Home রোমান্টিক ভাইয়া রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ১৯

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ১৯

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ১৯
মহাসিন

সিয়াম ফোনে কথা শেষ করে পিছনে ঘুরতেই থমকে গেল। জেরিন দাঁড়িয়ে আছে, ঠোঁটের কোণে চেনা সেই বাঁকা হাসি।
সিয়াম ভ্রু নাচিয়ে শুধালো,
“কী ব্যাপার? আপনি এখানে?”
জেরিন পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ল,
“কেন, কোনো সমস্যা নাকি?”
সিয়াম সংক্ষেপে জবাব দিল,
“না।”
জেরিন গলাটা একটু আদুরে করে বলল,
“অনেক দিন হলো কোথাও ঘুরতে যাই না। আমাকে নিয়ে একটু ঘুরতে যাবেন? প্লিজ না করবেন না!”
সিয়াম মানা করতে গিয়েও পারল না। গলাটা শুকিয়ে এল। _____“এখনই?”
“হ্যাঁ, এখনই।” জেরিনের চোখে জেদ।
সিয়াম একটা শ্বাস ফেলে বলল, “ঠিক আছে, চলুন তাহলে।”
দুজন ড্রয়িংরুমে ফিরে এল। জেরিন সোজা কবিতার দিকে তাকিয়ে ঘোষণার সুরে বলল, “ভাবি, আমি সিয়ামের সাথে এখন ঘুরতে যেতে চাই। অনেক দিন হলো কোথাও যাওয়া হয় না। যাব কি?”

কথাটা শাপলার কানে যেতেই ওর মুখটা মুহূর্তে কালো হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা কে যেন আ*গুন ধরিয়ে দিল। দা*উদাউ করে জ্ব*লে উঠল সমস্ত শরীর। হাতের তালু ঘামতে লাগল, চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
সিয়াম আড়চোখে শাপলার দিকে তাকাল। ওর থমথমে মুখ, কাঁপা ঠোঁট দেখেই বুঝে গেল—মেয়েটা জেলাসিতে পু*ড়ছে। ভেতরে ভেতরে দগ্ধ হচ্ছে।
কবিতা জেরিনের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “ভাই যদি নিয়ে যায়, তাহলে যাও।”
“হ্যাঁ, নিয়ে যাবে।” জেরিন বিজয়ীর হাসি হাসল।
সিয়াম এবার শাপলার দিকে ফিরল। চোখে দুষ্টুমি মিশিয়ে বলল, “শাপলা, তুইও আমাদের সাথে চল।”
মুহূর্তে শাপলার মুখে হাজারটা জোনাকি জ্বলে উঠল। চোখ চকচক করে উঠল খুশিতে।
আর জেরিন? রাগে ওর চোখ দুটো টকটকে লাল হয়ে গেল। মনে মনে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘ধ্যাত, ভাল্লাগে না! ভেবেছিলাম সিয়ামের সাথে একা একটু সময় কাটাব, তা আর হলো না। ফালতু মেয়েটা এখন আমাদের সাথে যাবে। মনে চায় এই আ*জাই*রা মেয়েটার গ*লা টি*পে দেই। বিরক্তিকর।’
তবুও মুখে হাসি টেনে তিনজন বেরিয়ে পড়ল।
গাড়িতে উঠেই জেরিন একরকম ছোঁ মেরে সিয়ামের পাশের সিটটা দখল করে বসল। শাপলাকে একা ফেলে দিল পিছনের সিটে।

শাপলার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। তার ভালোবাসার মানুষটার পাশে অন্য কেউ বসেছে—এই দৃশ্য তার সহ্য হচ্ছে না। কলিজাটা ছিঁ*ড়ে যাচ্ছে। হাত মুঠো করে সিটের কভার খামচে ধরল। নখ বসে গেল চামড়ায়। ইচ্ছে করছে জেরিনকে লা*থি মে*রে সরিয়ে দিতে।
আর জেরিন? সে তো খুশিতে আত্মহারা। যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছে। ইচ্ছে করেই সিটবেল্ট না লাগিয়ে সিয়ামের দিকে ঘাড় কাত করে বলল, “বেয়াই সাহেব, দেখুন না! আমি কোনোভাবেই সিটবেল্ট লাগাতে পারছি না। প্লিজ, একটু লাগিয়ে দিন।”
সিয়াম বুঝে গেল জেরিনের মতলব। এই ছুঁতোয় ওর কাছে আসতে চাইছে। ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি খেলে গেল। নিঃশব্দে ঝুঁকে গিয়ে সিটবেল্টটা লাগিয়ে দিল। ওদের শরীর ছুঁইছুঁই। জেরিনের গায়ের পারফিউমের গন্ধ সিয়ামের নাকে এসে লাগল।
পিছনের সিটে বসে শাপলা সব দেখছে। প্রতিটা মুহূর্ত ওর কাছে বি*ষের মতো লাগছে। র*ক্ত টগবগ করে ফুটছে। ইচ্ছে করছে জেরিনের ওই চুলগুলো টে*নে ছিঁ*ড়ে ফেলতে, ইচ্ছে করছে সিয়ামকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে। শ্বাস আটকে আসছে, চোখ জ্বালা করছে। তবুও দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে কন্ট্রোল করল। নখের দাগ বসে গেল হাতের তালুতে।
সিয়াম রিয়ারভিউ মিররে শাপলার দিকে তাকাল। মেয়েটার লাল হয়ে যাওয়া চোখ, থরথর করে কাঁপা ঠোঁট, কপালের বিন্দু বিন্দু ঘাম—সব দেখে ওর বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। তবুও মুখে একটা মুচকি হাসি ফুটিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিল।
ইঞ্জিনের গর্জনের সাথে সাথে শাপলার বুকের ভেতরের ঝড়টাও যেন আরও তীব্র হলো।

অন্যদিকে বাড়ির ড্রয়িংরুমে এখনও বসে আছে নীলাঞ্জনা আর কবিতা।
কবিতা নীলাঞ্জনার দিকে ফিরে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “তা কী শুনলাম ভাবি?”
নীলাঞ্জনা ভ্রু কুঁচকে তাকাল, “তুমি আবার কী শুনেছ?”
“তোমার আর ভাইয়ার মধ্যে নাকি মিল হয়ে গেছে?” কবিতার গলায় স্পষ্ট খোঁচা।
নীলাঞ্জনা সোজা হয়ে বসল। চোখে চোখ রেখে বলল, “হ্যাঁ, আরিফ আর আমার মধ্যে মিল হয়ে গেছে। কেন, তোমার তা সহ্য হচ্ছে না?”
“না ভাবি, তুমি আমাকে ভুল বুঝছ।” কবিতা মুখে মধু ঢেলে বলল, যদিও চোখে ঝিলিক দিচ্ছে অন্য কিছু। “আমি ওভাবে বলতে চাইনি। তবে কী বলো তো, যখন শুনলাম তোমার আর ভাইয়ার মধ্যে মিল হয়ে গেছে, তখন বেশ অবাক হলাম। কারণ ভাইয়া তো বলেছিল তোমাকে কখনো মেনে নেবে না।”
একটু থেমে আবার শুরু করল, “আচ্ছা ভাবি, একটা সত্যি কথা বলব? রাগ করবে না তো?”
“হ্যাঁ, বলো।” নীলাঞ্জনার গলা শক্ত।
“কী বলো তো, আমি আবার মানুষের পেছনে লুকিয়ে কথা বলা পছন্দ করি না। যা বলার সামনাসামনি বলি।” কবিতা গলাটা নামিয়ে আনল, কিন্তু প্রতিটা শব্দ বিঁধল কাঁটার মতো। “একটা সত্যি কথা কি জানো? তোমার চেয়ে ভাইয়ার প্রেমিকা অনেক বেশি সুন্দর ছিল। তুমি তার কাছে তুচ্ছ মাত্র। কিছু মনে করো না, এটাই সত্যি। আমি মেয়েটাকে একবার দেখেছিলাম… কী সুন্দর সে! উফ্ কি সুন্দর দেখতে একবার দেখলে আর চোখ ফিরাতে মন চায় না!”

নীলাঞ্জনার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। তবুও নিজেকে সামলে শান্ত গলায় বলল, “সুন্দর দিয়ে কী হবে? ওই মেয়েটা তো আরিফকে ঠকিয়েছে।”
কবিতা ঠোঁট উল্টাল, “আমি বিশ্বাস করি না। বাবা যে সত্যি বলছে তার কী প্রমাণ আছে, হ্যাঁ?”
“কেন, তুমি কি নিজের বাবাকে বিশ্বাস করো না?” নীলাঞ্জনার কণ্ঠে এবার বিস্ময়।
“না, তেমন না।” কবিতা কাঁধ ঝাঁকাল। “কেন জানি আমার মন বিশ্বাস করতে চায় না, অমন সুন্দর মেয়েটা কাউকে ঠকাতে পারে।”
একটু থেমে আবার খোঁচা মারল, “আচ্ছা ভাবি, শাপলা কি এ বাড়িতে সারাজীবনের জন্য থাকবে?”
“আমি কীভাবে জানব বলো?” নীলাঞ্জনা এবার বিরক্ত। “তুমি বরং মাকে জিজ্ঞেস কোরো। মা-ই তো শাপলাকে এ বাড়িতে এনেছে, তাই মা-ই জানে।”
“আমার ওই শাপলা মেয়েটাকে একদম সহ্য হয় না।” কবিতা নাক সিঁটকাল, “বিরক্তিকর একটা মেয়ে। আচ্ছা ভাবি, জেরিনকে তোমার কাছে কেমন লাগে?”

“কেমন আবার লাগবে? ভালোই। দেখতেও বেশ সুন্দর।” নীলাঞ্জনা সংক্ষেপে উত্তর দিল।
কবিতার চোখ চকচক করে উঠল। “জেরিন আর সিয়ামকে একসাথে কিন্তু দারুণ মানায়, তাই না?”
নীলাঞ্জনা ভ্রু কুঁচকে তাকাল, “মানে বুঝলাম না।”
“আরে, জেরিন আর সিয়াম… এদের দুজনকে কিন্তু বেশ ভালো মানায়, কি বলো?” কবিতা কথাটা আবার বলল, এবার আরও জোর দিয়ে। উদ্দেশ্য স্পষ্ট—নীলাঞ্জনার মনে কাঁটা ফোটানো।
“কই, আমার কাছে তো তেমন কিছু মনে হয় না।” নীলাঞ্জনা শীতল গলায় জবাব দিল।
নীলাঞ্জনা আর কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই কবিতার ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কবিতা তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়াল।
“আচ্ছা ভাবি, পরে কথা হবে।” এই বলে ফোনটা রিসিভ করে কথা বলতে বলতে সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেল।
আর নীলাঞ্জনা? ও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপচাপ উঠে দাঁড়াল। বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্টটা গিলে নিয়ে ধীর পায়ে কিচেনের দিকে পা বাড়াল।
ড্রয়িংরুমটা খালি হয়ে গেল, কিন্তু কবিতার বলে যাওয়া কথার বি*ষ তখনও বাতাসে ভাসছে।

কিছুটা সময় পেরিয়ে গেছে। সিয়াম, জেরিন আর শাপলা লেকের পাশ ধরে হাঁটছে।
জেরিনের মুখে স্পষ্ট বিরক্তি। হবে নাই বা কেন? মেয়েটা ভেবে এসেছিল সিয়ামের সাথে একটু আলাদা সময় কাটাবে, দুজনে মন খুলে কথা বলবে। কিন্তু হলো কোথায়? কাবাব মে হাড্ডি হয়ে শাপলাও চলে এসেছে।
আর শাপলা? তার ভেতরটা জ্ব*লছে। সিয়াম জেরিনকে কেন ঘুরতে নিয়ে এলো? তাকে একা নিয়ে এলেও তো পারত! বুকের ভেতর জেলাসি আ*গুন দাউদাউ করে জ্বলছে।
তিনজন একটা ফাঁকা বেঞ্চে বসল। জেরিন এক সেকেন্ডও দেরি না করে সিয়ামের গায়ের সাথে গা ঘেঁষে বসল। যেন সারা পৃথিবীকে দেখিয়ে দিতে চায়, সিয়াম তার।
শাপলা দেখল। আর দেখামাত্রই তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল। ইচ্ছে করছে এই শয়তান জেরিনকে ধা*ক্কা দিয়ে লেকের পানিতে ফে*লে দিতে। কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসল কে জানে!
সিয়াম জেরিনের দিকে ফিরে শুধালো,

“ঝালমুড়ি খাবে?”
জেরিন নাক সিঁটকে নেকামি করে বলল, “ঝালমুড়ি? No No ! আমি এসব ঝালমুড়ি খাবো না। I am on a diet.Eating all this junk food makes me fat.”
অনুবাদ: আমি ডায়েট করছি। এইসব জাঙ্ক ফুড খেলে আমি মোটা হয়ে যাব।”
শাপলা মুখ ভেংচি দিল। মনে মনে বলল, ‘ঢং দেখলে বাঁ*চি না!’
সিয়াম এবার শাপলার দিকে তাকাল, “কিরে শাপলা, তুই খাবি তো?”
শাপলা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “হ্যাঁ, আমি ঝালমুড়ি খাবো। সিয়াম ভাইয়া ঝালমুড়ি কিনে খাওয়াবে—এই সুযোগ হাতছাড়া করা যায় নাকি? আমি খাবো। আমি তো আর কারো মতো ডায়েট করি না।”
কথাটা সোজা জেরিনের গায়ে গিয়ে লাগল। শাপলা যে তাকে ঠ্যাস মেরে বলেছে, তা বুঝতে দেরি হলো না।

সিয়াম উঠে দাঁড়াতেই জেরিন বলে উঠল, “আমিও ঝালমুড়ি খাবো।”
শাপলা চোখ ছোট করে বলল, “কেন? আপনি না ডায়েট করেন? এসব জাঙ্ক ফুড খেলে তো আপনার সমস্যা হবে। আপনার এসব খাওয়ার দরকার নেই। বাড়ি ফেরার পথে কোনো রেস্টুরেন্ট থেকে বরং সালাদ খাবেন। আপনার জন্য ভালো হবে।”
জেরিন রাগে মুখ ভেংচি দিল, “তুমি চুপ করো তো! একটু খেলে কিছু হবে না।”
সিয়াম চলে গেল ঝালমুড়ি আনতে। বেঞ্চে বসে রইল শাপলা আর জেরিন। দুজন দুদিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে আছে। মাঝখানে বইছে বরফের মতো ঠান্ডা নীরবতা।
হঠাৎ জেরিন মুখ ঘুরিয়ে বলল, “এই শাপলা, তুই কেন আমাদের সাথে এলি?”
শাপলা কপাল কুঁচকে ফিরে তাকাল, “কেন, আপনার সমস্যা? যদি এতই সমস্যা, তাহলে সিয়াম ভাইয়া যখন আমাকে আপনাদের সাথে ঘুরতে আসতে বলল, তখন কেন তাকে বারণ করলেন না?”
“না, আমি কেন বারণ করব? হ্যাঁ!” জেরিন গলার স্বর নামিয়ে বলল, “তোর বোঝা উচিত ছিল, আমি আর সিয়াম আলাদা সময় কাটাবো বলেই তো বাইরে ঘুরতে এসেছি।”
শাপলা বলল, “আচ্ছা, সিয়াম ভাইয়া আসুক। তারপর হচ্ছে।”
জেরিন একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল, “আচ্ছা শাপলা, আমাকে আর সিয়ামকে একসাথে কেমন লাগে?”
শাপলা চাপা হাসি হেসে বলল, “কেন, আপনি জানেন না কেমন লাগে? আরে আপনাকে আর সিয়াম ভাইয়াকে একসাথে দাঁড় করালে – ভাইয়ের
বোনের মতো লাগে।”

জেরিনের চোখ বড় বড় করে বলল, “ধ্যাত! কী বলছিস এসব? তোর চোখ ভালো না।”
ঠিক তখনই সিয়াম ফিরে এলো। হাতে দুটো ঝালমুড়ির ঠোঙা। একটা জেরিনের দিকে বাড়িয়ে দিল।
জেরিন নাক ছিটকাল, “এ বাবা! এসব খাবো কীভাবে? কীসব দেওয়া এতে?”
শাপলা মুখ ভেংচে বলল, “খাবেন না যখন, আনতে বললেন কেন?”
তারপর সিয়ামের দিকে ফিরে চোখ ছোট করে বলল, “এই যে, আপনি আমাকে আপনাদের সাথে আনলেন কেন? আমি কি একবারও বলেছিলাম যে আপনাদের সাথে আসবো?”
সিয়াম অবাক শুরে শুধালো,
“কী হয়েছে আবার?”
শাপলা এবার গলায় খোঁচা মিশিয়ে বলল, “আমি যে আপনার সাথে এসেছি, এটা আপনার বেয়াইনের সহ্য হচ্ছে না। সে নাকি আপনার সাথে একা সময় কাটাতে চায়। তাহলে আমাকে কেন আনলেন?”
সিয়াম জেরিনের দিকে তাকাল, “এসব কি সত্যি?”
জেরিন তাড়াতাড়ি বলল, “আরে না! আমি এভাবে বলিনি। আমি তো শুধু বলছিলাম, শাপলার কষ্ট হচ্ছে আমাদের সাথে এসে।”
শাপলা তেতে উঠে বলল, “আমি কি একবারও বলেছি কষ্ট হচ্ছে? আমাকে যে আপনার সহ্য হচ্ছে না, সেটা বলেন না কেন? লুকোচুরি খেলছেন কেন?”

সিয়াম ধমকের সুরে বলল, “ঠিক আছে, এবার চুপ কর। আর ঘুরতে হবে না, এবার বাড়ি ফিরে যাবো।”
কথা শেষ করেই সিয়াম শাপলা জেরিন হাঁটা শুরু করল। খানিকটা দূর গিয়ে সিয়াম গাড়ির দরজা খুলে উঠে বসল।
জেরিন দৌড়ে এসে সামনের সিটে বসতে যাবে, ঠিক তখনই শাপলা এক ঝটকায় তাকে সরিয়ে দিয়ে নিজেই গট করে বসে পড়ল। জেরিন রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে শেষমেশ পেছনের সিটে বসতে বাধ্য হলো।
শাপলা সিয়ামের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে বলল, “ভাইয়া, আমার সিটবেল্টটা লাগিয়ে দিন তো।”
সবটা ইচ্ছে করেই করছে—জেরিনের গায়ে জ্বালা ধরানোর জন্য।
সিয়াম একটু ঝুঁকে পড়ল। শাপলার ঘাড় ছুঁই ছুঁই করে সিটবেল্টটা লাগিয়ে দিল। দুজনের মাঝের নৈকট্য দেখে জেরিনের বুকের ভেতরটা জ্বলে উঠল।
সিয়াম গাড়ি স্টার্ট দিল। কিছুক্ষণ সবাই চুপচাপ।
সিয়াম সামনে তাকিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে, কিন্তু আড়চোখে দেখছে শাপলার থমথমে মুখ আর ঠোঁটের কোণে চেপে রাখা বাঁকা হাসি।
হঠাৎ শাপলা পেছনে ফিরে জেরিনকে উদ্দেশ্য করে বলল, “আপা, আপনার বিয়ে হবে কবে?”

জেরিন ভ্রু কুঁচকে বলল, “এসব জেনে তুমি কী করবে?”
“না, এমনি কৌতূহল হলো।” শাপলা নিরীহ মুখে বলল।
জেরিন বলল, “যখন আমি আমার ভালোবাসার মানুষকে নিজের করে পাবো, তখন বিয়ে করব।”
সিয়াম জেরিন কে উদ্দেশ্য করে বলল, “আপনি আবার কাকে ভালোবাসেন?”
জেরিন একটু গর্ব করে বলল, “একজন নায়ককে ভালোবাসি।”
শাপলা অবাক হওয়ার ভান করে বলল, “কী বলেন আপা! আপনি একজন নায়ককে ভালোবাসেন? তার কিছু মুভির নাম বলেন তো, দেখবো।”
জেরিন থতমত খেয়ে বলল, “আরে, আমার নায়ক তো ছবি করে না।”
শাপলা অবাক শুরে শুধালো, “মানে কী? মুভি করে না, অথচ সে নায়ক?”
এই বলে সে খিলখিল করে হেসে উঠল। সিয়ামও শাপলার সাথে তাল মিলিয়ে হেসে উঠল।
জেরিনের মুখটা বিরক্তিতে কালো হয়ে গেল। রাগে ঠোঁট উল্টে বলল, “আমার ভালোবাসার মানুষ আমার কাছে নায়ক, বুঝেছো?”
শাপলা মাথা দুলিয়ে বলল, “ও আচ্ছা! আমি তো ভাবলাম সিনেমার হিরো।”
সিয়ামও যোগ দিল, “আপনি যে ভাবে বললেন, আমিও তাই ভেবেছি। আচ্ছা, আপনার নায়ককে একদিন দেখাবেন?”

জেরিন গর্বের সাথে বলল, “হ্যাঁ, অবশ্যই দেখাবো। দেখলে একদম টাসকি খেয়ে যাবে। এত সুন্দর, হ্যান্ডসাম আমার নায়ক!”
কিছুক্ষণ আবার চুপ। গাড়ির ভেতর শুধু ইঞ্জিনের গুনগুন আওয়াজ।
হঠাৎ শাপলা ইচ্ছে করেই জেরিনকে দেখিয়ে দেখিয়ে সিয়ামের গলার কাছে হাত বাড়াল। কোমল গলায় বলল, “একি! এটা কী? ভাইয়া, নড়বেন না। একটা পোকা বসেছে। সরিয়ে দিই।”
সিয়াম বুঝতে পারছে, এটা নিখাদ মিথ্যে। শাপলা শুধু জেরিনকে জ্বালাতে চাইছে।
আর জেরিন? সে রাগে কাঁপছে। চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে। ইচ্ছে করছে শাপলার হাতটা ধরে ভেঙে দিতে। কিন্তু সিয়াম সামনে বসে আছে বলে কিছু বলতে পারছে না।
গাড়ি টা এগোচ্ছে বাড়ির দিকে।

প্রায় অনেকটা সময় কেটে গেছে।
সিয়াম, জেরিন আর শাপলা বাড়িতে ফিরে এসেছে।
রাগে গজগজ করতে করতে জেরিন কবিতার ঘরে ঢুকেই
হ্যান্ডব্যাগটা সজোরে বিছানায় ছুঁড়ে ফেলল। শব্দটা ভারী হয়ে আছড়ে পড়ল ঘরের নীরবতায়।
কবিতা সোফায় বসে ছিল। জেরিনের কাণ্ড দেখে চমকে উঠে দাঁড়াল। কবিতা অবাক গলায় শুধালো,“জেরিন! তোমার কী হয়েছে? হ্যান্ডব্যাগটা বিছানায় ছুঁড়ে ফেললে কেন?”
জেরিন নিজের চুলগুলো মুঠো করে টানতে টানতে বলল, “এছাড়া আর কী করব বলো! আমার সব প্ল্যানে পানি ঢেলে দিয়েছে ওই ফা*লতু মেয়ে টা!”
কবিতা কপাল কুঁচকাল, “আমি তো তোমার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না। খুলে বলো তো।”
জেরিনের গলা রাগে কাঁপছে। “তোমাদের বাড়ির অসহ্য মেয়েটা—শাপলা! ও সবকিছু লন্ডভন্ড করে দিয়েছে। আমি চেয়েছিলাম সিয়ামের সাথে একটু ভালো সময় কাটাবো, ওকে আমার প্রতি আ*কৃষ্ট করব। কিন্তু হলো কোথায়? ওই ফা*লতু শাপলা আমাদের সাথে গিয়ে এসব নষ্ট করে দিল!”
একটু থেমে চোখ সরু করে বলল, “আচ্ছা ভাবি, এমনটা নয় তো… শাপলা সিয়ামকে ভালোবাসে?”

জেরিনের কথা শুনে কবিতা হঠাৎ হেসে উঠল। ঠোঁটের কোণে বিদ্রূপের রেখা।
“আরে, এটা কীভাবে সম্ভব?”
“সম্ভব না হলে কী হবে!” জেরিন বিরক্তিতে দাঁত চেপে বলল, “শাপলা যেভাবে সিয়ামের কাছে ঘেঁষে থাকে, যেভাবে ওর সাথে কথা বলে—দেখলেই বোঝা যায়। হয়তো শাপলা সিয়ামকে ভালোবাসে।”
কবিতা ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। তার চোখে খেলছে হিসেবি চাহনি।
“আচ্ছা, ধরে নিলাম শাপলা সিয়ামকে ভালোবাসে। কিন্তু সিয়াম কখনো শাপলাকে ভালোবাসবে না। এটা নিশ্চিত।”
সে একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল, “আগে এটা ভালো করে সিওর হতে হবে—শাপলা আসলেই সিয়ামকে ভালোবাসে কিনা। তুমি কোনো চিন্তা কোরো না জেরিন। শাপলা কিছু করতে পারবে না।”
কথাটা বলে কবিতা ঠোঁট বাঁকাল, চোখে চকচক করে উঠল শীতল দীপ্তি।
“ওকে কীভাবে এই বাড়ি থেকে তাড়াতে হয়, এবার সেটাই ভাবতে হবে।”
ঘরের বাতাসটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। দুই মেয়ের চোখে এখন একই ছায়া—ষড়*য*ন্ত্রের ছায়া।

ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। ঘড়িতে এখন সাতটা।
শাপলা পড়ার টেবিলে বসেছে মাত্র। মনটা বইয়ের পাতায় আটকাতে না আটকাতেই হঠাৎ তীক্ষ্ণ রিংটোনে চমকে উঠল। গুটি গুটি পায়ে সে বিছানার কাছে গেল। বালিশের নিচ থেকে ফোনটা বের করে দেখল—অচেনা নম্বর।
বুঝতে দেরি হলো না, এটা নিশ্চয়ই দীপা যে আনিক নামের ছেলেটাকে নাম্বার দিয়েছিল, সেই-ই।
ফোন বাজছেই।
শাপলা বিরক্ত হয়ে কেটে দিল। আবার বাজল। আবার কেটে দিল। তবুও থামছে না।
শেষমেশ রাগে গজগজ করতে কলটা রিসিভ করল।
“এই, আপনার সমস্যা কী হ্যাঁ?” গলায় আ*গুন ঝরছে। “দেখছেন যে কল কেটে দিচ্ছি, তবুও কেন বারবার ফোন দিচ্ছেন?”
ওপাশ থেকে ছেলেটার গলা ভেসে এলো, বেশ নির্লজ্জ।
“তোমার সাথে কথা বলার জন্য ফোন দিয়েছি। এত রাগ করো কেন?”
শাপলা দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আপনার আ* জা*ইরা ফালতু কথা শোনার সময় আমার নেই। নিজের পরিচয় দিন।”

“তুমি আমাকে চিনো না? আমি আনিক। তোমারই স্কুলে পড়ি, তোমার সিনিয়র।”
শাপলা বিদ্রূপ করে বলল, “তা কী বলবেন বলে এতবার ফোন দিচ্ছেন?”
আনিক এবার সোজা গলায় বলল, “আমি তোমাকে ভালোবাসি। এটা বলতেই ফোন দিয়েছি।”
শাপলার মাথায় র*ক্ত চড়ে গেল।
“আমার আপনার আ*জাইরা কথা শোনার সময় নেই। আর কখনো ফোন দেবেন না।”
আনিক হেসে উড়িয়ে দিল, “দেবো। অবশ্যই দেবো। আমি তোমাকে ভালোবাসি, তুমি আমার সাথে প্রেম করবে, প্লিজ।”

শাপলা ঠান্ডা গলায় বলল, “না। আমি আপনার সাথে প্রেম করব না। দয়া করে আর বিরক্ত করবেন না।”
“কেন করবে না?” আনিকের গলায় আত্মতুষ্টি। “আমি কি দেখতে খারাপ? স্কুলের সব মেয়ে আমার জন্য পাগল। আর তুমি বলছো প্রেম করবে না? একবার ভেবে দেখো, স্কুলের সব মেয়ের ক্রাশ তোমাকে ভালোবাসে, আর তুমি তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছো। এটা ঠিক হচ্ছে না।”
শাপলা আর ধৈর্য রাখতে পারল না।
“অনেকক্ষণ ধরে আপনার ফালতু বকবক শুনছি। এবার থামুন। আমি আগেই বলেছি, এখনো বলছি—না। আমি আপনার সাথে প্রেম করব না। আর ফোন দিলে ব্লক করে দেবো।”
আনিক নির্লজ্জের মতো হাসল, “তুমি আমার কয়টা নম্বর ব্লক করবে? একসময় ব্লক করতে তুমিই বিরক্ত হয়ে যাবে। তার চেয়ে বরং আমার সাথে প্রেম করো। বিশ্বাস করো, আমার সাথে প্রেম করে অনেক ম*জা পাবে। প্রতিরাতে রো*মা*ন্টিক কথা বলে তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে দেবো।”

এই কথা শুনে শাপলার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল।
রাগে তার গলা কাঁপছে।
“উফ! চুপ কর তো!” সে চিৎকার করে উঠল। “তোর রো*মা*ন্টিক কথা ধুয়ে পানি খা। ফা*লতু, বেয়া*দব ছেলে একটা! যেসব মেয়ে তোকে দেখে ক্রাশ খায়, তাদের রুচিতে দুর্ভিক্ষ নেমেছে। তোর মতো অ*সভ্য, বে*হায়া ছেলের সাথে প্রেম করা তো দূরের কথা, কথা বলাও পাপ।”
কথাগুলো বলে শাপলা ধড়াম করে ফোনটা কেটে দিল।
বুকটা তখনো ধকধক করছে রাগে।
রাতের নিস্তব্ধতা যেন তার ভেতরের আ*গুনটাকে আরও উসকে দিচ্ছে।
শাপলা আবার বই নিয়ে বসলো, কিন্তু কিছুতেই মন বসাতে পারলো না। বিরক্তিতে বইটা বন্ধ করে রাখলো সে।
ধীর পায়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল নিরব আহমেদের রুমের দিকে। ছোট ছোট পায়ে এগিয়ে দরজায় আলতো করে টোকা দিলো। টোকা পড়তেই দরজা ক্যাঁচ করে খুলে গেল যেন তার জন্যই অপেক্ষা করছিল।

ভেতরে ঢুকে দেখলো, ঘর ফাঁকা। শুধু নিরবতা।
শাপলা গলা খাটো করে ডাকলো, “নিরব ভাইয়া? আপনি কি ওয়াশরুমে?”
ভেতর থেকে পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দ ভেসে এলো।
“হ্যাঁ, তুই বস। আমি গোসল করে আসছি,” নিরবের গলা শোনা গেল।
সারাদিন অফিসের ক্লান্তি মেটাতেই এখন গোসলে ঢুকেছে সে।
শাপলার চোখ গেল টেবিলের উপর রাখা ল্যাপটপটায়। স্ক্রিন জ্বলছে। ওয়ালপেপারে একজোড়া চোখ।
থমকে গেল শাপলা।
এমন চোখ সে জীবনে দেখেনি। গভীর, টলটলে, যেন কথা বলে। পাপড়িতে হালকা কাজল, অন্ধকার রাতের মতো কালো মণি। এক পলকেই মন কেড়ে নেয়।

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ১৮

শাপলা নিঃশব্দে এগিয়ে গেল। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেই চোখের দিকে। সময় যেন থেমে গেল মুহূর্তের জন্য। ল্যাপটপের স্ক্রিনে ভাসা চোখ দুটো আর তার নিজের ভাবনার মাঝে হারিয়ে গেল সে।
আর কিছু ভাবতে পারলো না শাপলা। শুধু মনে হলো—এই চোখের পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো গল্প, যা সে জানতে চায়।

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ২০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here