রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৮১
সোহানা ইসলাম
সকাল নয়টা আরমান এখনো গভীর ঘুমে। অফিসে যাওয়ার কোনো নাম গন্ধ নেই। ঠিক তখনই ছোট ছোট পায়ে রুমে আসে আরহাম। চোখে মুখে গম্ভীরতা। যেনো এক মস্ত বড় দায়িত্ব নিয়ে রুমে এসেছে সে। সে বিছানার এক দিকে চলে যায়। যে পাশে পাপা শুয়ে আছে। ছোট ছোট হাত দিয়ে বাবার চুল টানতে টানতে বলে,
__“ পাপা উঠু..! আপিস দাবে না? ”
চুল টান পরায় একটু নড়ে চড়ে উঠে আরমান। কিন্তু সজাগ হয় না । বাবা কে উঠতে না দেখে আরহাম বেশ বিরক্ত হয়ে যায়। কোমড়ে হাত দিয়ে কিছু সময় দাঁড়িয়ে থাকে বাবার দিকে তাকিয়ে। তারপর বিছানায় উঠে বাবার উপরে বসে চুল ধরে বলে,
__“ পাপা..উঠু..! পাপা…উঠু..! আম্মু বলেচে ওটতে..!”
আরহাম এবার বেশ জোরেই টান দিয়েছে চুলে। আরমান “ আহ্” বলে চেচিয়ে উঠে। চোখ মুখ খিঁচে নেয়। এক ঝটকায় ছেলেকে নিজের উপর থেকে নামিয়ে কম্বলের ভিতরে ঝাপটে দরে। আরহাম বিচলিত হয়ে মা কে ডাকতে থাকে। আরমান ছেলেকে নিজের সাথে ভালো করে জড়িয়ে ধরে বলে,
__“ সোনা..! এখন আম্মু কে ডাকছো কেনো?”
আরহাম ওর ফোলা ফোলা গাল দুটু আরও ফুলিয়ে বলে,
__“ আম্মু বনেছে তোমায় দাক দিতে.?”
__“ দুষ্টুমি গুলো আম্মুর কাছ থেকে শেখা হচ্ছে তাই না? ”
আরহাম বাধ্য সন্তানের মতো মাথা ঝাকিয়ে বলে,
“ আম্মু শিখি”। আরমান হেসে ছেলের গালে চুমু দেয়। আরহাম আবার বাবার পেটের উপরে বসে বাবার দু’গালে ছোট ছোট হাত দিয়ে বলে,
__“ আম্মু আমাল চব তকলেট খেয়ে পেলেছে পাপা ?”
ছেলের অভিযোগ শুনে আরমান হু হু করে হেসে উঠে। ছেলের গালে হাত দিয়ে বলে,
__“ তোমার আম্মু ও তো তোমার মতো ছোট! তাই খেয়েছে! ”
আরহাম জ্ঞানী মানুষের মতো মাথা ঝাকিয়ে বলে,
__“ আম্মু চোটু..!”
__“ হুমম!”
আরহাম কিছু সময় চুপ করে থাকে। আরমানের আবারও চোখ বুজে আসে। ঠিক তখনই আরহামের কিছু মনে পরে। ওর মা শিখিয়ে দিয়েছে পাপা কে বলতে। না বললে চকলেট দিবে না! তাই আরহাম বাবার বুকে মাথা রেখে বলে,
__“ পাপা চুনো..!”
__“ পাপা শুনছি বলো..!”
__“ পাপা আমাল বোন হবে কবে? ”
আচমকা ছেলের মুখে এমন কথা শুনে আরমান চমকে উঠে। খুক খুক করে কেশে উঠে। বড় বড় চোখ করে ছেলেদের দিকে তাকিয়ে বলে,
__“এসব কে শিখিয়েছে তোমায়.?”
আরহাম বলতে যাবে ঠিক দরজার কাছে একটা শব্দ হয়। বাবা ছেলে দুজনেই দরজার দিকে তাকায়। জারা দাড়িয়ে আছে সেখানে। আসলে জারা অনেক ক্ষন আগেই এসেছে। দরজার সামনে দাড়িয়ে বাবা আর ছেলের কথা শুনেছিলো। এই দৃশ্য দেখতে তার খুব ভালোই লাগছে। কিন্তু যখন আরহান ওর শিখিয়ে দেওয়া কথা বাবাকে বলে, তখন তার হাত কেঁপে ওঠে লজ্জায়। হাতে থাকা কফির মগটা একটু নড়ে চড়ে পরে যায়। তার পালাতে গিয়ে ধরা পড়ে যায়।
আরমান সরো চোখে বউয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
__“ এদিকে আসুন ম্যাডাম..!”
জারা পিছনে ঘুরে একটা বোকা হাসি দিয়ে বলে,
__“ আমার কাজ আছে স্বামীজান। আমি যাই
এখন! ”
আরমান গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
__“ আসতে বলেছি আমি..! ”
জারা গাল ফুলিয়ে টিপ টিপ করে রুমে চলে আসে। আরমান চোখে ইশারা করে তারা কাছে আসতে। জারা প্রথমে না করলেও আরমানের চোখ রাঙ্গানো দেখে জারা বাধ্য বউয়ের মতো গিয়ে আরমানের মাথার কাছে দাঁড়ায়। আরমান এক ঝটকায় জারা’র হাত ধরে নিজের বুকে উপরে এনে ফেলে। জারা চমকে উঠে সঙ্গে সঙ্গে। লোকটা ছেলের সামনে এসব কি করছে ভেবে লজ্জা পাচ্ছে সে। আরহাম বাবার বুকে মা আর সে শুয়ে আছে দেখে খুশিতে হাত তালি দিতে থাকে। এতে জারা আরও লজ্জা পায়। আরমানের বুক থেকে উঠার জন্য ধস্তাধস্তি করে। আরমান জারাকে শক্ত করে ধরে ফিসফিস করে বলে,
__“ চুপ করে শুয়ে থাকো! ”
জারাও আর উপায় না পেয়ে শুয়ে থাকে স্বামীর বুকে। আরমান শুয়া থেকে একটু উঠে বসে। ছেলের দিকে তাকিয়ে বলে,
__“ পাপা..! তোমার বোন চাই? ”
আরহাম উপর নিচে মাথা ঝাকায়। যার অর্থ চাই। আরমান বলে,
__“ তাহলে দাদু ভাইয়ের কাছে যাও! ”
আরহাম বাবার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
__“ আমি দাবো না.? আমাল বোন চাই..! ”
__“ তুমি দাদু ভাইয়ের কাছে গেলেই বোন পেয়ে যাবে? ”
__“ থত্যি কতা..?”
__“ সত্যি কথা! ”
আরহাম বাধ্য ছেলের মতো বিছানা থেকে নেমে যেতে চায়। ঠিক তখনই জারা ছেলের হাত ধরে বলে,
__” তুমি পাপার কাছো থাকো, আম্মু যাই।”
আরহাম মায়ের হাত সরিয়ে দেয়,
__“ না আমি দাবই..!”
আরহাম বিছানা থেকে নেমে রুম থেকে বের হয়ে যায়। আরহাম বাবার কথা খুব মান্য করে। আরমান জারা’র মাথার ওরনা ঠিক করতে করতে বলে,
__“ ছেলেকে কী শেখানো হচ্ছে ম্যাডাম?”
জারা গাবরে গিয়ে বলে,
__“ ক..কই কী শেখাচ্ছি..? ”
__“ কিচ্ছু শেখাচ্ছেন না আপনি? ”
__“ না! ”
আরমান গম্ভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলে। জারাকে বুকের সাথে আরও মিশিয়ে নিয়ে আলতো করে কপাল চুমু এঁকে দেয়। জারা আবেশে চোখ বন্ধ করে নেয়। আরমান বলে,
__“ আমাদের আর বেবির দরকার নেই লক্ষ্মী বউ।তুমি আমি আর আমাদের আরহামই সুন্দর একটা পরিবার হয়ে থাকবো সবসময়। ”
জারা অভিমানী সুরে বলে,
__“ অন্যের স্বামীদের দেখি বেবি নেওয়ার জন্য বউদের সাথে ঝগড়া করে। আর আমি আপনার সাথে। আরহাম হওয়ার পর থেকে আপনার একটাই কথা আমাদের আর বেবি চাই না। কেন চাই না? আরহাম এর ও তো একটা বোনের প্রয়োজন বলুন?”
__“ নূর তো আছেই। তাই আর কোনো বোনের দরকার নেই ওর।”
জারা এবার আরমানের বুক থেকে উঠে রাগী ভাব নিয়ে বলে,
__“ আরহামের বোন লাগবেই! ”
আরমানের ও একটু রাগ উঠে যায়। বিছানা থেকে উঠে বসে। কন্ঠ গম্ভীর রেখে বলে,
__“ এক কথা বার বার বলবে না মানজারা। তুমি খুব ভালো করেই যানো আমি কেনো বেবি চাই না? আর একজন এসেও যদি আরহামের মতো কষ্ট পায় তাহলে আর নিজেকে ক্ষমা করতে পারবো না। আরহাম আমাদের অনেক কষ্টে পাওয়া সুখ। তাই আর দ্বিতীয় বার এসব নিয়ে কথা তুলবে না। ভালো লাগে না আমার। ”
জারা কিছু বলে না। চুপ করে অশ্রু বিসর্জন দিতে থাকে। তিন বছর আগের সেই দিনটার কথা মনে হলেই আরমানের বুকের ভেতরটা আজও হু হু করে ওঠে। সময় অনেক কিছু বদলায়, ক্ষত শুকায়—কিন্তু কিছু স্মৃতি থাকে, যেগুলো কখনো পুরোনো হয় না। শুধু একটু চুপচাপ বসে থাকে হৃদয়ের এক কোণে, সুযোগ পেলেই জেগে ওঠে।
সেদিন ভোর থেকেই আকাশটা কেমন ভারী ছিল। পরিস্থিতি আর সময় দুটুই যেনো তাল মিলে খারাপ গেছে তার। ইসলামপুর গ্রামের কাঁচা-পাকা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলোও যেনো নীরব হয়ে ছিল। গাড়ি চলছে আরমানের মরঝি অনুযায়ী। বার বার মাথায় ঘুরছে স্ত্রী আর সন্তানের পাশে তাকে থাকতেই হবে। তার অর্ধঙ্গ তার জীবনসঙ্গী ভালো নেই। “ ভালো নেই ”এই একটা বাক্যেই আরমানের মাথার ভেতর সব এলোমেলো হয়ে যায়। বার বার আল্লাহর কাছে স্ত্রী সন্তানের সুস্থত্বা চাইছে।
আর কিছু ভাবার সময় হচ্ছিল না, যত তাড়াতাড়ি পারবে পৌঁছাতে হবে। জারা তার জীবনের সবচেয়ে শক্ত মানুষ, কিন্তু সন্তান জন্ম—এই সময়টা যে কতটা ভয়ংকর হতে পারে, সেটা আরমান জানতো। সূর্যের আলো ধরণীতে ছড়িতে পরতেই আরমান বুঝতে পারে, আজকের রাস্তা সহজ না। ময়মনসিংহের ডুকার রাস্তায় বড় জ্যাম। সামনে শুধু গাড়ি আর গাড়ি। হর্ন, চিৎকার, ধোঁয়া—সব মিলিয়ে দম বন্ধ হয়ে আসছিল। প্রথম আধঘণ্টা নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে। মনে মনে দোয়া পড়ে, “আল্লাহ, একটু রাস্তা খুলে দাও।”
কিন্তু সময় যত যাচ্ছে, ততই অস্থিরতা বাড়ছে। আবার ফোন আসে। এবার কণ্ঠটা আরও কাঁপা। “ভাইয়া … জারা আর বেবির অবস্থা ভালো না। ”
এই কথাটা আরমানকে ভেতর থেকে ভেঙে দেয়। চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসে। হাত দুটো শক্ত করে স্টিয়ারিং ধরে রাখে সে। চারপাশের মানুষগু লোকে হঠাৎ শত্রু মনে হতে থাকে—এরা কেনো এগোচ্ছে না? কেনো রাস্তা ছাড়ছে না? এক ঘণ্টা পার হয়ে যায়। জ্যাম নড়ে না। তখনই আরমানের ধৈর্য পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। হঠাৎ করে সে গাড়ি থামিয়ে দরজা খুলে নেমে যায়। আশেপাশের লোকজন অবাক হয়ে তাকায়। কেউ বলে,
__“এই ভাই, গাড়ি রেখে যাবেন না চুরি হয়ে যাবে?”
কিন্তু আরমান কিছুই শোনে না। সে শুধু দৌড়াতে শুরু করে। সামনে ময়মনসিংহ, পেছনে পড়ে থাকে তার গাড়ি, তার স্বাভাবিক জীবন। দৌড়াতে দৌড়াতে তার পা কাঁপতে থাকে। রাস্তাটা সহজ না। কোথাও ভাঙা, কোথাও কাদা, কোথাও হঠাৎ গর্ত। কতবার যে হোঁচট খেয়েছে তার হিসেব নেই। একবার পড়ে গিয়ে হাতের তালু কেটে যায়, রক্ত বের হয়। সে তাকায় না। হাঁটুতে তীব্র ব্যথা ওঠে, তবু সে থামে না।
তার মাথার ভেতর শুধু জারার মুখ। বিয়ের পর প্রথম দিন, প্রথম হাসি, প্রথম ঝগড়া—সব একসাথে চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মনে পড়ে, কতবার সে জারাকে বলেছে,__“তুমি শক্ত মেয়ে আমার শক্ত লক্ষ্মী বউ। তুমি পারবে।তোমার স্বামীজান আসচ্ছে বউ।”
আজ সেই শক্ত মেয়েটাই হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। দুই ঘণ্টার মতো দৌড়ানোর পর অবশেষে হাসপাতালের গেটে পৌঁছায় আরমান। তার অবস্থা দেখে কেউ চিনতে পারে না। শার্ট ঘামে ভিজে গেছে, মুখে ধুলো, চোখ লাল। শ্বাস নিতে পারছে না ঠিকমতো। একেবারে পাগল পাগল অবস্থা তার।সে কাউন্টারে কাউকে ধরে শুধু জিজ্ঞেস করে,
__“মানজারা… আমার বউ.. মানজারা খান কোথায়?”
নাম শোনার সাথে সাথেই নার্সের মুখটা গম্ভীর হয়ে যায়।
__“আইসিইউ।”
এই একটা শব্দেই আরমানের শরীরটা কেঁপে ওঠে। ভেতরে ঢুকে সে আরও একটা খবর শোন,
—“বেবিটাও আইসিইউতে।”
মনে হয়, কেউ যেনো তার বুকের ভেতর থেকে বাতাস টেনে বের করে নিয়েছে। সে হাসপাতালের ফ্লোরে বসে পড়ে, মাথা ধরে। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে, কিন্তু সে কাঁদতে পারে না। গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হয় না। ডাক্তাররা জানায়, বেবি নিউমোনিয়া নিয়ে জন্মেছে। ফুসফুস ঠিকমতো কাজ করছে না। আর জারার সিজারিয়ান অপারেশনের সময় ভুল হয়েছে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, তারপর খিঁচুনি। অবস্থা ক্রিটিক্যাল। বাঁচা মরা আল্লাহর হাতে।
এই কথাগুলো শোনার পর আরমান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। রাগ, ভয়, অসহায়ত্ব—সব একসাথে তাকে গ্রাস করে। সে ডাক্তারের দিকে তেড়ে যায়।
__“ভুল মানে কী? আমার বউয়ের সাথে এমন করলি কেন জানোয়ারের বাচ্চা? খুন করে ফেলবো আমার বউয়ের কিছু হলে কুত্তার বাচ্চা। ”
কথা কাটাকাটি হয়। পরিস্থিতি এমন জায়গায় যায় যে আরমান হাত তুলে ফেলে। বাড়ির লোকজন, হাসপাতালের সিকিউরিটি—সবাই মিলে কোনোমতে তাকে সামলায়। তবুও দুইজন ডাক্তারকে মেরে মরি মরি অবস্থা করে ফেলে আরমান। আরমান কে না সামলালে না হলে সেদিন আরও বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেত।
এই অবস্থার মাঝেই আরমানের নিজের শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। পুরোনো শ্বাসকষ্ট আবার ফিরে আসে। বুকের ভেতর চাপ, মাথা ঘোরা। ডাক্তাররা তাকে বসতে বলে, অক্সিজেন দেয়।আরমানের চোখ মুখ রক্ত লাল হয়ে উঠে শ্বাস নিতে না পারায়। কিন্তু আরমান শুধু বলে,
__“আমি ঠিক আছি। আগে আমার বউ আর বাচ্চাকে দেখ কুত্তার বাচ্চারা। ”
শেষমেশ সিনিয়র ডাক্তাররা সিদ্ধান্ত নেয়—এই কেস এখানে রাখা ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের তিন জনের উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিতে হবে। লন্ডনের টিকিট বুক করা হয় সেদিন ছয়টা। ফারিয়া, মারজিয়া বেগম আর রোহান আরমানদের নিয়ে লন্ডন চলে যায়। সেই মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু বদলে যায়। পাসপোর্ট, ভিসা, ফ্লাইট—সব যেনো যুদ্ধের মতো।
লন্ডনে পৌঁছানোর পর শুরু হয় আরেক যুদ্ধ। প্রতিদিন আইসিইউর বাইরে বসে থাকা। কাঁচের ওপাশে শুয়ে থাকা জারা—চোখ বন্ধ, শরীরের সাথে অসংখ্য তার। আর পাশে ছোট্ট ইনকিউবেটরে তার সন্তান—যার নামও তখনো ঠিক করা হয়নি।
লন্ডনে পৌঁছানোর পর ভালো চিকিৎসার জন্য আরমান তুলনামূলক দ্রুতই সুস্থ হয়ে ওঠে। কিন্তু তার সুস্থতা মানে শুধু শরীরের সুস্থতা। মনটা তখনো আইসিইউর বাইরে বসে কাঁপছে। জারা তখনো অচেতন। বেবিটা ছোট্ট ইনকিউবেটরে, অসংখ্য তার আর যন্ত্রের ভেতর। আরমান প্রতিদিন আইসিইউর সামনে দাড়িয়ে কথা বলতো একা একা,
__“মানজারা, আমি আছি। তুমি একা না। ”
ছেলের কেবিনের সামনে গিয়ে কাদঁতে কাদঁতে বলতো,
__“ পাপা তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। তুমি আর আম্মু তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে আমার কাছে চলে আসো সোনা।”
সে জানতো না, তারা শুনছে কি না। তবু কথা বলা বন্ধ করেনি। তার বিশ্বাস ছিল, ভালোবাসা কখনো নষ্ট হয় না। তার বিশ্বাস ছিল, তার কণ্ঠস্বরই হয়তো ওদের দুজনকে টেনে রাখছে এই পৃথিবীতে। ধীরে ধীরে দিন যায়। আরমান প্রতিদিন সেজদায় বসে কান্না করে স্ত্রী সন্তানের জন্য। আরমানের কান্না দেখে ফারিয়া বেগম, মারজিয়া বেগম আর রোহান ও কান্না করে দেয়। কতো হাহাকার সহ্য করছে ছেলেটা। টানা একমাস পর এক দিন বেবির অক্সিজেন সাপোর্ট একটু কমানো হয়। নার্স এসে হাসিমুখে বলে,
__“শি ইজ স্টেবল নাও।”
সেদিন আরমান সিজদায় পড়ে যায়। এতদিন পর মনে হয়, সে একটু নিঃশ্বাস নিতে পারছে। অনেক দিন, অনেক রাত পেরোনোর পর ধীরে ধীরে বদল আসে। জারা শ্বাস স্বাভাবিক হতে শুরু করে। জারার খিঁচুনি কমে আসে। মাসের পর মাস চিকিৎসা চলে।
আরমান শারীরিকভাবে সুস্থ হয়ে ওঠে, কিন্তু মনটা তখনো ভাঙা। সে বুঝে যায়, জীবন তাকে দ্বিতীয় সুযোগ দিয়েছে। বউ আর সন্তানের প্রায় তিন মাস টানা চিকিৎসা চলেছে লন্ডনে। এই দিন গুলো ভুলার নয়। স্ত্রী সন্তান নিয়ে এতো কঠিন সময় কাটানোর পর আর কোনো রিস্ক নিতে চায় না আরমান। সবসময় নিজের সাথে, নিজের কাছে আগলে রাখে। তিন মাস পর, যখন দেশে ফিরার সময় তার পাশের সিটে ঘুমন্ত জারা, আর তার মায়ের কোলে ঘুমানো আরহামকে দেখে—তখন তার চোখ ভিজে ওঠে। এই শান্ত মুহূর্তের পেছনে কত ভয়, কত কান্না, কত দোয়া লুকিয়ে আছে, সেটা শুধু সে জানে। সে মনে মনে বলে,
__“আল্লাহ, তুমি আমাকে যা দিয়েছো, তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। আমার পৃথিবীটা আমার কাছে ফিরিয়ে দিয়েছো।”
গাড়ির ভেতর নিঃশব্দে সে হাসে। কারণ সে জানে—এই ঘুমন্ত পৃথিবীর জন্যই সে সেদিন দৌড়েছিল, ভেঙে পড়েছিল, আবার দাঁড়িয়েছিল। দেশে ফিরার পর আরহামের এক বছর হওয়া পর্যন্ত আরমান অফিস ও পুরো দমে বন্ধ করে। আর এখন অফিস যায় মন চাইলে। তার পৃথিবীগুলোকে ছেড়ে দূরে যেতে মন সায় দেয় না। মনে হাজার খারাপ চিন্তা ঘুরে। অবশ্য আরমানকে অফিসে যাওয়ার জন্য জোর করাও হয় না। সবাই আরমানের অবস্থা এবং ভয় টা বুঝে। আরমান অফিসে গেলে সন্ধ্যার মধ্যে আবার ফিরে আসে।
আজ আবার তিন বছর পর আবার বাচ্চা নেওয়ার কথা শুনে আরমানের রাগ কম ভয় টাই বেশি হয়। হারানোর ভয় আর সে পেতে চায় না। এখন শুধু সন্তান কে নিয়ে সুখের জীবন পার করা। হতাশ হয়ে গম্ভীর নিশ্বাস ফেলে জারার দিকে তাকায়। জারা বিছানার এক কোণে বসে ফুপিয়ে কাঁদছে। আরমান ধীরে পায়ে বউয়ের সামনে দাঁড়ায়। জারা আরমানকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চায়। তখনই আরমান খপ করে জারা’র হাত ধরে ফেলে। জারা হাত ছাড়িয়ে নিতে নিতে বলে,
__“ হাত ছাড়ুন আমার..!”
আরমান ছাড়ে না বরং জারা’কে নিজের বুকে আগলে নেয়। জারা প্রথমে ছুটার জন্য লড়াই করলেও আরমান যখন ওকে ছোট্ট বাচ্চার মতো আগলে তখন একেক চুপ হয়ে জারা। আরমান জারার হাত ধরে চুমু খেলা গুনগুন করে বলে,
~~~আমি বৃদ্ধ হবো তোমার হাতে
তোমায় তুলবো রাগি…
এই হাতটা ধরে যেতে চাই
আমি সত্যি বহুদুর….
আরমান জারার হাতটা নিজের মুঠোর ভেতর আরও শক্ত করে ধরে। তার কণ্ঠে কোনো উচ্চতা নেই, নেই জোর—তবু কথাগুলো জারার বুকে সোজা গিয়ে লাগে।
—“এই হাত ছাড়ার জন্য ধরিনি। আগলে রাখার আর ভালোবাসার জন্য ধরেছি। তাই ছাড়ার প্রশ্নই আসে না।”
এই কথাটা শুনেই জারার চোখ ভিজে ওঠে। এতক্ষণ যে অভিমানটা বুকের ভেতর পাথরের মতো জমে ছিল, সেটা হঠাৎ গলে পানি হয়ে নামতে চায়। সে চোখ নামিয়ে নেয়, ঠোঁট কাঁপে, কিন্তু কিছু বলতে পারে না। আরমান সেটা টের পায়। সে জানে—এই নীরবতাই সবচেয়ে বেশি কথা বলে। আরমান ধীরে ধীরে জারার কাছে এগিয়ে আসে। দুই হাত দিয়ে জারার মুখটা নিজের দিকে তুলে ধরে। সে নরম স্বরে বলে,
—“এইভাবে চোখ নামিয়ে রাখলে আমি ভয় পায়ই।মনে হয় আমার বউটা কষ্ট পাচ্ছে।”
জারা আর নিজেকে সামলাতে পারে না। চোখের কোণ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। সে ফিসফিস করে বলে,
__“ ভালোবাসি স্বামীজান… খুব ভালোবাসি আপনাকে আরহামকে পাপা।”
আরমান সাথে সাথে তার কপালে একটা আলতো চুমু দেয়। কোনো তাড়াহুড়া নেই, কোনো জোর নেই—শুধু নিশ্চিন্তি।
—“আমিও আপনাকে খুব ভালোবাসি আরহামের আম্মু। তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা হলো রৌদ্রমাখা বালির মতো। চকচক করে। ”
জারা হালকা করে হেসে ফেলে, কান্নার মাঝেই।
—“আপনি এসব সময় এতো কথা কোথা থেকে পান?”
আরমান ভ্রু কুঁচকে দুষ্টু ভঙ্গিতে বলে,
—“এইগুলো তো তোমার কাছ থেকেই শিখেছি, ম্যাডাম।”
জারা চোখ মুছতে মুছতে তাকায়।
—“মিথ্যে কথা বলে শুধু ।”
—“একদম সত্যি। ”
এই কথা শুনে জারার বুকটা আবার কেঁপে ওঠে। সে মুখ ঘুরিয়ে নেয়, যেন লজ্জা লুকাতে পারে। আরমান সুযোগ ছাড়ে না। সে আবার জারার গালে আলতো একটা চুমু দেয়। তারপর আরেকটা।
—“এই যে, একটু হাসো,কান্না করলে আমার খুব মন খারাপ হয়।”
জারা ঠোঁট চেপে ধরে, কিন্তু হাসিটা আটকে রাখতে পারে না।
—“আপনি খুব বাজে। এইভাবে সব অভিমান ভেঙে দিন।”
আরমান চোখ টিপে বলে,
—“এটাই তো আমার কাজ।”
সে এবার ইচ্ছে করে একটু নরম দুষ্টুমি করে। জারার নাকটা আলতো করে ঠোঁট ছুঁয়ে দেয়।
—“এই নাক দিয়ে এত রাগ আসে কোথা থেকে?”
জারা হঠাৎ করে হেসে ফেলে।
—“এই! কী করছেন?”
আরমান গম্ভীর মুখে বলে,
—“পরীক্ষা করছি। রাগ এখনো আছে কি না।”
জারা মাথা নাড়ে।
—“নেই।”
আরমান বিজয়ের ভঙ্গিতে বলে,
—“দেখেছো! আমি জানতাম নেই ।”
কথার ফাঁকে আরমান আবার কাছে আসে। জারার হাত নিজের বুকে রেখে বলে,
—“তুমিই তো আমার সব ভালোবাসা নিয়ে যাচ্ছো। আমাকে একটু ভালোবাসা দেবে না?”
এই কথাটা শুনে জারা পুরো লাল হয়ে যায়। সে চোখ তুলে তাকাতে পারে না। জারা ফিসফিস করে বলে,
—“কী বলছেন এসব?”
আরমান শান্তভাবে বলে,
—“ সত্যি বলছি ম্যাডাম। ”
জারা এক পা পিছিয়ে যায়। তার লজ্জা এখন আর ঢাকার জায়গা খুঁজে পাচ্ছে না। আরমান সেটা দেখে হেসে ফেলে।
—“এই দেখো, আবার পালানোর প্ল্যান করছো ।”
সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে জারার ঠোঁটের খুব কাছে চলে আসে। শ্বাসের উষ্ণতা জারা টের পায়। বুকের ভেতর ধকধক শুরু হয়। ঠিক তখনই— জারা হঠাৎ
করে আরমানকে ঠেলে দেয়।
—“না!”
বলে, প্রায় দৌড়ে দরজার দিকে ছুটে যায়। আরমান এক সেকেন্ডের জন্য অবাক হয়ে যায়। তারপর বুঝে যায়—এইটা রাগ না, এইটা লজ্জা। তার মুখে বড় একটা হাসি ফুটে ওঠে। জারা দরজা খুলে এক দৌড়ে বেরিয়ে যায়। আরমান পিছন থেকে চিৎকার করে,
__“ভালোই তো বাসো, তাহলে এত ফাঁকি বাজি করো কেন বউ?”
জারা থামে না। সিঁড়ির দিকে দৌড়াতে দৌড়াতে তার মুখে হাত চেপে ধরে। বুকের ভেতর এখনো হাসি আর লজ্জা একসাথে নাচছে।আরমান আবার ডাকে,
—“একটু আদর দিয়ে যাও না তোমার স্বামীজানকে!”
নিচে পৌঁছে জারা দাঁড়ায় না। সে জানে, দাঁড়ালে আরমানের কথা মনে পড়ে যাবে, আর সে আবার লজ্জায় গলে যাবে। তাই এক দৌড়ে ড্রইংরুম পেরিয়ে চলে যায়। উপরে দাঁড়িয়ে আরমান গভীর নিঃশ্বাস ফেলে। তার চোখে এখন শান্তির ঝিলিক। তার মুখে হাসি লেগেই থাকে। কারণ সে জানে—এই দৌড়ের পেছনে ভয় নেই, অভিমান নেই। আছে শুধু ভালোবাসা আর লজ্জার মিষ্টি ছোঁয়া। আরমান জানালার পাশে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকায়। মনে মনে বলে,
—“যতই পালাও, শেষমেশ তো আমার কাছেই ফিরবে।”
ঘরের ভেতরটা নীরব, কিন্তু তার বুকের ভেতরটা ভরে আছে উষ্ণতায়। এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই তো তাদের সংসারকে বাঁচিয়ে রাখে—কান্না, হাসি, লজ্জা আর অগাধ ভালোবাসার মিশেলে।
জারা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই ঘরের ভেতরটা অন্যরকম একটা কোলাহলে ভরা বলে মনে হলো। ড্রইংরুমের মাঝখানে নরম কার্পেটের ওপর আরহাম বসে আছে রিয়াত আর নূরের সঙ্গে। তিনজনের সামনে ছড়ানো রঙিন খেলনা, গাড়ি, বল—কোনটার দিকে যে আগে হাত বাড়াবে, ঠিক করতে পারছে না আরহাম। কখনো রিয়াতের গাড়িটা নিয়ে টানাটানি করছে, কখনো নূরের হাতে থাকা পুতুলটা ছুঁয়ে দেখছে। আরহামের মুখে সেই চেনা দুষ্টু হাসি, চোখে উচ্ছ্বাস।
সোফায় বসে আছে মিম, ফিহা আর জিনিয়া। তিনজনের মাথা প্রায় কাছাকাছি, যেন গোপন কোনো মজার গল্প চলছে। মাঝেমধ্যে হাসির ফোয়ারা ছুটে আসছে তাদের দিক থেকে। জারা সেটা লক্ষ্য করে হালকা হাসে। সে গিয়ে ওদের পাশে বসে পড়ে।জারা কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করে,
—“কি ব্যাপার? তোমরা তিনজন এত সিরিয়াস মুখ করে কার সাথে কথা বলছো?”
ফিহা ফোনটা একটু সামনে এনে বলে,
—“ছায়মা আপু কল করেছে জানু।”
এই নামটা শোনামাত্রই জারার মুখটা যেন আলোয়
ভরে ওঠে। চোখ দুটো চকচক করে ওঠে, ঠোঁটে বড় একটা হাসি।সে প্রায় লাফিয়ে ওঠার মতো করে বলে,
—“সত্যি?দে তো ফোনটা।”
ফিহা হাসতে হাসতে ফোনটা জারার হাতে দেয়। ছায়মা ভিডিও কল করেছে। জারা ফোন মুখের সামনে ধরতেই ওপাশ থেকে পরিচিত হাসিখুশি কণ্ঠ ভেসে আসে।ছায়মার গলায় সেই পুরোনো উষ্ণতা, দূরত্বের কোনো ছাপ নেই,
—“কী খবর, মানজারা?”
জারা উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে ওঠে,
—“ ভালো! আপু! তুমি না আমাকে কথা দিয়েছিলে, আরহামের জন্মদিনে দেশে আসবে! এখনো আসছো না কেন?”
ওপাশ থেকে ছায়মার হাসির শব্দ শোনা যায়।
—“আহা, এতো রাগ কেন? আমি কি কখনো কথা ভাঙি?”
জারা বাচ্চাদের দিকে একবার তাকায়। আরহাম তখন নূরের হাত থেকে খেলনা নিতে গিয়ে নিজেই হুমড়ি খেয়ে বসে পড়েছে। সে আবার ফোনে মন দেয়।
—“তাহলে এবার সত্যিই আসছো তো?”
ছায়মা একটু থেমে বলে,
—“হ্যাঁ, আমি আমার কথা রাখবো। চিন্তা করো না। আরহামের জন্মদিন আমি মিস করবো না।”
জারা খুশিতে প্রায় কেঁদে ফেলে।
—“তুমি জানো আপু, ও তোমাকে কতটা পছন্দ করে!”
ছায়মার কণ্ঠ একটু নরম হয়ে আসে।
—“আমি জানি। ও তো আমারও খুব আদরের।আমাকে কাছ থেকে না দেখেও কতো ভালোবাসে ।”
কথার ফাঁকে ছায়মার জীবনের গল্পগুলো জারার মাথায় ভেসে ওঠে। কত বছর হয়ে গেল সে দেশ ছেড়েছে। তখন জাহিরের বিয়ে নিয়ে খান বাড়িতে আলোচনা হচ্ছিল। রিয়াত কে দেখতে এসে জারার মা বাবা জাহিরের বিয়ের কথা তুলে। আী বলে ভালো মেয়ে পেলে বিয়ে করিয়ে দিবে ছেলেকে। ছায়মা জানত—জাহির তার ভাগ্যে নেই। ভালোবাসার মানুষটাকে নিজের চোখের সামনে অন্য কারও সঙ্গে সংসার করতে দেখা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই পড়াশোনার নাম করে আমেরিকায় চলে গিয়েছিল সে। আশ্চর্যের বিষয় সেদিন কেউ তাকে আটকায়নি।
ছায়মা জানতে চায়,
—“তোমরা সবাই কেমন আছো?”
—“ভালো আপু, আলহামদুলিল্লাহ।”
—“ভালো লাগছে শুনে। আমি আসলে তোমাদের অনেক মিস করি।”
আরও কিছু টুকটাক কথা হয়। ছায়মা আবার আশ্বাস দেয়, খুব শিগগিরই দেখা হবে। কল কেটে গেলে জারা কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকে, যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না এতদিন পর আবার ছায়মা আসছে।
তাদের কথার মাঝেই সিঁড়ির দিক থেকে পায়ের শব্দ আসে। আরমান অফিসের জন্য রেডি হয়ে নিচে নামছে। গায়ে পরিপাটি শার্ট, হাতে ফাইল। নেমেই সে আরহামের দিকে তাকায়।
—“এই যে আমার সোনা পাপা। কি করো !”
__“কেলি..!”
আরমান গিয়ে খাবার টেবিলে বসে। জারা আরমানের পাতে খাবার বেরে দেয়। আরমান খাবার শেষ করে যখন চেয়ার ছেড়ে উঠে তখনই আরহাম খেলনা ফেলে ছুটে গিয়ে বাবার পা জড়িয়ে ধরে।
—“পাপা, আমিও দাবো!”
আরমান হেসে ছেলেকে কোলে তুলে নেয়।
—“অফিসে গিয়ে তুমি কি করবে?”
আরহাম গম্ভীর গলায় বলে,
—“আমি গালি চানাবো। পাপা, আমি দাবো তোমাল সাথে ।”
জারা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
—“আজ তুমি বাড়িতেই থাকবে। তোমার নানু ভাই আর মামারা আসবে।”
এই কথাটা শুনে আরহামের চোখ বড় হয়ে যায়।
—“নানু ভাই আতবে?”
—“হ্যাঁ,কাল তো তোমার জন্মদিন তাই সকলেই আসবে ।”
জন্মদিন কথাটা শুনে আরহাম সঙ্গে সঙ্গে বাবার দিকে তাকায়।
—“আত্তা আমি দাবো না। পাপা, তকলেট আনবে তিত্তু!”
আরমান ছেলের নাক ছুঁয়ে বলে,
—“আচ্ছা, আনবো। অনেকগুলো আনবো।”
জারা মৃদু হেসে আরমানের দিকে তাকায়। চোখে তার আলাদা একটা উজ্জ্বলতা। আজ তার মনটা ভরে আছে—ছায়মা আসবে, মা-বাবা আসবে, ছেলের জন্মদিন। ছোট ছোট সুখগুলো মিলেই যেন তার সংসারটা পূর্ণ হয়ে উঠছে। আরমান আরহামকে আবার মাটিতে নামিয়ে দেয়।
—“শোনো, আমি এখন যাই। আম্মুর কথা শোনবে, ঠিক আছে?”
আরহাম মাথা নেড়ে বলে,
—“তিক আছে।”
আরমান জারার দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বলে,
—“ ছেলেকে নিয়ে সাবধানে থেকো?”
জারা হালকা হাসি দিয়ে মাথা নাড়ে।
—“হ্যাঁ, আপনি সাবধানে জাবেন ।”
আরমান বেরিয়ে যাওয়ার আগে আরহামের কপালে চুমু দেয়।
—“পাপা, আমি আসছি।”
আরহাম দরজা পর্যন্ত গিয়ে হাত নাড়ায়।
—“তকলেট ভুলবে না তিন্তু!”
দরজা বন্ধ হলে জারা কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর আবার ড্রইংরুমে ফিরে আসে। আরহাম তখন রিয়াত আর নূরের সঙ্গে খেলায় মেতে উঠেছে। জারা ওদের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবে—এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই তো তার জীবনের আসল সম্পদ।
বিকেলের দিকে খান বাড়িটা হঠাৎ করেই যেন আরও বেশি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। সদর দরজার সামনে গাড়ির শব্দ শোনা যেতেই আরহাম সবার আগে ছুটে যায়। ছোট ছোট পা ফেলতে ফেলতে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়, যদিও দরজা খোলার শক্তি তার নেই। চোখ দুটো বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে—কে এলো দেখতে!
জারা উপর থেকে নামতে নামতে ডাক দেয়,
—“আরহাম, দাঁড়াও, পড়ে যাবে!”
ঠিক তখনই দরজা খুলে যায়। জারার মা-বাবা ভেতরে ঢুকতেই আরহাম খুশিতে লাফিয়ে ওঠে।
—“নানুuu!নানা ভাই !”
একসাথে দু’দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় সে। জারার মা হেসে তাকে কোলে তুলে নেন, আর জারার বাবা নানিরমাথায় আদর করে হাত বুলিয়ে দেন।
—“আরে আমার সোনা, কত বড় হয়ে গেছিস!”
এই সুযোগে দুই মামা—জাহির আর জোহান,একসাথে এগিয়ে আসে। জাহির হাত বাড়ায়,
—“এই এই, নানু নানি না, এখন মামার পালা,”
জোহান বলে আরহামের অন্য হাত ধরে,
—“না না, আগে আমি,”
কোথা থেকে যে এত শক্তি পায়, আরহাম নিজেও জানে না। একদিকে নানু, অন্যদিকে মামা—এভাবে টানাটানি শুরু হয়ে যায়। খানিকটা সময় সে মজা পায়, হাসে, খিলখিল করে। কিন্তু টানাটানি একটু বেশি হতেই মুখটা বেঁকিয়ে বলে ওঠে,
—“তামু তোনলা? বিরুক্ত নালে?”
তার আধো আধো কথা শুনে ড্রইংরুম জুড়ে হাসির রোল পড়ে যায়।জারা হেসে বলে,
—“শোনো শোনো,আমার ছেলে কিন্তু প্রতিবাদ জানাচ্ছে।”
জারার মা সঙ্গে সঙ্গে আরহামকে নিজের বুকে টেনে নেন।
—“আচ্ছা আচ্ছা, আর টানাটানি করবো না। আমার নাতিটা বিরক্ত হয়ে গেছে।”
জাহির মজা করে বলে,
—“এই বয়সেই বিরক্ত হতে জানে? একদম বাবার কপি।”
আরহাম নানির কোলে বসে গম্ভীর মুখে তাকিয়ে থাকে। তারপর হঠাৎ জাহিরের দিকে আঙুল তুলে বলে,
—“মামা খালাপ!”
সবাই আবার হেসে ওঠে। জাহির ভান করে বুক চেপে ধরে,
—“আহা, এ কেমন বিচার! আমি তো শুধু আদর করছিলাম।”
এই ফাঁকে জোহান সুযোগ খুঁজে আরহামকে কোলে তুলে নেয়।
—“এইবার আমার পালা।”
জোহান বড় ভাই জাহিরের পেছনে পেছনে ঘুরে বেড়ায় সবসময়। আজও তার চোখ শুধু আরহামের দিকেই। কোলে নিয়েই সে ঘুরতে থাকে, কখনো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আরহামকে দেখায়, কখনো জানালার ধারে নিয়ে যায়।
—“দেখো, বাইরে কত গাড়ি।”
আরহাম চোখ বড় বড় করে বাইরে তাকায়। তারপর হঠাৎ জোহানের কাঁধে মাথা রেখে ফিসফিস করে বলে,
—“নামাও।”
জোহান হেসে বলে,
—“এই তো নিলাম,”
এই সময় জারার বাবা সোফায় বসে পরেন।ফারিয়া বেগম, জেসমিন বেগম আর তাদের আপ্যায়ন করতে ব্যস্তা হয়ে পরেন। আনিছুর রহমান মৃদু হেসে বলেন,
—“দেখছো, এদের আদরেই ছেলেটা হাঁপিয়ে যাচ্ছে।”
জারা পাশে বসে মায়ের সাথে কথা বলছিল।
—“মা, তোমরা আসাতে ও আজ সারাদিন অস্থির ছিল।”
মারিজায় মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলেন,
—“নাতির জন্য তো মনটা সবসময় টানে।”
ড্রইংরুমে যেন ছোটখাটো মেলা বসে গেছে। ফিহা, মিম, জিনিয়া—সবাই এসেছে। কেউ আরহামের গালে চুমু খাচ্ছে, কেউ মাথায় হাত বুলাচ্ছে। আরহাম একসময় সত্যিই বিরক্ত হয়ে যায়। কোলে কোলে ঘোরা তার ভালো লাগলেও, এত লোকের মাঝে সে একটু শান্তি চায়। হঠাৎ সে জোহানের কোল থেকে নেমে মাটিতে দাঁড়িয়ে জোর গলায় বলে,
—“ আমাকে দববে না তেউ। আমি গেম খেলবো!”
—“ওহ, সাহেবের এবার গেম খেলতে ইচ্ছে হয়েছে,”
জাহির হাসে। আরহাম দৌড়ে গিয়ে রিয়াত আর নূরের কাছে বসে পড়ে। ওরা তখন খেলনা গাড়ি নিয়ে খেলছিল। রিয়াত ছোট হলেও দায়িত্ববান ভঙ্গিতে বলে,
—“ভাই আসো, আমরা খেলি।”
আরহাম খেলনায় মন দিলেই খানিকটা শান্ত হয়। বড়রা দূর থেকে তাকিয়ে থাকে। জারার মা চোখ মুছতে মুছতে বলেন,
—“দেখছো, এই বয়সেই কত বুদ্ধি!”
জারার বাবা গর্বের সাথে বলেন,
—“খান পরিবারের রক্ত তো!”
এই কথার মাঝেই আবার জাহির কাছে আসে। নিচু হয়ে আরহামের সামনে হাত বাড়িয়ে বলে,
—“আচ্ছা, মামার সাথে একটু ছবি তুলবি?”
আরহাম ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
—“না।”
এই সরল ‘না’ শুনে সবাই আবার হেসে ওঠে। জোহান ফিসফিস করে বলে,
—“দেখেছো ভাইয়া, আমাদের গুরুত্ব কমে গেছে।”
জারা সব দেখে মনে মনে হাসে। তার চোখের সামনে যে দৃশ্যটা—বাবা-মা, ভাই, স্বামী, বাচ্চারা—সব মিলিয়ে এক পরিপূর্ণ পরিবার। এই কোলাহল, এই হাসি, এই টানাটানি—সবই তার জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকছে। আরহাম খেলতে খেলতেই হঠাৎ জারার কোলে এসে মাথা রাখে।
—“আম্মু,”
জারা ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে।
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৮০
—“কি হয়েছে আমার সোনা বাচ্চার? ”
—“ঘুম পায়।”
সবাই হেসে ওঠে। এত আদর আর দুষ্টুমির পর ছোট্ট শরীরটা যে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। জারা ছেলেকে কোলে তুলে নেয়। বড়রা তাকিয়ে থাকে—ভালোবাসায় ভরা চোখে। আজকের বিকেলটা শুধু এক বিকেল নয়, পুরো পরিবারের জন্য একখণ্ড সুখের স্মৃতি হয়ে রয়ে যায়।
