Home লাভ বাই দ্যা ভিলেন লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৭৪

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৭৪

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৭৪
লিজা মনি

অশ্রুসিক্ত নয়নে এনি নিষ্পলক চেয়ে রইল নিকের পানে। কিন্তু নিকের অভিব্যক্তিতে কোনো ভাবান্তর পরিলক্ষিত হলো না। তার মুখাবয়ব আর শারীরিক অবয়ব কেমন যেন এক পাষাণ খণ্ডে রূপান্তরিত হয়েছে। এনির শরীর ঝাঁকি দিয়ে উঠে আচমকা।
– চলে যেতে চাও?
এনি তাচ্ছিল্য হাসলো ” মেয়ের মৃত লাশ সামনে রেখে বিচ্ছেদ চাওয়ার আগে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলতেন আমাকে। মা – মেয়ের জানাজা এক সাথে হয়ে যেত। আপনার মত পাষণ্ডের সাথে বিচ্ছেদ হোক আমার। আর এই বিচ্ছেদের মিলন যাতে কখনো না আসে।

নিক কামড়ে ধরলো নিজের ঠোঁট। ধাউ – ধাউ করে জ্বলে উঠলো মস্তিষ্ক। ঘন -ঘন শ্বাস টেনে চোখ বন্ধ করে ফেলে। এনি কোনো আর কোনো প্রশ্নের প্রত্যুত্তর না দিয়ে তার কলিজার টুকরোকে আগলে নেয়। সেই নিস্পন্দ, নিথর দেহটিকে পুনরায় বক্ষস্থলে চেপে ধরে বুকফাটা আর্তনাদে ভেঙে পড়ে। অন্তরের সুতীব্র যন্ত্রণা যেন ক্ষণে ক্ষণে দ্বিগুণ বেগে সংক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে। মনে হলো, কোনো এক অদৃশ্য ঘাতক তার হৃৎপিণ্ডে উপর্যুপরি আঘাত হেনে তাকে রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত করে চলেছে। অবরুদ্ধ কান্নার তোড়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে এনি অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করতে থাকে,
” মা আমার। আমার কলিজা। ত.. তুমি ও আমাকে রেখে চলে গেলে? ভালোবাসা কি কম দিয়েছি? নয়টা মাস পেটে রেখে অসহ্য যন্ত্রনা সইয়েছি। তোমাদের পাপা ছিলো না আমার কাছে। ভরসার হাত ছিলো না মাথার উপর। মৃত্যু যখন সন্নিকটে তখন সেই মৃত্যুকে সরিয়ে দিয়ে তোমাদের জন্য বেঁচেছি। ডাক্তার বলেছিলো তিন জন সন্তান জন্ম দিতে গেলে মৃত্যুর ঝুঁকি। তবুও তোমাদের দুনিয়ায় এনেছি। কতটা আগলেছি। এরপরও শেষ পর্যন্ত মায়ের চোখে কিভাবে ধুলো দিলে? বলেছিলাম তো আমি আমার মায়েদের জন্য সুগন্ধী ফুলের মালা গেঁথে রাখব। আর সেই মালা গলায় দিয়ে সেজে উঠবে আমার শাহজাদীরা।

নিক তাকিয়ে দেখলো এনির কান্না। নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে চুল খামছে ধরলো। চোখের কার্ণিশ লাল হয়ে আছে। চোখ বন্ধ করলেই যেন রক্ত গড়িয়ে পড়বে। এনির কোল থেকে নিথর মেয়ের দেহখানা নিতে চাইলে এনি ছিটকে দুরে সরে যায়। মেয়েকে বুকের সাথে আরও গভীর ভাবে মিশিয়ে নেয়,
” ছ.. ছুবে না ওকে। কেউ ছুঁতে আসলে খুন করে ফেলব।
নিক শুনলো না। এনির মুখোমুখি নোংরা মেঝেতে হাটু ভেঙ্গে বসে পড়ে। এনির ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে শক্তভাবে চেপে ধরে কোনোরকম উচ্চারন করে,
” তোমার কত স্বাধীনতা। ওকে আগলে নিয়ে হাঁউমাঁউ করে কাঁদতে পারছো। অথচ আমি কাঁদার স্বাধীনতা পাচ্ছি না। কেনো বলোতো?

এনির শরীর শিরশির করে উঠে। অন্যমনস্ক হয়ে তাকাতেই নিক ছুঁ মেরে নিয়ে নেয় মেয়েকে। এনি বুঝে উঠার আগেই নিক উঠে দাঁড়িয়ে যায়। এনি ছটফট করে উঠে। সোনালি চুলগুলো পাগলের মত এলোমেলো হয়ে আছে। পা থেকে আবার ও তরল রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। শরীরে অসংখ্য ক্ষত। তার উপর সাদা ব্যান্ডাজ করে রাখা। কেমন এক ভিবৎস্য অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে রমণী। এলোমেলো গলায় বলে,
” ন.. নিয়েছেন কেনো? কি করবেন ওকে?
নিক শব্দ করে কয়েকবার চুমু খায় মেয়ের কপালে। ঠিক কতগুলো চুমু খেয়েছে নিক হয়ত নিজেও জানে না। অধিরাজের কোলে দিয়ে এনিকে শক্ত করে চেপে ধরে নিজের সাথে। নিম্ন আওয়াজে বলে,
” ওর বাবা জানোয়ার হলেও একসময় মুসলিম ঘরের সন্তান ছিলো। পাপী হতে পারি তবে সৃষ্টিকর্তা ভুলে যায় নি। আর নিজের ধর্ম অনুযায়ী শেষ কাজ সম্পন্ন হবে। শান্ত হও। সামলাও নিজেকে। পরকালে দেখা করে নিও ব্লাডরোজ। কেউ আটকাবে না তোমাকে। আজ আমি আটকাচ্ছি। চোখ বন্ধ করে বুকের সাথে মিশে থাকো আমার। যন্ত্রনাগুলোকে গিলে নাও। রাগ আর যন্ত্রনা মিটাতে চাইলে শত্রুর ছিন্ন-বিচ্ছন্ন দেহকে আর ও ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দাও। তবুও আমার মেয়েটাকে যেতে দাও।
এনি দুই পাশে মাথা নাড়িয়ে সামনে তাকায়। অধিরাজ অনেকটা জায়গা পেরিয়ে গিয়েছে। এনি নিকের বাহুডোর ভেদ করে সেদিকে ছুঁটতে চাইলো। কিন্তু পেরো উঠলো না নিকের শক্তির সাথে। এনি রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ক্ষেপে যায়,

” জানোয়ারের বাচ্চা মেরে ফেলব আমি তকে। আমার মেয়েটাকে নিয়ে যাচ্ছে। ছাড় বলছি।
নিক শান্ত চোখে তাকালো এনির দিকে। কোনো রাগ নেই মুখে। এনি হাঁউমাউ করে কেঁদে যাচ্ছে। বেহুশের মত চিৎকার দিয়ে উঠে,
” প্লিজ ওকে নিবেন না। ন… না নিবেন না। ন.. নিবেন না আমার মেয়েকে। এতটা পাষাণ হবেন না। ও তোমার মেয়ে। তোমার রক্ত নিক। কিভাবে পারবে নিজের মেয়েকে মাটির নিচে রেখে আসতে? যন্ত্রনা হবে না তোমার? কষ্টে বুক ছিঁড়ে যাবে না। আমার মেয়েটা ওই অন্ধকার কবরে একা থাকতে পারবে না। বয়স হয়েছে কত বলো? কিভাবে থাকবে আমাকে ছাড়া।তুমি তো জানো, একটু না দেখলে কিভাবে কেঁদে -কুটে অস্থির হয়ে যায়। বুকের দুধ ছাড়া কিছু খায় না। ক্ষুধার যন্ত্রনায় কাঁদবে। কেউ তখন সামাল দিতে পারে না। প্লিজ আল্লাহর দোহায় লাগে ওকে যেতে দিও না। প… প্লিজ. দ.. দিও না…

এনি আর উচ্চারন করতে পারলো না কোনো শব্দ। সমস্ত শক্তি ছেড়ে দিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ঢলে পড়ে নিকের বাহুডোরে। জ্ঞান হারিয়ে ফেলার আগে পর্যন্ত বিরবির করছে,
” যেতে দিবেন না। বাঁচব না আমি ওদের ছাড়া। আমার প্রান, আমার জীবন।
নিক কপালে চুমু খায়। দুই হাত দিয়ে পাজা কোলে তুলে নেয় ক্ষত-বিক্ষত হওয়া রমণীকে।
” আর ইউ ক্রাইং ফর আ চাইল্ড, ব্লাডরোজ? ইফ ইওর লাইফ ওয়ার নট ইন ডেঞ্জার, আই উড গিভ ইউ আ থাউজ্যান্ড ডটার্স। মাই হোম উড বি ফিল্ড উইথ পিস অ্যান্ড ওয়ার্মথ ওয়ান্স এগেইন। তোমার যন্ত্রনা দেখার জন্য আমি আছি। অথচ আমার যন্ত্রনা অনুভব করার মত কেউ নেই।

চিকিৎসক ও নার্সরা যখন দুপুরে খাবার খাওয়ার জন্য নিচে নেমে যান, তখন রিদ্ধিমার ঘর সম্পূর্ণ জনশূন্য হয়ে পড়ে। ক্ষতবিক্ষত সারা শরীরে প্রচণ্ড আঘাত, সামান্য নড়াচড়া করাও তার পক্ষে দুঃসাধ্য। দম যেন আটকে আসছে। কেবল একজন নার্স রিদ্ধিমার শিয়রে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে।
​সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রিদ্ধিমা কাতর কণ্ঠে শুধাল,
​”মিনারে কারা এসেছে নার্স? ভাইয়া কিংবা এনি কি এসেছে? আচ্ছা, বলতে পারো নাজলী আপুর কী অবস্থা? আরিশ ভাইয়া কোথায় আছেন? আমাদের ছোট্ট দুটো প্রাণ এখন কার কাছে আছে? মামুণির জানাজা কি সম্পন্ন হয়ে গেছে? বলো! চুপ করে আছ কেন?”​
একনাগাড়ে কথাগুলো বলতে বলতে রিদ্ধিমা হাঁপিয়ে ওঠে। তার শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুততর হতে থাকে। চারপাশের এই পৃথিবী কেন আজ তার কাছে এতটা বিষাক্ত ঠেকছে, তা তার জানা নেই। এক তীব্র যন্ত্রণায় ভেতরটা ছটফট করছে। এই অসহ্য যন্ত্রণা থেকে সে মুক্তি চায়—একটুখানি নিষ্কৃতি বড় বেশি প্রয়োজন। নার্স কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে উত্তর দেয়,

” মিনারে আপাতত তানভী ম্যাম ছাড়া কেউ নেই। অধিরাজ স্যার এসেছে পাঁচ মিনিট হবে। মনে হচ্ছে আবার চলে যাবে। বাকিদের খবর জানি না ম্যাম।
রিদ্ধিমা তপ্ত শ্বাস ফেলে বলে,
” অধিরাজ ভাইয়াকে একটু আসতে বলবে? একটু হ্যাল্প করো প্লিজ।
নার্স না চাইতেও সম্মতি জানায়। রিদ্ধিমার কাতর দৃষ্টি তাকে না করার সুযোগ দেয় নি। নার্স অধিরাজের কাছে গিয়ে ফিরে আসে আবার দশ মিনিটের ভেতরে। সাথে অধিরাজ হুড়মুড়িয়ে রুমে প্রবেশ করে। রিদ্ধিমা ঠোঁট চেপে ধরে কান্নাটা গিলে নিতে চাচ্ছে। অধিরাজ নিষ্পলক তাকায় ক্ষত – বিক্ষত হয়ে থাকা মেয়েটার দিকে।
” ডেকেছিলে?
রিদ্ধিমা নার্সকে ইশারা করে বলে,
” তুমি বাহিরে যাও। প্রয়োজনীয় কথা আছে আমার।

নার্স সম্মতি জানিয়ে চলে গেলো। অধিরাজ চেয়ার টেনে রিদ্ধিমার শিউরে বসে। রিদ্ধিমার দুই গাল দিয়ে টপ- টপ পানি পড়ছে। শুয়ে থাকার কারনে চোখ দিয়ে কানের দিকে অগ্রসর হচ্ছে পানির কণাগুলো। নিশ্বাস টেনে বলে,
” নিক যদি আমার রক্তের ভাই হয়ে থাকে তবে আপনি আর আরিশ ভাইয়ার সাথে আমার আত্নার সম্পর্ক। আপনারা দুইজন হলেন গ্যাংস্টার বসের সেই ছায়া যারা কখনো শরীর থেকে আলাদা হয় না। জানেন তো আপনাদের নিয়ে যদি ইতিহাস লেখা হত তবে বিশ্বস্ত হিসেবে আপনার নাম আর বন্ধুত্ব বুঝাতে আরিশের নাম উঠে আসত। ইতিহাস না লেখা হোক, আফ্রিকা আর আমেরিকা দুইটা দেশ তো জানবে গ্যাংস্টার বস যদি শরীর হয় তবে আপনারা দুইজন হলেন তার ছায়া।
আমি যখন প্রথম মিনারে আসি তখন সব মাথার উপর দিয়ে যেত। আপনার বিশালদেহী শরীর আর গায়ের রং নিয়ে ভয় লাগত। পরে যখন আমাকে বললেন ‘ ভয়ের কিছু নেই। আমাকে এসিস্ট্যান্ট বা ভাই ভাবতে পারো ” আমি সেদিন এসিস্ট্যান্ট শব্দটাকে পরিহার করে ভাই ডাক বেছে নিয়েছি। পরে আপনাকে আর ভয় লাগত না। কয়দিনে অনেকটা আপন হয়ে উঠেছি আপনাদের। একটা কথা জিজ্ঞাসা করব?
অধিরাজ নিশ্চুপ হয়ে শুনছিলো সব কথা। রিদ্ধিমার প্রশ্ন মাথা তুলে তাকিয়ে বলে,

” জিজ্ঞাসা করো।
” আমাকে সবাই ঘৃনা করে তাই না? আজ আমার কারনে প্রতিটা সদস্য মৃত্যু ঝুঁকিতে। এমনকি.. এ.. এমনকি।
রিদ্ধিমা আর বলতে পারে নি। ফুঁপিয়ে উঠে আচমকা। যন্ত্রনায় বুকটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। অধিরাজ আলতোভাবে রিদ্ধিমার কপালে হাত রাখে। স্নেহপরশ দিয়ে বলে,
” তুমি অসুস্থ রিদ্ধিমা। কাঁদা তোমার স্বাস্থ্যের জন্য ঠিক নয়।
” অথচ কাঁদাটা এই বিধাতা কপালে সিল লাগিয়ে দিয়েছে।
‘ ভুলে যাও সব কিছু। তোমাকে কেউ খারাপ ভাবে নি।

” কোনটা ভুলব আমি?ওই পিশাচ আমার দিকে লুলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলো? নাকি নিজের বেস্ট ফ্রেন্ড এমন ধোঁকা দিলো সেটা? ওই অন্ধকার রুমে কেউ আমার বুকে হাত দিচ্ছিলো, শরীরকে নোংরা করতে চেয়েছিলো। পুরোপুরি জ্ঞান হারাই নি আমি। একটু হলেও মস্তিষ্ক সজাগ ছিলো। তখন আপনারা না পৌঁছালে আজ ধর্ষিতা হয়ে মরতে হত। চোখের সামনে নিজের ভাইয়ের ছোট্ট প্রানটাকে ছটফট করতে দেখেছি একটা কাচের বক্সে। জানোয়ারগুলো কত কি বলছিলো। কোন দৃশ্য ভুলব আমি? আত্না কাঁপছে যতবার মনে হচ্ছে ওই নরকময় মুহূর্তে গুলো। যন্ত্রনায় শরীর অসাড় হয়ে আসছে। সত্যি বলছি আর পারছি না এই কাটা যুক্ত দুনিয়ায় থাকতে। আমার মরণ কেনো হলো না ভাইয়া?
অধিরাজের বুক ধক করে উঠে। শূন্য দৃষ্টিতে তাকায় রিদ্ধিমার দিকে। রিদ্ধিমার চোখের পানি মুছে দিয়ে বলে,
” শান্ত হও। পরিস্থিতি ভালো নয়। আসল কালপ্রিট এখনও খুঁজে পায় নি। কায়াত নিভ্রিতাকে মারে নি। মেরেছে অন্যজন। কিন্তু সেই অন্যজন কে জানা যায় নি। তুমি ভেঙ্গে পড়লে চলবে না রিদ্ধিমা। তুমি তো ওখানে উপস্থিত ছিলে। আমাকে বলে নিভ্রিতাকে কাচের ভেতরে কখন ডুকিয়েছিলো?
রিদ্ধিমা নাক টেনে শ্বাস নিয়ে বলে,

” আমার সামনে ওকে ডুকানো হয় নি। যখন জ্ঞান ফিরলো তখন দেখলাম চোখের সামনে ওর নিস্তেজ শরীর।
” তার মানে এর আগেই যা করার করে ফেলছিলো। কায়াত নিজেও জানত না তার আড়ালে কেউ এই কাজ করেছে। আসল কালপ্রিট খুঁজে না পেলে সবার জীবন আর ও ঝুঁকিতে পড়বে। তুমি রেস্ট নাও। আমি আসছি কিছুক্ষণের জন্য।
” একটা প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইছি ভাইয়া। যার জন্য আপনাকে ডেকেছি।
অধিরাজ পায়ের গতি থামিয়ে দেয়।ঘাড় ঘুরিয়ে প্রশ্ন করে,
” বলো, কি জানতে চাও?
রিদ্ধিমা কোনো ভণিতা ছাড়াই জিজ্ঞাসা করে,
” আমার জন্মদাত্রী আর জন্মদাতা কে ছিলো? ওরা মারা গিয়েছে কিভাবে?
অধিরাজ থমকে যায় দুইটা প্রশ্নে। ঠোঁট ভিজিয়ে বলে,
” ত.. তুমি জানো না?
” আপনি তুতলাচ্ছেন ভাইয়া? কঠিন প্রশ্ন করেছি আমি?
” উহুম।

” তাহলে উত্তর দিন। আমার জানার অধিকার আছে কে আমার বাবা – মা। তাদের সাথে কি হয়েছিলো। আমার মা মারা গিয়েছে কিভাবে? প্রথমে সরি ভাইয়া, এমন এক নরকময় মুহূর্তে এইসব প্রশ্ন করার জন্য। কিন্তু জানাটা আমার জন্য খুব প্রয়োজন। আজ আছি কাল না ও থাকতে পারি দুনিয়ায়। মরার আগে বাপ- মা সম্পর্কে জানতে চাই।
অধিরাজ কামড়ে ধরলো নিজের ঠোঁট। রিদ্ধিমার কথার মানে বুঝলো না সে। হুট করে মেহেরের কথা মনে পড়ছে খুব। মেয়েটা ঠিক এমন ছিলো। হুট- হাট প্রশ্নে সবাইকে থমকে দেয়। আবার এমন কথা বলে যেন মৃত্যু দেখছে চোখে। অধিরাজ নিস্তেজ গলায় বলে,
” বসের অনুমতি ছাড়া তোমাকে কিছু বলতে পারব না রিদ্ধিমা।
” একজন মেয়ে তার বাবা -মা সম্পর্কে জানতে চাচ্ছে ভাইয়া। অনুমতি নেওয়ার কি প্রয়োজন?
” আর পাঁচটা সাধারন ঘটনা হলে বলে দিতাম। এইসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি করা কষ্টকর। এই রহস্য উন্মোচন করলে তুমি কষ্ট পাবে।
” তাহলে আপনি বলবেন না?
” সরি।
অধিরাজ একটা শব্দ উচ্চারন করে কোনো মতে রুম থেকে বের হয়ে যায়। রিদ্ধিমা অশ্রুসিক্ত চোখে তাকিয়ে থাকে সেই যাওয়ার দিকে। তার মস্তিষ্কে আসে না এই প্রশ্নটা সবাই এড়িয়ে যায় কেনো? কেনো তাকে কেউ কিছু বলতে চায় না। মায়ের মৃত্যুতে কি এমন রহস্য আছে যেটা শুনলে আমি কষ্ট পাব? কিভাবে মারা গিয়েছেন উনি? রিদ্ধিমা নিশ্বাস টেনে চোখের পানি মুছলো। কাঁদতে-কাঁদতে মাথায় যন্ত্রনা শুরু হয়। চুল টেনে ধরে ঘাপটে মেরে শুয়ে থাকে।

দেয়ালের এক কোণে আরিশ নিস্তেজ প্রতিমার মতো স্থির হয়ে বসে আছে। চুলগুলো অবিন্যস্ত হয়ে সামনে ল্যাপ্টে আছে । অধরের এক প্রান্ত বিদীর্ণ হয়ে জমাটবদ্ধ রক্তের রেখা দৃশ্যমান। শরীরের রক্তের দাগগুলো শুভ্র শার্টের বক্ষপটে শুষ্ক ও কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করেছে। অতিরিক্ত কান্নার ফলে অক্ষিপটদ্বয় স্ফীত ও আরক্তিম। সমগ্র মুখাবয়বে এক অসহনীয় যন্ত্রণার ছাপ দৃশ্যমান। যেন শরীর আছে কিন্তু আত্নাটা সাথে নেই আর।
​হঠাৎ এক রুদ্ধশ্বাস ও ঘন ঘন শ্বসনের শব্দে আরিশের জড়তা ভেঙ্গে যায়। সম্মুখের শয্যায় নাজলী অত্যন্ত অস্থিরভাবে শ্বাস গ্রহণের চেষ্টা চালাচ্ছে। আরিশ শূন্য ও বিবর্ণ দৃষ্টিতে সেদিকে তাকায়। নাজলীর এই ক্ষীণতম প্রাণস্পন্দন প্রত্যক্ষ করা মাত্রই যেন আরিশের মৃতপ্রায় দেহে আকস্মিক এক জীবনীশক্তির সঞ্চার হয়। নাজলীকে পুনরায় শ্বাস নিতে দেখে আরিশ ঢোক গিলে। প্রবল ঝড়ের গতিতে সেই শ্বেতশুভ্র বেডের পাশে যায়। নাজলী তার নেত্রপল্লব খুলেছে বটে, কিন্তু তার শ্বাসের গতি অত্যন্ত দ্রুত চলছে। কেমন যেন অসম ও রুদ্ধপ্রায় ভাবে চলছে শ্বাস। আরিশ নাজলীর হাতে একাধিক চুমু খেয়ে অস্থির হয়ে উঠে,

” ত.. তুমি শ্বাস নিচ্ছো। ত.. তুমি আমাকে রেখে যাও নি। আই লাভ ইউ জান। আই লাভ ইউ সো মাচ। শ্বাস নিচ্ছো কেনো এইভাবে? কোথায় যন্ত্রনা হচ্ছে? বুকে ব্যাথা করছে? শরীরে যন্ত্রনা হচ্ছে? এ্যাই জান বল না?
নাজলী আরিশের উন্মাদের মত মুখটার দিকে তাকায়। চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। অতিরিক্ত শ্বাসের কারনে বুক উঠা-নামা করছে। আরিশ আর সহ্য করলো না। ডাক্তারকে দুই- তিনটা ডাক দিয়েই পুরো হসপিটাল মাথায় তুলে ফেলেছে। তিনজন ডাক্তার দৌঁড়ে আসে আরিশের ডাকে। তারা এতক্ষন বাহিরে এই অপেক্ষা করছিলো। আরিশ সবাইকে নিষেধ করেছিলো যাতে ভেতরে কেউ না আসে। তাই ভয়ে কেউ আসে নি এতক্ষণ। নাজলীকে ঘন -ঘন নিশ্বাস নিতে দেখে ডাক্তার তারা খুশিতে তাকায় আরিশের দিকে। আরিশের চোখে-মুখে উগ্রতা ভাব।
একজন ডাক্তার আরিশিকে হুশিয়ারি দিয়ে বলে,

” ওনার হাতটা ধরে রাখুন। খেয়াল রাখবেন অক্সিজেন মাস্ক যাতে খুলে না যায়।
মনিটরের পর্দায় নাজলীর হার্ট রেটের গ্রাফটি এতক্ষণ প্রায় সমান্তরাল হতে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ তা তীব্র চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে লাফাচ্ছে। সংখ্যাটা দেখাচ্ছে ১৪৫ থেকে ১৫০-এর ঘরে। তীব্র অক্সিজেনের অভাবে এবং বেঁচে থাকার শেষ লড়াইয়ে নাজলীর হৃদপিণ্ড এখন স্বাভাবিকের (৬০-১০০) চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি গতিতে অনবরত স্পন্দিত হচ্ছে। নাজলীর রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা নির্দেশক সংখ্যাটি আশঙ্কাজনকভাবে নেমে এসেছে ৬৫%-এ। সুস্থ মানুষের শরীরে যা ৯৫%-এর ওপরে থাকা উচিত, নাজলীর শরীরে তা এখন তলানিতে। আর এই তীব্র হাইপোক্সিয়া বা অক্সিজেন সংকটের কারণেই সে বাতাসের জন্য অমন ছটফট করছে, তার ফুসফুস শেষ চেষ্টা হিসেবে ঘন ঘন টেনে নিচ্ছে বিষাক্ত বাতাস।
ডাক্তার নাজলীর মুখের অক্সিজেন মাস্কটি ঠিক করতে করতে নার্সকে চিৎকার করে নির্দেশ দিলেন,
“শিগগিরই হাই-ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা (HFNC) রেডি করো! স্পীড বাড়িয়ে দাও, ওর ব্রেইনে অক্সিজেন পৌঁছাতে হবে!”

নাজলীর রক্তের অক্সিজেন যেহেতু মাত্র ৬৫%, তাই সাধারণ মাস্ক দিয়ে তাকে বাঁচানো সম্ভব নয়। ডাক্তাররা তাৎক্ষণিকভাবে তার মুখে হাই-ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা (HFNC) অথবা নন-ইনভেসিভ ভেন্টিলেটর (BiPAP) মাস্ক শক্ত করে চেপে ধরে।
এই মেশিনটি প্রতি মিনিটে প্রায় ৪০-৬০ লিটার বিশুদ্ধ অক্সিজেন উচ্চ চাপে নাজলীর ফুসফুসে পাঠাবে। এতে তার সংকুচিত ও অবরুদ্ধ হয়ে যাওয়া অ্যালভিওলাইগুলো (ফুসফুসের বায়ুথলি) আবার প্রসারিত হবে এবং রক্তে দ্রুত অক্সিজেন ছড়াতে শুরু করবে। আরিশ অস্থির হয়ে উঠে। ডাক্তারদের পারছে না কাচা চিঁবিয়ে খেতে। অনেক গুলো চিকিৎসার পর নাজলীর শরীর নিস্তেজ হয়ে আসে কিছুটা।
রক্তে এবং মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছানোর পর নাজলীর ছটফটানি কমে আসে। তীব্র হাইপোক্সিয়ার কারণে তার চোখ দুটো কেমন যেন দেখাচ্ছে।

ডাক্তার নাজলীর বুকে স্টেথোস্কোপ ঠেকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরিশের দিকে তাকিয়ে বলে “ক্রাইসিস ওভার! ফুসফুস আবার অক্সিজেন হোল্ড করতে পারছে। হার্ট রেটও নরমাল। শি ইজ আউট অফ ডেঞ্জার নাউ।”
আরিশ দেখে এতক্ষণে নাজলীর নীলচে হয়ে যাওয়া ঠোঁট ও নখগুলোতে আবার স্বাভাবিক রক্তের লালচে আভা ফিরে এসেছে। এতক্ষণে চেপে রাখা শ্বাসটা স্বস্তির সাথে ছাড়ে। বিরবির করে কিছু একটা উচ্চারন করে বার বার।
নাজলী পিটপিট করে চোখ খুলে তাকায় ঘন্টা খানেক পর। আরিশকে না চিনে শূন্য দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল বার বার। আরিশ সবাইকে উপেক্ষা করে এক প্রকার ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রিয়সীর উপরে। চোখে -মুখে অজস্র চুমু দিতে থাকে। কেমন উগ্র আর উন্মাদের মত চুমু খেয়ে যাচ্ছে। ডাক্তার তারা মৃদু হাসলেন এমন আচরনে। আরিশের এমন উগ্র আচরনে নাজলী ছটফটিয়ে উঠে। বিভ্রান্তি কেটে যায়। দীর্ঘ একটা শান্ত শ্বাস নিয়ে চোখ পিটপিট করে তাকায় সামনের দিকে। বুঝতে পারছে না তার সাথে কি হচ্ছে। হাত – পা অসাড় হয়ে আছে। নড়া-চড়া করতে পারছে না। আরশ দুইটা হাত চেপে ধরে রেখেছে। অনেকখন পর টনক নড়লো আরিশ পাগলামো করছে সবার সামনে। ডাক্তারদের মুখে হাসি দেখে লজ্জায় মিলিয়ে যায়। আরিশকে থামাতে গিয়ে নিজেই হাঁপিয়ে উঠছে। এই লোক যেন চুমু খাওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এত চুমু কে খায় ভাই? পুরো মুখ ভিজিয়ে ফেলেছে। নাজলী নাক- মুখ কুচকাতে গিয়েই সামান্য হাসে। আরিশ হাজারের ও বেশি চুমু খায়। অবশেষে থেমে যায় যুবক। ঘন শ্বাস ফেলে নাজলীর মুখের থু- থু রুমাল দিয়ে মুছে দেয়। নাজলী লজ্জায় মৃদু আওয়াজে বলে,

‘ থামুন আরিশ, সবাই দেখছে। মরে যায় নি তো!
আরিশের চোখ – মুখের রং রাগে ফ্যাকাশে হয়ে আসে। হুট করে আরিশের মুখের পরিবর্তন দেখে নাজলী হতভম্ভ হয়ে যায়। এত দ্রুত কারোর রিয়্যাকশন পাল্টে যায় কিভাবে? এইমাত্র চোখে-মুখে কেমন উন্মাদনা ছিলো। এখন মিনিট না ঘুরতেই রাগে চোখ-মুখ শক্ত করে ফেলেছে। নাজলী সামান্য হেসে তাকায় আরিশের দিকে। ডাক্তার তারা অভিনন্দন জানিয়ে বের হয়ে যায় কেবিন থেকে। আরিশ কেবিনের দরজা বন্ধ করে এসে চেয়ারে হাত- পা ছড়িয়ে বসে। চোখ বন্ধ করে কপালের উপর একটা হাত দিয়ে রাখে। নাজলী সামান্য কেঁশে বলে,
” দুরে বসলেন যে? বেডে জায়গা আছে, এখানে আসুন।
আরিশ আসলো না। এখানেই ঠাঁই বসে আছে। নাজলী দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ভুলে মরনের কথা বলেছে, কে জানতো রেগে যাবে। নাজলীর সহ্য হলো না এই দুরত্ব। কিছুটা কঠিন গলায় ধমক দেয়,
” শুনতে পান নি আমার কথা? কাছে আসতে বলেছি আপনাকে।
আরিশ কপাল থেকে হাত সরায়। ভ্রুঁ কুচকে বলে,

” আমাকে ধমক দিচ্ছো? সাহস বেড়েছে?
নাজলী ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলে,
” অবশ্যই! একটু আগের কাহিনী ভুলে যায় নি। শত্রুর জন্য কেউ এমন উন্মাদ হয়? শরীরের কি অবস্থা করে রেখেছেন? রিতীমত আপনার শরীর থেকে গন্ধ বের হচ্ছে। রক্তগুলো থেকে কি বিশ্রি গন্ধ।
নাজলীর নাক ছিটকানো দেখে আরিশ ইচ্ছে করে তার পাশে এসে বসে। নাজলী আড়চোখে তাকায়। তার টেকনিক কাজে লাগলো তবে। আরিশ ঝুঁকে চুমু খায় কপালে। এরপর গালে হাত দিয়ে বলে,
” আমি যদি নর্দমা থেকেও উঠে আসি এরপরও আমার সান্নিধ্যে থাকতে হবে। সেকেন্ড অপশন নেই।
নাজলী হেসে বলে,

” আমি তো থাকতে রাজি। তখন রেগে গেলেন ঠিক কোন কারনে?
” আমি রেগে গিয়েছি কে বললো তোমাকে?
” আমার সামনে অভিনয় আর এটিটিউট ভাবটা না দেখালে কি হয় না? আপনার দুর্বলতা সব এইতো জানা। মুখের ভঙ্গিমা দেখলে বলে দিতে পারি।
” রাগিনি আমি।
” আবার মিথ্যে বলছেন?
আরিশ এইবার বিরক্ত হয়ে ধমকে উঠে,
” সুস্থ হয়েছে তুমি? এত উত্তেজিত হচ্ছো কেনো অসুস্থ শরীর নিয়ে। চুপচাপ থাকো।
আরিশের ধমকে শিউরে উঠে রমণী। কত বড় গাজাখোর হলে তাকে এই অবস্থায় ধমকায়। নাজলীর কেনো জানি অভিমান হলো। কই আগে তো কখনো এইসব ধমক বেশি একটা গায়ে লাগত না। এখন কেনো তীঁরের মত কলিজা ছেদ করলো? কান্নাটা গিলে নিয়ে বলে,

” বের হন কেবিন থেকে।
আরিশ অবাক হয়ে বলে,
” মানে?
নাজলী চোখ-মুখ শক্ত করে বলে,
” আমার কেবিন থেকে বের হতে বলছি।
আরিশ অদ্ভুত চোখে তাকালো। রাগ না দেখিয়ে শান্ত গলায় বলে,
” রাগ, জেদ আর ঝগড়া না করলে তোমার হয় না? অসুস্থ তুমি নাজলী।
নাজলী একই ভঙ্গিতে বলে,
” আপনার যেমন ত্যারামি না করলে হয় না। ঠিক আমার ও হয় না।
” আমি কি নিয়ে ত্যারামি করলাম? আচ্ছা, রাগের কথা বলছো? হ্যা, করেছিলাম রাগ। সুস্থ থাকলে থাপড়ে কানে তালা ঝুঁলিয়ে দিতাম। রাগ কন্ট্রোল করার সহজ মাধ্যম হচ্ছে শান্ত থাকা। তাই শান্ত হয়ে বসে ছিলাম। আর কি জানতে চাও?

নাজলী মিটমিট হেসে বলে,
” আগে বলে দিলেই হত। এনি আসে নি?
এনির কথা বলেই আচমকা তাকায় আরিশের দিকে। এক – এক করে পুরো ঘটনা মনে হতে থাকে। সেই ঘাতকের আক্রমন, রক্তাক্ত অবস্থা! নিভ্রিতা নিঁখোজ! নাজলী ঠোঁট ভেজায়। ভয়ে শিরশির করে উঠে নিস্তেজ শরীরটা। আতঙ্ক নিয়ে জিজ্ঞাসা করে,
” এ.. এনি আর বাচ্চারা কেমন আছে আরিশ?
আরিশ মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,
” শান্ত হও। ঠিক আছে তারা।
” আর ন.. নিভ্রিতা?
আরিশের চোখ – মুখে অন্ধকার নেমে আসে। একটা শ্বাস ফেলে বলে,
” বাঁচানো সম্ভব হয় নি। পৌঁছানোর আগেই মেরে ফেলেছে।

নাজলীর কানে যেন কেউ শিশা ডুকিয়ে দিয়েছে। নিভ্রিতার হাসি-খুশি ছোট্ট মুখটা ভেসে উঠে চোখের সামনে। একা তিন জনকে সামলাতে এনি বরাবর হিমশিম খায়। এনির পাশে সব থেকে বড় রক্ষক ছিলো সে। দিনের বেলা বাচ্চাদের বুকে নিয়ে কত – শতবার আগলে রেখেছে। মাতৃত্বের এক টান চলে এসেছিলো সবার প্রতি। নাজলীর বুক ভেঙ্গে আসে। চোখে পানি ভড়ে উঠে। বিশ্বাস করতে পারছে না সেই ছোট প্রানটা আর ওদের মধ্যে নেই। নাজলী হাঁপাচ্ছে শুধু। আচমকা মুখে হাত দিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে। প্রথমবারের মত নাজলীকে এমন কাঁদতে দেখে আরিশ কিছুক্ষণ নিষ্পলক চেয়ে থাকে। সময়ের ব্যবধানে স্ত্রীর পাশে শুয়ে বুকের সাথে মিশিয়ে নেয় কাঁপতে থাকা শরীরটাকে। নাজলী আরিশের শার্ট খামছে ধরে কেঁদেই যাচ্ছে।

” শান্ত হও। অসুস্থ তুমি।
নাজলী কাঁদার মধ্যেই ভাঙ্গা গলায় বলে,
” এনিটা মরে যাবে আরিশ। মায়ের বুকে সন্তানের নিথর দেহ, এর থেকে নরকময় মুহূর্ত আর একটাও নেই ভুবনে।
আরিশ নাজলীর কপালের চুল ঠিক করে দিয়ে বলে,
” চিন্তা নেই, নিক দুই হাত দিয়ে আগলে নিবে সব কিছু।

সময় এগিয়ে যাচ্ছে নিজ গতিতে। রিদ্ধিমা পুরো সুস্থ না হলেও ক্ষত অনেকটা শুকিয়ে গিয়েছে। রাত কয়টা বাজে তার ধ্যান নেই। বুকে সাহস নিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে অজানা গন্তব্যের দিকে। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ এর গর্জনে মুখরিত চার পাশ। ঠিক সেসময় শুনা গেলো এক পরিচিত কন্ঠস্বর। সেই কন্ঠ যেটা শুনলেই সে খুশিতে লাফিয়ে উঠতো। বুকে প্রশান্তি অনুভব করত। কিন্তু আজ পুরো শরীর রাগে জ্বলে যাচ্ছে। ঘৃনায় তাকাতে ইচ্ছে করছে না।
” রিদ্ধি!
রিদ্ধিমা না চাইতেও তাকায় মানবটার দিকে। এক অপরিচিত ব্যক্তির মত এগিয়ে যায়। চোখ-মুখ শক্ত করে দাঁত পিষে,
” ডোন্ট কল মি রিদ্ধি মি, এড্রিয়াণ! প্রয়োজনে ফুল নেম ডাকবেন তবুও এইসব ড্রামা করবেন না। শরীর জ্বলে উঠে।
এড্রিয়ান তাকিয়ে থাকলো রিদ্ধিমার রাগান্বিত মুখটার দিকে। ফর্সা মুখটার মধ্যে এখনও অনেক স্পট রয়ে গিয়েছে। হয়ত ধীরে ধীরে সব রিমুভ হবে। এড্রির কলিজায় যেন কেউ খামছে ধরে আছে। এই কঠিন রিদ্ধিমাকে মেনে নিতে অনেক কষ্ট হচ্ছে তার। এড্রিয়ান কান্নাটাকে আটকে বলে,

” ভাবিনি ডাকা মাত্র এই তুই আসবি। আসার জন্য থ্যাংক্স।
রিদ্ধিমা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে তাচ্ছিল্য হাসে,
” এত খুশি হওয়ার কিছু নেই। দেখতে এসেছিলাম আমার শত্রুর কি জঘন্য পরিনতি হয়েছে। এখন তো দেখছি দিব্বি ভালো আছেন। চোখ সামান্য গর্তে গিয়েছে আর মুখটা হালকা ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছে। চুলগুলোও অনেক বড় হয়ে আছে। এই সামান্য ধ্বংসে তো তৃপ্তি আসছে না। ভেবেছিলাম মরে হয়ত গিয়েছেন। এসে দেখি পাক্কা জীবিত।
এড্রিয়ান সামান্য পিছিয়ে যায়। পুরো শরীর অসাড় হয়ে আসে তার। সামান্য আঘাত পেলে যে মেয়েটা কেঁদে দিত। সে আজ তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে মরণ চাইছে। এড্রিয়ান ভাঙ্গা গলায় বলে,
” মরণ কামনা করছিস?
” মরে গেলে ভালো হত।
” কষ্ট হচ্ছে না তর? তুই আমাকে মরতে বলছিস?

রিদ্ধিমার চোখ জ্বলে উঠে। রক্তচক্ষু নিয়ে তাকায় এড্রিয়ানের দিকে। রিদ্ধিমা সামান্য এগিয়ে এসে তীক্ষ্ণ গলায় বলে,
” কার জন্য কষ্ট পাব মি, এড্রিয়ান? কার জন্য পাব? তার জন্য যার কারনে আমার পুরো জীবনটা তছনছ হয়ে গিয়েছে? তুই ভেবেছিস আমার কথা? একবার অনুভব করেছিস গুন্ডারা আমাকে তাদের কাছে নিয়ে গেলে কি করবে? ধর্ষিতা বানানোর ইচ্ছে জেগেছিলো বুঝি? গজব যে পড়েনি তর উপর শুক্রিয়া কর। আমি তর বুকে ছুঁড়ি ডুকিয়ে রক্তাক্ত করে নি তর ভাগ্য সেটা। কি করে পারলি এমন মাছুম বাচ্চাকে ওইসব পিশাচের হাতে তুলে দিতে? বুক কাঁপে নি তর? এক বাচ্চার অভিশাপে ধ্বংস হবি তুই। এক মায়ের আহাজারিতে ধ্বংস হবি তুই। তুই জানিস এনির অবস্থা কি হয়েছে? মরে যাচ্ছে মেয়েটা। পুরো আমেরিকা আর আফ্রিকার মানুষগুলো আন্ডারগ্রাউন্ড টেরোরিস্ট নামে যাকে সবাই চিনে তাকে পর্যন্ত কাঁদিয়েছিস তুই। অথচ এই ব্যক্তিকে নাকি কেউ কোনোদিন কাঁদতে দেখে নি। তার ভীবৎস্য অতীতকে পিছনে ফেলে তার বর্তমানকে আরো যন্ত্রনাময় করে তুলেছিস তুই। হাসি- খুশি পরিবারটাকে জাহান্নাম বানিয়ে দিয়েছিস। এক মায়ের বুক খালি করেছিস তুই। সৃষ্টিকর্তা এত সহজে সইবে না। তর ধ্বংস বাজেভাবে হোক। তর বুকে আঘাত করার মত শক্তি নেই আমার। নয়ত এই মুহূর্তে তর রক্ত শরীরে লেপ্টে ফেলতাম।

তুই একটা বিশ্বাসঘাতক এড্রি। এই জমিনে তর মত বন্ধু কারোর না হোক। তর মত জানোয়ার কারোর জীবনে আসলে ধ্বংস হয়ে যাবে সে। নিজের থেকেও বেশি ভরসা আর বিশ্বাস করেছি তকে। নিজের স্বার্থ রক্ষার জন্য নিষ্পাপ বাচ্চাটাকে বলি দিলি। সবাইকে তছনছ করে দিলি। তুই একটা পিশাচ!
রিদ্ধিমা হাঁপাচ্ছে কথাগুলো বলে। কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছে তার। এড্রিয়ান চোখের পানি মুছে শব্দ করে হাসলো। রিদ্ধিমা রাগে উন্মাদের মত গর্জে উঠে,
” তুই হাসছিস বেহায়ার মত? ইয়া আল্লাহ, ধৈর্য দাও আমাকে।
এড্রিয়ান উল্টো দিকে পিছাতে থাকে। শাঁ – শাঁ করে বাতাস ছুটে চলছে। রিদ্ধিমা চুল সরিয়ে এড্রিয়ানের দিকে তাকায়। এড্রিয়ান মৃদু হেসে বলে,

” তুই অনেক ভালো মেয়ে রিদ্ধি। এই জীবনে তর মত বন্ধু পেয়ে আমি নিজেকে অনেক সুখী মনে করি। তুই আমার মরণ চাইলি অথচ তর ভাইকে কিন্তু বলিস নি সেদিন আমি তকে বাহিরে বের করেছিলাম। কারন বললে অন্তত আমি জীবিত থাকতাম না আজ। কেনো বাঁচালি? তর বিশ্বাস আর ভরসা রাখতে পারিনি আমি। আমার মত বিশ্বাসঘাতককে ক্ষমা করিস না কোনোদিন। সেদিন আমি নিরুপায় হয়ে করেছি সব। মায়ের আর্তনাদ আর রক্তাক্ত দেহ ছেলে হয়ে কিভাবে সহ্য করব বল? আমার মাকে খুব মারছিলো। পাগলের মত হয়ে গিয়েছিলাম। কোনো পথ ছিলো না। নিজের মাকে বাঁচাতে অন্যকে বলি দিতে হলো। প্রকৃতির কি অদ্ভুত লীলা আমার মা বাঁচে নি। এক সপ্তাহ পর এই মারা গিয়েছে। দেখেছিস ইশ্বর কিভাবে বদলা নিলো। আমি খারাপ রিদ্ধি, আমাকে কখনো ক্ষমা করিস না। আমাকে আজন্ম ঘৃনা কর। শেষবার একটা কথা বলে যায়, সবটুকু দিয়ে তকে ভালোবেসেছিলাম। আমি মজা করে বলতাম না ভালোবাসার কথা। সত্যি তকে ভালোবেসেছি অনেক। যখন ধর্ম নিয়ে বলতি তখন আর সাহস হত না। যেদিন গুন্ডারা আমার চোখের সামনে দিয়ে তকে নিয়ে গেলো সেদিনের চিৎকার দেখিস নি। বন্ধরুমে কত কেঁদেছি তার হিসেব নেই। আজও তকে এইসব বলতাম না। কিন্তু যন্ত্রনা আর আত্নগ্লানিতে মরে যাচ্ছি আমি। আমি একটু বাঁচতে চেয়েছিলাম রিদ্ধি। তর ভালোবাসার চাদরে বাঁচতে চেয়েছিলাম। পারলাম না তর বিশ্বাস আর রাখতে। পারলাম না আদর্শ প্রেমিক হয়ে বাঁচতে। মৃত্যু অনেক কঠিন তবুও তাকে গ্রহন করে নিলাম।
রিদ্ধিমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। মাথা ভঁন – ভঁন করছে তার। এড্রি একদম সমুদ্রের উঁচু স্থানে চলে যায়। সামান্য স্লিপ কাটলেই পড়ে যাবে গভীর সমুদ্রে। রিদ্ধিমা ঝড়ের বেগে ছুঁটে যায় সেদিকে। চেঁচিয়ে উঠে সবটুকু শক্তি দিয়ে,

” এড্রি না! এমন করিস না তুই। এড্রি শুন!
এড্রিয়ান হালকা হাসলো। দুই হাত দুই দিকে প্রসারিত করে চোখ বন্ধ করে ফেলে। রিদ্ধিমা দৌঁড়াচ্ছে। রিদ্ধিমা উঁচু সথানে আসা মাত্রই এড্রিয়ান মুহূর্তেই ঝাঁপ দেয় সমুদ্রে। একটা শব্দ ধ্বাক্কা খেলো রিদ্ধিমার কানে,
” আই লাভ ইউ রিদ্ধি। ক্ষমা করিস না আমাকে কখনো।
বেলাভূমির তপ্ত বালুকাস্তূপে রিদ্ধিমা ধপ করে বসে পড়ে। পরক্ষণেই এক তীব্র ও অবশ করা শূন্যতা অনুভব করে সে মাটির বুক থেকে আর্তনাদ করে ওঠে। সম্মুখে উদ্বেলিত জলরাশির উন্মত্ত গর্জন, অথচ সেখানে নেই। কোথাও নেই এড্রির সামান্যতম অস্তিত্ব। সমুদ্রের এই রাক্ষুসে কৃষ্ণতরঙ্গ তাকে কোন সুদূর অতলান্তে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছে, তা কেবল ওই নির্মম প্রকৃতিই জানে।

​রিদ্ধিমার কম্পিত হস্তযুগল তখন আঁকড়ে ধরে এড্রিয়ানের ফেলে যাওয়া শেষ স্মৃতিচিহ্ন—একটি রকেট। রকেটের ক্ষুদ্র কবাট উন্মোচন করতেই উন্মোচিত হয় এক টুকরো অতীত। বাম পাশে ফ্রেমবন্দি হয়ে আছে রিদ্ধিমার এক হাস্যোজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি, আর তার ঠিক বিপরীতে চিরচেনা এড্রিয়ান। ধূসর হয়ে আসা সেই আলোকচিত্রগুলো বহু পূর্বের, যখন নিয়তির এই নিষ্ঠুর খেলা শুরু হয়নি।

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৭৩

​স্মৃতির সেই অতলস্পর্শী দহনে রিদ্ধিমার বক্ষ বিদীর্ণ হতে চায়। রিদ্ধিমা কেঁদে উঠে,
” কেনো বিশ্বাসঘাতকতা করলি আর কেনো আজ মরে গিয়ে কষ্টের সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে গেলি! ক্ষমা করতে পারব কি না জানি না। তবে তুই ওপারে ভালো থাক। তুই একটা সময় আমার রক্ষাকবচ ছিলি। অস্বীকার করব না। অনেক সুখে থাক।

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৭৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here