রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ২০
মহাসিন
শাপলা চোখ দুটো মন ভরে দেখতে লাগল।
কী অসম্ভব সুন্দর চোখ!
মনে মনে বিড়বিড় করল, ‘এটাই কি নিরব ভাইয়ার ভালোবাসার মানুষের চোখ? চোখও এত সুন্দর হয়?এই চোখের সৌন্দর্যের কাছে অলকানন্দ ফুলের সৌন্দর্যও হার মানতে বাধ্য।
চোখ দুটো যখন এত মায়াবী, তাহলে যার চোখ, সে কতটা সুন্দর হবে?’
এই চোখ দুটো দেখে শাপলার ভেতরটা কেমন ছটফট করে উঠল। নিরবের ভালোবাসার মানুষটাকে দেখার আগ্রহটা আরো বেড়ে গেল কয়েকগুণ।
এত সুন্দর চোখ শাপলা জীবনে কখনো দেখেনি। বহুক্ষণ কেটে গেল, তবুও শাপলার চোখ সরল না স্ক্রিন থেকে।
ঠিক তখনই নিরব আহমেদ গোসল সেরে ফিরে এলো। ভেজা চুলগুলো কপালে লেপ্টে আছে। গায়ে সাদা টিশার্ট, পরনে ট্রাউজার।
গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এসে হেসে বলল,
“কিরে শাপলা, অমন করে কী দেখছিস?”
নিরবের কণ্ঠস্বর শুনে শাপলা চমকে টেবিলের কাছ থেকে সরে দাঁড়াল। তারপর একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল,
“ভাইয়া, এই চোখ দুটো কার?”
নিরব ল্যাপটপের দিকে একপলক তাকিয়ে হালকা হাসল,
“মানুষের।”
শাপলা মুখ ভেংচি কাটল,
“ধ্যাত! আমিও তো জানি মানুষের। কিন্তু এই চোখ দুটোর কার ?”
নিরব চোখ দুটো আবার দেখল। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে কোমল হাসি খেলে গেল।
“আমি যাকে ভালোবাসি, তার চোখ। এই অসম্ভব সুন্দর চোখ দুটো দেখেই তো আমি তার প্রেমে পড়েছি। একবার তাকালে আর নজর সরানো যায় না।”
শাপলা সত্যি মুগ্ধ হয়ে বলল,
“হ্যাঁ ভাইয়া, চোখ দুটো সত্যিই অনেক সুন্দর। আমি কখনো এমন চোখ দেখিনি। আজই প্রথম দেখলাম।”
নিরব দীর্ঘশ্বাস ফেলল বলল,
“জানি না এই সুন্দর চোখের মেয়েটাকে আমি পাবো কি না। যদি তাকে না পাই, তাহলে সারাজীবন আফসোসেই কাটবে আমার।”
শাপলা গম্ভীর হয়ে বলল,
“ভাইয়া, আপনি মেয়েটাকে প্রপোজ করে দিন। নাহলে আপনার আগেই যদি কেউ তাকে প্রপোজ করে বসে, আর সে যদি তার হয়ে যায় তাহলে তো আর ফিরে পাবেন না।”
নিরব মাথা নিচু করল। গলায় একটা চাপা ভয়,
“ভয় হয়… যদি সে আমাকে ফিরিয়ে দেয়? সেই ভেবেই সাহস পাই না।”
শাপলা আবার ছবিটার দিকে তাকাল।
“মেয়েটার চোখ দুটো সত্যিই অসম্ভব সুন্দর। আমার এখন আরও বেশি ইচ্ছে করছে তাকে দেখার। প্লিজ ভাইয়া, তার একটা ছবি দেখান না।”
নিরব মাথা নাড়ল,
“ছবি দেখতে হবে না। একদিন সরাসরি দেখিস।”
শাপলা অধৈর্য হয়ে বলল,
“কবে আসবে সেই দিন?”
“সময় হলেই আসবে।” (নিরব বলল)
“এখন দেখালে কী হবে?” শাপলা নাছোড়বান্দা।
“কিছু হবে না। তবুও এখন দেখাতে চাই না,” নিরব দৃঢ় গলায় বলল।
আর কিছু বলার আগেই দরজায় মৃদু টোকা পড়ল।
জেরিন দরজার ওপাশ থেকে শুধালো, “ভিতরে আসতে পারি?”
নিরব হেসে বলল, “হ্যাঁ অবশ্যই।”
জেরিন ভেতরে ঢুকে ভ্রু নাচিয়ে বলল, “কী কথা হচ্ছে শুনি? আমিও কি জয়েন হতে পারি? একা রুমে বসে থাকতে ভালো লাগছিল না, তাই চলে এলাম।”
শাপলা আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। তড়িঘড়ি করে বলল, “আচ্ছা, আমি আবার পরে আসবো।”
এই বলে গুটি গুটি পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
জেরিন মুখ ভেংচি দিল।
আর শাপলা সোজা হেঁটে চলে গেল নীলাঞ্জনার ঘরের দিকে।
নীলাঞ্জনা ড্রেসিং টেবিলের পাশে বসে চুল আঁচড়াচ্ছিল।
ঠিক তখনই শাপলা নিঃশব্দে এসে তার পাশে বসল।
“ভাবি, আলো কোথায়?” শাপলা জিজ্ঞেস করল।
নীলাঞ্জনা আয়নার দিকে তাকিয়েই বলল, “মায়ের ঘরে গেছে।”
একটু থেমে হঠাৎ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, “আচ্ছা, তুমি কি এখনো ভাবা শেষ করোনি?”
শাপলা ভ্রু কুঁচকে বলল, “মানে? বুঝলাম না।”
নীলাঞ্জনার ঠোঁটে মৃদু হাসি, “এই যে সিয়ামকে ভালোবাসো—সেটা।”
শাপলার গাল হালকা লাল হয়ে উঠল।
“আমি… আমি সিয়াম ভাইয়াকে ভালোবেসে ফেলেছি, ভাবি। এখন বলব কি না, সেটাই ভাবছি।”
নীলাঞ্জনা গম্ভীর হয়ে বলল, “যদি সত্যি ভালোবাসো, তাহলে বলে দাও। বেশি দেরি করলে আবার হারিয়ে ফেলবে।”
শাপলার চোখে দ্বিধা, “কিন্তু আমাদের এই সম্পর্ক… এই বাড়ির সবাই মেনে নেবে তো?”
নীলাঞ্জনা একটু থামল। তার চোখে ছায়া পড়ল।
“জানি না। সবাই মেনে নিলেও বাবা হয়তো মেনে নেবে না। বাবা এসব প্রেম-ভালোবাসা একদম পছন্দ করেন না। আর তার উপর আমি যা শুনেছি—”
কথাটা অসমাপ্ত রেখেই থেমে গেল নীলাঞ্জনা।
শাপলা উদ্বিগ্ন হয়ে বলল, “কী হলো থেমে গেলেন কেন? পুরো কথাটা বলুন।”
নীলাঞ্জনা মাথা নাড়ল, “না শাপলা, আমি বলতে পারব না। কিছু কথা গোপন থাকাই ভালো।”
একটু থেমে আবার বলল, “আচ্ছা শাপলা, তোমাকে একটা কথা বলব? শুনবে?”
“কী বলেন?”
নীলাঞ্জনার গলা নিচু হয়ে এলো, “তুমি সিয়ামের সাথে প্রেম কোরো না। ওর সাথে কোনো সম্পর্ক জড়িয়ো না। পরে কিন্তু অনেক কষ্ট পাবে। এটা তোমার ভালোর জন্যই বলছি।”
শাপলা অবাক হয়ে বলল, “মানে কী? কেন কষ্ট পাবো?”
নীলাঞ্জনা চোখ নামিয়ে নিল, “আমি বলতে পারব না। সময় হলে নিজেই বুঝবে।”
শাপলা আর জোর করল না। শুধু বলল, “যাই হোক, এসব পরে দেখা যাবে। এখন একটা কথা বলব, কাউকে বলবেন না তো?”
নীলাঞ্জনা মৃদু হাসল, “তোমার যা ইচ্ছা শেয়ার করতে পারো। আমি কাউকে বলব না।”
শাপলার চোখ চকচক করে উঠল, “সিয়াম ভাইয়া আমাকে একটা ফোন কিনে দিয়েছে। অনেক সুন্দর ফোনটা! আচ্ছা, আমি এখুনি গিয়ে নিয়ে আসি।”
এই বলে সে দৌড়ে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর ফোনটা হাতে নিয়ে ফিরে এলো। নীলাঞ্জনার সামনে ধরে বলল, “দেখুন ভাবি! সুন্দর না ফোনটা?”
নীলাঞ্জনা ফোনটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে দেখল।
“হ্যাঁ, খুব সুন্দর।”
ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠল।
নীলাঞ্জনা ফোনটা শাপলার হাতে ফিরিয়ে দিল।
শাপলা স্ক্রিনের দিকে তাকাল। আনিক কল দিয়েছে।
সে বিরক্ত হয়ে কল কেটে দিল।
কিন্তু কল থামল না।
আবার বাজল।
আবার কাটল।
আবার বাজল।
আবার কাটল।
একটার পর একটা কল আসতেই থাকল।
শাপলার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। রাগে তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
ঘরের ভেতর এখন শুধু ফোনের একঘেয়ে রিংটোন আর দুই মেয়ের নীরব অস্বস্তি।
নীলাঞ্জনা ভ্রু কুঁচকে তাকাল, “একি শাপলা! তুমি বারবার কল কেটে দিচ্ছো কেন? একবার রিসিভ করো তো।”
শাপলা অনিচ্ছা সত্ত্বেও কলটা রিসিভ করল। গলা যতটা সম্ভব কঠিন করে বলল,
“এই, আপনার সমস্যা কী? কতবার বলব, আমি আপনার সাথে প্রেম করব না। তবুও কেন বারবার ফোন দেন?”
শাপলার কথা শুনে নীলাঞ্জনা চমকে উঠল।
ওপাশ থেকে আনিকের গলা ভেসে এলো, বেশ নির্লজ্জ।
“তুমি কেন বোঝো না, আমি তোমাকে ভালোবাসি। তুমি আমার সাথে প্রেম করো, প্লিজ। এমন কোরো না।”
শাপলা রাগে ফুঁসে উঠল,
“এই চুপ কর, বে*য়া*দব! তোর সাথে আমি প্রেম করব না কতবার বলতে হবে? তোর মন মানসিকতা জঘন্য, নোংরা। তোর সাথে প্রেম করা মানে আ*গুনে ঝাঁপ দেওয়া।”
আনিক হাসল, যেন কিছুই গায়ে মাখছে না।
“না, তুমি ভুল বলছো। আমার সাথে প্রেম করা মানে স্বর্গে বাস করা। তুমি আমার সাথে প্রেম করো, দেখবে পৃথিবীতে বসেই স্বর্গের সুখ পাবে।”
শাপলা তাচ্ছিল্যের সাথে বলল,
“তোর সুখ ধুয়ে পানি খা। ফা*লতু ছেলে একটা! মাথায় কি একটাও কথা ঢোকে না? কতবার বলছি তোর সাথে প্রেম করব না, তবুও কেন ফোন দিস?”
নীলাঞ্জনা এতক্ষণ চুপ ছিল। এবার ধৈর্য হারিয়ে শাপলার দিকে তাকিয়ে বলল,
“কে এই অ*সভ্য ছেলেটা?”
শাপলা বিরক্তিতে বলল, “আমাদের স্কুলের একটা ছেলে। আমি স্পষ্ট বলে দিয়েছি তার সাথে প্রেম করব না, তবুও ফোন দিয়ে ডিস্টার্ব করে। নোং*রা কথা বলে।”
নীলাঞ্জনা হাত বাড়িয়ে দিল, “ফোনটা আমার কাছে দাও।”
শাপলা ফোনটা ধরিয়ে দিল।
নীলাঞ্জনা গলা নামিয়ে শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় বলল,
“হ্যালো, কে তুমি?”
ওপাশ থেকে আনিকের গলা, “আপনি আবার কে?”
“আমি শাপলার ভাবি। তুমি কে?”
“আমি আনিক। শাপলার স্কুলে পড়ি।”
নীলাঞ্জনার গলায় কাঠিন্য,
“শাপলাকে বারবার ফোন দিয়ে ডিস্টার্ব করছো কেন?”
আনিক নির্বিকার,
“আমি মোটেও ডিস্টার্ব করছি না। আমি শাপলাকে ভালোবাসি। নিজের ভালোবাসার মানুষকে কি কেউ ডিস্টার্ব করতে পারে?”
নীলাঞ্জনা ধৈর্য ধরে বলল,
“কিন্তু শাপলা তো তোমাকে ভালোবাসে না। এটা তো বুঝতে হবে। কেউ যদি তোমাকে ভালো না বাসে, তাকে জোর করা যায় না।”
আনিকের গলায় আবদার,
“আপনি একটু শাপলাকে বোঝান না। ও যেন আমার সাথে প্রেম করে। আমি ওকে অনেক ভালোবাসবো, অনেক রো*মা*ন্স করবো….”
আর কিছু বলার আগেই নীলাঞ্জনা তাকে থামিয়ে দিল।
“এই চুপ! আর একটা কথাও না। বে*য়া*দব ছেলে, মুখে কোনো লাগাম নেই দেখছি। যা মুখে আসছে তাই বলিস। শাপলা একদম ঠিক কাজ করেছে তোর সাথে প্রেম না করে।”
আনিকের গলা বদলে গেল। রূঢ়, অভদ্র।
“এই অ*স*ভ্য মহিলা, চুপ কর ! তোর ফা*লতু কথা শোনার জন্য ফোন দিইনি।”
নীলাঞ্জনার চোখ কঠিন হয়ে উঠল।
“এই ছেলে, কথাবার্তা সাবধানে বল। সামনে পেলে এক চ*ড় মেরে মুখের সব কটা দাঁত ফেলে দিতাম। তোকে কীভাবে শিক্ষা দিতে হয়, তা আমি খুব ভালো করেই জানি।”
এই বলে সে ধড়াম করে কল কেটে দিল।
শাপলার দিকে ফিরে শান্ত অথচ কঠিন গলায় বলল,
“ছেলেটা অত্যন্ত নোং*রা। তোমার স্কুল খুলুক, তখন দেখো আমি কী করি।”
তারপর নাম্বারটা ব্লক করে দিল।
“আমি নাম্বার ব্লক করে দিলাম। এরপর যত নাম্বার দিয়েই ফোন দিক, তুমি সঙ্গে ব্লক করে দেবে।”
শাপলা মাথা নাড়ল, গলায় স্বস্তির সুর,
“আচ্ছা ভাবি। এখন আসি তাহলে।”
এই বলে শাপলা নীলাঞ্জনার ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে চলে এলো।
বুকের ভেতর তখনো দাউদাউ করে জ্ব*লছে রাগের আ*গুন। সে সোজা জানালার কাছে গিয়ে দুই হাতে জানালাটা খুলে দিল।
বাইরে আকাশে চাঁদটা ঝলমল করছে। রূপালি আলো ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু সেই স্নিগ্ধতাও শাপলার ভেতরের অশান্তি ছুঁতে পারল না।
এর পর দীপাকে কল দিল।
ওপাশ থেকে দীপার কণ্ঠ ভেসে এলো, বেশ কৌতুক মেশানো।
“কিরে, কী অবস্থা? তোর প্রেম কেমন চলছে?”
শাপলা রাগে ফুঁসে উঠল।
“এই শয়*তা*ন মেয়ে, একটা কথাও বলবি না! তোকে এত মাতব্বরি করতে কে বলেছে? তোকে যদি এখন সামনে পেতাম, তোর মাথার একটা চু*লও রাখতাম না!”
দীপা থতমত খেয়ে বলল, “ওরে বাবা! এত রাগ করিস না। কী হয়েছে, সব খুলে বল।”
শাপলা দম নিয়ে বলল,
“আমি ওই ফালতু ছেলেটাকে প্রথমেই স্পষ্ট বলে দিয়েছি—আমি ওর সাথে প্রেম করব না। কিন্তু ও শোনে না। বারবার কল দেয়, নোং*রা নোং*রা কথা বলে। এমনকি আমার ভাবি যখন ওকে বোঝাতে গেল, ও আমার ভাবির সাথেও খারাপ ব্যবহার করেছে।”
দীপার গলার কৌতুহল মুছে গেল। সে গম্ভীর হয়ে বলল,
“আচ্ছা, আমি দেখছি।”
এই বলে কলটা কেটে দিল।
শাপলা ফোনটা টেবিলে ছুঁড়ে রেখে চেয়ারে বসে পড়ল।
চোখ তুলে তাকাল আকাশের দিকে।
ঠিক তখনই কবিতা শাপলার ঘরে ঢুকল।
চোখে-মুখে বিদ্রূপের ছায়া।
ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “কিরে শাপলা, তোর কপালটা তো দেখছি সত্যিই ভালো।”
শাপলা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। কবিতার দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল, “মানে? বুঝলাম না।”
কবিতা ঘরের চারপাশে পায়চারি করতে করতে বলল,
“আরে, বলছি তোর কপালটা সত্যিই ভালো। দেখছিস না, অন্যের বাড়িতে এসে কীভাবে একটা রুম দখল করে বসে আছিস? তা, এই বাড়িতে কি সারাজীবন থাকার ধান্দা করছিস নাকি?”
শাপলার কপাল কুঁচকে গেল।
“আপনি যেভাবে বলছেন, মনে হচ্ছে এই বাড়িটাই আমি নিজের নামে লিখিয়ে নিয়েছি।”
কবিতা এগিয়ে এসে শাপলার মুখের খুব কাছে দাঁড়াল।
“এখনো লিখিয়ে নিস নায়, তবে লিখিয়ে নেওয়ার ধান্দা করছিস।”
গলা নামিয়ে বলল, “তুই এত সিয়ামের আশেপাশে ঘুরঘুর করিস কেন রে? আমার ভাইয়ের গলায় ঝুলে পড়ার ধান্দা নাকি?”
শাপলার চোখ বড় হয়ে গেল।
“আপনি এসব কী ধরনের কথাবার্তা বলছেন?”
কবিতা হাসল, সেই হাসিতে বি*ষ মেশানো।
“আমি যা বলছি, ঠিকই বলছি। তুই একদম তোর মায়ের মতো হয়েছিস। তোর মা যেমন তোর বাবাকে ফাঁদে ফেলে বিয়ে করেছিল, তুইও কি সেই রকম চিন্তা করছিস?”
শাপলার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
“আপনি আমার মাকে নিয়ে কথা বলছেন কেন? আমার মা আমার বাবাকে ফাঁদে ফেলে বিয়ে করেছে—আপনি কি তখন সাথে ছিলেন?”
কবিতা ঠোঁট উল্টাল,
“আমি কীভাবে থাকব? আমার তো তখনো জন্মই হয়নি। তবে কি জানিস তো, কোনো ঘটনা ঘটলে সেটা রটেও।”
একটু থেমে গলা চড়াল,
“তোকে সাবধান করে দিচ্ছি—আমার ভাইয়ের আশেপাশে তোকে যেন আর না দেখি। যদি দেখি, তাহলে তোর অবস্থা খুব খারাপ হবে। কাউকে মুখ পর্যন্ত দেখাতে পারবি না। বলে দিলাম।”
কথাগুলো ছুরির মতো বিঁধিয়ে দিয়ে কবিতা রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
দরজাটা বন্ধ হওয়ার শব্দটা বাজল বাজের মতো।
শাপলা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না।
ধুপ করে মেঝেতে বসে পড়ল।
চোখের কোণ বেয়ে শ্রাবণের মেঘের মতো নেমে এলো অশ্রুধারা।
রাত এখন গভীর। ঘড়ির কাঁটা ছুঁয়েছে দশটা।
সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে বাড়ির সবাই খাওয়া দাওয়া সেরে যে যার মতো গুছিয়ে নিয়েছে। নীলাঞ্জনা শেষবারের মতো রান্নাঘরটা দেখে, ঘর দোর গুছিয়ে গুটি গুটি পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিজের রুরের দিকে এগোল।
দরজা ঠেলে ভেতরে পা রাখতেই চোখ আটকে গেল আরিফের ওপর।
আরিফ বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আছে। গায়ে জা*মা নেই, পরনে শুধু এ*কটা কালো জিন্স। ম্লান আলোয় তার সুঠাম গড়নটা যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
নীলাঞ্জনা ধীরে দরজাটা আটকে দিল।
আরিফ এক মুহূর্ত দেরি করল না। উঠে এসে দুই হাতে তাকে জ*ড়িয়ে ধরল।
নীলাঞ্জনার সারা শরীরে শিহরণ বয়ে গেল।
“একি! কী করছেন? আলো দেখে ফেলবে তো!”
আরিফ তার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল,
“আলোকে অনেক আগেই মায়ের ঘরে পাঠিয়ে দিয়েছি। এখন এখানে শুধু তুমি আর আমি।”
একটু থেমে দুষ্টু হেসে যোগ করল, “চলো, আরেকটা বাচ্চা নে*ওয়ার মিশনে নেমে পড়ি।”
নীলাঞ্জনা লজ্জায় কুঁকড়ে গিয়ে তাকে হালকা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল।
গাল দুটো টমেটোর মতো লাল, কান গরম হয়ে উঠেছে। বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা এমনভাবে লাফাচ্ছে, যেন পাঁজর ভেদ করে বেরিয়ে আসবে।
কাঁপা গলায় বলল, “না… আর বাচ্চা নিবো না।”
আরিফ হাসল। ধীরে এগিয়ে এসে আবার তার কানের কাছে মুখ নিল।
“ঠিক আছে, বাচ্চা নিতে হবে না। আমাকে স্যা*টিস*ফাই করো, তাহলেই হবে।”
নীলাঞ্জনা শুকনো ঢোঁক গিলল, “মানে?”
আরিফ তার চোখে চোখ রেখে বলল, “মানে বুঝতে চাও?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে তো আমার প্যা*ন্ট*টা খু*ল*তে হবে।”
নীলাঞ্জনা মুখ ঘুরিয়ে নিল, “ধ্যাত! কী সব বলছেন!”
আরিফ এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এসেছে।
ফিসফিস করে বলল, “অনেক হ*ট হয়ে আছি। আমার আ*গুন নেভাবে কে, বলো? তুমি ছাড়া আর কে আছে?”
নীলাঞ্জনার ঠোঁট কাঁপছে। লজ্জায় মাথা তুলতে পারছে না।
আরিফ আর সময় নষ্ট করল না। আলতো করে তাকে ধরে বিছানায় শুইয়ে দিল।
তারপর নিজেও তার ওপর ঝুঁ*কে পড়ল।
প্রথমে নীলাঞ্জনার কোমল ঠোঁ*টে ছুঁইয়ে দিল নিজের ঠোঁ*ট।
ধীরে, গভীরে। যেন বছরের সব না বলা কথা সেই একটা স্প*র্শেই বলে দিতে চায়।
তারপর কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করল,
“ আমি শুধু তোমাকে চাই, বউ।”
কথাটা বলেই সে নীলাঞ্জনার গলায়, গলার বাঁকে ছোট ছোট চু*মু আঁকতে লাগল।
নীলাঞ্জনার সারা শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল।
লজ্জা, সংকোচ সব ভুলে সে আরিফের পিঠে ন*খ ব*সিয়ে দিল। দুই হাতে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, যেন ছেড়ে দিলে এই মুহূর্তটা হারিয়ে যাবে।
বাইরে নিস্তব্ধ রাত। ঘরের ভেতর দুটি হৃদয়ের স্পন্দন এক হয়ে মিশে গেল।
কথা ফুরিয়ে গেল, রয়ে গেল শুধু নিঃশ্বাসের উষ্ণতা আর ভালোবাসার নীরব ভাষা।
রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ১৯
জেরিন মুখ গোমড়া করে চুপচাপ বসে আছে। চোখে মুখে চাপা অস্থিরতা।
কবিতা ওর পাশে এসে বসে মৃদু গলায় বলল, “এমন করে বসে আছো কেন? কী হয়েছে?”
জেরিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। গলার স্বরটা একটু কেঁপে উঠল।
“আমি যদি সিয়ামকে প্রপোজ করি, আর ও যদি ফিরিয়ে দেয়… ভাবতেই কেমন যেন খারাপ লাগছে।”
কবিতা হালকা হেসে ওর হাতটা চেপে ধরল।
“আরে আমি তো আছি। চিন্তা করো না।”
জেরিন একটু থেমে ধীরে জিজ্ঞেস করল,
“আচ্ছা, শাপলাকে কিছু বলেছিলে?”
