লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ১
লিজা মনি
রক্তের রং লাল — কিন্তু আমার কাছে এ লাল এক অলৌকিক শুদ্ধতা এক বিকৃত মোহ।
অন্ধকার — নিছক ছায়া নয় বরং আমার আত্মার চিরস্থায়ী বাসভূমি।
মানুষের কণ্ঠবিদারক চিৎকার আর ছিন্নবিচ্ছিন্ন আহাজারি — এ আমার শ্রুতিমধুর সংগীত ও পৈশাচিক প্রশান্তির অলিখিত উৎস।
আফ্রিকার অপরাধ জগতের অবিসংবাদিত রাজপুত্র আমি । আমি নই রাষ্ট্রের নিয়ম আমাতে বন্দী।রাষ্ট্র বন্দী আমার ইচ্ছের শেকলে। আমার চাওয়া মানেই শাসন, আমার না বলা মানেই রক্তক্ষয়ী বিপ্লব।
এই সব কিছু আমার সব চেয়ে প্রিয় জিনিস। রক্ত হাতে নিয়ে খেলা করতে আমি সবচেয়ে বেশি ভালো বাসি। ভিতরে এক প্রশান্তি আসে। যখন কারোর বুকে ছুঁরি চালাই ঠিক তখন আমার ভিতরে এক উন্মাদনার রুপ নেয়। পৈশাচিক আনন্দ পায় তখন।
ব্লেক ভাইপার মেনশনের ভিতরে অবস্থিত কালো রঙ্গে আবৃত এক রুমে দাঁড়িয়ে আছে এক সুঠামদেহীর অধিকারী ব্যক্তি । সদ্য শাওয়ার নিয়ে শরীরের রক্ত পরিষ্কার করে এসেছে। পানির ফোটাগুলো শরীরের মুক্তার মত চিকচিক করছে। ভয়ংকর সেই লোকটা নিজের শরীরটা টাওয়াল দিয়ে মুছতে থাকে। হাতে দুইটা পাখির ট্যাটু, গলায় ড্রাগনের, পিঠে সাপের ট্যাটু খোদায় করা। ফর্সা শরীরে জলকণার স্পর্শে প্রতিটি ট্যাটু যেন জীবন্ত হয়ে উঠে। লোকটার মুখে সবসময় এক ভয়ংকর ভাব ফুটে থাকে। হুট করে শব্দ করে মোবাইলটা বেজে উঠে। ফোনটা মোবাইলে হাতে নিয়ে কানে চেপে ধরে। মুহূর্তেই রক্ত টগবগিয়ে উঠে। ধাঁরালো আর ঝাঁঝালো ভয়ংকর আওয়াজ,,
— যত টাকা লাগে ঠিক তত টাকা নিয়ে যা । নিলামে যেমন হোক জিতটা যাতে আমাদের হয়।
— হ্যা।
ফোন কেটে লোকটা বিশাল সাইজের বিছানার এক পাশে বসে। চোখে কোনো আবেগ নেই।
শুধু শীতল, বিশ্লেষণী, অগ্নিগর্ভ নীরবতা।
প্রতিটি তাকানো মানে এক রক্তস্নাত ভবিষ্যতের ঘোষণা।
আফ্রিকার অপরাধ চক্রের এক নির্জন নিলাম কেন্দ্রে আঠারো জন গ্যাংস্টার বসে আছে। তাদের সামনে রাখা হয়েছে একটা মেয়েকে। যার পুরো দেহ কালো কাপড়ে আবৃত করে রেখা । তার মুখ সব ঢাকা। মেয়েটাকে পাচার করার জন্য আনা হয়েছিলো। কিন্তু তার সৌন্দর্য তাকে নিয়ে এসেছে এখানে। মেয়েদের সৌন্দর্য এক পবিত্র দান। কিন্তু সেই সৌন্দর্য একদিন কাল হয়ে পড়ে। যদি কোনো শকুনের নজরে পড়ে তাহলে বিনাশ নিশ্চিত। পাচার কেন্দ্রে মেয়েটার সৌন্দর্য সবার চোখে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলো। ঊনিশ বছরের এক মেয়েকে কেনার জন্য বসে আছে দেশ সেরা বড় বড় গ্যাং স্টারেরা। একজনে বিশ কোটি টাকার আবেদন রাখে। ব্যক্তিটার কথা শুনে একজন ঠাট্টা করে বলে,,
” সবজি ক্রয় করতে আসো নি হুক। মাত্র বিশ কোটি টাকা রাখো কোন বিবেকে?
সবাই হেসে উঠে।
— ত্রিশ কোটি!
— চল্লিশ কোটি!
— পঞ্চাশ কোটি!
___ সত্তর কোটি!
___ একশত কোটি!
গম্ভীর আর ঝঁঝরা সেই ভয়ানক আওয়াজে কম্পিত হয়ে পড়ে সেই নিলাম কেন্দ্র। কেন্দ্রের প্রতিটি দেয়াল জানান দিচ্ছে কেউ একজন এসেছে। সব কিছু এক মুহূর্তে যেন স্তব্দ হয়ে যায়। মেয়েটা ভয়ে কাঁপছে।।জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে যে কোনো সময়। তার চোখে কাঁপর বেঁধে রাখা হয়েছে ফলে কিছু দেখতে পারছে না। বাচ্চা মেয়েটা আল্লাহর কাছে হয়ত প্রান আর ইজ্জত ভিক্ষে চাইছে। তার জানা নেই সেখানে থেকে আর কোনো দিন বেঁচে ফিরতে পারবে কি না? তার আপা কি করছে এখন? নিশ্চয় ওর জন্য এখন চিন্তায় ধুঁকে ধুঁকে মরছে? মেয়েটা মনে মনে ফুঁপিয়ে উঠে। কিন্তু এখানে কান্নার শব্দও বারন।
একশত কোটি টাকার কথা শুনে সবাই পিছনে ফিরে দরজার দিকে তাকায়। কালো কোর্ট পরিহিতা ছয় ফুট লম্বা এক সুদর্শন হিংস্র যুবক দাঁড়িয়ে আছে। যুবকটা ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে তাদের সামনে তার বরাদ্ধকৃত চেয়ারে বসে। চোখ দুটি গম্ভীর। ঠোঁটের কোনে বাঁকা হাসি। পায়ের উপর পা রেখে গম্ভীর আওয়াজে বলে,,
” একশত কোটি টাকা বলেছি আমি। যদি এর থেকে বেশি টাকা দিয়ে কেউ নিতে চাও তাহলে বলতে পারো।
সবাই মাথা নত করে ফেলে। তাদের কাছে বর্তমানে এত টাকা নেই। যে টাকা দিয়ে এক রমনী কিনতে পারবে। এই মেয়েটার জন্য একশত কোটি টাকা তাদের কাছে কিছুই না। কিন্তু তাদের কাছে এই মুহূর্ত এত টাকা নেই।
সবাইকে নিশ্চুপ দেখে যুবক রহস্যময় চোখে তাকিয়ে বলে,,
” কেউ নেই এমন? যে একশত টাকার উপরে যাবে। সময় পাঁচ মিনিট দিলাম। এই পাঁচ মিনিটে আমাকে জানান দাও। পাঁচ মিনিট পর নিলাম কেন্দ্রে একশত কোটি টাকার নগদ ক্যাশ রেখে এই মেয়েটাকে আমি কিনে নিয়ে যাব।
সবাই নিশ্চুপ হয়ে থাকে। সেকেন্ড যায়, এক মিনিট, দুই মিনিট, একসময় পাঁচ মিনিট ও চলে যায়। কিন্তু কারোর কোনো আওয়াজ আসছে না। শুধু বাতাসে ভেসে আসছে সবার রাগ আর গম্ভীর নিশ্বাস।
যুবকটি পা মেঝেতে রেখে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়। এরপর নগদ একশত কোটি টাকা দিয়ে মেয়েটাকে লিখিত ভাবে ক্রয় করে নেয়। নিলাম খাতায় সাইন করে গম্ভীর আওয়াজে বলেন,
” আমি নিক জেভরান এখানে উপস্থিত আঠারো জন গ্যাংস্টারকে সাক্ষী রেখে , মি, কায়াতের চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলা করে মোট একশত কোটি টাকার বিনিময়ে মেয়েটাকে নিজের রক্ষিতা হিসেবে কিনে নিলাম।
ভয়ংকর আর ঝাঁঝালো সেই কন্ঠস্বর। সবাই শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। হিংসা, ক্রোধে ফেটে পড়ছে। এখানে সব গ্যাংস্টারের থেকে ক্ষমতাবান এই যুবকটি। কে জানত সেও এক মেয়েকে ক্রয় করবে। কখনো কোনো মেয়েলী কাজে জড়াতে দেখা যায় নি তাকে। অন্যান্য গ্যাংস্টাররা অবাক হয়েছে বটে। এক একজনের মনে প্রতি হিংসার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। তাদের সামনে এই সুন্দরী রমনীকে নিয়ে চলে যাচ্ছে ” জেভরান নিক “। সবাই নিজেকে সংযত করছে। সুযোগ বুঝে একদিন ঠিক ছিনিয়ে আনবে।
নিক লিখিত দলিল নিয়ে প্যান্টের পকেটে ডুকিয়ে নেয়। এরপর গম্ভীর হয়ে সবাইকে ইশারা করে মেয়েটার কাছ থেকে সরে যেতে। নিক এখনও মেয়েটির মুখ দেখে নি। এক অযাচিত জেদের কারনে তাকে এতগুলো টাকা দিয়ে মেয়েটাকে ক্রয় করতে হয়েছে। তার জানা নেই এখান থেকে বের হওয়ার পর সে মেয়েটাকে কোথায় রাখবে? সে ধীর পায়ে এগিয়ে যায় কালো কাপড়ে আবৃত পাঁচ ফুট এক ইঞ্চি সাইজের মেয়েটার দিকে। তার দৃষ্টি এখনও ভালোভাবে সেদিকে ফেলে নি। অন্য দিকে তাকিয়ে গম্ভীর হয়ে মেয়েটির হাতে স্পর্শ করতেই কপালের ভাঁজ প্রখর হয়ে উঠে। হাত অসম্ভব ঠান্ডা আর শক্ত। নিক তীক্ষ্ম দৃষ্টি ঘুরিয়ে মেয়েটির দিকে তাকায়। মেয়েটি একদম স্ট্যাচু হয়ে বসে আছে।। নিক সেদিকে তোয়াক্কা না করে হাত শক্ত করে চেপে ধরে দাঁড়া করায়। সাথে সাথে মেয়েটা জ্ঞান হারিয়ে এক পাশে হেলে পড়ে। রাগ, আর বিরক্তি নিয়ে নিক হুংকার ছেড়ে বলে,,
” অধিরাজ মেয়েটাকে কোলে নিয়ে গাড়িতে বসা।
নিকের হুংকার পেতেই অধিরাজ এগিয়ে আসে। জন্মগতভাবে আফ্রিকার নাগরিক সে। কুচকুচে কালো, লম্বা সুঠামদেহী এক ব্যক্তিত্ববান পুরুষ। পালোয়ানের মত শরীরটা নিয়ে নিকের সম্মুখে আসে,
” বস আমি?
নিক রক্তচোখে তাকিয়ে বলে,,
” অধিরাজ কি আমার নাম? নোংরা জিনিস শরীরে লাগাতে চাই না।
অধিরাজ থতমত খেয়ে মেয়েটাকে নিকের কাছ থেকে নিয়ে শূন্যে তুলে নেয়।
নিক চোখে রোদ চশমা লাগিয়ে বাঁকা হেসে সবার দিকে এক নজর তাকায়। এরপর হাস্যরস কন্ঠে বলে,
” কি মি, কায়াত, হেরে গেলেন আবার ও ! বলেছিলাম এইসব চ্যালেঞ্জ করে আমার মাথায় জেদ ডুকাবেন না। এখন কি করব এই মেয়েটাকে বলোন তো? ইচ্ছে হলে কাজের লোক অথবা রক্ষিতা বানিয়ে রাখব।
কায়াত দাঁত পিষে উঠে,
” মি, জেভরান মেয়েটা কাজের লোক হওয়ার যোগ্য নয়। সে রানী হওয়ার যোগ্য। খবরদার কাজের লোক বানালে আপনকে ধ্বংস করে দিব।
নিক হেসে উঠে উচ্চস্বরে,
” ক্ষমতা আর শক্তি দিয়ে আগে আমার সমান হন তারপর না হয় আমার ধ্বংসের কথা উচ্চারন করবেন। কিন্তু বর্তমানে মেয়েটা আমার কেনা গোলাম। তাই আমার যা ইচ্ছে তাই করব।
কায়াত — তাহলে প্রমান হলো তো, সুন্দরী মেয়ে দেখে তোমার ও মাথা ঠিক থাকলো না। সেই কিনে নিলে সয্যাসঙ্গী বানানোর জন্য।
নিক — নিক জেভরানের সয্যাসঙ্গীর প্রয়োজন হয় না মি, কায়াত। কারন সেই মেয়ে এক রাত ও টিকতে পারবে না। এখন তাহলে আসি। তোমাদের হিংসা আর ক্রোধটাকে পায়ের নিচে চাপা দিয়ে গেলাম।
নিক হেসে চলে যায়। প্রতিটি গ্যাংস্টার নিকের দিকে তাকিয়ে আছে। মি, কায়াত পারছে না নিককে জ্যাঁন্ত কবর দিয়ে আসতে।
নিক গাড়িতে গিয়ে বসে। চোখ – মুখে কোনো ভাবভঙ্গি নেই। মনে হয় কিছুক্ষন আগে নিলাম কেন্দ্রে কিছুই ঘটে নি। নিককে দেখে অধিরাজ বলে,
” বস মেয়েটাকে কোথায় রাখব?
নিক বিরক্তি নিয়ে বলে,
” রেখে দে কোনো এক জায়গায়।
অধিরাজ অবাক হয়ে প্রচুর। এত টাকা দিয়ে তাহলে কিনেছে কেনো? সে নিককে চিনে , কোনো মেয়ে তার পাশে পর্যন্ত যেতে পারে না। শুধু একজন মেয়ে ছাড়া!অধিরাজ বড্ড অবাক হয়, যে কোনো মেয়েকে সহ্য করতে পারে না সে ওই মেয়েটাকে নিয়ে খুব পজেসিভ। মেয়েটা তাকে খাইয়ে পর্যন্ত দেয় অথচ নিক কিছু বলে না। অধিরাজ নিশ্চুপভাবে নিশ্বাস ছাড়ে। নিক সিগারেট ধরিয়ে ঠোঁটের ভাঁজে নিয়ে টান দিয়ে ধোঁয়া উড়াতেই মেয়েটি কেঁশে উঠে। কাঁশির শব্দ পেয়ে অধিরাজ চিন্তিত হয়ে বলে,
“বস হয়ত মেয়েটা সিগারেটের ধোঁয়া সহ্য করতে পারে না।
নিক রাগী চোখে অধিরাজের দিকে তাকায়। নিকের চোখ দেখে অধিরাজ চুপসে যায়। মেয়েটির স্পষ্ট শব্দ কানে ভেসে উঠে,,
” প.. পা.. নি , পা.. পানি!
অধিরাজ শব্দটা বুঝতে পেরে চট করে পিছন ফিরে তাকায়। এরপর অসহায় হয়ে নিকের দিকে তাকাতেই নিক ইশারা করে ব্যাক সিটে যাওয়ার জন্য।
— বস তাহলে ড্রাইভিং করবে কে?
— আমি করছি তুই পিছনে যা। বিরক্ত লাগছে আমার এইসব।
অধিরাজ অনুমতি পেয়ে মেয়েটির কাছে চলে যায়। এরপর ব্যাক সিটে বসে পানির বোতল এগিয়ে দেয়।
— আপনি মুখের কাপড়টা খুলে ফেলতে পারেন। কিছু বলবে না কেউ।
মেয়েটি অধিরাজের কথামত মুখের উপর থেকে কালো কাপড় – খানা সরিয়ে ফেলে। এরপর বোতলের সবটুকু পানি এক নিশ্বাসে শেষ করে ফেলে। যেন কত বছরের তৃষ্ণার্ত। অধিরাজ মেয়েটির দিকে তাকিয়ে স্তব্দ। থমকে যায় সে কিছু মুহূর্তের জন্য। চোখের পাতা নড়ছে না এক সেকেন্ডের জন্য ও। যেন চোখের সামান্য পাতা নড়লেই অনেক কিছু দেখা সে হারিয়ে ফেলবে। এত স্নিগ্ধ, এত কোমল, এত মায়াবী, এত আবেদনমায়ী কোনো মেয়ে হয়! এই নীল চোখ হাজারটা পুরুষকে ঘায়েল করার ক্ষমতা রাখে। অধিরাজ অন্য এক জগতে হারিয়ে যেতে চাইছে। জোর করে নিজেকে সামলে মেয়। কারন এইটা তার বসের সম্পদ। তার এসিস্টেন্ট হয়ে তাকানোটা উচিত নয়। অধিরাজ নিচের দিকে তাকিয়ে বড় বড় নিশ্বাস টানে। আর কিছুক্ষন তাকালে সে সৌন্দের্যে মোহিত হয়ে পাগল হয়ে যাবে। এত সুন্দরী মেয়ে বিগত পনেরো দিন ধরে পাচার কেন্দ্রে ছিলো! ওর তো রাজ প্রাসাদে থাকার কথা। ভাগ্য আজ কোথায় নিয়ে আসলো। আমি মেয়েটাকে কিছু জিজ্ঞাসা করতে চাই। আমার কথা বলাটা কি ঠিক হবে? অধিরাজ সব ভয়কে এক পাশে রেখে কাঁপা আওয়াজে বলে,
” কে তুমি? তোমার বাড়ি কোথায়? কোথা থেকে এসেছো?
মেয়েটি নিজের দুর্বলতা কাটিয়ে জ্ঞানে আসে। মনে পড়ে ধীরে ধীরে সব ঘটনা। ভয়ে সিটিয়ে যায়। পাশে কোনো পুরুষকে দেখে কাঁপতে থাকে। অধিরাজ মেয়েটিকে কাঁপতে দেখে বলে,
” আমাকে ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। তুমি বর্তমানে বিপদ মুক্ত। আগে বলো কে তুমি?
মেয়েটি কাঁপা গলায় বলে,
” আনাস্তাসিয়া এনি !
অধিরাজ মোহিত হয়ে পড়ে এত সুন্দর কন্ঠস্বর শুনে। সামনে বসে ড্রাইভিং কর ব্যক্তিটা সামান্য ভ্রুঁ নাচায়।
— বাড়ি কোথায় তোমার?
মেয়েটি কিছু বলে না আর। শুধু ভয়ে কাঁপতে থাকে। ঘাম ঝরছে তার কপাল থেকে। মেয়েটিকে এইভাবে ভয় পেতে দেখে অধিরাজ আর কিছু জিজ্ঞাসা করে না। ভয়ে মেয়েটার দিকে আর তাকায় না। মেয়েটার চোখে চোখ রাখার ক্ষমতা তার নেই।
বাগানের চারপাশে হেসে খেলে বেড়াচ্ছে আঠারো বছরের এক রমনী। এক প্রজাপতির পিছনে ছুটছে প্রান – পনে। কোমর পর্যন্ত চুলগুলো বাতাসের সাথে নেচে বেড়াচ্ছে। পড়নে হাটুর নিচ অব্দি একটা বেবি পিংক কালারের জামা। সে প্রান – পন চেষ্টা করছে প্রজাপতিটা ছোঁয়ার জন্য। কিন্তু কিছুতেই পারছে না। হঠাৎ কারোর ডাকে সে দাঁড়িয়ে যায়,
” মেহের কোথায় তুমি ? তোমাকে খাওয়ার জন্য দাদুভাই ডাকছে।
মেহের কিছুক্ষনের জন্য পিছনে ফিরেছিলো। সামনে তাকাতেই দেখে প্রজাপতিটা চলে গিয়েছে। মেহের মন খারাপ করে বাগান থেকে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করে। সে গাল ফুলিয়ে গিয়ে ডিভানে বসে। তাকে গাল ফুলাতে দেখে সত্তর বছরের এক বৃদ্ধা এগিয়ে এসে বলে,
” আমার দাদুভাইয়ের কি হয়েছে? সে এইভাবে গাল ফুলিয়ে রেখেছে কেনো?
মেহের মন খারাপ করে বলে,
” প্রজাপতিটাকে হারিয়ে ফেললাম। কত কষ্ট করেছি সামান্য ছুঁয়ে দেখার জন্য কিন্তু কাছেই যেতে পারি নি।
বৃদ্ধ লোকটি — পাখিরা উন্মুক্ত আকশে উড়ে বেড়াতে ভালোবাসে দাদুভাই। তাদের ধরতে পারো নি বলে মন খারাপ করে থাকাটা বোকামি। এখন খাবে চলো।
মেহের — নিক ভাইয়া তো এখনও আসে নি দাদুভাই। ভাইয়া আসুক তারপর খাব।
বৃদ্ধটি নিশ্বাস ছাড়ে মেহেরের দিকে তাকিয়ে। মেয়েটা শুধু শুধু পাগলামি করে এই ছন্নছাড়া নিকের জন্য। মেহের কিছু না বলে উপরে চলে যায়।নিক আসলে সে এমনি খবর পেয়ে যাবে।
নিকের গাড়িটি গিয়ে থামে একটা বিলাশ- বহুল বাড়ির সামনে। সে গাড়ি থেকে নেমে অধিরাজকে ইশারা করে ভিতরে ডুকার জন্য। অধিরাজ গাড়ি থেকে নামার আগেই নিক ভিতরে ডুকে যায়। ভিতরে প্রবেশ করে কপাল কুচকে ফেলে। মেঝেতে তরল রক্ত ছড়িয়ে আছে। আর সেই রক্তের পাশে কেউ আয়েশ করে বসে আছে। তার হাতে একটা দারালো ছুঁরি। নিক নিশ্বাস ছেড়ে বলে,
” কি এইটা?
মেঝেতে বসে থাকা ছেলেটা গম্ভীর হয়ে বলে,
” কুকুর! আমার সবচেয়ে পছন্দের কুকুরটা।
নিক অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে,
” তর সবচেয়ে পছন্দের কুকুর ছিলো এইটা। মেরে ফেললি কেনো এইভাবে?
— রাগ কন্ট্রোল করতে পারি নি। রক্তের প্রয়োজন ছিলো তাই মেরেছি। পছন্দের বলেই তো মেরেছি। দুর্বলতা রাখতে নেই জীবনে।
নিক গম্ভীর হয়ে ডিভানে বসে বলে,
” মেয়েটাকে কিনে নিয়েছি।
ছেলেটা মেঝে থেকে উঠে। এরপর একজনকে ইশারা করে জায়গাটা পরিষ্কার করে দেওয়ার জন্য। ছেলেটা রক্তমাখা হাত বেসিনে ধুয়ে কপাল ভাঁজ করে বলে,
” মেয়ে দিয়ে কি করবি তুই?
নিক — চ্যালেঞ্জ জিতার প্রয়োজন ছিলো। এখন আপাযত এখানে থাক মেয়েটা। এরপর কোথাও রেখে আসব।
ছেলেটা ধপ করে ডিভানে বসে,
” মেয়েটাকে এক নজর দেখার দরকার। কি এমন সুন্দরী যে সবাই এইভাবে পাগল হলো?
নিক নাক ছিটকিয়ে বলে,
” চামড়া সবার ওই সুন্দর। মেয়েদের উপর মোহিত হওয়া মানে নিজে সাপের গর্তে ডুকে যাওয়া।
ছেলেটি — দেখেছিস তুই?
নিক বিরক্তি নিয়ে বলে,
” এইসব দেখার টাইম নেই আমার। আবর্জনা দেখে চোখ নষ্ট করি না।
নিক ডিভান থেকে উঠে চলে যায়। ছেলেটা গম্ভীর হাসে নিকের দিকে তাকিয়ে। নিক চলে যাওয়ার কিছুক্ষন পড়েই অধিরাজ মেয়েটাকে নিয়ে রুমে ডুকে। অধিরাজ ছেলেটার পিছন অংশ দেখে বলে,
” আরিশ স্যার মেয়েটাকে কোথায় রাখব?
আরিশ সামনে তাকিয়েই হাত দিয়ে ইশারা করে ভিতরে আসার জন্য। অধিরাজ মেয়েটাকে নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে। আরিশ হেসে অধিরাজের দিকে তাকিয়ে মেয়েটার দিকে তাকাতেই চট করে উঠে দাঁড়ায়। স্তব্দ হয়ে তাকিয়ে থাকে মায়াবী সেই নীল চোখ- গুলোতে। আরিশের পুরো সর্বাঙ্গ কেঁঁপে উঠে কিছু মুহূর্তের জন্য। আরিশ ঠোঁট ভিজিয়ে মেয়েটার থেকে চোখ সরিয়ে নেয়। এরপর বড় বড় শ্বাস টেনে আধিরাজের উদ্দেশ্যে বলে,
” অধিরাজ এই মেয়ে কে?
অধিরাজ — স্যার এই মেয়েকেই নিলামে তোলা হয়েছিলো। আর বস একশত কোটি টাকা দিয়ে মেয়েটাকে কিনে এনেছে।
আরিশ চট করে তাকায়। অধিরাজের চোখে ভয় এক প্রকার যুদ্ধ। আরিশ কাঁপা চোখে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলে,
” কি.. নাম তোমার?
মেয়েটা ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে। এরপর অধিরাজের হাত শক্ত করে চেপে ধরে সিটিয়ে যায়। অধিরাজ আবেগপ্লুত হয়ে মেয়েটার স্পর্শ করা জায়গাটার দিকে তাকায়। এরপর এনির আতঙ্কিত মুখটার দিকে তাকিয়ে বলে,
” ভয় পেয়েও না এনি। আমাকে নিজের ভাই ভাবতে পারো। উনি আরিশ স্যার। তোমাকে যে কিনে এনেছেন তার বেস্ট ফ্রেন্ড।
এনি অধিরাজের দিকে তাকায়। চোখে পানি চিকচিক করছে। কাঁপা আওয়াজে বলে,
” ভ.. ভাই!
অধিরাজ — হুম। এইবার নিজের পুরো পরিচয়টা আমাদের কাছে দাও। কে তুমি? তোমার জন্মস্থান কোথায়?
এনি নিজেকে সামলে বলে,
” আমি আনাস্তাসিয়া এনি। আমি ইরানে বড় হয়েছি কিন্তু আমার মা বাংলাদেশী।
আরিশ নিজ অজান্তেই বলে,
” তুমি সৌন্দর্যের এক নিষ্পাপ ফুল এনি। তোমার এই নীল চোখ আর চেহারার দিকে তাকালে প্রথমে নিজেকে কেউ সামলাতে পারবে না। বুকের হার্টবিট বাড়ানোর ক্ষমতা রাখো!
এনি নিজের মুখ ঢেকে ফেলে। আরিশ আলতো হাসে।
আরিশ — অধিরাজ এনিকে রুম দেখিয়ে দিয়ে আয়। ফুলের শরীরের নোংরা মানায় না।
আরিশের আদেশ পাওয়া মাত্র’ই অধিরাজ এনিকে নিয়ে উপরে চলে যায়। এরপর একটা রুমের দরজা খুলে দিয়ে বলে,
” আজ থেকে তুমি এখানে থাকবে। তোমার প্রয়োজনীয় সবকিছু কিছুক্ষনের মধ্যে চলে আসবে।
এনি অধিরাজের দিকে তাকায়,
” আপনি তো আমার ভাইয়া তাই না? আপনি আপনার বোনকে সাহায্য করবেন প্লিজ! আমি এখান থেকে চলে যেতে চাই। আপনার বসের ভয়ে তখন কিছু বলি নি।আমি আমার গন্তব্যে যেতে চাই। নিজেকে আর শক্ত করে রাখতে পারছি না। খুব কষ্ট হচ্ছে ভাইয়া। আমার শরীরে কলঙ্ক লেগে গেলো। বিগত অনেক দিন পাচার কেন্দ্রে ছিলাম, কত পুরুষের লালসার স্বীকার হয়েছি। আল্লাহ সহায় ছিলো বলে কেউ স্পর্শ করতে পারে নি। ভাই হিসেবে বোনকে একটু সাহায্য করুন। আমাকে ইরান ফিরে যেতে দিবেন প্লিজ?
অধিরাজ এনির কান্না – মিশ্রিত চোখের পানির দিকে তাকিয়ে বলে,
” তোমার সুন্দর চোখে জলকনা মানায় না। এমন আবদার করেছো যা পুরন করা আমার জন্য অসম্ভব। তোমাকে নিক স্যার একশত টাকার বিনিময়ে ক্রয় করেছেন। উনি যদি অনুমতি দেন তাহলে আমি নিজ হাতে তোমাকে তোমার ঠিকানায় পৌঁছে দিব।
এনি ভয়ে কঁপা গলায় বলে,
” আমি কি আপনার বসের রক্ষিতা ভাইয়া? উনি কি আমার সাথে খারাপ কিছু করবেন?
অধিরাজ হেসে বলে,
” উনি তোমাকে কিনেছে তার একটাই কারন , কাউকে ক্ষমতায় হারানো। হেরে যাওয়া আমার স্যারের পছন্দ না। খারাপ কিছু তো তখন করবে যখন সে তোমাকে কাছে ঘেষতে দিবে। উনি নারীদের সহ্য করতে পারে না। তাই স্যার যখন এখানে আসবে তুমি ভুলেও সামনে বা কাছে যেও না।
এনি গম্ভীর শ্বাস ফেলে। অধিরাজ কপাল কুচকে বলে,
” রক্ষিতা মানে কি সেটার ধারনা আছে তোমার এনি?
এনি দুই পাশে মাথা নাড়ায়,,
” না ”
অধিরাজ গম্ভীর শ্বাস ফেলে। তার প্রফেশনে মায়া জিনিসটা যায় না। উপরওয়ালা দিক তোমাকে যাতে বসের রক্ষিতা হতে না হয়। বস তোমাকে ভুলে যাক এনি। তোমার মত এমন স্নিগ্ধ পরী রক্ষিতা হিসেবে মানায় না। আমার বস প্রচন্ড হিংস্র। স্যারের রক্ষিতা হলে তুমি একদিন ও টিকতে পারবে না!
” মানুষ কতটা নিকৃষ্ট হলে নিজ স্বার্থে একটা মেয়েকে নিলামে তুলে ভাইয়া। আর সেখান থেকে মেয়েটাকে কেউ কিনে আনে। যখন আপনার বস আমাকে সহ্য করতে পারবে না তখন এখানে রেখে কি করবে? এর চেয়ে ভালো আমি আমার ঠিকানায় ফিরে যাব।
অধিরাজ নিশ্বাস ছেড়ে বলে,
” বস হয়ত মেয়েদেরকে সহ্য করতে পারে না। কিন্তু তুমি বর্তমানে স্যারের রক্ষিতা। স্যার যদি চায় তাহলে অনেক কিছুই করতে পারবে। তবে আজ রাতে যদি তুমি কোনো বর্বরতার স্বীকার না হও তাহলে তুমি স্বাধীন। তোমাকে বাঁচানোর ক্ষমতা আমার নেই।
অধিরাজ এনিকে কিছু বলতে না দিয়ে দরজার কাছ থেকে চলে যায়। এনি ভিতরে ডুকে বিছানায় ধপ করে বসে পড়ে। পুরো শরীর নিস্তেজ হয়ে আছে। ভয়, আতঙ্ক, ঘৃনা হাহাকার সব মিলিয়ে অস্থির হয়ে উঠে। এত বড় নিষ্ঠুরতার সাথে সে জড়িয়ে গেলো। চোখে ভাসছে পাচার কেন্দ্রের সেই মর্মান্তিক ঘটনাগুলো। কেউ মেয়েগুলোকে টর্চার করছে, কেউ শারীরিকভাবে মেরে ফেলছে! প্রতিনিয়ত লড়াই করেছে নিজের ইজ্জত নিয়ে। মনে হয়েছিলো কোনো এক অদৃশ্য শক্তি তাকে রক্ষা করেছে। নাহলে সে কেনো একবার ও টর্চারের শিকার হলো না। মূলত সব – কিছুর সুবিধা সে পেয়েছে! যেদিন তাকে পাচার কেন্দ্রে আনা হয় পরের দিন এক কালো কোর্ট পরিহিতা ব্যক্তির গম্ভীর আওয়াজ শুধু শুনেছে,
” রুম – ২২ – এ রাখা মেয়েটার গায়ে যাতে সামান্য ফুলের আচর ও না লাগে। সামান্য স্পট পেলে সবাইকে জ্যাঁন্ত মাটিতে পুতে ফেলব।
সেই ভয়ংকর ঝাঁঝালো আওয়াজে শুধু এনি নয়, যেন কেঁপে উঠেছিলো পুরো কেন্দ্র।
অধিরাজ নিচে নামলে আরিশ অবাক হয়ে বলে,
” নিক মেয়েটার কোনো পরিচয় না নিয়েই এত টাকা দিয়ে কিনে ফেললো! মাথায় আসছে না কি হচ্ছে এইসব।
অধিরাজ — মি, কায়াত স্যারকে চ্যালেঞ্জ করেছে এক সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে করে স্যারকে দেখিয়ে দিবে। ক্ষমতা নয় রুপ দিয়ে হারাবে। স্যার মি, কায়াতের কথায় প্রথমে পাত্তা দেয় নি। কিন্তু শালা বার বার ফোন দিয়ে একই কথা বলছিলো। তাই সকালেই জেদের বসে নিলাম কেন্দ্র থেকে মি, কায়াতের মুখে উস্টা দিয়ে মেয়েটাকে কিনে আনা হয়।
আরিশ — কিছু মুহূর্তের জন্য মেয়েটা আমাকে পাগল করে দিয়েছিলো আরিশ। এত স্নিগ্ধ, কোমল মেয়ে এর আগে কখনো দেখিনি।
অধিরাজ — মেয়েটার সৌন্দর্য হয় মেয়েটাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে নাহয় আগুনে নিয়ে এসেছে। মেয়েটা পাচার হতে যাচ্ছিলো।।আর কোনোভাবে মি, কায়াত ওকে দেখে ফেলে। মি, কায়াতের সাথে আরও সাত জন ছিলো। সবাই মেয়েটাকে রক্ষিতা বানানোর জন্য যুদ্ধ শুরু করে। পরে এক প্রকার নিলামে তুলা হয়। মি, কায়াত বসকে ফোন করে বলেছে, ” এক সুন্দরী মেয়েকে সে কিনে নিচ্ছে। স্যারের নাকি নিজস্ব সমস্যা আছে তাই কোনো মেয়েকে ঘেষতে দেয় না। পারলে মেয়েটাকে কিনে দেখাতে। মি, কায়াত জানত স্যার এইসবে মেয়েলি বিষয়ে পাত্তা দিবে না। কিন্তু স্যার অবাক করে দিয়ে দিগুন দামে এনিকে কিনে আনে।
আরিশ — তার মানে নিক এনিকে দেখে নি?
অধিরাজ — প্রয়োজনবোধ করে নি। বিরক্ত বোধ করছিলো আরও। এখন আমি আসি স্যার।
আরিশ সম্মতি জানিয়ে কিছুক্ষন গম্ভীর হয়ে বসে থাকে। এরপর উপরে চলে যায় নিকের কাছে। নিক গায়ে কোর্ট জড়াচ্ছিলো। আরিশ রুমে ডুকে প্রশ্ন করে,
” তুই মেয়েটাকে দেখিস নি নিক?
নিক — নো।
আরিশ — তাহলে মেয়েটাকে আমায় দিয়ে দে।
নিকের ভ্রুঁ নাচিয়ে বলে,
” সে আমার রক্ষিতা।
আরিশ হেসে উঠে,
” ভাই তর আবার রক্ষিতা! আগেরবারের মেয়েটার মত গলা টিপে মেরে ফেলিস না!
আরিশ হাসছে শুধু। নিক আরিশকে অন্য কিছুর ইশারা দিয়ে রহস্যময় হাসি দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। আরিশ ইশারা পেয়ে নিকের পিছু পিছু চলে যায়।
