লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ২০
লিজা মনি
রাতের নিস্তব্ধতা তখন এমন ঘন যে বাতাসের ভেতরও যেন মৃত ছায়ার ভার। আকাশ আচ্ছন্ন শ্যামল কালোয় অদৃশ্য মেঘের গহ্বরে চাঁদ নির্বাসিত। তার আলো শ্বাসরুদ্ধ হয়ে নিস্তেজ। চারদিকের গাছপালার কঙ্কালসদৃশ ছায়া লম্বা নখের মতো মাটিতে প্রসারিত।ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে আর্তনাদ সেই নীরবতাকে আরও ভয়ার্ত করে তুলছে।
এমন মৃত্যু নিভৃত অন্ধকার ছিন্ন করে হঠাৎই গর্জে ওঠে ইঞ্জিনের শব্দ। শা শা ছেদনধ্বনিতে বুকে ঝাঁপিয়ে আসে এক কালো গাড়ি।যেন রাতের দেহে বজ্রাঘাত। শুষ্ক মাটির উপর চাকার ঘর্ষণে উড়ে যায় ধুলো–কুণ্ডলী ঘূর্ণি পাকিয়ে ছড়িয়ে পড়ে বিষাক্ত ধোঁয়ার মতো। হেডলাইটের ক্ষুরধার আলোকরেখা অন্ধকার বিদীর্ণ করে বাগানবাড়ির শ্যামল ছায়ার উপর নিক্ষেপ করে ভৌতিক আভা। গাছের শাখাগুলো মুহূর্তেই যেন দানবীয় বাহু হয়ে ওঠে।
অবশেষে ঝড়ো গতির সেই যান্ত্রিক জানোয়ার দাঁত কিঁচিয়ে থেমে যায় আরিশের বাগানবাড়ির দ্বারে। আকস্মিক থামার অভিঘাতে মাটি কেঁপে ওঠে। টায়ারের গরম রাবারের গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে দমবন্ধ করা ধোঁয়ার মতো। আর মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধতা আরও শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ওঠে। হঠাৎ এইভাবে গাড়ি থেমে যাওয়াতে নাজলী ভয় পেয়ে যায়। চারদিকে – বিশাল গাছপালা দেখতে পেয়ে ভড়কে যায়। এতসময়ে জমিয়ে রাখা সাহসটা যেন কর্পূরের মত উধাও হয়ে যাচ্ছে। এতক্ষন তো নিজেকে শক্ত করেছে। কিন্তু এখন আরিশকে ভীষন ভয় করছে। ওরা গ্যাংস্টার! হৃদয়ে কোনো দয়া- মায়া থাকে না। তাদের কাছে ভালো কিছু আশা করাটা বোকামি। উনি যদি আমাকে খুন করে গাছের সাথে ঝুঁলিয়েও রাখে কেউ খুঁজে পাবে না। বড় বড় কোকদের মেরে ঘুম করে ফেলে কেউ কোনো প্রমান পায় না। আর সেখানে আমি তো চিনেপুটি মাত্র। লোকটা খারাপ কিছু না করলেও হয়। সাহসের দাপট দেখিয়ে চলে এসেছি কিন্তু এখন আমি নিজেই গ্যাস ছাড়া বেলুন। আরিশ গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করে।। নাজলীকে আসতে না দেখে ঘাড় পিছনে নিয়ে বলে ”
” বাহিরে থাকার ইচ্ছে হলে থাকতে পারো। আমি গ্লাস লাগিয়ে দিচ্ছি। এরপর চাইলেও ভেতরে ডুকতে পারবে না।
আরিশের গম্ভীর কণ্ঠ কানের ভেতর প্রবেশ করতেই, নাজলীর শৈশবের মতো বিভ্রান্ত মনে ঘুম ভেঙে আসে। চারপাশে থেকে মনে হচ্ছে ভুতুরে নিস্তব্ধতার প্রতিধ্বনি স্পন্দিত হচ্ছে। প্রায় প্রতিটি ছায়া যেন তার শ্বাসকষ্টের সাথে একাত্ম হয়ে নড়াচড়া করছে। হঠাৎ, শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধহীনতা হারিয়ে নাজলী দ্রুততর পায়ে আরিশের দিকে এগিয়ে আসে।
লিভিং রুমে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই, আরিশের হাতে থাকা রিমোটটি কাঁপতে থাকা হাতে পায়ে হেলিয়ে কাউচের পিঠ নামিয়ে দেয়। নাজলী ভয়ে সামান্য সটকে যায়।চোখে অচেতন শঙ্কার রং জ্বলজ্বল করে। আরিশ, বাঁকা হাসি মুখে আঁকড়ে ধরে। ডিভানে জড়িয়ে বসে শান্ত ভঙ্গিমায়।
সামনের মিনি টেবিলের উপর পা চেপে বসে। আরিশের চোখ নাজলীর দিকে বাজপাখির মতো ধারালো। অনিবার্য তীক্ষ্ণতা নিয়ে ধাবিত হয়। নাজলী ভয়ে শিউরে ওঠে কিছুটা। ঠাণ্ডা ঘামের মতো অনুভূতিগুলো শরীরের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে পড়ে।
আরিশের গলা গ্রিবাদেশে কেঁপে ওঠে শব্দের প্রতিটি ছন্দ যেন রাগের আগুনে গলিত করে বলে,
“অনেক চালাক নারী তুমি, নাজলী। আই লাইক ইট!”
নাজলী দ্রুত চোখ ঘোরায় নাবিদের দিকে, মুখে অনিশ্চয়তার অস্থিরতা, সামান্য ঠোঁট ভিজিয়ে বলে,
“ম… মানে?”
আরিশ কাঁধ নাড়িয়ে সামান্য হাসে। এরপর মৃদু তির্যক হাসির আড়ালে রাগের লুকানো জ্বলন্ত উত্তেজনা নিয়ে বলে,
“মানে… কিছুই নয়।”
নাজলী চোখ উপরের দিকে ভেসে ওঠে। অধৈর্য এবং অন্তঃসত্তার শঙ্কায় বলে,
“আমার বোন কোথায়? কখন দেখা করতে পারব ওর সাথে?”
আরিশের চোখ ছোট ছোট হয়ে অগ্নিবিদ্ধ ধূসর কণার মতো ঝলমল করে উঠে।রাগের পিচ্ছিল ছায়া তার দৃষ্টি ঢাকা দিয়ে বলে,
“তোমার বোন তার স্বামীর বাড়িতে।”
নাজলী চমকে উঠে, কণ্ঠে দমবন্ধ করা বিস্ময় ও আতঙ্কের মিশ্রণ,
“ম… মানে?
“মানে এনি নিকের মেনশনে… আর এই স্থানটি আমাদের বাগান বাড়ি।”
নাজলীর চোখ অগ্নি স্পর্শক রাগে ভরে ওঠে, প্রতিটি নাড়ি যেন ক্রোধের আগুনে ছিঁড়ে যাচ্ছে। শরীর ভেতর থেকে কেঁপে ওঠে। কণ্ঠে জমে থাকা প্রতিরোধের আগুন নিয়ে বলে,
“তাহলে আমাকে মেনশনে না নিয়ে এখানে এনেছেন কেনো?”
আরিশ শান্ত ভঙ্গিমায় কর্কশ গলায় বলে,
” তোমার রক্ত দিয়ে গোসল করব বলে।
কর্কশ, হিম্মাহীন ভয়ানক কণ্ঠে ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়। শব্দের প্রতিটি নড়াচড়া কণ্ঠের সঙ্গে মিলেমিশে ঘরের বাতাস কেটে যাচ্ছে। নাজলী শিউরে উঠে।চোখে বাজপাখির মতো দৃষ্টি খাঁ খাঁ করছে। গলায় শুকনো আগুনের মতো অচেতন উত্তেজনা। তবু, স্বাভাবিক আত্মসংযম বজায় রাখে। কণ্ঠে স্থিরতা মেলাতে বলে,
“গোসল করার ইচ্ছে হলে, ফ্রেশ পানি দিয়ে করুন। আমি রক্ত দেব না আপনাকে।”
আরিশের অধরে ভেসে আসে সূক্ষ্ম, তির্যক হাসির ছায়া।রাগের ভেতর লুকানো জ্বলন্ত ব্যর্থতার আভা নিয়ে বলে,
“ছিনিয়ে নেওয়া আমাদের কাজের ধর্ম। তোমার থেকে চেয়েছে কে?”
নাজলী সামান্য শব্দে তবু তীক্ষ্ণ কল্পনার আঘাতে কণ্ঠ ভেঙে চট করে হেসে বলে,
“আগে জানতাম, গরীবরা পেটের দায়ে ছেঁচরামি করে। এখন দেখি, ট্রিলিয়ন ডলারের মালিকরাও ছেঁচড়ামি করে। একটি মেয়ে রক্ত দিতে চায় না, অথচ তার থেকে রক্ত ছিনিয়ে নিতে চাচ্ছেন।”
শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যেন উত্তেজনা, রাগ, এবং ভয়ের এক অনন্য সংগমে দুলছে। নাজলীর মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ আর আরিশের হিংস্র আধিপত্য মিলেমিশে বাগান বাড়ির নীরব বাতাসে ভয়ঙ্কর এক ধ্বনি রচনা করছে।
আরিশের চোয়াল অনিবার্য তীব্রতা নিয়ে শক্ত হয়ে আসে। গলার স্বর ভেঙে ওঠে আগুনের মতো,
“সেট আপ! স্টুপিড, ব্রেইনল্যাস একটা।”
নাজলী নাক ছিটকে অস্থির শ্বাসে প্রতিরোধী কণ্ঠে বলে,
“আপনার ধমক শুনব বলে কন্ট্রাক্ট ম্যারেজ করি নি। খুব জলদি আমাকে আমার বোনের কাছে নিয়ে চলুন।”
আরিশ ঠোঁট কামড়ে তাকায়। চোখের কোণে অগ্নি ঝলমল করছে। গম্ভীরতায় ভরা সুরে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়,
“– কখন যাবে?”
নাজলী, লাজুক হাসি লুকিয়ে, দৃঢ় মনোভাব নিয়ে বলে,
“চলুন, এখন যাই।”
আরিশের ঠোঁটের কোমল কামড়ের আড়ালে লুকানো হিংস্র গম্ভীরতা স্পন্দিত হচ্ছে। কণ্ঠে শব্দ করে বলে,
“শেষবারের মতো কালিমা পড়ে নাও।”
নাজলীর ভ্রুঁ উঁচু করে, অবিশ্বাসের রেখা মুখে স্পষ্ট হয়ে প্রশ্ন করে,
“কালিমা কেনো পড়তে যাব আমি?”
আরিশ শান্ত তবে শাসকসুলভ গলায় অবধারিত সত্য নিয়ে বলে,
“– মুসলিম রাইট?”
“– হ্যা।”
“– মুসলমানদের মৃত্যুর আগে কালিমা পড়া আবশ্যক। তোমার ইচ্ছা হলে পড়তে পারো।”
আরিশের শান্ত দৃষ্টি। ভয়ঙ্কর কণ্ঠের প্রতিটি শব্দ নাজলীর হৃদয়ের অগ্নিসংযোগ ঘটাচ্ছে। শ্বাসরোধকারী অবাক বিস্ময় নিয়ে তাকাচ্ছে বার বার। চোখের ধূলিস্রোত মতো স্থির করে রেখেছে। আর চাহনির তীক্ষ্ণতায় শীতল আগুনের মতো অগ্নিস্ফুরণ। কি সাঙ্ঘাতিক মানুষ এরা!
বুকে সাহস সঞ্চয় করে। নাজলী বাঁকা হাসি দিয়ে শব্দ করে বলে,
“– মেরে ফেলার জন্য তাহলে এখানে এনেছেন। নিজের বিয়ে করা বউকে মারতে হাত কাঁপবে না?”
আরিশের গলা কেবলমাত্র শব্দ নয় তা যেন আঘাতপ্রবণ আগুনের মতো ভেসে আসে,
“– বউ!”
“– ইয়েস। আমি আপনার ওয়াইফ। হোক সেটা কন্ট্রাক্ট ম্যারেজ, বাট এক বছরের জন্য আইনত স্ত্রী আমি।”
আরিশ গম্ভীর হয়ে দাঁতে দাঁত ঘর্ষন করে উঠে।প্রতিটি শব্দে রাগের আঁচ জ্বলজ্বল করে বলে,
“মিস নাজলী…”
আর বলতে পারে নি। কথাটাকে ছিনিয়ে নিয়ে নাজলী দৃঢ়তা দিয়ে কণ্ঠে সংযম রেখে বলে,
“– মিস নয়, মিসেস হবে। বিবাহিত নারীদের কেউ মিস বলে না।”
আরিশ শিকারীর মতো চোখ সরিয়ে তাকিয়ে থাকে। নাজলীর দৃষ্টি যেন ধরার জন্য প্রস্তুত। ডিভান থেকে হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়। আচমকা নাজলীর দিকে ঝুঁকে পড়ে। এত কাছাকাছি আরিশকে দেখে, নাজলীর গলা শুকিয়ে আসে। আরিশ ঠোঁট কামড়ে, নাজলীর উন্মুক্ত গলায় আঙ্গুলটি ধীরে ধীরে স্লাইড করতে করতে বলে,
“আরিশের বউ হলে বিছানার পারফরম্যান্স ঠিক থাকতে হবে, বেইবি। নচেৎ, দ্বিতীয়বার নিজেকে আমার বউ সম্মোধন করলে মাটির নিচে পুঁতে দিয়ে আসব।”
নাজলী চোখ বন্ধ করে ঘনঘন নিশ্বাস টানছে। প্রথম বার কোনো পুরুষের স্পর্শ যেন বিদ্যুতের মত শক দিয়ে যাচ্ছে শরীরে। ভয়ে মুখ খিঁচে রেখেছে মেয়েটা। আরিশের স্পর্শ আরও গভীর হতে থাকে।হাতের অবাধ্য বিচরণ ধীরে ধীরে নিচে নামতে থাকে। আরিশ তার ভয়ঙ্কর দৃষ্টিতে নাজলীর মুখ ঘিরে রাখে। নাজলী ঘন ঘন শ্বাস ফেলে।
হঠাৎ, আরিশের হাত শক্ত করে চেপে ধরে কণ্ঠে শান্তি ও প্রভুতার ছাপ দিয়ে বলে,
“স্টপ! আর বলব না। থেমে যান এখানেই।”
আরিশ বাঁকা হাসি দিয়ে পুনরায় ডিভানে বসে পড়ে। নাজলীর ঠোঁট এখনও কাঁপছে আতঙ্কে। বড় বড় শ্বাস টেনে কণ্ঠে অব্যক্ত ক্রোধ এবং আতঙ্কের মিশ্রণ দিয়ে বলে,
“অভদ্র পুরুষ আপনি। আমাকে স্পর্শ করার রাইট আপনাকে দেয়নি। পরের বার আমার থেকে একশত হাত দূরে থাকবেন।”
আরিশ গম্ভীরতা টেনে ছাদের নিচে একক বীরত্বের অধিকারী বলে প্রতিধ্বনি ফেলে,
“নিজের মর্জি অনুযায়ী চলি। পুরুষ মানুষ আমি। একই ছাদের নিচে একটি মেয়ে দেখে কন্ট্রোল করা মুশকিল হয়ে যেতে পারে। কিছু একটা হয়ে যাবে, এটা শিউর।”
নাজলী গভীর দৃষ্টি ফেলে হেসে বলে,
” ভয় দেখাচ্ছেন? ভেবেছেন ভয় পেয়ে আপনার কাছে কান্না – কাটি করব। আর আপনি বসে বসে মজা নিবেন। একবার ছুঁয়ে তো দেখুন। পরবর্তী অবস্থার জন্য ও চিন্তা করবেন। কথায় আছে পুরুষ তুমি সবার সাথে লাগতে যাও কিন্তু নারীর সতিত্বে হাত দিতে যেও না। এতে তুমি নিজে ধ্বংস হয়ে যাবে। আমাকে অবলা নারী ভেবে থাকলে বোকামি করবেন। আমার হাতে যে অস্ত্র আছে সেখানে আপনার ক্ষমতা কিছুই নয়। আপনার যদি ক্ষমতা থাকে আমাকে কলঙ্কিত করার। তবে আপনার সেই ক্ষমতাটাকে কেটে আজীবন পঙ্গু করে দিতেও আমার দুই মিনিট টাইম লাগবে না।
আরিশ শান্ত চোখে তাকায় নাজলীর তেজী মুখটার দিকে। বাঁকা হেসে বলে,
” তাহলে চলো একটু হয়ে যাক।
নাজলী ভ্রুঁ নাচিয়ে বলে,
” কি?
— যুদ্ধের লড়াই।
নাজলী রেগে বলে,
” আপনার সাথে লড়াই করতে আসি নি আমি। অশ্লিলতামি না করে আমাকে এখনই এনির কাছে নিয়ে যাবেন। আমার – আপনার বিয়ের লক্ষ্য ভুলে যাবেন না।
আরিশ ব্লেজার ঠিক করে গ্রিবাদেশ নাড়িয়ে বলে,
” তোমার মনে প্রশ্ন জাগে না, এত সহজে কিভাবে বিয়ে করতে রাজি হয়ে গেলাম আমি। আন্ডগ্রাউন্ডের ক্রিমাল লিডার আরিশ সামান্য একটা মেয়ের সাধারন ইমোশননাল ব্লেকমেইলে গলে গেলো। কিন্তু আদ’ও কি সম্ভব।
নাজলী ঠোঁট ভিজিয়ে বলে,
” এনিকে সাহায্য করার জন্য আমাকে সাহায্য করছেন। এর থেকে বড় সত্য আর কি হতে পারে। আপনি নিজেও চান এনি যাতে সুন্দর স্বাভাবিক জীবন পার করতে পারে। তাই আমার কথাটাকে আপনি মেনে নিয়েছেন।
আরিশ অধরে হাসি ফুটিয়ে আশে-পাশে তাকায়। নাজলী চোখ ছোট ছোট করে পুনরায় বলে,
” নাকি আমাকে বিয়ে করাটাও আপনাদের কোনো রহস্য।
আরিশ শব্দ করে হেসে উঠে। কি ভয়ানক সেই হাসির শব্দ। রাতের অন্ধকারে কেমন ভুতুরে শুনা যাচ্ছে। টেবিলের উপরে রাখা একটা পা অপর পায়ের উপর রেখে বলে,
” প্রয়োজন, কারন, স্বার্থ ছাড়া আমরা এক চুল ও নড়ি না। নিজের জন্মদাত্রী মায়ের আকুতি- মিনতি ও কোনোদিন গলাতে পারে নি। আর ভাবলে কিভাবে তোমার সামান্য কথায় গলে যাব। আমি চেয়েছি বলে কন্ট্রাক্ট ম্যারেজ হয়েছে। নাহলে যখন আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছো সেখানে তোমার জায়গায় অন্য কেউ হলে সাথে সাথে গলা চেপে ধরতাম। তোমাকেও ধরতাম তার কোনো সন্দেহ ছিলো না।
— তাহলে ধরলে না কেনো?
আরিশ হেসে বলে,
” নিজেদের স্বার্থ, কারন আছে। মেরে ফেলে দিলে কিভাবে হবে বেইবি।
নাজলী শান্ত কন্ঠে বলে,
” তারমানে আমাকে এখানে নিয়ে আসা আপনাদের প্লান ছিলো। কিন্তু কেনো?
— বন্ধী করার ইচ্ছে হলো। আজ থেকে তুমি এই বদ্ধ রুমে বন্ধী হয়ে থাকবে। বাহিরের আলো- বাতাস তোমার জন্য নিষিদ্ধ হয়ে পড়েছে। কথার আবাধ্য হলে মেরে সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়ে আসব। কেউ খুজেঁও পাবে না।
— ম.. মানে কি বলতে চাইছেন?
— রিপিট করতে ইচ্ছুক নয়। আজ থেকে তুমি এই বাগানবাড়িতে বন্ধী থাকবে আমার নজরে।
নাজলী চোয়াল শক্ত করে বলে,
” আমার সাথে এমন প্রতারনা কেনো করলেন?
আরিশ ঠোঁট কামড়ে হেসে বলে,
” প্রতারনা করেই কার্য হাসিল করতে হয়।
— আমাকে বন্ধী করার সাথে কিসের কাজ?
— সময় আসলে দেখতে পাবে।
নাজলী রাগে অচেতনভাবে কেঁপে উঠে।নিজেই অবাক, কল্পনা করেনি যে নিজের তৈরি ফাঁদে একদিন এমনভাবে ফেঁশে যাবে। বুকে অস্থিরতা করে উঠে। রক্তের তীব্র স্পন্দন এবং মনস্তাত্ত্বিক উত্তেজনার মিশ্রণে সে অস্থির।
আরিশ বাঁকা হাসি মুখে ডিভান থেকে উঠে দাঁড়ায়। পিছনে ফিরে, সামনে এগোতে যেতেই নাজলীর হঠাৎ আক্রমণের সম্মুখীন হয়। টেবিলের উপর রাখা ফলকাটা ছুঁরিটা চট করে ধরা দিয়ে নাজলী এক মুহূর্তের জন্য আরিশের পিঠের মধ্যভাগে প্রবেশ করিয়ে দেয়।
হঠাৎ ছুঁরির আঘাতের জন্য আরিশ নিজেও প্রস্তুত ছিল না। পুরোটা শারীরিক আঘাত না হলেও রক্তে তার সাদা শার্ট লালাভ হয়ে যায়। ব্যথায় নাক-মুখ কুঁচকে যায়।পা দুইটি থেমে যায়। চোয়াল শক্ত করে রাগ প্রকাশ করে আর পিছন ফিরে তাকায়।
আরিশ কোনো রকম সতর্কতা ছাড়াই নাজলীর গালে থাপ্পর বসায়। থাপ্পরের সঙ্গে যেন দুনিয়া মুহূর্তে ঘুরে যায়।প্রতিটি স্পন্দন, প্রতিটি দমবন্ধকারী নিঃশ্বাস, ঘরের বাতাসে ভেসে ওঠে। নাজলী সঞ্চালন হারিয়ে পুনরায় ডিভানের উপর ছিটকে পড়ে।
আরিশ ধীরে ধীরে কিন্তু হিংস্রতার সঙ্গে নাজলীর চুল শক্ত করে ধরে সম্মুখে মুখ নিয়ে আসে। নাজলীর গালের কাছে ঠোঁট চেপে ধরে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,
” সব জায়গায় সাহস দেখিয়ে নিজের বিপদ ডেকে আনতে যেও না। আঘাত করার আগে ভেবে নিবে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিটা কে। এখানে এসেছো তোমার সম্মতিতে। কিন্তু যাবে আমাদের ইচ্ছেতে।
এমনি এমনি বিয়ের পেপারে সাইন করে ফেলি নি। শালী বেশি তেরিং- বেরিং করলে অবস্থা খারাপ করব।
হঠাৎ ফোনের আওয়াজে আরিশ নাজলীকে ছিটকে সরিয়ে দেয়। নাজলী গালে হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে। আরিশ ফোনের দিকে এক পলক তাকিয়ে নাজলীর উদ্দেশ্যে বলে,
” একদম আওয়াজ করবে না। আমার বোন ফোন দিয়েছে। তোমার আওয়াজ যাতে শুনতে না পায়।
নাজলী কোনো প্রতি উত্তর করলো না। একই ভাবে ঠাঁই ভাবে বসে আছে পাথরের মত। আরিশ নিজেকে স্বাভাবিক করে রাগ কন্ট্রোল করে ফোন রিসিভ করে।
ফোন রিসিভ করতেই এক চঞ্চল কন্ঠ ভেসে আসে,
” কখন থেকে ফোন দিচ্ছি। রিসিভ করতে দেরী কেনো হয়েছে তোমার?
আরিশ মুখের কঠোরতা সরিয়ে স্বাভাবিক ভাবে বলে।,
” ব্যস্ত ছিলাম। এত রাতে ফোন কেনো দিয়েছিস? ঘুমাস নি এখন ও।
মেহের কিছুক্ষন চুপ থেকে অভিমানি কন্ঠে বলে,
” ভাইয়া তুমি বিয়ে করেছো অথচ আমাকে একবার জানাও নি।
আরিশের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে। জানলো কিভাবে এই মেয়ে? আরিশ কপাল কুচকে বলে,
” কে বলেছে তকে এইসব?
— নিচে দাদামশাই আর অধিরাজ ভাইয়া কথা বলছিলো। আমি দুর থেকে শুনেছি।
— তেমন কিছু নয়।
— কিন্তু বিয়ে তো করেছো
আরিশ চোখ গরম করে বলে,
” বললাম না, এমন কিছু নয়।
মেহের প্রায় কেঁদে দিবে ভাব,
” ধমকাচ্ছো কেনো ভাইয়া। দাদামশাই কখনো মিথ্যে বলে না। না জানিয়ে বিয়ে করার জন্য তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। কিন্তু কাল সকালে তোমার এখানে আসছি আমি।
আরিশ অধৈর্য হয়ে বলে,
” একদম নয়। বাহিরে বের হওয়া যাবে না কিছুতেই।
— কিন্তু ভাইয়া আমি আসতে চাই।
আরিশ ফুঁশ করে শ্বাস টেনে বলে,
” বাহিরে সব শত্রুদের চলাচল। তকে দেখলেই আ্যটাক করবে।
মেহের জেদ ধরে বলে,
” কি হয়েছে তাতে? তুমি সামলে নিবে সবাইকে। এমন কেনো করছো ভাইয়া? আমি তো এমনিতেও কখনো বাহিরে বের হয় না। কাল যেতে চাই প্লিজ।
আরিশ মেহেরর জেদের কাছে পরাজিত হয়ে বলে,
” আমি নিয়ে আসব। একা বের হবি না।
মেহের মুচকি হেসে বলে,
” অপেক্ষা করব তোমার জন্য ভাইয়া।
আরিশ ফোন কেটে দেয়। নাজলী তাচ্ছিল্য হেসে বলে,
” নিজের বোনের জন্য এত দরদ অথচ অন্যের বোনেরা পন্য।
আরিশ গম্ভীর হয়ে হেসে বলে,
” তোমরা পন্য হিসেবে আছো বলেই আমরা বিক্রি করতে পারি। নিজেদেরকে নিজেরা রক্ষা করতে শিখো। আমার বোনকে আমি রক্ষা করছি।
নাজলী রেগে দাঁত চেপে বলে,
” যতদিন আপনারা বেঁচে থাকবেন ততদিন মেয়েরা শান্তিতে নিশ্বাস পর্যন্ত নিতে পারবে না। আমাকে যে ফাঁদে আপনি ফেলেছেন তার জন্য পস্তাতে হবে। এর মুল্য আপনি খুব বাজেভাবে দিবেন। আপনি মিথ্যে আশা দেখিয়ে এখানে নিয়ে এসেছেন। বন্ধীত্ব জীবন দান করছেন। কিন্ত আমাকে বন্ধী করে রাখার ক্ষমতা আপনার নেই।
আরিশ বিরক্তিতে চোয়াল শক্ত করে ফেলে,
” এত তেজ কেনো তোমার? বন্ধী হয়ে আমার সামনে দাড়িয়ে আছো অথচ ভিতরে কোনো ভয় নেই।
আরিশ এক প্রকার রাগ নিয়ে উপরে চলে যায়। সব রাগ গিয়ে পড়ে নিকের উপর। বাল মার্কা আজাইরা ঝামেলায় তাকে ফাঁশিয়ে দিয়েছে। মেয়েদের কখনো কাছেই ঘেষতে দেয় নি এখন একটা জ্যাঁন্ত মেয়ের সাথে এক ছাদের নিচে থাকতে হবে ভাবতেই যেন রাগটা আরও বেড়ে যায়।
বারের ঘন বাতাসটা যেন ধোঁয়ার চাদরে ঢাকা।তাতে মিলেমিশে আছে নোংরা ঘামের গন্ধ। পোড়া সিগারের দগদগে ধোঁয়া। আর পুরনো কাঠে শুষে থাকা নোনা রক্তের শীতল আভাস। দেয়ালের কালচে রঙ।ঝাপসা ঝাড়বাতির কাঁপা আলো। আর মেঝের উপর ছড়িয়ে থাকা ভাঙা কাঁচের টুকরো। সব মিলিয়ে জায়গাটাকে করেছে ভৌতিক এক সমাধিক্ষেত্রের মতো।যেখানে প্রতিটি আসনেই বসে আছে রক্তচোষা নেকড়ে।
আঠারোজন মাফিয়া—প্রতিটি মুখ পাথরের মতো কঠিন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তারা একে অপরকে ভেদ করছে। কারো ঠোঁটে বিষাক্ত বিদ্রূপ হাসি। কারো চোয়ালে গর্জন আটকে রাখা কুণ্ঠা। কারো হাতে ভারী আঙটির ঝলক। কারো কব্জিতে রক্তে রঞ্জিত উল্কির দাগ। সব জানাচ্ছে এদের প্রতিটি জীবন কেবল মৃত্যুর ব্যবসা। টেবিলের উপর ঠকঠক শব্দ তুলে কাঁপছে হুইস্কির গ্লাস।তাতে প্রতিফলিত হচ্ছে তাদের ক্রোধে বিকৃত মুখাবয়ব।
তবে এই অশুভ ভীড়ের মাঝখানেই এক আলাদা অস্তিত্ব বসে আছে।এক অচঞ্চল জটিলতা নিক জেভরান। তার বসার ভঙ্গি যেন সাম্রাজ্যের সিংহাসনে বসা শাসকের। অগোছালো মাফিয়া টেবিলটাকেও সে নিজের রাজসভা করে তুলেছে। তার চোখ দুটি শীতল ইস্পাতের মতো নিস্তেজ নয়। তার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ কূটিল ও অপ্রতিরোধ্য। যে চোখে তাকায় সে যেন নিজের ভেতরের দুর্বলতা নগ্ন হয়ে যেতে দেখে।
নিকের ঠোঁটের কোণে মৃদু এক ব্যঙ্গ হাসি। তবে সেই হাসি শীতল ছুরির মতো ধারালো। এই হাসি যে কোনো মুহূর্তে সে শব্দহীনভাবে কারও গলা কেটে দিতে পারে। আঙুলে অলস ভঙ্গিতে ঘুরতে থাকা সোনালি রিভলভার আসলে এক নীরব বার্তা। তার কাছে মৃত্যু কেবল খেলার উপকরণ। শরীরের একটিও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ উদ্বিগ্ন নয়।এমন শীতল নির্লিপ্ততা কেবল তারই থাকে।যার হাতে মৃত্যুর রাশ।
আঠারোজন মাফিয়ার চোখে জমে থাকা রক্তগরম ক্ষোভ যেন গর্জন তুলতে চাইছে, কিন্তু নিকের তীর্যক দৃষ্টি তাদের গলাতেই শ্বাসরোধ করে দিচ্ছে। কেউ সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে দাঁত কড়মড় করে। কেউ আঙুলে ছুরি চেপে রাখে।কেউ আবার হুইস্কির গ্লাস চূর্ণ করার উপক্রম হয়।তবু নীরবতা ভাঙতে পারে না।
কারণ, নিক জেভরান কেবল মেয়েটিকে ছিনিয়ে নেয়নি। সে ছিনিয়েছে তাদের সম্মান।তাদের অহংকার। তাদের অস্তিত্বের মূল ভিত্তি। একশত কোটি টাকার বিনিময়ে কেনা সেই মেয়েটি এখন হয়ে উঠেছে ক্ষমতার প্রতীক, অপমানের দাগ, আর বিদ্রোহের নীরব বীজ।
বারের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয় কাঁচ ভাঙার শব্দ। বাতাসে ঘনীভূত হয় রক্তের গন্ধের পূর্বাভাস।মুহূর্তের মধ্যে এই সভা পরিণত হতে পারে হত্যাযজ্ঞে। অথচ কেন্দ্রে বসে থাকা মানুষটা তার চোখের শীতল অগ্নিশিখায় যেন জানিয়ে দিচ্ছে,
“রক্ত ঝরবে, তবে আমার ইচ্ছাতেই।”
নিকের উপস্থিতি এই পুরো ভিড়ের মধ্যে একটি অদৃশ্য শক্তির মতো। চোখে লুকানো অগ্নিদাহ। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি নিয়ে বলে,
“তোমরা কিনতে পারো নি। কিন্তু এখন সে আমার। যা আমার, তা ছোঁয়া সাহস করতে পারবে না কেউ। তাই ভুলে ও তার দিকে হাত বাড়ানোর সাহস করবে না কেউ।
মাফিয়ারা একে অপরকে চোখ মেলায়।রাগ ও লোভে অদ্ভুত ভাবে তাকায় নিকের দিকে। কেউ টেবিলের ওপর থাপ্পড় মারার পরিকল্পনা করে।কেউ আঙুলের আঘাতের হুমকি ছুড়ে দেয়। কিন্তু নিকের উপস্থিতি তার প্রতিটি নিঃশ্বাস প্রতিটি অঙ্গ সব কিছু দমিয়ে রাখে। হিংস্রতা আর কর্তৃত্ব একাকার হয়ে বারটিকে এক অনিশ্চিত মৃত্যুর মতো থরথরানি সৃষ্টি করে। ইগর রাগটাকে সামলাতে না পেরে বলে,
” অনেকদিন তো ছিলো আপনার কাছে। এইবার আমাদের দিয়ে দিন।
নিক দাঁত কটমট করে বলে,
” ওর বয়স কম। মাত্র আঠারো বছর। তোমাদের কাছে টিকবে না।
ক্রেশ টেবিলের উপর শব্দ করে বলে,
” বয়স দিয়ে যাচাই করলে আপনার এখানে টিকেছে কিভাবে? পুরো মাফিয়া সম্রাজ্যের সব থেকে বড় নরখাদক আপনি। এক মেয়ের মৃত লাশ হয়ে বের হয়েছিলো। অতীত ভুলে যায় নি আমরা। কিন্তু এনি লাশ হয় নি। নিশ্বন্দেহে সে আপনার অত্যাচার সহ্য করার ক্ষমতা রাখে। সেখানে আমাদের ও রাখবে। বয়স বলা আপনার মুখে হাস্যকর।
নিক ঠোঁট বাঁকিয়ে রহস্যময় হাসি দিয়ে বলে,
” অতীত কেনো ঘাটাঘাটি শুরু করলে ক্রেশ। মেয়েটা কেনো মরেছে ভুলে যাও নি নিশ্চয়। আমার সাথে তেরিং – বেরিং করলে গলা চেপে ধরব এইটাই স্বাভাবিক।
মি,কায়াত গম্ভীর হয়ে বলে,
” এনিকে কবে গলা চেপে ধরবে?
নিক সামান্য শব্দ করে হেসে বলে,
” গলা তো প্রতিনিয়ত টিপে ধরি। কিন্তু জানে মেরে ফেলতে পারি না। আমার বোকা এনি। আমি যে কথাটা পছন্দ করি না সেটাই বার বার বলে। ইচ্ছে তো করে শ্বাস রোধ করে মেরে ফেলি। প্রচন্ড ঘাড় ত্যারা। মৃত্যুর সামান্য ভয় টুকুও নেই। সারাক্ষন কানের কাছে নিজের মৃত্যু কামনা করে। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে মাটিতে পুঁতে ফেলি। কিন্তু যখন গাল ফুলিয়ে বিষন্ন মুখে বসে থাকে তখন মনে হয় পুরো জগতের সুখ তার পদতলে এনে রাখি।
থেমে….
” আঘাত করে একদম রক্তাক্ত করে ফেলি। চাবুক পিটাও করেছি। তবুও মরনের ভয় ডুকাতে পারি নি। বাঁচার জন্য একবার ও মিনতি জানায় নি। সে কারনে ইচ্ছে করে বাকিদের মত তারও একই দশা করি। কিন্তু এইটাকে ছাড়া আমার ঠিক চলবে না। দেড় বছর যুদ্ধ করেছি নিজের সাথে। তবুও টিকতে পারি নি। এখন নিজের সম্রাজ্যে বন্ধী করে ফেলেছি। সামান্য একটা পাখিও তার দিকে তাকাতে পারবে না। ট্রাস্ট মি ওর হাসি- মুখটা দেখলেও আমার সহ্য হয় না।
ইতালির গ্যাংস্টার জেমস তাচ্ছিল্য হেসে বলে,
” সাধারন রক্ষিতার জন্য এত ভাবনা? আমি তো ভেবেছিলাম ফুর্তি করার জন্য কিনেছেন।
নিক দাঁত কটমট করে বলে,
” সে আমার সম্পদ। রক্ষিতা নাম মাত্র কিন্তু সে রক্ষিতা নয়।
জেমস পুনরা তাচ্ছিল্য হেসে বলে,
” যে মেয়ে বিয়ে ছাড়া পুরুষের প্রতি বেলার ভোগ বস্তু হতে পারে তাকে রক্ষিতা বলতে বারন করছেন নিক জেভরান? কয়েকদিন পর সে হয়ত আমার বেডেও যাবে। আপনি না দিলেও ছিনিয়ে আনব। প্রয়োজনে রক্তপাত ঘটাব। মুলত এইসব রক্ষিতারা জন্মই নিয়েছে আমাদের মনরোঞ্জনে।
জেমসের কথা কর্নে প্রবেশ করতেই নিক চোয়াল শক্ত করে ফেলে। ধূসর মনিগুলো মুহূর্তেই রক্তবর্ন ধারন করে। তিঁরতিঁর করে কাঁপতে থাকে শরীরটা। নিজের রাগটাকে কন্ট্রোল করতে না পেরে জেমসের মুখের ভিতর আচমকা রিভলভার ডুকিয়ে দেয়। নিকের হঠাৎ এমন পাগলাটে আক্রমনে পুরো বার আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। নিকের ফর্সা মুখটা লাল হয়ে গিয়েছে। জেমসের গাল প্রায় ছিঁরে যাওয়ার মত অবস্থা। রিভলভারটা গিয়ে ঠেকেছে কন্ঠনালির মধ্যে। সে বাঁচার জন্য ছটফট করতে থাকে। নিক রাগে গর্জে উঠে,
” শুয়রের বাচ্চা! আমার ব্যক্তিগত নারীকে রক্ষিতা বলার সাহস কিভাবে হয় তর? ওর শরীরে সামান্য কলঙ্কের দাগ পড়তে দেয় নি আমি। এই মেয়েকে নিয়ে কু চিন্তা করলে কলিজা ছিঁড়ে খাব ব্লাডি বিচ!
জেমসের অবস্থা নাজেহাল। শ্বাস প্রায় চলে যাচ্ছে। চোখ দুইটা উল্টে আসছে। ইগর ভয় পেলেও নিকের হাতের উপর হাত রেখে বলে,
” আরেকটু হলে মরে যাবে। ছেড়ে দিন এখনি। ভুলে যাবেন না চারদিন পর আমাদের মাফিয়া মিটিং। তখন জেমসের উপস্থিতি জরুরি। চারশত কোটি টাকার অস্ত্রের হিসেব তার কাছে।
নিক চোখ বন্ধ করে নিশ্বাস টেনে ধ্বাক্কা মেরে ফেলে দেয়। জেমস গিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। নাক দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। ছাড়া পেতেই গলা কাটা মুরগির মত ছটফট করে উঠে। ইগরের ইশারাতে গার্ডরা এসে অর্ধমৃত জেমসকে টেনে- হিচড়ে নিয়ে যায়।
নিক চোখ বন্ধ করে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রন করার চেষ্টা করছে। ক্রেশ নিকের মুখের দিকে তাকিয়ে শান্ত সুরে বলে,
” সামান্য রক্ষিতা বলায় আপনি একজন মাফিয়ার জীবনে নিয়ে নিচ্ছিলেন।
নিক চোয়াল শক্ত করে বলে,
” শুক্রিয়া আদায় করো জানে এখনও মারি নি। তবে এইটার মৃত্যু লেখা হয়ে গিয়েছে।
মি, কায়াত গ্রিবাদেশ নাড়িয়ে বলে,
” কয়জনকে মারবে তুমি?
নিক তীক্ষ্ণ চোখে ঘাড় কাৎ করে তাকায়,
” লিস্টের প্রথমে তুমি’ই আছো কায়াত।
থেমে..
” ছয়হাজার তিনশত একাত্তর কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এই পৃথিবীতে ৮.২৪৭ লোক সংখ্যার মধ্যে যতজন এই নারীকে ঘৃনিত ইঙ্গিত দিবে ঠিক ততজনকে মারব।
প্রতিটা মাফিয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। বিনা অনুমতিতে একটা মেয়ে তার রুমে ডুকে পিঠে সামান্য স্পর্শ করেছিলো বলে তার গলা টিপে মেরে ফেলেছিলো। আজ সেই নিক জেভরান একটা মেয়ের জন্য ধ্বংসের ইতিহাস রচনা করছে।
ইগর দাঁত চেপে বলে,
” উন্মাদ হয়ে গিয়েছেন আপনি। এই মেয়েকে না পেলে আমরা ও বসে থাকব না। তাহলে কি আপনি মাফিয়া সম্রাজ্যের সবাইকে মেরে ফেলবেন?
নিক ঠোঁট কামড়ে বলে,
” আমার কথাটা মেবি বুঝতে পারো নি ইগর। প্রয়োজনে পুরো মাফিয়া সম্রাজ্য ধ্বংস করব। আমি জানি তোমরা মাফিয়া মিটিং এর জন্য অপেক্ষা করছো। নাহলে কবেই আ্যটাক করতে। মাফিয়া মিটিং শেষ হলে ক্ষমতা থাকলে চোখ তুলে তাকিয়ে দেখো।
কায়াত রক্তলাল চোখে বলে,
” যে কোনো মুল্যে আমি ছিনিয়ে আনব।
নিক দাঁত কটমট করে বলে,
” সামান্য স্পর্শ করে দেখাতে পারলে আমি নিক জেভরান গ্যাংস্টার বস পদবি থেকে সরে যাব।
নিক চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়। এরপর ধীরে ধীরে দরজার দিকে সামনে আসে। তার পদক্ষেপ মেঝেতে প্রতিধ্বনিত হয়। প্রতিটি শব্দ কক্ষের ভিতর ভয়ানক আগুনের মতো ছড়িয়ে যায়। পিছন থেকে কায়াত শব্দ করে বলে,
” পুরো সম্রাজ্য তুমি শাষন করলেও তোমাকে শাষন করছে একটা মেয়ে। সতর্ক থেকো এই মেয়ে তোমার ধ্বংসের কারন না হয়ে দাঁড়ায়।
নিক শুনেও শুনল না কারোর কথা। প্রতিটা মাফিয়ার চোখে হিংসার আগুন ঝলঝল করছে। শুধু ক্ষমতা আর শক্তি দিয়ে কেউ পেরে উঠছে না। নিকের বাজ পাখির মত ধারালো দৃষ্টি আর তীক্ষ্ণ বুদ্ধির কারনে আজ পুরো সম্রাজ্যের বাদশাহ সে।
রাত প্রায় তিনটার কাছা- কাছি। একটা বাজে সপ্নে হুট করে এনির ঘুম ভেঙ্গে যায়। কিছুটা ভয় পেয়ে সামান্য পানি পান করে। পুরো রুম আলোকিত তবুও তার কাছে সব অন্ধকার লাগছে। একটা রুমের সব কিছু যদি কালো হয় তাহলে অন্ধকার লাগাটা’ই স্বাভাবিক। এনি পানিটা খেয়ে নিককে খুঁজার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। নিজের পাশে না দেখে প্রচুর অবাক হয়ে যায়। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে নরপশুর মুখটা দেখতে হয়। আজ দেখতে না পেয়ে শান্তির নিশ্বাস ফেলে। রাতে না খেয়েই খুব দ্রুত ঘুমিয়ে গিয়েছলো। এখন পেটে ক্ষিধের কারনে জ্বালা করছে। এনি কোনো কিছু না ভেবে রুম থেকে বেরিয়ে পড়ে। পুরো বাড়ি দিনের মত ঝলঝল করছে। কেউ বলবে না এখন রাত। এনি সিঁড়ি দিয়ে নেমে কিচেনের উদ্দেশ্যে যায়। কিচেন থেকে খুঁজে কিছু হালকা খাবার দুই হাত ভর্তি করে নেয়। হতে জায়গা নেই তাই পেটের উপর রেখে হাত দিয়ে ঝাপ্টে ধরে আছে। কিচেনে এমন খাবার দেখে সে অনেক অবাক হয়েছে। তার জানা মতে নিক কখনো এইসব জিনিস ছুঁয়ে ও দেখে না। তাহলে এইগুলো এখানে কেনো রাখা হয়েছে? এনি মনের খুশিতে কিচেন থেকে বেরিয়ে আসে। কোনোদিকে নজর না দিয়ে সামনে এগিয়ে যায়। হুট করে চোখ বড় বড় করে ফেলে কারোর গলার আওয়াজ শুনে।
— আজকাল নিক জেভরানের মেনশনে চুরি ও হয়।
এনি চোখের পাতা ঝাপ্টে সামান্য ঢোক গিলে। নির্ঘাত ওইদিনকার মত অপমানের স্বীকার হতে হবে। কি দরকার ছিলো এনি এখানে আসার। ক্ষিধের জ্বালায় তো কেউ আর মরে যায় না। তুই ও নিশ্চই মরে যেতি না। তাহলে কেনো অযথা কাজ করে অন্যের কথার স্বীকার হস। এনি ঘাড় ঘুরিয়ে নিকের দিকে তাকায়। খাবারের কারনে এনির মুখটা পর্যন্ত ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে না। নিক কপাল কুচকে তাকিয়ে আছে। নিককে দেখে এনি অবাক হয়ে যায়। চুলগুলো কেমন এলো- মেলো হয়ে আছে। শরীরে ফর্মাল কালো ড্রেস। নিককে এমন কপাল কুচকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ঠোঁট ভিজিয়ে বলে,
” আমি মোটেও চুরি করছিলাম না। আর আমি চুর ও নয়।
নিক গম্ভীরতা টেনে সব গুলো খাদ্যদ্রব্যের দিকে তাকায়। এরপর ঠোঁট চেপে বলে,
” প্রমান সহ ধরেছি এরপর ও অস্বীকার করছে। এখন বিশ্বাস করানোর জন্য আর কি লাগবে?
এনি ভড়কে যায়। হাতে থাকা সব খাবার মেঝেতে ফেলে দেয়। মুহূর্তেই শব্দ করে উঠে। সব কিছু এইভাবে মেঝেতে ফেলে দেওয়াতে খারাপ লাগলেও কঠিন স্বরে বলে,
” আপনার মত কিপ্টে জীবনেও দেখিনি। সাধারন খাবার এইতো ছিলো এইভাবে চুরের অপবাদ দেওয়ার কি আছে। মুলত অবৈধ ব্যবসায়ীরা এমন ছোট মনের এই থাকে।
এনিকে রাগতে দেখে নিক ঠোঁট কামড়ে বলে,
” পুরো সম্রাজ্য খেয়ে ফেললেও কিছু বলব না বেবিগার্ল। বাট এইগুলো ফেলে দেওয়া তোমার একদম উচিত হয় নি। এখন নিজেই সব কিছু পরিপাটি করবে।
এনি চোয়াল শক্ত করে বলে,
” জীবনেও করব না।
নিক বাঁকা হেসে বলে,
” ইজ্জতের ভয় সবার এই আছে।
এনি কাঁপা গলায় বলে,
” ম.. মানে?
নিক গ্রিবাদেশ নাড়িয়ে মোবাইলটার দিকে তাকিয়ে বলে,
“তোমার শাওয়ার নেওয়া ভিডিওটা কি অনলাইনে পোস্ট করে দিব? আমার কথা না শুনলে নিজের সর্বস্ব হারাবে।
এনি কেঁপে উঠে। ঠোঁট চেপে কান্না আটকিয়ে বলে,
” সর্বহারা মেয়েটাকে আর কি সর্বহারা করবেন নিক জেভরান। আমি এমন এক সর্বহারা যাকে কষ্ট দিলে কষ্ট নিজেও আর্তনাদ করে উঠে।
এনি কথা বলতে বলতে প্রায় কান্না করে দেয়। চোখ দিয়ে পড়তে থাকে নোনাজল। নিক এনির কান্নারত মুখটার দিকে তাকায়। তবে ভুলেও চোখে চোখ রাখে না। নিক গম্ভীর নিশ্বাস টেনে বলে,
” ফা** ক অফ বেবিগার্ল। স্টপ ক্রায়িং। ক্রায়িং ইজ ফরবিডেন ইন মাই মেনশন।ইফ ওয়ান মোর টিয়ার ফল্স ফ্রম ইয়োর আই, মাই বডি উইল বি অন টপ অফ ইয়োর্স। হোয়াট হ্যাপেন্স নেক্সট ইউ উইল নট বি এবল টু এন্ডিউর। ইভেন ইফ ইউ স্ক্রিম, ইউ ওয়োন্ট গেট অ্যান এমব্রেস।
এনি থেমে যায়। নিকের অশালীন ইঙ্গিতে থামতে বাধ্য হয়। তবে কোনো কথা বলে না। নিকের দিকে একবারের জন্য ফিরেও তাকায় না। মেঝেতে হাটু ভেঙ্গে বসে পুনরায় সবগুলো খাবার হাতে তুলে নেয়। নাক পিটপিটের জ্বালায় ভালোভাবে তুলতে ও পারছে না। অসহ্য হয়ে নিজের জামা দিয়েই নাক মুছে ফেলে। নিক সেদিকে তাকিয়ে কপাল কুচকে ফেলে। এনি সবগুলো হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। এরপর ধীর পায়ে কিচেনে যায়। কিচেনে সবকয়টা রেখে নিশ্বব্দে বেরিয়ে আসে। নিক তাকিয়ে দেখছে শুধু এনিকে। অজান্তেই অধরে হাসি ফুটে উঠে। তবে সেটা আর প্রকাশিত হয় নি। কারোর নজরে পড়ে নি। এনি নাক টানতে টানতে মাথা নিচু করে কিচেন থেকে বেরিয়ে আসে। নিকের দিকে না তাকিয়ে রুমের উদ্দেশ্যে সামনে এগিয়ে যেতে থাকে। নিক এনির হাত চেপে ধরে নিজের কাছে নিয়ে আসে। তবে এইবার চেপে ধরেছে ঠিক তবে ব্যাথাতুরে ছিলো না। এনি প্রথমে রেগে গেলেও নিকের নরমাল স্পর্শে অবাক হয়ে যায়। নিক এনিকে নিজের সাথে বসিয়ে কোনো এক জনকে মেসেজ পাঠায়। এনি রাগটাকে নিয়ন্ত্রনে রেখে বলে,
” আজ এত নরমালভাবে স্পর্শ করার কারন?
নিক গম্ভীরতা টেনে বলে,
” কেনো, আমার রক্তাক্ত স্পর্শ তোমার পছন্দ?
এনি ছুটার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। নিক এনিকে নিজের উড়ুর উপর বসিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে বলে,
” অস্থির হইও না বেবিগার্ল। তুমি এমন এক জায়গায় বসে আছো যেখানে নড়াচড়া করলে সে কন্ট্রোলল্যাস হয়ে পড়বে। নিজেও নড়ো না সেই জিনিসটাকেও শান্তিতে থাকতে দাও। এমনিতে বিগত দেড় বছর ধরে সে অশান্তিতে ভুগছে।
নিকের অশ্লিল ইঙ্গিতে এনির কান দিয়ে ধোঁয়া বের হওয়ার উপক্রম। নাক – মুখ খিঁচে ফেলে। সামান্য নড়া- চড়া করে বলে,
” আপনার মাইন্ড জঘন্য। কি বাজে চিন্তাভাবনা আপনার। ছেলে হয়ে একটা মেয়ের সামনে এইসব বলতে লজ্জা লাগে না?.
নিক ঠোঁট কামড়ে হেসে বলে,
” ট্রাস্ট মি একটুও লজ্জা লাগে না। কারন তোমাকে নিয়ে আমি সবচেয়ে জঘন্য জিনিস গুলো চিন্তা করি। সেখানে নিজের জিনিস তোমার কাছে শেয়ার করতে লজ্জা লাগবে কেনো?
এনি নিকের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,
” ব.. বাজে জিনিস চিন্তা করেন ম.. মানে? কি চিন্তা করেন আমাকে নিয়ে?
নিক গ্রিবাদেশ নাড়িয়ে শান্ত গলায় বলে,
” কোনো একদিন প্রেকটিক্যালভাব দেখাব। আমি বলা থেকে দেখাতে বেশি আগ্রহী।
এনি নিকের কথাটার অর্থ বুঝল না। শুধু থম মেরে বসে আছে। নিক এনির লম্বা চুল নিজের এক আঙ্গুলে পেচিয়ে নেয়। এর মধ্যেই একজন গার্ড এসে মাথা তাদের সামনে দাঁড়ায়। নিক সাথে সাথে এনির মুখটা নিজের বক্ষের সাথে চেপে ধরে। হুট করে এমন শক্ত- পোক্ত বক্ষে ধ্বাক্কা লাগায় নাকে সামান্য ব্যাথা পেয়ে যায়। এনি সরে আসার জন্য ছটফট শুরু করে দেয়। নিক আরও গভীরভাবে চেপে ধরে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়। লোকটা নিকের দিকে ভুল করে তাকিয়ে যায়।নিকের সাথে মিশে থাকা কোনো একটা মেয়েকে দেখে সাথে সাথে চোখ ফিরিয়ে নেয়। এই মেয়েটার দিকে তাকানো মানে নিজের মরন আলিঙ্গন করা। শুধু এই মেয়ের কারনে অনেক গার্ড নিজেদের প্রান দিতে হয়েছে তাও বিকৃতভাবে।
নিক গার্ডের দিকে ইশারা দিতেই লোকটা নিয়ে আসা প্রতিটা খাবার টেবিলের উপর রাখে।
নিক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে প্রতিটা খাবারের দিকে তাকায়। গ্রিলড চিকেন, খিঁচুরি, স্টিমড ফিশ, দই পারফে, গ্রিলড স্যালমন, লেন্টিল স্যুপ। প্রতিটা পেয়ালায় সুন্দরভাবে সাজিয়ে দিয়েছে। নিক সব খাবার পরখ করে বলে,
” নিজে আগে টেস্ট করো। কুইক!
লোকটা কোনোরকম সন্দেহ ছাড়াই টেস্ট শুরু করে। এইটা নতুন নয়। বাহির থেকে কোনো খাবার আসলে প্রতিটা খাবার টেস্ট করতে হয়। লোকটা সবগুলো টেস্ট করে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। নিক লোকটাকে স্বাভবিকভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে গম্ভীর হয়ে বলে,
” ইউ ক্যান কাম নাউ।
নিকের আদেশ পাওয়া সাথে সাথে লোকটা বেরিয়ে যায়। লোকটা চলে যেতেই নিক নিজের বাঁধন নরম করে। এনি সাথে সাথে মাথা তুলে বড় বড় শ্বাস টানে। ফর্সা নাকটা কেমন লাল হয়ে গিয়েছে। যেন রক্ত জমাট বেঁধে আছে। এনি রাগে কিড়মিডিয়ে বলে,
” শ্বাস রোধ করে মারার দান্ধা করছেন? এইভাবে চেপে রেখেছেন কেনো? আরেকটু হলে দম আটকে যেত।
নিক এনির নাকের উপর আঙ্গুল ছুঁইয়ে বিরক্তি নিয়ে বলে,
” কিসব বাল মার্কা শরীর তোমার। সামান্য স্পর্শ করলেই লাল হয়ে যায়। যেখানে স্পর্শ করি সেখানেই সিলমোহর লেগে যায়। ক্ষত এমন গভীর হয় যে পরের বার ক্ষত করার ইচ্ছে হারিয়ে ফেলি।
নিকের রাগ দেখে এনির চোয়াল ঝুলে আসে। সামান্য ঠোঁট ভিজিয়ে বলে,
” কখনো ঠিকভাবে স্পর্শ করেছেন? সামান্য হাত ধরলেও মনে হয় যেন হাড্ডিগুলো ভেঙ্গে যাচ্ছে। ঠোঁট দিয়ে স্পর্শ করতে গেলে দাঁত দিয়ে কামড়ে অর্ধেক মাংস খুলে ফেলেন শরীরের। এমন ভাবে নিজের সাথে চেপে ধরেন যে পুরো শরীর অবশ হয়ে আসে। আপনার আর চিতাবাঘের সাথে কোনো প্রার্থক্য নেই।
নিক ঠোঁট কামড়ে হেসে বলে,
” আই লাইক ইট বেবিগার্ল। স্পর্শে যদি ক্ষত সৃষ্টি না হয় তাহলে স্পর্শহীন এই ভালো। আমার দেওয়া প্রতিটা স্পর্শ তোমার শরীরে গভীর সিলমোহর লাগিয়ে দিবে। যাতে দুই হাত দুরত্বে থাকলেও প্রতিটা ক্ষত আমার কথা মনে করিয়ে দেয়।
এনি ছুটার জন্য হাত নাড়িয়ে বলে,
‘ ছাডুন আমাকে?
নিক গম্ভীরতা টেনে বলে,
” খাবারগুলো শেষ করো।
এনি টেবিলের দিকে তাকায়। চোখের সামনে এত সুস্বাদু খাবার দেখে যেন পেটের ভেতর আরও জ্বালা করে উঠে। কিন্তু নিকের অপমানের কথা মাথায় আসতেই পুনরায় নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। নিকের বাঁধন থেকে ছুটার জন্য মরিয়ে হয়ে বলে,
” খাব না আমি।
নিক বিরক্তির নিশ্বাস ছেড়ে বলে,
” আমি রেগে গেলে ঘূর্নিঝর হয়ে যাবে বেবিগার্ল। আমার টর্চার গুলো নিশ্চই ভুলে যাও নি। তবে এখন আঘাত করব না আর। কারন যার ভিতরে মৃত্যুর ভয় থাকে না তাকে মেরে লাভ নেই। তবে ইজ্জতের ভয় ঠিকই আছে। ভিডিওটা পোস্ট করে দিব সব জায়গায়।
এনির শরীরটা কেঁপে উঠে। সব শক্তি যেন একটা ব্লেকমেইলে শেষ হয়ে যায়। যদি একবার এই ভিডিও অনলাইনে দেওয়া হয় তাহলে সবাই তার নগ্ন শরীর দেখবে। হাজার অশুর তাকে হাজার বাজে সপ্ন বানাবে। শকুনের মত তার শরীরটাকে দৃষ্টি দিয়ে জ্বালিয়ে দিব। সে হয়ত মরে যাবে কিন্তু তাতে লাভ কি? ভিডিওটা সবাই দেখবে। আজীবন থাকবে মোবাইলের ভিতরে। এক নরপশু তার শরীর দেখেছে ভাবতেই বমি আসে। আর অন্যদের কথা সে কল্পনা ও করতে পারে না। আজীবন তার ভিডিওটা নিয়ে সবাই লালসা করবে। এনি আবার ও কান্না করে দেয়। শব্দহীনভাবে ঠোঁট চেপে বলে,
” আমার জীবনের সব থেকে ঘৃনিত পুরুষটি আপনি নিক জেভরান। কখনো যদি সময় আসে আপনাকে খুন করব আমি, ঠিক ততটা ঘৃনা করি। পৃথীবীতে প্রতিটা লোকের ঘৃনাকে একত্রিত করলে যে ঘৃনা জমা হয় তার থেকেও বেশি ঘৃনা করি আমি আপনাকে।আই হেট ইউ ভেরি মাচ। মে ইউ রিসিভ দ্য হার্শেস্ট প্যানিশমেন্ট।
নিক সামান্য হাসলো। কপাল কুচকে বলে,
” তোমার ঘৃনা অথবা ভালোবাসা দিয়ে আমি কি করব? তুমি বর্তমানে আফ্রিকায় আছো। এই দেশের নাগরিক ও নও। তোমার থেকে তো আর ভোট চাইতে যাব না যে মন জুগিয়ে চলতে হবে। ফিনিশ ইউর ফুড কুইকলি।
নিকের এমন হার্টল্যাস উত্তরে এনির ইচ্ছে করছিলো দেয়ালে মাথা ঠুকতে। চুরের কাছে গিয়েছিলো ধর্মের জ্ঞান শুনাতে। এনি খিঁচুরির চামচ হাতে নিয়ে বিরবির করে উঠে,
” কুকুরের লেজ কোনোদিন সোজা হয় না। এর লেজও কোনোদিন সোজা হবে না। তার আগেই আমি লাপাত্তা হয়ে যাব। আর মাত্র চার দিন!
কথাটা হয়ত নিকের কানে প্রবেশ করে নি। এনি সামান্য ফুঁ দিয়ে খিচুরিটা মুখে দেয়। সাথে সাথে চোখ বন্ধ করে। খাবার পেয়ে সব কিছু ভুলে যায়। সব গুলো খাবার একটু একটু করে খেয়ে একইভাবে রেখে দেয়। সামান্য পানি পান করে নিকের কথা মাথায় আসে। কিন্তু পর মুহূর্তে নিজের মস্তিষ্ক কে ধিক্কার জানায়। মদ, সিগারেট, গাজাখোরদে খাবার খেতে হয় না। তাদের পেট চব্বিশ ঘন্টা এমনিতেই ফুল থাকে। এনি নিজের কাপড় দিয়ে মুখ মুছে উঠে দাঁড়ায়। পেট পুজো করে কারোর দিকে তাকানোর ও প্রয়োজন করে নি। সামনে এগিয়ে যেতেই নিকের আদেশ আসে,
” কিচেন থেকে আমার জন্য এক ক্লাস করলার জুস নিয়ে আসো।
এনির ইচ্ছে না থাকা সত্তেও এক গ্লাস করলার জুস নিয়ে এসে নিকের সামনে রাখে। করলার জুসের দিকে তাকিয়ে নাক – মুখ কুচকে ফেলে। এইসব অখাদ্য ও লোকে খায়!
নিক বাঁকা হেসে বলে,
” ফলো অর্ডারস উইদআউট টুইস্টিং ইয়োর নেক। ট্রাস্ট মি একটুও আঘাত করব না। আমার আদেশ পালন করো দুনিয়ার সব সুখ এনে দিব।
নিকের কথায় এনি তাচ্ছিল্য হেসে বলে,
” দুনিয়ার সব সুখ কাকে বলে জানেন নিক জেভরান? একটা মেয়েকে পাচার কেন্দ্রে নিয়ে এসে যৌন হয়রানি করে মানসিক নির্যাতন করা, নিলাম কেন্দ্রে তোলা, পুরো দেশের সামনে একজন তুচ্ছ রক্ষিতা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া, মেয়েটার নগ্ন ভিডিও মেমোরি বন্ধী করে দিনের পর দিন ব্লেকমিল করা,অনুমতি ছাড়া অশালীনভাবে স্পর্শ করা, নোংরা চিন্তা করা, জ্বলন্ত কয়লার উপর হাটতে বাধ্য করা, তাকে খুন করাতে বাধ্য করা, চাবু দিয়ে রক্তাক্ত করে অজ্ঞান করে ফেলা, এইগুলোকে কি বলে গ্যাংস্টস্র বস। আমার শরীরে অর্ধেক জুড়ে আপনার দেওয়া আঘাতের, অত্যাচারের ক্ষত আছে। কলসিটে দাগ পড়ে আছে প্রতিটা অত্যচারের। যতদিন বেঁচে থাকব ততদিন আমার অভিশাপ পাবেন। খোদার কসম আপনি মরে গেলেও একটু মায়া জন্মাবে না। আমার জীবনের সব থেকে ঘৃনিত পুরুষটি আপনি। আপনি আমাকে লাঞ্চিত করেছে , পুরো বিশ্বের সামনে কলঙ্কিত করেছেন। আনাস্তাসিয়া এনি নামক নামটাকে যারা ভালোবাসত তারা আজ আমাকে দেখলে ঘৃনায় চোখ ফিরিয়ে নিবে। সবাই ভাববে আমি হাজার ও পুরুষের কামনা মিটিয়ছি। একজন গ্যাংস্টার বসের রক্ষিতা হয়ে থেকেছি দিনের পর দিন। পুরো দেশের সামনে আজ আমি কলঙ্কিত।
নিকের ধূসর মনির চোখ দুইটা রক্তিম হয়ে উঠে। রাগে তিঁরতিঁর করে কেঁপে উঠে শরীর। সামনে থাকা কাউচটাকে লাথি দিয়ে ফেলে দেয়। এক বিকট শব্দে এনি কেঁপে উঠে। ভয়ে দুই পা পিছিয়ে যায়। নিক হিংস্র হায়েনার মত এনির গালটাকে চেপে ধরে গর্জে উঠে,
” মিথ্যে জিনিস নিয়ে মানসিক আঘাত পেলে জান খেয়ে ফেলব শালী মাদার্ফাক। একজন পুরুষ ও তর দিকে তাকায় নি। যারা তাকিয়েছিলো তাদের কঠিন মৃত্যু হয়েছে। যারা রক্ষিতা নিউজ ছড়িয়েছিলো তাদের প্রত্যেকের কলিজা কেটে তর সামনে নিয়ে আসব। যাস্ট আর কয়েকটা দে। আর যদি তুই কলঙ্কিত হয়ে ও থাকিস তাহলে আমার স্পর্শে হয়েছিস। তাতে এত আফসোস কিসের?
এনির শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে অগ্নির হিংস্র থাবায়। বেপোরোয়াভাবে নিকের বুকে ধ্বাক্কা দেয়। নিক এনিকে ছেড়ে দেয়। এনি বড় বড় শ্বাস টেনে কেঁশে উঠে। নিক এনির মাথাটা নিজের মাথার সাথে লাগিয়ে নিশ্বাস টেনে বলে,
” আমি প্রচুর খারাপ বেবিগার্ল। এমন কোনো অশালীন কাজ নেই যা আমি করি নি। আমার হার্ট নেই, ভালোবাসা নেই। জীবনে কারোর জন্য এক ফোঁটা চোখের পানি খরচ করিনি।নিজের জন্মদাত্রীর জন্য ও দয়া- করুনা দেখায় নি। লোকের আর্তনাদে পৈশাচিক আনন্দ লাভ করি। সামান্য কারনে লোকের দেহ ছিন্ন- বিচ্ছিন্ন করে ফেলি। দিনে হাজারটা খুন করলেও অনুশুচনা হয় না। কিন্তু তুমি ভিন্ন।
তোমাকে অত্যাচার করে সাময়িক পৈশাচিক আনন্দ লাভ করি। তবে দিন শেষে আমি উন্মাদ হয়ে যায়। হারিয়ে ফেলি নিজের গন্তব্য। আমার সম্রাজ্যে তোমার বন্দিদশা আজীবনের জন্য। তোমার জন্য বাহিরের পৃথিবী নিষিদ্ধ। তোমার শ্বাসের হিসেব রাখব আমি। আমি ছাড়া কারোর সাথে তুমি কথা বলতে পারবে না। আমি ব্যতিত তোমার চোখে অন্য কেউ থাকলে কঠিন নির্যাতনের স্বীকার হবে। রক্তাক্ত করে ফেলব তবুও অন্যের জন্য সামান্য চিন্তা করতে দিব না। ইফ নেসেসারি, আই উইল বাইন্ড ইউ ইন চেইনস, বাট আই উইল নট সেপারেট ইউ ফ্রম মাইসেল্ফ।
নিকের গরম নিশ্বাস, ফিসফিস করা কন্ঠাস্বর এনির শরীরটাকে কাঁপিয়ে তুলে। এক মুহূর্তের জন্য ভুলে যায় সব কিছু। অস্ফুর্ত আওয়াজে বলে,
লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ১৯
” টানা দিনের পর বাহিরের জগত না দেখে সারাদিন একটা রুমে থাকটা মৃত্যুর চেয়েও কষ্টদায়ক। আপনার কারনে আমি সামান্য বাতাস ও শরীরে লাগাতে পারি না।আপনার মস্তিষ্ক ঠিক নেই। বিকৃত ভাবনার অধিকারী আপনি। একটা হার্টল্যাস সাইকোপ্যাথ।
