লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৩৮
লিজা মনি
এনি তীব্র ক্ষোভে নিকের বুকে কামড় বসিয়ে দেয়। নিক নাক -মুখ কুচকে দাঁড়িয়ে থাকে। রাগে কেঁপে উঠে শরীরটা। এনি প্রায় অনেক্ষন একই জায়গায় দাঁত বসিয়ে রাখে শক্তভাবে। মুখে নোনতা অনুভব করে ছেড়ে দেয়,
” এমন চরিত্রহীন মেয়েকে বিয়ে করেছেন কেনো? যার চরিত্র সমস্যা আছে। চার -পাঁচটা নগর বানিয়ে রেখেছে।
নিক আচমকা এনিকে চেপে ধরে নিজের সাথে। মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত গলায় বলে,
” এই সামান্য শরীরে এত তেজ তর কোথা থেকে আসে জান। আগের মত কঠোর হতে পারি না । আঘাত করতে পারি না শক্তভাবে। কি করেছিস আমার উপর? কি মায়ায় ফেলেছিস আমায়।
এনি নিকের বুকে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে উঠে। এনির ফুঁপানোর শব্দ নিক অনুভব করে কপাল কুচকে ফেলে। এনির মুখটা বুক থেকে তুলে। এনি ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরে আছে। পুরো মুখ এই কেমন লাল হয়ে আছে। নিক ক্ষিপ্ত চোখে তাকায় এনির দিকে। কন্ঠে কাঠিন্যতা বজায় রেখে বলে,
” সামান্য নরম সুরে কথা বলেছি বলে কি আমার আদেশ ভুলে গিয়েছো? নাকি আমার স্বভাব -পরিচয়। বারন করেছি না, অযথা এই বাল মার্কা চোখের পানি ফেলবে না। মেরেছি আমি? আঘাত করেছি নাকি আদর করেছি?
নিকের ধমকে এনি হুট করেই চুপ হয়ে যায়। কান্নাও সেকেন্ডের মধ্যে অফ হয়ে যায়। এনির এমন হুটহাট পরিবর্তন দেখে নিক ঠোঁট কামড়ে ধরে হাসে। এনির কোমড়টা চেপে ধরে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়। এনি পাথরের মত এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। নিক গলায় মুখ গুঁজে দিয়ে হিসহিসিয়ে বলে,
” ঠিক এইভাবেই আমার প্রতিটা কথা শুনবে। আমার অবাধ্য হবে না।
এতক্ষন এনি চুপ হয়ে থাকলেও এখন কেমন যেন ছটফট করে উঠে। নিককে সরানোর জন্য শক্তি প্রয়োগ করে আতঙ্কিত গলায় বলে,
” সরুন।
নিক যেন শুনে ও শুনলো না। এনির জামার এক অংশ সামান্য সরিয়ে এনির হাত চেপে ধরে। পাগলাটে আচরনের মধ্যেই ঘন নিশ্বাস ফেলে বলে,
” দশ দিন তো সরেই ছিলাম।
এনি একদম নিকের বাহুধরে বন্ধী হয়ে পড়ে।নিকের শক্ত থাবার সম্মুখীন থেকে বাঁচার জন্য আরও ছটফট করে উঠে। নিক বিরক্ত হয়ে কাউচের উপর বসিয়ে দেয়। এরপর সেকেন্ডের ব্যবধানে একটা হ্যান্ডকাফ দিয়ে এনির হাত বেঁধে ফেলে। ওষ্ঠে -ওষ্ঠ মিলাতে যাবে ঠিক সেই মুহূর্তে এনি মুখ সরিয়ে ফেলে। ভয়ে ঘাম ঝড়ছে তার কপাল দিয়ে। গলা শুকিয়ে গিয়েছে। হুট করে নিকের এমন পাগলাটে আচরন বোধগাম্য হচ্ছে না। উনি হঠাৎ করে এই রুপে ফিরেছেন কেনো? নাভিদ ভাইকে দেখে! নাভিদ ভাই এসেছে বলে কি উনি এমন করছেন? জেলাসিতে এমন করছেন নাকি রাগ মিটাচ্ছেন? কোনটা! এনিকে মুখ ফিরিয়ে নিতে দেখে নিক ক্ষ্যাপা বাঘের ন্যায় এনির চোয়ালটা চেপে ধরে। সামান্য চোখ রাঙ্গিয়ে বলে,
” মুডটাকে নষ্ট করছো কেনো এইভাবে? আবার ও সাপের মত এপিঠ-উপিঠ করলে সোজা নিয়ে যাব টর্চার সেলে। হাত -পা বেঁধে….
এনি আতঙ্কিত গলায় বলে,
” কি? ক… কি করবেন?
এনির ভয়াতুর মুখ দেখে নিক বাঁকা হাসে। অথচ শক্ত গলায় ধীর আওয়াজে বলে,
” হাত -পা বেঁধে কি করে বেবিগার্ল? সবারটা জানি না বাট প্রতিবার আমি কি করি? এক কশাইয়ের মত গলা জবাই করি, আর দুই শরীরের শক্তি অপচয় করার কাজ করি। ডিড ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড হোয়াট আই মিন্ট বাই ওয়েস্টিং ফিজিক্যাল এনার্জি, মাই এফ***িং বেবিগার্ল?
এনি আতঙ্কে সিটিয়ে যায়। নিকের চোখের দিকে তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিলে। যা হবে সেসব পরে ভাবা যবে। আগে সত্যিটা জানানো উচিত। এনি নিকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিকে অনুসরন করে নিজেও দৃষ্টি রাখে। ঠোঁট ভিজিয়ে মিহি সুরে বলে,
” আমার মান্থলি প্রবলেম চলছে।
নিকের কপাল কুচকে আসে। এনির দিকে এমন ভাবে তাকায় যেন কোনো শিকারীর দিকে তাকিয়ে আছে। এনি চোখ নামিয়ে নাক মুখ খিঁচে রাখে। নিক এনিকে ছেড়ে ঘন ঘন নিশ্বাস টানে। কপাল আঙ্গুল দিয়ে ঘেষে শক্ত গলায় বলে,
‘ মান্থলি প্রবলেম মাসে কতবার হয় তোমার?
এনি আড়চোখে নিকের রাগান্বিত মুখের দিকে তাকায়। সাথে সাথে চোখ নামিয়ে মিহি সুরে বলে,
” এ..কবার।
নিক ঘুরে এনির দুইটা বাহু চেপে ধরে। চোয়াল শক্ত করে চাপা স্বরে বলে,
” মিথ্যে বলছো?
এনি সাথে সাথে মাথা নাড়িয়ে বলে,
” না।
নিক দাঁত পিষে,
” তাহলে এক মাসে দুইবার।
” সেটা কখন বললাম?
নিক রাগ নিয়ন্ত্রন করার ব্যার্থ চেষ্টা করছে। কিন্তু তবুও নিজেকে সংযত করে তীব্র ক্ষোভে বলে,
” ওইদিন তাহলে মিথ্যে বললে কেনো?
এনি ভয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে। নিকের দিকে এই মুহূর্তে তাকানো যাচ্ছে না। সেই সাহস তার মধ্যে হচ্ছে না। তবুও বহু কষ্টে বলে,
” আপনার থেকে বাঁচতে।
নিকের হাত শিথিল হয়ে আসে। ছেড়ে দেয় এনির বাহু। সোজা হয়ে ডিভানে বসে। ছন্নছাড়া হয়ে চারপাশে তাকায়। মুখটা কেমন লালচে হয়ে গিয়েছে। ধূসর চোখ দুইটা রক্তিম বর্ণ ধারন করে। নিক ঘন ঘন শ্বাস টেনে একদম শান্ত কন্ঠে বলে,
” তোমার এই মিথ্যের জন্য আমি দশ দিন মিনারে আসি নি। জানি সান্নিধ্য থাকলে নিয়ন্ত্রন হারা হয়ে পড়ি। কিন্তু নিজেকে নিয়ন্ত্রন করার ক্ষমতা গ্যাংস্টার বসের আছে।
নিকের কন্ঠ ধীরে ধীরে কঠিন হতে থাকে। কাউচটাকে লাথি মেরে ফেলে দেয় ফ্লোরে। মুহূর্তেই এক বিকট শব্দে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যায় সব কিছু। এনির দেহটা সামান্য কেঁপেছে শুধু। ভয়ে থম মরে বসে আছে। নিক এনির দিকে তাকায়। দিশেহারা গ্যাংস্টার বস নিজের স্ত্রীর দুইটা বাহু সামান্য চেপে ধরে বলে,
” তাকাও আমার দিকে?
এনি তাকায় না। তির তির করে কাঁপছে তার ছোট্ট শরীর খানা। এনির এমন নিরবতা যেন নিকের রাগটাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। প্রগাঢ় ক্ষুব্দতা নিয়ে গর্জে উঠে,
” বান্দির বাচ্চা তাকাতে বলেছি আমি।
নিকের ধমকে এনি সাথে সাথে তাকায় তার দিকে। নিক শান্ত হয়ে শ্বাস টানলে। এনির মুখটাকে নিজের দুই হাতের মাধ্যমে আগলে নেয়। বৃদ্ধা আঙ্গুল দিয়ে চোখের পানি মুছে বলে,
” মিথ্যের আশ্রয় কেনো নিলে? মিথ্যেবাদীদের চরম ঘৃনা করি আমি। নিজের জন্মদাত্রীকেও বাঁচতে দেয় নি। চোখে চোখ রেখে মিথ্যে কেনো বলেছো আমার সাথে?
এনি চোখ বন্ধ করে নেয়। নিজেকে স্বাভাবিক করতে চাইছে এই মুহূর্তে। কিন্তু সামনে বাঘ থাকলে আদ’ও স্বাভাবিক থাকা যায়! এনি কন্ঠ নিচে নামিয়ে বলে,
“একবার তো বলেছি, আপনার ভয়ে।
নিক হাতের বাঁধন আরও শক্ত করে বলে,
” ভয় কেনো পাও আমাকে? যখন আমি রেগে যায় সামলাতে পারো না আমাকে?
এনি অবাক হয়ে বলে,
” আপনাকে সামলাব? নিজের মধ্যে থাকেন আপনি? ঠিক কতটা অমানুষে পরিনত হন সেটা যদি আমার চোখ দিয়ে দেখতেন তবে নিজেও নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে ভয় পেতেন। আপনি হিংস্র নিক জেভরান! যার সাথে মোকাবেলা করার সামর্থ আমার নেই। আপনার স্পর্শ সহ্য করতে পারি না আমি। এই রক্তাক্ত স্পর্শে আমি শুধু ক্ষত-বিক্ষত হব। তার থেকে বরং একটু মিথ্যে না হয় বলে ফেলেছি, কি যায় আসে তাতে? মুক্তি তো মনে হয় এই জীবনে পাব না। যদি পালিয়ে যায় আবারও খুঁজে নিবেন। খুঁজে হয়ত আবার ও চাবুক দিয়ে রক্তাক্ত করে ফেলবেন। তবে এইটা ভাববেন না হাল ছেড়ে দিয়েছি। সুযোগ……
এনি আর বলতে পারলো না। ব্যাথায় গোঙ্গিয়ে উঠে। তীব্র ব্যাথায় ছটফট করে উঠে রমণীর ছোট্ট কায়া। নিক গলার চাপ আরও তীব্র করে দাঁত পিষে উঠে,
” স্টপ ইউর ড্রামা মাই ফা*কিং গার্ল। নাহলে জবান টেনে আনব। বাহিরে যুদ্ধ করতে করতে হয়রান হয়ে যাচ্ছি আর তুই রুমে বসে পালিয়ে যাওয়ার ধান্দা করছিস? ধান্দাবাজ নারী! মেরে ফেলি ঠিক এইভাবে গলাটা চেপে? যদি মেরে টর্চার সেলে ফেলি রাখি একটা কাক ও জানবে না। কিন্তু প্রানে মারতে পারব না। ইউ আর সো ড্যাম অ্যাডিকটিভ দ্যাট আই কুড্ন্ট ইভেন কিল ইউ, নট ইভেন ফর মাই লাইফ।
নিক থামে। এনি ছাড়া পাওয়ার জন্য নিকের সাথে এক প্রকার যুদ্ধ লেগে যায়। নিক এনির হাতটাকে শক্তভাবে পিছন দিয়ে পেঁচিয়ে ধরে বলে,
” কেনো সৃষ্টিকর্তা তকে এই ব্রহ্মাণ্ডে পাঠালো? আর কেনো আমাকে এতটা উন্মাদ করেলো তর প্রতি? প্রতি সেকেন্ড, ন্যানো সেকেন্ড আতঙ্কে থাকি শুধু মাত্র তকে নিয়ে। যে গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান দীর্ঘ বছরের পর বছর নেকড়ের সাথে যুদ্ধ করে অন্ধ কুঠুরিতে কাটিয়েছে সে আজ ভয় পাচ্ছে। দীর্ঘ আড়াই বছর ধরে তীব্র দহনে জ্বলে -পুড়ে মারছিস আমাকে। ড্রাগস হয়ে উঠেছে আমার নিত্য দিনের সঙ্গী। আমার ছন্নছাড়া অগুছানো জীবনে এসে আরও তছনছ না করলেও তো পারতিস।
এনি ব্যাথায় কান্না করে উঠে। নিক ছেড়ে দেয়। এনি যেন জীবন ফিরে পেয়েছে। পানির প্রয়োজন এই মুহূর্তে।
নিক নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে শক্তভাবে। এমনভাবে ধরেছে যে সাথে সাথে তরল রক্ত গড়াতে থাকে। এনি সেদিকে তাকিয়ে আৎকে উঠে। দিশেহারা রমনী আতঙ্কিত গলায় উচ্চারিত করে,
‘ নিক আপনার ঠোঁট থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।
দ্বিতীয়বারের মত এনির মুখে নিজের নাম শুনে গ্যাংস্টার বসের কি হলো বুঝা গেলো না। ঠোঁট ছেড়ে দিয়ে অদ্ভুতভাবে হাসলো। এনির ঠোঁটে রক্তাক্ত ঠোঁট দিয়ে মিনিট লাগিয়ে শক্ত করে চুমু খেয়ে বলে,
” গলায় ব্যাথা পেয়েছো তাই না? আফসোস আমার ব্যাথা দেখলে না।
লাস্ট বার ওয়ার্নিং দিচ্ছি তোমাকে, সেকেন্ড বার যদি মিথ্যের আশ্রয় নাও তাহলে বিলিভ মি, ব্লাড রোজ আমার সর্বোচ্চ খারাপ রুপ দেখতে পারবে। এই দশ দিন আমি আলাদা থেকেছি মাত্র একটা মিথ্যের জন্য। এই নিষ্পাপ চাহনি আজ তোমাকে বাঁচিয়ে দিলো। কিন্তু পরের বার এইটাও বাঁচাতে পারবে না।
নিক কথাটা বলে থামে। কিন্তু পরের মুহূর্তে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বলে,
” এখন সত্যি বলছো?
এনি ছটফটিয়ে উঠে,
” ট্রাস্ট মি। আজকের কথায় বিন্দুমাত্র মিথ্যে নেই।
নিক ডিভান থেকে উঠে থেকে বের হয়ে বারান্দায় যেতে যেতে বলে,
” হোয়েন দ্য টাইম কামস, আইল চেক ইট মাইসেল্ফ।
নিকের কথাটা কানে আসতেই এনি বিরবির করে,
” লুচ্চা চিতাবাঘ। মেয়েরা নাকি নিজের হাজবেন্ডের কাছে সর্বোচ্চ সেইফ থাকে। কিন্ত আমি তো নিজের হাজবেন্ডের কাছেই সেইফ না। বাহিরের লোকে কুনজর দিবে কখন, ঘরের লোক এই চব্বিশ ঘন্টা অশ্লীল দৃষ্টি দিয়ে রাখে। শালার জিন্দেগীহহ!
নিজের ভাবনায় এনি নিজেই হতভম্ভ হয়ে যায়। আশ্চর্য সে এইসব কি অযথা চিন্তা করছে। হাজবেন্ড কে! এমন হার্টল্যাস যন্ত্রকে নিজের সাথে জড়িয়ে বোকামি করিস না এনি। জীবনের সব থেকে বড় অপরাধ হবে এইটা। তারা অত্যাচার, আঘাত, হার্ট করতে জানে কিন্তু কোনোদিন ভালোবাসতে জানে না। পুরো পৃথিবী না জানুক কিন্তু তুই জানিস ঠিক কতটা অন্ধকার আছে প্রতিটা লোকের ভিতর।তারা খারাপ, দয়া-মায়াহীন। তার থেকে ও বড় অন্ধকার হলো অশুভ পাপাচারে লিপ্ত গ্যাংস্টার বস।
এনি ভাবনার মধ্যেই ডিভানে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে।
নিক বারান্দায় এসে রিমোটের মাধ্যমে প্রতিটা কাউচ তুলে দেয়। মুহূর্তেই দিনের আলো প্রবেশ করে বিশাল বেলকনির কাণায় -কাণায়। নিক রুমের দিকে এক পলক তাকিয়ে রুমের সামনে কালো পর্দাগুলো টেনে দেয়। এমন ভাবে টেনে দেয় যাতে রুমে সামান্য আলোও ঢুকতে না পারে।
বারান্দার প্রান্তদেশে রাখা বিশালাকৃতির চেয়ারে বসে আছে গ্যাংস্টার বস।
দেহভঙ্গিতে অনড় আধিপত্য। দৃষ্টিতে নিস্তব্ধ হিংস্রতা ভেসে উঠেছে । দেয়ালের প্রান্তে ধাক্কা খাচ্ছে।
নিকের সামনে বিস্তৃত একটি পুরোনো মানচিত্র।ভাঁজে ভাঁজে জমে থাকা লালচে দাগ। দেখেই বুঝা যাচ্ছে অতীতের অপরাধচিহ্নে মোড়া কোনো ভূখণ্ড।
মানচিত্রের পাশে ছড়িয়ে আছে টুকরো টুকরো কাগজ
অসম্পূর্ণ পরিকল্পনা, অর্ধেক নাম,
আর কিছু নীরব সিদ্ধান্ত। জানা নেই এই কাগজ গুলো ঠিক কি? কারোর জীবন দানে নাকি জীবন বিনাশে!
কাউচের ছোট টেবিলে সাজানো রয়েছে কাচের বোতল। বিদেশি মদ, কোকেইন, আরও অনেক কিছু
নিক ম্যাপের দিকে তাকিয়ে সোজা হয়ে বসে। মাথা ঠান্ডা করার জন্য ওয়াইনের বোতলের দিকে তাকায়। কিন্তু কেনো জানি সব কিছু বিরক্ত লাগছে। রাগে শরীর কাঁপছে তার। কিন্তু রাগটা কি কারনে সেটা গ্যাংস্টার বস নিজেও জানেন না। চোখ বন্ধ করে ডিভানে গা এলিয়ে দেয়। বুক চীরে যেন বেরিয়ে আসে,
” পাখি আমার নিঠুর বড় মন ও বুঝে না। আমার ভাঙ্গা খাঁচা পড়ে আছে সে তো আসে না। পোড়া মনে ভালোবাসার বাসা বাঁধে না।
অধিরাজ আর দুইজন গার্ড বাগান বাড়ির বদ্ধ রুম থেকে দুইটা বিশাল বক্স বের করে। পুরো বক্স স্টিলের লাল রঙ্গের ছিলো। উপরে কিছু লিখা ছিলো। কি লেখা সেটা বুঝা মুশকিল।
অধিরাজ গার্ডকে ইশারা দিয়ে বলে,
” এইগুলো সোজা প্রাইভেট জেটে নিয়ে চলো। বস বলেছে এক ঘন্টার ভিতরে যাতে সব থাকে সেখানে। উনি রাতে সব চেক করবে। আরিশ স্যার দেশে আসলেই বাকি কাজ করা হবে।
গার্ড মাথা নাড়িয়ে বক্স দুইটা নিয়ে চলে গেলো। অধিরাজ কাউচের উপর থেকে গ্লাস নেয় পানি খাওয়ার জন্য। কিন্তু আচমকা কেউ গ্লাসটা হাত থেকে টেনে নিয়ে যায়। অধিরাজ দাঁত পিষে তাকায় সেদিকে। নাজলী বাহিরের দিকে তাকিয়ে বলে,
” বক্সে কি ছিলো এইসব?
অধিরাজ বিরক্তি হয়ে বলে,
” সেটা না জানলে ও চলব।
” কেনো জানবো না? নিশ্চই কোনো মানুষ নিয়েছেন তাই না?
” মানুষ নেওয়ার হলে এইভাবে লুকিয়ে নিতে হবে না। গাড়িতে ডুকাব আর টর্চার সেলে নিয়ে গলাটা আলাদা করব। ব্যাস কাহিনী খতম।
নাজলী ঘৃনায় নাক -মুখ কুচকে ফেলে,
” কি নিয়ে গিয়েছেন তাহলে?
” ভিবিন্ন অস্ত্র আর ড্রাগস! ড্রাগস নিবেন? সামান্য নিবেন দশ দিন অজ্ঞান হয়ে থাকবেন। বললে এনে দিতে পারি।
নাজলী শক্ত দৃষ্টিতে তাকায়। অধিরাজ পানির গ্লাসটার দিকে এক পলক তাকিয়ে বিরক্তির নিশ্বাস ছাড়ে। পানি পান করার প্রয়োজন মনে করলো না। চলে যেতে যাবে এমন সময় নাজলীর কথায় কপাল কুচকে ফেলে।
” ক্রিমিনাল বেডা কোন গুহায় ডুকেছে বলতে পারবেন?
অধিরাজকে এইভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে নাজলী চোখ ছোট ছোট করে বলে,
” নিজের স্যারকেই ভুলে গেলেন?
অধিরাজ তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বলে,
” হুট করে স্যারের খুঁজ করছেন যে?
নাজলী হালকা লাজুকতা নিয়ে বলে,
” স্বামীর খোঁজ না করলে কি চলে দেবর – জি?
অধিরাজ কাঁশতে গিয়েও থেমে যায়। নাজলী বাঁকা হেসে লাজুকতা নিয়েই বলে,
” একটা ফোন দিবেন আপনার স্যারকে?
অধিরাজ গম্ভীর গলায় বলে,
” স্যার এখন ব্যস্ত আছে।
নাজলী আহত গলায় বলে,
” কোথায় আছে?
” ইতালি।
নাজলী শান্ত চোখে তাকিয়ে বলে,
” আপনার স্যারকে একটা ফোন দিন।
” বললাম তো ব্যাস্ত আছে।
” নিজের স্ত্রী -সন্তানের থেকে ব্যস্ত আর কিছু নেই।
অধিরাজ অবাক হয়ে বলে,
” সন্তান!
নাজলী সামান্য কেঁশে নিজেকে স্বাভাবিক করে নেয়। মাথা নিচু করে বলে,
” আপনি চাচ্চু হতে চলেছেন অমাবশ্যা সাহেব। আর আপনার স্যার বাবা। সংবাদটা পাঠানোর জন্য মরিয়া হয়ে আছি। একটু ফোন দিন – না।
অধিরাজ কথা বলতেও ভুলে যায়। হা করে তাকিয়ে থাকে নাজলীর দিকে। স্যারকে মেয়ে দিয়েছে শত্রুদের হাত থেকে বাঁচাতে। অথচ স্যার মেয়েটাকে নিজের বাচ্চার মা বানিয়ে দিয়েছে! আশ্চর্য হারবাল সেবন করে তারা। একজন মা বানানোর জন্য যুদ্ধ করছে। আরেকজন চুপি-চুপি অলরেডি বানিয়েও দিয়েছে। আর এদিকে আমি এক হতভাগা কাজের চাপে নিজের না হওয়া বউটার সময় পর্যন্ত নিতে পারছি না। সৃষ্টি কর্তা তুমি বিচার কইরো।
অধিরাজকে এমন হা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নাজলী ঠোঁট চেপে হাসি। আহত গলায় বলে,
” কি হলো অমবশ্যায় ঢেকে যাওয়া দেবর-জী, ফোন দিবেন না নিজের স্যারকে?
অধিরাজ পকেট থেকে ফোন বের করে। আরিশের নম্বরে ফোন দিয়ে মোবাইল এগিয়ে দেয়। নাজলী ফোনটা হাতে নিয়ে বিরবির করে বলে,
” তর জীবনটাকে আমি জ্বালিয়ে মারব ক্রিমিনালের বাচ্চা। দেশের বাহিরে ও তকে শান্তিতে থাকতে দিব না।
সময়ের ব্যবধানে পরিচিত ব্যক্তির কন্ঠস্বর ভেসে আসে,
” হুম অধিরাজ বল।
নাজলী গলা কেঁশে কান্নার সুরে বলে,
” কেমন আছেন স্বামীজান? নিজের বউকে বলে গেলে কি হত? ইশশ কত চিন্তা করছিলাম জানেন?
নাজলীর গলা পেতেই আরিশ চেঁচিয়ে উঠে,
” তুমি? অধিরাজের ফোন তোমার কাছে কেনো? আর… অধিরাজ কোথায়?
নাজলী চোয়াল চেপে ধরে পাল্টা ধমকায়,
” আস্তে চেঁচা বাল। কানে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার ধান্দা করছেন নাকি?
আরিশ দাঁত পিঁষে বলে,
” তুমি সারাজীবনের জন্য কালা হলে খুশি হতাম। স্টুপিট!
আরিশ রাগে ফোনটা কাটবে তার আগেই নাজলী লজ্জা নিয়ে বলে,
” নিজের সন্তানের মায়ের সাথে কেউ এইভাবে কথা বলে?
আরিশ কপাল কুচকে বলে,
” সন্তানের মা কে? আর সন্তান কে?
নাজলী ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে বলে,
” সন্তান আমার পেটে আর আমি আপনার সন্তানের মা।
আরিশ বসা থেকে দাঁড়িয়ে যায়। আবার ও চেঁচিয়ে উঠে,
” হুয়াট! পাগল হয়ে গিয়েছো তুমি?
” আমি মা হতে চলেছি খুশি হন নি আপনি?
আরিশ চোয়াল শক্ত করে ধমকে উঠে,
” যাস্ট স্টপ ইট ফাকিং গার্ল। এইসব কথা বলার দায়ে সামনে থাকলে খুন করতাম। আমি তোমার সন্তানের বাবা হতে যাব কেনো?
নাজলী ভাঙ্গা গলায় বলে,
” যেভাবে আমি মা হয়েছি।
আরিশ ধমকে বলে,
” মিথ্যে অপবাদ দিলে খুন করব। একবারের জন্য ও কাছে যায় নি তোমার। সন্তান আসবে কোথা থেকে!
নাজলী ফুঁপিয়ে উঠে,
” মিথ্যে কেনো বলছেন? চুমু খান নি আপনি আমাকে?
” সামান্য চুমু খেলে কেউ প্রেগন্যান্ট হয়ে যায় লাইক সিরিয়াসলি? তোমাকে….
আরিশকে সম্পূর্ন কথা বলতে না দিয়েই কান্না করে বলে,
” আপনি এই সন্তানকে অস্বীকার করতে পারেন না হাফ ল্যাডিসের বাপ। এইটা আপনার ভালোবাসার অংশ। আপনার অস্তিত্ব সে। তাই তো এমন হাফ ল্যাডিস। সে ও আপনার মত ঝগড়ুটে হবে মেয়েদের মত। কোনো এক রাতে আপনার করা পাগলামোর অংশ সে। আপনার হয়ত খেয়াল নেই। একদিন রাতে কিছু-মিছু হয়েছিলো। ভুল করে চলে আসে আমার গর্ভে। আপনাকে জানাবো না ভেবেছিলাম। অথচ প্রেগন্যান্ট হয়ে যায় না চাইতেও। আপনি অস্বীকার করলে আমার মরণ ছাড়া কোনো উপাই নেই আক্কাসের বাপ। দেয়ালে মাথা ঠুকতে হবে স্বামীজান। আপনি মেনে নিন। আপাযত রাখছি। কান্নার জন্য কথা বলতে পারছি না। নিজের খেয়াল রাখবেন। পারলে বাচ্চার জন্য একটু দোয়া করবেন।
নাজলী আরিশকে কিছু বলতে না দিয়ে ফোন কেটে দেয়। অধিরাজের কাছে ফোনটা দিয়ে কান্নার অভিনয় করতে করতে রুমের ভিতরে চলে যায়। আগুন একটা লাগিয়ে দিয়েছে, এখন সেই আগুনে চিন্তিত হয়ে জ্বলে -পুড়ে ছাই হবে ক্রিমিনালের বাচ্চা।
এইদিকে অধিরাজ আহাম্মকের মত দাঁড়িয়ে আছে। নাজলীর মুখে বাচ্চাদের নাম শুনে হতভম্ভ সে। মেয়েটার কান্না কিছুটা খারাপ ও লাগলো। এদিকে আরিশের ফোন বাজছে। অধিরাজ ইচ্ছে করে ফোন রিসিভ করে নি। যা হবে সামনাসামনি হবে। দিয়েছিলো হেফাযত রাখতে অথচ এক চান্সেই মা বানিয়ে দিয়েছে! আশ্চর্যনক হারবাল খায় তাহলে!
রাস্তার এক প্রান্তে ব্যস্ততা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রমণী।
চারপাশের কোলাহল উপস্থিতি ঢেকে রাখলেও,
তার দৃষ্টি বারবার ছুটে যাচ্ছে দূরের সেই নির্জন বাড়িটির দিকে। চোখে জমে ওঠেছে এক রাশ অস্থিরতার ছায়া। প্রতিটি ক্ষণ অপেক্ষার ভারে তাকে আরও দিশেহারা করে তোলছে।
কারও আগমনের আশায় স্থির দেহটা ও যেন ভেতরে ভাঙতে থাকা এক নীরব উৎকণ্ঠা হয়ে উঠতে চাইছে। রমণীর কাছে মনে হচ্ছে সময় থেমে যেন আছে। আর সে একাই দাঁড়িয়ে আছে প্রতীক্ষার নিষ্ঠুর প্রহরে।
টানা চল্লিশ মিনিট পর দেখা মিললো কাঙ্খিত মানুষটিকে। খুশিতে প্রফুল্ল হয়ে উঠে নারীর মন -মস্তিষ্ক। ইচ্ছে করছে এক দৌঁড়ে গিয়ে পুরুষটিকে জড়িয়ে ধরতে। আর বুকে মুখ লুকিয়ে অভিমানী গলায় বলতে,
” এত কাজ তোমার রাজ, একটু খোঁজ নেওয়া যায় না?
রমনী কথাটা মনে করেই অভিমানে মন ভাড় হয়ে উঠে। পুনরায় অধিরাজের দিকে তাকাতেই দৃষ্টি মিললো তার। অধিরাজ যেন প্রচুর অবাক হয়েছে নিজের প্রেয়সীকে এই মুহূর্তে এখানে দেখে। দৃষ্টিতে মিলন ঘটলেও দীর্ঘক্ষণ তৃষ্ণার্ত দৃষ্টি বিনিময় ঘটলো না। ফোনের রিংটনে তানভী নিজের হাতের দিকে তাকায়। মেহেরের ফোন দেখে দ্রুত রিসিভ করে। ফোন রিসিভ করতেই ভেসে আসে মেহেরের অধৈর্য কন্ঠস্বর,
” আপু তুমি কি আজ অধিরাজ ভাইয়ার সাথে দেখা করতে গিয়েছো?
তানভীর চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম। সে যে এখানে আসবে সে নিজেও জানত না। এই বিচ্ছু জানলো কিভাবে? তানভী শিনা টান টান করে দাঁড়িয়ে বলে,
” একদম এই না। যে আমাকে মনে রাখে না আমি তার সাথে দেখা করতে আসব কোন দুঃখে।
ফোনের ওপাশ থেকে শুনা গেলো মেহেরের প্রানবন্ত হাসির শব্দ,
” যে দুঃখে আমার পালোয়ান ভাইয়ের প্রেমে পড়েছো ঠিক সেই দুঃখে যাবে।
তানভী বিরবির করে বলে,
” পালোয়ান না ছাই।
মেহের দুষ্টু হেসে বলে,
” এখন তুচ্ছ করছো। সামলাতে পারবে তো তখন?
তানভী লজ্জায় হাঁশ-ফাঁশ করে উঠে। আশ্চর্য এদের কি লজ্জা নেই? কিন্তু আমার এত লজ্জা করছে কেনো।
তানভী সামান্য রাগী গলায় বলে,
” মেহের!
মেহের শব্দ করে হেসে উঠে। তানভী কপাল কুচকে বলে,
” ইতনা জ্যাদা মত হাসো, বহেন। মেরা ওয়ালা ছোড় দো। তুমি যাকে ভালোবেসে উন্মাদ আদ’ও জানো তার সম্পর্কে। নিজে সামলাতে পারবি?
মেহেরের হাসি থেমে যায়। তানভী ঠিক বুঝতে পারছে ঠিক জায়গায় মেডিসিন দিয়েছে। মেয়েটা এখন লজ্জায় মরে যাবে। তানভী দীর্ঘশ্বাস টেনে নিশ্বব্দে হাসলো। চোখ তুলে দেখে অধিরাজ তার দিকে এগিয়ে আসছে। লোকটা কি এতক্ষন দাঁড়িয়ে তাকেই পর্যবেক্ষণ করলো নাকি! তানভী গম্ভীর গলায় বলে,
” কেনো ফোন দিয়েছিলি?
মেহের শান্ত গলায় বলে,
” আপু, আমি মিনারে যেতে চাই আবার।
তানভী অবাক হয়ে বলে,
” তুই পাগল মেহের? আরিশ ভাইয়া নেই এখানে। উনার অনুপস্থিতিতে তুই বাহিরে বের হওয়া বিপদজ্জনক।
” শান্ত হও আপু। আরিশ ভাইয়া নেই কিন্তু অধিরাজ ভাইয়া আছে। তুমি উনাকে বুঝাও প্লিজ।
” আমি কিভাবে বুঝাব?
” আপু আমি জানি তুমি আজ দেখা করতে গিয়েছো। সেজন্যই তোমাকে ফোন করলাম।
তানভী ভ্রুঁ কুচকে বলে,
‘ তুই এত অধৈর্য হয়ে আছিস কেনো?
মেহের শান্ত গলায় বলে,
” আপু ওইদিন মিনারে একটা মেয়েকে দেখেছি। তুমি তো চলে এসেছিলে। মেয়েটা অসম্ভব সুন্দর ছিলো। আমি একজন মেয়ে হয়ে ও ওর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ছিলাম। কিন্তু আশ্চর্যের কথা সে আমাদের বিষয়ে অনেক জানে। যতটুকু বুঝলাম মেয়েটা শত্রুর কবলে পড়েছে হয়ত। তাই নিক মিনারে জায়গা দিয়েছে। হয়ত তাদের কোনো পরিচিত। শুধু এইটাই দেখতে যাব মেয়েটা চলে গিয়েছে নাকি এখনও আছে?
তানভী আশ্চর্য হয়ে বলে,
” কিন্তু মেহের স্যার তো মেয়েদের সহ্য এই করতে পারে না। গ্লাস মিনারে মেয়ে আসলো কিভাবে?
মেহের তপ্ত শ্বাস ফেলে বলে,
” এইটা গ্লাস মিনার হলেও সেটা অন্ধকার এক জগৎ। হয়ত তাদের কোনো প্রয়োজনীয় কাজের জিনিস এই মেয়ে। তাই এইভাবে লুকিয়ে রেখেছে।
তানভী আনমনেই বলে,
লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৩৭
” হয়ত। কিন্তু কেনো জানি অদ্ভুত সন্দেহ হচ্ছে।
অধিরাজ ততক্ষণে চলে আসে তানভীর সামনে। তানভী মেহেরের উদ্দেশ্যে বলে,
” তর সাথে পরে কথা বলছি। আর বিষয় নিয়ে আলোচনা করে দেখি, রাজি করাতে পারি কি -না।
