Home রোমান্টিক ভাইয়া রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৮

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৮

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৮
মহাসিন

সিয়ামকে অ*র্ধন”গ্ন অবস্থায় দেখে শাপলার নিঃশ্বাস আটকে গেল।
ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসা পুরুষটার ভেজা চুল থেকে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ছে চওড়া কাঁধ বেয়ে। কোমরে শুধু একটা কালো টাওয়েল, বুকের পেশির খাঁজে খাঁজে নেমে যাচ্ছে পানির ধারা। সেই ধারা নাভির গভীরে হারিয়ে যাচ্ছে নিঃশব্দে।চোখ দুটো শান্ত, কিন্তু অতল। শাপলার ওপর স্থির হয়ে আছে সেই দৃষ্টি।
শাপলা হতভম্ব। গলা শুকিয়ে কাঠ। হাতের খাতাটা খামচে ধরল সে। লজ্জা, ভয় আর শরীর কাঁপানো অচেনা শিহরণ একসাথে আছড়ে পড়ল তার ওপর। চোখ নামাতে গিয়েও পারল না। সিয়ামের ভেজা শরীর, পানির ফোঁটা, উন্মুক্ত বুক—সব মিলিয়ে কোনো অদৃশ্য শেকলে বেঁধে ফেলেছে তাকে।

সিয়াম ঠোঁট বাঁকাল। গলায় নামল ভারী,শক্ত করা স্বর,
“কিরে, এভাবে কী দেখছিস? আমার এই শ*রীরে প্রেমে পড়ে গেলি নাকি? তুই যদি চাস তাহলে টাওয়েলটা খু*লেই ফেলি?”
শাপলার বুকের ভেতর হাতুড়ি পিটতে লাগল। ঢোক গিলে কোনোমতে বলল, “আমি… আমি পরে আসব।”
সিয়াম মাথা নাড়ল। মুচকি হেসে বলল, “কোথাও যেতে হবে না। এখানেই বোস।”
কথা শেষ করেই আলমারি থেকে ট্রাউজার আর গেঞ্জি নিয়ে আবার ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল সে।
শাপলা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। যেন এতক্ষণ বুকের ওপর পাথর চাপা ছিল। হাতে থাকা খাতা খামচে ধরে নিজেকে সামলাল সে।
কিছুক্ষণ পর সিয়াম ফিরে এলো। পরনে এখন কালো ট্রাউজার, ধূসর গেঞ্জি। ভেজা চুল কপালে লেপ্টে আছে। কিন্তু চোখের সেই গভীরতা কমেনি একটুও।
শাপলার পাশে এসে বসল সে। শরীরের উত্তাপ ছুঁয়ে গেল শাপলাকে।
“কোন অঙ্ক পারিস না?”

শাপলা কথা বলতে পারল না। শুধু কাঁপা হাতে খাতাটা এগিয়ে দিল। সিয়াম অঙ্কটা দেখে শব্দ করে হেসে উঠল,
“এই সামান্য অঙ্কটা পারিস না তুই?”
শাপলা বিরক্তি চেপে বলল, “এতে হাসার কী আছে, হ্যাঁ?”
সিয়াম হাসি থামাল না। বরং আরও ঝুঁকে এল। কলমটা নিজের হাতে নিয়ে শাপলার আঙুল ছুঁয়ে ধরল। শাপলা কেঁপে উঠল।
সিয়াম ফিসফিস করল, “রাগ করিস না, পিচ্চি বউ। তোর রাগটাও আমার নে*শা।”
তারপর গভীর গলায়, ধীরে ধীরে অঙ্কটা বোঝাতে লাগল। শাপলার কানে কোনো সূত্র ঢুকছে না। ঢুকছে শুধু সিয়ামের নিঃশ্বাস, গায়ের ভেজা গন্ধ, আর আঙুলের স্পর্শ। বাইরে রাত নামছে। আর ঘরের ভেতর দুটো মানুষের মাঝে জমে উঠছে অন্য এক অঙ্ক—যার কোনো সমাধান নেই, আছে শুধু অধিকার আর আ*গুন।
কিছু সময় চলে গেল।

এরপর শাপলা উঠে চলে যেতে নিলে সিয়াম তার হাত চেপে ধরল। শাপলার হার্টবিট বেড়ে গেল।
সিয়াম বাঁকা হাসি দিয়ে বলল, “এত তাড়া কিসের?”
শাপলা আমতা আমতা করে বলল, “হাত ছাড়ুন, আমার রুমে যাব।”
সিয়াম শাপলার কোনো কথা শুনল না। শাপলাকে ধাক্কা দিয়ে বিছানায় ফেলে দিয়ে শাপলার উ*পর ঝাঁ*পিয়ে পড়ল।
শাপলা কাঁপা গলায় বলল, “কী করছেন এসব? ছাড়ুন, আমাকে যেতে দিন।”
সিয়াম দুষ্ট হাসি দিয়ে বলল, “তোকে দেখেই হ*ট হয়ে গেছি, অনেক আ*দর করতে ইচ্ছে করছে। এমন করিস কেন? একটুখানি আ*দর করলে কী হবে?”
শাপলা সিয়ামকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল, দৌড়ে দরজার কাছে গিয়ে মুখ ভেংচে দিয়ে চলে গেল। সিয়াম মৃদু হাসি দিল।

রাত তখন প্রায় এগারোটা। ড্রয়িংরুমের নিস্তব্ধতা ভেঙে সায়েক আহমেদ অস্থির পায়ে পায়চারি করছেন। প্রতিটা পদক্ষেপে জমাট বাঁধা রাগ আর দুশ্চিন্তা। সোফায় বসে থাকা মহুয়া আহমেদের মুখে বিরক্তি আর ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।
সায়েক আহমেদের চোখ দুটো রাগে টকটকে লাল। বারবার তিনি সদর দরজার দিকে তাকাচ্ছেন—কখন ফিরবে তার বড় ছেলে আরিফ? অপেক্ষার প্রতিটা মিনিট যেন কাঁটার মতো বিঁধছে।
অনেকটা সময় গড়িয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ দরজায় ঠকঠক শব্দ। সায়েক আহমেদ ঝড়ের বেগে গিয়ে সদর দরজা খুলে দিলেন।
দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আরিফ। টলছে। চোখ লাল, জামা-কাপড় এলোমেলো। ম*দের উৎকট গন্ধে পুরো ঘরটা ভরে গেল মুহূর্তেই।গন্ধে নাক চেপে ধরলেন সায়েক আহমেদ। রাগে, ঘৃণায় সদর দরজাটা বিকট শব্দে বন্ধ করে দিলেন তিনি। শব্দটা গিয়ে বিঁধল বাড়ির প্রতিটা দেওয়ালে।
আরিফ কোনো দিকে না তাকিয়ে টলতে টলতে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে গেল। ঠিক তখনই সায়েক আহমেদ বিদ্যুৎগতিতে তার হাত চেপে ধরলেন। পরমুহূর্তে গায়ের সমস্ত জোর দিয়ে কষে এক চ*ড় বসিয়ে দিলেন আরিফের গালে।
আরিফ টাল সামলাতে না পেরে দেওয়াল ধরে ফেলল। রাগে গজগজ করতে করতে বাবার দিকে আঙুল তুলে চিৎকার করে উঠল,
“বাবা! তুমি আমাকে মা*রলে কেন?”

সায়েক আহমেদ কোনো জবাব দিলেন না। নিঃশব্দে আরও একটা চ*ড় কষালেন। তার গলা কাঁপছে, কিন্তু স্বর পাথরের মতো কঠিন, “তুই এসব কী শুরু করেছিস, আরিফ? নীলাঞ্জনাকে মা*রিস কেন? আমার বাড়িতে থেকে এসব নোংরামি করতে পারবি না তুই। কত সুন্দর ফুটফুটে একটা মেয়ে—তারপরও তুই কীভাবে পারিস?”
আরিফ চোখ পাকিয়ে ফুঁসে উঠল। ম*দের নেশায় আর রাগে তার মুখ বিকৃত, “তুমি চুপ করো, বাবা! তোমার জন্যই এসব হয়েছে। শুধু তোমার আর মায়ের জন্য আমি আমার ভালোবাসার মানুষটাকে বিয়ে করতে পারিনি। তোমাদের জন্য আমার জীবনটা শে*ষ হয়ে গেছে! একটা ফা*লতু মেয়ের সাথে জো”র করে আমার বিয়ে দিয়েছো তোমরা!”
কথাটা শেষ হতেই মহুয়া আহমেদ বিদ্যুতের মতো সোফা থেকে উঠে এলেন। কাঁপা হাতে ছেলের গালে আরেকটা চ*ড় বসিয়ে দিলেন। তার গলায় মায়ের অসহায় আর্তনাদ, “চুপ! একদম চুপ, আরিফ। নীলাঞ্জনার মতো মেয়ে হয় না। কত ক*ষ্ট, কত অত্যা*চার মুখ বুজে সয়ে এই বাড়িতে পড়ে আছে মেয়েটা। তুই যার সাথে প্রেম করেছিস, সেই মেয়ে নীলাঞ্জনার নখের যোগ্যও না। এখনো সময় আছে, শুধরে যা। নীলাঞ্জনাকে হারালে বুঝবি কী হারালি। তখন হাজার কেঁদেও কোনো লাভ হবে না।”
আর কোনো কথা বললেন না সায়েক আহমেদ আর মহুয়া আহমেদ। ছেলের মুখের ওপর থেকে চোখ সরিয়ে দুজন নিঃশব্দে নিজেদের ঘরের দিকে চলে গেলেন। পেছনে ফেলে গেলেন এক টুকরো মৃ*ত নিস্তব্ধতা আর একরাশ দীর্ঘশ্বাস।

আরিফ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। রাগে, অপমানে তার সারা শরীর কাঁপছে। তারপর গজগজ করতে করতে টলতে টলতে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। তার প্রতিটা পদক্ষেপে জমে থাকল ধ্বংসের পদধ্বনি।
আরিফ দরজায় টোকা দিল। ভেতর থেকে কোনো সাড়া নেই। নীলাঞ্জনা দরজা খুলল না।
কয়েকবার টোকা দেওয়ার পর দরজাটা খুলে গেল নিঃশব্দে। দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে নীলাঞ্জনা—চোখে ঘুম নেই, আছে শুধু ক্লান্তি আর একরাশ শূন্যতা।
কিছু বোঝার আগেই আরিফের হাত উঠে এল বিদ্যুৎগতিতে। নীলাঞ্জনার গালে পড়ল প্রচণ্ড এক চ*ড়।
নীলাঞ্জনা হতভম্ব। গাল চেপে ধরে কাঁপা গলায় বলল, “আমি আপনাকে এখন কী করলাম যে আমাকে মা*রলেন?”
আরিফের চোখ দুটো আ*গুনের মতো জ্বলছে। রাগে গজগজ করতে করতে সে গর্জে উঠল, “কী করা বাকি রেখেছিস? আমার জীবনটা তো ন*ষ্ট করেই দিয়েছিস! আমার জীবন থেকে চলে যেতে পারিস না? দুদিনের মধ্যে তুই যাবি—নইলে আমি সারাজীবনের জন্য চ*লে যাব।তোর ওই মুখ টাও আর দেখতে চাই না!”
কথাটা শেষ করেই আরিফ ধপ করে বিছানায় শুয়ে পড়ল। পাশেই ঘুমিয়ে আছে তার ছোট্ট মেয়ে আলো। নিষ্পাপ মুখটা জ্বলজ্বল করছে।
নীলাঞ্জনার চোখ থেকে অঝোরে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। নিঃশব্দে দরজাটা বন্ধ করে দিল সে। তারপর গুটি গুটি পায়ে হেঁটে গিয়ে টেবিলের পাশের চেয়ারটায় বসে পড়ল।
সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেসে আসছে শুধু আরিফের নাক ডাকার শব্দ। সে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। পৃথিবীর কোনো যন্ত্রণা যেন তাকে ছুঁতে পারছে না।

নীলাঞ্জনা কাঁপা হাতে একটা কাগজ টেনে নিল। কলম ধরতেই চোখের জল টপটপ করে পড়ে কালি লেপ্টে দিল। তবু সে লিখল—প্রতিটা শব্দে মিশে গেল একটা ভাঙা সংসারের আর্তনাদ।
লেখা শেষ করে ধীর পায়ে আরিফের পাশে গিয়ে বসল সে। অনেকক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল সেই মুখটার দিকে।
বুক ফেটে যাচ্ছে নীলাঞ্জনার। তবু নিঃশব্দে ঝুঁকে আলতো করে আরিফের কপালে একটা চু*মু এঁকে দিল। শেষ চু*মু। বিদায়ের চু*মু।
চিঠিটা আরিফের হাতের মুঠোয় গুঁজে দিল সে। তারপর ঘুমন্ত আলোকে পরম মমতায় কোলে তুলে নিল।
রুম থেকে বেরিয়ে ড্রয়িংরুমে এসে দাঁড়াল নীলাঞ্জনা। এই বাড়ির প্রতিটা দেওয়াল, প্রতিটা কোণায় জমে আছে কত স্মৃতি—কত স্বপ্ন, কত অপমান, কত না পাওয়া ভালোবাসা। সব ফেলে যাচ্ছে সে।
পেছনের দরজাটা খুলে বাইরে পা রাখল নীলাঞ্জনা। সামনে গাঢ় অন্ধকার। এক অজানা রাস্তা। কোলে তার নিষ্পাপ মেয়ে, আর বুকে এক সমুদ্র য*ন্ত্রণা।
পেছনে পড়ে রইল একটা ঘর, একটা সংসার, আর একজন মানুষ—যে কখনো বুঝলই না, কী রত্ন হারাল সে।
নীলাঞ্জনা হেঁটে চলল। অন্ধকার আরও গাঢ় হলো। চোখের পানি আর অন্ধকার মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল।

সকাল হয়ে গেছে। আরিফ চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে বসল। জানালা গলে আসা রোদ চোখে লাগছে। হঠাৎ বিছানার ওপর পড়ে থাকা ভাঁজ করা কাগজটার ওপর চোখ পড়ল তার।
কৌতূহলবশত হাতে তুলে নিল। খুলতেই নীলাঞ্জনার হাতের লেখা। পড়তে লাগল—
`আমার প্রিয়, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শূন্যতা, আমার স্বামী আরিফ,`
এই কাগজটা যখন ছুঁয়ে দেখবেন, তখন আমার নিঃশ্বাসের শব্দটাও আর এই ঘরে থাকবে না। আমি নেই, আরিফ। আমি সত্যিই নেই। শরীরটা নিয়ে চলে যাচ্ছি, কিন্তু আত্মাটা আপনার পায়ের কাছে ক*বর দিয়ে যাচ্ছি।
আমাকে পাগল ভাববেন? ভাবুন। লোভী ভাববেন? আমি তো তাই। জন্মের লোভী, মৃত্যুর লোভী।
কিসের লোভ জানেন? আপনার একটা ‘ভালোবাসি’ শোনার লোভ। একটা রাত আপনার বুকের ভেতর মাথা গুঁজে ফুঁপিয়ে কাঁদার লোভ। আপনার চোখে নিজের জন্য একফোঁটা পানি দেখার লোভ।
এই লোভে আমি পু*ড়েছি, আরিফ। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত। প্রতিটা নিঃশ্বাসে পু*ড়েছি। আপনি টেরও পাননি। আপনার কাছে আমি ছিলাম ঘরের একটা আসবাব—যাকে লা*থি মা*রা যায়, ভেঙে ফেলা যায়, কিন্তু ভালোবাসা যায় না।

মনে আছে আপনার? বিয়ের রাতে আপনি আমার দিকে ফিরেও তাকাননি। বলেছিলেন, “শরীর চাইলে নিতে পারেন, মনটা অন্য কারো কাছে বাঁধা।” আমি সেদিন ম*রে গিয়েছিলাম, আরিফ। প্রথমবার। তারপর থেকে রোজ ম*রেছি। রোজ। রোজ। রোজ।
আপনি যখন বন্ধুদের সাথে হাসতেন, আমি আড়াল থেকে দেখতাম। ভাবতাম, এই হাসিটা যদি একবার আমার জন্য হতো! আপনি যখন মা*তাল হয়ে ফিরে আমাকে জন্তুর মতো মা*রতেন, আমি চিৎকার করতাম না। কারণ ভয় পেতাম, চিৎকার করলে যদি আপনি আর ঘরেই না ফেরেন? আপনার মা*রটাও তখন আমার কাছে আদর মনে হতো। ভাবুন, আমি কতটা নীচে নেমেছি! কতটা লোভী আমি!
আপনি আমাকে ছুঁয়েছেন, আরিফ। বহুবার। কিন্তু একবারও ভালোবেসে ছোঁননি। আপনার প্রতিটা ছোঁয়ায় আমি ক্ষ”ত*বি*ক্ষত হয়েছি। র*ক্তাক্ত হয়েছি। তবু পরের দিন সকালে আপনার পছন্দের খাবার তৈরি করেছি। আপনার শার্ট ইস্ত্রি করেছি। কেন জানেন? কারণ আমি একটা উন্মাদ। আপনার জন্য উন্মাদ।

মনে পড়ে সেই দিনটা? বিয়ের আগে আপনি আমার হাত ধরেননি, চোখে চোখ রাখেননি। শুধু বলেছিলেন, “আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি, নীলাঞ্জনা। আপনাকে বিয়ে করলে আমরা কেউ সুখী হবো না।”
আমি সব শুনেও চুপ ছিলাম। কারণ আমি বে*হায়া। আমি নি*র্লজ্জ। আমি ভেবেছিলাম, আমার ভালোবাসার আ*গুনে আপনার বরফ গলবে। আমি ভুল ছিলাম। আপনি বরফ নন, আপনি পাথর। আর পাথরে কখনো ফুল ফোটে না, আরিফ।
এতগুলো বছর… উফ! কতগুলো বছর আমি আপনার ঘরে একটা লা”শ হয়ে বেঁচে ছিলাম জানেন? আপনি অফিস থেকে ফিরতেন, আমি দৌড়ে যেতাম। ভাবতাম, আজ হয়তো জিজ্ঞেস করবেন, “সারাদিন কী করলে?” করেননি। আপনি মা*তাল হয়ে ফিরতেন, আমি দরজা খুলে দিতাম। ভাবতাম, আজ হয়তো জড়িয়ে ধরে বলবেন, “সরি।” বলেননি।
আপনি আমাকে মা*রতেন, আরিফ। শরীরের চেয়েও বেশি মা*রতেন আত্মায়। প্রতিটা চ*ড়ের সাথে আমার ভেতরের নীলাঞ্জনাটা একটু একটু করে ম”রে যেত। তবু সকালে উঠে আবার আপনার জন্য চা বানাতাম। কেন জানেন? কারণ আমি লোভী। আপনার অবহেলার নেশায় আসক্ত একটা লোভী মেয়ে আমি।
আপনি আমাকে ভালোবাসতে পারেননি, এটা আপনার দোষ না। দোষ আমার। আমি কেন আপনাকে ভালোবেসে ফেললাম? কেন আপনার মতো মানুষের জন্য নিজের সমস্ত অস্তিত্ব বিলিয়ে দিলাম?

আমি কী নিয়ে যাব? বলুন তো? এই সোনার গহনা? এই দামি শাড়ি? এই হীরের আংটি যেটা পরানোর সময়ও আপনি অন্য কারো কথা ভাবছিলেন? এগুলো দিয়ে আমি কী করব? এগুলো কি আমার একাকীত্ব ঘোচাবে? এগুলো কি রাতের বেলা আমাকে জড়িয়ে ধরে বলবে, “ভয় পেয়ো না, আমি আছি”?
না, আরিফ। তাই সব ফেলে যাচ্ছি। এই ঘর, এই বিছানা, এই আলমারি—যেখানে আপনার একটা পুরনো শার্ট এখনও আপনার গায়ের গন্ধ নিয়ে পড়ে আছে। সব ফেলে যাচ্ছি।
শুধু আমার আলোকে নিয়ে যাচ্ছি। আমার কলিজার টুকরোটাকে। ওর কপালে আপনার চু*মু নেই, কিন্তু আমার বুকের সমস্ত উষ্ণতা আছে। ওকে আমি আপনার মতো করে ভাঙতে দেব না। ওকে আমি শেখাব না কীভাবে তিলে তিলে ম*রতে হয়।
আপনি আমার লোহার খাঁচা থেকে মুক্ত, আরিফ। আজ থেকে আপনি সম্পূর্ণ মুক্ত। আমার চোখের পানি থেকে মুক্ত, আমার দীর্ঘশ্বাস থেকে মুক্ত, আমার অস্তিত্ব থেকে মুক্ত। আমি দূর থেকে দেখব আর প্রতিটা রাতে আল্লাহর কাছে দোয়া করব—আপনি যেন ভালো থাকেন। হ্যাঁ, এত মা*র খেয়েও, এত অপমান সয়েও আমি আপনার খারাপ চাইতে পারলাম না। এটাই আমার দুর্ভাগ্য।

আমি কোথায় যাব? জানি না, আরিফ। সত্যিই জানি না। বাবার বাড়িতে গেলে মা বলবে, “মেয়েদের এত জেদ ভালো না। মানিয়ে নে।” মা জানে না, মানিয়ে নিতে নিতে আমি কখন ম*রে গেছি।
তাই দূরে যাব। বহু দূরে। এমন কোথাও, যেখানে বাংলায় কেউ কাঁদে না। যেখানে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে কেউ শুনবে না আমার ফুঁপিয়ে ওঠার শব্দ।
যাওয়ার আগে আপনাকে শেষবার দেখেছি। ঘুমন্ত আপনাকে। কী মায়া লাগছিল জানেন? ইচ্ছে করছিল, আপনার পা জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে বলি, “আমাকে একবার বুকে টেনে নিন, আরিফ। শুধু একবার। আমি কথা দিচ্ছি, আর কখনো কিছু চাইব না।”
কিন্তু বলিনি। আপনার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাইনি। শুধু আপনার কপালে একটা চু*মু দিয়েছি। আমার ঠোঁট কাঁপছিল, চোখ দিয়ে শ্রাবণের ধারা নামছিল। সেই চু*মুতে ছিল আমার জনম জনমের না-পাওয়া, আমার সমস্ত কান্না, আমার সমস্ত হাহাকার। আপনি টেরও পাননি।
ভালো থাকবেন, আরিফ। ম*দ একটু কম খাবেন। শরীরের যত্ন নেবেন। আর যদি কখনো মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়, যদি হঠাৎ বুকের বাম পাশটা চিনচিন করে ওঠে—জানবেন, পৃথিবীর কোনো এক কোণে একটা মেয়ে আপনার নাম নিয়ে কেঁদে কেঁদে অন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
আমাকে ক্ষমা করবেন না, আরিফ। ক্ষমা করে দিলে আমি আরও কষ্ট পাব। বরং ঘৃণা করবেন। যত পারেন ঘৃণা করবেন। তাহলে হয়তো আমি ভুলতে পারব যে, আমি আপনাকে পাগলের মতো ভালোবেসেছিলাম।
“ইতি,”
“_আপনার ঘরের কোনায় পড়ে থাকা একটা দীর্ঘশ্বাস,
আপনার পায়ে পিষে যাওয়া একটা কাঠগোলাপ,
আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল,
আপনার লোভী, বেহায়া, দুর্ভাগা স্ত্রী—
নীলাঞ্জনা………

চিঠিটা পড়ে আরিফের বুকের ভেতরটা হঠাৎ ফাঁকা হয়ে গেল। একটা অদ্ভুত শূন্যতা, একটা চিনচিনে ব্যথা পাঁজর বেয়ে নামছে। আরিফের অজান্তেই চোখের কোণে হালকা শ্রাবণ মেঘের বৃষ্টি নামছে।
আরিফ নিজে নিজে বির বির করে বলল, “আমার এমন অদ্ভুত কষ্ট লাগছে কেন। নীলাঞ্জনা চলে গেছে এতে তো আমার খুশী লাগার কথা। তাহলে এমন কেন হচ্ছে?”
হাতের মুঠোয় চিঠিটা শক্ত করে ধরে সে ধীর পায়ে ড্রয়িংরুমের দিকে এগোল।
ড্রয়িংরুমে তখন সবাই। সায়েক আহমেদ, মহুয়া আহমেদ, নিরব, শাপলা, সিয়াম—সকলে বসে আছে।
আরিফ এসে দাঁড়াল সবার সামনে। মুখ থমথমে, চোখ দুটো লাল। নিঃশব্দে চিঠিটা মায়ের দিকে বাড়িয়ে দিল।
মহুয়া আহমেদ অবাক হয়ে ভুরু কুঁচকালেন, “কী এটা?”
আরিফের গলা শান্ত, অথচ ভেতরে ঝড়, “পড়ে দেখো, মা।”
মহুয়া আহমেদ কাঁপা হাতে চিঠিটা নিলেন। চোখ বুলাতে বুলাতে একসময় জোরে জোরেই পড়তে শুরু করলেন। প্রতিটা লাইনের সাথে তার গলাটা ধরে আসছে, চোখের কোণ ভিজে উঠছে। পড়া শেষ হতেই দু’চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ল।
ঘরের সবাই স্তব্ধ। বাতাস ভারী হয়ে গেছে।

হঠাৎ মহুয়া আহমেদ বিদ্যুৎবেগে উঠে দাঁড়ালেন। ঠাস করে একটা চ”ড় বসিয়ে দিলেন আরিফের গালে। তার গলা কান্নায় ভেঙে যাচ্ছে, “তোর জন্য! শুধু তোর জন্য আজ আমার নীলাঞ্জনা চলে গেল!”
আরিফ গালে হাত দিয়ে বড় বড় চোখ করে তাকাল। ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “যা করেছি, বেশ করেছি! আমার জীবন থেকে ফা*লতু মেয়েটা এতদিনে বিদায় নিল—”
কথা শেষ হওয়ার আগেই সায়েক আহমেদ উঠে দাঁড়ালেন। মুহূর্তে তার হাত উঠে এল, আর আরিফের অন্য গালে পড়ল আরেকটা প্রচণ্ড চ*ড়। ঘর কেঁপে উঠল শব্দে।
পাশ থেকে নিরব আহমেদ আর চুপ থাকতে পারল না। ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে তিক্ত গলায় বলল, “ভাইয়া, তুই কি আদৌ মানুষের কাতারে পড়িস? একটা মানুষের সাথে এতগুলো বছর থেকে কীভাবে এমন বলিস? ইট-কাঠের ঘরের ওপরও মায়া জন্মে যায়, আর তোর বুকের ভেতর কি একটুও মায়া জন্মায়নি তার জন্য?”

শাপলা এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার আর পারল না। আরিফের দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বলল, “ভাইয়া, আপনি এত সাধারণভাবে কথাটা বললেন কীভাবে? আপনার হৃদয়টা এতটা পাষাণ কী করে হলো?”
আরিফ রক্তচক্ষু মেলে তাকাল শাপলার দিকে। গর্জে উঠল, “তুই চুপ কর! আশ্রিতা আশ্রিতার মতো থাকবি। আমাদের পারিবারিক বিষয়ে নাক গলাবি না একদম!”
সিয়াম আহমেদ আর সহ্য করতে পারল না। চোয়াল শক্ত করে আরিফের দিকে এক পা এগিয়ে বলল, “ভাইয়া, নিজের মুখ সামলা। আর না হলে কিন্তু—”
সায়েক আহমেদ সিয়ামকে থামিয়ে দিলেন । তারপর ধীর পায়ে আরিফের সামনে এসে দাঁড়ালেন। চোখে জল, গলায় ক্লান্তি।
“আজ তোকে একটা সত্যি কথা বলব, আরিফ,” সায়েক আহমেদ বললেন। “চেয়েছিলাম, এই কথাটা তোকে কোনোদিন বলব না। ভেবেছিলাম, শুনলে তুই কষ্ট পাবি। তাই চেপে গিয়েছিলাম। কিন্তু আজ বলতেই হচ্ছে।”
ঘরের সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে আছে।
সায়েক আহমেদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “তুই যে মেয়েটাকে ভালোবাসতি, রাইমা… সে আগে থেকেই বিবাহিত ছিল, আরিফ। শুধু বিবাহিত না, ওর একটা বাচ্চাও ছিল। তুই যখন ওর কথা বলেছিলি, আমি গোপনে খোঁজ নিয়েছিলাম। সব জানতে পেরেছি।”
আরিফের মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেল। পা দুটো টলছে।

সায়েক আহমেদ থামলেন। আবার বলতে শুরু করলেন, “তুই যদি জানতে পারিস যে মেয়েটা তোকে দিনের পর দিন ঠকিয়েছে, তুই ভেঙে পড়বি—এই ভয়ে তোকে কিছুই বলিনি। তাই জোর করে নীলাঞ্জনার সাথে তোর বিয়ে দিয়েছিলাম।”
এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে তিনি যোগ করলেন, “নীলাঞ্জনাকে আমি সব বলেছিলাম। তোর কথা, রাইমার কথা, সব। মেয়েটা সব জেনেশুনেই রাজি হয়েছিল। বলেছিল, ‘আংকেল, আমি ওনাকে ভালোবাসব। একদিন ওনার মন জয় করবই।’ আর তুই… তুই এটা কী করলি?”
ঘরে পিনপতন নিস্তব্ধতা।
বাবার মুখে এমন কথা শুনে আরিফের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। চোখের সামনে সব অন্ধকার। নীলাঞ্জনার প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা কান্না, প্রতিটা অপমান এখন তীরের মতো এসে বিঁধছে তার বুকে।
সে হেরে গেছে। নিজের কাছেই হেরে গেছে।

চারটা দিন কেটে গেল। সকাল দশটা বাজে। বাড়ির সবাই অনেক আগেই অফিসে বেরিয়ে গেছে।
আরিফ নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে বসে আছে। চুলগুলো এলোমেলো, মুখটা কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।
আরিফ বারবার নীলাঞ্জনার ফোনে কল দিচ্ছে। কিন্তু ওপাশ থেকে কেউ ধরছে না। রিং হয়ে হয়ে কেটে যাচ্ছে।
সব হারানোর পর এখন আরিফ বুঝতে পারছে, সে আসলে কী হারিয়েছে। কখন যে নীলাঞ্জনাকে ভালোবেসে ফেলেছে, নিজেও টের পায়নি। এখন বুকের ভেতরটা খালি খালি লাগছে। আরিফের চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। কষ্টে বুকটা ফেটে যাচ্ছে, কিন্তু কাউকে বলতে পারছে না।
শাপলা আজ স্কুলে যায়নি। রান্নাঘরে খাবার তৈরি করতেছে। হঠাৎ কলিংবেল বেজে উঠল। শাপলা শুনতে পেল না। বেল বেজেই চলেছে। একটু পর শুনতে পেলো কেউ কলিং বেল বাজাচ্ছে। শাপলা তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে সদর দরজার সামনে এল। বেল তখনও বাজছে। বিরক্ত হয়ে বলল,

“উফ্! থামেন এবার। এভাবে বাজাতে থাকলে বেলটাই নষ্ট হয়ে যাবে।”
এই বলে দরজাটা খুলে দিল। সাথে সাথে সিয়াম ভেতরে ঢুকে পড়ল।
শাপলা অবাক হয়ে গেল। “আপনি? এখন?”
সিয়াম শাপলার দিকে তাকিয়ে হাসল। “কী করছিলি? দরজা খুলতে এত দেরি হলো কেন?”
“রান্নাঘরে ছিলাম, শুনতে পাইনি।” শাপলা দরজা লাগিয়ে দিল। তারপর জিজ্ঞেস করল, “আপনি আবার ফিরে এলেন কেন?”

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৭

সিয়াম সোজা শাপলার চোখের দিকে তাকাল। আস্তে করে বলল, “তোকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছিল, তাই চলে এলাম।”
শাপলা কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই নাকে পোড়া গন্ধ ভেসে এলো। দৌড়ে রান্নাঘরের দিকে ছুটল।
সিয়ামও মুচকি হেসে ওর পেছন পেছন হাঁটা দিল। ধীরে ধীরে, চুপচাপ।

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here