রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ২৯
সোহানা ইসলাম
রোহানের শরীরের ব্যথা শুধু বাইরে নয়, ভেতরেও যেন আগুনের মতো ছড়িয়ে আছে। সারা শরীরে কেটে গেছে, নীলচে দাগ। গ্রামের ঐ ঝগড়ার পর বাড়ি ফিরেছে তারা , কিন্তু মুখে কোনো অভিযোগ নেই। কেনোই বা থাকবে? তার বেস্ট ফ্রেন্ড এর এমন অবস্থায় কি করে সে একা ফেলে আসতে পারত? চুপ করে আছে, শুধু কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ঘাম, ঠোঁটে ফাটল, আর চোখের ভেতর লুকানো একরাশ অভিমান।
এই সময় জিনিয়া বারান্দায় আসে। তার চোখের চাহনিতে ভয়, উৎকণ্ঠা আর অদ্ভুত একটা কষ্ট।
“ ক কি হইছে রোহান ভাই আ আপনার? ”
রোহান কিছু বললো না। শুধু মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে আছে। কিন্তু শরীরের কষ্টে মুখটা শক্ত হয়ে আছে।
জিনিয়া রোহানকে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি এনে দে ফাস্ট। আর আসার সময় ফাস্ট-এক্সবক্স নিয়ে আসিস সাথে করে। কিছু টা বিচলিত কন্ঠে বলে আরমান।
জিনিয়া পানি আনতে চলে যায়। কিছু সময় পর পানি এনে রোহানের দিকে বারিয়ে দিয়ে বলে
—” পা পানি টা খান রোহান ভাই! ”
মাথা নিচু রেখেই পানির গ্লাস টা হাতে নেয় রোহান। পানি একদমে খেয়ে, আবারও চুপচাপ বসে থাকে।
জিনিয়া হাত বারিয়ে গ্লাস টা নিয়ে এক পাশে রাখে। জিনিয়া রোহানের দিকে তাকিয়ে বলল—
“আপনি ঠিক মতো বসুন। আমি ঔষধ লাগিয়ে দিচ্ছি ।”
তার গলার স্বর এমন ছিল যেন কোনো বউ তার স্বামীর জন্য চিন্তিত।
রোহান হালকা হেসে বলল—
“দরকার নাই, আমি ঠিক আছি।”
কিন্তু জিনিয়া শুনছে না। তাড়াতাড়ি ঔষধের বক্স খুলে হাঁটু গেড়ে বসলো তার সামনে।
“হাতটা বাড়িয়ে দিন ।”
রোহান ঠোঁটে একরাশ ব্যথার হাসি টেনে বলল—
“জিনিয়া, লাগবে না এসব। আমি ভালো আছি।”
জিনিয়া চোখ কুঁচকে রাগী গলায় বলল—
“চুপ করুন রোহান ভাই ! শরীরের অবস্থা দেখেছেন নিজের ? কত রক্ত পড়ছে। আমি কিছু জানি না, আপনি হাত বাড়ান।”
রোহান মনে মনে হাসল। “আমায় তো ভালোবাসো না তুমি। তাহলে এতো চিন্তা কেন তোমার আমায় নিয়ে? শুধু কি লোক দেখানো দায়িত্ব? না অন্য কিছু?”
কিন্তু মুখে কিছু বলল না। জিনিয়া যখন তুলোর ভেতর মলম নিতে যাবে, তখন হঠাৎ রোহান উঠে দাঁড়াল।
—“না, লাগবে না এসব।”
“রোহান ভাই !”—জিনিয়া অবাক হয়ে তাকাল।
রোহান তার দিকে না তাকিয়ে পা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলে গেল নিজের রুমের দিকে।
তার পেছনে দাঁড়িয়ে রইল জিনিয়া। বুকের ভেতর ধুক করে উঠল। “এভাবে চলে গেল? আমার মনের মানুষ। যার জন্য এই বুক কাঁপে, সে কেন আমার যত্ন নিতে দিল না? আমি কি এতো অবহেলিত? যত্ন নেওয়ার জন্য কি ভালোবাসা প্রকাশ করা জরুরি? কিন্ত আমি তো অপারগ। আপনার ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য যে
আমি না। ”
চোখের কোণে পানি চলে এল, কিন্তু কাউকে দেখাল না।
রোহান তার রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। চুপচাপ বিছানায় বসল। শরীরের ব্যথা তখন তীব্র। কিন্তু তার মনে অন্য ব্যথা। “তুমি কি বুঝো না চাঁদ সুন্দরী ? আমি তোমার জন্য কতটা পাগল? কিন্তু তোমার চোখে আমি কি শুধু ভাইয়ের বন্ধু?আমার ভালোবাসা চোখে পরে না তোমার?কি করে বাঁচব আমি তোমাকে ছাড়া? এই কষ্ট সহ্য করা যায়?”
ঠিক তখন দরজা খুলে ঢুকল আরমান আর জাহেদ।
আরমানের চোখে রাগ।
—“রোহান! তুই কি করলি হে? ড্রেসিং না করিয়ে এভাবে চলে আসলি কেন? তোর মাথা ঠিক আছে?”
রোহান হেসে বলল—
“কিছু হয় নাই আমার। আমি ঠিক আছি।”
“চুপ ! তোরে আমি চিনি। নিজের শরীরের কী অবস্থা করে বসে আছিস? হিরো সাজতে গিয়েছিলি সেখানে। আমাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের কি অবস্থা করেছিস তুই। আমারে মেরে ফেলবি নাকি? কুওার বাচ্চা। ”—আরমানের গলা কাঁপছে রাগে। নিজের বেস্ট ফ্রেন্ডের এই অবস্থা দেখে তার ভিতরটা ফেটে যাচ্ছে।
রোহান শুধু নিচের দিকে তাকিয়ে রইল। তার ঠোঁট কাঁপছে। গলা শুকিয়ে গেছে।
—“ আরমান ! ”
—” কথা বলবি না? হিরোগিরি করতে গেছিস? আমি বলছি তোকে যেতে?”
—” এখন হিরোইন বাঁচাবে না তোমায় এসে। চুপচাপ আমার বোনের কাছে ঔষধ লাগিয়ে এসো !”—জাহেদ মজার ছলে বলল, রাগের আবহ ভাঙতে।
রোহান হঠাৎ মাথা তুলে তাকাল। চোখ লাল। তারপর আরমানের কাছে গিয়ে হঠাৎ গলা জড়িয়ে ধরল।
আরমান চমকে গেল। তাকে হটাৎ এভাবে জরিয়ে ধরায়।
—“ওই কি হইছে? এই রোমান্টিক সিচুয়েশন করে ফেলেছো কেন?”—হেসে বলল জাহেদ।
কিন্তু রোহান কিছু বলছে না। শুধু বুক ফেটে কান্না করছে।
—“ওই পাগল, কান্না করছিস কেন? কি হইছে? অনেক ব্যথা করছে? জিনিয়াকে বলব এসে ঔষধ লাগিয়ে দিতে?”—আরমান হতভম্ব। তার হাতে ভেজা অশ্রু।
রোহান হাউমাউ করে কান্না করতে করতে বলল—
“ভাই… তোর বোনটাকে দিবি আমায়। প্লিজ ভাই।দিয়ে দে না ভাই তোর বোন টাকে।
ওর এতো অবহেলা সহ্য হচ্ছে হয় না আমার। আমি আর পারতেছি না। এই বুকটায় খুব যন্ত্রণা করে। সত্যি বলছি এই বুকটায় লুকিয়ে রাখব সযত্নে। কোনো আঁচ লাগতে দিবনা। দিয়ে দে ভাই। খোদার কসম জীবনে আর তোর কাছে কিচ্ছু চাইব না। ”
আরমান থমকে গেল। চোখ বড় বড় হয়ে গেল।
“কি বললি তুই? ”
জাহেদ তো হেসে গড়াগড়ি।
“এইটা কি ফাইটের সিক্যুয়েল না কি লাভ স্টোরির টুইস্ট?”
রোহান কাঁদছে। কণ্ঠ ভাঙা—
“আমি তোরে অনেক ভালোবাসি ভাই। আমি তোর বোনের জন্য এতো ব্যথা সহ্য করতে পারছি না । ওরে আমি ছাড়া আর কেউ ভালোবাসতে পারবে না। ওকে হাড়ানোর ভয়ে বুকটা কেমন যেন করে উঠে। এই বোঝি হাড়িয়ে ফেললাম তাকে। বিশ্বাস কর আমি ওকে সুখে রাখব। আমারে শুধু একবার তোর বোনটাকে দিয়ে দে-না ভাই।”
তার চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে আরমানের কাঁধে।
আরমান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার বুকের ভেতর মিশে গেল রাগ, অবাক আর মায়া। শরীরে এই অবস্থা নিয়ে এই গরু তার বোনকে চাইছে। সে কি কখনো বলেছে তার বোনে সে দিবে না।
জাহেদ হেসে বলল—
“ওই আরমান ভাইয়া , কি বলবে এখন ? আমার তো লাইভ করতে মন চাচ্ছে এখন । বেস্ট ফ্রেন্ড এর গলা জড়িয়ে কান্না করছে তার বোনকে বিয়ে করার জন্য, তারই বেস্ট ফ্রেন্ড! ”
আরমান এক লাফে জাহেদের দিকে তাকাল—
“চুপ কর! গরু! এটা তোর মায়ের পেটের বোন, ভুলে যাস না? ”
জাহেদ হটাৎ রোহানের দিকে বড় বড় চোখ করে তাকায় —” আরে আমি তো ভুলেই গিয়ে ছিলাম
জিনিয়া আমার বোন? কিন্তু কোনো ব্যপার না রোহান ভাইয়া দুলাভাই হিসেবে পারফেক্ট! ”
আরমান রোহানের মাথায় হাত রাখল। চুল গুলো ঠিক করে দেয়। রোহানের চোখের পানি মুছে দিয়ে বলে —
“তোকে আমি চিনি নেং* কাল থেকে । আমি জানি তুই জিনিয়াকে পছন্দ করিস ?”
রোহান আবারও কাঁদতে কাঁদতে বলল
— “পছন্দ করি না ভাই, ওকে আমি ভালোবাসি! ”
আমি তোর বোন ছাড়া বাঁচতে পারবো না। তার জন্য আমি সব ছাড়তে পারবো। প্লিজ ভাই…”
ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা। শুধু শোনা যাচ্ছে রোহানের কান্নার শব্দ। বাইরে শীতের বাতাস হালকা করে জানালার পর্দা দুলাচ্ছে।
জিনিয়া দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে এখনো তুলো আর মলম। ভেতরে যা হচ্ছে, তার প্রতিটি শব্দ সে শুনছে।
ভেতর থেকে রোহানের গলা কাঁপা কান্নার শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে—
“ভাই… তোর বোনটাকে দিবি আমায়। আমি আর পারতেছি না।”
এই কথাটা শুনে জিনিয়ার বুকের ভেতরটা যেন কেউ ছিঁড়ে ফেলল। হাতের মলমটা কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে পড়ে গেল। চোখের ভেতর পানি জমে উঠল মুহূর্তেই।
“ও কি বলল? আমার জন্য এতটা কষ্ট? আমার জন্য এভাবে কাঁদছে? এই ব্যথা শুধু শরীরে না, মনের? ”
জিনিয়ার গলা শুকিয়ে এলো। তার শ্বাসের শব্দ বেড়ে গেলো। এই কথাটা শোনার পর জিনিয়ার চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল গালের ওপর দিয়ে। তার বুক কাঁপছে। মনে মনে বলছে
—” উনি আমাকে এত ভালোবাসে! অথচ আমি কখনো কিছু বলিনি।বোঝেও না বোঝার মতো করে থাকি? আমি চুপ করে থাকছি বলে এতো অভিমানী, এত কষ্টে।”
তার ভেতরে অদ্ভুত এক মিশ্র অনুভূতি। খুশি, ভয়, লজ্জা, আর গভীর আবেগ। খুশি কারণ রোহান তাকে সীমাহীন ভাবে সত্যিই ভালোবাসে। ভয়ের কারণ তার কালো অতীত । যে শরীরে অন্য কারোর নোংরা ছুঁড়া গেলে আছে।
সে চুপ করে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে রইল, কান্না চেপে রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে থামছে না।
তারপর ধীরে ধীরে পেছন ফিরল। মনে মনে বলল—
“আপনি যদি এতটা কষ্ট পান আমার জন্য, আমি আপনার থেকে মুখ ফেরাতে পারব না রোহান। কিন্তু সামনে অনেক ঝড় আসবে।আমার অতীত যানার পর কি আপনি আমাকে এই ভাবে ভালোবাসবেন রোহান? ”
তার বুকের ভেতর তখনো কাঁপছে। পা দুটো কাঁপতে কাঁপতে সে নিজের রুমের দিকে চলে গেল।
বিকেলের উত্তেজনা আর বিশৃঙ্খলা কেটে গেছে অনেকক্ষণ আগে। রোহানকে শান্ত করাতে আরমান আর জাহেদের অবস্থা একদম নাজুক হয়ে গিয়েছিল। রোহানের চোখের পানি শুকিয়েছে, কিন্তু সেই দৃশ্য এখনো আরমানের চোখে ভাসছে। এত বছর ধরে একসাথে থাকা বন্ধুটা আজ তার কাঁধে মুখ গুঁজে কেঁদেছিল। আর তার কণ্ঠের সেই একটাই কথা—
“ভাই… তোর বোনটাকে দিবি আমায়।”
এই কথার ভার এখনো আরমানের বুকের ওপর চাপ হয়ে আছে।
রোহানকে অনেক কষ্টে শান্ত করা হয়েছে। আরমান নিজেই তাকে বাথরুমে নিয়ে গিয়ে ফ্রেশ করিয়েছে। জাহেদ মজা করে বলছিল—
“ওই হিরো, মেকআপ ধুয়ে ফেল, নাহলে পরের বার মারামারির আগে ক্যামেরা আনব।”
কিন্তু ভিতরের ব্যথা কেউ মুছতে পারেনি।
ওষুধ খাওয়ানোর সময়ও রোহান মুখ গোমড়া করে বসেছিল। আরমান তাকে চেপে ধরে খাইয়ে দিয়েছে। তারপর রাতের খাবার মুখে তুলে দিয়েছে। রোহান কিছু না বলে খেয়ে নিয়েছে, যেন তার সমস্ত শক্তি শেষ হয়ে গেছে।
সব শেষ করে আরমান বলল—
“যা, শুয়ে থাক। বেশি ভাবিস না। সব ঠিক হবে।”
রোহান মাথা নাড়ল। চোখের ভেতর লুকোনো একরাশ আশার আলো, যেন আরমানের কথায় সব ঠিক হয়ে যাবে।
তারপর সবাই নিজ নিজ রুমে চলে গেল। আরমানও ফ্রেশ হয়ে খেয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। শরীরের ক্লান্তি, মনের ভার, সব মিলে তার চোখ লাল হয়ে আছে।
রাত ৯:৪৯।
চাঁদের আলো জানালা পেরিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকেছে। চারপাশ নিস্তব্ধ, শুধু দূরে কুকুরের হালকা ডাক শোনা যাচ্ছে।
এদিকে জারা বিছানায় বসে আছে মোবাইল হাতে। তার বুকের ভেতর ধুকপুকানি যেন কানে শোনা যাচ্ছে। দুপুরের সেই ঘটনার পর থেকে তার মাথা কাজ করছে না। আরমানের চোখের রাগ, সেই চিৎকার, সেই ভয়ঙ্কর চেহারা এখনো তার মনে আঁকড়ে আছে।
“আমি কে তাই না? আজ বোঝাব আমি কে।”
এই কথাটা বারবার কানে বাজছে।
আবার আরমানের সেই আদুরে ছুঁয়া। তাকে জান, সোনা বলে যন্ত করে চোখের পানি মুছে দেওয়া সব এখনো তার চোখের সামনে বেসে উঠছে।
জারা মোবাইলের স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে। হোয়াটসঅ্যাপে আরমানের নামের পাশে ছোট্ট সবুজ ডট। নম্বর আনব্লক করেছে মিনিট দশেক হলো। কিন্তু ফোন দিতে সাহস পাচ্ছে না।
তার মাথার ভেতর শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরছে—
“ও ফোন ধরলে কি বলবে? রাগ এখনো আছে নাকি? আমাকে গালাগালি দেবে? না কথা শুনবেই না?”
হাতের তালু ঘামে ভিজে গেছে। ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ। অবশেষে অনেক দোনামোনা করে কল বাটনে চাপ দিল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল—
Calling…
প্রতিটি রিং তার বুকের ভেতর ধাক্কা দিচ্ছে। হঠাৎ কল রিসিভ হলো।
“হ্যালো।”
আরমানের গলা। গা শিউরে উঠল জারার। ভয়ের চোটে বুকের কলিজা যেন গলায় উঠে এল। সম্মানের সাথে সালাম দিলো সে ভয়ে ভয়ে..
—”আসসালামু… হ্যালো… মানে হায়ালাইকুম… ওহ না— আসসা… হেলাইকুম সালাম?? ”
বলেই থেমে গেল। মুখ দিয়ে কি বের হলো নিজেই বুঝতে পারল না।
লাইন এক মুহূর্ত চুপ। তারপর আরমানের ঠাণ্ডা গলা—
—“কি বললে ?”
জারার হাত কাঁপছে। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে।
——“ওই… মানে… সালাম দিছি…”
——“ ভুল সালাম দেওয়ার উপর পিএইচডি করে আছো তুমি ? আগে সালাম দেওয়া শিখো তারপর ফোন দবে! ”—আরমানের গলায় সেই রাগী সুর।
জারা কেঁপে উঠল। গলা শুকিয়ে গেল।
“ওই… মানে… আমি…”
“বলো তাড়াতাড়ি। আমার বেশি সময় নেই ।”
জারার চোখ দিয়ে কান্না গড়িয়ে পড়ছে। গলা আটকে গেছে। “কি বলব আমি? ক্ষমা চাইব? না বোঝাব আমি চিঠি টা পড়তে চেয়েছিলাম। কিন্তু মিম আর ফিহার ছেলেমানুষীর কারণ পড়তে পারি নাই?”
অবশেষে কাঁপা গলায় বলল—
——“ রাগ কইরেন না প্লিজ। আমি আ আপনার চিঠি টা প পড়তে চেয়ে ছিলাম, কিন্তু….”
আরমানের নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে ফোনের ওপাশে। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর গলা নিচু করে বলল—
——“ থাক পড়তে হবে না তোমায়। আমি তো আর কেউ না তোমার! আমায় দেওয়া চিঠির কেন মূল্য থাকবে তোমার কাছে ?”
জারার বুকের ভেতর হুহু করে উঠল।
——“ আ আমি সত্যি আপনার দেওয়া চি চিঠি টা না চেয়েছিলাম! কিন্তু ।”
জারা’র কথা শেষ করার আগেই আরমান বলে —
——“ থাক এতো ছাফায় গাইতে হবে না! আমার চিঠি পড়তে হবে না, আমার সাথে কথা বলতে হবে না। আমি তো আর তোমার কেউ হই না ? আমি মানুষ না? কল কেটে আবার ব্লক করে দাও আমাকে। ”—আরমানের গলা কাঁপছে রাগে।
জারা এবার হু হু করে কাঁদতে কাঁদতে বলল—
“ শয়তান লোক! আমার কথা আপনি শুনছেন না কেনো? আমার কথা না শুনে শুধু নিজেই বলে যাচ্ছেন? ”
আরমান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কিছুক্ষণ চুপ। তারপর ধীরে বলল—
—“কান্না থামাও। আমার জন্য তোমাকে কান্না করতে হবে না! আমি পর মানুষ! আর কল কেটে ব্লক করে দা….”
আরমানের কথা শেষ করতে দিল না। জারার চোখের পানি গাল বেয়ে বিছানায় পড়ছে। সে ঠোঁট কামড়ে চিৎকার করে বলল
—“ মিম আর ফিহা মজা করে চিঠি টা ছিঁড়ে ফেলেছিল! তাহলে আমি কী ভাবে চিঠি টা পড়তাম? ”
আরমান হালকা চমকে উঠে জারা’র চিৎকারে। বিস্ফরিত গলায় বলল—
––“ কী বললে তুমি? চিঠি ছিঁড়ে ফেলেছে?”
___ ” হুম ”
__ ” তাহলে সেটা আমায় আগে বললে না কেন? ”
__ ” আপনি আমাকে বলার সুযোগ দিয়েছেন? ”
আরমান চুপ হয়ে আছে। সত্যি তো সে জারা’র কথা শুনতেই চাই নি। মাথায় আগুন ধরে উঠছে এখন তার। তার জন্য প্রতি বার পাখি টা কান্না করে। এখনো কান্না করছে। এক হাতে ফোন ধরে অন্য হাতে নিজের চুল ধরে টানছে রাগের তুপে।
জারা’র কান্না থামানোর জন্য শান্ত কন্ঠে বলে
___” হাফ ইঞ্চি মেয়ে ”
আরমানের এতো নরম আর শান্ত কন্ঠ শুনে শিউরে ওঠে জারা। লোকটার হটাৎ গলার স্বর নরম হয়ে গেলো কি করে?
____ ” হুমম ”
__ ” অনেক কষ্ট দেই আমি? আজ অনেক ব্যথা দিয়ে ফেলেছি তাই না? ”
আরমানের এমন ঠান্ডা গলার স্বর শুনে বুকটা মুচড় দিয়ে উঠে জারার। কি বললে সে? এই প্রশ্নের উত্তর আছে তার কাছে?
___ ন না ”
__ ” ভয় পাও আমায়? ”
__ ” হু হুমম ”
__ রাতে খেয়েছ? শরীর ঠিক আছে? ”
__ হু হুম! আপনি খেয়েছেন? ”
জারা’র এমন কাঁপা কাঁপা গলা শুনে ঠোঁট কামড়ে হাসে আরমান। তার পাখি এখন কী সুন্দর করে কথা বলছে।
___ ” হুম খেয়েছি। ”
___ নিশ্চুপ ___
__ ” আচ্ছা ঘুমিয়ে পরো৷ অনেক রাত হয়েছে। ”
আরমান কল কেটে দিতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই জারার কণ্ঠ কেঁপে বলে —
“ শুনুন ?”
কথার ভেতর লুকিয়ে ছিল ভয়, চিন্তা আর এক অদ্ভুত আকুলতা। দুপুরের সেই মারামারির দৃশ্যটা বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। লড়াইয়ের সময় আরমানকে দেখেছিল—কাঁধে কেটে গেছে, হাতের চামড়া ছিঁড়ে গেছে, গায়ের রক্ত মাটিতে পড়ছে।
___ ” বলুন ”
__ ” আ আপনার শরীর ঠিক আছে? ”
আরমান হেসে উঠল, ঠোঁটের কোণে সেই চেনা দুষ্টুমি।
___ “শরীর? হুঁ… তুমি তাহলে আমার শরীর নিয়ে এত চিন্তিত?”
জারা রেগে গেল, কিন্তু তার গলার কম্পন রাগের নয়, অন্য কিছুর। কিন্তু গলায় সংকোচ রেখে বলে জারা
__“ না,মানে ওই ! আমি দু দুপুরে দেখেছি আপনার শরীরের অনেক জায়গায় কেটে গেছে।”
___ ” তুমি আমার শরীর ও লক্ষ করেছো, হাফ ইঞ্চি মেয়ে? ”
__ ও ওই আ আর কি দেখে ছিলাম। বলুন না ব্যথা করছে? ”
আরমান ধীরে ধীরে গলায় মায়া মিশিয়ে বলল,
__ “ব্যথা? তোমার চিন্তায় থাকলে ব্যথা টেরই পাই না। কিন্তু… যদি তুমি একটু আদর করে দাও, সব ব্যথা এক নিমিষে উধাও হয়ে যাবে।”
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ২৮
জারার গাল লাল হয়ে গেল। মুখে সে কিছু বলল না, কিন্তু মনের ভেতর কেমন যেন গরম গরম অনুভূতি ছড়িয়ে গেল। রাগের ভান করে শুধু বলল,
__“ ধ্যাত !”
ফোনের ওপাশে আরমানের হাসি ভেসে এলো, সেই হাসি যা জারার বুকের ভেতর হঠাৎ ঝড় তুলে দেয়।
