল। বীণা কুটনিটা আবার রুপুকে সব বলে দেবে নাতো?
রুপু খুব যত্ন করে পিসি শাশুড়ীকে নিজে হাতে বেড়ে খাওয়াচ্ছে। বড় মাছের মাথা, মুরগির রান পিসি শাশুড়ীর পাতে তুলে দিল। বীণা তৃপ্তি করে খাচ্ছে। খেতে খেতে বলল,
“তোমাকে দেখে বোঝার উপায় নেই কিন্তু। তোমার ব্যবহার এত খারাপ।”
উত্তরে রুপু মিষ্টি করে হাসল। হাসতে হাসতে বলল,
“আপনাকে দেখেও বোঝার উপায় নেই কিন্তু আপনি এক নম্বরের ডাইনি, দজ্জাল মহিলা।”
বীণা হতভম্ব হয়ে গেল। খাওয়া বাদ দিয়ে রুপুর দিকে বড় বড় চোখ করে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। রাগে, দুঃখে বীণার চোখে জল এসে গেল। বুকের নিঃশ্বাস খুব জোরে ওঠানামা করছে।
“কি.. কি বললে তুমি।”
রুপুর চোখে জল এসে গেল। বীণার পাশে বসে বীণার বামহাত চেপে ধরল। নরম কণ্ঠে বলল,
“আমাকে ভুল বুঝবেন না পিসি মণি। আমি যা শুনেছি। তাই মুখ ফস্কে ভুলে বলে ফেলেছি। আমাকে ক্ষমা করে দিন। আপনি চাইলে আমি আপনার পা ধরব।”
অভিনয়টা কী একটু বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে? না ঠিক-ঠাকই আছে।
“বিনয়ের মা আমার নামে তোমার কাছে বদনাম করেছে তাই তো? করবেই তো .. করবেই তো। মহিলা যে কুটনির কুটনি। আমার দাদার বাড়ি। অথচ আমরা এসে দুদণ্ড শান্তি পাই না। সবার কাছে ইনিয়েবিনিয়ে আমাদের নামে বদনাম করে। আমাদের খল নায়িকা বানিয়ে নিজে নায়িকা সেজে বসে থাকে।”
“মাকে ভুল বুঝবেন না পিসি মণি। মা ততটাও খারাপ না।
বীণা বিরক্ত হয়ে বলল,
“ তুমি চুপ করো। কয়দিন ধরে তুমি তোমার শাশুড়ীকে চেনো? চেনো নাতো। এই মহিলা কী চিজ। যেদিন চিনবে সেদিন হাড়ে হাড়ে টের পাবে। তুমি জানো, আমি এই বাড়িতে পা রাখার পর থেকে এই পর্যন্ত তোমার নামে কী ভয়ংকর ভয়ংকর কথা বলেছে ওই কুটনি মহিলা। কত বড় সাহস। নতুন বউয়ের কাছে বলে আমি নাকি ডাইনি, দজ্জাল।”
বীণা পিসি অতিরিক্ত রাগে কাঁপতে কাঁপতে খাওয়া ফেলে উঠে যেতে নিল। রুপু পেছন থেকে টেনে ধরল। কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলল,
“আমি মায়ের হয়ে আপনার কাছে হাত জোর করে ক্ষমা চাই পিসি। প্লিজ খাবার না খেয়ে উঠে যাবেন না। গেরস্তের অকল্যান হবে। মাতো আমার নামে যে আসে তার কাছেই কত বদনাম করে। আমি তো কাউকে কিছু বলি না। এখন আপনি যদি কথাগুলো মাকে গিয়ে বলেন। মা সাথে সাথে অস্বীকার করে ফেলবে। আরও সুযোগ পেয়ে যাবে আমাকে অপমান করার। সবার সামনে অপদস্ত করার।”
বীণা রুপুর কথা ফেলতে পারল না। খেতে বসল। খেয়ে-দেয়ে বিকালের দিকে চলে গেল। যাওয়ার আগে রুপুর শাশুড়ীকে জোর গলায় বলে গেল।
“ভাগ্য করে বড়ছেলের বউ পেয়েছ। এত বদনাম না করে আদর যত্ন করে রেখো। নাহলে বুড়ো বয়সে আফসোস করবে।”
রুপুর শাশুড়ীর সুস্থ হতে খুব বেশিদিন সময় লাগল না। বীথি রানী সুস্থ হয়েই বিনয়-রুপুকে অমঙ্গলায় পাঠানোর তোরজোর শুরু করে দিল। বীথি রানীর বাবা-মা বেঁচে নেই। শুধু এক দাদা আছে। আর তিনবোন আছে। বোনদের বিয়ে হয়ে গেছে। বাড়িতে এখন শুধু দাদা-বউদি থাকে। একসময় বীথির দাদার পরিবারও দরিদ্র ছিল। এখন বীথির ভাইপোরা চাকরি-বাকরি করে সচ্ছল হয়েছে। বীথির বাবার বাড়ি গ্রামে। বীথি রানীর দাদা-বউদি গ্রামেই থাকে। একফাঁকে বীথির বউদি শিখাকে ফোন দিল বীথি। বলল,
“কেমন আছো বউদি?”
“ভালো। তুমি এখন কেমন আছো?”
“আমার আর ভালো থাকা। যে বউ কপালে জুটেছে।”
“আবার কী হলো?”
“সে কত কিছুই তো হয়।”
“বিনয়দের তো আজ এখানে আসার কথা। ওরা কী রওনা হয়েছে?”
“হ্যাঁ বেরিয়ে গেছে। বউদি একটা কথা বলার ছিল।”
“বলো?”
“ওদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে আসলে..
“ শোন বীথি, সবার তোমাদের মতো বড়োলোকি কারবার নেই। বিনয়ের মামার যা জুটবে তাই নতুন বউকে খাওয়াবে।”
“বউদি আমি টাকা পাঠাচ্ছি তো। তুমি শুধু একটু আয়োজন করবে। তাও কী পারবে না?”
শিখার গলার স্বর নরম হলো। বলল,
“পারব না কেন? অবশ্যই পারব। তোমাকে এত চিন্তা করতে হবে না। কী কী রাঁধতে হবে শুধু বলো আমাকে। আমার কথায় কিছু মনে করো না বীথি। তোমার দাদার অবস্থা তো জানোই। ছেলেদের নতুন চাকরি। চাকরি পেতে না পেতেই একগাদা লোন নিয়ে ঘর করল। অভাব যেন সংসার থেকে যেতেই চায় না। ভালোই ভালোই লোন শোধ হলে আর কোনো চিন্তা নেই।”
বীথি রানী ফোন রেখে হাফ ছেড়ে বাঁচল। দুই দিনের মেয়ের কাছে বীথি রানী কিছুতেই মাথা নোয়াবে না। বউদি যে কিপ্টে। আলাদা করে টাকা না পাঠালে তিনপদের বেশিকিছু জীবনেও রাঁধতো না।
রুপুর ভীষণ মন খারাপ। জেদ করে মামাশ্বশুর বাড়ি না এসে নিজেদের বাড়িতে গেলেই বরং ভালো হতো৷ কিন্তু উপায় ছিল না। ওদের যাওয়ার কথা শুনে, বাবা আবারও ধার দেনা করে একগাদা বাজার করতো। মাসের শেষে টাকাগুলো শোধ করতে বাবার বড্ড বেশি কষ্ট হয়ে যেত। তাছাড়া রুপুর বিয়ের সময় মোটা অংকের টাকা লোন করা আছে। ঈশ্বর জানে, টাকাগুলো কীভাবে শোধ করবে বাবা। বড় হোক ছোট হোক। একটা ভাই থাকলে ভালো হতো। কী সব মান্ধাতা যুগের ভাবনা ভাবছে রুপু। ভাই নেই তো কী হয়েছে। রুপু নিজেই স্বাবলম্বী হবে। বাবা-মাকে কোনদিন ভাইয়ের অভাব বুঝতেই দেবে না। রুপুর রেজাল্ট ভালো। মাস্টার্স কম্পিলিট করে চাকরির জন্য সিভি জমা দেবে। একটা না একটা চাকরি ঠিকই জুটিয়ে ফেলবে রুপু। পড়াশোনার ব্যাপারটা নিয়ে বিনয়ের সাথে কথা বলতে হবে।
গাড়ির সিটে মাথা এলিয়ে দিয়ে চোখদুটো বন্ধ করে বসেছিল রুপু। আচমকা ঝাঁকুনিতে বিনয় রুপুর গায়ের উপরে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। রুপু চমকে উঠে বিনয়ের দিকে তাকাল। বিনয় লজ্জা পেয়েছে। সরে যেতে যেতে মিটিমিটি হাসছে।
“সরি।”
রুপু চোখে-মুখে মিথ্যামিথ্যি বিরক্ত ফুটিয়ে বলল,
রুপুর বিয়ে পর্ব ৮
“ঠিক করে বসো।”
“ভাগ্যিস তোমার গায়ের উপরে পড়েছিলাম। নাহলে তো আমার সাথে কথাই বলতে না। তোমার কী হয়েছে রুপু? এত চুপচাপ হয়ে যাচ্ছ কেন?”
