Home লাভ বাই দ্যা ভিলেন লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৪৯

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৪৯

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৪৯
লিজা মনি

এনির জ্ঞান ফিরেছে প্রায় তিন ঘন্টা পর। শরীরের রক্তগুলো দেখে আবারও মাথা চক্কর মারে। কোনোরকম উঠে দ্রুত শাওয়ার নিয়ে নেয়। নিককে রুমে দেখতে না পেয়ে এনির কপালে ভাঁজ পড়ে। এতগুলো আঘাত নিয়ে লোকটা কোথায় গেলো? এনির হুট করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু কেনো কাঁদতে ইচ্ছে করছে জানা নেই। কাল রাতের ঘটনাগুলো মনে হতেই শরীর শিউরে উঠে। নিকের উপস্থিতি খুব ভয় কাজ করছে তার মনে। লোকটা আসলেই একটা বিকৃত মস্তিষ্কের সাইকোপ্যাথ। নাহলে আর যায় হোক, নিজের শরীরের রক্ত কেউ এইভাবে নষ্ট করে না। জীবন্ত অবস্থায় কিভাবে এতটা আঘাত করতে পারে নিজের শরীরে! প্রতিটা মর্মান্তিক ঘটনা মনে হতেই এনি কেঁপে উঠে। শুকনো ঢোক গিলে। চোখ বন্ধ করে বড় বড় নিশ্বাস টানে।

বেলকনির দরজা খুলা দেখে হকচকিয়ে উঠে। এই দরজা খুব সহজে খুলে না। আলো-বাতাসে যাওয়া এনির জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এইটা জেলাসি নাকি আধিপত্য! উনি যদি পারতেন তবে নিশ্বাসটাও তার নিয়ন্ত্রনে নিয়ে নিত। এনি চোখের পানি মুছে অজান্তেই বেলকনির দিকে এগিয়ে যায়। সামান্য উঁকি দিতেই আরেক টাস্কি খায়। নিক ডিভানের সাথে হেলান দিয়ে মেঝেতে বসে আছে। দৃষ্টি তার মেঝের দিকে। হাতে একটা কাচের বোতল। বোতলটা হুইস্কির সেটা আর এনির বুঝতে বাকি নেই। এখনও সেই অর্ধ উলঙ্গ শরীর। চাবুকের এক একটা আঘাত কালচে হয়ে ভেসে উঠে। রক্তগুলো জমাট বেঁধে কালো হয়ে গিয়েছে। ঘাড় পর্যন্ত চুলগুলো এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে। এনির নিশ্বাসের ঘনত্ব বেড়ে যায়। দুই হাত দিয়ে দেয়াল শক্তভাবে চেপে ধরে। তার শরীর কাঁপছে অসম্ভবভাবে। নিচের ঠোঁট শক্তভাবে কামড়ে ধরে চোখ বন্ধ করে ফেলে। ভয় করছে সামনে এগিয়ে যেতে। মন বলছে একবার যাও আর মস্তিষ্ক বলছে কি প্রয়োজন যাওয়ার! এই লোকটা খারাপ, জানোয়ার রুপী মনস্টার! যা করেছো বেশ করেছো। পাপের সামান্য শাস্তি দিয়েছো মাত্র। এই লোকের তো আরও শাস্তি পাওয়া উচিত। মরণ যন্ত্রনা ভোগ করে তিলে তিলে মারা উচিত। কিন্তু মন কেনো এগিয়ে যেতে চাইছে। কেনো এই অবাধ্য মন মস্তিষ্কের ভাষাকে পরিত্যাগ করতে বলছে?

এনি চট করে চোখ খুলে ফেলে। কোনো কিছু না ভেবে নিকের দিকে এগিয়ে যায়। নিকের সামনে দাঁড়িয়ে কিছু বলতে যাবে তার আগেই থেমে যায়। মনে হচ্ছে কন্ঠনালীতে কেউ চেপে ধরে রেখেছে।গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বের করতে পারছে না। এনি ঠোঁট ভিজিয়ে শ্বাস টানে নিজের। এতটা অস্থিরতা কাজ করছে কেনো তার ভেতরে?
এনি আবারও কিছু বলতে যায়। কিন্তু তার আগে কারোর চোখ দেখে থমকে যায়। ধূসর বাদামী চোখ দুইটা অসম্ভব লাল হয়ে আছে। কপালে ঘামে ভিজে গিয়েছে। গোলাপি ঠোঁটে এখনও রক্ত লেগে আছে। এনিকে দেখে নিক ঠোঁট কামড়ে ধরে বলে,

” এখানে এসেছো কেনো?
নিকের এই গভীর কন্ঠে কিছু একটা আছে। এতটা উন্মাদ আর বেপোরোয়া লাগছে কেনো? অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে যদি কিছু হয়ে যায়! এনি চোখের পাতা ঝাপ্টায়,
” আপনার চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
এনি ভ্রুঁ নাচিয়ে বলে,
” হুয়াই বেবিগার্ল?
এনির রাগ হলো প্রচুর। এত প্রশ্নের উত্তর সে দিবে কিভাবে? এত কাটাছিড়া শরীরে অথচ ভ্রুঁ ক্ষেপ নেই। এনি অস্থির গলায় বলে,
” আপনার শরীর থেকে অনেক রক্তক্ষরণ হয়েছে।
“গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান ডাজ নট নিড মেডিক্যাল ট্রিটমেন্ট মাই ফ*কিং ব্লাড রোজ।
এনি গভীর দৃষ্টি রাখে নিকের উপর। নিক নিজের নিয়ন্ত্রনে নেই। কেমন নেশাময় লাগছে মুখখানা। এনি শান্ত সুরে বলে,

” ড্রাগস নিয়েছেন?
নিক ঠোঁট কামড়ে হেসে বলে,
” ভেতরের জ্বালা কমানোর তো প্রয়োজন ব্লাডরোজ।
” কিসের এত জ্বালা আপনার?
নিক হুইস্কির বোতলটা শব্দ করে রাখে। এনি নিজের নাক চেপে ধরে শক্তভাবে। নিক হাসলো সামান্য। বসা থেকে উঠে দাঁড়ায় গ্যাংস্টার বস। এনির দুইটা বাহু ধরে এনির দিকে ঝুঁকে পড়ে। গলার খাঁদ নামিয়ে বলে,
” তোমার ঘৃণার চাহনি। তোমার -চোখ, মুখ সব আমার ভেতরে জ্বালা দেয়।মুলত এই পুরো অস্তিত্ব আমাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে গ্যাংস্টার বস। যার হুংকারে সম্রাজ্য থমকে যায় সে থমকে যাচ্ছে কারোর উপস্থিতিতে।
এনি নিকের পুরো মুখের দিকে তাকায়। গালে হাত রেখে শীতল চাহনি নিক্ষেপ করে বলে,
” ধ্বংস হয়ে যাচ্ছেন?
” ইয়েস।

এনি নিকের কাটাস্থানে আঙ্গুল চেপে ধরে বলে,
” ধ্বংস তো আপনি সেদিন এই হয়েছেন যেদিন এই পাপের সম্রাজ্যে ডুকেছেন। যেদিন অন্ধকারকে নিজের জগত হিসেবে বেছে নিয়েছেন। নতুন করে আমি আবার কি ধ্বংস করব?
নিক এনিকে ধ্বাক্কা মেরে সরিয়ে দেয় নিজের কাছ থেকে। নিজের চুল খামছে ধরে ঘন ঘন শ্বাস টেনে বলে,
” পাপের সম্রাজ্য আমাকে ধ্বংস করেনি। এই জগত আমার পরিচয়। আমার জীবনের সবটা জুড়ে এই দুনিয়াকে কেন্দ্র করে।
এনি পড়ে যেতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিলো। অযথা কথা বলার আর প্রয়োজন বোধ করলো না। নিকের হাত শক্তভাবে চেপে ধরে বলে,
” ভেতরে চলুন। আপনার সাথে এই অবস্থা মানায় না।
নিক গ্রিবাদেশ নাড়িয়ে বলে,
” সুন্দর লাগছে না?

এনি চট করে তাকায় নিকের চোখের দিকে। লোকটার সৌন্দর্যের বর্ণনা দেওয়ার সাধ্য তার নেই। ঠোঁটের নিচে ঠিক মাঝখানের তিলটা এনিকে চুম্বকের মত টানে। এই জায়গা দেখলে এনি মাতাল হয়ে পড়ে। এই লোক সুন্দর। এনির ভাষায় এই লোক বাহ্যিক ভাবে সব সৌন্দর্য ধারন করে আছে। ভেতরের অন্ধকারটার কারনে লোকটা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বাহ্যিক সৌন্দর্য দিয়ে কি হবে?
এনি শক্ত গলায় বলে,
” বন মানুষের মত দেখা যাচ্ছে।
” লাগুক। তোমার এই।
এনি অবাক হয়ে বলে,
” কি আমার’ই?
” আমি তো তোমার এই ব্লাড রোজ। নরপশু, জানোয়ার, মনস্টার, বনমানুষ যায় বলো।
এনির শরীর শিরশির করে উঠে। এতটা কঠিন কেনো এই ভাষা গুলো? এনির মনে হচ্ছে গলা শুকিয়ে আসছে। নিজেকে সংযত করে নিকের হাত ধরে রুমের ভেতরে যেতে যেতে বলে,

” কোনো বনমানুষ আমার হতে পারে না?
” ইউ শুড’ন্ট লাই লাইক দিস, ব্লাড রোজ। আই অ্যাম এভরি গার্ল’স ড্রিম। এক রাতের বেড পার্টনার হওয়ার জন্য মেয়েরা উৎপাত হয়ে বসে আছে।
এনি চোখ পাকিয়ে তাকায় নিকের দিকে। নিক ঠোঁট কামড়ে বলে,
” আর ইউ জেলাস বেবিগার্ল?
এনি শক্ত গলায় বলে,
” এইসব জেলাসি আমার আসে না। আপনি কোন মেয়ের সাথে রাত কাটিয়েছেন এইসব দেখা আমার কর্ম নয়।
নিকের কপালে ভাঁজ পড়ে। বিরক্তির ছাপ নিয়ে বলে,
” রাত কাটিয়েছি কখন বললাম?
” রাত না কাটালে বুঝলেন কিভাবে মেয়েরা মরিয়া হয়ে আছে? একজনের সাথে কাটিয়েছেন পড়েই তো আরেকজন চেয়েছে।
নিক রাগে চোয়াল পিষে,

” শালার মেয়ে জাত। এক লাইন বললে দশ লাইন বেশি বুঝে।
এনি কিছু বললো না। নিককে বিছানায় বসিয়ে একটা বড় পাত্রে পানি নিয়ে আসে। একটা নরম টাওয়াল হাতে নিয়ে পানিতে ভেজায়। নিক কপাল কুচকে তাকিয়ে আছে। ভেজা টাওয়ালটা নিকের বুকের উপর রাখতেই নিক হাত সরিয়ে দেয়। শক্ত গলায় বলে,
” কি করছো এইসব?
এনি আবারও বুকে রাখে টাওয়েল। শরীর মুছে দিতে দিতে বলে,
” পুরো শরীর জঘন্য হয়ে আছে। এইসব নিয়ে বাহিরে গেলে সবাই ভাববে আমি আপনাকে একা রুমে নির্যাতন করি। তারা তো আর আসল ঘটনা জানে না।
নিক এনির কোমর জড়িয়ে ধরে। এনির বুকে নাক ঘষে বলে,
” আমার পুরো শরীর কেটে ফেললেও কেউ আটনোর সাহস নেই। আর এইসব নিয়ে প্রশ্ন করাটা অনেক বড় বিলাসিতা বেবিগার্ল।
এনির হাত থেমে যায়। নিকের গরম নিশ্বাস পুরো শরীর কেঁপে উঠে। এনি এতটুকু বুঝেছে লোকটার শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। শরীরের তাপে এনির এসির মধ্য থেকেও ঘেমে যাচ্ছে। এনি আতঙ্কিত গলায় বলে,

” মুখ সরিয়ে নিন।
নিক আরও চেপে ধরে,
” উহুম।
এনি ছটফটিয়ে উঠে। রাগে কান্না করতে ইচ্ছে করছে এই মুহূর্তে। এই লোক কি জীবনেও শান্তি দেবে না।
এইভাবে থাকলে শরীর মুছে দিবে কিভাবে? এনি তবুও বহু কষ্টে পুরো শরীর মুছে দেয়। কাটা স্থানে মলম লাগিয়ে দুরে সরে আসে। বুকে হাত গুঁজে সিরিয়াস হয়ে বলে,
” জেড আপনার কি হয়?
গ্যাংস্টার বসের চোখ চিকচিক করে উঠে। চোখ বন্ধ করে বলে,
” ভাই।
” আপন?
” আমার আপন বলতে কেউ নেই।
” আপন না হলে এইভাবে পুষে রেখেছেন কেনো? দিনের পর দিন অন্যায় করে গিয়েছে অথচ চুপ থেকেছেন কেনো? মেয়েগুলোকে যখন নিজের কামনা মিটিয়ে কাচা চিবিয়ে খেত তখন খারাপ লাগে নি আপনার?
নিকের চোখ হিংস্রতায় ঝলঝল করে উঠে। কাটা স্থানে মলমের স্পর্শে জ্বলছে প্রচন্ডভাবে। নিক দাঁতে দাঁত ঠেকিয়ে বলে,

” আমার ভেতরে মায়া বলতে কিছু নেই। হৃদয়ের উপর নিষ্ঠুরতার প্রলেপ পড়ে গিয়েছে। পাথরের থেকেও জঘন্য আমি।
এনি শ্বাস ফেলে বলে,
” মেয়েগুলোর জায়গায় যদি আমি থাকতাম?
নিক সাথে সাথে এনির দুই হাত খামছে ধরে। এনি ব্যাথায় মৃদু চিৎকার দিয়ে উঠে। রাগের উন্মাদনায় গর্জে উঠেন গ্যাংস্টার বস,
” ফা*ক অফ! ডোন্ট ইভেন সে ওয়ার্ডস লাইক দ্যাট।
শহর জ্বালিয়ে দিব আমি। গ্যাংস্টার বসের ধ্বংসের সাথে পুরো শহর ধ্বংস হয়ে পড়বে। নিজেকে ধ্বংস করে তকে আগলে রাখছি। টাচিং ইজ আউট অব দ্য কোয়েশ্চন। নো ওয়ান ইজ অ্যালাউড টু কাম এনিওয়্যার নিয়ার।
এনির চোখ থেকে পানি পড়ছে অনবরত। ভাঙ্গা গলায় বলে,
” কে আমি? এত কেনো উন্মাদ হয়ে পড়েন?
নিকের হাত সরে যায়। এনির সামনে থেকে সরে যেতেই এনি তাচ্ছিল্য হেসে বলে,

” আমার পরিচয় হলো আমি একজন খুনি। মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে নিজের চাচাকে কেটে টুকরো টুকরো করেছি। এরপর থেকে শুরু হয় আমার বেঁচে থাকার সংগ্রাম। হাজার ও পুরুষের লালসার স্বীকার হয়েছি।
পাচার হতে যাচ্ছিলাম এক নোংরা আর বিধ্বস্ত জগতে। আঠারো জন মাফিয়ার সামনে নিলামে উঠেছি। প্রতারণার মধ্য দিয়ে গ্যাংস্টার বসের রক্ষিতা হয়েছি। আমি আনাস্তাসিয়া এনি। মাত্র তেরো বছর বয়সে বাবা -মাকে হারিয়ে সর্বহারা হয়ে যাওয়া এক রমণী। একসময় সামান্য শব্দে ভয়ে মুচড়ে যেতাম। থমকে যেত আমার হৃদস্পন্দন। আর এখন আমি’ই হাজারটা শব্দ তৈরি করি। ভয় পায় তবুও, বার বার হাত রক্তাক্ত করে ফেলি। একদিনে লক্ষ বছরের কষ্ট সয়েছি আমি। প্রতিনিয়ত ভয়ে মুচড়ে যেতাম কখন আমার ইজ্জতে এসে হামলে পড়বে। প্রতিঘাত করেছি যারা আমার দিকে হাত বাড়িয়েছে।

মৃত্যু দিয়েছি তাদের। নিজের বুকে জমে থাকা কষ্ট আর আর্তনাদগুলোকে আকাশে উড়িয়ে দিয়েছি। নিজেকে এতটা শক্ত রেখেছি যে যাতে ভেঙ্গে না পড়ি। একবার ও জানতে চেয়েছেন, বাচ্চা মেয়েটাকে যে বিয়ে করেছি সে কেমন আছে? এতটা বয়স তো আমার হয় না। যতটা নিষ্ঠুরতার সম্মুখীন হয়েছি এইসব মোকাবেলা করার বয়স কি আমার হয়েছে? স্বামী হয়ে কোনোদিন মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছেন? চোখের পানি মুছে দিয়ে কোনোদিন বুকে জড়িয়ে নিয়েছেন? একটা কাগজে স্বাক্ষর করলেই কি স্বামী হওয়া যায়? আপনি আমার স্বামী নন। বাবা -মা থাকলে এতটা সংগ্রাম আমি কখনোই করতাম না। আ..মার পরিচয় এইটা..
এনির কন্ঠ ভেঙ্গে আসে। শরীর কাঁপছে তার অসম্ভবভাবে। মুখ চেপে ধরে নিজেকে নিয়ন্ত্রন করতে থাকে। নিক এনির মাথাটা নিজের মাথাটা নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে। ঘন ঘন নিশ্বাস টেনে অস্ফূর্ত আওয়াজে বলে,
” কি চাই তর বউ? একবার শুধু বল। শহর ধ্বংস করে হলেও আমি সেই সুখ তর পদতলে এনে দিব।
নিকের উষ্ণ আলিঙ্গনে রমণী আরও নেতিয়ে পড়ে। চোখ বন্ধ করে বলে,

” পারবেন না দিতে?
” একবার বল।
” আমার সব কথা শুনতে হবে। পারবেন?
নিক ঠোঁট কামড়ে ধরে বলে,
” দিনটা তোমার নামে লিখে দিব যদি রাতটা আমার নামে হয়।
এনির নাক-মুখ কুচকে আসে।
” প্রয়োজন নেই।
” আমার প্রয়োজন পড়লে নিজেই নিতে জানি আর কি চাই?
” আমি যা চাই সেটা আপনি ইহকালে কখনো দিবেন না। এই জীবনে কোনোদিন আমার মুক্তি হবেও না।
নিকের চোখ -মুখের রং পাল্টে যায়। তীব্র ক্ষোভে বুক থেকে এনিকে সরিয়ে দেয়। এনির চোয়াল চেপে ধরে বলে,
” মুক্তির কথা ভাবলে জ্যাঁন্ত কবর দিয়ে আসব। একবার তো বাঁচিয়ে নিয়েছি। পরের বার সেই টুকুও করব না।
নিক সবটা রাগ নিয়ে কাবার্ডের কাছে যায়। হাত পুরোটা ব্যান্ডেজ করা। কাপড় ও স্পর্শ করতে পারছে না। মেজাজ আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠে। এনি চুপচাপ কাবার্ডের কাছে গিয়ে নিকের ফর্মাল ড্রেস বের করে। এরপর নিকের কাছে দিয়ে বলে,

” আপনার শরীরে প্রচুর জ্বর।
নিক গম্ভীর হয়ে বলে,
” নরমাল।
” এই অবস্থায় বাহিরে গেলে অঘটন ঘটে যাবে।
নিকের শান্ত দৃষ্টি,
” তাতে তোমার কি?
” মানুষ হিসেবে মনুষ্যত্ব দেখাচ্ছি।
নিকের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। অগ্নি দৃষ্টি নিয়ে বলে,
” মিথ্যে মায়া দেখাতে আসলে জান খেয়ে ফেলব। শুয়ে রেস্ট নাও।
এনি আহাম্মকের মত তাকিয়ে থাকে। এই কারনেই কারোর ভালো চাইতে নেই। দশ মিনিটের ব্যবধানে নিক রেডি হয়ে আসে। এনি অস্থিরতা নিয়ে আবারও বলে,

” আপনি এখন অনেক দুর্বল।
” এরপরও তোমাকে অজ্ঞান করার ক্ষমতা আছে।চলো একবার প্রমান পেয়ে যাবে।
নিকের অশালীন ইঙ্গিত বুঝতেই এনি নাক-মুখ খিঁচে ফেলে। এনি বিরবির করে নিককে গালি দেয় কয়েকটা। নিক নিজের প্রয়োজনীয় অস্ত্র নিয়ে দরজার কাছে চলে আসে।
এনি চট করে নিকের হাত ধরে অসহায় গলায় বলে,
” অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে আপনি দুর্বল হয়ে আছেন। এই অবস্থায় বাহিরে গেলে জ্বর আরও বেড়ে যাবে।
নিক রাগে দাঁত পিষে নিজের। ঘাড়ে আঙ্গুল ঘেষে। কপালে ভাঁজ ফেলে এনির দিকে তাকায়। এনির একদম কাছে এসে বলে,

” “আর ইউ শোয়িং অ্যাফেকশন, অর পুটিং অন আ ফেইক অ্যাক্ট, মাই ফাকিং ব্লাড রোজ? মিথ্যে জিনিসটা গ্যাংস্টার বস সহ্য করতে পারে না। এইসব অযথা মায়া দেখাতে আসলে শ্বাস রোধ করে মারব।
এনি কি সত্যি মিথ্যে মায়া দেখাচ্ছে? সামান্য হেসে বলে,
” মারতে পারবেন?
” চ্যালেঞ্জ করছো?
এনি আত্নবিশ্বাসের গলায় বলে,
” আমাকে আপনি মারতে পারবেন না নিক জেভরান। মারার হলে বহু আগেই মেরে ফেলতেন। অসংখ্য বার আপনার ভয়ানক রাগের স্বীকার হয়েছি। আমার জায়গায় অন্য কেউ হলে হয়ত তাকে রাগের উন্মাদনায় কেটে ফেলতেন। অথচ আমাকে যখন মারেন নি, তখন মনে হয় না আর জানে মারবেন।

মেহেরকে আজ হসপিটাল থেকে নিয়ে আসা হয়েছে। নিক চেয়েছিলো একবার দেখতে। কিন্তু মেহেরের নিষেধ নিকের ছায়া ও যাতে তার রুমে না পড়ে। মেয়েটার চোখ কোটরে বসে গিয়েছে। মুখটা কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছে। চোখের নিচে ডার্ক সার্কেল পড়ে গিয়েছে। নির্ঘুম রাতের উদাহারন তার মলিন মুখ -খানা। সারাদিন বাহিরে উদাসীন নয়নে তাকিয়ে থাকে। রমণীর ভেতরে কি চলছে কারোর বুঝার ক্ষমতা নেই। আরিশ এই মাত্র মেহেরের কাছ থেকে নিজের বাড়িতে গিয়েছে। সেই বাড়ি যেখানে এনিকে প্রথম রাখা হয়েছিলো। এখন সেই বাড়িতে নাজলীর বসবাস। আরিশ ড্রয়িং রুমে ডুকতেই বিরক্তিতে মেঝের দিকে তাকায়। পুরো মেঝে নোংরা করে রেখেছে। নাজলী ডিভাবে বসে এটা-সেটা খাচ্ছে আর সেটা মেঝেতে ফেলছে। কোলের উপরে যেন দশ দিনের খাবার নিয়ে বসেছে। নোংরা আরিশের সব থেকে অপছন্দের জিনিস। ছড়ানো -ছিটানো কিছু দেখলে শরীর শিরশির করে তার। মেঝেতে এমন নোংরা দেখে আরিশ চোয়াল শক্ত করে বলে,

” আমার বাড়ি কি তোমার ডাস্টবিন মনে হয়?
হঠাৎ আরিশের কন্ঠস্বর পেয়ে নাজলী ভয়ে ধরফরিয়ে উঠে। সামনে আরিশের বিরক্তকর মুখ দেখে বুকে থু থু ফেলে।
একটা চিপস মুখে দিয়ে বলে,
” আপনাকেই তো ডাস্টবিন মনে হয়। আর বাড়িকে ডাস্টবিন ভাবাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এত খুঁতখুঁত স্বভাব থাকলে ক্লিন করে নিন।
আরিশ ধমকে উঠে,
” হুয়াট রাবিশ! আমি ক্লিন করব মানে?
নাজলী ভয়ে সামান্য ঢোক গিলে। এই লোকগুলোর সামনে সে বুক ফুলিয়ে কথা বলে ভাবতেই নিজেকে নিয়ে গর্ব কাজ করে। বাহিরের আবহাওয়া খুব একটা ভালো নয়। অনেক্ষন ধরে মেঘের গর্জন শুনা যাচ্ছে। এই শীতল আবহাওয়াতেও নাজলী ঘামছে। নিজেকে ধাতস্থ করে বলে,
” আপনি ক্লিন করতে পারবেন না এইটা কোনো বইয়ে লেখা আছে? সরি, সরি আপনাদের মত ক্রিমিনালের লেখা বইয়ে থাকবে কেনো? আপনাদের নাম তো ডাস্টবিনের গায়ে থাকবে।
আরিশ নিজেকে সামলাতে না পেরে ফ্লাওয়ার টবটাকে লাথি মেরে ফেলে দেয়। নাজলীর হাত ধরে দাঁড়ায় করায়। রাগে শক্ত গলায় বলে,

” ডোন্ট ক্রস ইউর লিমিট। এই পুরো বাড়িতে একা আছো এরপরও ভয় লাগে না? অযথা কথা বলে আমার মাথা না খেলে ভালো লাগে না?
নাজলী আরিশের হাত সরিয়ে নেয়। চোখে চোখ রেখে বলে,
” মৃত্যুর ভয় যখন কারোর মন থেকে চলে যায় তখন সে বাঘের গর্জনের সামনেও হাসে। যেমন আমি আপনার সামনে হাসি। আর আপনার এই পচন শীল মাথা খেতে আমি নাজলী মাইলাহ ইন্টারেস্টেড নয়। এই মাথায় শুধু জঘন্য কিছু।
নাজলী এমন-ভাবে নাক মুখ কুচকে নিলো যেন সত্যি নোংরা কিছু। আরিশ রাগে পারছে না নিজের চুল ছিঁড়ে ফেলতে। একটা মেয়ে এতটা বাচাল কিভাবে হয়? আরিশ সোফায় লাথি মেরে এই জায়গা ত্যাগ করতে চাইলো।
নাজলী বিরবির করে দাঁত পিষে,
” রে*পিস্ট একট।
আরিশ থেমে যায়। ঘাড় ঘুরিয়ে নাজলীর দিকে তাকায়। নাজলী ঠোঁট ভিজিয়ে হতভম্ভ হয়ে যায়। ও তো একদম কম আওয়াজে বলেছে। তাহলে এই লোক শুনলো কিভাবে? ওহহ নাজলী, একটু ধীরে কথা বললে কি হয় তর? এখন ঠেলা সামাল দে! আরিশ রাগ দেখালো না। নিজেকে সংযত করে বলে,

” রে*প মানে?
নাজলী চট করে বলে,
” রে*প মানে ধর্ষণ।
আরিশ দাঁত পিষে বলে,
” থাপরিয়ে জবান বন্ধ করব বিয়াদব। ধর্ষণ আর রে*প মানে আমি চিনি না?
নাজলী ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বলে,
” আপনি চিনেন? ধর্ষণ মানে বুঝলে রাতের অন্ধকারে ধর্ষককে সাহায্য করেন কিভাবে? আদ’ও অনুমান করতে পারেন এইটার মানে কি?
আরিশ বাঁকা হাসি দিয়ে শার্ট ঠিক করে। চুলে আঙ্গুল ডুকিয়ে পরিপাটি করে বলে,
” ধর্ষণ মানে জানতে চাও?
” জি বলুন।
” কর্তা একজন কর্তীর ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে হস্তে হস্ত রাখিয়া জোরপূর্বক কাপড় খুলিয়া, একটা নির্দিষ্ট বিন্দুকে কেন্দ্রে করে যে লম্ব দন্ড……..
নাজলী চেঁচিয়ে উঠে। সোফা থেকে একটা বালিশ আরিশের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলে,
” চুপ করুন অসভ্য লোক।
আরিশ সরে যায়। বালিশ গিয়ে পড়ে সিঁড়ির কাছে। নাজলীর অবস্থা দেখে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে হাসে। নিকের ফোন পেতেই নাজলীকে আদেশ করে বলে,
” পাঁ মিনিটের ভেতরে রুমে আসবে। নয়ত যে কথাটা বলতে চেয়েছিলাম সেটা তোমার উপরে যাবে।
নীরব হুমকি দিয়ে আরিশ উপরে চলে যায়।
আরিশ চলে যেতেই নাজলী ডিভানের উপর বসে ঠোঁট ভেজায়।
বিরবির করে বলে,
” নির্লজ্জতার লিমিট ছাড়া এই লোকগুলো। মুখ নয় যেন এটম বোমা। এরা সব কয়টা এক ক্যাটাগরির। যাব না আমি উপরে ক্রিমিনালের বাচ্চা!

গভীর এক রজনী। রাতের অন্ধকার নিজেই একটি জীবন্ত সত্তা হয়ে নেমে এসেছে চারপাশে।
আকাশের বুকে তীব্র বজ্রপাত ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে নীরবতার শেষ অবলম্বন। তুমুল বেগে ঝরে পড়া বৃষ্টি অদৃশ্য চাবুকের মতো আছড়ে পড়ছে মাটি আর ছাদের ওপর। বিদ্যুতের ঝলকানি ক্ষণিকের জন্য চারপাশকে উন্মোচন করে আবার গিলে ফেলছে অন্ধকারে। মেঘের গর্জন গভীর বুকফাটা শব্দে ঘোষণা দিচ্ছে প্রকৃতির অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতা।
বাতাসের তাণ্ডবে গাছপালা কেঁপে উঠছে, পাতার আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠছে রাত।
ভেজা মাটির গন্ধে বাতাস ঘন, শ্বাস নিলেই বুকের ভেতর চাপা উত্তেজনা জমে।
দূরের আলো নিভে গিয়ে চারপাশে জন্ম নিচ্ছে এক রহস্যময় শূন্যতা। প্রতিটি মুহূর্তে মনে হচ্ছে এই রাত কোনো কাহিনির অন্ধকারতম অধ্যায়।

জানালার কাছে বসে আছে এক অষ্টাদশী কন্না। দুই ঘন্টা খরচ করে সে কয়েকটা চিঠি লিখেছে। বৃষ্টির ফুটাগুলোকে অনুভব করার জন্য একটা চিঠি সম্পূর্ণ না করেই জানালার কাছে এস বসে পড়ে। তার চোখে -মুখে বৃষ্টির ফুটা এসে আছড়ে পড়ছে। বৃষ্টির পানিতে মুছে যাচ্ছে তার চোখের পানি। বিলীন করে দিচ্ছে তার চাপা আর্তনাদ গুলো। চুলগুলো বাতাসে দুল খাচ্ছে। পুরো শহর নীরব। শুধু গর্জন করছে আকাশের মেঘগুলো। মেহের নিজেকে আর টিকিয়ে রাখতে পারছে না। এই পৃথিবী সে আর সহ্য করতে পারছে না। প্রতিটা মুহূর্তকে বিষাক্ত মনে হচ্ছে। মুখ চেপে ধরে চিৎকার করে উঠে রমণী। মেঘের গর্জনের সাথে তার চিৎকারের শব্দ মিশে যায়। কেউ শুনে নি কষ্টের আর্তনাদ। মেহের এলোমেলো চুল নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। খুব ইচ্ছে করছে এই বৃষ্টির পানিতে সব কষ্ট মুছে দিতে। এই বর্ষণ হয়ত তাকে প্রশান্তি দিবে। মেহের বের হয়ে যায় রুম থেকে। বাহিরে পা রাখা তার জন্য নিষিদ্ধ। জ্ঞান হওয়ার পর কখনো একা বের হয় নি। শত্রুদের কারনে আরিশের নিষেধ মেনে চলেছে। আজ কোনো নিষেধাজ্ঞা তার মনে হয়। মনে একটু প্রাশান্তি চাচ্ছে এই মুহূর্তে গার্ড নেই আজ বাহিরে। কেমন শুনশান নিরবতা চারপাশ। মেইন ডোর খুলে বাহিরে পা রাখতেই বৃষ্টির ফোটায় ভিজে যায় তার সর্বাঙ্গ। মেহের চোখ বন্ধ করে নিশ্বাস টানে,
” একটু ভালোবাসলে কি ক্ষতি হত? খুব ভালোবাসতাম তোমাকে। আমার প্রতিটা মোনাজাতে তুমি ছিলে। অথচ আজ তুমি অন্যের দখলে। ভালোবাসা এতটা কাঁদায় জানলে কখনো ভালোবাসার সাহস করতাম না। আমাকে তুমি নিষ্ঠুরভাবে হারিয়ে দিয়েছো। এই নিষ্ঠুরতা আমি কিভাব সইব?

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৪৮

মেহের বিরবির করছে আর এগিয়ে যাচ্ছে সামনে। কোথায় যাচ্ছে তার জানে নেই। অজান্তেই বাড়ি থেকে অনেকটা দুরে চলে এসেছে সেই খেয়াল নেই তার। হুট করেই সামনে চার-পাঁচজন লোককে দেখে থমকে যায়। মেহের কিছু বলতে পারলো না। তার আগেই কেউ তার মুখটা চেপে ধরে। আর অন্যরা বিশ্রিভাবে হেসে উঠে। রাতের অন্ধকারে এই হাসিটা মনে হলো কোনো অশুভ আত্নার আর্তচিৎকার।

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৫০